Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,eid-2021-bangla-golpo Atoar Rahman

ঈদ সংখ্যার গল্প: সমীকরণ । আতোয়ার রহমান

Reading Time: 9 minutes

রানা বাইরে থেকে ঘরে এসে কাপড় চেঞ্জ করেই সোজা কিচেনে চলে গেল। শেফ এর ড্রেসটা পরে  ফ্রিজ থেকে মাছ ও সবজি বের করে পাটাতনের উপর রেখে কাটতে লাগল। কিচেন থেকে ঝলসানো মাংসের গন্ধে ভরা ঝাঁঝাল ধোঁয়া ভেসে আসছে। তরকারির কড়া সুবাস রুমার জীভের নিচে একটা শিহরণ ছড়ায়। পাতলা একটা লালার স্রোত জীভের নিচ দিয়ে বয়ে গিয়ে তার মুখ ভরিয়ে দেয়। এটা সেটা নামানো বসানোর আওয়াজ সোফায় বসে টিভি দেখতে থাকা রুমার কানে আসছে। রান্নার শব্দে বিরক্ত হয়ে গলা ঘুরিয়ে রানাকে দেখে বলল, তোমাকে দেখতে রিনা খালার কাজের বুয়া রেহানা খালার মতো লাগছে। ওনার মতো ফার্স্ট ক্লাস বিরিয়ানি খিচুড়িও রান্না করতে শিখেছো।

উনুনের মতো গরম রান্নাঘর থেকে খুন্তি হাতে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে রানা বলে, “বেগুন দিয়ে ইলিশ মাছের তরকারিতে না ঝোল একটু বেশি হয়ে গেছে। একটু জ্বাল দিলে ঝোল কমে যেতো, কিন্তু তাতে মাছটা গলে যাবে। তুমি তো আবার পাতলা ঝোল পছন্দ করো না, কোন সমস্যা হবে তোমার?” কথাগুলো বলার সময় রানার কপাল বেয়ে নায়াগ্রার ঝর্ণাধারার মতো ঘাম ঝরছে।

রুমা রাগ চেপে মুখে হাল্কা হাসি রেখে বলল, “সমস্যা হবে না। তবে দরকার কী বলো এতো কষ্ট করার? তুমি কেমনে পারো সব সময় রান্না-বান্নার এইসব উটকো ঝামেলা নিয়ে ব্যস্ত থাকতে? আমি দু’চক্ষে তোমার এসব দেখতে পারি না। আমার গা জ্বলে। অসহ্য!

রানা নিস্প্রভ হয়ে যায় রুমার কথা শুনে। এর জন্য প্রস্তুত ছিল না। প্রশংসা শুনবে কি, না তাকে তিরস্কার শুনতে হচ্ছে। হেঁসেলের কাজে আবার মনোযোগ দিতে দিতে বলে, “ঘরের কাজ নিজের হাতে করলে শরীর মন ভালো থাকে, ডিপ্রেশন কাছে ভিড়তে পারে না। আমি এক্সারসাইজ ভেবে এ কাজটা করি।”

রানা হরেক পদের তরকারি রান্না করে, একটা গামলাতে করে লাঞ্চের জন্য সেগুলো ডাইনিং টেবিলের ওপর রেখে এল, মাংসের বাটিটা রেফ্রিজারেটরে রাখল। ফেলে রাখা অধোয়া থালা-বাটি ধুয়ে রুমার পরিস্কার করা ঘরের মেঝেটি আবার ঝাড়ু দিয়ে, ছোট বাচ্চাটিকে শাওয়ারে নিয়ে যত্ন করে গোসল করিয়ে দিল। গোসল করাতে করাতে বললো, “বাচ্চার শরীরটা কি ময়লা হয়েছে বাপরে বাপ।” গোসল শেষ করে বাচ্চার দুধ বানিয়ে বোতলে ভরে রাখল। রুমা ও তার নিজের লন্ড্রিতে ধোয়া ও শুকানো কাপড়গুলি ইস্ত্রী করে, নিজের জিনিসপত্র গুছিয়ে রেখে ক্লান্ত শরীরে সোফায় গাটা একটু এলিয়ে দিল। আচমকা আড়াই বছরের মেয়েটি প্রজাপতির মত রানার দিকে হাত নাড়তে নাড়তে দৌড়ে এল, বলল, “ডায়াপার!” “ঠিক আছে, মামনি,” জোর করে মুখে হাসি এনে রানা বলে। ” মমির চেয়েও ভাল ডায়াপার চেঞ্জ করো তুমি। মমি মাঝে মাঝে আমাকে  চেঞ্জ করে দেয়, ঠিক তোমার মতো।” বাচ্চাদের একটা সহজাত ইন্দ্রিয় আছে সব কিছু আঁচ করার। কোনরকম জড়তা ছাড়াই নোংরা ডায়াপার পরিবর্তন করে রানা তাকে কোলে নিয়ে দোলা দিয়ে গান শুনিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিল। হইচই করা শিশুটি দ্রুত চুপচাপ হয়ে গেল। শিশুটির ছোট্ট শরীরে ঝাঁকুনির সাথে সাথে তার দেহের মিষ্টি ঘ্রাণে শ্বাস নিল, সে কান্নাকাটি করল না, চুপচাপ হয়ে গেল। রানার গা ঘামছে, হাতে ব্যথা হচ্ছে, কোনদিকে ভ্রূক্ষেপ নেই তার। যেন বাইরের এক জগতে এনে নিজেকে ফেলেছে সে। বাবাকে এ ভাবে পেয়ে বাপ সোহাগী মেয়েটি খুব খুশি। গলা জড়িয়ে সে বলে, “তুমি সব থেকে ভাল বাবা।” মেয়ের মাথার চুল ঘেঁটে শুকনো গলায় রানা বলে, “তুমিও আমার সব থেকে ভাল মা।” বাবাকে এ রকম কখনও দেখেনি। বাবা এখন সব সময় বাড়িতে আছে, লুডো খেলছে, মুখোশ মুখোশ খেলছে আবার মায়ের সঙ্গে হাতে হাতে কাজও করছে। বেশ আনন্দে আছে সে। 

এসব রুমার দৃষ্টি এড়ায় না। ফুচকা খেতে খেতে সিরিয়াল দেখে রুমা বিরক্ত স্বরে বলে, “বাহ! বেশ। তুমি আমার চেয়ে একজন ভাল মা হয়েছো। মেয়ে আমার ডাক অগ্রাহ্য করলেও  তোমার ডাকে সাড়া দেয়। একজন সিনিয়র ডে-কেয়ার ওয়ার্কারের মতো যে নিপুণ ভাবে ডায়াপার পরিয়ে দিলে! আমি জীবনে এত সুন্দরভাবে বাচ্চাদের ডায়াপার পরানো দেখিনি। কন্সট্রাকশন ফার্মের চাকরি বাদ দিয়ে ডে-কেয়ারের চাকরি নিলেই ভালো করতে। বলি, সারাদিন যদি এভাবে ঘরের মেয়েলি কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাক, তবে অফিসের কাজ করবে কখন? রান্না ও কান্না কেবল মেয়েদেরই সাজে। তোমার এসব দেখে গা জ্বলে আমার।”

“কেন রুমা? এসব কী বল? সংসারটা যখন দুজনের তখন কাজটাও তো দুজনকেই করতে হবে। আমি তো ম্যানেজারের কাজ করি। অফিসের পাশাপাশি ঘরের কাজও তো ম্যানেজ করতে হবে, না কি? অন্তত ছুটির দিনগুলিতে বসে শুয়ে আয়েস করে চর্বি বাড়ানোর থেকে হাতে হাতে একটু সাহায্য তো করতে পারি তোমাকে।” রানা ভিজে গামছা দিয়ে গা রগড়াতে রগড়াতে বলল।

রুমার চোখমুখ এখন লাল। রেগে গেলে ওর চোখ লাল হয়, আজও  হল, বলে, “ম্যানেজারি তো না, ওসব তোমার বাড়াবাড়ি, পাগলামি।”

“তুমি তো দেখি আমায় খারাপ সমস্যায় ফেলে দিলে,” জোর করে মুখে হাসি আনার চেষ্টা করে শুকনো গলায় বলল রানা। “এসব কী বল রুমা? তোমাকে হেল্প করতে হবে না? এদেশে এটাই নিয়ম। এখানে স্বামী-স্ত্রী উভয়ই বাসার কাজ ভাগাভাগি করে নেয়। মেয়েলি পুরুষালি বলে কথা নেই। স্বামী-স্ত্রী উভয়ের সন্মিলীত প্রচেষ্টায় সংসারকে এগিয়ে নিতে হবে। সভ্যতার শুরু থেকে এ পর্যন্ত যা কিছুই অর্জন হয়েছে তা উভয়ের সন্মিলিত প্রচেষ্টারই ফসল। এ কথাটি নজরুল ইসলাম সেই কবেই বলে গেছেন,

পৃথিবীতে যা কিছু মহান সৃষ্টি চিরকল্যাণকর

অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর।

তাই আমাদের একে অপরকে ভালোবাসা দিয়ে একসাথে পথ চলতে হবে। যাক, ঘরের কাজে তোমাকে সাহায্য করবো বলে প্যাটার্নাল লিভ নিলাম। বুঝলে এখন যুগ পাল্টেছে।”

“ঘোড়ার ডিম। ওসব তোমার মতো মেয়েলি পুরুষদের বানানো কথা। মেয়েরা ঘরের শোভা, পুরুষেরা বাইরের। আমার মা, দাদীদের দেখেছি, কত সুন্দর ভাবে ঘর সামলিয়ে স্বামী সোহাগী জীবন পার করে দিয়েছে। আমিও তাই চাই।”

“ওটা তোমার ভুল ধারণা। গৃহকর্মীরাও এখন আর বাড়ির কাজ পছন্দ করে না, তারা এখন গার্মেন্টে কাজ করে, অফিসে কাজ করে; সুতরাং বুঝতেই পারছো। ঘর বাহির এখন দুজনকেই সামলাতে হবে। তোমার তিন পুরুষ ঢাকার বাসিন্দা হয়েও এমন মানসিকতা দেখে আমার খুব কষ্ট হয় রুমা। তোমার ফেলে আসা পরিবারের প্রতি, তার সংস্কারের প্রতি তোমার ভালোবাসার অক্টোপাসের আট পায়ে আটকানো থাকলে এখানে কিছু করতে পারবে না।”

“তোমার কষ্টটা সেজন্য নয়। বউ এর ইনকাম খেতে পারছো না সেই জন্য। আমি চাকরি করছি না, আর তা দেখে তোমার মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। শুনে রাখ রানা, পশ্চিমা জীবনের গোলকধাঁধায় ডুব দিতে পারব না। আমি যে ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে উঠে এসেছি সেখানে আমাকে এটা অ্যালাউ করে না।”

“তোমার ইনকামের জন্য নয় রুমা। আমি চাই তুমি মেধার পরীক্ষা দিয়ে চাকরি পাবে, ঘরের বাইরে যাবে। এভাবে তুমি শক্তিশালী হও, জ্ঞানের চর্চা কর এবং মেধাবি হও। তোমার ক্যারিয়ার তৈরি হবে, পাশাপাশি আত্মবিশ্বাসও বেড়ে যাবে। চার দেয়ালের মধ্যে থাকলে তা হতে পারবে না।”

“দেখ রানা, আমি একজন মা হওয়া খুব বেশি উপভোগ করি, প্রতিটি নারীর পরম চাওয়া একজন মা হওয়া, সন্তানদের কোলে জড়িয়ে ধরে রাখা, তাদের ঠিকমতো লালনপালন করা। তুমি মনে করেছো আমি আমার বাচ্চাকে ঘরে ফেলে রেখে কাজে যাব? আমি আমার মাতৃত্বের সত্তাকে হারিয়ে ফেলে সস্তা টাকা ইনকামের গোলকধাঁধায় হাবুডুবু খাব? না।  ভালোবাসার আঁধারে সৃষ্টি হওয়া যে প্রাণ আমার জঠরে ঠাঁই নিয়েছে, সেই আগন্তক পৃথিবীর আলো স্পর্শ করেছে, হাঁটি হাঁটি করে এখন আড়াই বছরে পড়েছে। ওকে বাসায় রেখে কাজে যাব! না বাপু ওসব আমার দ্বারা হবে না। ও সবে হাঁটা শিখছে, আর একটু বড় হলে আমার রাজকন্যার মতো মেয়েটি সকাল বেলা আমার কোল থেকে লাফ দিয়ে নেচে নেচে পিঠে বইভর্তি ব্যাগ নিয়ে দৌড়ে দৌড়ে স্কুলে যাবে, দুই পাশে দুই লম্বা বেনী দুলবে, আমি ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে দূর থেকে চেয়ে চেয়ে দেখব… এর চেয়ে বড় আনন্দের আমার কাছে আর কী হতে পারে!

-হ্যাঁ, মাতৃত্বের মূল্যটা আমিও বুঝি। কিন্তু তাই বলে ক্যারিয়ারকে বিসর্জন দিয়ে!

-না তা নয়। বাচ্চা বড় হলে চাকরির কথা ভাববো। তাছাড়া আমার চাকরির প্রয়োজন পড়ে না। তুমি তো এখন একটা ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্মের ম্যানেজার। তোমার যা ইনকাম তাতে তো আমাদের ভালোভাবেই চলে যাচ্ছে। আমি যদি এভাবেই জীবন পার করি তাতে তোমার ক্ষতি কী?”

-“সংসার ভালভাবে চালিয়ে নেয়ার মতো যথেষ্ট উপার্জন আমি করি। আমার ক্রেডিট কার্ডের স্কোরও অনেক হাই। কিন্তু তুমি জব করলে আর একটু বেশি সেভিং হতো, জীবনটাকে আর একটু বেশি উপভোগ করতে পারতাম। দেখ পরিবারটা হচ্ছে একটা টিমের মতো। এখানে টিমওয়ার্ক কাজ করে, ওয়ানম্যান শো এখানে চলে না।”

-“তোমার এসব প্যাচাল রাখোতো।”

-“এসব প্যাচাল নয়, রুমা। তুমি বাস্তবতাটা বুঝার চেষ্টা করো। তোমার ঘরে বসে থাকার অন্য ক্ষতিও আছে। তুমি যদি মেধার চর্চা না করে স্বামী নির্ভর থেকে ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে নিজের জীবনটা পার করে দাও, সে ক্ষেত্রে তুমি আমাদের মেয়ের জন্য মোটেই ভাল উদাহরণ তৈরি করবে না। তাহলে  সেও তোমার মতন একজন ঘরকুনো ভীত মেয়ে মানুষ হবে; মানুষ হবে না। চরম প্রতিযোগিতামূলক এ দুনিয়ায় টিকে থাকতে পারবে না, শক্তিশালী হবে না।”

-“আমি নিজের ভালমন্দ যথেষ্ট বুঝি। আমাকে এ বিষয়ে তোমার জ্ঞান দিতে হবে না।”

-“জ্ঞান দিচ্ছি না। ভেবে দেখ  ওর জন্মের আগে আমাদের যে পরিকল্পনা ছিল তা থেকে তুমি দূরে চলে যাচ্ছ। তুমি সর্বদা অনড় ছিলে যে তুমি মা হওয়ার পরেও কাজ করবে। আমাদের বিয়ের আগে আমি তোমার সৌন্দর্যের পাশাপাশি মেধার প্রতিও আকৃষ্ট হয়েছিলাম। তোমার মধ্যে দেখেছিলাম উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং দৃঢ়তা। আমি এখন শুনে সত্যিই অবাক হচ্ছি যে ক্যারিয়ার তোমার জন্য আর তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়।”

-“ক্যারিয়ার আমার কাছে অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেটাকে আমি সন্তান জন্মদান ও লালন-পালনের ক্ষেত্রে বাধা হতে দেব না। দেখ রানা আমি কেবলমাত্র আমাদের মেয়ের প্রতি-ই যত্নশীল এবং এই মুহূর্তে আমার সমস্ত শক্তি সেখানে দিতে হবে। তুমি যদি আমাকে ভালোবাসো তবে আশা করি তুমি আমাকে এ কাজটা ভালোভাবে করতে দেবে।”

-“আমি তোমাকে ভালোবাসি এবং সন্মান করি। তোমার ওপর কোন সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে চাই না। কিন্তু তাই বলে চাই না যে আমার স্ত্রী একজন বাড়িতে থাকা মা হোক। তুমি তোমার পুরনো চোখে পৃথিবীটাকে দেখো না, নতুন চোখে দেখ, দেখবে অনেক নাটকীয় পরিবর্তন হচ্ছে সমাজে, সংসারে। সেগুলোর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলাই হবে স্মার্ট কাজ।”

-“আমি বাইরের কাজে, ক্যারিয়ারে ওভার-ফোকাস করে পরিবারের শান্তি নষ্ট করার মতো স্মার্ট হতে চাই না। বিরক্ত মুখে চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে রুমা বললো।” মনে হলো সে কোথাও বেড়াতে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

পুরান ঢাকার রক্ষনশীল পরিবারের রফিক চৌধুরীর মেয়ে রুমা। রুমার সাথে টরন্টো প্রবাসী রানার বিয়ে হয় পারিবারিক আয়োজনে। রফিক চৌধুরী ছিল রাশ ভারি লোক। তার স্ত্রী রাবেয়া ছিল পোষা কুকুরের মত বাধ্য। স্বামীর মন জুগিয়ে চলার বিষয়ে তার কোন জুড়ি ছিল না। রুমা দেখেছে  মা কোন দিন রাজনীতি করা বাবা রাতে বাসা ফেরার আগে একা ভাত খেত না। বাবা সারাদিন বিচার শালিস করে বেড়াত। মা খাওয়া সব সময় রেডি রাখত। তাদের দু’ ভাই বোনের দেখাশোনা তার মা-ই করত। বাবার সময় হতো না ওদের দেখভাল করার। রুমাও ওর মায়ের মতো একজন হাউজওয়াইফ হতে চেষ্টা করে। স্বামী সন্তানের জন্য সব কিছু উজাড় করে দেওয়ার জন্য তার মন উথালপাথাল করে। স্বামী সারাদিন অফিসে থেকে হাড় ভাঙ্গা পরিশ্রম করে তাদের অর্থের সংস্থান করছে। সুতরাং, সে কেন আবার  ঘর-গেরস্থালীর কাজ করবে? এ প্রশ্ন তার মাথায় চিংড়ি মাছের মতো লাফায়। মেয়েবেলাতেই রুমা বুঝে গিয়েছিল, সমাজে মেয়েদের কদর তাদের রুপে, ঘর গৃহস্থালির কাজ সুন্দরভাবে সম্পন্ন করার দক্ষতায়। ভালো না লাগলেও রুমা কিন্তু প্রচলিত এ নিয়মটি মেনে নিয়েছিলেন। এখনও তার মন নিজের পুরনো সংস্কার আঁকড়ে থাকতে চায়।

বিয়ে হওয়ার পর শুরুতে টরন্টোতে রানা ও রুমা হাবুডুবু করতে শুরু করেছিল। অজানা জায়গা, অচেনা পরিবেশ… একেবারে আটলান্টিকের ওপারে। ওদের কোন পরিচিত নিকটজন এখানে থাকে না, তাই গাইড করার মতো কেউ নেই। দোকান, বাজার-হাট কোথায় কি পাওয়া যায় সেই খোঁজ-খবর নিয়ে সপ্তাহান্তে টীটীসি বাসে চড়ে প্রজাপতির মতো এদিক সেদিক ঘুরতে ঘুরতে ওরা টরন্টো চিনতে শুরু করেছিল। জীবিকার সংগ্রামে, টিকে থাকার ব্যস্ততায় দুটো বছর যে কীভাবে কেটে গেল!

রানার অনেক গুণের মধ্যে একটা গুণ হল ও সাবলীলভাবে অনর্গল ইংরেজিতে কথা বলতে পারে। কম্পিউটারেও বেশ দখল আছে। তার এক বন্ধুর সহায়তায় কিছুদিন পর একটা রেস্টুরেন্টে কাজ পায়। পরে একটা কন্সট্রাকশন ফার্মে ম্যানেজারের কাজ জুটে। অফিসের কাজ আর ঘরের সে-ই রান্নাঘর-হেঁশেল এর কাজে ব্যস্ত থেকে গৎবাঁধা সাংসারিক দিনগুলি সাদামাটা ভাবে পার করা। কতদিন দুজন হাত ধরাধরি করে বাগানে হাঁটা হয় না, গোলাপ ফুলের গাছে সবুজ প্রজাপতির উড়ে এসে বসা দেখা হয় না। বুনো পত্রপল্লব ঘেরা ছায়াময় ঘরটির বারান্দায় মুখোমুখি বসে চা খাওয়া হয় না, লেকঝরা মৃদুমন্দ ঠাণ্ডা বাতাসে ব্যালকনিতে বসে দূর নীলাকাশে লেক অন্টারিও থেকে উড়ে আসা ধূসর সন্ধ্যার মায়াময় বিবর্ণ ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘের ভেলা দেখা হয় না। ঘুটঘুটে রাতের অন্ধকারে পাশাপাশি বসে নীল আকাশে জ্বলজ্বলে তারা গোনা হয় না। রাতের বেলা প্রয়োজনে শুধু দুটি শরীর একসঙ্গে এসে আবার বিচ্ছিন্ন হয়ে ঘুমিয়ে পড়া।

রুমাকে বদলানোর অপচেষ্টায় রানা প্রাণান্ত হয়। রুমা যেনো লৌহ-মানবী। বাঁকে না, ভাঙে না, বদলও হয় না। হাল ছেড়ে রানা ক্ষান্ত দেয়।

-“তুমি অত রাত করে কোন মেয়ের সাথে ফোনে কথা বল, আমি জানি না? তোমার অফিসের সাদা মেয়েটার সাথে নাকি তোমার ফষ্টিনষ্টি আছে। তুমি বিভিন্ন রিলেশনে জড়িয়ে যাচ্ছ। ঘরে থাকি বলে মনে কর কোন খবর রাখি না!” রুমা উচ্চস্বরে চেঁচিয়ে উঠল।

-“রুমা, সন্দেহের মতো বিষ নেই। স্বামী বা স্ত্রী অফিসে গিয়ে কী করছে, কার সাথে বেশি কথা বলছে, এইসব নিয়ে অহেতুক চিন্তা করে বা সন্দেহ করে তুমি কোন কুল-কিনারা করতে পারবে না। দেখ রুমা, স্বামী বা স্ত্রী সবারই কিন্তু অন্য পুরুষ বা অন্য নারীকে ভাল লাগতেই পারে। আমি মনে করি এটার মধ্যে কোন দোষ নেই। নিজের কাছে সৎ আছো কি না সেটাই বড় কথা। অবশ্য নারীরা প্রকৃতিগতভাবেই কিছুটা সন্দেহবাতিক, রানা মুখে একটা হাসির প্রলেপ রেখে পরিবেশটাকে হাল্কা করে দেওয়ার চেষ্টা করে।”

-“তুমি এরকম একটা সিরিয়াস বিষয়ে কিভাবে হেসে হেসে কথা বল, আমি ভেবে পাই না। তুমি এখনো অপরিপক্কই রয়ে গেলে।”

-“পরিপক্কতা হলো অন্য ব্যক্তিটি মিথ্যা বলছে যেনেও তুমি কেবল হাসো এবং তা তুমি তোমার গায়ে লাগতে দাও না। নেতিবাচকতা শোষণ করার ক্ষমতা পরিণত হওয়ার সামর্থ্যকে প্রকাশ করে।”

রানার এমন ভাবলেশহীন কথায় রুমা নিস্প্রভ হয়ে পড়ে। সে এটা কোনভাবেই মেনে নিতে পারে না। “এরকম একটা লোককে বিয়ে করে আচ্ছা বিপদে পড়েছি” মনে মনে একটা কষ্টের হাসি হাসল রুমা। পুরুষমানুষ মাত্রই কি মেয়েঘেঁষা, দুশ্চরিত্র? রুমা বিড়বিড় করে।

-“তোমাকে এখন আমার ভয়ংকর রকম অসহ্য লাগছে! তুমি এক্ষুনি আমার বাসা থেকে বের হয়ে যাবে! রাইট নাও! আই উইল নট লিভ উইথ এ লোফার লাইক ইউ! ঘটনার আকস্মিকতায় মাথা নিচু করে বিমুড় তাজ্জব হত বিহব্বল অবস্থায় বসে থাকে রানা। একটু ধাতস্ত হয়ে বলে, “বি প্যাসেন্ট। রুমা তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে? তুমি উত্তেজিত হয়ে কথা বলছো। তাই তোমার কথা আমি সিরিয়াসলি নিচ্ছি না। তুমি শান্ত হয়ে ঠান্ডা মাথায় এসব বললে আমি অবশ্যই বের হয়ে যাবো  ‘’তবে মনে রেখ আই এম ফুললি কমিটেড টু ইউ।”

আমি ওকে ভালোবাসি ও বিশ্বাসও করি। ওর জন্য আমার যতোটা ঘৃণা  আছে ততটা ভালোবাসাও আছে।  আমি তো ওকে ভালো করার চেষ্টা করছি, কিন্তু আমাদের সম্পর্কটা তো ভালো করার চেষ্টা করিনি। আমাদের সম্পর্কটা একটা প্যাটার্নের মধ্যে ঘুরছে। তাছাড়া ওর বিরুদ্ধে কোন অকাট্য প্রমাণ আমার কাছে নেই। আমাকে অ্যাসার্টিভ হতে হবে। রুমা নিজের সাথে নিজেই কথা বলে।

রানার সঙ্গে নিত্য তর্ক,  ওর উদাসীনতা, ওর বোহেমিয়ান চঞ্চলতা, বাচ্চাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে মতের অমিল,  নিজের সুখী জীবনের অভিনয় মঞ্চে রানার দারুণ পারদর্শীতাও ইদানীং ফিকে হয়ে যাচ্ছে। মাসুদের সাথে কত অমিল রানার। রুমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বন্ধু মাসুদ। ও তাকে কত করে বলেছিল রানাকে বিয়ে না করতে, বিদেশে পাড়ি না দিতে। মনে খুব আঘাত পেয়েছিল মাসুদ। কিন্তু তবু সে তো দিব্যি আছে ওর সাথে, পার্টিতে যাচ্ছে, দেশ-দেশান্তরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। নিজের মনকে বুঝানোর চেষ্টা করে রুমা। রানা এমন একজন মানুষ যে আমার দোষ ত্রুটি সমস্ত কিছুর জন্য ভালোবাসে এবং আমার সমস্ত কিছু সত্ত্বেও আমাকে ভালোবাসে, আমার দিকে তাকায় এবং আমার মধ্যে পরিপূর্ণতা ছাড়া কিছুই দেখে না। আমাদের কয়েকটি পার্থক্য এবং মতবিরোধ নির্বিশেষে দিনের শেষে সেইতো অন্তত আমার সুরক্ষা দিয়েছে, এবং আমার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধও। সে হয়তো একটু কম পুরুষালি পুরুষ, কিন্তু রাতের বেলায় বিছানায় তো সে আগ্রাসী। শরীরে বল-শক্তিও আছে। সন্দেহ আর কনফিউশনে ভরা সংসার সাগর সে তো একজন দক্ষ নাবিকের মতোই অতিক্রম করছে। ও হয়তো জ্বলজ্বল বর্ম পরিহিত একজন নাইট নাও হতে পারে তবে আমি যখন বাইরের দুনিয়ার সাথে লড়াইয়ের জন্য বের হই তখন সে আমাকে তরোয়ালটা আমারর হাতে দেবে। এসব কেন ভাবছে রুমা, মনের কোন নিভৃত কোনে আজও কি…! না সেটা কি করে সম্ভব? যে যায় সে তো তার সবটুকু নিয়েই যায়। 

           

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>