দেশভাগ দাঙ্গা ও একটি জ্যাকেট আর একটি ব্রিফকেস

গল্পটি একটি জ্যাকেট আর একটি ব্রিফকেসের। জ্যাকেটভর্তি স্মৃতি আর ব্রিফকেস ভর্তি বেঁচে থাকার তাগিদ নিয়ে বেরিয়ে পরা একটি ছেলে আর একটি মেয়ের দেশান্তরি হওয়ার গল্প।

ভগবান সিং মাইনি এবং প্রীতম কউর – দুজনের প্রথম দেখা পারিবারিকভাবে। পাঞ্জাবের বাসিন্দা এই দুই জনকে পারিবারিক ভাবে বিয়ের পিড়িতে বসানোর জন্য ঠিক করা হয়। দুই জনের পারিবারিক ভাবে দেখা সাক্ষাতের পর বিয়ের সিদ্ধান্ত হয়ে যায়। কিন্তু বাদ সাধে ১৯৪৭ সালের দেশভাগের রক্তাক্ত সময়।

১৯৪৭-এর দেশভাগ

১৯৪৭সালে ভারতীয় উপমহাদেশ ভেঙে হিন্দুস্তান এবং পাকিস্তান করাটা তখন চূড়ান্ত। বাংলা, বিহার, পাঞ্জাব সহ সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশের উপরে টানা হবে ধর্মের বিভাজন রেখা। পৃথিবীর সব থেকে বড় এই দেশান্তরি প্রক্রিয়া বলা হয় এই ভারত পাকিস্তান পার্টিশনকে।

৪৭ এর দেশভাগের পর এই উপমহাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলাতে থাকে দ্রুত গতিতে। সাম্প্রদায়িক দাঙার লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পরে শহরতলি থেকে গ্রাম-গঞ্জ সবখানে। বাদ যায়নি ভগবান সিং এবং প্রীতম কউরের পাঞ্জাব। হিন্দু-মুসলিম আধিকক্যের ভিত্তিত পাঞ্জাব ভাগ হয়ে যায় দুই ভাগে।

ভগবান সিং এবং প্রীতম কউর পাঞ্জাবের যে অংশে বসবাস করত তা ছিল মুসলিম অধ্যুষিত। বর্তমানে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত সেই প্রদেশটি ছেড়ে তারা অমৃতসরের উদ্দেশ্য রওনা হয়। প্রীতম তার পরিবারের সাথে,তার দুইবছরের ছোট ভাইকে নিয়ে উঠে পড়ে উদ্বাস্তুবাহী এক ট্রেনে।

প্রীতমের খুব পছন্দের ফুলকরী এমব্রয়ডারি করা জ্যাকেটটি ছাড়া তার সাথে নিতে পারেনি কোন কিছুই। পরিস্থিতি তখন এতোটাই করুণ ছিলো বাস্তুভিটার করুণ স্মৃতি আর নিত্যপ্রয়োজনীয় কিছু জিনিষ ছাড়া তারা নিতে পারেনি কোন কিছুই।

অপরদিকে ভগবান সিং সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় তার আপন ভাইসহ হারিয়ে ফেলে তার পুরো পরিবারকে। নিঃস্ব এই মানুষটির সহায় সম্বল বলতে ছিলো একটি ব্রিফকেস। সেই ব্রিফকেস ভর্তি ছিলো তার সকল শিক্ষা সনদ আর প্রয়োজনীয় কিছু কাগজ। ব্রিফকেস নিয়ে ভগবান সিং বেরিয়ে পরল অমৃতসরের পথে।

বলা হয়ে থাকে ইতিহাসের এই সর্ববৃহৎ দেশান্তরীকরণে প্রায় ১৫০ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে একদেশ হতে আরেক দেশের পথে রওনা হয়েছে। উদ্বাস্তু শিবিরে আশ্রয় নিয়েছিলো হাজারো মানুষ। অমৃতসর শহরের এমনি এক উদ্বাস্তু শিবিরের খাবারের লাইনে আশ্চর্যজনকভাবে দেখা হয়ে যায় ভগবান সিং এবং প্রীতম কউরের। শুনতে অনেকটা বলিউডি মুভির কোন সিনের কথা মনে হলেও ব্যাপারটা আসলে বাস্তবেই ঘটেছিলো।

যে দুইটা মানুষ ভেবে ছিলো তাদের দেখা হয়ত এই জীবনে হওয়া আর কোনদিনো সম্ভব না, তাদের যখন আবার দেখা হয়ে যায় তার অনুভূতি শুধু তারাই বুঝতে পারে।

ভগবান সিং এবং প্রীতম কউর এতোদিনের জমানো কথাগুলো পরস্পরকে বলতে লাগলো। আস্তে আস্তে তাদের পরিবার পরস্পরের সংস্পর্শে আসতে লাগলো। অবশেষে ১৯৪৮ সালে তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলেন।

প্রীতম তার পছন্দের জ্যাকেটটি পরল আর ভগবান সিং তার সব সনদপত্র আর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে তাদের নতুন জীবন শুরু করল। জুডিসিয়াল সার্ভিসের চাকরি নিয়ে ভগবান সিং আর প্রীতম লুধিয়ানাতে চলে গেলো।

গত অক্টোবরে অমৃতসরে চালু হওয়া পার্টিশন মিউজিয়ামের অধীকৃত সম্পদ জ্যাকেট আর ব্রিফকেসটি। দেশভাগের রক্তাক্ত স্মৃতির বিপরীতে এই জ্যাকেট আর ব্রিফকেসটি যেনো এক অনন্য ভালোবাসার স্মারক।

– বিবিসি ও বিয়িং ইন্ডিয়ান অবলম্বনে

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত