ডাকনাম জবাকুসুম

সকাল থেকে রঞ্জনীর মেজাজ সপ্তমে চড়ে আছে। সব কাজ সে একা হাতেই সামলাতে চায় তবু দু’দন্ড কাউকে বসে থাকতে দেখলে সহ্য হয় না ওর। শমিতের হয়েছে সবদিকেই বিপদ।

আমি একটু বের হচ্ছি। কিছু আনতে হবে রঞ্জা?

সাড়া নেই। বাইরের ঘরে বসে শমিত একটু একটু ঘামছে। ঘরকন্নায় পটিয়সী রঞ্জনী এত বেলা হয়ে যাবার পরেও এখন অব্দি এক কাপ চা দেয়নি। ব্যাপারটা ওকে দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। চায়ের তৃষ্ণার চেয়ে এর পেছনের কারণটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নিশ্চয়ই কিছু একটা ভুল হয়েছে ওর। চিনি কি ফুরিয়েছে কিংবা দেশলাই? তাই হবে হয়তো। কাল রাতে বোধ হয় একবার রঞ্জনী বলেও ছিল কথাটা, শমিতই অন্যমনস্ক ছিল। ব্যাপারটা এখন সরাসরি জিজ্ঞেস করবার উপায় নেই, কায়দা করে জানতে হবে।

শমিত আরেকবার ওকে ডাকে। এবারেও কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না। নিজের উপরই রাগ লাগছে এখন। কাজের সময় ডাকা ডাকি করলে রঞ্জনী আরো বেশি বিরক্ত হয়। কথাটা ও কানেই নেয় না তখন। শমিত উঁকি দিয়ে দেখতে পায় রঞ্জা বাক্স থেকে ক্রোকারিজগুলো বের করতে ব্যস্ত।

ফোঁস করে একটা নিঃশ্বাস ছাড়ে শমিত। ঘরগুলো গোছানো শেষ হলে বাঁচে সে। এত হ্যাঁপা জানলে হয়ত নাজিমবেগের বাসাটা এমাসে ছাড়তো না। কিন্তু না ছেড়েও তো উপায় ছিল না। বাসাটা খুব পুরনো হয়ে গিয়েছিল। বোঝাই যাচ্ছিল বাড়িওয়ালা ডেভেলপারকে দিয়ে দেবে যেকোনো সময়। লোকটা গতমাসে কথায় কথায় একবার সেরকম বলেও ছিল।

হুট করে বাসা ভাড়া পাওয়া যায় না আজকাল। রঞ্জা বহু আগে থেকে ওকে বলে বলে সাতশো পঁচাত্তর স্কয়ার ফিটের এই ফ্লাটবাসাটা বুকিং দিয়েছিল বলে রক্ষা। সেও প্রায় দেড় দুই বছর আগের কথা। এতদিনে ফ্ল্যাট রেডি হয়ে গেলেও নানা হাঙ্গামায় ওরা উঠতে পারেনি। শমিতের লোন আর রঞ্জার সঞ্চয়পত্রের টাকায় ফ্লাটটা কেনা হয়েছিল।

বাড়ি ছাড়ার ইঙ্গিত দেয়ায় রঞ্জা আর একমুহূর্ত ওই বাসায় থাকতে চায়নি। শমিতেরও মনে হলো সত্যি এবার বাসাটা ছাড়া দরকার। তারপর সব জিনিসপত্র গোছগাছ করে দু’দিন আগে ওরা এই ফ্লাটে এসে উঠেছে।

নিজের ঘর, কেউ মাথার দিব্যি দেয়নি যে দু’দিনেই সব সাজিয়ে ফেলতে হবে। কিন্তু রঞ্জা খুব গুছানো মেয়ে। সব ঝকঝকে তকতকে না হলে ওর পোষায় না। মাঝরাতে ঘুম ভেঙ্গে যদি দেখে দেয়ালে ছবির ফ্রেমে ফ্রিদা কিংবা চে বাঁকা হয়ে আছেন তবে সেটা তখুনিই ঠিক করতে হবে। ডাইনিং টেবিলে জলের একটা ফোটা থাকা চলবে না, টাইলসে একটু দাগ দেখলেই সেটা সাথে সাথে মুছতে হবে। বসার ঘরের ডিভান, সেন্টার টেবিল, ঘরের আর সব ফার্নিচার দিনে দু’বার ঝাড়পোঁছ করা চাই। যেন একটু পরেই বিশেষ কোনো অতিথি আসবে। এসব করতে গিয়ে কাজের লোকের পিছু পিছু রঞ্জাও ছুটতে থাকে সারাদিন।

শমিতের দম বন্ধ লাগলেও কিছু করার নেই। সে নিজে ভীষণ অগোছালো। বাঁধা দিলে রঞ্জা বলে- আজ থেকে সব তুমি করবে। ব্যস, তাতেই এ ঘরের জিনিস অন্যঘরে চলে যায়। জায়গামতো আর কিছুই খুঁজে পাওয়া যায় না। তারপর বিস্তর কথা কাটাকাটি, অশান্তি। এর চেয়ে রঞ্জার হাতে সব ছেড়ে দেয়া আরামদায়ক।

শমিত কখন থেকে বাইরে বের হবে হবে করেও বেরুতে পারছে না। আসলে কথাটা ওকে কীকরে বলবে মনে মনে আওড়াচ্ছে সে। স্যান্ডেল জোড়া যে খুঁজে পাচ্ছে না তা রঞ্জা ঠিকই টের পায়। ছোট্ট করে বলে – পেছনের বারান্দায় সবুজ প্যাকেটে দেখো, খোলা হয়নি এখনো।

রঞ্জা সেরা। শমিতকে কথাটা মানতেই হয়। আজ অব্দি এরকম কত কিছু মুখ ফুটে না বললেও ঠিক বুঝে ফেলেছে মেয়েটা! শমিত তার উল্টো। সহজ কথা বুঝতেও ওর সময় লেগে যায় অনেক। বন্ধুরা এমনি এমনি টিউবলাইট নাম দেয়নি। জীবনে সবকিছুতেই ওর বুঝতে দেরি। হয়ত এজন্যই এত বছর এক ছাদের নিচে বাস করবার পরেও শমিত রঞ্জাকে ঠিক বুঝতে পারে না। কেন মাঝেমাঝে ওর মন খারাপ হয়, কেন হঠাৎ কোনো বিকেলে হাসি হাসি মুখ করে মেয়েটা বারান্দায় গুনগুন করে বুঝতে পারে না শমিত। সবকিছুই প্রশ্ন করে জেনে নিতে হয় ওকে।

রঞ্জার যখন প্রথমবার মিসক্যারেজ হলো শমিত বুঝতেই পারেনি ব্যাপারটা। রঞ্জা তখন মায়ের বাসায়। রাত তিনটা নাগাদ ওদের বাসা থেকে ফোন এলো, শমিতকে বলা হলো সোজা ক্লিনিকে চলে যেতে। গাইনী ওয়ার্ডে রঞ্জার পাঁশুটে মুখটা দেখে শমিত জিজ্ঞেস করেছিল- কী হয়েছে?

উত্তরে কিছু বলেনি রঞ্জা। শুধু সেদিনের ঐ শূন্য দৃষ্টিটা কখনো ভুলতে পারেনি শমিত। এখনো মাঝেমাঝে ওভাবেই চোখ তুলে তাকায় মেয়েটা। কিন্তু আজকাল বিষাদের চেয়ে নির্লিপ্তভঙ্গিটা বেশি চোখে পড়ে।

রাস্তায় বের হয়ে পুরনো অভ্যাসবশত শমিত নতুন ফ্লাটের বারান্দায় চোখ রাখে। দোতলার এলামন্ডা উপরের দিকে বাড়তে বাড়তে ওদের বারান্দাটাকে রাস্তা থেকে কিছুটা আড়াল করে দিয়েছে। তবু দেখতে না পেলেও শমিত জানে তিনতলার বারান্দায় কেউ নেই৷ আগে রঞ্জা প্রতিবারই বারান্দায় এসে দাঁড়াত। আজকাল এসব ব্যাপারে উদাসীন হয়ে গেছে সে। শুধু ঘরকন্নায় মনোযোগ বেড়েছে দশগুণ। বোধ হয় সংসারে তৃতীয় কেউ আর আসবে না বলে সংসারটাকেই ওর কর্মযজ্ঞ করে নিয়েছে। অথচ আরো দু’বার মিসক্যারেজের পর শমিত ভেবেছিল সবকিছু এলোমেলো হয়ে যাবে, রঞ্জা আরো বেশি ডিপ্রেশনে পড়বে।

ওর অনুমানটা মিথ্যে প্রমাণিত হয়েছে। একদিন ভোরে ঘুম ভেঙ্গে দেখে রঞ্জা ঘরদোর ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করতে লেগে গেছে। ওর শরীর খারাপ ছিল বলে ঘরের সবকিছু নোংরা, অগোছালো হয়ে পড়েছিল। কিন্তু সেদিন কয়েক ঘন্টায় সব আগের মতো পরিপাটি হয়ে গেল। তারপর বিকেলে নার্সারি থেকে একগাদা চারাগাছ আর টব কিনে এনে বারান্দা সাজানো হলো। সকাল বিকাল জল দেয়া, কলি এলো কিনা ফুল ফুটলো কিনা সেদিকে নজর রাখা এসব নিয়েই থাকতে শুরু করলো রঞ্জা। বাড়িতে এক্যুরিয়াম আর মুনিয়ার খাঁচাও এলো। শমিত আজকাল ব্যাপারগুলো স্বাভাবিকভাবে নিচ্ছে। মন খারাপ না করে সারাক্ষণ একটা কিছু নিয়ে ব্যস্ত থাকা বরং ঢের ভালো।

আজকের সকালটা খুব সুন্দর। হিলিবিলি হাওয়া চারপাশে। শমিতের মন খারাপের কথা আর ভাবতে ইচ্ছে করলো না। সে এদিক ওদিক ঘুরে এলাকাটা দেখতে লাগলো।

রাস্তাটা বেশ চওড়া আর ছায়াঘেরা। রিকশা কিংবা অটো খুব একটা নেই। ছুটির দিন বলে হয়তো এত ফাঁকা হয়ে আছে। কাছেই কোথাও একটা গানের স্কুল আছে, সারেগামা শুনতে পাচ্ছে শমিত। নতুন জায়গাটা ওর একটু একটু করে ভালো লেগে যাচ্ছে৷

ওরা নাজিমবেগে এতগুলো বছর কী করে কাটিয়েছে ভাবতে এখন অবাক লাগে। ওখানকার পরিবেশ খুব একটা ভালো ছিল না। সবচেয়ে বড় সমস্যা বাসার সামনের রাস্তাটা বেশ সরু ছিল। ভ্যানে তুলবার জন্য জিনিসিপত্র বের করে আনতে বেশ কষ্ট হয়েছে ওদের। আসলে প্রথম যখন বাসাটা ভাড়া নেয় তখন ওদের এত জিনিসপত্র ছিল না। এগারো বছরের সংসারে একটু একটু করে অনেক কিছুই তো করেছে শমিত আর রঞ্জনী। কত স্মৃতি ছিল বাসাটায়। ছেড়ে আসতে খারাপ লেগেছে ওর। গাড়ি ছাড়বার সময় রঞ্জাও ওড়নায় চোখ মুছছিল।

বাসা বদলাবার আগে রঞ্জা বেশ কিছু পুরনো জিনিস বিক্রি করে দিয়েছে। ও বলছিল ফ্লাট বাসায় এত পুরনো মালপত্র রাখবার দরকার নেই। শমিতও ভেবেছে ভালই হবে, যত কম জিনিসপত্র তত কম ঝক্কি। তবু এত এত মালপত্র সাথে এসেছে, ভ্যান থেকে সব নামাতে আর ফ্লাটে তুলতে সেদিন সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিল।

শমিতের ট্রাইসাইকেলটা এখনো রয়ে গেছে। রঞ্জা ওটাও বিক্রি করতে চেয়েছিল। শমিত দেয়নি। দাদা দিদি চড়েছে ওটায়, তারপর শমিত। কত রকম স্মৃতি! দিদির ছেলে হলে মা ওদের দিয়ে দিতে বলেছিল। কিন্তু সেবার রঞ্জাই বলে কয়ে সাইকেলটা রেখে দিয়েছিল। শমিতের মনে আছে রঞ্জা তখন প্রথমবার কনসিভ করেছিল।

কাল রাতে আরেকবার এটা নিয়ে কথা হয়ে গিয়েছে দু’জনের। রঞ্জা বলছিল ট্রাইসাইকেলটা যেন এবার অন্তত বিক্রি করে দেয়া হয় বা কাউকে দিয়ে দেয়া হয়। শমিত গা করেনি। এতক্ষণ পর সে বুঝতে পারছে সকাল থেকে কেন মেয়েটা এত চুপচাপ।

শমিত হাঁটতে হাঁটতে অনেকটুকু চলে এসেছে। এদিকে ওরকম পুরনো জিনিসের দোকান এখনো চোখে পড়েনি। আজই সাইকেলটা বিক্রি করে দেয়া যায় কিনা ভাবছে শমিত। দাদা কিংবা দিদি কেউ তো আর এ শহরে নেই। ছেলেমেয়েরা সব বড় হয়ে যাচ্ছে। আবার কবে কার সংসারে বাচ্চা হবে তার নেই ঠিক। তাছাড়া এত পুরনো জিনিস কেউ আর নেবেই বা কেন! শুধু শমিতই স্মৃতি আঁকড়ে বসে ছিল এতদিন। রঞ্জা আসলে ওটা চোখের সামনে দেখতে চায়নি। ছেলে বা মেয়ে তার বাবার সাইকেলে চড়বে এই নিয়ে কত স্বপ্ন ছিল ওর। সেই স্বপ্নই যখন মরে গেছে তখন আর সাইকেল রেখে কী হবে! এতদিন পর ব্যাপারটা বুঝতে পেরে শমিত সত্যি খুব গ্লানি বোধ করছে। না, আজকেই এর একটা ব্যবস্থা ওকে করতে হবে৷

একটা সস্তা হোটেলে বসে চা খেতে খেতে এইসব ভাবছিল শমিত। বিল মেটানোর সময় রাস্তার উল্টোদিকে লোকজনের জটলাটা চোখে পড়লো। শমিতের কৌতূহল বরাবরই কম। কোথাও ভিড় জটলা দেখতে পেলে দাঁড়িয়ে পড়ার অভ্যাস নেই। কিন্তু হোটেল থেকে বেরিয়ে আজকে ভিড়ের দিকেই এগুলো সে।

ভিড়ের পাশে ‘মেসার্স ঝামেলা কিনি’র রঙচটা ছোট সাইনবোর্ডটা ওকে কৌতূহলী করেছে। ট্রাইসাইকেলটা এখানে বিক্রি করা যায় কিনা কথা বলে দেখতে হবে। তাছাড়া আরো কিছু পুরনো জিনিস জমে আছে৷ কোনটা রাখবে, কোনটা ফেলে দেবে শমিত দেখার সময় পায়নি বলে রয়ে গেছে।

দোকানটা ফাঁকা। সম্ভবত সবাই পাশের জটলায় কী হচ্ছে দেখতে গিয়েছে। শমিত একটু দাঁড়াবে কিনা ভাবছিল। তখুনিই একজন ছুটে এলো। শমিত আলাপ শুরু করলো লোকটার সাথে। কিন্তু জিনিসপত্র না দেখে কথাই বলতে চাইলো না লোকটা। আসলে তার মনোযোগ ঐ ভিড়ের দিকে। শমিত ভাবছে লোকটাকে সঙ্গে করে বাসায় নিয়ে যাবে কিনা । সাইকেল আর টুকটাক জিনিসগুলো ওর তাহলে এতদূর বয়ে আনতে হবে না। কিন্তু ব্যাটা রাজি হবে কিনা কেজানে!

– ওখানে কী হয়েছে?

– একটা বাচ্চা পাওয়া গেছে স্যার। নামধাম কইতে পারতেছে না।

তখুনিই কান্নাটা কানে এলো ওর। শমিত ভিড়ের দিকে এগুলো। দেখতে পেলো স্যান্ডো গেঞ্জি আর হাফপ্যান্ট পরা একটা দুই কি তিন বছরের বাচ্চা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। হাতে একটা অর্ধেক পাউরুটি। সবাই বলছে আশেপাশেই কোনো বস্তিতে থাকে হয়তো, মা খেয়াল করেনি, খেলতে খেলতে এদিকে চলে এসেছে।

থানায় খবর দেবার কথা বলছে লোকজন। অনেকক্ষণ তো হয়ে গেছে, ওকে কেউ খুঁজতেও আসেনি। ঝামেলা কিনির লোকটা বললো আরেকটু অপেক্ষা করতে। বাচ্চাটা শুধু ওর নাম বলতে পেরেছে, এর বেশি কিছু বলছে না। অবিরাম কাঁদছে। ভিড়ের মধ্যে নানাজন নানা মন্তব্য করছে। শমিতের হঠাৎ কী হলো কে জানে! সে প্রস্তাব দিলো যতক্ষণ না খোঁজ পাওয়া যায় বাচ্চাটাকে ওর বাসায় নিয়ে রাখবে। ক্ষুধায়, ভয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে বাচ্চাটা, একটু ঘুম দরকার ওর। বাসার ঠিকানাটা তো রইলোই ওদের কাছে, একটা কিছু খবর পেলে শমিত নিজে এসে দিয়ে যাবে ওকে।

লোকজন যে সাথেসাথেই রাজি হয়ে যাবে শমিত বোধ হয় ভাবতে পারেনি। তাই ওকে বাসায় নিয়ে যেতে বললে মনে মনে এখন একটু দ্বিধাগ্রস্থ হয়ে পড়লো। রঞ্জা কিভাবে রিয়্যাক্ট করে সেটা একবার ভেবে দেখা দরকার ছিল। কিন্তু এখন তো মেয়েটা ফোনই ধরছে না। ভিড়টা এর মধ্যে পাতলা হয়ে আসছে। ঝামেলা কিনির লোকটা ঠায় দাঁড়িয়ে আছে ওর সামনে।

– স্যার আপনার সাথে আমিও যাই। বাসাটা দেইখা আসি। খোঁজ পাইলে তখন গিয়া আপনারে জানামু।

শমিতের মনে হলো এখন আর ভাববার সময় নেই। কিছুক্ষণ কিংবা আজকের দিনটা অন্তত ওদের কাছে থাকতেই পারে বাচ্চাটা। দোকানের লোকটা বেশ কাজের, সে এরই মধ্যে একটা

রিকশা দাঁড় করিয়ে বাচ্চাটাকে নিয়ে উঠে পড়েছে।

বাসার সামনে এসে নামতেই রঞ্জার ফোন এলো। শমিত ফোন ধরছে না, একটু একটু ভয় পাচ্ছে সে এখন। মনে হচ্ছে কাজটা ঠিক হয়নি। দোকানের লোকটা তাকিয়ে আছে অদ্ভুত চোখে। যেন দৃষ্টি দিয়ে ভেতরটা পড়ে ফেলতে পারছে। শমিত আর দাঁড়ালো না ওখানে, সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল।

কিন্তু বাসায় ঢুকে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো শমিত। কারণ রঞ্জা খুব স্বাভাবিকভাবেই নিল ব্যাপারটাকে। বাচ্চাটা ছেলে না মেয়ে সেটা দুশ্চিন্তায় এতক্ষণ লক্ষ্য করার সময় পায়নি ওরা। রঞ্জা ওকে মামণি বলে কাছে ডেকে নিতেই বোঝা গেল। মেয়েটার নাম জবা। ওর মায়ের নাম রানু। এর বেশি কিছু জানা গেল না।

জবা এতক্ষণ চুপচাপ থাকলেও এখন ঘরের ভেতরে পায়চারি করছে আর বড় বড় চোখে চারপাশ দেখছে। শমিত দূর থেকে দেখেছে মুনিয়ার খাঁচার সামনে দাঁড়িয়ে ওর মুখটা কেমন হাসি হাসি হয়ে যাচ্ছিল।

শোকেসে সাজাবার জন্য সকালে কার্টন থেকে ককেশী পুতুলের একটা সেট বের করেছিল রঞ্জা। শমিতের দিদি সেবার জাপান থেকে এনেছিল ওটা। জবা হাত বাড়াতেই রঞ্জা ওকে পুতুলগুলো দিয়ে খেলতে বসিয়ে দিল। মেয়েটার বোধ হয় ওকে পছন্দ হয়েছে। রঞ্জারও নিশ্চয়ই মেয়েটাকে পেয়ে ভাল লাগছে। ওর ঝলমলে চোখমুখ দেখে শমিতের ভেতরটা দুলছিল।

ঝামেলা কিনির লোকটার নাম বাবুল। সে যাবার আগে তার ফোনে জবার কয়েকটা ছবি তুলে নিল। শমিত নিচ পর্যন্ত গেল লোকটার সাথে। তখন আবার রঞ্জার ফোন এলো । জবার জন্য কিছু নতুন জামাকাপড় কিনে আনতে হবে। আর দুধ, বিস্কুট, চিনি এসবও নাকি ফুরিয়েছে। ফোন রেখে মেসেজে বাজারের লিস্টটা পাঠিয়ে দিল রঞ্জা।

শমিতের এখন দিশেহারা লাগছে। এই বয়েসী বাচ্চার জিনিসপত্র তো আগে কখনো কিনতে হয়নি ওকে। কোথায় যে পাওয়া যায় বুঝতেও পারছে না সে। সামনে একটা সুপারশপ আছে। গতকাল একবার গিয়েছিল টুকটাক জিনিসপত্র কিনতে। অগত্যা ওখানেই একবার ঢুঁ মারবে বলে হাঁটতে থাকে সে।

ওদিকে হাতের কাজ ফেলে জবাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে রঞ্জা। হালকা গরম জলে সাবান দিয়ে ওকে স্নান করিয়ে দিয়েছে। সারাগায়ে পাউডার লাগিয়ে দিয়েছে যত্ন করে। তারপর মাছভাজা আর ডাল দিয়ে গরম ভাতও খাইয়েছে। পেট ভরে খেতে পেয়ে বাচ্চাটা প্রায় সাথে সাথেই ঘুমে ঢলে পড়লো। ওকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে গলা অব্দি কাঁথা টেনে দিল রঞ্জা। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন মেয়েটা, তবু গুনগুন করে ঘুমপাড়ানি গান গাইতে ইচ্ছে করে আর অযথাই চোখ জলে ভরে আসে রঞ্জার।

শমিত কল্পনায় এইসব দেখতে পায়। মনটা হুহু করে ওঠে। বোধ হয় বহুদিন বন্ধ থাকবার পর কোথাও একটা দরজা খুলে গেছে আর এক পশলা তিরতিরে হাওয়া এসে ওকে আপাদমস্তক ছুঁয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বড় অযাচিত, বড় ঠুনকো এই অনুভূতি। হয়তো আজকে বিকেলে বা কাল সকালেই বাবুল নামের লোকটা ওদের ফোন করবে কিংবা বাসায় চলে আসবে। জবা ওর বাবামায়ের কোলে ঝাঁপিয়ে পড়বে। তারপর ওদের হাত ধরে খুশিমনে বাড়ি ফিরে যাবে।

তবু শমিতের ইচ্ছে করছে অন্যরকম কিছু ভাবতে। ওদের সাতশো পঁচাত্তর স্কয়ার ফিটের নতুন ফ্লাটে এঘর থেকে ওঘরে চঞ্চল পায়ে ছুটে বেড়াচ্ছে কেউ। কলকল হাসির ফোয়ারায় বিহবল করে দিচ্ছে ওদের দু’জনকে। চোখ বুঁজলে শমিত দেখতে পায় রঞ্জার বারান্দায় মোসেন্ডা আর দোপাটির সাথে একটা টুকটুকে লালরঙের ফুলও ফুটেছে, তার নাম জবাকুসুম।

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত