| 20 মে 2024
Categories
ধারাবাহিক সময়ের ডায়েরি

পদসঞ্চার (পর্ব-১৫)

আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট

১৫ এপ্রিল । বুধবার   

ভারতে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে গেল। মৃত্যু ৩৫৩ জনের। তাই লকডাউনের মেয়াদ বেড়ে গেল। ৩ মে পর্যন্ত। প্রধানমন্ত্রী গর্ব ভরে বলেছেন, ‘অন্যান্য দেশের তুলনায় আমরা অনেক আগে থেকে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছি।’ কি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল আমরা পূর্ববর্তী অধ্যায়ে তা তুলে ধরেছি। প্রধানমন্ত্রী আজ দেশের মানুষকে সাত দফা নির্দেশ দিয়েছেন : বয়স্কদের খেয়াল রাখুন, লক্ষণরেখা পালন করুন ও মাস্ক ব্যবহার করুন, আয়ুষ মন্ত্রকের নির্দেশ পালন করুন, আরোগ্য সেতু আ্যপ ডাউনলোড করুন, গরিবদের দেখভাল করুন, কর্মী ছাঁটাই থেকে বিরত থাকুন, করোনাযোদ্ধা ডাক্তার-নার্স-পুলিশকে সম্মান করুন। তা নাহয় আমরা করলাম, কিন্তু আপনারা আমাদের জন্য কি করবেন? তার কোন কথা নেই কেন আপনার ভাষণে?

আমাদের প্রশ্ন : যথোপযুক্ত পরীক্ষা-কিট নেই কেন ? ডাক্তার-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষার কি কোন   ব্যবস্থা আছে? স্বাস্থ্য পরিকাঠামোয় কেন মাত্র ১৫ হাজার কোটি বরাদ্দ? রবি ফসল কাটা, ফসল কেনা, মজুত ও পরিবহনে কি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? কর্মী ছাঁটাই বন্ধ করার ব্যবস্থা কি? গরিবদের বাড়তি ৫ কেজি চাল দিয়েই কি দায়িত্ব শেষ? ভিন রাজ্যে আটকে পড়া ২০ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য কি সুরাহার ব্যবস্থা করা হয়েছে?

নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়, আই এম এফের মুখ্য অর্থনীতিবিদ গীতা গোপীনাথ, অর্থনীতিবিদ জঁ দ্রেঁজ, রিজার্ভ ব্যাঙ্কের প্রাক্তন গভর্নর রঘুরাম রাজন সকলেই বলছেন এ অবস্থায় গরিব মানুষের হাতে টাকা দেওয়া জরুরি। সেকথা প্রধানমন্ত্রীর বাংলা নববর্ষের সকালের ভাষণে শোনা গেল না। একজন বিরোধী সাংসদ তাই বলেছেন, ‘ এই সরকারের আমলে নাগরিকদের কি করতে হবে, তা শোনা যায়। সরকার নাগরিকদের জন্য কি করতে চলেছে, তা শোনা যায় না। উনি নিজেই বলেছেন, মানুষের অসুবিধের কথা জানেন। কারও খাদ্যের সমস্যা হচ্ছে, সে কথাও বলেছেন। কিন্তু তার সমাধান কি করেছেন, তা বলেননি।

আজ সংবাদ মাধ্যমে একটা ছবি দেখে চমকে উঠলাম। মুম্বাইএর বান্দ্রায় পরিযায়ী শ্রমিকদের ভিড়ের ছবি। তাঁরা বাড়ি ফিরতে চান। না খেতে পেয়ে মরার আগে বাড়ি ফিরে আসতে চান তাঁরা। গত মার্চ মাসে চার ঘন্টার নোটিশে লকডাউন ঘোষণার পরে এরকম ভিড় দেখেছিলাম দিল্লির আনন্দবিহার বাস টার্মিনালে। এই সংকটে তাদের সুরক্ষার কোন ব্যবস্থা নেই। বাড়িওয়ালা তাদের তড়িয়ে দিয়েছে ভাড়া দিতে পারছে না বলে। যে রাজ্যে তারা ছিল, সেখানকার প্রশাসন খাবার দিচ্ছে না। কি করবে এই সব অসহায় মানুষ! এদের  আবার একটা বড় অংশ নারী। যারা বাসে যেতে পারল না, তারা ৫০০/ ১০০০ মাইল হেঁটে যাবার সিদ্ধান্ত নিল। এদের জন্য বলার কেউ নেই। এদের কোন ইউনিয়ন নেই, তাই এদের হয়ে কেউ লড়তে আসবে না।

ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশনের একটা প্রতিবেদনে দেখলাম সারা পৃথিবীতে পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ২৪ কোটি। পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ৩.৩%। বিশ্বায়নে এদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। উন্নয়নশীল দেশের মানুষ দারিদ্র্য ও বেকারির জ্বালায় চলে গেছে বিদেশে। বিদেশে বসবাসকারী মানুষের ৭৩% পরিযায়ী শ্রমিক।

ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ১৪ কোটি। দিল্লি, মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ু, গুজরাট, অন্ধ্রপ্রদেশ, কেরলে পরিযায়ী শ্রমিক বেশি আছে। সংখ্যায় কিছুটা কম হলেও আছে উত্তর প্রদেশ, বিহার, পঞ্জাব, মধ্য প্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গে। ২০১৫ সালে সরকার যে স্মার্ট সিটি প্রকল্প গ্রহণ করেন তার ফলে পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যা বেড়েছে। সরকার তাদের ব্যাপারে প্রায় উদাসীন। তাদের সঠিক সংখ্যা সরকারের জানা নেই। জানা নেই কারা কত সময়ের জন্য কোথায় আছে।

সব্যসাচী বসু রায়চৌধুরী লিখেছেন, ‘পুঁজিকেন্দ্রিক বিশ্বায়ন দুনিয়াটাকে বিগত কয়েক দশকে একেবারে পাল্টে ফেলেছে। পুঁজি এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে শ্রমিক এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায়, এক দেশ থেকে অন্য দেশে ছড়িয়ে পড়ছেন উন্নত পরিবহন ব্যবস্থার সৌজন্যে। আইনি পথে বা আইনবহির্ভূত উপায়ে, হয়তো বা দালালের হাত ধরে, কোটি কোটি মানুষ জীবিকার সন্ধানে পাড়ি দিয়েছেন বা দিতে বাধ্য হয়েছেন অন্যত্র বা ভিন দেশেও। গোটা পৃথিবীতেই উচ্চপ্রশিক্ষিত কর্মীদের স্বাগত জানানো হয়েছে। স্বল্পশিক্ষিত, অদক্ষ শ্রমিকদের জন্য রাষ্ট্রের সীমানা বহু ক্ষেত্রেই বন্ধ থাকলেও কম খরচে ক্রেতা, উপভোক্তাদের কাছে পণ্য পরিষেবা পৌঁছানোর তাগিদে প্রধানত মুনাফাকেন্দ্রিক এই অর্থনীতিতে ঠাঁই মিলেছে স্থানীয় মানুষের, দেশের মানুষের বহিরাগত বিদ্বেষ সত্ত্বেও।’

আজকের এরকম সংকটে অভিবাসী শ্রমিকরা ভয়াবহ বিপদের সম্মুখীন। তাঁরা নতুন বৈষম্যের শিকার। তাঁদের সঞ্চয় সীমিত, সরকারি কোন সাহায্য তাঁদের নেই। তাহলে দিন-আনা-দিন-খাওয়া এই সব মানুষের চলবে কিভাবে?

বান্দ্রা পূর্ব এলাকায় দুই ছেলেকে নিয়ে আটকে আছেন কালিয়াচকের আব্দুস সালাম। তিনি বলছেন, ‘মুম্বই থেকে মালদহ প্রায় আড়াই হাজার কিলোমিটার। এতখানি রাস্তা কি হেঁটে ফেরা যায়? তিন সপ্তাহ ধরে লকডাউন চলায় আমাদের পরিস্থিতি ভয়াবহ। দুবেলা খাবার জুটছে না। হাতে টাকা নেই। ওদিকে বাড়িতেও পরিবারের লোকজন অনাহারে।’ সুফিয়ান মোমিন বলেন, ‘হেঁটে মালদহ ফেরা সম্ভব নয় জানি। কিন্তু খাবার না পেলে এমনি মরতে হবে। তাই ভাবছি হাঁটতে হাঁটতে যদি রাস্তায় মরে যাই তবু ভালো হয়।’

সুরতের লসকানা এলাকায় আটকে আছেন অন্য রাজ্যের প্রচুর শ্রমিক। কেউ কাজ করেন নির্মাণসংস্থায়, কেউ কাপড়কলে। তাঁরা খাবার পাচ্ছেন না। বাড়ি ফেরার দাবি নিয়ে তাঁরা বাধ্য হয়ে নেমে এসেছেন রাস্তায়। পুলিশ গ্রেপ্তার করতে এলে তাঁদের ক্ষোভ বেড়ে যায়। সংঘর্ষ শুরু হয় পুলিশের সঙ্গে।

কালীপুজোর পরে পূর্ব মেদিনীপুরের পটাশপুর, পশ্চিম মেদিনীপুরের দাঁতন ২ নম্বর ব্লকের জনা ৪০ মানুষ এসেছিলেন দিল্লিতে। প্যান্ডেল তৈরির কাজে তাঁদের ডাক পড়ে। তাঁরা আটকে পড়েছেন পুরনো দিল্লির ফতেহপুরির একচিলতে একটা ঘরে। কাজ বন্ধ, রোজগারও বন্ধ। কিন্তু পেটকে তো বন্ধ করা যায় না। সিপিএম দলের থেকে তাঁদের খাবার ব্যবস্থা করা হয়েছে দিন দশেকের মতো। তারপরে কি হবে তাঁরা জানেন না।

পরিযায়ী শ্রমিকদের বিষয়ে সাম্প্রতিককালের একটি ডিজিটাল বইয়ের সন্ধান পাওয়া গেল অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়ের লেখায়। বইটির নাম ‘ বর্ডার্স অফ আ্যন এপিডেমিক : কোভিদ-১৯ আ্যন্ড মাইগ্রান্ট ওয়ার্কাস’। এটি সম্পাদনা করেছেন সমাজবিজ্ঞানী রণবীর সমাদ্দার। প্রবনধগুলি লিখেছেন রবি অরবিন্দ পটেল( ভাইরাস আ্যন্ড ওয়ার্ল্ড ইকোনমি, দি ওল্ড ইস ডেড, দি নিউ ক্যান্ট বি বর্ন ), রীতজ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়( মাইগ্রান্ট লেবার, ইনফর্মাল ইকোনমি, আ্যন্ড লজিস্টিকস সেক্টর ইন এ কোভিদ-১৯ ওয়ার্ল্ড), বদ্রিনারায়ণ তেওয়ারি( দি বডি ইন সার্ভিলেন্স : হোয়াট টু ডু উইথ দি মাইগ্রান্টস ইন দি করোনা লকডাউন), উৎসা সার্মিন( হাঙ্গার, হিউমিলিয়েশন আ্যন্ড ডেথ, পেরিলস অফ দি মাইগ্রান্ট ওয়ার্কাস ইন দি টাইম অফ কোভিদ-১৯), মনীষকুমার ঝা ও অজিতকুমার পঙ্কজ(ইনসিকিউরিটি আ্যন্ড ফিয়ার ট্রাভেল আ্যজ লেবার ট্রাভেলস ইন দি টাইম অফ প্যানডেমিক), অনামিকা প্রিয়দর্শিনী ও সোনামণি চৌধুরী( দি রিটার্ন অফ বিহারি মাইগ্রান্টস আফটার কোভোদ-১৯ লকডাউন), রজত রায়( দি সাডেন ভিজিবিলিটি অফ রিটার্নি লেবার), মাধুরীলতা বসু ও শিবাজীপ্রতিম বসু( গ্লিমসেস অফ লাইফ ইন দি টাইম অফ করোনা), অম্বরকুমার ঘোষ ও অবসূয়া বসু রায়চৌধুরী( মাইগ্রান্ট ওয়ার্কাস আ্যন্ড দি এথিকস অফ কেয়ার ডিউরিং প্যানডেমিক),  ইশিতা দে( সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং, ‘টাচ মি নট’, আ্যন্ড দি মাইগ্রান্ট ওয়ার্কাস), সমতা বিশ্বাস( ব্রিংগিং দি বর্ডার হোম : ইন্ডিয়ান পার্টিশন ২০২০), পাউলা ব্যানার্জী( নোভেল করোনাভাইরাস আ্যন্ড জেন্ডার ট্রান্সগ্রেশন), সাবির আহমদ(এপিলগ : কাউন্টিং আ্যন্ড আ্যকাউন্টিং ফর দোজ আন দি লং ওয়াক হোম), স্বাতী ভট্টাচার্য ও অভিযান সরকার( এ রিপোর্ট : হাউ ওয়ান স্টেট ক্যান লার্ন ফ্রম আ্যনাদার)।

প্রবন্ধগুলির আলোচনার প্রেক্ষিতে অনির্বাণবাবু সঠিকভাবেই বলেছেন, ‘শ্রমজীবী মানুষ যখন রুজি-রোজগারের  প্রয়োজনে নিজের ঘর ছেড়ে অন্যত্র যান, তখন তাঁকে অনিবার্যভাবেই একটি মধ্যবর্তী অবস্থান মেনে নিতে হয়। যেখানে তাঁর নিজের জা্য়গা সেখানে কাজ নেই, যেখানে তিনি কাজ করেন সেখানে তাঁর নিজের জায়গা নেই। পরিযায়ীদের এক বিরাট অংশ ক্রমাগত এই দুয়ের মাঝে চলাচল করেন, অনেকেই বছরে একাধিকবার যাতায়াত করেন কর্মভূমি থেকে স্বভূমিতে, তাঁদের সীমিত আয়ের একটা অংশ নিয়মিত দেশে যায়, পরিযায়ী কর্মীর প্রেরিত অর্থে গ্রামভারতের অগনিত সংসার চলে, অনেক এলাকার অর্থনীতিও। তাঁদের কাজ ও আয় কোনওটার গতি মসৃণ নয়, থেকে থেকেই নানা উপদ্রব আসে, কাজ চলে যায়, আয় কমে যায়। কিন্তু ওই, গরিবের তো হাত গুটিয়ে বাঁচার উপায় নেই। অতএব দিন আসে, দিন যায়।

‘করোনা সেই ছকটা ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে এবং এক লহমায় বুঝিয়ে দিয়েছে, সর্বহারা পরিযায়ীর মধ্যবর্তী অবস্থানটা নিছক ভৌগোলিক নয়, সেটা উৎপাদন কাঠামোয় তার ভূমিকার অন্তর্নিহিত সংকট। সেই সংকটের মূলে আছে ধনতন্ত্র নামক ব্যবস্থাটির স্বধর্ম, যে ধর্ম শ্রমিককে মানুষ হিসেবে দেখে না, দেখতে জানে না, দেখতে পারে না, যার কাছে শ্রমিক শুধু শ্রমিক, আর কিছু নয়।’

[ক্রমশ]

 

আগের সবগুলো পর্ব ও লেখকের অন্যান্য লেখা পড়তে ক্লিক করুন।

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত