দূর্জয়ের একগুচ্ছ কবিতা

দুর্জয় আশরাফুল ইসলাম

ঘাটের কথা

অহেতুক গল্পোচ্ছলে চন্দ্ররাত্তির নিয়ে অপেক্ষায় থাকা মুহূর্তদের
আমিও লোভাতুর কোন রহস্যের ইংগিত দিতে চাই বলে,
আগেভাগে চলে যাবো বিকেলের ট্রেনে কোন, অগুনতি মানুষ
ভিড় করে আছে যদিও, আমি ঠিক খুঁজে নিবো একার ভাবনা,
অশথের নিচে মনমরা হে অনন্ত সিঁড়ি ঘাট, বুক পকেটে আছে
কি সব মনোহারী, এই ভিড় আর জনস্রোত, কেউ টের পাবে না।

*
ট্রেন থেমে গেলে পর চলে যাবো নিরুদ্দেশ দূর সকলের থেকে
একটা বৈঠাহীন নৌকা বাঁধা আছে যে ঘাটে, সে ঘাটকে বলবো
তোমার কথা; একদল রাজহাঁস তাড়িয়ে বেড়াবে জলস্রোত –
তাদের ডেকে বলবো স্মৃতির দস্যুতা, অমোঘ কেন ডাকে চোখ
ডাকতে ডাকতে ভেঙে পড়ে রাজকুমারীর প্রাসাদ, শব্দহীন ;
এমন ভঙ্গুর, এলিয়ে যাওয়া নির্জনতা নিয়ে লিখে ফেলবো কবিতা।

*
ঘাট থেকে ঘাটে ছুটে বেড়াবো। জল থেকে জলের দূরত্ব জেনে
তোমাকে বলবো জলের সমান্তরাল অরণ্য গল্প, অহেতুক দেশের
কোন এক নির্মেঘ অন্ধকারে তোমার মুখের অনুরুপ চাঁদ ভাসা এক
টান, স্বতস্ফুর্ত আকাশের মতো ঝুলে থাকে পৃথিবীর কার্ণিশে; আর
আমি একা নিমগ্ন থেকে উঠে বারংবার ফিরে আসি তোমার কাছে
নির্বোধ কোলাহল কোনোদিনও না জানে।

 

বৃষ্টিজলের কথা

জানলা ভাঙা বৃষ্টি জলের আঁচের মতো এসে পড়ে অনেক কথা
কিছু বলবার আছে, কিছু বলা হয়ে গেছে,
কোনদিন হবে না বলা এমন সব কথাও।
স্তব্ধ পুকুরের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে লুক্কায়িত ছটফটানি
বহুদিন বহুদিনের কান্নাহাসি, মনমরা বিকেলের মতো যতো
সঞ্চিত আছে বিলুপ্ত পৃথিবীর উত্তাল-পাতাল আর নিস্তরঙ্গ কথা।

এই পৃথিবীতে তুমি আমি আমরা এসে হারিয়েছি আরো কত পৃথিবী
নিঃশব্দ দহনের নিচে ফেলে এসেছি কতো গান,
দেশলাই বাক্স থেকে খসে পড়া চিঠির মতো আমাদের স্বপ্ন যতো
আবছায়া অতীতে মিলিয়ে গেলে আমরা হয়েছি পাখি –
ডানাহীন উড়বার তাড়া নিয়ে এক আকাশ ব্যতিব্যস্ততার নীচ;

প্রতিবার বৃষ্টিজল, জানলা ভাঙা নিশ্চিদ্র শূন্যতায় ঢুকে পড়ে
প্রবাহমান জীবনের বোবা হাহাকারের ‘পর আরশি খেলে দেখায়
প্রতিবিম্বিত নক্ষত্রের দিন-রাত্রি ; সোনালী মৌমাছি উড়ন্ত খেলা।

 

তর্পণ

খুঁজতে বেরিয়েছি স্মৃতিময় আখ্যান, উৎসর্গিত মন্দির
হাতড়ে নিচ্ছি বই পত্তর, দিনপঞ্জির যা কিছু মেলে
কোথায় হারিয়ে এসেছি সেসব অমৃতকথা, গীতপুঞ্জ
নিরুত্তর হাওয়া বয়, আরো পাতা উলটে যায় স্বয়ং
নীল মৃত্যুর যত আখ্যান লিখা আছে বৃক্ষমূল, শরীরে
সে সব আবছা প্রকাশ্য হয়, শোক সন্তপ্ত পটভূমিতে
তুমি নিজেও দৌড়ে বেরিয়েছো বেদনার সর্বমূল নিয়ে
অন্ধকার বিষের মতো কতশতবার চুম্বনসিক্ত করেছে
তোমার ঘুম, জাগরণ আর আঙুলের অগ্রভাগকে –
তুমি মুখ ঘুরিয়ে শুধু বলতে চেয়েছো দূর দর্শিত সুন্দর
সে সব ভাষ্য খুদিত হয়ে আছে পাথরফলকের মতো
তুমি, তোমার সর্বনাম খেলা করে আজ উপবন ধরে,
আর আমি খুঁজতে বেরিয়েছিলাম অন্য কিছু, স্মৃতিত
তর্পন, তোমার বাঁশরী তে বাঁজা সুরে সুর ধরে সারাক্ষণ

 

নির্মোহ দৃষ্টিপাত

নির্মোহ আকাশের নীচে পড়ে আছে মৃত মাছের চোখ জোড়া,
রোদে চিকচিক খেলা একটা পাথুরে নদীতে ভাসছে সর্বনাম,
কার মুখ জড়িয়ে আছে সেই চোখের মণিকোঠার ঠিক ভেতর,
যে জানে সে আজ মায়াঘোর অন্য পৃথিবীতে দীর্ঘঘুম অচেতন
ঈশ্বরী হয়ে আছে, সে জানে না এখানে অনেক কান্না বরফ হয়ে
আনমন প্রতীক্ষায় আছে যদি ফিরে আসে কুকুর টানা শ্লেজ,
খুচরো এক দুপুর কাটাবে বলে, আর আঁচড়ের থেকে উঠে জল

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত