বোবা বালক আমপাতার মুকুট : জহর সেন মজুমদারের কবিতা

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com
 
দাঁড়কাক ; শুধু দাঁড়কাক
 
নিজের লেখার ঈশ্বর,নিজের লেখার মাংসভুক শকুনের কাছ থেকে কতদিন তিনি নির্বাসিত! এ আসলে যক্ষের নির্বাসনদণ্ড নয়, তাই প্রভুর দেওয়া শাস্তির মতো এর কোনো সুরাহা হয় নি। কিন্তু যে কবি নিজের জন্মদিন রোজ একটু করে ভুলে যান,তিনি সমকালের কাছে কংসের কাটা মুণ্ডের মতো , পৃথিবীর কোনো সুদর্শনচক্র তাঁকে ভুলতে পারে না । কেবল তিনি নিজেকে অস্বীকার করে প্রথা,মিথ,চিত্রকল্প —-বানরীর মূর্খ চামচ হিসেবে কবিতার দড়িদড়া সমস্ত ভেঙে ফেলেন ।নিজের পীতবসনের এক ফালি উত্তরীয়টুকু কেবল রেখে সব ভুলে যান ,খিদে তেষ্টা আগুন। আর ভুলে যাওয়া মাত্র ভূমিকম্প হয়,কেঁপে ওঠে চেয়ার টেবিল ফুলদানি। বালিশের ওয়াড়গুলো খুলে আর কিছু পরানো হয় না,কেবল একটা কবিতার অধর তার ওপর শুয়ে থাকে আজানুলম্বিতকাল।বাটি নামের কবিতাটি এরকম :
— তুমি কোথায় আমরা এখনও জানি না
—- তোমার ঠি কানা কী,তা ও জানি না
—-তবুও তোমায় বলি
—শোনো
— তোমার জগজ্জননী ভাঙা বাটি হাতে
—- রাস্তায় রাস্তায় ভিক্ষে করছে
—- তোমার প্রেমিকা গলায় দড়ি দিয়ে
—- হঠাৎ ই আত্মহত্যা করেছে
—- আজ আমরা সবাই দেখলাম
—- তোমার ভাঙা বাড়ির একটা জানলা
—- পাগলের মতো উড়ে যাচ্ছে
—- দিগন্তের পর দিগন্ত
— পার হয়ে উড়ে যাচ্ছে
—- তোমার দিকে ; শুধু তোমার দিকে (দাঁড়কাক ; শুধু দাঁড়কাক / তবুও প্রয়াস ,২০১৭)
লাইনগুলো অপৌরুষেয়। লাইনগুলো পুরনো টানেল পেরোতে চেয়েছিল। লাইনগুলোর কোনো অভিভাবক নেই,বাংলা কবিতা এদের স্বীকার করেনি। এরা জবালার কানীন সন্তান। সংক্ষিপ্ত কথারএকটা অংশ ভেঙে পরের অংশে লেখা ,বা ভাঙাস্বর অন্য কোনো একদিন আবার ডাক আসবে, তখন সে বা অন্য কেউ হয়ত আরো কিছু বলবে।
Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com
◦ বাংলা কবিতার গদ্য জহর সেন মজুমদারকে গ্রহণ করেনি।এর প্রধান কারণ ভ্যাদভ্যাদে গীতল ‘কাব্যি’ র তাবেদারি করেননি তিনি।কবিতার সচেতন পাঠককে তৃতীয় বিশ্বের পুঁজিবাদী প্রবণতাগুলোকে আলাদা ধ্রুপদী সংকেতে বলেছেন।আমরা বুঝিনি সেই সংকেত।
◦ যৌনতার রাজনীতি যেমন দুরূহ সন্ধাভাষায় লিখতে হয়,তেমনি প্রাতিষ্ঠানিক থাপ্পর ও যে অবজ্ঞা করতে পারে,তার কাছে সরস্বতী বাঁধা হয়ে থাকেন।মহাকালের রথ তাকে পিষ্ট করে না,চাপা দেয় না,সেই কলমের ফলা শব্দকে নতুন সীমানা দেয় ।কাব্যভাষা যুগের তৃতীয় একটি স্তর বা শ্রেণীর বয়ান নির্মাণ করে নেয়।ইহুদীহত্যার সামনে দাঁড়িয়ে কবি যেমন নিজেকে বেপরোয়া করে হতে দেন,অনেকটা সেরকম।
◦ তাঁর কবিতা একই সঙ্গে গল্প এবং গল্প ভাঙার গল্প ।আখ্যানকে ইঙ্গিত করে শব্দার্থে নতুন গজানো ডানা ভাষার দূরবর্তী নির্ভাষটুকু ধরে আনে যা গল্পের বিরুদ্ধমুখ, তা ই কবিতার এক তৃতীয় ভাষ্য। বলা যায়,উপেক্ষিত তৃতীয় বিশ্বের সেই স্বর,আসলে তা সমকালীনতাকে আঘাত করে নিজের বক্তব্যের আসল তাৎপর্য ছুঁতে পারে। যেমন মৃত্যু কবিতাটি ,”দাঁড়কাক;শুধু দাঁড়কাক” বইয়ে।
◦ ‘নুন ‘কবিতায় যে অন্য বাস্তব এসে গেল,তাকে দূর থেকে দেখলাম আমরা। কিন্তু তার প্রতিটা বাচ্যের বন্ধ্যা মুহূর্তে আছে আর কারও কন্ঠস্বর ।কবিকে সম্বোধন করে কথাগুলো বলা হয়েছে,যা কবির বুকের ভেতর দিয়ে ঢুকে এফোঁড় ওফোড় হয়ে যায় ।কে বা কারা যেন হুমকির চালে এগুলো বলে।কে? যে বলে আর যাকে বলে দুজনেই এক লোক। তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে দেখা, চোখ মারা,গালি দেওয়া — কবিতার প্রথাগত সমস্ত ন্যাকামি টেনে ফেলে দেয় । একই কারণে কবিতার বইয়ের উৎসর্গপত্রে কবি লেখেন:
◦ তুমি গানওয়ালা — আমরা কখনো তোমার গান শুনিনি
◦ তুমি পাখিওয়ালা — আমরা কখনো তোমার পাখি দেখিনি
◦ তুমি কবিওয়ালা — আমরা কখনো তোমার কবিতা পড়িনি
◦ “তুমি” বলতে এখানে এক শ্রেণীহীন গোষ্ঠীর প্রতিনিধি,যার কোনো নাম নেই,কেন্দ্রীয় দল নেই,জনতার পাশে কেবল তৃতীয় একটা আইডেনটিটি। কাজেই সে তো দাঁড়কাক ছাড়া কিছু নয়।
◦ রোম্যান্টিক মসৃণতার পরিবর্তে মেদহীন রিক্ত চামড়ার ঘা খুলে দেখালেন এই উপায়ে:
◦ — কী কবিতা লিখেছ তুমি?
◦ —- পা কাটা বাবা
◦ —— হাত কাটা মা
◦ —- মুণ্ডু কাটা বোন
◦ কবিতার কোনো বিগত যুগের নস্টালজিয়া এখানে বিঁধে নেই।তাই বাচ্যে যে লেখা কবিকে প্রশ্ন করে,তার মধ্যে যে অপমান ও ধিক্কার লেগে আছে,তা কবি স্বচ্ছন্দে গ্রহণ করছেন ,যেন সেটাই তাঁর প্রত্যাশা ছিল।সংলাপ বা কথোপকথনের মুদ্রায় বহন করেছে বহুস্তরীয় বয়ান।পঙ্গুত্ব আসলে প্রতিষ্ঠানের দাবি,সমাজের দাবি যে তুমি “আমাদের” মতো নও বলে তোমার মা বাবা বোন এরা অশক্ত,অঙ্গচ্যুত হবে।এদের স্থান “আমাদের” চেয়ে নীচুতে। একইরকম আরেকটি কবিতার প্রসঙ্গে আসি,’অন্ধকার; গৃহসন্নিকটে’ বইটির “আশাবাদ “শীর্ষক কবিতাটি ছিল এইরকম —-
◦ “তুমি আমাদের জীবন দিয়েছ; আমরা ভিখারি,আমরা কাঙাল,তোমার হাতে
◦ আমাদের এই জীবনরহস্য তুলে নিতে এসেছি; আমরা আজো হিজলের বাড়ি
◦ পাইনি ; আমরা আজো ডাকবাক্সভর্তি স্বপ্ন পাইনি…”
◦ এখানে “আমরা” আর “ তুমি” পৃথক অস্তিত্বের দুই প্রান্ত।ন্যারেটিভের একই প্রকরণ,তবে স্পষ্ট করে কবি আগের কবিতার মতো সংকেত করেননি এখানে। তুমি বলতে “বাংলার চিরন্তন মেয়ে” আর সে একক ও স্বতন্ত্র। বাকি পুরুষের কোনো স্বাতন্ত্র্য নেই।আসলে কবির অভ্যন্তরীণ মননে স্ত্রীসত্তার এক গহীন যোগসূত্র সংবেদনায় সৃষ্ট হয়েছে ।যেন অর্ধনারীশ্বর , নারী ও পুরুষ দুই সত্তার অভিনিবেশ স্পষ্ট।
◦ কবির অচল রচনা যেমন মৃত,তেমনি সে ও নিরুদ্দেশ — অর্থাৎ, এটা পৌনপুনিকতার মোটিফ বহন করছে।কবির থাকা বা না-থাকায় আমাদের কী বা আসে যায়! পাখিরাও আজ “আমাদের” হিংস্রতার হাতে শারীরিক ক্লীবত্বে এসে পৌঁছিয়েছে।”সর্বত্র সবরকম পাখিদের হিজড়ে করবার ষড়যন্ত্র “ বলামাত্র প্রাতিষ্ঠানিকতার বিরুদ্ধ এক প্রতিবাদ ওঠানো হল। কবির প্রতি-উত্তর আসলে পুরোটাই বে-দস্তুর মতো আপত্তি।কিন্তু তিনি পূর্ণমাত্রায় ওয়াকিবহাল যে,কবিতার ঈশ্বরী পরিত্যাগ করেছেন “আমাদের”। তিনি ভাঙা বাড়িতে বাস করেন,কিন্তু কেউ সেখানে যেতে পারে না। তাই তিনি কাউকে দেখা দেন না, শ্মশানের সৎকারকর্মীর কাছে মাত্র একবারের জন্য ছাড়া। যুগের সমাজ প্রতিবেশের সাক্ষ্য হিসেবে নয়, উল্টে কবি যখন আগামীকালের কথা সংকেত করেন, সেই যুগান্তরের কথা একাল সহজে নিতে পারে না। কিন্তু কবি তো সেই মনীষার অধিকারী যিনি, নতুন মুদ্রায় নিজের ভিন্নতর এক অস্তিত্বের কথা বলেন ,যে অস্তিত্ব নিজের চেতনরাজ্যে ও অজানা ,কবি তাকে নিজেও জানেন নি এখনও ।কালো কাকের কর্কশতা ভেদ করে কোনও পাঠক নিশ্চয় কবিকে একদিন সনাক্ত করে নেবেন।
Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com
 
২.
“আদি ও অনন্তকাল”
 
আত্মজীবনীর এক জায়গায় কবি বলেছেন,”আজকের বিশ্ব আসলে এক কুহকবিশ্ব, এই বিশ্বে আসল বলে আর কিছু নেই,সব নকল,সবটাই নকল; বদ্রিলার এও বলেছিলেন— একটা সময় আসবে,যখন কোনটা আসল আর কোনটা নকল,এই পার্থক্য করবার বোধটাও আমাদের আর থাকবে না; নকলের মধ্যে থাকতে থাকতে অদ্ভুত ছায়াভ্রমে মনে হবে নকলটাই বুঝি বা আসল… মানুষ কেন চিনতে পারে না এই নকলকে?[হৃল্লেখবীজ ,দমন ও প্রত্যাখ্যান ,পৃ ৩৮ ]Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com
জহর সেন মজুমদারের কবিতা কোনো রাজাকে প্রণাম জানায়নি,কোনো আমলাতন্ত্রের পোষকতা করেনি,নিজের লেখার কোনো বিজ্ঞাপন বা মুসাবিদা ও তাঁকে কলঙ্কিত করেনি।তাঁর কবিতা ,মৌলিকভাবে তৃতীয়ত্ব কে ধারণ করে,যে যাযাবর,যার কোনো পায়ের তলায় মাটি নেই। অথবা,সে ই একমাত্র প্রকৃত গৃহস্থ,যেমন দাঁড়কাক।এই অকাব্যোচিত কালো পাখিটি গৃহস্থের সবচেয়ে কাছের হয়ে ও সবচেয়ে অত্যাচারিত জীববিশেষ।উপেক্ষা বা ঘৃণা ছাড়া এদের দেবার কিছু নেই। কিন্তু আসলে, একটি কাক সবচেয়ে বেশি ধৈর্য নিয়ে বাসা তৈরি করে,সবচেয়ে বড় মা বলে,অন্যের সন্তানকে বীজাকারে শরীরের ওমে বড় করে তোলে ।চাঁদ কবিতায় কবি যেখানে বলেন—-
“ …
—- তোমার কবিতার ভিতর একটা লাশকাটা ঘর ছিল
—- লাশকাটা ঘর,একটা লাশকাটা ঘর
—- লাশকাটা ঘর, একটা লাশকাটা ঘর
—- একজন মৃত ময়ূর এইখানে যৌন হল
—- একজন মৃত ময়ূরী ভয়ে ভয়ে দৌড়ে পালাল
আর মাথাভর্তি চাঁদ ফেটে গলগল রক্ত পড়ছে “ চাঁদ/ পৃ ১১, ঐ লাইনগুলো মনে করিয়ে দেয় গীয়র্গ ট্রাকল্ এর Evening Land কবিতাটি,যেখানে কবি চাঁদের প্রতি বলেন,” A moon, as if a thing dead/ Emerged from a blue den “(Sebastian Dreaming,Georg Trakl ).
জীবনানন্দের “আট বছর আগের একদিন “ কবিতার অনুষঙ্গের ভিন্ন জাতীয় একটা প্রয়োগ এল।প্রতিটা ড্যাশচিহ্ন একাধিক ও অজস্র স্বর বোঝায়,যারা কবির কেউ নয়।তারা তাদের না বুঝতে পারা বোধের প্রথাগত গমকটুকুর মধ্যে কবিকে ধরাবে। কিছুতেই নিজেদের সিনট্যাক্স বদল করবে না।বহুস্বর, কিন্তু একজন ও দীক্ষিত পাঠক নেই কবির। স্বরবৃত্তের মিল দেওয়া ছড়া বা গানে বসানো গোঁজামিল ব্যতিরেকে আমরা আর কবিতা বুঝলাম কই! তাই প্রতিটা ছত্র কেন্দ্রচ্যুতি বোঝায়,বিরুদ্ধমুখ সংবেদনের এই পরম্পরা প্রবাহ থেকে , আখ্যান থেকে কবিকে নির্বাসন দেয়।কবিতায় কবির অনুপস্থিতি কেউ নিতে পারে না।বদ্রিয়ে তাঁর সাম্প্রতিক চিন্তায় বলেছেন,”When I speak of time,it is not yet/ When I speak of a place,it has happened/ When I speak of a man,he ‘ s already dead/ When I speak of time, it already is no more “; Raymond Queneau রচিত রচনার সামান্য পরিবর্তিত অভিমতের সাহায্যে তিনি আমাদের ভিতরের সময়ের মাপ বুঝিয়েছেন।কবিতায় এহেন নিরপেক্ষ অপর হয়ে থাকা সচেতন সত্তাকে পাঠক কিছুতেই স্বীকার না করায়, রোম্যান্টিক ও এ্যান্টিরোম্যান্টিক কবিতার পয়ার এর বাইরে আমরা ভিন্ন কাব্যভাষার গুরুত্ব লক্ষ করিনি। জহর সেন মজুমদারের লেখা তাই কেবল এ্যান্টিপোয়েট্রি নয়, ওটা পাঠকের সমগ্র অবচেতনের চিৎকার।
Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com
‘নুন’কবিতায় কবি নিজে নিরুদ্দেশ।কার বকলমে তিনি পৃথিবীময় বিচরণ করছেন,কার কন্ঠস্বর নিয়ে কবিতায় তাঁর কান্না বেজে উঠছে,তিনি চুপ করে যাচ্ছেন,স্বেচ্ছানীরবতা ই তাঁর অস্ত্র। বলা যায়,কিছুটা ব্যাহত মাংসের মতো নিজের ত্বকের জমি কেটে ফেলে দিতে পিছ-পা নন আর।প্রেমিকার
লাশের সামনে ও তিনি অবশ, অদৃশ্য,বোবা । “তুমি কোথায় আমরা এখনও জানি না” — এই বক্তব্যের সূত্র ধরে সর্বজ্ঞতাকে খণ্ডন করা হল ।অর্থাৎ যে কবি ফেরার, যে কবিকে চিনবে না কেউ; যার মন্ত্র উপবীত কিছুই নেই — সে আবার কবিতা লিখতে পারে নাকি! দাহক্ষেত্র বলতে তাই কবি নিজেদের পচা স্নায়ুতন্ত্রের নলকে বোঝেন, “এই গান আমরা আর গাইতে চাই না”, এটাই কবির শেষ হওয়া আত্মচরিত্র।জগদীশ গুপ্তের শটিত জীর্ণ বইগুলো,যা কিনবার কেউ নেই — উত্তরকালের সমস্ত ক্লীবতা আত্মসাৎ করে তারা শেষ হয়ে গেছে।প্রবাহ থেকে বেরিয়ে যে সব লেখা ভিন্নগোত্রের, তাদের কোনো কালেই কোনও পাঠক নেই।
 
৩.
“মেঘ রৌদ্র কবিতা “
হৃল্লেখবীজ এর “মনখারাপ ভাসমানতা “অধ্যায়ের সাত পর্বে কবি লিখেছিলেন,”শাশ্বত মহাজগতের ভেতরে তাহলে কি এভাবেই উল্টে আছে সব? চিৎ হয়ে আছে সব ?”
বের্ট্রান্ড রাসেল প্রসঙ্গে অসভাল্ডো ফেরারিকে বলেছিলেন বোর্হেস,Reality is always anachronistic — আজকের সঙ্গে আগামীকালের নিদারুণ ব্যর্থতা নিয়ে জহর সেন মজুমদারের কবিতা প্রথাগত তান,লয় ভাঙলো না কেবল; ছন্দের গতিতে রোম্যান্টিক আত্মকণ্ডূয়ন ভেঙে নতুন রাস্তা নির্মাণ করলেন। কিন্তু পাঠক তো কবির কাছে প্রাতিষ্ঠানিক স্বর ই চায়,চায় গোগ্রাসে আর্তনাদ বা রগরগে সর্বহারার যকৃতের গোঙানি।আর কবি পুরনো লাইন ভেঙে, বাসি তরকারি ফেলে দিয়ে ,নারীপুরুষের রিপুতাড়িত ছক নষ্ট করলেন। আখ্যানকে বিন্দুর মাপে রেখে তার শেষ টা ঢেলে সাজালেন।যতিচিহ্নের প্রয়োগে বিপ্লব এল ।জাঁ বদ্রিয়ে বলেছিলেন,” But disappearance may be conceived differently: as a singular event and the object of a specific desire,the desire no longer to be there,which is not negative at all.”প্রযুক্তিবিশ্বের তূরীয় ক্ষমতা অনুযায়ী মানুষের শক্তি এতটাই বর্দ্ধিত যে, সময়ের পরম্পরাগত হ্রাস নেই তার।জহর সেন মজুমদার এই সাহিত্যচক্রের উল্টো মুখে কবিতা লেখেন।পাঠক নেই বলেই তাঁর লেখায় অনুপস্থিতি আরো প্রকট হতে পারে, বিস্ফোরণের মতো।Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com ১৯২০ সালে প্রকাশিত তত্ত্বে সিগমুণ্ড ফ্রয়েড এরোস এর পাশে থ্যানাটস এর প্রসঙ্গ আনলেন ।বললেন
Sexual drive এবং death drive যা নিজের এবং অপরের প্রতি ধাবিত হয়,তার বিস্তারিত বিশ্লেষণ করলেন।কবির অকাব্যিক ভাষা এক দিকে সেই আত্মধ্বংসের পরিকল্পিত নির্মাণ।তাঁর মেদহীন গদ্য কবিতার পাঠককে কমলকুমারের গদ্যের মতো ভাবিয়ে তোলে ,মীমাংসা করে না। আয়োজিত নির্জিত প্রৈতির মধ্যে থেকে উঠে আসে বৃত্তচ্যুতি ,যা কবির কথনধর্মী সংলাপের বৈশিষ্ট্য ।যদি এভাবে বলি যে, পোস্ট- স্ট্রাকচারালিস্ট্ এর চোখে রোলাঁ বার্তে র “ইমেজ মিউজিক টেক্সট” যে স্বরান্তরে আস্থা রেখেছিল,এ হল তাই ।প্রশ্নকর্তার প্রশ্ন আর উত্তরদাতার উত্তরের কোনো মিল নেই।বরং লেখক নিজেও কবিতার ভেতরে কেবল পাঠক হয়ে অবস্থান করেন। তাই দেরিদা কথিত doubling commentary কবিতার কন্ঠস্বর বদলে দিয়েছে বলে আমাদের বিশ্বাস।
 
তথ্যসূত্র ।।
১ হৃল্লেখবীজ / জহর সেন মজুমদার ,বুকস স্পেস,২০১২
২ দাঁড়কাক শুধু দাঁড়কাক / জহর সেন মজুমদার
৩ অন্ধকার; গৃহসন্নিকটে / জহর সেন মজুমদার
৪ Conversations/ Jorge Luis Borges, pg 137,translated by Tom Boll ,Vol 2/ Seagull books
৫ Why hasn’t everything already disappeared? / Jean Baudrillard ,translated by Chris Turner, Seagull books
৬ Sebastian Dreaming / Georg Trakl
৭ Beginning Theory / Peter Barry ,first Indian edition 2010/Viva books
৮ দশদিশ / শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায়,গাঙচিল,২০১৪
৯ New Left Review,July august 2011/ “ Potemkin Republics”, Bolivar Echeverria
১০ A lover’s Discourse/ Roland Barthes,translated by Richard Howard,paperback ed 2010.

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত