দাহ

।।বিশ্বদীপ চক্রবর্তী।।

 

আজ পূর্ণিমা। কিন্তু মেঘলা বলে রাতের আকাশে চাঁদ নেই।নির্জন অলৌকিক সেই পথে শ্রান্ত প্যাডলে সাইকেল চালিয়ে ফিরছিল অশোক। ব্যর্থতায় কোঁকড়ানো অশোকের এই নির্জনতাই বেশি ভাল লাগছিল। এমনকী পান-সিগারেটের দোকানটাও যে ঝাঁপ ফেলে দিয়েছে, এতে সে হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে। না হলে সেই জটলা থেকে কেউ নিশ্চয় হাঁক পাড়ত, ‘‘কী অশোকদা, আজ কত নম্বর হল?’’

অথচ একসময় এরকম প্রশ্নে সে খুব খুশি হত, এমনকী সাইকেল থামিয়ে কখনও দাঁড়িয়েও পড়ত বা। টুকটাক গল্প, তাতে নিশ্চিতভাবেই মড়া পোড়ানোর গল্প এসে পড়ত। খারাপ লাগত না তার, বরং সেটা একটা তৃপ্তির কারণ ছিল। কিন্তু যত লক্ষ্যের কাছাকাছি এসেছে, সীমার কথার ধার বেড়েছে, বাইরের জগতের কাছে সে ততই কুন্ঠিত হয়ে গেছে। সীমার কাছ থেকে লুকোতে গিয়ে, আর সবার কাছ থেকেও…একমাত্র সাতুই জানত। সে কি সত্যিই শকুন হয়ে গেছে, যেমন সীমা বলে? মানুষ মরার অপেক্ষায় বসে আছে? যেদিন সীমার মুখে এই শব্দটা প্রথম শুনেছিল, ওর চোখে উপচে পড়া ঘৃণা অশোককে ভিতর থেকে কুঁকড়ে দিয়েছিল। বাইরে ফেটে পড়েছিল রাগে।সীমার বাঁকা ঠোঁটের ঘৃণ্য ইঙ্গিত শরীরের জোরে মুছে দিতে চেয়েছিল অশোক, হয়তো বা ভেঙেও। কোনওটাই হতে দেয়নি সীমা। বরং নিজেকে দু’হাতে ছাড়িয়ে নিয়ে হিসহিসিয়ে উঠেছিল, ‘‘বাসি মড়ার গন্ধে আমার গা গুলোয়।’’

শুরুটা হয়েছিল খুব স্বাভাবিকভাবেই, যেমন আর পাঁচটা রকে বসা বাঙালি ছেলে করে। তখনও অ্যাকাউন্টস ফার্মের জুনিয়র অ্যাকাউন্ট্যান্টের চাকরিটা জোটেনি তার। মোড়ের মাথার কালী ভটচাযের বুড়ি মা-টা মারা গেল। একাই থাকত বুড়ি। কালীদারা কবেই এ এলাকা ছেড়ে চলে গিয়েছে, মা-র খোঁজ নিতেও আসত না। ওরাই চেয়েচিন্তে টাকা তুলে বুড়িকে পুড়িয়ে এল।ছেলেমেয়ে কেউ তো আসেনি, কেন কে জানে সবাই অশোককেই মুখে আগুন দেওয়ার জন্য ঠেলে দিল। হয়তো নিজের বাবার মুখাগ্নি করার অভিজ্ঞতা ছিল বলে। সেই শুরু।কোথাও খাটে কাঁধ লাগানোর লোক নেই, সৎকার করার সংস্থান নেই, কিংবা বেওয়ারিশ মড়া রাস্তার ধারে লাট খাচ্ছে — তাদের রকে খবর চলে এল। আর ওরাও ছুটল। দরকার হলে এদিক-ওদিক থেকে টাকা জোগাড় করে শেষকৃত্যটা ঠিক করিয়ে দিত।পুলিশের ঝক্কিও পোহাতে হত একেক সময়ে। এটা তাদের তখনকার উদ্দেশ্যহীন জীবনে একটা কিছু করতে পারার তৃপ্তি এনে দিয়েছিল। দরকার পড়লে মুখে আগুন দেওয়ার দায়িত্বটা কিন্তু অশোকেরই রয়ে গিয়েছিল। যোগেশ বলত, ‘‘আকাশের তারারা তোকে দু’হাত তুলে আশীর্বাদ করে রে আশু, অনেক পুণ্য করছিস।’’ ভাল কাজ করতে পারার সুখবোধটা অশোকের মনের মধ্যে একটা স্থায়ী জায়গা করে নিচ্ছিল।

রকের আড্ডায় অনেকরকম হিড়িক ওঠে, হুল্লোড় হয়, আবার থেমেও যায়। এটা কিন্তু থামেনি। একে-একে সবাই গেল নিজের-নিজের ধান্দায়। অশোকের কিছু জমেনি তখনও। তার সাধারণ বি.কম ডিগ্রিতে কোনও চাকরি জুটছিল না। রকে নতুন ছেলেদের ভিড়ে অশোকদাই মড়া পোড়ানোর লিডার। এর মধ্যে সাতু আবার ক্রিকেটের স্কোর রাখার মতো রকের শবযাত্রার একটা হিসেব রাখতেও শুরু করেছিল। আখেরে এতে অবশ্য অশোকেরই লাভ হল। যখন এই স্কোর কুড়ি ছাড়াল, ওরা সবাই গেল পাড়ার কাউন্সিলরের কাছে। তখন কাউন্সিলর ছিলেন প্রবীণ কুণ্ডু। তিনি ওদের এই কাজের কথা জানতেন। ওদের একটু প্রশ্রয়ের চোখেই দেখতেন। একবার উদ্যোগ নিয়ে প্রতি শবযাত্রার জন্য মিউনিসিপ্যালিটি থেকে একটা টাকার অঙ্ক বরাদ্দ করে দিলেন। তারপর থেকে মিউনিসিপ্যালিটির পুরো এক্তিয়ারের মধ্যে কোনও কেস থাকলেই প্রথমে খবর যেত ওদের কাছে।

এটা একটা নেশার মতো হয়ে গিয়েছিল। চেনা নেই, শোনা নেই, খোঁজ পেলেই হল, অশোক তার দলবল নিয়ে হাজির। অজানা অচেনা লোকের লাশ ঘাড়ে করে শ্মশানে নিয়ে যাওয়া, পুরুত ডেকে ঘাট-কাজ করানো, মুখে আগুন দিয়ে সেই শব পুড়ে ছাই হতে দেখা, তারপর ছাই কুড়িয়ে ফিরে আসা। কেন করত? পুণ্য নাকি আমোদ?

অনেকে বাজে কথাও বলেছে। বলেছে মড়া পোড়ানোর নাম করে টাকা নিয়ে তারা চোলাই খায়, ফুর্তি করে। কখনও করেনি তা নয়। ওই বয়সের ছেলেরা ওসব একটু-আধটু করবেই। কিন্তু মোটের উপর কাজটা তো ভাল। কিছু লোকের পিছনে কথা বলা তো আর আটকানো যাবে না। বদনাম করবেই। পিছন থেকে অনেকে তাকে বলহরি অশোক বলে ডাকত, সে এটা নিয়ে অত গা করেনি।

ভাল লোকও তো আছে। যেমন প্রবীণ কুণ্ডু। তখন উনি আর কাউন্সিলর নন। একদিন ডাকলেন। অশোকের কাঁধে হাত দিয়ে বসালেন।

‘‘কী, তোমার সমাজসেবা কেমন চলছে, ওই হিন্দু সৎকার সমিতি?’’ হেসে বললেও ওঁর বলার মধ্যে কোনও খোঁচা ছিল না। উনি কাজটার ভাল দিকটা বুঝতেন।

‘‘আর কিছু করছ তুমি? চাকরি-বাকরি?’’

মাথা চুলকে অশোক বলেছিল, ‘‘না কাকু, এখনও তো কিছু জোটাতে পারিনি। হেসে যোগ করেছিল, ‘‘চাকরির যা বাজার, কাকা-জ্যাঠার জোর না থাকলে আমার মতো সাধারণ বি.কম পাশে আজকাল কিছু হয় না কাকু।’’

তার বাবা মারা গেছেন বহুদিন। নিজের কাকা-জ্যাঠা কখনও ছিল না। কিন্তু মা তখনও বেঁচে ছিলেন। বাবার পেনশনের টাকায় কোনওক্রমে চলছিল। মাথার উপর একটা ছাদ ছিল তাই মাকে নিয়ে পথে বসতে হয়নি। কুণ্ডুকাকুর এ সবই জানা। জেনেই তো ডেকেছিলেন। বললেন, ‘‘করবে একটা চাকরি? আমার এক বন্ধুর ফার্মে একটা বিশ্বাসী ছেলে খুঁজছে। তোমার কথা মনে পড়ে গেল।’’

শুনেই আবেগে চোখ ঝাপসা অশোকের। পা ছুঁয়ে প্রণাম করেছিল, ‘‘আপনি আমাকে বাঁচালেন কাকু।’’

‘‘তুমি সমাজের কাজ করছ, সমাজকেও তো তোমারটা দেখতে হবে নাকি? ভালভাবে কাজ করো। আমার বন্ধু অমর বোস, ওরই ফার্ম। ওকে একটা চিঠি লিখে দেবো। চিঠি নিয়ে কালকে সকালে দেখা করো।’’

চাকরিটা হয়ে গেল। অশোকের একটা হিল্লে হল। কিন্তু ওই কাজটা যে সে ভাল পারে, সেটাও মনে গেঁথে গেল। ওই কাজের জন্যই তো চাকরিটা। অস্বীকার করে লাভ নেই, গর্বে বুকটা ফুলে উঠেছিল। তাই চাকরি শুরু করেও শবযাত্রা ছাড়তে পারেনি।যখনই খবর পেয়েছে, কাজ ফেলে দৌড়ে গেছে। এরকম ভাবেই সীমার সঙ্গে দেখা।

সীমার বাবা কালীপদ ধর অটো চালাত। তার মা ছেড়ে চলে গেছিল, সেও অনেকদিন। লোকে বলে কালীর চোলাই খাওয়া আর বউকে ধরে পেটানোর জন্যই যামিনী স্বামীকে ছাড়ে। কালীর মতে সে চোলাই ধরেছে বউ পালানোর দুঃখে। যামিনী দেখতে-শুনতে বেশ ঢলঢল ছিল, তার অনুরাগীর অভাব হওয়ার কথা নয়। যামিনী যখন ভাগে, অশোকের বয়স অল্প। সে তো ওই চোখে দেখেনি। তবে সীমাকে দেখলে বোঝা যায়, বেশ টগবগে, ধার আছে। অনেকেরই তাই চোখ পড়েছিল। ওই বয়সের মেয়ে, বাড়িতে দেখাশোনা করার কেউ নেই। বাবা থেকেও না থাকার মতো। খারাপ হওয়াটা সোজা। কিন্তু মেয়েটা নিজেকে সামলে রেখেছিল। চেষ্টা ছিল, কলেজেও ঢুকেছিল সে বছর। বাবা বাউন্ডুলে হলেও, ছিল মাথার উপর ছায়া হয়ে। দিনভর বাপের হদিশ পাওয়া যেত না, কিন্তু রাত্রে ঠিক টলমল পায়ে এসে দাঁড়াত। একদিন এল না। চোলাইয়ের ঠেক থেকে ফেরার পথে লাইনে কাটা পড়ল।

রেলে কাটা মড়া, অনেক হ্যাপা। পোস্টমর্টেম করে, পুলিশের ক্লিয়ারেন্স নিয়ে অশোক, সাতু, মিহির, কুটুসরা সবাই পরদিন কালীকে পুড়িয়ে এল।

এবার কিন্তু পুড়িয়েই কাজ মিটল না। সীমা একা মেয়ে, চেহারা ভাল, দেখার কেউ নেই, লোকেরা তো ছোঁকছোঁক করবেই।ওদের সামনেই পুলিশের কনস্টেবলটা সান্ত্বনা দেওয়ার বাহানায় দু’বার মেয়েটির পিঠে হাত ঘষে নিল।

অশোকের কানের কাছে কুটুস ফিসফিসাল, ‘‘মেয়েটা কিন্তু আগুন অশোকদা।’’ অশোক ধমকে থামিয়েছিল, ‘‘কী যা তা বলছিস। একটা শোকের সময়। ওর উপর দিয়ে কী যাচ্ছে বলতো!’’

‘‘কিন্তু লোককে তো থামানো যাবে না, আগুন পেলে হাত সেঁকতে চলে আসবেই। আমাদের কিছু করা উচিত।’’

শ্রাদ্ধশান্তি হতে-হতেই দেখা গেল কালীর বাড়িওলা সীমাকে রাস্তায় বের করতে বদ্ধপরিকর। বাড়িভাড়া তিন মাসের উপর বাকি ছিল। মেয়ের জন্য কালী বেশি কিছু রেখে গেছিল তাও নয়।অটোটাও তো তার নিজের ছিল না। অতএব ভাঁড়ে মা ভবানী।সীমার চোখে তখন অন্ধকার। বাড়িওলা অন্য মতলবও থাকতে পারে। উঠতি বয়সের মেয়ে, টাকার চাপ দিয়ে কিছু আদায় করার চেষ্টা।

অশোকরা চলে আসছিল। সীমা জিজ্ঞেস করল, ‘‘আমার কী হবে অশোকদা?’’ অশোক মুখ খোলার আগেই আগ বাড়িয়ে মিহির বলেছিল, ‘‘আমরা কী বলব? আত্মীয়স্বজনের কাছে গিয়ে ওঠো।মড়া পোড়ানো, সৎকার, সব কাজ করে দিয়েছি। ব্যস।নারীকল্যাণ সমিতি তো খুলিনি।’’ ওভাবে না বললেও পারত।সীমা অবশ্য মিহিরকে পাত্তাও না দিয়ে অশোকের চোখে চোখ রেখে বলেছিল, ‘‘তা হলে আমাকেও পোড়ানোর ব্যবস্থা করুন।তার খুব দেরি নেই।’’

কথার তীব্রতাতেই হোক বা সীমার চাহনিতে কিছু একটা ছিল, অশোক থতমত খেয়ে গিয়েছিল। কিছু বলতেই পারেনি। কোনও জবাব না দিয়ে চলে তো এল, কিন্তু সারারাত সেই চোখ অশোকের সঙ্গে কথা বলল। সেই চোখে কখনও রাগ, কখনও জল। রাতে একা সীমার যদি কিছু হয়ে যায়, সেই ভেবে অশোক নিজের দু’চোখের পাতা এক করতে পারল না সারারাত। অফিস যাওয়ার পথে একটু ঘুর হয়ে কালীর বাড়ির পাশ দিয়ে গেল।বাইরে থেকে বোঝার চেষ্টা করল সব ঠিকঠাক আছে কি না।পর্দার আড়ালে একটা ছায়া পিছলে যেতে দেখে নিশ্চিন্ত হয়ে অফিসে গেছিল।

কিন্তু চমকাল বাড়ি ফিরে। বাড়ির গেটে সীমা।

‘‘কী ব্যাপার? তুমি এখানে? অবাক হয়েছিল অশোক।

‘‘কিছু হয়েছে? সকালে তো সব ঠিকই দেখলাম।’’

‘‘দূর থেকে দেখে কী করে জানলে অশোকদা?’’

জানা গেল সারারাত ঘুমোতে পারেনি সীমা। বাইরে থেকে বিশ্রী কথা ভেসে এসেছে। চালে দু’একটা ঢিল পড়েছিল, শেষরাতে দরজায় ধাক্কা। মুখে রুমাল চাপা দিয়ে হু হু করে কেঁদে উঠেছিল সীমা, ‘‘আমায় এরা ছিঁড়ে খাবে অশোকদা।’’

বিয়ে করায় কোনও বাধা ছিল না অশোকের। চাকরিটা তত বড় কিছু নয়, কিন্তু দায়িত্ব বলতেও তেমন কিছু নেই। বিধবা মা ছাড়া সংসারে কেউ নেই, বাবা মাথার উপর ছাদটাও রেখে গেছিল।সবাই উৎসাহ দিল, ‘‘লেগে পড়ো অশোকদা।’’

নরম মাটিতে চারা পোঁতা হয়েই গেছিল। মিথ্যে বলে লাভ নেই, সীমার টানটান চেহারাটাও উপেক্ষা করার মতো নয়। পরিবার অত ভাল নয় — বাবা মাতাল, মা নিপাত্তা। কিন্তু তারা তো আর কেউ নেই। মেয়েটারই বা কী দোষ? অশোক নিজেকে বুঝিয়েছিল। সাতপাঁচ ভেবে বিয়েতে রাজি হয়ে গেল। মেয়েটা বাঁচল, অনেক শকুনেরই তো চোখ পড়েছিল। অশোকের জীবনে সুখের সর জমাট বাঁধল।

আজ সেই সীমাই কিনা অশোককে শকুন বলে? জীবনের ছক এত দ্রুত বদলে যেতে পারে? সাইকেলে জোরে প্যাডল করতে-করতে একদলা থুতু ফেলল অশোক। সীমার কাছ থেকে আর একটু কৃতজ্ঞতা আশা করেছিল, একটুখানি ভালবাসা। সীমা তাকে ভালবাসত ঠিকই, খুবই ভালবাসত — কিন্তু মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা ওর ছিল না। সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে সবকিছুই তার পালটে গেল। কেন হল? অশোক নিজেকে পালটাতে পারেনি বলে?

বিয়ে করেও অশোকের সৎকার সমিতি থেকেই গিয়েছিল।পাড়া-বেপাড়ায় নাম কেনার জন্য, সীমা বলে। কিন্তু নাম কে না চায়? সঙ্গে একটু সমীহ? তাও পাচ্ছিল বইকি। অশোকের পঞ্চাশ নম্বর পোড়ানোটা সাতু মনে রেখেছিল, রকের পাসে স্টেজ করে তার সম্বর্ধনার ব্যবস্থাও সেই করেছিল। কুণ্ডুকাকুও এসে বক্তৃতা দিলেন। সমাজের কাজে আজকের তরুণদের দলে-দলে এগিয়ে আসতে হবে বলে একটু থেমে অশোকের দিকে ফিরে বললেন, সমাজসেবার আদর্শের জন্য তাদের বেশি দূরে যাওয়ার দরকার নেই, তাদের সামনেই আছে জলজ্যান্ত নিদর্শন। ভিড়ের পিছনে দাঁড়ানো সীমার চোখের ঔজ্জ্বল্যে বুকটা সত্যিই ফুলে উঠেছিল অশোকের। কিন্তু সেদিনই রাত্রে সীমার কথায় চমকে উঠেছিল ।তার মাথার চুলে বিলি কেটে দিতে-দিতে সীমা বলেছিল, ‘‘তুমি এবার মড়া পোড়ানোটা বন্ধ করো।’’

‘‘কেন, তোমার কী অসুবিধে হচ্ছে?’’

‘‘কত রাত থাকো না, মা-ও আর নেই। আমার ভয় করে না বুঝি?’’ আদুরে ভঙ্গিতে ঠোঁট ফুলিয়ে সীমা তার শরীরে ঢেউ তুলেছিল। সীমার শরীরে ডুবে যেতে-যেতে ঘড়ঘড়ে গলায় বলেছিল অশোক, ‘‘অশোক রাহার বউকে কেউ কিছু বলবে না সীমু। চোখ তুলে তাকাক তো কেউ!’’ কিন্তু কথা সেখানেই থেমে থাকেনি চিরকালের মতো। টুকটাক লেগেই থাকত এটা নিয়ে।একদিন রাগে ফেটে পড়েছিল অশোক, ‘‘আমি চোলাই আড্ডায় পড়ে থাকি না সীমা, অন্য মেয়ের নেশাও আমার নেই।’’ শ্বশুরের নেশাভাঙের অভ্যাসের দিকেই ইঙ্গিত। ‘‘নেশা নেশাই, কাউকে দিশি খেতে হয়, কেউ শ্মশানে যায়,’’ শীতল গলায় কেটে-কেটে বলা সীমার এই কথায় আজ আর কোনও লাস্যের মোড়ক ছিল না, ছিল চাবুকের ধার।

জোঁকের মুখে নুন পড়ার মতো গুটিয়ে গিয়েছিল অশোক। এটা ঠিক, সেও গুনতে শুরু করেছে মন দিয়ে, বাহাত্তরটা মড়া পোড়ানো হয়ে গেছে তার। একশো ছোঁয়ার নেশা লেগেছিল।আজকাল মড়ার খবরের অপেক্ষায় থাকে অশোক, খবর পেলে অফিস ফেলেও দৌড়য়। এই নিয়ে অফিসেও হাসাহাসি শুরু হয়েছিল। রায়বাবু পান মুখে নিয়ে চোখ গোল-গোল করে বলেছিলেন, ‘‘কী ভায়া, মন্তর-তন্তর ঝাড়ো, নাকি শ্মশানকালীর সাধনা? সেসব করতে তো শুনেছি মড়ার উপর বসতে হয়। পোড়াতে কাউকে শুনিনি।’’ বলেই হা হা হাসি।

অশোকের মুখে খিস্তি এসে গিয়েছিল, কোনওমতে সামলে নিয়েছিল। কারণ যখন হঠাৎ করে মড়া পোড়াতে ছুটতে হয়, অফিসের কাজটা করে দেন ওই রায়দাই। দু’দিন বাদে অফিস আসার পথে বাজার থেকে পাকা কাঁঠাল কিনে এনে রায়বাবুকে দিয়ে বলেছিল, ‘‘রায়দা, গাছের ফল। খেয়ে দেখবেন চিনির থেকেও মিষ্টি।’’

সীমার সঙ্গে তখনও কথা কাটাকাটি হত। যদি খুব কম সময়ের মধ্যে দু’টো কেস এসে যেত, বিশেষ করে তখন। অশোক রাগ সামলাতে না পেরে আড্ডাতেও মুখ ফসকে কথাটা বলেছে। কুটুস সবজান্তা, ‘‘এসব আমাদের সবারই হয় অশোকদা, অত চিন্তার কিছু নেই। আসলে বাপের বাড়ি নেই তো। আমার বউ তো রাগ করলেই বাপের বাড়ি ছুট দেয়।’’

‘‘তখন কী করিস?’’

‘‘ক’দিন বসে থাকি তা দিয়ে। সপ্তাহখানেক বাদে মিষ্টির হাঁড়ি নিয়ে গুটিগুটি পায় হাজির হই শ্বশুরবাড়ি। আর শাশুড়ি চা আনতে গেলেই বউকে এক ঝটকায় কোলে তুলে হামি।’’

‘‘দেয়?’’ সাতু এখনও বিয়ে করেনি তো, তার অদম্য কৌতূহল।

সীমা যে অত সহজে নরম হওয়ার পাত্রী নয় সেটা অশোক জানত। তা ছাড়া ওর তো গোঁসাঘর বানানোর জন্য কোনও বাপের বাড়ি নেই। অতএব রাগ পড়তে সময় লাগত। সমস্যার একটা সমাধান হল যখন সীমার পেটে বাচ্চা এল। নতুন জীবন আসার খুশিকে ঘিরে আবার খুব কাছাকাছি এসে গেছিল ওরা।এমনকী মাঝখানে যেদিন সৎকারের কাজে অশোককে যেতে হয়েছিল, সীমা খুব নরম গলায় বলেছিল, ‘‘একটু তাড়াতাড়ি ফিরো কেমন, একা-একা ভয় লাগে।’’ অশোক কথা রেখেছিল।কাজ হতেই ছুট্টে বাড়ি।

কিন্তু সবকিছু তছনছ হয়ে গেল ক’দিন বাদেই। সেদিন আরেকটা কেস ছিল। রাতে একা বাড়িতে সীমা অন্ধকারে বাথরুমে পড়ে গেল। বাচ্চাটা রইল না। ভেঙে গেল তাদের সম্পর্কটাও। এরপর অনেকভাবে কাছে আসার চেষ্টা করেছে। কিন্তু সীমা বরফশীতল।ও যে কেন বোঝে না এটা তার অফিসে থাকার সময়েও হতে পারত? তখনও কি ও এরকমই করত? অশোক সীমাকে বুঝিয়ে উঠতে পারেনি। সব যদি ছেড়ে দিতে পারত তা হলে হয়তো বরফ গলানো যেত। কিন্তু সেটাই বা পারল কই!

শবযাত্রা তাই থামেনি। আর সবার তো এমন বাই ছিল না, সংসারে জুতে গেছে। কখনও আসত, কখনও নয়। সাতুর সংসার হয়নি, সে বাবার দোকানে বসত। দোকানে বসার দরুন এদিক-ওদিক থেকে ও-ই এসব খবর পেত। আর খবর পেলেই অশোককে জানাতে ভুলত না। এখনও। নিজে হয়তো আসত না, বলত বাবার ব্যবসা সামলে নিঃশ্বাস ফেলার অবকাশ নেই তার।কিন্তু উৎসাহ দিত খুব। দেখা হলেই মনে করিয়ে দিত, ‘‘অশোকদা, নব্বই হয়ে গেল এবার। একশো হলে কিন্তু পার্টি।’’ ফিকে হেসে বুকের মধ্যেকার খুশির দ্রিম-দ্রিমটা চাপা দিত অশোক।

অবশেষে নিরানব্বইতে পৌঁছে যাওয়া অশোককে আজ দুপুরে ফোন করে সাতুই জানিয়েছিল। কাটাপুকুরের দিকে, একটু দূরে পড়ে যাবে — সাতু আমতা-আমতা করে বলেছিল।

‘‘তুই আসতে পারবি?’’

‘‘বাবাকে তো জানো অশোকদা, সন্ধের দিকে দোকান ছাড়লে গালি দিয়ে ভূত ভাগাবে। কুটুস, মিহিররাও আজ নেই। ময়দানে গেছে।’’ অশোক মনে-মনে হিসেব করে নিল। কেউ নেই, একটু অসুবিধে আছে আজ।

‘‘দলের আর কাউকে তুমি পাবে না আজকে। দোকান বন্ধ হয়ে গেলে আমি আসার চেষ্টা করব। কিন্তু একশোর এই সুযোগটা তুমি ছেড়ো না।’’ দোনামনায় ছিল অশোক, কিন্তু এ কথাটা শুনে মনস্থির করে ফেলল। কাজটা শেষ করে ফেলা দরকার, তারপর সীমার সঙ্গে সব মিটিয়ে ফেলবে। ‘‘কাটাপুকুরের ওদিকে মন্টুদের পেয়ে যেতে পারি বল…দেখি।’’

অশোক আর দেরি করেনি। রায়দাকে হাতের কাজটা বুঝিয়ে দিয়ে বেরিয়ে এসেছিল। রায়দা পিছন থেকে ফুট কাটতে ছাড়েনি, ‘‘এই যে তেন্ডুলকর, কালকে মিষ্টির হাঁড়ি আনতে ভুলো না।’’ রায়দাও জানত।

অশোক খুব ছোটাছুটি করে কাটাপুকুরে পৌঁছেছিল। দেরিই হয়ে গিয়েছিল, সময়মতো ট্রেনটা ধরতে না পারায়। কিন্তু কিছু হল না।কেসটা ঝঞ্ঝাটের ছিল, পুলিশে বডি নিয়ে গেছে। সাতুকে ফোন করে বলবে ভেবেছিল। কিন্তু ব্যাটা ফোন সুইচ অফ করে রেখেছে। ওর অবশ্য বিশেষ কিছু করার নেই। দোকানে বসে খদ্দের ছেড়ে ফোন ধরতে দেয় না বুড়ো। বলে বেশি কথা বললে খাবারে থুতু ছিটবে, খদ্দের রাগ করবে।

মনটা খুব দমে গিয়েছিল। হতে-হতেও হল না। বাড়ি ফিরতেও যেন পা টানছিল না। এত কাছাকাছি এসে গিয়েও, আবার অপেক্ষা। কোথায় সারা রাস্তা ভাবতে-ভাবে গিয়েছিল এবার সীমার সঙ্গে সব মিটমাট করে নেবে। একবার একশো ছুঁয়ে ফেললে, সব বন্ধ। সংসারে খুব মন দেবে। সীমাকে বুঝিয়ে বললে কি বুঝবে না? সে যদি রাত্রে মড়া পোড়াতে যাওয়া ছেড়ে দেয়? তাতেও ভরসা নেই। কারণ সীমার মনের ঠিকানা অনেকদিন থেকে তার আর জানা নেই। সে যত লক্ষ্যের কাছাকাছি এসেছে, দূরত্ব যেন বাড়তেই থেকেছে। সীমা তাকে আর কাছেও আসতে দেয় না। বড় গোঁ মেয়েটার। ঘুমন্ত সীমার নরম মুখ দেখতে-দেখতে কখনও হালকা হাতে ছুঁয়ে দেখেছে, শক খাওয়ার মতো সীমা ছিটকে পড়েছে বিছানা থেকে, ‘‘বাড়িতে আর একটা খাট থাকলে তোমার পাশে আমি শুতামও না। বলো তো রান্নাঘরে গিয়ে শুই! এরপর অশোক আর কখনও চেষ্টাও করেনি। নিজের আলাদা চাবি করে নিয়েছে। মড়া পোড়ানো থাকুক বা না থাকুক, সীমা ঘুমোনোর আগে পারতপক্ষে বাড়ির পথ মাড়ায় না।

নিঃশব্দ রাস্তা পেরিয়ে নিঃসঙ্গ বাড়িতে ঢোকায় তাই ঘরে ফেরার চাঞ্চল্য ছিল না। সাইকেলটা যথাস্থানে রেখে চাবির জন্য পকেট হাতড়াল। সীমা এতক্ষণে ঘুমিয়ে পড়ে। তাই দরজা খুলে অন্ধকার প্যাসেজটায় পা রেখেই অবাক হল অশোক, সীমার গলা না? ঘুমন্ত রাতের স্তব্ধতা ভেদ করে সীমার চাপা হাসি তীরের মতো বিঁধল অশোককে। সন্দেহ বিষের মতো সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ছিল। একদিকে বিষক্রিয়ায় আবিষ্ট পশুর মতো নিথর হয়ে যাওয়ার বাসনা, অন্যদিকে অদম্য কৌতূহল আর রাগ তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল শোওয়ার ঘরের দিকে। সীমার আসক্তিভরা শব্দগুলো এখন অনেক স্পষ্ট। হালকা করে ভেজানো দরজার ফাঁক দিয়ে সীমার নগ্ন অবয়বে চাঁদের আলো খুশিতে ছলকে পড়তে দেখল অশোক। সঙ্গে কে ওটা? সাতু? একটা জান্তব আর্তনাদ নিজের গলার মধ্যেই দাবিয়ে দিল অশোক। সাতুর হাত দু’টো সীমার নিশ্চিন্ত বুকের উপর কী অবলীলায় খেলা করছে, যে ছাড়পত্র আজ অশোকের নেই। নিষ্ফল আক্রোশে দাঁত পিষল অশোক, ‘‘আগুনে গা সেঁকছিস? তোর ওই হাত আমি…’’

ততক্ষণে খিলখিল হাসিতে সীমা সাতুর উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে।উন্মুখ শরীর এখন সমস্ত শরীর দিয়ে সাতুকে খুঁজে বেড়াচ্ছে, চুল ধরে সাতুর মাথাটাকে নিজের বুকের নরম গভীরে নিয়ে আসে সে চরম আশ্লেষে। সীমার তৃপ্তিভরা শীৎকার তীরের মতো বিঁধল অশোককে। কুৎসিত রাগ ফেনার মতো ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে ছড়িয়ে পড়ে। ‘‘সাতু-উ-উ —’’ অশোকের নিঃশব্দ হাহাকার সিক্ত অন্ধকার বাতাসকে ভারাক্রান্ত করল, কিন্তু সীমার আগ্রসী শরীরকে তৃপ্ত করতে ব্যস্ত সাতু জানতেও পারল না। রমনরত দু’টো শরীরকে এক হয়ে যেতে দেখে এই অবস্থাতেও কামতাড়িত হল অশোক। সে নপুংসক নয়, ব্যর্থ কামনার দাহ তার সমস্ত শরীরকে পোড়াচ্ছিল। অশোক ত্রস্ত পায়ে রান্নাঘরের দিকে ছুটল, ‘‘হারামি, আমাকে বোকা বানাবি তোরা?’’ সীমা এইজন্য তাকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল? থুঃ, একদলা থুতু ছড়িয়ে দেয় ঘৃণায়। মিথ্যা বাহানায় তৈরি করেছে অলঙ্ঘনীয় সীমারেখা।ওরই বন্ধুর সঙ্গে ওরই বাড়িতে লীলাখেলা। আর সাতুটা? এই জন্যই একশো পূর্তি করানোর জন্য এত উৎসাহ। কল্পনায় ওর গলাটাকে সাঁড়াশির মতো চেপে ধরল অশোকের দু’টো হাত।নিশ্চয় আজই প্রথম নয়। আগেও তার রাতভর না থাকাটাকে এভাবেই ব্যবহার করেছে ওরা। ক্রমশ পরিষ্কার হয়ে যাওয়া ঘটনাপ্রবাহের তীব্রতা আগুন জ্বালিয়ে দিল তার মাথায়। কী ভেবেছে ওরা অশোককে? অনেক মড়া পুড়িয়েছে, আজ তবে জ্যান্ত পুড়িয়েই লক্ষ্যপূর্ণ হোক। কেরোসিনের ক্যানটা নিয়ে তীব্র জিঘাংসাভরে শোওয়ার ঘরের দিকে ফিরতে থাকে অশোক।

সুখশ্রান্ত দু’টো শরীর এখন নিস্তরঙ্গ। একপাশ ফিরে শুয়ে থাকা সীমার কোঁকড়া চুল মেঝে ছুঁয়েছে, এক হাতে আবৃত বুক। সীমার শরীর এখন শান্ত নদী, মাঝি নৌকা বেয়ে চলে যাওয়ার পর ছলাৎ শব্দ তলিয়ে গভীর গহন। পরিতৃপ্তির এই মায়াময় ছবি অশোককে থমকে দিল। কতদিন এই সীমাকে দেখেনি ও? শ্মশানডাঙার মতো বুকটা হু হু করে উঠল। কাঁপা হাতে অশোক দু’হাতে চোখের জল মোছে। কাঁদছে সে। হঠাৎ খুলে যাওয়া চোখের জলকে থামানোর সাধ্যি কই? সব হারানোর উপলব্ধিভরা এক হাহাকার অশোককে গ্রাস করছিল। কীসের খোঁজে সে ছুটে বেড়িয়েছে এতদিন? কোন লক্ষ্যের পিছনে নিজেকে এভাবে নিঃস্ব করেছে? কী আর বাকি আছে তার? মড়া পোড়ানোর নেশায় নিজেই সে কবে মরে গেছে। সদরের দরজা ঠেলে উঠোনে নেমে আসে অশোক।

মেঘ কেটে পূর্ণিমার চাঁদ বেরিয়ে পড়েছে অনেকক্ষণ। জ্যোৎস্নার ফটফটে আলো পুড়িয়ে দিল অশোককে, এ আগুন আর উসকানোর দরকার নেই।

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত