‘দীনেশচন্দ্র সেন’ বাঙালি সংস্কৃতির প্রকৃত সাধক

Reading Time: 4 minutes

দীনেশচন্দ্র সেন (১৮৬৬-১৯৩৯) ছিলেন বাঙালি সংস্কৃতির এক প্রকৃত সাধক। অখণ্ড বাংলার ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং জীবন নিয়েই ছিল তাঁর আমৃত্যু গবেষণার আরাধনা। এই অখণ্ডতাকে সামগ্রিক করে তোলার জন্য তাঁর দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল এ অঞ্চলের ব্রাত্য জনগোষ্ঠীর ওপর। কারণ তারাই বাংলার আত্মাকে প্রকৃত অর্থে ধারণ করেছে। এই অনার্য ব্রাত্যদের অধিকাংশেরই বসবাস ছিল পূর্ববঙ্গে। ফলে পূর্ববঙ্গকে মন্থন করেই তিনি উদ্ধার করেছেন সেই অমৃত, যার মধ্যে সংগুপ্ত রয়েছে ইতিহাসের প্রকৃত সত্য। বাঙালি সংস্কৃতির মধ্যেই তিনি খুঁজে পেয়েছেন অসাম্প্রদায়িক চেতনার বীজ। ফলে বাঙালিত্ব আর হিন্দুত্বকে তিনি কখনো এক করে দেখেননি।শাস্ত্রীয় সংকীর্ণতার পরিবর্তে ব্রাত্য জনগোষ্ঠীর মধ্যে যে উদার মনোভঙ্গি সক্রিয়, তা তাকে জাতপাত-ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে প্রকৃত মানবিক ও সেক্যুলার হতে সহায়তা করেছে। ফলে এ অঞ্চলের অনার্য মানুষ বারবার ধর্মান্তরিত হলেও তার মধ্যে বজায় থেকেছে উদার মানবিক অসাম্প্রদায়িক চেতনা। মানিকগঞ্জ-ধামরাইয়ের পল্লিপরিবেশে দীনেশচন্দ্র সেনের বাল্য-কৈশোরকাল অতিবাহিত হলেও তা ছিল দারুণভাবে উন্নত এক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল। তাঁর পিতা ছিলেন বিষয়বুদ্ধিমুক্ত এক সৃষ্টিশীল ব্যক্তিত্ব, ব্রাহ্মধর্মপন্থী, উন্নত রুচির মানবিক বোধসম্পন্ন। অন্যদিকে বৈষ্ণব সাহিত্য ও সংগীতচর্চার মাধ্যমে তাঁর পারিবারিক পরিবেশে বিরাজমান ছিল অধ্যাত্ম প্রেমদীপ্ত এক উদার মহৎ অনুভূতি। উনিশ শতকের শেষার্ধে বাঙালির জাতীয় মানসে উপনিবেশবাদী চিন্তার বিপরীতে যে স্বাজাত্যবোধের জাগরণ ও সমৃদ্ধ অতীতের গৌরব পুনরুদ্ধারের প্রবল স্পৃহা সৃষ্টি হয়, তা থেকেই পরিপুষ্টি লাভ করে দীনেশচন্দ্র সেনের জীবনবোধ।

বাংলা সাহিত্যের প্রথম ইতিহাসগ্রন্থ বঙ্গভাষা ও সাহিত্য (১৮৯৬) রচনাকালে দীনেশচন্দ্র সেনছিলেন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া স্কুলের প্রধান শিক্ষক। এ সময় তাঁর সামনে মুদ্রিত বইয়ের দৃষ্টান্ত তেমন ছিল না। বিপুল শ্রম স্বীকার করে তিনি কুমিল্লা ও আশেপাশের অঞ্চল থেকে যে তিন শতাধিক বাংলা পুঁথি সংগ্রহ করেন, তার ওপর ভিত্তি করেই এটি রচিত হয়। তাঁর সাধকসুলভ নিষ্ঠা পক্ষপাতমুক্ত ছিল বলেই বাংলা সাহিত্য বিকাশে মুসলমানদের অবদানকে তিনি নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে স্বীকার করতে সক্ষম হন। তিনি লেখেন:

ব্রাহ্মণগণ প্রথমতঃ ভাষা-গ্রন্থ প্রচারের বিরোধী ছিলেন। কৃত্তিবাস ও কাশীদাসকে ইঁহারা ‘সর্ব্বনেশে’ উপাধি প্রদান করিয়াছিলেন এবং অষ্টাদশ পুরাণ অনুবাদকগণের জন্য ইঁহারা রৌরব নামক নরকে স্থান নির্দ্ধারিত করিয়াছিলেন। … এই সমৃদ্ধ সভাগৃহে বঙ্গভাষা কি প্রকারে প্রবেশ লাভ করিল? ব্রাহ্মণগণ ইহাকে কিরূপ ঘৃণার চক্ষে দেখিতেন তাহা পূর্ব্বেই উক্ত হইয়াছে। এরূপ অবস্থায় তাঁহারা কি কারণে এই ভাষার প্রতি সদয় হইয়া উঠিলেন?

আমাদের বিশ্বাস, মুসলমান কর্তৃক বঙ্গবিজয়ই বঙ্গভাষার এই সৌভাগ্যের কারণ হইয়া দাঁড়াইয়াছিল। (নবম সং,১৯৮৬, পৃ ১২৯) বাংলা সাহিত্যের প্রথম সফল ইতিহাসবিদ হিসেবে দীনেশচন্দ্র সেন এই সাহিত্যের বিকাশে বিভাষী মুসলিম শাসকদের অবদানকে যে বস্তুবাদী উদার দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করেছেন, পরবর্তীকালে দুঃখজনকভাবে অনেকের মধ্যে তার অনুপস্থিতি লক্ষণীয়।

১৯১৩ থেকে ১৯৩২ সাল পর্যন্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে রামতনু লাহিড়ী রিসার্চ ফেলো হিসেবে তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো, চার খণ্ডে পূর্ব্ববঙ্গ-গীতিকা সম্পাদনা। তিনি এগুলোকে ইংরেজিতে অনুবাদ করে চার খণ্ডে ইস্টার্ন বেঙ্গল ব্যালাডস নামেও প্রকাশ করেন। এর প্রথম খণ্ডটির নামকরণ করেন মৈমনসিংহ-গীতিকা।

পূর্ব্ববঙ্গ-গীতিকা সংকলন ও সম্পাদনার ক্ষেত্রে যে কৃতিত্বের পরিচয় তিনি দেন, তা এককথায় অসাধারণ। কিন্তু এর পেছনে তাঁর যে মনোভঙ্গি সক্রিয়, সেটি প্রায়ই অনালোচিত থেকে যায়। স্মরণীয় যে, ঔপনিবেশিক শাসন উপনিবেশিত মানুষের মধ্যে যে হীনম্মন্যতার জন্ম দিয়েছে, তা থেকে উত্তরণের জন্যই স্বাজাত্যবোধে উদ্বুদ্ধ এ দেশের শিক্ষিত মানস নিজ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির স্বরূপ অনুসন্ধানে ব্যাপৃত হয়। এই স্পৃহাই দীনেশচন্দ্র সেনকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাস রচনায় গ্রামাঞ্চল মন্থন করে প্রাচীন পুঁথি আবিষ্কারের কঠিন শ্রমে ব্রতী হওয়ার প্রেরণা জোগায়। ওই গ্রন্থ রচনার মাধ্যমে তিনি এই সত্যে উপনীত হন যে, অখণ্ড বাংলার ভৌগোলিক পরিসরের মধ্যেও পূর্ববঙ্গের রয়েছে ভিন্নতর বৈশিষ্ট্য। বাংলার পূর্ব অঞ্চলে অধিক হারে নিম্নবর্গীয় অনার্য জনগোষ্ঠীর বসবাসসূত্রে এখানেই প্রকৃত প্রাণস্পন্দিত সাহিত্যের চর্চা অনেক বেশি বেগবান ছিল। এ অঞ্চলের মানুষের জীবন যেমন প্রতিনিয়ত সংগ্রামমুখর, তেমনি সহজ-সরল, জটিলতামুক্ত, উদার চেতনায় স্বচ্ছ ও ঋদ্ধ। ধর্মতান্ত্রিক সংকীর্ণতা তাদের জীবনকে কলুষিত কিংবা মানবিক আবেগশূন্য করেনি। ফলে মধ্যযুগীয় পটভূমিতেও এই অঞ্চলেই সৃষ্টি হতে পেরেছে বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে ধর্মাচ্ছন্নতামুক্ত মানবিক প্রেমের আখ্যানমূলক গীতিকাসমূহ।

গীতিকাসাহিত্যে বিধৃত এই জীবনপরিবেশের মধ্যে, অতঃপর, দীনেশচন্দ্র সেন লক্ষ করেন, সংস্কৃত সাহিত্যের প্রভাবমুক্ত বাংলার পল্লিপ্রকৃতিআশ্রিত একান্ত স্বকীয় বৈশিষ্ট্য। তিনি বলেছেন, এখানে আমরা

বাঙ্গালা ভাষার স্বরূপটি পাইতেছি। বহু শতাব্দীকাল পাশাপাশি বাস করার ফলে হিন্দু ও মুসলমানের ভাষা এক সাধারণ সম্পত্তি হইয়া দাঁড়াইয়াছে। ইহা সমগ্র বঙ্গবাসীর ভাষা। এক্ষেত্রে জাতিভেদ নাই।… এই গীতিসাহিত্য হিন্দু-মুসলমান উভয়ের… খাঁটি বাঙ্গালা যে প্রাকৃতের কত নিকট ও সংস্কৃত হইতে কত দূরবর্ত্তী তাহা স্পষ্টভাবে হৃদয়ঙ্গম হইবে।’ (মৈমনসিংহ-গীতিকা: ভূমিকাংশ)

১৯৩২ সালে চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পর তাঁর সৃষ্টি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে দুই খণ্ডে বৃহৎ বঙ্গ (১৯৩৫) এবং প্রাচীন বাঙ্গলা সাহিত্যে মুসলমানের অবদান (১৯৪০) শীর্ষক গ্রন্থ।

বৃহৎ বঙ্গ–এ তিনি প্রাচীনকাল থেকে ব্রিটিশ শাসনপূর্ব বাংলার ইতিহাস উপস্থাপন করতে গিয়ে বাঙালির অতীত গৌরব নিয়ে অনেক উচ্ছ্বসিত মন্তব্য করেছেন। উচ্চবর্ণের কর্তৃত্ববাদী মনোভঙ্গি দ্বারা পরিচালিত না হওয়ায় তাঁর ইতিহাস-অন্বেষা প্রকৃত সত্য-উদ্ঘাটনে সহায়ক হয়েছে। ফলে তিনি বৌদ্ধধর্মীয় পালবংশীয় রাজাদের উদারনৈতিক পরধর্মসহিষ্ণু বৈশিষ্ট্যকে যেমন প্রশংসা করেন, তেমনি পরবর্তী উচ্চবর্ণীয় সেনবংশীয়দের কঠোর অনুশাসনক্লিষ্ট সংস্কৃতঘেঁষা বাংলাবিরোধী সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিকে সমালোচনা করতেও কুণ্ঠিত হন না। অন্যদিকে ১৩ শতক থেকে এ দেশে পশ্চিম এশীয় শাসকদের বিভিন্ন কার্যক্রমের মূল্যায়ন করতে গিয়ে তিনি অনুসরণ করেন একটি সদর্থক দৃষ্টিভঙ্গি। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে মধ্যযুগীয় শাসকদের সহানুভূতিপরায়ণ মনোভঙ্গিকে তিনি অনুসন্ধানমূলক বিশ্লেষণ-প্রক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। মধ্যযুগের সবচেয়ে উন্নত ও সমৃদ্ধ সাহিত্য সৃষ্টির ক্ষেত্রে বৈষ্ণব ধর্মান্দোলনের যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান, তা বিচার করতে গিয়ে শাসক ও শাসিতের দুই ধর্মীয় সংস্কৃতির সংশ্লেষণের বিষয়টি তাঁর দৃষ্টি এড়ায় না। বৈষ্ণব ধর্ম আন্দোলন সমাজে যে উদার, মানবিক ও প্রেমময় বোধের জাগরণ ঘটিয়েছে, তা বর্ণপ্রথার কড়াকড়ির বিরুদ্ধে নিশ্চিতভাবে এক প্রতিবাদ। তিনি চৈতন্যদেবকে ‘প্রাচীন সমাজের প্রধান এবং প্রথম বিদ্রোহী’ বলে অভিহিত করেন।

প্রাচীন বাঙ্গলা সাহিত্যে মুসলমানের অবদান গ্রন্থে ব্যক্ত হয়েছে সারা জীবনের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা তাঁর বস্তুনিষ্ঠ, সত্য উচ্চারণে নির্ভীক মনোভাব। মুসলমানদের এই অবদানের ক্ষেত্রটি মূলত পূর্ববঙ্গ। বাংলার এ অংশে মুসলমানরা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। এর কারণ, দীনেশচন্দ্রের ভাষায়: সেন-রাজগণের কোপানলে দগ্ধ হইয়া পূর্ব্ববঙ্গে নাথপন্থীরা ইস্লামের আশ্রয় লইয়া জুড়াইয়াছিল। ইস্লাম সেখানে উগ্রভাবে ধর্ম্মপ্রচার করে নাই। পূর্ব্ববঙ্গের বৌদ্ধ জন-সাধারণ সমধিক পরিমাণে সংখ্যায় গরিষ্ঠ ছিল। গোঁড়া হিন্দু সমাজের উৎপীড়নে ইহারা স্বতঃপ্রবৃত্ত হইয়া ইস্লামের আশ্রয় গ্রহণ করে। এই জন্যই পূর্ব্ববঙ্গের মুসলমানেরা সংখ্যায় গরিষ্ঠ। (পৃ. ২৬-২৭)

এ গ্রন্থের সূচনাতেই তিনি উল্লেখ করেন বাংলা ভাষার প্রতি মধ্যযুগীয় কবি আবদুল হাকিমের অপরিসীম আবেগময় অনুরাগের কথা (‘যেসবে বঙ্গেতে জন্মে হিংসে বঙ্গবাণী…’)। বাঙালি মুসলিম কবির এই অনুরাগের মধ্যেই প্রোথিত রয়েছে তাঁর পুরো গ্রন্থে উপস্থাপিত বক্তব্যের বীজটি। তিনি পূর্ববঙ্গ থেকে আরাকান পর্যন্ত অঞ্চলে মধ্যযুগে সৃষ্ট বাংলা সাহিত্যের দুটি ধারাকে তাঁর আলোচনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। একটি রোম্যান্সধর্মী প্রণয়োপাখ্যান; অন্যটি পূর্ববঙ্গ-গীতিকা । রোম্যান্সধর্মী কাব্যের সদর্থক বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি লক্ষ করেছেন ওই সব লেখকের প্রবল বাংলা ভাষাপ্রীতি। পাশাপাশি এসব কবির দেশাত্মবোধের কথাও উল্লেখ করেছেন তিনি। তাঁর মতে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে আরব-পারস্য অঞ্চলের রচনার অনুবাদ হিসেবে এসব সাহিত্য সৃষ্টি হলেও এতে ব্যক্ত হয়েছে বাঙালিরই জীবনাচার, জীবনবোধ ও তাদের আনন্দ-বেদনার মর্মকথা। দেশজ উপাদান আয়ত্ত করেই এগুলো হয়ে উঠেছে অনেক বেশি মনোজ্ঞ, হৃদয়গ্রাহী ও বাংলার নিজস্ব সম্পদ। তিনি যথার্থভাবেই চিহ্নিত করেছেন ওই কবিদের ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালিত্বের আদর্শকে।

সমগ্র লেখকজীবনজুড়ে একদিকে তিনি যেমন উপনিবেশবাদের উচ্চম্মন্যতার বিরুদ্ধে নিজ সাহিত্য-সংস্কৃতির সমৃদ্ধিকে উপস্থাপনের মাধ্যমে স্বাজাত্যবোধের পরিচয় দিয়েছেন, অন্যদিকে তেমনি দেশীয় পটভূমিতে উচ্চশ্রেণির সংকীর্ণ মানসিকতার বিপক্ষে নিম্নবর্গের উদার বোধের প্রতি দেখিয়েছেন যথার্থ পক্ষপাত। তিনি বাঙ্গাল হিসেবে কখনো হীনম্মন্যতায় ভোগেননি, বরং নিম্নবর্গীয় বাঙ্গাল জীবনের সমৃদ্ধ সংস্কৃতি, বাঙালি সংস্কৃতি, নিয়েই গর্ব অনুভব করেছেন। সুত্র: প্রথম আলো    

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>