| 1 মার্চ 2024
Categories
ইতিহাস

দারাশুকো এক বিস্মৃত শাহজাদা

আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট

দীপরাজ দাশগুপ্ত

দারার কথা আমি প্রথম পড়ি ডি.এল রায়ের ঐতিহাসিক নাটক সাজাহানে। বাদশা শাহজাহান ও মমতাজের বড়ছেলে শাহজাদা সুলতান মুহাম্মদ দারাশুকো। নামটি ঠাকুরদা জাহাঙ্গীরের দেয়া। পিতার প্রিয়পুত্র হওয়ায় পেয়েছিলেন শাহবুলন্দ ইকবাল উপাধি। পিতার মনোনীত উত্তরাধিকারী হওয়ার পরও হলো তাঁর ভাগ্যবিপর্যয় এবং ভাতৃদ্বন্দ্বে মর্মান্তিক মৃত্যু।

শাহজাহানের পুত্র, আওরঙ্গজেবের বড়ভাই কিংবা ময়ূর সিংহাসনের লড়াইয়ে পরাজিত ভাগ্যহত এক মধ্যযুগীয় শাহজাদা হিসেবেই মূলত আমরা তাঁকে জানি। কিন্তু এটুকুতেই তাঁর পরিচয় কখনোই সীমাবদ্ধ নয়। ইতিহাসের অনুসন্ধানী দৃষ্টি দিয়ে যদি আমরা তাঁকে দেখার চেষ্টা করি, তবে আমরা দারাশুকোকে দেখতে পাবো — এক প্রেমিক পুরুষ রূপে, এক কবির রূপে, এক লেখক রূপে, এক অনুবাদক রূপে, এক সুফিচিন্তক রূপে, এক বেদান্তবাদী দার্শনিক রূপে এবং সর্বোপরি এক উদারচেতা মুক্তমনা মানুষ রূপে। যিনি কিনা তাঁর সময়ের অনেক আগেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং যাঁকে তাঁর সমকালীন মানুষেরা সঠিক ভাবে বুঝতে পারেনি। সক্রেটিসের বিষপান ও দারার শিরচ্ছেদে মৃত্যু এই দুটি ঘটনার পেছনে রয়েছে মানুষ দুটির জীবনদর্শন। সক্রেটিস নিজেকে জেনেছিলেন আর দারাশুকো ধর্মীয় সহাবস্থানের সূত্রটিকে জানার চেষ্টা করেছিলেন। এই এঁদের অপরাধ।

আমি দারাশুকোকে জানার চেষ্টা করেছি , বিভিন্ন গ্রন্থের মাধ্যমে। স্যার যদুনাথ সরকারের প্রবন্ধ “কুমার দারার বেদান্তচর্চা” , সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের প্রবন্ধ “শাহজাদা দারাশুকো” ও “মজবা উ-ল- বহরৈন”, কে.আর কানুনগোর ঐতিহাসিক জীবনী গ্রন্থ ” শাহজাদা দারাশুকো “, অমিয়কুমার মজুমদারের ” দারাশুকো: জীবন ও সাধনা “, এবং শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের শত অধ্যায়ের সুবিশাল ঐতিহাসিক উপন্যাস ” শাহজাদা দারাশুকোতে “। এছাড়া সাম্প্রতিককালে ঢাকা থেকে প্রকাশিত শানজিদ অর্ণবের লেখা “দারাশুকো” এক্ষেত্রে নবতম সংযোজন। বাংলা প্রকাশনা জগতে তাই বলা যায় , দারাশুকো চর্চায় তথ্যনির্ভর মানসম্পন্ন গ্রন্থের অভাব নেই।

দারা মানসিকতায় ছিলেন তাঁর প্রপিতামহ বাদশা আকবরের মতো। আন্ত ধর্মীয় অনুভূতিগুলোর সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন এবং এদের মধ্যে সাংস্কৃতিক সমন্বয়ের প্রয়াস করা ছিল এ দুজনের লক্ষ্য। কিন্তু এক্ষেত্রে বলা যায় , দুজনেই ব্যর্থ। কারণ এটি ছিল মধ্যযুগ। আধুনিক কালে যা আমাদের কাছে অত্যন্ত সহজ বোধগম্য, মধ্যযুগে তাই আবার প্রবল কঠিন। আকবর তাঁর রাজকীয় ক্ষমতাকে এক্ষেত্রে কাজে লাগিয়েছিলেন আর দারাশুকো তাঁর অধীত জ্ঞান ও প্রজ্ঞাকে। উপমহাদেশে প্রচলিত প্রধান দুটি ধর্মমতের মধ্যকার অবিশ্বাস ও সংঘাত সাংস্কৃতিক সমন্বয়ের কোনো বৃক্ষকেই পরিপূর্ণ রূপে ফলবতী হতে দেয়নি। তাই দারার ক্ষুদ্র প্রয়াসটি তাঁর মর্মান্তিক মৃত্যুর মধ্য দিয়েই সমাপ্ত হয়েছিল।

দারা ছিলেন লাহোরের বিখ্যাত সুফি সাধক মিয়াঁমীরের ভক্ত শিষ্য। তিনি মূলত কাদেরীয়া সুফি মতবাদের অনুসারী ছিলেন। এছাড়া তিনি হিন্দু যোগী বাবালালের ও সাধু সারমাদের অনুরাগী ছিলেন। ঐতিহাসিক কে. আর কানুনগো তাঁর বইতে দারাশুকো ও বাবালালের মধ্যকার অতীন্দ্রিয় অনুভূতিমূলক প্রশ্নোত্তর আলোচনা করেছেন । যার মধ্যে থেকে আমরা দারার অতীন্দ্রিয়বাদীতা ও ঈশ্বর বিষয় ভাবনার কথা জানতে পারি।

দারা এমন একজন মানুষ ছিলেন যিনি অতীন্দ্রিয়বাদীতাকে জীবন যাপনের অংশে পরিণত করেছিলেন। পুঁথিপত্র আর সাধুসঙ্গই ছিল তাঁর দৈনন্দিন জীবনের অঙ্গ। যে হাতে তরবারি শোভা পাবার কথা , সেই হাতে তিনি লেখনী তুলে নিয়েছিলেন। আর এর ফলস্বরূপ মুঘল মসনদ ময়ুর সিংহাসন দখলের লড়াইয়ে সবচেয়ে পেছনে পড়ে গিয়েছিলেন।

দারাশুকো তাঁর ৪৩ বছরের স্বল্প আয়ুর জীবনে ৫০টি প্রধান উপনিষদ ও গীতা ফার্সি ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন। দারার অনুবাদিত একটি ফার্সি উপনিষদের পাণ্ডুলিপি কলকাতা ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে সংরক্ষিত আছে। উপনিষদের অনুবাদের মাধ্যমে তাঁর বেদান্ত অনুরাগের পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি যে প্রাচীন হিন্দু জ্ঞানের সন্ধান করছিলেন, উপনিষদ তথা বেদান্তদর্শনে সেই জ্ঞানকে খুঁজে পেয়েছিলেন। দারার এই ফার্সি উপনিষদই সর্বপ্রথম ইউরোপে প্রবেশ করেছিল। আর পাশ্চাত্য সমাজ সন্ধান পেয়েছিল প্রাচ্যের অমূল্য দর্শনের। সুফিবাদ ও বেদান্তের মধ্যে নৈকট্য তাঁকে অভিভূত করেছিল। অবশ্য এ দুইয়ের মধ্যে কিছু মৌলিক পার্থক্য বিদ্যমান ছিল। ভারতীয় বেদান্তের আংশিক অনুকৃতিই হলো সুফি মতবাদ।

অনুবাদ ছাড়াও দারা কয়েকটি মৌলিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। এর মধ্যে কবিতা, ইসলামের শেষপয়গম্বর থেকে শুরু করে মিয়াঁমীর পর্যন্ত ৩৫০ জন আউলিয়ার জীবনী ও মজবা উ-ল-বহরৈন। দুই সমুদ্রের সম্মিলন নামক একটি গ্রন্থ। এই শেষোক্ত গ্রন্থটি তাঁর অন্যতম রচনা। এখানে তিনি হিন্দু ও ইসলামকে দুটি পরিপূর্ণ সমুদ্র হিসেবে বর্ণনা করে এদের মধ্যকার মিলগুলো খুঁজে বের করে, দুইয়ের মধ্যে সম্মিলন ঘটানোর কথা বলেছেন। সম্মিলনের সূত্রটি জানার আগ্রহে তাঁর এই গ্রন্থটি রচনা। এই গ্রন্থের মাধ্যমে আমরা এমন এক দারাশুকোকে অনুধাবন করি, যিনি দুই পরস্পর বিচ্ছিন্ন সমুদ্র-হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে সমন্বয়ের সেতু নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন। মধ্যযুগে এমন প্রয়াসের কথা সত্যিই অবিস্মরণীয়।

এখন প্রশ্ন হলো ভারতীয় ইতিহাসে দারাশুকোর স্থান কোথায়? কত রাজপুত্র, কত শাহজাদা তো ছিলেন ইতিহাসে। কিন্তু মধ্যযুগে এমন আরেকজন শাহজাদাকে পাওয়া যাবে না, যিনি ছিলেন বেদান্তবাদী। যাঁর অন্তরের ফকিরত্ব বাইরের রাজকীয়তাকে ডেকে দিয়েছিল। তাই আজো আমরা অনুসন্ধান করি, সেই ফকির দারাকে। তিনি যদি ব্যতিক্রম না হতেন তবে হয়তো হারিয়ে যেতেন কত শত রাজপুত্রদের ভিড়ে।

মধ্যকালীন ইতিহাসের আলোচনায় তাঁর প্রাসঙ্গিকতা থাকলেও আমরা হয়তো থাকে সেই ভাবে মনে রাখিনি। তাই আমাদের কাজে, আমাদের মানসিকতায় আজো আওরঙ্গজেবের প্রাধান্য। আওরঙ্গজেব অনেকের কাছেই জিন্দাপীর বাদশা আর দারা নালায়েক – কাফের মাত্র। সমন্বয়ের চেষ্টা করতে গিয়ে দারা অনেকের দৃষ্টিতে ধর্মচ্যুত হয়েছিলেন।

অনেক ঐতিহাসিক বলে থাকেন , আওরঙ্গজেবের পরিবর্তে দারাশুকো যদি সম্রাট হতেন, তাহলে হয়তো ১৯৪৭ এ ভারতভাগ হতো না। কিন্তু কি হলে কি হতো না এমন অনুমান দিয়ে সাহিত্য রচিত হতে পারে, ইতিহাস নয়। কারণ ইতিহাসে কল্পনা বিলাসের স্থান অত্যন্ত সঙ্কুচিত। ইতিহাস কঠোর বাস্তবতা ও যুক্তির নিগড়ে আবদ্ধ।

ইতিহাসের যুক্তি বিচার করে বলতে হয়, বিশাল মুঘল সাম্রাজ্যকে শক্ত হাতে ধরে রাখার রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক দক্ষতা দারার কখনোই ছিল না। তিনি নিগমবোধ মঞ্জিলে বেদান্তদর্শন চর্চা নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। সামরিক শিবিরের সাথে তাঁর প্রায় কোনো যোগাযোগই ছিল না। একজন সুদক্ষ যোদ্ধা ও আদর্শ নেতার গুণাবলী কোনোটাই তিনি অর্জন করতে পারেননি।

তবুও যা করে গেছেন তার জন্য তিনি ইতিহাসের সহানুভূতি অর্জন করেছেন। ভারতাত্মাকে উপলব্ধি করাই ছিল তাঁর জীবনের সাধনা। তাই বলা যায়  ময়ুর সিংহাসনের অধিকারী না হতে পারলেও শাহজাদা দারাশুকো ভারতীয় বৃহত্তর জনমানষের হৃদয়ের সিংহাসনের অধিকারী ঠিকই হতে পেরেছেন। অন্তত এক ট্র্যাজিক নায়ক হিসেবে তো অবশ্যই।

 

 

 

তথ্যঋণ :

. যদুনাথ সরকার রচনা সম্ভার ।
. সাংস্কৃতিকী – সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ।
. শাহজাদা দারাশুকো – কালিকারঞ্জন কানুনগো ।
. দারাশুকো : জীবন ও সাধনা – অমিয়কুমার মজুমদার।
. দারাশুকো – শানজিদ অর্ণব ।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত