ভগবানিয়া সম্প্রদায়ের ধর্ম ও দর্শন

বাংলাদেশে ভগবানিয়া সম্প্রদায়ের বড় একটি অংশ রয়েছে যারা ‘গুরুপূজা অর্থাৎ গুরুকে ঈশ্বর জ্ঞানে ভজনা করে। এসমাজের গুরু নারী বা পুরুষ যে কেউ-ই হতে পারেন। এ সম্প্রদায়ের মধ্যে আশ্চর্যরকম সমন্বয়বাদী ধ্যান ধারণা প্রকট। এরা হিন্দু ও মুসলিম সংস্কৃতিকে একই সঙ্গে লালন করে। এদের কারও নাম-লক্ষি, স্বরস্বতী কারো নাম নিজামউদ্দিন কিংবা রহিম। নাম নিয়ে এদের বিশেষ মাতামাতি নেই। বিবাহিত নারী-রাশেদা বা মাজেদা, দেখা যায় তার কপালে লাল সিঁদুরে টিপ জ্বলজ্বল করছে।

বাংলাদেশের খুলনা, যশোর ও সাতক্ষীরা অঞ্চলে ভগবানিয়া সম্প্রদায়ের সন্ধান মেলে। ভগবানিয়া সম্প্রদায়ের কোন উপাস্য দেবতা নেই। নেই কোন ধর্মগ্রন্থ। তারা প্রয়োজনে ভক্তি ভরে হিন্দুর মন্দিরেও যান, মুসলিমের মসজিদেও মানত করতে পারেন। কিন্তু যা-ই করুন না কেন, গুরুদেব কে না নিবেদন করে তারা কোন ধর্মীয় কাজ বা সামাজিক কাজ করতে পারেন না। ভগবানিয়া সম্প্রদায়ের ধর্মীয় বিধি নিষেধ সমস্তই রয়েছে তাদের গানের মধ্যে। প্রতি শুক্রবারে গুরুর বাড়িতে বা কোন ভক্তের বাড়িতে গান ও ধর্মালোচনার আসর বসে। ফলে ভগবানিয়া সম্প্রদায়ের ধর্মও দর্শন নিয়ে আলোচনা করতে হলে এদের গান নিয়ে মূলত আলোচনা করতে হয়। ভগবানিয়া সম্প্রদায়ের বারমাসে মূর্তিহীন বার রকম পূজা অনুষ্ঠান করে যার সব কিছু নিবেদন করা হয় গুরুর নামে, গুরুকে। এসব অনুষ্ঠানকেই তারা ধর্মীয়নুষ্ঠান বলে থাকে।
যেমন- বৈশাখ মাসে-ভগবতী পূজা
জৈষ্ঠ্য মাসে-জামাই ষষ্ঠী
আষাঢ় মাসে-রথযাত্রা
শ্রাবণ মাসে-মনসা
ভাদ্র মাসে-নবা
আশ্বিন মাসে-ডাক সারান্দি
কার্তিক মাসে-কালিমাস
অগ্রাহায়ন মাসে-নবান্ন
পৌষ মাসে-পৌষাসারান্দি
মাঘ মাসে-পঞ্চমী সরস্বতী
ফাল্গুন মাসে-গোসারান্দী
চৈত্রমাসে-দোলপূর্নিমা

এসব অনুষ্ঠানে রান্না করা বা তৈরী করা পরমান্ন দেবতা নয় গুরুকে উৎসর্গ করা-ই ভগবানিয়াদের নিয়ম। ভগবানিয়া সম্প্রদায় ইসলামাচার পালন করলেও খৎনা প্রথা এদের মধ্যে প্রচলিত নয়।

মানবতাবাদঃ

হিন্দু বা মুসলিম যই হোক বাঙালির সুদীর্ঘ পথ পরিক্রমায় দেখা গেছে যে- প্রাগৈতিহাসি আদিম সমাজের কৌমগত মানসিকতার মধ্যে কোন শাস্ত্রিয় ধর্ম বিশেষ প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়নি। রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আন্দোলনের ফলে নিন্মস্তরের সাধারণ মানুষের আর্থিক দৈন্য ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরী হলেও মনের বিশেষ স্তরে বিশেষ কোন পরিবর্তন লক্ষ করা যায় না।

আঠারো শতকে যতগুলো উপধর্ম সম্প্রদায় সৃষ্টি হয়েছে তার প্রায় সবগুলোই সমন্বয়বাদি সহজিয়া বৈষ্ণব ধর্মের ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। পার্থক্য কেবল বহিরাঙ্গে। মানসিকতায় তারা প্রায় এক। এদেশে যতই প্রাকৃতিক দূর্যোগ আসুক, রাষ্ট্রিয় বা রাজনৈতিক পীড়ন ও দাঙ্গা হোক, ধর্মীয় আন্দোলনের নৃশংসতা আসুক নিন্মস্তরের মানুষের সমাজ কাঠামোতে কোন পরির্বতন সূচিত হয়নি। এদেশের মানুষ মনে ও মজ্জায় মানসিক আশ্রয়ের সন্ধান পেয়ে গেলে সেটাকেই তার বেঁচে থাকার একমাত্র উপায় মনে করে স্থির থাকতে চেয়েছে, ফলে প্রাক-আর্য-যুগ থেকে অনেক শাস্ত্রীয় ধর্ম এদেশে এসেছে কিন্তু সেই শাস্ত্রীয় ধর্ম সর্বাংশে তারা কোনদিনও গ্রহণ করেননি বরং নিজের সহজসাচে ফেলে তাকে লৌকিক করে নিয়ে সে স্থীর হয়েছে।
অনুরূপ ভাবে-গৌড়িয় বৈষ্ণব ধর্ম শাস্ত্রের বিধি নিষেধের জ্যামিতিক মাপ জোখের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে গেলে সাধারণ মানুষেরাই সৃষ্টি করে নিয়েছে নিজের সহজ পথ, যে পথে তার মনের মুক্তি মিলবে। শাস্ত্রীয় পন্ডিতদের ছুৎমার্গের স্রষ্টাকে ছেড়ে তারা মানুষের ভজনা করতে চান। ফকির বাউল গেয়ে ওঠেন
“মানুষের করন করো
এবার সাধন বলে ভক্তির জোরে মানুষ ধরো
মানুষের করন করো
মানুষের করো না ভেদাভেদ
করো ধর্মযাজন মানুষভজন
ছেড়ে দাওরে বেদ।
মানুষ সত্যতত্ত্ব জেনে মানুষের উদ্দেশ্যে ফেরো।”১

এই মানুষ ধরা অতই কি সহজ?মানুষের ভেদাভেদ জ্ঞান শুন্য না হলে কি করে সে মানুষ ধরবে। ভেদাভেদ জ্ঞান কে দূর করতে হলে শাস্ত্রের নিয়ম নীতি নয় প্রয়োজন গুরুর চরন, আর পান করতে হয় প্রেমের সুধা। ফকির তাই গেয়ে ওঠেন-
ঘাটে পথে দিও নারে মন
পান কর সদা প্রেমের সুধা অমূল্য রতন।
গোঁসাই চরন বলে কুবির চরন যদি নিতে পারো
এই ঘাট পথ মূলত শাস্ত্রজ্ঞদের নিয়ম কানুন। ঈশ্বর এই নিয়ম কানুনে, যাগ যজ্ঞে থাকেন না, থাকেন মানুষের মধ্যে। মানুষই ভগবানের আশ্রয়। তাই মানুষকে ধরতে না পারলে স্রষ্টাকে পাওয়া যাবেনা। যে মানুষের অন্তরে ভগবান বিরাজ করেন সেই মানুষকে ধরাও অত সহজ নয়! তাই ভগবানিয়া গেয়ে ওঠেন-
অধর মানুষ ধরা এবার ভার হয়েছে গো
মানুষ ধরি ধরি করি, ধরিতে না পারি গো,

এই যে মানুষরতন বেদের উপর
বিরাজ করতেছে গো।

কিংবা-
মানুষ ধরা এত মুখের কথা নয়

এবার আপনি মজে তার পীরিতে তারে মজাইতে হয়।২
অর্থাৎ মানুষকে ভালোবেসে ঈশ্বর সাধনার পথ সুগম করতে হয়। তাই সে গেয়ে ওঠে-
মানুষ হয়ে মানুষ মানো
মানুষ হয়ে মানুষ জানো
মানুষ হয়ে মানুষ চেনো
মানুষ রতন ধন
কর সেই মানুষের অন্বেষণ।৩
ভগবানিয়া সম্প্রদায়ের সংস্কৃতির দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই সমন্বয়বাদের চমৎকার মেলবন্ধন। বিয়ের সংস্কৃতিতে হিন্দুয়ানী, মৃত্যুর সংস্কৃতিতে ইসলামী পন্থা অবলম্বন করে এই সম্প্রদায়ের উদার মানসিকতার পরিচয় বহন করেছে বহিরাঙ্গে। আর অন্তরে সে সাধনা করে নিরন্তর মানুষ। এভাবে ভগবানিয়ারা মানবতার জয় গেয়েছে। তাছাড়া ভগবানিয়া সম্প্রদায তাদের ধর্ম বা সম্প্রদায় কেন্দ্রিক কোন নির্দিষ্ট বেশভূষা পরিধান করা, শরীরে কোন চিহ্ন অর্থৎ তুলসি মালা, রুদ্রাক্ষমালা,তিলক,ত্রিশুল প্রভৃতি ধারন করাকে গর্হিত মনে করে। তারা মনে করে এগুলো মানুষের সাথে মানুষের বিভেদ সৃষ্টির জন্য দায়ী। ভগবানিয়া সম্প্রদায় মানুষের সাথে মানুষের ভেদাভেদ সৃষ্টি করে না।আর তাই তাদেও নির্দিষ্ট কোন পোষাক বা চিহ্ন নেই।

গুরুবাদীঃ

ভগবানিয়া সম্প্রদায় গুরুবাদীধর্ম। গুরুছাড়া তারা অন্য কারো উপাসনা করেন না। গুরুর গৃহই ভক্তের মন্দির। এইগুরু আবার একটি পরিবারে একাধীক হতে পারে। মেয়েরা বিয়ের আগে বাবার গুরুর প্রতি ভক্তি প্রদর্শন করে, বিয়ের পরে স্বামীর গুরুই তার গুরু হয়ে যায়। কখনো কখনো এর ব্যতিক্রমও দেখা যায়। এই গুরুনির্ভর সাধন প্রক্রিয়া সূফি মতবাদে যেমন আছে তেমনি থেরবাদী বৌদ্ধদের মধ্যেও ছিল। এদেশে গুরুবাদটা জৈন বৌদ্ধ অবদান’।৪ ভগবানিয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে হিন্দু ভক্তের যেমন মুসলিম গুরু রয়েছে তেমনি মুসলিম ভক্তেরও আছে হিন্দু গুরু।

ভগবানিয়া সম্প্রদায়ের ভক্তবৃন্দ কর্তাভজাদের মতোই গুরুকে সর্বকাজের মধ্যমণি করে রাখেন। কর্তভজা ভক্ত যেমন বলে-
প্রকৃত স্বভাব না নিলে হবে না গুরুভজন
আগে স্বভাবকে কর প্রকৃতি
গুরুকে পতিস্বীকৃতি।
তবে হবে আসল করন।৫
অর্থাৎ গুরুকে স্বামীজ্ঞানে স্বীকার করলে সমস্ত দায়-দায়িত্ব চিন্তা ভাবনা অহংকার তার চরনে সঁপে দিয়ে ভারমুক্ত হওয়াটা সহজ হয়। একজন দেবতার পায়ে যত সহজে সব কিছু বিসর্জন দেয়া যায় একজন গুরুর কাছে (যখন সে মানুষ) কি অতসহজে সব সঁপে দেয়া যায়? তবু ভগবানিয়া ভক্ত- ভক্তিতে আকুল হয়ে গুরুর বন্ধনা করে।

কি দিব, কি দিব, প্রাণধন কি ধন আছে আমার
কি দিব কি দিব যে ধন তোমারে দিব
প্রাণধন সেইধন আমার তুমি।
কি দিব কি দিব প্রাণধন কি ধন আছে আমার?
তোমারই ধন তোমারে দিয়ে
প্রাণধন দাস্যগিরি করব পায়ে।৬

ভগবানিয়া ভক্তের বিশ্বাস গুরু নাম হল একমাত্র মুক্তির পথ, যে নামে ভব যন্ত্রনা দূর হয়,মানুষ পায় পথের দিশা।তাই সে গেয়ে ওঠে-
‘মানব জনম পেলাম শেষে,
এবার যেন হারাইও না দিশে,
গুরু সত্য নাম ভুলো না।
ভাই বন্ধু আদি, এজগতের সাথী
এরা কেউ হবে না,
সঙ্গের সাথী কাঙ্গাল বলে-
অন্তিম কালে গুরুনাম ছাড়া কেউ যাবে না পারে।’৭

এজন্য ভগবানিয়া সম্প্রদায় গুরু নিন্দাকে মহাপাপ বলো হয়েছে। ভক্ত তাই বলে-গুরুনিন্দা অধঃগতি অর্থাৎ গুরু নিন্দা করা যেমন পাপ শোনাও পাপ। পতি নিন্দা শুনে সতীর যেমন মৃত্যু হয়, তেমনি গুরু নিন্দা শুনলে অধঃগতি প্রাপ্ত হতে হয় বলে ভগবানিয়া ভক্তরা বিশ্বাস করে।
গুরুর কাছেই ভক্তরা পথের নির্দেশ নেয়, সে গুরুর কাছে জানতে চায়-‘গুরু আমার এ পাপ দেহে কেন জ্ঞানের উদয় হল নারে? গুরু তখন ভক্তকে মন্ত্র দেন।
‘সত্য মানুষের সঙ্গে থেকে
সত্য সত্য বল মুখে,
নিরবধি থাকবা সুখে
মানুষের আশ্রয়”৮
একজন গুরু তার ভক্তকে মানুষের মধ্যে থেকে সত্যানুসন্ধানের মন্ত্র দেন। এমন্ত্র ফকির আউলেচাঁদ দিয়েছিলেন শিবরাম ঠাকুরকে আবার শিবরাম ঠাকুর দিয়েছেন ফতে মাহমুদকে আর এখন ভগবানিয় গুরুরা সেই একই মন্ত্র তার ভক্তকে দেন।
‘এক সত্য কর সার
ভবনদী হবে পার’।
কি সেই সত্য?
ভগবানিয়া সম্প্রদায়ের গুরুমন্ত্র সত্য যাকে তারা বলে বীজমন্ত্র।
‘গুরু সত্য বিপদ মিথ্যা
গুরু সত্য, সত্য বল, গুরু ধর, সঙ্গে চল।
এক সত্য কর সার
ভবনদী হবে পার।’
এখানে সঙ্গে চলার অর্থই হল সকল মানুষকে নিয়ে একসঙ্গে চলা। মানুষ ভেদজ্ঞান রহিত হয়ে চলা। গুরুধরা যেমন ভগবানিয়া সম্প্রদায়ের আবশ্যক কর্তব্য তেমনি সত্য বলাটাও আবশ্যিক। এজন্য এ ধর্মকে সত্য ধর্মও বলে, গুরু ধর্মও বলে।

এই গুরুবাদীমন্ত্র কর্তাভজাদের সঙ্গেই সাদৃশ্যপূর্ণ নয় কেবল, সাদৃশ্যপূর্ন সাহেব ধনী সম্প্রদায়ের সঙ্গেও। সাহেব ধনী সমপ্্রদায় তার গুহ্য মন্ত্র বা গুরুমন্ত্রে বলে-
‘গুরু তুমি সত্যধন। সত্য তুমি নিরঞ্জন।
খাটি তোমার নাম সত্য। কাম সত্য। সেবা সত্য
ঠাকুর সত্য। বাক্য সত্য গুরু সত্য।’৯
কর্তাভজা সনম্প্রদায়ের গুরু মন্ত্রও ভগবানিয়াদের অনুরূপ। তারা বলেন-
জয় গুরু সত্য
কর্তা আউলে মহাপ্রভ’
আমি তোমার সুখে চলি ফিরি
যা বলাও তাই বলি
যা খাওয়াও তাই খাই তোমা ছাড়া তিলার্ধ নাই
গুরু সত্য বিপদ মিথ্যা
দোহাই আউলে মহাপ্রভু।
ভগবানিয়া সম্প্রদায়ের মত বাউল ও সুফ ধর্ম গুরুবাদী ধর্ম কিন্তু সেখানে সমন্বয়বাদের আড়ালেও সুক্ষ পার্থক্য বয়েছে। বাউল সাধনায় নারী সহায়ক, সেবাদাস। সেখানে নারী গুরু হয়ে উঠতে পারে নি, সুফি ধর্ম ও পীরবাদী বা গুরুবাদী ধর্মে নারী গুরু হতে পারেন না। কিন্তু কর্তাভজা ও ভগবানিয়া সম্প্রদায় নারীকে দিয়েছে গুরুর মর্যদা। এটি তারা গ্রহন করেছে বৌদ্ধ সহজিয়া তত্ব থেকেই। বৈষ্ণব সহজিয়ারা নারীকে রাধার অংশ মনে করে থাকে। এই প্রাধান্য তান্ত্রিক ঐতিহ্যাশ্রয়ী।‘….দেবী হচ্ছেন গুরু । সকল নারীই কোন না কোন ভাবে দেবীর গুনাবলী সম্পন্ন। বৈষ্ণব সহজিয়াও এটাই বিবৃত করে। যে গুরু দীক্ষাদেন, তিনি দীক্ষাগুরু, কৃষ্ণ। শিক্ষাগুরু, যিনি অনুভবকের উপলব্দি করতে শেখান, হলেন রাধা। রাধার গুনাবলীতে ভাগ আছে সকল নারীর। তাই কোন না কোন ভাবে সকল নারীই গুরু।’১০
শ্রী চৈতন্যের মা স্ত্রী হিসেবে শচীদেব ও বিষ্ণুপ্রিয়া প্রচুর সন্মান পেয়েছিলেন। রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের স্ত্রী সারদা দেবীও তেমনই সন্মান পান। চৈতন্যদেবের প্রধান শিষ্য নিত্যানন্দের স্ত্রী জাহ্নবী দেবীও হয়ে উঠেছিলেন একটি সম্প্রদায়ের নেতা। তাঁরই অনুরোধে নিত্যানন্দ দাস রচনা করেছিলেন প্রেমবিলাস। হেমলতা দেবীও ছিলেন ‘কর্নানন্দ’ গ্রন্থের রচয়িতা যধুনন্দন দাসের দীক্ষাগুরু। শ্রীচৈতন্য বলেন “…হোক স্বাক্ষন বা সন্ন্যাসী-অথবা শুদ্র , যে কৃষ্ণ জ্ঞানে বিজ্ঞ সেই হচ্ছে গুরু।’১১ চৈতন্যর জাত সম্পর্কিত মানুষের ধারণাটি ভেঙ্গে দিয়েছেন জ্ঞানমার্গের আচরনীয় বৈশিষ্ট্য দিয়ে । আদি বৈদিক ধর্মে নারীদেবতারই স্থান ছিলো না। সেখানে দেবীরা সহজিয়া তত্ত্বের মধ্য দিয়ে মধ্যযুগে ব্যাপক প্রচার ও প্রসার লাভ করলেও সামাজিক ভাবে নারীর মর্যদা ছিলো যোগ্য স্ত্রী ও মা হয়ে ওঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ। সেই সীমাবদ্ধতার দেয়ালও ভেঙ্গে ফেলেন সমন্বয়বাদী উপধর্মের ধর্মগুরুরা। কর্তাভজা সম্প্রদায়ের ভক্তরা এদিক থেকে অনেক প্রগতীশলিতার পরিচয় দিতে সমর্থন হয়েছেন,

তারা দুলাল চাঁদের মা সতী দেবীকে কর্তামা জ্ঞানে পুজা ও সন্মান করেন। শুধু তাই নয় তাঁর নামে তারা জয়ধ্বনিও দেন।
‘দিলে সতীমায়ের জয় দিলে কর্তামায়ের জয়
আপদ খন্ডে খন্ডে কালের ভয়।
দিলে মায়ের দোহাই ঘোচে আপদ বালাই
ছুঁতে পারে না কাল শমনে।১২
ভক্তরা বিশ্বাস করে যে, সতীমায়ের দোহাই দিলে যে কোন রোগবালাই দূর হয়,দূর হয় যেকোন বিপদ। আর এ ভাবে সতীমায়ের অলৌকিক ক্ষমতা কর্তাভজা সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রচারিত হলে সতীমা সাধ্বী রূপে কর্তাভজা স্প্রদায়ের মধ্যে প্রতিষ্ঠা পেয়ে যান।
ভক্তদের এই বিশ্বাস-
সতীমা উপরে যেবা রাখিবে বিশ্বাস
সেরে যাবে কুষ্ঠ ব্যাধি হাঁপ শুল কাশ।
বাংলাদেশ ভগবানিয়া সম্প্রদায়ও সতীমাকে মান্য করে ভক্তি শ্রদ্ধা করে। তাদের মধ্যেও দীক্ষাগুরু হিসেবে, শিক্ষাগুরু হিসেবে-নারী মন্ত্রদেন তার ভক্তকে। গুরুবাদী ধর্ম হিসেবে ভগবানিয়া ধর্মের যে টুকু মাহাতœ্য তার চেয়ে অনেক বেশি একে মহিমা দান করেছে নারীকে গুরুর মর্যদানের বিষয়টি।

এই বিষয়টি সাহেব ধনী সম্প্রদায়ের মধ্যে অনেক বেশি সরব।সেখানে রাই অর্থাৎ রাধা হলেন সাহেব ধনী, তিনি এখানে কর্তা।
অথচ ভগবতে বা বৈষ্ণব ধর্মে রাধাকে একক ভাবে পূজা পেতে দেখা যায় না, কৃষ্ণের সাথে তিনি একত্রে পূজা পান। কৃষ্ণ বিহীন রাধার মূর্তির সন্ধান কোথাও মেলে না। অথচ সাহেব ধনী সম্প্রদায় রাধাকে কর্তা করে নিয়ে তার অর্চনা করছে। বার বার শাস্ত্র যেখানে মুখ থুবরে পরেছে, বারবার সেখানেই সমাজের নীচু তলার মানুষ ভালবাসার আলো জ্বেলে মানবতার জয় ঘোষনা করেছে। একক পুরুষের জয় যেমন জয় নয়, নয় একক নারীর জয়ও নয় জয়। পৃথিবীতে স্রষ্টাকে লাভ করতে হলে স্রষ্টার সৃষ্টিকে সন্মান করতে হয়। এই সৃষ্টির রহস্যের মধ্যেই তো লুকিয়ে আছে পরম কর্তা, পরম মানুষ, পরম পুরুষ, পরম প্রকৃতি, পরমাত্মা। তাই ভগবানিয়া ভক্ত গেয়ে ওঠেন-
দিয়ে সৃষ্টির ভার
ঠাকুর করতে চাইলেন সুখ বিহার….
সৃষ্টির দ্বায়িত্ব ভক্তকে দিয়ে-ই স্রষ্টা সুখী হতে চান এই বিশ্বাস লালন করতে পারলে আজকের পৃথিবীকে সম্প্রদায়িক ইস্যুতে কাতর হতে হতো না। শাস্ত্রজ্ঞরা এটি বুঝতে পারেননি বলেই বার বার ধর্ম ভেঙ্গেছে ধর্মের লড়াই হয়েছে আর ঈশ্বর শেষ পর্যন্ত কৈবর্তের ঘরে মধুর হাসি হেসেছেন। এ যেন
‘জলের মধ্যে ফুলবাগিচা
পাতায় পাতায় মেয়ে
জলের মধ্যে আগুন দিয়ে
বাউল রইলো চেয়ে।১৩
গুরুবাদী এই সম্প্রদায়ের জন্য কতগুলো অলিখিত আদেশ রয়েছে যা গুরু কেন্দ্রিক কর্তব্যকর্ম বলেই মানতে হয় ভক্তকে।ভগবানিয়া সম্প্রদায়ের সকল সামাজিক কাজ গুরুকে নিয়ে সম্পন্ন করতে হয়। প্রতি মাসে গুরুগৃহে ভক্তকে অবশ্যই যেতে হবে। যদি একে বারেই কোন যৌক্তিক কারনে তা সম্ভব না হয় তা হলে বছরে দু-বার অন্তত যেতেই হবে। গুরুগৃহে যবার সময় প্রয়োজন মত খাদ্য সামগ্রী নিয়ে যেতে হবে। বছরে অন্তত দু’বার নিজ গৃহে গুরুকে নিয়ে ধর্মীয় উৎসব করতে হবে। গুরু প্রদত্ত কোন তত্ব কোন মন্ত্র কাগজে লেখা যাবে না। গুরু বচন সত্য বলে জানতে হবে ও মানতে হবে। আর এই বিধি নিষেধ মেনে ভক্ত তার আপন ভক্তির শতদল গুরুর পায়ে তথা ফকিরের পায়ে অর্পন করে গেয়ে ওঠে
“জগৎ গুরু বলিয়া দুবাহু তুলিয়া
ফকির গুন গাওরে….

ভক্তিবাদ:

আর্যদের প্রধান ধর্মগ্রন্থে বিষ্ণুর যে স্ত্রোত্র রয়েছে এবং তার যজ্ঞরূপে ও নামকীর্তনের মধ্য দিয়ে ভগবান বিষ্ণুর যে অনুগ্রহ লাভের উল্লেখ পাওয়া যায় তা প্রচীনতম বৈষ্ণবাচার। এখানে লৌকিক পূজা অর্চনার বিষয় নেই। এই শ্রৌত বৈষ্ণব ধর্মের আলোচনায় ভক্তি কখনোই প্রধান অনুষঙ্গ হয়ে ওঠেনি। বৈদিক পর্ব থেকে বিষ্ণু যখন পৌরানিক যুগে আবির্ভূত হলেন তখন তিনি ভাগবতের প্রধান অবতার কৃষ্ণ। ভক্তেরা তাই কৃষ্ণকে বিষ্ণুর অংশাবতার বলে থাকে। পৌরানিক বৈষ্ণব ধর্ম ব্রাহ্মন শাস্ত্র দ্বারা অনুমোদিত হলে বৈষ্ণবচার ও পূজাপদ্ধতিসমুহ উপপুরান সমুহে লিপিবদ্ধ হয়ে যায়। যারা এই লৌকিক আচার বা পূজানুষ্ঠানের বিরোধী ছিলেন তারা যে তত্বের অবতারনা করলেন তার নামই ভক্তিবাদ।১৪ভাগবত পুরানে কৃষ্ণ প্রেমের ভক্তিমূলক ব্যাখ্যা তারা উপস্থাপন করেন। বাংলায় ধর্মচিন্তায় ভক্তিবাদের লক্ষন স্পষ্ঠ হয়ে ওঠে খ্রিস্টিয় পঞ্চদশ শতকের মধ্যভাগ থেকে।১৫

ভগবান কে পাওয়ার তিনটি পথ রয়েছে আর সেগুলো হল-জ্ঞানমার্গ, কর্মমার্গ ও ভক্তিমার্গ। জ্ঞান মার্গের লোকেরা ব্রহ্মাকে পান জ্ঞানতত্ত¡ দিয়ে কিন্তু ভক্তের হৃদয়ের ভক্তির কারণেও ধরা দেন ভগবান। তাই ভক্তিতে মুক্তি মেলে এই বিশ্বাসে ভক্ত সজল নয়নে করজোড়ে মাথা নত করে ভগবানের সামনে উপস্থিত হন।তাই ভগবানও ভক্তের বোঝা বহন করতে যেন প্রস্তুত থাকেন সব সময়। শ্রী চৈতন্যদেব এই বৈষ্ণব ভক্তিকে জনগনের মনে এমন ভাবে সু-প্রতিষ্ঠিত করে দেন যে, এই ভক্তির পথ ধরে সমাজে ধর্মীয় উদারনীতি ও ভক্তিবাদ প্রচার পেয়ে যায়। এই ভক্তিবাদের প্রচারে চৈতন্যের সহযোগী ছিলেন-অদ্বৈত আশ্চর্য, নিত্যানন্দ, শ্রীবাস পন্ডিত, গদাধর পন্ডিত ও বড়গোস্বামীগণ।
গৌড়িয় বৈষ্ণবাচার্যরা মনে করেন ভক্তিকে বাদ দিয়ে যারা কর্ম জ্ঞান মার্গদিয়ে ঈশ্বর লাভে বা মোক্ষলাভে চেষ্টা করেন তাদের দ্বারা পারমার্থিক সত্ত্বার সন্ধান লাভ সম্ভব নয়।১৬ এই পরমার্থিক সত্ত্বার সন্ধান লাভের ক্ষেত্রে শ্রীচৈতন্যের আন্দোলন বাংলার ভাবান্দোলনের অত্যন্তগুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়।১৭
ভগবানিয়া সম্প্রদায়ের প্রবক্তা আউলেচাঁদ লোককাহিনী অনুযায়ী স্বয়ং শ্রী চৈতন্য। অতএব তিনি তার শিষ্যদের মধ্যে যে ভক্তিবাদ বা ভাববাদের রস প্রচার করবেন তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই। আর একারণেই বৈষ্ণব ধর্ম কেন্দ্রিক সকল লোকধর্মে ভক্তিবাদ সুপ্রতিষ্ঠিত। ভগবানিয়া সম্প্রদায় ও তাদের উপসনায় ভক্তিবাদকেই মোক্ষলাভের একমাত্র উপায় বা পথ বলে মনে করে। তাই ভক্তিতে ভগবানিয়া ভক্ত গেয়ে ওঠেন-
ভক্তি বিনে হয়না ভজন,
আর এই ভক্তি ভাবে বিশ্বাস হলে
মিলবে তবে মানুষ রতন।
ভক্তি বিনে হয় না ভজন
আর ভক্তি বিনে মুক্তি পথ
কে কোথায় পেয়েছে, দেখ কে কোথায় পেয়েছে,
আর ভবিÍ হবে মুক্তি পাবে
যার আছে একান্ত মনন।১৮
ভগবানিয়া ভক্ত বিশ্বাস করেন- ভক্ত যদি সেবার আয়োজন করে তাহলে ভগবান কিছুতেই সেই সেবা গ্রহন না করে থাকতে পারেন না। কারণ ভক্ত ছাড়া তিনি থাকবেন কোথায় ভক্তের হৃদয়েই তো তার আসন, তাই ভক্ত যদি দরদ দিয়ে সেবা দেয় তবে পাষানও গলে যায়। তাই ভক্ত গেয়ে ওঠেন-
‘ভক্ত যদি করে সেবা আয়োজন
ভক্তের কাছ থেকে করেন গ্রহণ
ভক্ত ছাড়া কোথাও থাকেন না কখন,
সে যে ভক্তের জীবন ধন।১৯
সুফি ধর্মের প্রেমবাদ, বৌদ্ধ ধর্মের ভক্তিবাদ, বৈষ্ণব ধর্মের ভাব নিবেদন সবই একপরম ব্যক্তির প্রতি কিন্তু কর্তাভজা বা ভগবানিয়ায় সেই ভক্তি এসে লীন হয়েছে মানুষের কাছে।
ভগবানিয়া যে সেবার আয়োজন করে তা গুরু কেন্দ্রিক বা মানুষ কেন্দ্রিক। ভগবানকে সে মানুষ বলেই সম্বোধন করে পরম ভক্তিতে গেয়ে ওঠেন-
জগতে কে আনিলোরে
সুধা মাখা সহজ মানুষের নাম?
এই নাম নিলে সুখে পরে
এ জনমে বিপদ খন্ডে
ভব রোগের হয় আরাম।২০
এই মানুষকে সহজে পাওয়া যায় না তাই ভক্ত গায়-
সহজ মানুষ কি শুধু কথায় পাওয়া যায়,
হলে আপনি সহজ তবে সহজ মানুষ পাওয়া যায়।
সহজ সহজ বলতেছে সবাই
কে দেখেছ, কে শুনেছ, সহজ মানুষ রয়েছে কোথায়
ব্রহ্মান্ডের উপরে মানুষের ঈশ্বরও তার ধ্যানে রয়।২১
সহজ মানুষ কে কোথায় পেয়েছে? ঈশ্বর নিজেও ব্রহ্মান্ডের উপরে মানুষের-ই ধ্যান করছেন!!
অতএব-ভগবানিয়া সম্প্রদায়ের ভক্তরা সহজ করে গেয়ে ওঠে-
মানুষ চিন্তা করো রে মন
অন্যচিন্তার কি প্রয়োজন,
এই মানুষে আছে মিশে
ও সেই মানুষ রতন।২২
এবাবে দেখা যায় যে, শাস্ত্রীয় ধর্মের উদার নীতি, ভক্তিবাদের তুলনায় ভগবানিয়া ধর্মের এই উদারনীতি ও ভক্তিবাদ অনেক বেশি সেক্যুলার মতবাদ। না হলে সে এত সহজে কী করে বলে-
‘মানুষ রূপেতে মিশে
ঝলক দিচ্ছে তাঁর নয়নের কিরণ।২৩
ঈশ্বর মানুষ রূপেই মানুষের সাথে মিশে আছেন, মানুষের মধ্যে তাঁর নয়নের কিরণ ঝলক দেয়। সেই মানুষকে চিনতে না পারলে অধর এই মানুষকে ধরা সহজ হয় না। তাই সে ভক্তিতে গায়…
অনুরাগে করগে ভজন,
তবে পাবে সেই রূপদর্শন
ও সেই ভাবের মানুষভাব ধরিয়া
কর তাঁর নিদর্শন।২৪

বৈষ্ণব মতবাদে মোক্ষলাভের যেমন একমাত্র পথ ভগবান শ্রীকৃষ্ণর প্রতি ভক্তেরএকান্ত প্রেম তেমনি ভগবানিয়া সম্প্রদায়ের একমাত্র পথও হল ভক্তি কিন্তু সেই ভক্তি বা প্রেম মানুষের প্রতি। এখানে এসে তাই শাস্ত্রীয় ধর্ম ও লৌকিক ধর্ম আলাদা হয়ে যায়। বাউল তত্তে¡র শ্রেষ্ঠ পথও ভক্তিমার্গ বা প্রেমমার্গ । ভগবানিয়াদেরও ভক্তি বা প্রেম সেই মানুষ কেন্দ্রিক, গুরু কেন্দ্রিক। লালন যখন বলেন-
মানুষ গুরু কল্পতরু ভজ মন
মানুষ হইয়া মানুষ ভজ
পাবা মানুষে মানুষে রতন।
কিংবা-
মানুষের চরণ ভজন কর মন
অথবা-
এই মানুষেই মানুষ আছে
মানুষ ধরা বিষম দায়।
মানুষের মধ্যেই যে অধর মানুষ রয়েছেন সেই মানুষকে ধরা সহজ নয় এর জন্য মানুষের চরণই ভজন করতে হবে। বাউল ও সূফি দর্শনের ভবিক্তবাদ বা প্রেম বাদের অনুরূপ ভগবানিয়া সম্প্রদায়ের দর্শন। ঈশ্বরকে পেতে এরা মানুষের আরাধনা করাকেই শ্রেয় মনে করে। প্রায় সকল লৌকিক ধর্ম তথা ভাববাদী দর্শনে দেহতত্ত¡ একটি বিশেষ জায়গা জুড়ে আছে। শরীর ছাড়া ভাবের কোন অর্থই নেই। তাই ভাব বা ভক্তিবাদে শরীর চিন্তা ও শরীর চর্চার প্রবণতা নজরে পড়লেও বাউলদের মত ভগবানিয়া ধর্ম শরীর কেন্দ্রিক নয়। ভগবানিয়া গার্হ্যস্থ ধর্ম। এখানে প্রেম ও ভক্তির স্থান আছে, কামাচার নেই। ভগবানিয়া তাঁর গানেই বলেন-
‘কোন ও প্রেম এই যে মানুষ বর্তেরয়
এ হচ্ছে প্রেমের ধর্ম
একামির ধর্ম তো নয়।২৫

বাংলাদেশে তো বটেই সমগ্র ভরতে যে সব মতবাদ আমরা লক্ষ করি সুফি, বাউল, সহজিয়া, কিংবা বৈষ্ণব এদের সব কিছুর মধ্যে বাঙালির যে দর্শন তা আধ্যাতœবাদ বা ভাববাদী দর্শন। হাসান আজিজুল হক তার বাংলাদেশ দর্শন প্রবন্ধে বলেন-আধ্যাতিœকতা শুধু বাঙালির চিন্তার কেন সমস্ত ভারতীয় দর্শনের মূল বৈশিষ্ট্য।২৬যে পথে আমরা আগাই না কেন শাস্ত্রীয় বা লৌকিক সমস্ত পথটাই ভাববাদে ঢেকে যায়।চারিদিকে আত্মার মুক্তি কামনায় নিবেদিত এক ভক্তের ক্রন্দন বা আর্তি আমরা শুনতে পাই। বৈরাগ্যই এখানে মূল কথা যা তাকে করে তোলে সমাজ বিমূখ, মোট কথা, দায়িত্ব পালনে অনাগ্রহী। ফলে স্তবিরতা অনিবার্য হয়ে ওঠে। ভগবানিয়া সম্প্রদায়ের ধর্মে বৈরাগ্যের স্থান নেই, সমাজ সংসার ত্যাগী মানুষের জায়গাও এটা নয়। তাই তাদের ভাবের গানে কোথাও সংসার ত্যাগের মন্ত্রনা শোনা যায় না- বরং ভগবানিয়া গেয়ে ওঠে-
সে যে সারের সার নাই তার পরস্পর
ও তার সহজ বিচার এই ভ‚বনে,
ও মন কর যদি ভক্তি,
মানুষের রিত পদ্ধতি জানাবে জ্ঞানে।
মন ভাব মনে মনে বসে নির্জনে
যেতে হয় না দেশ ভ্রমনে,
ওযার পায়ে বেড়ী, যায় না কারোর বাড়ি
করে দৌড়া দৌড়ি এ উঠানে।
সতীর সত্য ধর্ম যেসব কাজকর্ম
করে যদি পতি চিনে,
সদায় থাকে বাসায় নাই তার অন্য আশা
ওতার আশয় বিষয় ঐ চরনে।২৭
অর্থাৎ মন যদি ভক্তি ভার নির্জনে বসে ধ্যান করে তাহলে মানুষের রীতি পদ্ধতি সে নিজেই জানতে পারবে। এর জন্য তাকে দেশ ভ্রমন করার দরকার পরে না; তার নিজের পায় সে আপনি বেড়ি পরে সত্যধর্ম মেনে যে কাজ করে, সে নিজের বাসায় বা বাড়িতে থেকে মনের আশা পুরন করতে পারে। এজন্য তার পতি বা গুরু চিনে নিতে হয়, কেননা তার যাবতীয় আশয় বিষয় তো ঐ চরনেই রয়েছে। এভাবে ভগবানিয়া সম্প্রদায়ের কর্ম ও ভক্তি মার্গের সমন্বয় ঘটিয়ে-একটি নতুন ধর্মের প্রচার ও প্রসার ঘটিয়েছেন। তাই তাদের গাওয়া পাড়ের সাট পদে দেখি-
এক নতুন পথ হল এবার
এক নতুন পথ হল।…
চলো মন যাই ব্যাপারে……২৮

ভগবানিয়া ধর্মের মূল মন্ত্রঃ
ভগবানিয়া সম্প্রদায় কতগুলো মূল মন্ত্র রয়েছে যেগুলোকে আজ্ঞা বা আদেশ হিসেবে তারা পালন করে। প্রথম ছয়টিকে বলা হয় কৈট বা কোট বা নিষেধজ্ঞা। এগুলি হল
১। চুরি করা যাবে না
২। ব্যাভিচার করা যাবে না
৩। মাংস ও ডিম খাওয়া যাবে না
৪। মদ গ্রহণ করা যাবে না
৫। এটো গ্রহণ করা যাবে না।
৬। মিথ্যা বলা যাবে না, জীবন চলে গেলেও না।
বাকি নয়টি নিষেধাজ্ঞাকে কর্ম বলে। এ কর্ম তিন রকম যথা বাক্য কর্ম, কায় কর্মও মন কর্ম।

বাক্য কর্ম তিনটি
১। কটু কথা না বলা।
২অনর্থক বচন না বলা/অনাবশ্যক কথা না বলা
৩। প্রলাপ ভাষন না দেয়া।

কায় কর্ম তিনটি
১।পরস্ত্রী গমন না করা।
২।পর দ্রব্য হরণ না করা।
৩। নরহত্যা না করা।

মন কর্ম তিনটি
১। পরস্ত্রী হরনের ইচ্ছা না করা
২। পরদ্রব্য হরনের ইচ্ছা না করা
৩। নর হত্যা করার ইচ্ছা না করা।২৯

এছাড়া ভগবানিয়া সম্প্রদায়ের গরু ছাড়া অন্যকোন পশু পাখি পালন বা পোষ মানানো নিষেধ। কর্তভজা সম্প্রদায়ের মতো বা বাউল সম্প্রদায়ের মত ভগবানিয়া সম্প্রদায়ের কোন ধর্মগ্রন্থ নেই। গানই তাদের মন্ত্র ও বিশ্বাসের ব্যাখ্যা। গানের মধ্যেই তারা পেয়ে যান ধর্মের দর্শন নীতি ও জীবন যাপনের প্রনালী। এই গানকে তারা বলেন ভাবের গীত বা পদের গান। প্রতি শুক্রবার তারা বাড়িতে অথবা নিজের বাড়িতে এই পদের গীতের আসর বসান। সেখানে চলে তাদের ধর্ম ও কর্ম আলোচনা। ভক্ত গেয়ে ওঠে-
মন চলো যাই গুরুর দরবারে
সংসারে সংসেজে বন্দী রইলি কেন কারাগারে।
নির্মল গুরুর কাছারী যেথায় নাইকো জুয়াচুরী
কামুকের দন্ডভারি আইন অনুমানে।
গুরু পাস করেছে পর আনা, হিংসুটের হয় যন্ত্রনা
কৃপা দন্ডে জব্দ করে।
.
ভেঙ্গেছে গুরুর তবিল, করগে ভক্তির আপিল
অনুরাগে রাখো উকিল প্রেমিক জুড়ি দারে।
এখন খালাস পাবি আনা হাসে (অনায়াসে)
মনচলো যাই মানুষের দেশে
নিরবধি থাকবা সুখে সদাই এই শান্তিপুরে।৩০
বেশির ভাগ পদের গানেই প্রেম ও ভক্তির উল্লেখ দেখতে পাওয়া যায়। বৈষ্ণব ধর্মের প্রেমই মানবতাবাদকে বেগবান করে তুলে ছিলো এ উপমহাদেশে। কবীর বলেন‘…(তোমার দেহমন্দিরে যে কাম বিরাজ করে সেই তো মৃত্যুর দুর্গ বাঁধিয়াছে।…প্রেমের পেয়ালা গ্রহন কর।৩১
সুফিবাদে প্রেমই প্রধান কিন্তু সে প্রেম আল্লা প্রম। তবে স্রষ্টার সৃষ্টিকর্মের প্রতি প্রেম প্রদর্শনেও স্রষ্টার প্রেমের বিকাশ ঘটে বলে সুফিরা বিশ্বাস করে।
খ্রিষ্টধর্মে প্রেমের প্রসঙ্গটি বর্ণিত হয়েছে এভাবে-

Through I speek with the tongues of men and of angels, and have not charity, I am become as sounding brass, ar tinkling cymbad. And though I have the gift of prophecy and understand off mysteries, and all knowledge; and though I have all faith, So that I could remove mountains. and have not charity. I am nothing. And though I bestow all my goods to feed the poor, and though I give my body to be burned, and have not charity. it profitcth me nothing.

Charity swffereth long and is kind; charity envieth not; charity vaunteth not it self, isnot puffedup, doth not behave itself, unseemly , seeketh not her own is not casily provoked thinketh no evil….,৩২

এভাবে শাস্ত্র ধর্ম বর্জন করে প্রেমের মাধ্যমে যীশু যেমন গোটা জেরুশালেমের ভিত্তি- নড়িয়ে দিয়ে ছিলেন তেমনি শ্রীচৈত্যন্যও প্রেমের বানী উচ্চারণ করে আচন্ডাল পর্যন্ত সমস্ত ধর্ম বর্ণ ও জাতিকে একটি পতাকা তলে সম্মলিত করার প্রয়াস পেয়ে ছিলেন। ফলে বাংলাদেশে নিচু জাতের মানুষের মধ্যে শাস্ত্র বিহীন প্রেমের ধর্ম-ই প্রধান হয়ে ওঠে, প্রধান হয়ে ওঠে ভক্তিবাদ এই ভক্তিবাদের জোয়ারে মধ্যযুগে ও তৎপরবর্তী বাংলার দীনদুস্থ নিঃস্ব মানুষ শোষিত-নীপিড়িত মানুষেরা বৈরাগ্য বরণ করে.. ব্রাহ্মন্যবাদের বিরুদ্ধে শ্রেষ্টত্ব অর্জনের প্রয়াস পেয়েছে।
ভগবানিয়া সম্প্রদায় ঈশ্বর কে মালিক বলে।আর ভক্তের দেহ ঈশ্বরের সম্পদ আর তাই তাদেও মধ্যে ‘খাজনা প্রদান’ এর রেওয়াজ আছে। কেননা তারা বিশ্বাস করে যেহেতু ভক্তের দেহে জীবাত্মা ও পরমাত্মার বাস তাই জীবাত্মা ও পরমাত্মার বসবাসের কারণ সরূপ মালিককে খাজনা দেওয়াই বিধেয়। এ যেন খ্রিস্টের সেই বিখ্যাত বাণির অনুরণন- ‘ঈশ্বরের যা তা ঈশ্বর কে দাও, কৈসরের (রাষ্ট্র বা সরকার) যা তা কৈসরকে দাও।’
মধ্যযুগের ব্রহ্মন্যবাদের নীপিড়িন; শাস্ত্রীয় বা শরীয়তপন্থি মোল্লাদের ফতোয়ার দৌরাত্যের বিরুদ্ধে উত্তর ভারতে ছিলেন তাঁতীর, রবিদাস মুচির, সেন-নাপিতের ধর্মদাস-সুদীর, দাদুশাহ ধূনকরের বিমান-চাষীর,তিরু-বল্লভ-পরিয়ার নামদেব-দর্জির আর নানক ছিলেন রঙবেজের সন্তান।৩৪ বাংলার ভগবানিয়া সম্প্রদায়ের প্রবক্তা শিবরাম ও ছিলেম না মান্যবংশের কেউ। তিনি ছিলেন কৈবর্ত বা জেলের সন্তান। তবে গৃহিধর্মের এই সম্প্রদায়ের লোকেরা একে বারে বৈরাগী বা বিবাগী না হলেও বিষয় সম্পদেও লোভী নয়। ধর্মই তাদের দান করেছে সংযম, তাই অর্থলিপ্সা তাদের সহজাত নয়। তারা তাই দাস্যভাবে গুরুর সেবা করে, মানুষের সেবা করে; কর্ম করে সে গেয়ে ওঠে
‘মানুষের সুখের কর্ম করবে মন সকলে….
মানুষই তার ঈশ্বর-মানুষের সুখের চেষ্টাতেই তার ঈশ্বর সাধনা সফল হয়। এখাবে ভগবানিয়া ধর্ম এক মহৎ মানব ধর্মহিসেবে পরিচিত পায়।

তথ্যসূচি

১. সুধীর চক্রবর্তী, গভীর নির্জন পথে পৃ. ৩৩।
২. সত্য সদানন্দ সরদার, সত্য ধর্মের সত্য আইন, শিবরাম মহন্ত নিত্য ধাম, যশোর, ২০০৬, পৃ: ৮৮ম
৩. সুধীর চক্রবর্তী প্রাগুক্ত, পৃ: ৬৮
৪. আহমদ শরিফ, চৈতন্য মতবাদ ও ইসলাম, রায়হান রাইন ( সম্পা:) প্রাগুক্ত, পৃ: ১৭৩
৫. সুধীর চক্রবর্তী, প্রাগুক্ত. পৃ: ৬৯
৬. সত্য সদানন্দ সরদার, প্রাগুক্ত. পৃ: ৯২; পদ ২৭৫
৭. প্রাগুক্ত. পৃ: ৯২, পদ ২৭৬
৮. প্রাগুক্ত. পৃ: ৮০, পদ ২৪৬
৯. সুধীর চক্রবর্তী প্রাগুক্ত. পৃ: ৩০
১০. এডওয়ার্ড সি ডিমক প্রবন্ধ ‘জাত নারী ও সহজিয়া আন্দোলন, বাংলার ধর্ম ও দর্শন, রায়হান রাইন(সম্পা:) প্রাগুক্ত. পৃ: ২৯৬
১১. প্রাগুক্ত. পৃ: ২৯১
১২. সুধীর চক্রবর্তী প্রাগুক্ত. পৃ: ৫৮-৫৯
১৩. সত্য সদানন্দ সরদার, প্রাগুক্ত. পৃ: ৪৬; পদ ৯২
১৪. রায়হান রাইন, গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শনে ভক্তিবাদ; বাংলার ধর্ম ও দর্শন,রায়হান রাইন (সম্পা:) প্রাগুক্ত. পৃ: ২৬৭
১৫. প্রাগুক্ত. পৃ: ২৬৮
১৬. প্রাগুক্ত. পৃ: ২৬৮
১৭. প্রাগুক্ত. পৃ: ২৭০
১৮. ফরহাদ মজহার ,বাংলায় ভাব আন্দোলন(প্রবন্ধ) সম্পা.রায়হান রাইন, বাংলার ধর্ম ও দর্শন,সংবেদ। পৃ: ২১৩
১৯. সত্য সদানন্দ সরদার; প্রাগুক্ত. পৃ: ৬৬, পদ ১৭০
২০. প্রাগুক্ত. পৃ: ৯৭
২১. প্রাগুক্ত. পৃ: ৪০, পদ ৮৯
২২. প্রাগুক্ত. পৃ: ২৯, পদ ২৫০
২৩. প্রাগুক্ত. পৃ: ৯৭, পদ ২৯৫
২৪. প্রাগুক্ত. পৃ: ৪৩, পদ ৮১
২৫. প্রাগুক্ত. পৃ: ৪৩, পদ ৮১
২৬. প্রাগুক্ত. পৃ: ৭২, পদ ১৯৬
২৭. ফরহাদ মজহার, প্রাগুক্ত, পৃ: ২১৬
২৮. সত্য সদানন্দ সরদার, প্রাগুক্ত. পৃ: ৯৭, পদ ১৯৩
২৯. প্রাগুক্ত. পৃ: ৩৭, পদ ৫৮
৩০. প্রাগুক্ত. পৃ: ৩৯, পদ ৬৫
৩১. ক্ষিতিমোহন সেন, কবীর, আনন্দ পাবলিশার্স প্রা. লি.কলকাতা, পৃ: ৪৪
৩২.বাইবেল,নিউ টেস্টামেন্ট, করন্থিয় ১.১৩ অধ্যায়:১-৬।
৩৩. আহমদ শরীফ, চৈতন্য মতবাদ ও ইসলাম, বাংলার ধর্ম ও দর্শন প্রাগুক্ত. পৃ: ১৬৮।

 

 

.

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত