| 3 মার্চ 2024
Categories
ঈদ সংখ্যা ২০২০

চিত্রাঙ্গদা, অর্জুন অমসুং বভ্রুবাহনগী ওয়ারী (চিত্রাঙ্গদা, অর্জুন ও বভ্রুবাহনের গল্প)

আনুমানিক পঠনকাল: 55 মিনিট

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com

হেই, অঙাং মচাশা, উসিত্তেদা! অর্জুন ঐবু থৌ শাদবা! (আরে বাচ্চা ছেলের দল- কত্ত বড় সাহস তোমাদের! আমি অর্জুন- আর আমাকেই কিনা তোমরা ডিঙ্গিয়ে যাচ্ছ)?… তখন অর্জুন বললেন।

প্রায় বছর খানেক আর্যাবর্ত থেকে বহু দূরের এই পাহাড়ি জনপদ মনিপুরে বছর খানেক বনে বনে সাধনার জন্য আত্মগোপনে থাকলেও…নিতান্ত ফল-মূল সংগ্রহ বা মাঝে মাঝে চাল কিনতে তাঁকে একটু নগরের দিকে যেতেই হয়…সেই পাহাড়ি জনপদের পথে পথে চলার ফাঁকে এই অঞ্চলের মানুষের ভাষা তিনি শিখে নিয়েছেন কিছুটা। মৈতৈ মণিপুরী ভাষা তিনি বলতে পারেন। সুদূর উত্তর ভারতের রাজসভার ভাষা সংস্কৃত কিকরে জানবে এই পাহাড়ি এলাকার পীতকায়, বোঁচা নাক আর ছোট চোখের, চকচকে রেশম চুলের মিষ্টি দেখতে নারী-পুরুষেরা?  ছিপছিপে তবে ঈষৎ খর্ব কিন্ত দারুণ শক্ত আর পরিশ্রমী মনিপুরীরা সংস্কৃত বিশেষ বোঝে না। মগধের মানুষের মত পূর্বী মাগধ, মৈথিলী বা প্রাকৃতও ঠিক এখানকার ভাষা নয়। বারো বছরের অরণ্যবাস ও তারও পরের এই এক বছরের অজ্ঞাতবাসের কৌরবপক্ষীয় কূটচালে প্রাণ ওষ্ঠাগত বীরকে ক্রমাগত ভারতের নানা অঞ্চলে ঘুরতে ঘুরতে শিখতে হয়েছে নানা জনপদের কথ্য ভাষা। এই মনিপুর দেশও তার ব্যতিক্রম নয়। তাই পাহাড়ের পাকদণ্ডি বেয়ে হাঁটতে হাঁটতে দূরে ঝর্ণা কোথায় সেটা জিজ্ঞাসা করার জন্য কিম্বা পাহাড়ের কোন্ দিকে বাজার বসে যেখানে সপ্তাহের চাল একবার কিনতে পারা যায়…যেহেতু গুহাতে ধ্যানস্থ যোগীরও দিনান্তে একবার অন্ন ফুটাতে হয় কিম্বা কোথায় বা কামারশালা যেখানে গাছ কাটার কুঠারে ধার বা তীরের ফলায় শান দিতে যাওয়া যায়…সেসব প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে ও উত্তর বুঝে নিতে মৈতে মনিপুরী ভাষা তিনি কিছুটা শিখে গেছেন। রবীন্দ্রনাথ হয়তো এই সংলাপটিই তাঁর নৃত্যনাট্য ‘চিত্রাঙ্গদা’য় কাব্যের ছন্দে লিখেছিলেন, অহো কি দু:সহ স্পর্ধা, অর্জুনে যে করে অশ্রদ্ধাকোথা তার আশ্রয়! কিন্ত অর্জুনের সংলাপটি…অনুমান করা যায়…কথ্য ভাষায় ছিল যা কবিতা নয় নিশ্চিত…তাই তিনি আরো বললেন, নমিত্তু তাঙব্রা অঙাংশা? খংব্রা কনানো হাইবা? (চোখে দ্যাখো না নাকি বাচ্চা ছেলের দল? জানো আমি কে)?

চকচকে রেশম কুন্তল যিনি একটু বড় হলেই কেটে ফেলেন, শিকারে-তীর ছোঁড়ায়-যুদ্ধে যার শরীর আর দশটি মেয়ের মত নয় বরং পুরুষের মতোই অতি ক্ষিপ্র ও সবল, রোদে-বৃষ্টিতে ত্বক যার খসখসে…সেই চিত্রাঙ্গদা বিষ্মিত হয়ে আবারও বললেন, অর্জুন! নঙ অর্জুন নি! (অর্জুন! তুমি অর্জুন)!’

অর্জুন হেসে উঠলেন,  নাঙনুংশিত মরকসিদা চিংনুংসিদা করি তৌগে হাইনা লাক্লিনো অঙাং মচাশা? ইংগা ইংবগা চিংগী ওকনা চাদুনা নথওয়াই মাং তারেকো! কানদে, চৎলো নমাগী মনাক্তা (আরে বাচ্চা ছেলের দল- এই ঝড়-বাদলার দিনে পাহাড়ের গুহায় কি করতে এসেছো? ঠাট্টায় আর পাহাড়ি শুকরের আক্রমণে মারা পড়বে যে! বরং যাও ত’- মা’র কাছে চলে যাও)!

হ্যাঁ- পাঠক- আপাতত: চিত্রাঙ্গদা-র এই ভার্সানটিতে আমরা রবীন্দ্রনাথের নৃত্যনাট্যের স্টোরি-লাইনই ফলো করছি। সংলাপগুলো সংস্কৃতেও রাখা যেত। কেননা, অনুমান করা যায় যে সাধারণ মনিপুরীরা সংস্কৃত না জানলেও মনিপুরী রাজকন্যা চিত্রাঙ্গদা হয়তো সংস্কৃত জানতেন। সেসময় অভিজাতদের ত’ সংস্কৃত শিখতে হতোই এখন যেমন শিখতে হয় ইংরেজি। মুস্কিল হলো মনিপুরী ভাষায় সংলাপ অনুবাদের জন্য এ বাংলাদেশেই আমার পরিচিত এক/দু’জন মনিপুরী আছেন। কিন্ত সংস্কৃত ভাষায় সংলাপ কি করে অনুবাদ করি? এখন মনিপুরী ভাষাতে সংলাপ অনুবাদের প্রসঙ্গ এলেই একটি ক্যাঁচাল মনে পড়বেই যা ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় বাবার বদলির চাকরিতে শ্রীমঙ্গল যাবার আগে আমি জানতাম না। হ্যাঁ, সেটা সেই ১৯৮৫ সালের কথা। বাবার বদলির চাকরিতে বছর দেড়/দুই পরপরই আমাদের এক শহর থেকে আর এক শহর যেতে হয়। এবার হঠাৎই বদলির অর্ডার এলো। কোথায়? না, শ্রীমঙ্গল। শ্রীমঙ্গলে পৌঁছে প্রথমেই সেই ছোট্ট মফস্বল শহরের একমাত্র বালিকা বিদ্যালয়ে ক্লাস করার সময় ক্লাস সেভেনের বেঞ্চিতে বসা বোঁচা নাক, ছোট ছোট চোখ আর ঝরঝরে রেশমি চুলের তিন/চারটা মেয়েকে আমি দেখতে পাই যারা ঠিক আমাদের মত মানে সৈয়দা আমিনা খাতুন বা জয়া ঘোষের মত দেখতে না। মেয়েগুলো যখন নিজেদের ভেতর কথা বলে তখন ঠিক বাংলায় কথা বলে না। তবে এই চারটি মেয়ের তিনটি মেয়ে বোঁচা নাক বা ছোট চোখ হলেও (দু:খিত এভাবে বলার জন্য…কিন্তÍ বিষয়টা বোঝাতে আমাকে এভাবেই বলতে হচ্ছে) তাদের রং আমাদের বাঙালীদের মতই শ্যামলা ধাঁচের। আর হলুদ জাপানী পুতুলের মত ফর্সা মেয়েটির নাক-চোখ বোঁচাটে হলেও রঙটা খুবই আলাদা। অচিরেই দেখি চারটি মেয়ের ভেতর ঐ মেয়েটি একা হয়ে থাকে। এই স্কুলের ক্লাসের ফার্স্ট গার্ল সৈয়দা আমিনা খাতুন একদিন আমাকে বলে, মনিপুরী মেয়েগুলো কেমন আলাদা থাকে আমাদের থেকে দেখছো? আবার নবনীতা, শর্মিষ্ঠা আর বসুন্ধরা সিনহা কিন্ত থোংজাং মনোরমার সাথে মেশে না। দেখো খেয়াল করে!

‘কেন? ওরা চারজনই না মনিপুরী?’

‘তুমি সিলেটে নতুন আসছো ত’ তাই জানো না- মনিপুরীদের দুটো জাত। মৈতেই আর বিষ্ণুপ্রিয়া। মৈতেইরা বলে বিষ্ণুপ্রিয়ারা খাঁটি মনিপুরী না- এই আমাদের বাঙালীদের মতোই কালো- নামগুলোও তোমাদের হিন্দু বাঙালীদের মতো আর ওরাই নাকি খাঁটি মনিপুরী।’

‘তোমার কি মনে হয়?’

‘হতে পারে। নবনীতা-শর্মিষ্ঠা-বসুন্ধরাদের বাসায় গেলে ওদের ভাষার একটা/দু’টা শব্দ তা-ও বোঝা যায়। কিন্ত থোংজাং মনোরমা আর তার বড় বোন থোংজাং চিত্রাদের বাসায় গেলে…আহ্…তুমি ওদের ভাষার একটা অক্ষরও বুঝবা না!’

‘ওহ্’

‘প্রিয়ার বড় বোন থোংজাং চিত্রা দি কিন্ত আমাদের স্কুলের ভলিবল টিম ক্যাপ্টেন।’

‘তাই?’

‘ও আল্লাহ্- এইটাও জানো না? ঐ যে ক্লাস টেনের ফর্সা, পাতলা আর ছোট ছোট চুলের একটা আপা আছে না? ছেলেদের মতো দেখতে?’

‘তাই বুঝি?’

‘তাই না ত’কি? চিত্রা দি ত’ খুব ভাল ভলিবল খেলে। গতবার সিলেট গিয়ে খোদ জেলা শহরের মেয়েদের হারিয়ে দিয়ে এলো। উনি একাই অনেকগুলো গোল করেছিলেন। আরে…আমাদের স্কুলের…গোটা সিলেট জেলার আন্ত:বালিকা বিদ্যালয়ের ভলিবল চ্যাম্পিয়ন না? এ্যাথলেটিক্সেও অনেক পুরস্কার আছে। একশ মিটার আর দুইশো মিটার দৌড়, হার্ডলস দৌড়ে কতবার ফার্স্ট হলেন। শুধু আপুটার চেহারা কেমন ছেলে ছেলে! ওদের মণিপুরী মেয়েরা ত’ এম্নিতেই খুব পাতলা হয়…চিত্রা দি আরো পাতলা। হাত, পা সব সরু সরু। চুল ছোট। বুকই ওঠে নি। ছেলে না মেয়ে বোঝা যায় না। তবু ছেলেরা অনেকেই ওনার ফ্যান- খেলায় নাম আছে যে তাই!’

সৈয়দা আমিনা খাতুনের কথায় আমার কান লাল হতে থাকে। সে তার বয়স বলেছে চোদ্দ। ক্লাস সেভেনেই কারো বয়স কি করে চোদ্দ হয়? আমার উপরের বোনটা ত’ মেট্রিকই দিল সাড়ে চোদ্দতে। আমি তার ঝাড়া চার বছরের ছোট (… মানে আমার বড় বোনের)। সৈয়দা আমিনা খাতুন লম্বা বেশ খানিকটা। সেই সাথে শরীরটাও ক্লাস নাইন-টেনের বা মেট্রিক দেওয়া আপাদের মত। তবে সে ভাল ছাত্রী। বিশেষত: অঙ্কে খুব ভাল। এই স্কুলে আসার পর প্রথম পরীক্ষা বা হাফ-ইয়ারলিতে আমি ইংরেজি-বাংলা-সমাজবিজ্ঞান সহ যাবতীয় বিষয়ে সৈয়দা আমিনার চেয়ে পাঁচ বা দশ করে বেশি পেলেও অঙ্কে সে ৯৮ আর আমি ৫৮। সব মিলিয়ে সে আমার চেয়ে ১০ নম্বর বেশি পেয়ে ফার্স্ট হয়েছে। এটাই নিয়তি। আমি জানি সব স্কুলেই আমি সব ফার্স্ট গার্লদের চেয়ে সব বিষয়ে বেশি পাব। শুধু অঙ্কে এত কম পাব যে দ্বিতীয় হওয়া ছাড়া আমার কোন গতি থাকবে না। আমি পৃথিবীতে কোন কিছুতেই প্রথম হবার জন্য জন্মাই নি। দ্বিতীয় হওয়াই আমার নিয়তি…বাবা খামোকা কেন যে আমার পুরো উল্টো একটা নাম রাখতে গেল?

সৈয়দা আমিনার কথায় আশপাশের অন্য মেয়েরাও খিক খিক করে হাসা শুরু করে। সত্যি মণিপুরী মেয়েরা এত পাতলা! এ ক্লাসেও অধিকাংশ মেয়েই আমার চেয়ে বড়। তারা এমন সব সিনেমার পত্রিকা আনে, এমন সব বই পড়ে যা আমি বুঝি না। প্রায়ই দেখা যায় আমার খেলা-ধূলা বা বন্ধুত্ব জমে ওঠে আমার থেকে মিনিমাম দু/তিন ক্লাস নিচে পড়া মেয়েদের সাথে। ওরা আমাকে‘আপা’ ডাকলেও ওদের সাথেই আমার বন্ধুত্ব হয়।

 ‘বিষ্ঞুপ্রিয়া মেয়েদের তা-ও একটু শরীর আছে- মৈতৈ মেয়েগুলোর চামড়াই যা কাঁচা হলুদের মতো। শরীর বলতে কিছুই নাই!’কবিতা সরকার হাসতে হাসতে বলেছিল। 

অনেক অনেক পরে…বহু বহুদিন পরে আমি বুঝব বা নৃ-তত্ত্বের ছাত্রী হিসেবে আমি জানতে পারব  খাসিয়া, মণিপুরী বা এককথায় মঙ্গোলয়েড আর ককেশাস মেয়েদের শারীরিক গড়ন ভেড্ডিড, অস্ট্রো-দ্রাবিড় বা নেগ্রিটো মেয়েদের মত ভারি নয়। তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সমতল বক্ষা, সমতল নিতম্ব। এটাই তাদের নৃ-তত্ত্ব।      

…এভাবেই দেখতে দেখতে থোংজাং মনোরমা আর তার বড় দিদি থোংজাং চিত্রার সাথে আমার ভাল বন্ধুত্ব হয়ে যায়। অচিরেই আমি চিত্রাদির কাছে ঘ্যানঘ্যান করা শুরু করি যেন আমাকে স্কুলের মেয়েদের ভলিবল দলে নেওয়া হয়। চিত্রা দি হেসে বলেন, ‘রোজ তাহলে ভাল করে প্র্যাক্টিস করা লাগবে। কোন ফাঁকি দেওয়া চলবে না।’ সে সময়টা…তখন দেশে সামরিক শাসন চলছিল…আর মৈতৈ মণিপুরীরা দলে দলে ইম্ফলে চলে যাচ্ছিলো। বিষ্ণুপ্রিয়ারা অনেকটা আমাদের মানে বাঙালীদের মত দেখতে বলে বা তাদের ভাষার সাথে বাংলার কিছু মিল আছে বলে আর্মি নাকি তাদের তেমন হ্যারাস করতো না। কিন্তÍ হলদে ফর্সা চীণা ধাঁচের চেহারা আর খুব  অচেনা ভাষার জন্য মৈতৈ পাড়ায় রাতে নাকি প্রায়ই আর্মির ট্রাক নামতো। আজ এ বাড়িতে তল্লাশি, কাল ও বাড়িতে সার্চ ওয়ারেন্ট। পরশু অমুক বাড়ির যুবক ছেলে গ্রেপ্তার। তারপর দিন আর এক মৈতৈ মেয়েকে কোন সেনা অফিসারের হেনস্থা। কাজেই মৈতৈরা দলে দলে চলে যাচ্ছিলো। মূলত: থোংজাং মনোরমা বা তার বড় বোন থোংজাং চিত্রা বা চিত্রা দি’র সাথে সেই আমার শেষ দেখা। তবে আমার ক্লাসমেট মনোরমার সাথে এ জীবনে আর দেখা না হলেও চিত্রা দি বা ওদের ছোট বোন থোংজাং প্রিয়ার সাথে যে আবার দেখা হবে…সে দেখাও হবে ফেসবুকের কল্যাণে…ইম্ফলে আমার যাওয়া হবে…এসবই ছিল স্বপ্নেরও অগোচর। পুরো গল্পটাই এতটাই রুদ্ধশ্বাস যে কিভাবে বলি সেটাই ভাবছি।  

…অথবা একদিক থেকে ভেবে দেখলে রুদ্ধশ্বাসেরও কিছু নয়। ২০০৫-এ আমার প্রথম ফেবু আইডি খোলার পর বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী কবি ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শুভাশিষ সিনহা সমীরের ফ্রেণ্ড-রিকোয়েস্ট এ্যাকসেপ্ট করার পরই ওরই এলাকার মৈতৈ (শুভাশিষ মাস্টার্সের পরই শ্রীমঙ্গল ফিরে গেছে ‘মণিপুরী সংস্কৃতি একাডেমির কাজ নিয়ে) আর একটি ছেলে থোংজাং রণজয়ের কাছ থেকেও একটি রিকোয়েস্ট পাই। তার রিকোয়েস্ট নেবার দু/তিন দিনের মাথায় থোংজাং প্রিয়া নামে একটি মেয়ে একদিন আমাকে মেসেজ করে, ‘আপনি শ্রীমঙ্গল গার্লস স্কুলে ছিলেন না?

‘হ্যাঁ- ছিলাম ত!’

‘থোংজাং মনোরমা আর থোংজাং চিত্রার কথা মনে আছে?’

‘হ্যাঁ- হ্যাঁ- বেশ মনে করতে পারছি।’

‘তাদের এক ছোট বোন ছিল- আমি আপনাদের এক ক্লাস নিচে পড়তাম- মনে আছে? থোংজাং প্রিয়া আমার নাম!’

‘আরে- তোমরা ত’ সেই কবে ইম্ফল চলে গেছো? আমাকে চিনলে কি করে? বাংলা ভাষা এখনো মনে আছে?’

ওপার থেকে প্রিয়া দ্রুত রোমান হরফে বাংলা টাইপ করতে থাকে, ‘বাংলা ভাষায় আমার প্রথম স্কুল- মনে থাকবে না?’

‘ভাষাও ত’ ভাল মনে আছে দেখি

‘আছে একটু একটু।’

‘মনোরমা কেমন আছে? চিত্রা দি? বাই দ্য ওয়ে, তুমি থোংজাং রণজয়কে চেনো কি করে?’

‘আমার জ্যাঠার ছেলে- জ্যাঠতুতো দাদা আর চিনবো না?’

‘ওহ্…ওরা বুঝি ওপারে যায় নি?’

‘না- এখন ফেসবুক হয়ে সবার সাথে যোগাযোগ আছে।’

‘মনোরমা আর চিত্রা দি কেমন আছে?’

প্রিয়া কিছুক্ষণ ইন-বক্সে চুপ করে থাকে। তারপর লেখে, ‘মনোরমা ত’ আর বেঁচে নেই।’

‘কি হয়েছিল? অসুখ করেছিল?’

‘না-’

‘তবে?’

‘আর্মি মেরেছে ওকে।’

‘কোন্ আর্মি? ইণ্ডিয়ান আর্মি?’

‘নয়তো কে?’

‘কিন্তÍ তোমরাও তএখন ইণ্ডিয়ান- এখানেও আর্মি আর ওখানেও আর্মি?’

স্বাতী প্রসঙ্গ পাল্টায়, ‘আপনার কি ভারত আসা হয়?’

‘খুব কম। গেলেও বড়জোর দিল্লি বা কলকাতা। তোমরা ত’ ইম্ফলেই থাকো?’

‘হ্যাঁ-’

‘কিন্তÍ- মনোরমা মারা গেল কেন? আর্মি ওকে মারলো কেন? ও কি কোন পার্টি করতো?’

‘করতো তো- আর সেজন্যই ত’মারা গেল!’

‘কি পার্র্টি করতো?’

‘ঐ আমাদের মণিপুরী মানুষের স্বাধীনতার পার্টি!’

…প্রিয় পাঠক, ইম্ফলে আমি সত্যিই গেছিলাম। ২০০৬-এ। অথবা কোনদিনই যাই নি। কৈশোরে চেনা চৌহদ্দির ভেতরে চোখ ধাঁধাঁনো এ্যাথলেট থোংজাং চিত্রাকে ‘ইম্ফল সাঁলো’ বিউটি পার্লারের বিউটিশিয়ান হিসেবে আমি হয়তো দেখেছি অথবা দেখি নি। ইম্ফলের রাস্তায় রাস্তায় আমি হেঁটেছি…কিম্বা সত্যিই কি হেঁটেছি? মনে করা কঠিন। জীবনের অনেক স্মৃতিই আমরা মনে করতে পারি না। আবার না ঘটা অনেক ঘটনাও তীব্র স্মৃতি হিসেবে আমাদের আঘাত করতে থাকে…এমন হয়তো? আপনাদের হয় না বুঝি? কারণ আমরা ত’ জানিই আমাদের এ মহাবিশ্বের সমান্তরালে রয়েছে আরো অনেকগুলো মহাবিশ্ব। সেই সব মহাবিশ্বে আমার মত রয়েছে আরো অনেকগুলো আমি। আমার জীবনের সমান্তরালে রয়েছে আরো অনেকগুলো জীবন। বাদ দেই…কিম্বা, অর্জুন আর চিত্রাঙ্গদার গল্পটাও তেমন কি হতে পারে না? শিকারী চিত্রাঙ্গদার পাশে ছিল সুন্দরী চিত্রাঙ্গদা নামে অন্য কেউ? তারা দু’জন ছিল দুই ভিন্ন মানুষী অথবা একজনই ছিল দুই ভিন্ন মানবী সত্ত্বা? 

 

 

 

 

 

২.

ঝরঝর করে বৃষ্টি ঝরছিল। পিএলএ-র সভা থেকে বাসায় ফিরতে মনোরমার কিছু রাতই হয়ে গেছিল।

‘মনোরমা- থাংজম মনোরমা- কমরেড! নংবু য়ুমফাউ থিঞ্জনলমগদ্রা (মনোরমা- থাংজাং মনোরমা- কমরেড! আমি কি আপনাকে বাসা পর্যন্ত এগিয়ে দেব)?’

 ইম্ফলে পিপলস লিবারেশন আর্মি বা সংক্ষেপে পিএলএ-র পাঠচক্রের নতুন সদস্য ছেলেটি একটু লাজুক গলায় বললো মনোরমাকে।

‘নো-থ্যাঙ্কস!’

একটু হেসে মনোরমা পাঠচক্র থেকে বের হয়ে আসে।

‘য়াম্না য়েংনা চৎলুকো। আসাম রাইফেলস হুই অঙাওবগুম ওলবনি (সাবধানে যাবেন। আসাম রাইফেলস কিন্তÍ পাগলা কুকুর হয়ে আছে)।’

‘ঐগী য়ুমদি অনকপদনিদা। করিসু তৌরোই (না- আমার বাসা কাছেই। সমস্যা হবে না)।’

ইম্ফলের যে জায়গাটায় পিএলএ-র পাঠচক্র বসে সেখান থেকে মনোরমার বাসা খুব দূরে নয়। একটি স্কুলে দুপুরের শিফটে ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্রদের ভুগোল আর ইতিহাস পড়িয়ে বিকেল গড়ালে মনোরমা আসে এই পাঠচক্রে।

কেন্দ্রগী সরকারনা ঐখোয়গী মণিপুরসে ১৯৮০ দগী ঙসিফাও ইরাং লৈবা মফমনী হায়দুনা লাওথোকনা লৈখ্রে আর্মড ফোর্সেস স্পেশাল পাওয়ার এ্যাক্ট (আফসপা) না লান্মিসিংবু ডিউটিগী মতমদা মী পুম্নমকপু হাৎপা নত্রগা ফানা থম্বগি ঙমখৈ লৈতবা পাওয়ার পীনা থমখ্রে অসিগুম্বা মখা পোনবাকিহনবগী অসিগুম্বা মিহিং কয়ানী য়ানা লৈখো হায়রিবগে (সেই ১৯৮০ সাল থেকে কেন্দ্রীয় সরকার আমাদের মণিপুরকে একটি গোলযোগ পূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করে রেখেছে। আর্মড ফোর্সেস স্পেশাল পাওয়ারস এ্যাক্ট (আফসপা) সেনাবাহিনীকে দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় সব মণিপুরীকে যে কোন সময় হত্যা বা বন্দী করার অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা দিয়ে রেখেছে। এই বশ্যতা-ভয়ের এই দাসত্ব আমরা কতদিন মানবো)?’

বাড়িতে ঢুকে আয়নার সামনে চুলের কাঁটা খুলতে খুলতে পাঠচক্রে দলনেতার আবেগোদ্দীপ্ত বক্তৃতা মনে পড়ে মনোরমার। শিহরিত বোধ করে সে।

মহাভারতকি মতমদগী ঐখোয়না উবা ফংঙিঅওয়াং ভারতকি নিংথৌমচা অর্জুন মফসিদা লাক্তুনা ঐখোয়গী নিংথৌলৈমা চিত্রাঙ্গদাবু পাইরক্কী মওংদা লুহোংঙগা অকোনবদা চৎখি.. কদায়দা? হস্তিনাপুর নত্রগা ইন্দ্রপ্রস্থদা! চিত্রাঙ্গদাগী গর্ভদা বভ্রুবাহন পোকখি ঐখোয় মণিপুরীসিংনা ইশাগী মায়বু ঙাকনবৈ দমক  মণিপুরী সমাজসি নুপীনা লিংবনি হায়নৈ.. অসোমদনা চিত্রাঙ্গদাগী মপারীগী মচানুপা পোক্তবনা অর্জুনদা ওয়ামাং থমখি মচানুপীগা মহাকনুপাগা মপাগী মনাক্তা থমগনি হায়দুনা মণিপুরী সমাজসি তশেংনা নুপীনা লিংবনি হায়বা য়াব্রা? চুম্মি, নুপীবুদি ঐখোয় মমল পি অদুবু অওয়াং নোংপোক্কী গারো নত্রগা খাসিয়া সমাজতা নুপীনা লিংবগুম্না চপ মান্নবদি ঐখোয় নত্তে অচুম্বা হায়রগদি.. চিত্রাঙ্গদা অর্জুননা শিজিন্নখি অমসুং লংথোকপিখিবনি হৌজিকসু ঐখোয় অওয়াং নোংপোক্কি নুপীসিংবু শিজিন্নরি..পাঞ্জাব নত্রগা অওয়াং ভারতকি লান্মী অফিসার, কারবারী অচাওবা লাকলে.. অদুদৈ ঐখোয় নুপীমচাসিংগা খরনি নুঙাই মথোই কার¤গা হনখি ঐখোয়গী মঙ্গোলয়েড নুপীসিংবু মবুক কংহল¤গা অওয়াং ইন্ডিয়াগী আর্যসিংনা চৎখিবা অসিগুম্না বভ্রুবাহনখোই মপা মশক খংদনা চেন চাওরকখি অর্জুনখোই তোয়না তোয়না লাকইমখোয়গী মথৌ তাবা মতমদা লান ঙম্নবা সৈন্যবাহিনী মসিং হেনহনবৈ মথৌ তাবা মতমদা অমুক লাক্কনিমপারিগী হক তান্দুনালৈপাকনিংবগী ওয়া হায়দুনা মহাভারতকি ওয়া হায়দুনা- ফেডারেল ইউনিয়ন অফ ইন্ডিয়াগী ওয়া হায়দুনা (মহাভারতের সময় থেকে যদি আমরা দেখি…উত্তর ভারতের রাজকুমার অর্জুন এখানে এসে আমাদের রাজকুমারী চিত্রাঙ্গদাকে নামে নামে একটি বিয়ে করেন ঠিকই, কিন্তÍ পরে চলে যান…কোথায়? না- হস্তিনাপুর বা ইন্দ্রপ্রস্থে! চিত্রাঙ্গদার গর্ভে জন্ম নেয় বভ্রুবাহন। আমরা মণিপুরীরা নিজেদের সম্মান বাঁচাতে বলি যে মণিপুরী সমাজ মাতৃতান্ত্রিক…আর চিত্রাঙ্গদার বাবার ছেলে ছিল না বলে তিনি অর্জুনকে শর্ত দেন যে মেয়ে ও দৌহিত্র তাঁর কাছেই থাকবে। কিন্তÍ আসলেই কি মণিপুরী সমাজ মাতৃতান্ত্রিক? হ্যাঁ, মেয়েদের আমরা খুব সম্মান করি ঠিকই। কিন্তÍ যে অর্থে এই উত্তর-পূর্বেরই গারো বা খাসিয়ারা মাতৃতান্ত্রিক, সেই অর্থে আমরা মোটেই মাতৃতান্ত্রিক নই। বাস্তবতা হলো…চিত্রাঙ্গদা অর্জুনের হাতে ব্যবহৃত ও পরিত্যক্ত হয়েছিলেন। যেমন হয় এই উত্তর-পূর্বের পাহাড়ি মেয়েরা আজো…পাঞ্জাবের কি উত্তর ভারতের সেনা অফিসার, বড় বিজনেসম্যানরা আসে…আমাদের মেয়েদের সাথে ক’দিন ফূর্তি করে চলে যায়। আমাদের…মঙ্গোলয়েড মেয়েদের গর্ভবতী করে নর্থ ইণ্ডিয়ার আর্যরা চলে যেত। এভাবেই বভ্রুবাহনরা পিতৃহীন বড় হয়। অর্জুনরা আবার আসে- যখন তাদের দরকার হয়। যুদ্ধে জেতার জন্য যখন সৈন্যবাহিনী বড় করতে হয়- তখন তারা আবার আসে- পিতৃত্বের দাবি তুলে-দেশপ্রেমের কথা বলে- মহাভারতে’র কথা বলে- ফেডারেল ইউনিয়ন অফ ইণ্ডিয়ার কথা বলে)।’

শুনতে শুনতে মরমে মরে যাচ্ছিলো মনোরমা। এ কি তার নিজের ঘরেরই কাহিনী নয়? বাংলাদেশ থেকে ১৯৮৬ সালে তারা এপারে ইম্ফল চলে এলো। তখন সে নবম শ্রেণীতে আর দিদি চিত্রা  একাদশ শ্রেণীতে। এরশাদ আমলে…তখন মিলিটারি শাসন…তাদের আদিবাসীদের প্রতিদিনই ধর-পাকড় আর হয়রাণির উপর থাকতে হতো। বিশেষ করে মৈতৈ মণিপুরীদের দূর্দশার শেষ ছিল না। বিষ্ণুপ্রিয়াদের গায়ের রং শ্যামলা বলে বা ওদের ভাষাটা বাংলার কাছাকাছি বলে ওদের বাংলাও অনেক নিখুঁত। সহজে তারা বাঙালীর ভেতর ঘাপটি মেরে থাকতে পারে বা পারত। কিন্তÍ মৈতৈ মানেই দৌড়ানির উপর থাকা। বাবা শেষমেশ ঘর-বাড়ি, জায়গা-জমি মায় তাঁত পর্যন্ত বিক্রি করে এপারে চলে এলো। দিদি ত’ শ্রীমঙ্গলে থাকতেই খেলা-ধূলায় বেশ ভাল করছিল। এখানে এসেও খেলা-ধূলা দারুণ চলছিলো। ১৯৯১ সাল… মাটামুটি রেজাল্ট আর খেলা-ধূলায় ভাল বলে একটি টেলিফোন কোম্পানীতে খেলোয়াড় কোটায় চাকরিও পেয়ে গেল দিদি। সেসময়ই…দিদিদের অফিসের পাশে পাঞ্জাব ব্যাটালিয়নের একটি দল এলো। তাঁবু গাড়লো তারা। ক্যাপ্টেন যশরাজ কাপুর…ছ’ফুট উচ্চতা…খাড়া নাক আর ফর্সা রঙ! তা’ কি ব্যপার? শুরুতে লক্ষ্য করে নি বৈকি মনোরমা। জীবনেও মেয়েদের পোশাক না পরা দিদি যখন এক বিকেলে গোলাপী সালোয়ার কামিজের সাথে চুন্দ্রি ওড়না আর হাই হিল পরে বাসা থেকে বের হলো…কাণে ঝুলছে ক্রিস্টালের দুল…আরে, দিদি চুল লম্বা করলো কখন? দিদি মানেই ত’ ছোট চুলের টম বয়…হাতে এই ব্যাডমিন্টনের র‌্যাকেট নয় ভলিবল খেলছে…জিন্স আর শার্ট…শুকনো, চটপটে শরীরে কোমল মুখটি দেখলে বালক বলেই বিভ্রম জাগে…বরং মনোরমা খানিকটা মেয়েলী…বাড়ির সবাই ধাক্কা খেল সেদিন। বিধবা, নি:সন্তান ছোট পিসী বলেই বসলো, করি তৌরে চিত্রা? নুপাময়ুমদৈ লাকপা মী সিং উনৌ হায়বদি য়াদে ঙসিনা অসুক কে মৌরিসিনাতশেংনা ঙকচরেকো (ব্যপার কি চিত্রা? কোন পাত্রপক্ষের সাথে তোকে দেখা করাতে রাজি করতে পারি না। আজ যে এমন সাজ- ওমা, কি অবাক ব্যপার)! চিত্রা লাজুক হেসে বললো, করিসু নত্তে ইন্দোনইমানবীমগী মপোক নুমিতনি ঙসি! সন্ধ্যাদা বার্তোন লৈবা অদুগিনী (কিছু না পিসী- এক বান্ধবীর জন্মদিন আজ! সন্ধ্যায় নিমন্ত্রণ তাই)।’

…সন্ধ্যার পর বাড়ি ফিরতেই মনোরমা জোঁকের মত লেগে রইলো দিদির পিছ পিছ।   

 ‘করি লৈরগে ইচে? হায়য়ুনা (কি ব্যপার রে দিদি? বল্ তো)!’

দিদি ব্রীড়ায় অবনত হলো। এই ত প্রায় ছয় মাস হয়ে গেল। তাদের অফিসের পাশের মাঠটায় পাঞ্জাব ব্যাটালিয়নের একটি দল তাঁবু ফেলেছে। একদিন অফিস ছুটির পর দিদিরা যখন ছেলে-মেয়ে মিক্সড ভলিবল খেলছিল, পাঞ্জাব ব্যাটালিয়নের যুবক সেনা অফিসার যশরাজ কাপুর এসে ভ্রু কুঁচকে খানিকটা ধমকের গলায় বললো, ‘তুম্ টিনএজ লেড়কা-লেড়কি ইধার মে ইতনা শোর করতা হ্যায় কিঁউ?’

খংঙব্রা মনোপুন্সিগী অহানবা ওইনা নুপামা উবদা খংহৌদনা করিনোমা ফাওখি! লওয়াই লতোন দগী খোংগী মতোনফাও খংইন ইনশিল্লকপগুম তৌখিইকাইবনা ওয়ামতা ঙাংবা থোকখিদে কলিগস অমসুং মরুপসিংনা ঐবু করিনোমা হায়হন্নিংখি মখোয় ঐবু য়েংনা লৈখি অদুবু ঐদি করিমা হায়বা ঙমখিদে নুপাদুনা হায়রকখি ( বুঝলি মনো- জীবনে এই প্রথম কোন পুরুষকে দেখে হঠাৎ আমার এমন লাগলো! মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত কেমন একটা ধাক্কা খেলাম- লজ্জায় কথাই বলতে পারছিলাম না। কলিগস আর বন্ধু-বান্ধবীরা চাইছিলো আমি কিছু বলি। ওরা আমার দিকেই মুখ চেয়েছিল। কিন্তÍ আমি কিছুই বলতে পারলাম না। লোকটা আবার বললো কি-)’

হায়খি (কি বললো)?’

অদুদৈ-(বললো) ম্যায় ক্যাপ্টেন যশরাজ বলতা হুঁ। ইয়ে ফিল্ড তো আর্মি কে লিয়ে প্রিজার্ভড হ্যায়। তুম ইয়ে ফিল্ড মে ক্যা করতা থা? অর আসমান কা হালোত দেখো- বারিষ আতা হ্যায়। যাও- সব মা’কো পাশ যাও… তুম টিনএজ লেড়কা-লেড়কি- যাও’

 

‘অদুদৈ (বললো)?’

মখা তারনু! সি হায়রদুনা ক্যাপ্টেন অদো নোকনা নোকনা সিগারেটমা চুখতখি শাওনিংবা পোকখিকপনিংবসু পোকখি! অসুককুইবা মতমসে ইশাবু ইশানা য়েংখিদেঐবু নুপামনা করিগুম্বা নুংশি মীতয়েং তাখিবরা, মীৎচিনা য়েংখিবরা হায়বা হৌখিবা চহি ২২ সিদা নোংমতসু খলুদে, করি তৌরগা মিটার ১০০গী লমজেন তান্নবদা মকোক থংবা য়াইমিটার ২০০গী লমজেনভলিবলদা কাপ লৌবাঐগী ফিজিক্যাল ফিটনেস নুপানসু কিবা য়াবা  সিতনি খনখিবা! অদুবু ক্যাপ্টেন যশরাজনা থৌশাদনা তৌবা ময়োংদুনা ঐবু খঙহৌদনা লৈখা তাহনখি ঐগী লোইনবী শান্তি, সুধা, রাধা পুম্নমক ঙকনখি ঐবু উবদা! ঐগী সিগুম্বী মাইথোং কৈদৌঙৈদসু উখিদ্রি মখোই (আর বলিস না! এই বলে সেই ক্যাপ্টেন হাসতে হাসতে সিগারেট ধরালো। আমার খুব অপমানে লাগলো- কেমন কান্না পাচ্ছিলো! এতদিন নিজের দিকে চেয়েই দেখি নি- আমাকে কোন ছেলে আদৌ পছন্দ করে কিনা, কোন ছেলে আমার দিকে তাকায় কিনা ত’ গত ২২ বছর ধরে ভাবি নি- শুধু ভেবেছি কি করে একশো মিটার দৌড়ে ফার্স্ট হবো- দুইশো মিটার দৌড়ে- ভলিবলে কাপ নিতে হবে- আমার ফিজিক্যাল ফিটনেস যেন ছেলেরাও ভয় করে! কিন্তÍ ক্যাপ্টেন যশরাজের তাচ্ছিল্য হঠাৎই আমাকে ধূলায় গুঁড়িয়ে দিল! আমার সাথে শান্তি, সুধা, রাধা সবাই অবাক হয়ে গেল আমাকে দেখে! এই আমিকে তারা কখনো দ্যাখে নি)!’

ইচেনংগী ওয়ারীসে চিত্রাঙ্গদাগী ওয়ারীগা চপ মান্নরে বাংলাদেশতা লৈরিঙৈইদা বৈশাখকি তাং ২৫ খুদিং স্কুলদা শান্নবা রবীন্দ্রনাথকি নৃত্যনাট্যদো নিংশিংলিব্রা (দিদি- তোর গল্পটা একদম চিত্রাঙ্গদার মত শোনাচ্ছে যে! বাংলাদেশে থাকতে প্রত্যেক ২৫ শে বৈশাখে ঐ যে রবীন্দ্রনাথের নৃত্যনাট্যটা হতো স্কুলে মনে আছে)?’

নিংশিংলি (হ্যাঁ- হ্যাঁ-)’

নংনা শক থিবী চিত্রাঙ্গদাগী মফমদা, ইচে উর্মিমালা সিনহানা শক ফজবী চিত্রাঙ্গদাগী মফমদা অরোয়বা তাঙ্ককতা নং অমুক লাকপা ফজবদা ঙাওবা অর্জুনগী ওয়াখল মতমদুদা লোইখ্রে! স্কুল টিচার অমিয় দাশগুপ্ত স্যারনা হায়খি রবীন্দ্রনাথনা সিলেট লাকপদা মাছিমপুর খুঙ্গংদা মণিপুরী জগোই উখিবা মখাদৈসিগী নৃত্যনাট্যসে লেংখিবনি মণিপুরী নুপীমচামা ওইনা ঐখোয়গী জগোইসে কৈদৌঙৈদা কাওবা য়াদে হায়না (তুই কুরূপা চিত্রাঙ্গদার অভিনয় করতি আর উর্মিমালা সিনহা দি করতো সুরূপা চিত্রাঙ্গদার ভূমিকায়। শেষ দৃশ্যে আবার তুই আসতি। অর্জুনের ততক্ষণে রূপের মোহ শেষ! স্কুল টিচার অমিয় দাশগুপ্ত স্যার বারবার বলতেন রবীন্দ্রনাথ সিলেটে বেড়াতে এসে মাসিমপুর গ্রামে মণিপুরী নাচ দেখেই এই নৃত্যনাট্য লিখেছেন। আমরা যেন মণিপুরী মেয়ে হিসেবে আমাদের নাচ কখনো ভুলে না যাই)!

অশ.. অর্জুননা ফজবদা ঙাওবা হনখ্রবা নূপাসিংগী ঙাওজবৈ মফমদি অমতনিনুপীগী শক, খংঙব্রা? রবীন্দ্রনাথ লালবনি (ইসশ…অর্জুনের রূপের মোহ শেষ। পুরুষ মানুষের একটাই মোহের জায়গা আর তা’ হলো মেয়েদের রূপ- বুঝলি? রবীন্দ্রনাথ ঠিক লেখেন নি)।’

করি, মানা ইরিসে চুমদ্রে হায়বা (ঠিক লেখেন নি)?’

হয় (না)-’

হয় (না)?’

যশরাজবু য়েংঙুনা.. অহানবদা ঐসে মীৎতা চুদবা তৌনা তৌরম্বদো.. হৌজিক তপ্না তপ্না ওন্থোরকপসিদা.. নুপীগুম্না কে নৌরকপদা, শমসু শাঙহলকপদা (হ্যাঁ-এই তো যশরাজকেই দ্যাখ…শুরুতে আমাকে দেখে যেন চোখেই লাগে নি কিছু…এখন যখন একটু একটু করে বদলে যাচ্ছি…মেয়েদের মত সাজছি, চুল লম্বা করছি)?’

চুম্না হায়রঙসি নং যশরাজকা ডেটতা চৎলুরি নত্রা ( সত্যি বলবি? আজ বুঝি ক্যাপ্টেন যশরাজের সাথে ডেট করতে যাওয়া হয়েছিল)?’

শিরে নং! ইমাগা ইন্দোমচাগদা হায়দোকপা য়াদেকো (এই-এই-খবরদার! মাকে আর ছোট পিসীকে বলিস না কিন্তÍ)! ’

হায়দোক্লোই- অদুবু ইচে- ক্যাপ্টেন যশরাজতি মণিপুরী নত্তেনা (বলবো না- কিন্তÍ দিদি-ক্যাপ্টেন যশরাজ ত’ মণিপুরী না)!’

‘‘ওইদ্রা কৈতৌরে? অর্জুনসু মণিপুরী নত্তেনা (তাতে কি? অর্জুনও ত’ মনিপুরী ছিলেন না)!’

ফরেনে.. অদো.. আজ কা অর্জুনগী.. ক্যাপ্টেন যশরাজকি পাওদি করিনো? মাক থা তরক মমাংগী এ্যাথলেট অদুদৈ থা তরক মতুংগী শক ফজবী চিত্রাদা ওন্থোরকপসিদা মিপাইরক্লবা যাৎলা (হুম…তা’ আজ কা অর্জুনের…ক্যাপ্টেন যশরাজের খবর কি? তিনি কি ছ’মাস আগের এ্যাথলেট আর ছ’মাস পরের সুন্দরী থোংজাং চিত্রার এই বদলে বিচলিত)? একটু চিন্তিত ভাবে চুপ করে গিয়ে অপ্রীতিকর এক আশঙ্কার প্রসঙ্গ পাল্টেছিল মনোরমা।

উত্তরে দিদি চিত্রা আরো ব্রীড়াময়ী, আরো অবনতমুখী হয়ে গেছিল।

সেদিন…১৯৯১-এর সেই সন্ধ্যায়…বাংলাদেশ থেকে আনা বাংলা বই-পত্রের যেগুলো তখনো ফেলে দেওয়া হয় নি, সেই বইয়ের স্তÍপ থেকে রবীন্দ্রনাথের‘চিত্রাঙ্গদা’ বের করে দিদিকে দুষ্টুমি করে সে পড়ে শুনিয়েছিল। পাঁচ বছর পর বাংলা পড়তে গিয়ে…একে ত’ মৈতৈ মণিপুরী জিহ্বায় বাংলা বরাবরই কঠিন…তাতে রবীন্দ্রনাথের এত কঠিন সব বাংলা…তবু পড়তে গিয়ে বহুদিন পর শ্রীমঙ্গলের দিনগুলো, বাংলা স্কুলে বাঙালী মেয়েদের সাথে রবীন্দ্র-নজরুলের লেখা আবৃত্তি করা, ভাঙ্গা মণিপুরী উচ্চারণে রবীন্দ্রনাথের গান গাওয়া- পুরনো স্মৃতিতে তলিয়ে গেছিলো তারা দুই বোন! দিদির অবশ্য বরাবরই খেলায় যত মন পড়ায় ততটা নয়। মনোরমার আবার বই ছাড়া চলে না।

 ‘নং অওইবমক্কি শান্নবা থাদোক্লগে হায়রিব্রা ইচে (তুই কি তবে সত্যিই খেলা-ধূলা ছেড়ে দিবি, দিদি)?’

হৌজিক তং তাদ্রেহান্না নখোয়না মীংশেং মমাংদা মিনিট মঙা লেপ্পা উরগা নোকনিংঙম্মি! হৌজিক ইশামক মতম কয়াম্না মীংশেং মমাংদা লেমহলিওয়াখল তং তাদে করম্বা মতমদা যশরাজকা উনগনি খলুবদা (আর মন বসে না যে- আগে তোদের আয়নার সামনে পাঁচ মিনিট দাঁড়াতে দেখলে হাসতাম! এখন নিজেই কত সময় আয়নার সামনে কাটাই- মন ছটফট করে সন্ধ্যা হলে কখন যশরাজের সাথে দেখা হবে)?

অশেংবা! ক্যাপ্টেনগী দশাদি করি (তাই? ক্যাপ্টেনের কি দশা?)’

ক্যাপ্টেন হৌজিক ঐগী ওয়াদা হৌগৎ হৌজিন তৌরি.. তৌববুদি ঙরাং অমুক হায়রক্লি.. (ক্যাপ্টেন এখন আমার কথায় ওঠে-বসে…তবে গতকাল আবার বলছিল…)’

করি হায়রিবা (কি বলছিল)?’

হায়খি.. ঐবু শান্নবসি পুম্থা থাদোক্লব্রা? মানা ঐবু উখিবা অহানবা মিকুপ্তুদা..অদুঙৈগী ঐগী টম বয় শক্তমদো হৌজিক য়াম্না মিস তৌরি হায়না (বলছিল খেলাটা কি আমি একেবারে ছেড়েই দিলাম? প্রথম যখন সে আমাকে দেখেছিল…সেই টম বয় লুকটা নাকি এখন সে মিস করে)!’

হৈমা! অদুদি পুরা অর্জুনিনে (আরে- এ ত’ পুরাই অর্জুন)!’

মনোরমা হেসেছিল চিত্রার সাথে গলা ছেড়ে।

…হ্যাঁ, তাইইতো। অর্জুনের গল্পই ত’। অনাকাঙ্খিত বভ্রুবাহনের গল্প। যশরাজ কাপুর কোনদিনই বলে নি সে বিবাহিত। বলে নি যে দিল্লিতে তার স্ত্রী আছে। সরল দিদি ভালবেসে নিজেকে আনখশির সমর্পন করেছিল সেই উত্তর ভারতীয় সেনা অফিসারের কাছে। মায়ের মরণপন অসুস্থতার কথা বলে যশরাজ কাপুর দিল্লি চলে যাবার মাস দুয়েক পর দিদি যখন একদিন খাবার টেবিলে মুখে ভাত দিয়ে বমি করে ফ্যালে, পুরো বাড়িতে থমথমে অবস্থা। কয়েক মাস ধরেই চেপে রেখেছিল দিদি। বাবা পাগল হয়ে গেলেন। দিদিকে নিয়ে ট্রেনের সেকেণ্ড ক্লাস টিকিট কেটে ছুটলেন দিল্লিতে। যশরাজের দেওয়া ঠিকানায় গিয়ে জানা গেল এ নামে এ ঠিকানায় কেউ থাকে না। বছর দুয়েক আগে এক যশরাজ কাপুর থাকতো বটে…হ্যাঁ…আর্মির ক্যাপ্টেন…বিবি ছিল তার…এক লেড়কা…যশরাজ কাপুর আর্মি থেকে রিটায়ার করে বউ-বাচ্চা নিয়ে আমেরিকা ভাইয়ের কাছে চলে গেছে। সেখানে একটা গ্যাস স্টেশনের ব্যবসা শুরু করেছে। তার আগে একটি বছর সে বহু দূরে ইম্ফলে পোস্টিংয়ে ছিল বৈকি।

এ্যাবর্শন ইজ নট পসিবল ইন দিস মোমেন্ট থা মরি ফাওদি লাইনা এ্যাবর্শন তৌবা য়াই অদুবু ফোয়েটাস ইউরেটাসকি শেপ চাখিদ্রবা মফম্মদা লৈবনা ফিভমসি য়াম্না ক্রিটিক্যাল ওইরে সি ফিভমসিদা ফোয়েটাস টার্মিনেট তৌরদি পেশেন্ট শিবসু য়াই (এ্যাবর্শন ইজ নট পসিবল ইন দিস মোমেন্ট। চার মাসে দিব্যি এ্যাবর্শন করা যায়। কিন্তÍ ফোয়েটাস ইউটেরাসের এমন একটা জায়গায় আছে যে কণ্ডিশন খুবই ক্রিটিক্যাল। এ অবস্থায় ফোয়েটাস টার্মিনেট করতে গেলে পেশেন্ট মারাও যেতে পারে)!’

হিম সাদা এপ্রন পরা গাইনির লেডি ডাক্তার তার গ্লাভস্ পরা হাতে দিদির তলপেটে স্টেথোস্কোপের মত কি একটা দিয়ে চেপে চেপে ধরছিল আর ক্রমশ:ই শক্ত হয়ে উঠেছিল তার মুখ এয়ার কণ্ডিশন্ড ঘরের ভেতর।

ঐবু কনবিউ ডক্টর! সমাজতা মাই উতপগি মফম মতদি পিবিউ ঐবু (আমাকে রক্ষা করেন ডক্টর! সমাজে যে আমার মুখ দেখানোর কোন জায়গা থাকবে না)।’ বাবা হাউমাউ করে কেঁদে উঠেছিলেন।     

স্যরি অদুগিসু মথক্তা য়েংঙু.. ইশা মৈতৈ ওইরসু ক্যাথলিকনি থওয়াই হাতপা তৌদে অদুবু ইবেম্মগী মাই য়েংদুনা অতৈ ডাক্তার অমদা সাজেস্ট তৌরমগদবনি অদুবু হৌজিক্তি পেশেন্টসিগী পুন্সি রিস্ক ওইবা তারে! য়াদ্রে (আমি স্যরি। এছাড়া দেখুন…আমি নিজেও মৈতৈ মণিপুরী হলেও ক্যাথলিক। প্রাণ হত্যা এ¤িœতেও করি না। তবু আপনার সম্মানের কথা ভেবে হয়তো অন্য কোন ডাক্তারের কাছে সাজেস্ট করতাম। কিন্তÍ এখন এই পেশেন্টের ত’লাইফ রিস্ক হয়ে যাবে! না-না-)’

বাবা অসহায় শিশুর মতো ডাক্তারের টেবিলে মুখ গুঁজে কাঁদতে থাকেন।

‘অদোমদি হৌজিকসু বৈষ্ণব ধর্ম চৎলিকো, নত্রা (আপনারা আজো বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বী, না)?’

 ভদ্রমহিলা কোমল গলায় জিজ্ঞাসা করেছিলেন।

‘হোয় (হ্যাঁ)-’

হিন্দুগী নিয়মকানুনসে কনখ্রে ঐনা হায়জনিংবদি ক্যাথলিক লৌবিরো! ক্যাথলিক ধর্মদা থওয়াই হাতপা মহাপাপনি অঙাং পুম্নমক্কি অপোকপি পলেমপন্থৌগা লোয়ননা ধর্মগী মপা নত্রগা ধর্মগী মমালৈবা তাই মরম অদুনা মপাবুং লৈত্রসু কয়া অওয়াবা ওইদে মণিপুরদা হৌজিক ঐখোয় অয়াম্বা খৃষ্টান ওইরক্লবনি..(হিন্দুদের বড় কড়া সব নিয়ম-কানুন। আমি বলি কি বরং ক্যাথলিক হয়ে যান না! ক্যাথলিক ধর্মে ভ্রুণ হত্যা মহাপাপ। প্রতিটি শিশুরই জৈবিক পিতা-মাতার পাশাপাশি ধর্ম পিতা বা ধর্ম মাতা  থাকতে হয়। কাজেই পিতা না থাকলেও খুব একটা সমস্যা হয় না। মণিপুরে এখন ত’ আমরা দিন দিন খ্রিষ্টানই হয়ে যাচ্ছি বেশির ভাগ মানুষ…)!’

খুব কঠিন ছিল সেই সিদ্ধান্ত। বিষ্ণু ভক্ত, শান্ত-শিষ্ট বাবা দু’বার মাঝরাতে উঠে দা হাতে দিদিকে খুন করতে চাইলেন। কোনক্রমে মা আর ছোট পিসী বাঁচালেন। দুই দাদা আলাদা হয়ে গেল বোনের এ কলঙ্ক থেকে নিজেদের এবং তাদের স্ত্রীদের বাঁচাতে। বৈষ্ণব পাড়া ছেড়ে বহুদূরের ক্যাথলিক পাড়ায় ঘর ভাড়া নেওয়া হলো। ম্লান মুখে মা, বাবা, ছোট পিসী, দিদি আর সে চার্চে একদিন ধর্ম বদলে এলো। নতুন পাড়ায় এতকিছুর পরও একটা মিথ্যা গল্প বলতে হলো। বলতে হলো দিদি সদ্য বিধবা। ইম্ফল বড় শহর। তাই সমস্যা হয় নি। দিদি তার টেলিফোন অফিসের চাকরি ছেড়ে ক্যাথলিক পাড়ায় একটি বিউটি পার্লারে কাজ নিলো। রূপচর্চা কর্মীর কাজ। গর্ভে দিন দিন ভারি হতে থাকলো বভ্রুবাহন…উঁহু…থোংগাম অরুণ।  দিদি এখন কথাই বলে না প্রায়। পার্লারে সে সিনিয়র বিউটিশিয়ান। ভালই বেতন পায়। একটু ভারি হয়ে যাওয়া, গম্ভীর মুখের দিদিকে দেখে তার অতীতের এ্যাথলেট জীবনের গল্প কারোরই বিশ্বাস হবে না যে খেলায় লেগে থাকলে হয়তো আরো অনেকটা দূর যেতে পারতো। মনোরমার বিয়ে করতে ইচ্ছেই করে না। দিদির ঘটনার পর পৃথিবীর কোন পুরুষ মানুষকেই তার বিশ্বাস হয় না।

৩.

 – মনোরমা! চাক চাখিরোইদ্রা? করি ওয়াখল তৌরিনো? চাকসে ইংখ্রেনে (মনোরমা! ভাত খাবি না? কি এত ভাবছিস? খাবার যে ঠাণ্ডা হয়ে গেল)?

লাকএ ইচে (আসছি দিদি)।’ 

  – নয়ুমগা পাল্লরোইদ্রো? স্কুলগা পার্টিগা অসুম, কয়ানি অদুমাইনা লৈখিগে হায়রিগে! ঐসু থোকহনখিবা থৌদোকনা ইমা পাবুংগী মাই য়েংবা য়াদ্রে নংসু…(বিয়ে-টিয়ে করবি না? এইভাবে কতদিন যাবে? শুধু স্কুল আর পার্টি! আমি এমন কাণ্ড করলাম…বাবা-মা’র মুখের দিকে তাকানো যায় না। তুইও যদি)…

ওহ ইচে! লুহোংবগী ওয়া নত্তনা নংগী অতৈ ওয়া লৈত্রবাসিনা মরম ওইদুনা মপানদতা লৈরবনি খংব্রা? নিপা হাইসে তুকচ্চৈ নশানা খংঙবা নত্রা নং? অদুগা ঐঙোন্দা অমুক তকশিল্লিব্রা (উফ্ দিদি! বিয়ে ছাড়া তোমার মুখে কি কোন কথা নেই? এই ভয়ে সারাদিন বাড়ির বাইরে থাকি জানো? পুরুষ মানুষ ঘেন্না করি আমি। নিজে শিক্ষা পাও নি পুরুষ মানুষের কাছ থেকে? আবার আমাকে বলছো)?

অদুগীসু মথক্তা অতোপ্পা জাতকী নুপা নুংশীরুবগী অভিশাপ পাল্লবনি ঐদি নং মৈতৈ নুপাদা অদুম লুহোংলো, শাইদনা অফবা ওইগনি (সবার ভাগ্য কি একরকম হয়? এছাড়া আমি হয়তো ভিন জাতের ছেলে ভালবেসেছি বলে অভিশাপ লেগেছে আমার গায়ে। তুই মণিপুরী ছেলে দেখেই বিয়ে কর। তাহলে সুখী হতে পারবি)।’ 

ইচেতোক্লো, লুহোংবদগীসু হেনবা তৌগদবা থবক হৌজিক ময়ামা লৈরি তোক্লো, নংগী ফিভম উবদা নুপাশিংগী মথক্তা থাজবা অতৈ লত্রে (দিদি-বিয়ের চেয়েও অনেক গুরত্বপূর্ণ কাজ এখন করার আছে। বাদ দাও। তোমার অবস্থা দেখে আমার আর কোন পুরুষ মানুষকে ভরসা করার সাহস হয় না।”

নংনাসি ফৈ হায়দো তৌরো সে.. চাক, এন্সাং, হওয়াই পু¤œমক কুপ্না লৈরবনি তুম্বা চৎলে হয়েং অলকেশকি স্কুল লৈ নিংথিনা চাওকো (যা ভাল বোঝ্ তাই কর। শোন্…ডাল-ভাত-তরকারি সবই ঢাকা দেওয়া আছে। আমি শুয়ে পড়লাম। কাল সকালে অলকেশের স্কুল। ঠিক মতো খেয়ে নিস)।

-ইমাগা পাবুংগা চাখ্রবা (মা-বাবা খেয়েছে)?

কুইরেনা! মখোই অনিমক তুমখ্রে নংবু ফনা কুইনা ঙাইরম্বনি (কখন! দুÕজনেই ঘুমিয়ে পড়েছে। তোর জন্য অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেছিল)।’

নং চৎলো ইচেতুম্মুরো থেংঙনু প্রিয়া মামযাইমা খোইদৈ হল্লক্লব্রা (তুমি যাও দিদি-শুয়ে পড়ো। দেরি করো না। প্রিয়া মেজো মামার বাসা থেকে ফিরলো নাকি) ?

-হল্লক্ত্রি হৌজিকফাও (এখনো  ত’ ফেরে নি)।

ঙসি নুংথিল নত্রো হল্লক্কনি হায়বদো (আজ বিকেলে না ফেরার কথা ছিল)?

নত্তেমামযাইমা ফোন তৌরক্লম্মি হয়েং অয়ুক হল্লক্কনি (না- মেজো মামা ফোন করেছিল। কাল সকালে ফিরবে)।

  সেই রাতে ঘুমাতে যাবার সময় ঝমঝম করে বৃষ্টি নামলো আবার। বেশ ঘুম পাচ্ছিলো মনোরমার। ঘুমের ভেতর তলিয়ে যাবার আগে পাঠচক্রের নতুন ছেলেটির মুখ সে যেন দেখতে পেল একবার। ঠোঁটে একচিলতে হাসি ফুটে উঠলো কি?

  • কনানো (কে? কে)?

বাবা-মার গলা কেন এই মাঝরাতে?   

দিদি চিত্রা দৌড়ে এলো।

মনোরমাশুক থেংবসিদা আর্মিনা নংবু থীবা লাক্লিসি করিগিনো? নংনা হায়বদাই নখোয় নমান্নবী খরা এমবিএ তমি হায়না নং পার্টিগা তৌবা যাৎরা (মনোরমা- তোকে খুঁজতে আর্মি এসেছে কেন এত রাতে? তুই ত’ বলিস তোরা কিছু ছেলে-মেয়ে মিলে এমবিএ-র পড়া পড়িস। তুই কি কোন পার্টি করিস)? ’    

চিত্রা দরজা আটকে দিলো। ছিটকিনি তুলে বললো, নং বাথরুমদা লোতখ্রো বাথরুম চংঙগা মনুংদৈ থোং লোনশিনল্লু? খংঙেনা (তুই বরং বাথরুমে ঢুকে পড়। বাথরুমে ঢুকে দরজা আটকে দিস ভেতর থেকে? কেমন?)’

করিগী ইচে? করি ওয়ানো অদুদি? ঐনা করি হুরাল্লুবা নত্রগা ডাকাতি তৌরুদুনা চেন্দৌরিবা? মনিং তম্বা লৈপাকমদা অসুমাইনা অহিংদা আর্মি লাক্তৌরি করিগী? মখোয়গী করি হক (কেন দিদি? এটা কেমন কথা? আমি চুরি না ডাকাতি করেছি যে পালাবো? একটি স্বাধীন দেশে এভাবে মাঝরাতে আর্মি আসবে কেন? তাদের কি অধিকার)?

কথা শেষ হতে পারে না। তার আগেই চিত্রা টেনে-হিঁচড়ে মনোরমাকে ঢুকিয়ে দেয় বাথরুমে। তার অতীত খেলোড়ার জীবনের অবশিষ্ট শক্তিমত্তা টের পাওয়া যায়। তারপর চিত্রাই বাইরে দেয় বাথরুমের দরজা আটকে দেয়।

ওদিকে মিলিটারি ঢুকে পড়েছে বাড়ির ভেতরে। বাবা-মা প্রথমে বোধ করি দরজা খুলতে চাচ্ছিলো না। কিন্তÍ প্রশিক্ষিত, শক্ত বুটের লাথি সহজেই দরজা ভেঙ্গে ফেললো।

ঙসাইতগী লাওরিসি তাদ্রাথোং হাংদ্রি করিগিনো? থাংজম মনোরমা কৌবা কনা য়ুমসিদা লৈ (কতক্ষণ ধরে চেঁচাচ্ছি- দরজা খুলছিলে না কেন? থোংজাং মনোরমা নামে কেউ এ বাসায় থাকে)?

হোয়নত্তেহায়বদি (হ্যাঁ- না- মানে)-

করি? কদায় নখোয়গী নুপীমচাদো (মানে? কই তোমাদের মেয়ে)?

মামাদি হৌজিক ইম্ফালদা লৈতেনা মামগী ময়ুম কোইবা চৎখি (ও-ও ত’ এখন ইম্ফলে নেই। মামাবাড়ি গেছে বেড়াতে!)

তো  তো করে বললো মা। সরল, সত্যবাদী মানুষ মিথ্যা বলতে গেলে যেমন সহজেই ধরা পড়ে যায়, এক্ষেত্রেও তার ব্যত্যয় হলো না!

নচিন থিনুনখোইগী মাইথোংদুনা হাইরি নখোই চিন থিরি হায়না সার্চ  (মিথ্যে কথা- আপনাদের মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে আপনারা মিথ্যে বলছেন। সার্চ)!

 দশ-বারো জনের সেনা দলটির নেতা গর্জে ওঠেন। ড্রয়িং রুমের সোফা, ডাইনিং টেবিলে খাবারের প্লেট, অন্য সব রুমের বিছানা-পত্র, আলমারি সব খোলা আর জিনিষ-পত্র মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলার শব্দ পাওয়া যায়। হ্যাঁ…কয়েকটি ভারি বুটের শব্দ মনোরমার কাণের খুব কাছেই। এবার তার রুমেই ঢুকে পড়ছে কি?

সি রুমসিদা কনাসু লৈতে, তৌববুদি রুমসে মাক্কিনি (এ রুমে কেউ নেই? তবে এই রুমটিই তার)!

ফমুং মখাদা য়েংঙু (বিছানার নিচে দ্যাখো)!

আলমিরাদা লোত্ত্রা? আলনাগী মরুমদা (আলমিরাতে লুকোনো নেই ত? আলনার পিছে)?

মনোরমার ভেতরের বাঘিনীটা গর্জায়। নিজেই বাথরুমের দরজা খুলে ফ্যালে সে। একটু অবাক হয়ে যাওয়া সৈনিকদের সামনে এসে দাঁড়ায়।

নখোয়না থিরিদো ঐনি ঐনি থাংজম মনোরমা (আমিই সেই যাকে তোমরা খুঁজছো। আমিই থোংজাং মনোরমা)।’

লৈরেদনা বেশ্যাদোহুই নুপীদো (আরে এই সেই বেশ্যা- এই সেই কুত্তী)!

-ওয়া লেমনা ঙাংবিউ! নখোয়দা সার্চ ওয়ারেন্ট লৈব্রা (ভদ্র ভাবে কথা বলুন। আপনাদের সার্চ ওয়ারেন্ট আছে)?

চিনথক্তা ওয়াসু ঙাঙিনে! করিগী সার্চ ওয়ারেন্ট! নং পিএলএ গী মী নত্রা? ইরাং য়াওবী হুই নুপী (আবার মুখে মুখে তর্ক করে! কিসের সার্চ ওয়ারেন্ট শুনি? তুই পিএলএ-র সদস্য না? শালী বিচ্ছিন্নতাবাদী)?

টেনে-হিঁচড়ে মনোরমাকে বাড়ির ব্যালকনিতে নিয়ে আসে সৈন্যরা। বাবা-মা-দিদির সামনেই চললো বেধড়ক মার।

  • কাওট্রাকতা কাও (ওঠ্- ট্রাকে ওঠ)!
  • কারোইসুংকা কারোই (না- কিছুতেই না)!

ঙাকপিউআহ ওফিসারঙাকপিউনোং নুংশিৎ মরকসিদা ঐগী ইচানুপীসি অদুমাইনা পুবিখিনু (দয়া করো- ওহ অফিসার- দয়া করো- এমন বৃষ্টির ভেতর আমার মেয়েটাকে তোমরা এভাবে নিয়ে যেও না)।’

-খরনি মমাংদতা অরুমদগী হৌগৎলক্লিবনি নখোয় মাবু অদুমাইনা পুবিখিনু (ক’দিন আগেই জ্বর থেকে উঠেছে। তোমরা ওকে এভাবে তুলে নিও না)।’

…কোন কথা না বলেই জিপ গাড়ি হ্যাঁচ্ স্টার্ট নেয়। সাত/আটটি জলপাই উর্দি, কাঁধে রাইফেল ঝুলানো মানুষের শক্ত ও ক্ষিপ্র থাবায় রাত পোশাকের, বিনুনী করা একটি মেয়ে। জিপ গাড়ির কাঁচে বৃষ্টির জল ধোঁয়ার মত সাদা ও গনগনে।

গুলিদো পানখি মাক্কি খোমথক্তা, মখজাইদা অমসুং চিনবান্দা

হকচাং পুম্নমক নৈহৎপগী দাকফম..

গুলি য়ৈশনখি মাক্কি হকচাংগী অরোনবা মফমদা জরায়ুদা

নুপা খুৎলাইগী শক্তম্মকনি

নুপা খুৎলাইনা শা খুৎলাই

ময়াই কারবা হু

আতিয়াদা খোংলি নোং ব্জ্র

তুমলি মনোরমা

হৌগৎলো মনোরমাতাও থাংজম

হাংদোক্লো নমীৎ

নংগী ঈগী মহুত লৌগদৌবা ঐখোয়

ঐখোয় তেংথাদে শাওবিদে..

(গুলি লেগেছিল তার স্তনে, গালে ও ঠোঁটে

সারা দেহে ধর্ষণ চিহ্ন…

গুলি গেঁথে গেছে যোনি ও জরায়ুতে

ঠিক যেন পুরুষ দন্ত

পুরুষ দন্ত যেন শ্বাপদ দন্ত

হিসহিস করে বিষে-

আকাশে বৃষ্টি বজ্র ডাকছে

মনোরমা নিদ্রিত

জাগো মনোরমা- শোন থোংজাং

এবার খোল হে চোখ-

তোমার রক্তের বদলা নেব যারা

আমরা অশোক অক্ষোভ…)

ইণ্ডিয়ান আর্মিরেপ আস!

-অসুম হায়না ফি যাওদনা লম্বি থোক্তোরিবা ঐখোয় (এমন নগ্ন ভাবেই কি আমরা পথে বের হবো)?

-মানি- মনোরমানা থওয়ায় থাখিবৈ হেক মাংগী ক্ষেনফমদো নিংশিংবা ঙম্মগদি ঐখোয় ইকাইফমদি থোকতে- মাবুসু ফী লৌথোকপিখী- গুলি কাপখিবনি মাক্কি হকচাংগী অরোনবা মফমখুদিংমক্তা- (হ্যাঁ- যদি আমরা মনোরমার মৃত্যুর আগের শেষ মূহুর্তগুলো স্মরণ করি তবে লজ্জা বোধ করার ত’ কারণ নেই- তাকেও বিবস্ত্র করা হয়েছিল- গুলি করা হয়েছিল তাঁর দেহের গুপ্ত সব স্থাণে)?

– অদুবু লম্বিদা নুপাসিংনা ঐখোয়গী ফী যাওদ্রবা হকচাংবু অরানবা মীৎয়েংদা য়েংলবদি (কিন্তÍ রাস্তার পুরুষেরা যদি আমাদের নগ্নতা চোখ মেলে দ্যাখে-উপভোগ করে)?

– মদুদি ঐখোয়না ফী শেৎলবসু অদুম য়েংবৈ য়েংঙিবা! মানা মণিপুরী অশেংবা মমাগী মচা ওই তারদি ঐখোয়গী ফি যাওদ্রবা হকচাংদা করেম্বা ঙমলোই কৈদৌনুংদা। মীহৌবা মীৎয়েংদা য়েংবা ঙম্লোই  (সেটা ত’আমরা আচ্ছাদিত থাকলেও ওরা করে! কোন মৈতৈ মণিপুরী মায়ের সন্তান হয়ে থাকলে আজ আমাদের নগ্নতা দেখে উপহাস করবে না। লোভের চোখে দেখবে না)।’

একে একে খুললো তারা…

দেহের সমস্ত আবরণ।

খুললো শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ, ট্রাউজার-টিশার্ট

খুললো দেহের গভীরতর আচ্ছাদন যত…

নগ্ন- ভীষণ নগ্ন হয়ে উঠলো তারা…

ওদের হরিদ্রাভ দেহে সকালের প্রথম রোদ ঝিকমিকিয়ে উঠলো।

  • ঐখোয় কদায় চৎতরিনো (আমরা কোথায় যাচ্ছি)?

 দলের কনিষ্ঠতমা মেয়েটি লজ্জায় জড়োসড়ো দেহে আবার প্রশ্ন করলো।

  • আসাম রাইফেলসকি অফিস মমাংদা (আসাম রাইফেলস্ অফিসের সামনে)!

 দলের জ্যেষ্ঠতমা প্রৌঢ়া নারী উত্তর করেন।

  • অসুম হায়না চৎলগা লান্মিসিংনা ঐখোয়বু (এভাবে গেলে সৈন্যরা যদি আমাদের)?
  • নোরমা শিরবা মখাদা.. নংগী নচনবু ফী লৌথোকপিরগা মাক্কি হকচাংগী অরোনবা মফমদা, মথবাক্তা অমসুং চিনবান্দা গুলি কাপ্পা যারগদি.. ঐখোয় পুম্নমক মদুগুম্বা লাইবক্তু তরাম্না ওকপা মথৌ তায় (মনোরমার মৃত্যুর পর…তোমার এক বোণকে যদি উলঙ্গ করে তার লজ্জা স্থান, স্তন আর ঠোঁটে গুলি করা যায়…তবে দরকারে আমাদের সবারই সে নিয়তি গ্রহণ করতে প্রস্তÍত থাকা উচিত)।’
  • লম্বিদা নুপাসিংনা সিটি খোংলক্লদি (রাস্তায় কোন ছেলে যদি শীষ বাজায়)?
  • অদু ওইরদি মাক মমাগী গর্ভদগী পোকপা নত্রেমমাগী খোম্লাং থকপা ফংখিবা মচা নত্রবনি (তবে তার মনুষ্য গর্ভে জন্মই নয়- মায়ের দুধ খায়ই নি সে)?
  • ইকাইজৈ তশেংনা ইকাইজৈ (আমার লজ্জা করছে- লজ্জা করছে আমার বড়)?
  • ইকাইবানং তুকচ্চবা ফাওদ্রা? ঐখোয় মৈতৈ নুপীসিংসে অয়াম্বা শম যাম্না শাংঙি শাঙলবা শমগী অহানবা খাইবোকমনা হকচাংগী মাংথংবা মাইকৈ অমসুং খাইবোকমনা কুপশনগনি নীংথংবা মাইকৈঐখোয়গী হকচাং ঙসিদি বেয়নেট ওইরবনিওইরবনি রাইফেলইক্লবা লীচৈঐখোয়গী হকচাং উরগা লান্মীসিং ইকাইগনিকীবা পোক্কনিভাব তাগনি কয়া শাথিনা লানখি হায়বা, কয়াম্না শাথিবা পাপনো মখোয়না লংজখি হায়বা (লজ্জা- তোমার ঘৃণা হচ্ছে না? আমরা মৈতৈ নারীরা অধিকাংশই দীর্ঘকেশী। দীর্ঘ চুলের অর্দ্ধেকাংশে আমরা ঢেকে রাখব আমাদের দেহের সম্মুখভাগ আর অর্দ্ধেক দিয়ে ঢেকে রাখব পশ্চাদাংশ- আজ আমাদের দেহ বেয়নেট হবে- হবে রাইফেল- তীক্ষè চাবুক- আমাদের দেহ দেখে সৈনিকেরা লজ্জিত হবে- হবে ভীত- বুঝবে কি ভয়ানক অপরাধ, কতটা ঘৃণ্য পাপ তারা করেছে)!
  • খংঙে লোয়নাঅদুবু আসাম রাইফেলস মমাংদা চৎলগা করিনো ঐখোয়না হায়দোরিসে (সব বুঝলাম- কিন্তÍ আসাম রাইফেলস অফিসের সামনে গিয়ে আমরা কি বলবো)?
  • করিসু হায়রোয়- সিগী প্ল্যাকার্ডসে থাংগতলগা উৎকনিইন্ডিয়ান আর্মিরেপ আস (কিচ্ছু বলবো না- শুধু এই প্ল্যাকার্ড উঁচিয়ে বলবো- ই-িয়ান আর্মি-রেপ আস)!!

লাইহারাওবা অথবা নুপী লান

মণিপুরী নারী কি বরাবরই চিত্রাঙ্গদার মতো? কখনো রাসলীলা নৃত্যের বিভঙ্গ-ব্রীড়ায় কোমল, অবনত মুখ আবার এই সে জ্বলে উঠেছে বিদ্রোহে? পুরুষের সাথে বা কখনো পুরুষকে ছাপিয়ে অংশ নিচ্ছে দেশের স্বাধিকার সংগ্রামে? সিলেটের মাসিমপুরে এসে মণিপুরী নাচ দেখে মুগ্ধ রবীন্দ্রনাথ  বাংলায় লিখেই দায় শেষ করলেন, জনপদবাসী শোনরক্ষক নেই তোমাদের কোন?

তীর্থে গেছেন তিনি-গোপন ব্রতধারীনী! চিত্রাঙ্গদা রাজকুমারী!

বিষ্মিত উত্তর ভারতীয় যুবরাজ অর্জুন বললেন, নারী? তিনি নারী?  

প্রজার দল উত্তর করলো, বাহুবলে তিনি রাজা- ¯েœহবলে তিনি মাতা- তাঁর নামে ভেরী বাজা! 

…তাই-ই তো। নুপী বা নারীর লান…বিদ্রোহের উপরই দাঁড়িয়ে আছে মণিপুর। দাঁড়িয়ে আছে তার কোমলতা ও বীরত্বের উপর। মণিপুরের সৃষ্টি হয়েছিল সাত নারী দেবতা বা লাইনুরার কোমল নৃত্য বিভঙ্গে। আবার সঙ্কটে বা ক্রান্তিকালে সেই নুপী বা নারীই এগিয়ে এসেছে প্রতিরোধে। মণিপুর থেকে আসাম হয়ে বাংলার শ্রীহট্টের দীর্ঘ এলাকা জুড়ে হিন্দুত্ব প্রভাব বিস্তারের আগে, বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষার বহু আগে পরমপুরুষ আতিয়া গুরু শিদাবা যখন পৃথিবী ও মানুষ সৃষ্টির পরিকল্পনা করলেন, তখন তিনি প্রথমে নির্মাণ করলেন নয়জন লাইবুংথৌ বা দেবতা এবং সাতজন লাইনূরা বা দেবীর। তখনো সমগ্র মহাবিশ্ব জলে জলময়। গুরু শিদাবার নির্দেশে নয়জন দেবতা স্বর্গ থেকে মুঠো মুঠো মাটি ছুঁড়তে লাগলেন পৃথিবীর দিকে আর সাতজন দেবী সেই জলের উপরেই নাচতে শুরু করেন। তাঁদেরই নাচের তালে তালে স্বর্গ থেকে ছুঁড়ে দেওয়া মাটির ঢেলা জমে জমে জন্ম নিলো এ বিশাল পৃথিবী। মৈতৈ বা মণিপুরীদের প্রাচীন ধর্মের সাথে যে নৃত্য ছিল যেমন লাইহারাওবা, খাম্বা-থোইবী, থাবল চোংবী, মাইবী, লৈমা বা লৈশেম নাচে নারী কখনো লাস্যে কোমল আর কখনো তাণ্ডবে প্রবল। শ্রীচৈতন্যের শিষ্য শান্তি দাস শ্রীহট্ট হয়ে মণিপুর অবধি বৈষ্ণব ধর্ম প্রচারের সময় নতুন ধর্মে দীক্ষিত মণিপুরীদের জীবনে এলো নতুন দেব-দেবীরা। দেখা দিল নতুন নৃত্য। তাদের নামও ভিন্ন। রাসনৃত্য, নটসংকীর্তন, গোষ্ঠলীলা, উদূখল, মৃদঙ্গ নৃত্য। বৈষ্ণব ধর্ম প্রচারের সময় লাস্য নৃত্যই প্রধান জায়গা নিয়ে নিল মণিপুরী সমাজে। এ নৃত্যের বৈশিষ্ট্য তার শান্ত কোমলতা, ভক্তি আর নিবেদন। শুধু পুরুষের মৃদঙ্গ নৃত্যই পুরোপুরি তাণ্ডব রসে ভরপুর।

চন্দন চর্চ্চিতা নীল কলেবর পীত বসন বনমালী

কেলী চলন মণিকুণ্ডলা মন্দিতা গণ্ড যুগ স্মিত জালি

হরির ইহা মুগ্ধ বধূ নিকারে: বিলাসিনী বিলাসতী কেলি পরে

পীনো পয়োধরা ভরা ভরে না হরিম পরিরাভ সারগম

হরির ইহা মুগ্ধ বধূ নিকারে: বিলাসিনী বিলাসতি কেলি পারে

কপি বিলাস বিলোল বিলোচনা খেলনা জনিত মনোজম

দেবায়তি মুগ্ধ বধূর অধিকম মধূসুদন বদনা সরোজম।

জয়দেবের গীতগোবিন্দ বা বিদ্যাপতির পদাবলীতে আরাধ্য প্রেমিকা রাধা হয়ে উঠলো মণিপুরী নারীর প্রার্থিত রূপ। তবু, বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষা নেবার আগে মণিপুরের নারী যে লাইহারাওবা নাচ নাচতো, সেই লাস্য ও তাণ্ডবের মিশ্রণ আজো তাঁর স্বভাবে রয়েছে। লাই  যদি হয় আনন্দ আর হারাওবা যদি হয় নৃত্য, তবে লাই হারাওবা ত’ আনন্দ নৃত্য। মণিপুরের এক এক অঞ্চলে এ আনন্দ নৃত্য বা লাইহারাওবা নানা নামে নাম নিয়েছে। কোথাও সে কংলৈ হারাওবা, কোথাও মোইরাং হারাওবা, কোথাও চকপা হারাওবা বা ককচিং হারাওবা। তিন থেকে এগারো দিনের এ নৃত্যে মণিপুরী নারী পৃথিবী সৃষ্টি, আদি মানব-মানবীর গোটা পৃথিবী ভ্রমণ, ঘর বানানো বা ফসল ফলানোর দৃশ্য ফুটিয়ে তুলতো। মাইবা-মাইবী…পুরোহিত আর নারী পুরোহিতের বয়ানে লাই ঈকৌবা বা দেবতার উদ্বোধন দিয়ে শুরু হয় লাইহারাওবা নাচ। মাইবা বা পুরোহিত বাজান পেনা (মণিপুরী বীণা) আর মাইবী বা নারী পুরোহিত তার তালে তালে নাচের অপরূপ ভঙ্গিমায় হ্রদ থেকে দেবতাকে জাগ্রত করে শুরু করে তার নৃত্য পূজা। নাচের লয়েই সে জানায় লৈশেম জাগোই বা পৃথিবী সৃষ্টির গল্প, লৈনেৎ জাগোই বা ভূমি সমতল করার কথা, লৈতা জাগোই বা বসতি স্থাপন, লৈমা জাগোই বা কুমারী নৃত্য। আবার এই ব্রীড়াময়ী মণিপুরী মেয়েরাই ফেটে পড়ে লান বা বিদ্রোহে।

‘মনোরমার এই বিদ্রোহ ত’ একদিনের না। আমাদের বংশে ঠাকুর মাই কি প্রথম নূপি লানে ছিলেন না?

থোংজাম চিত্রা-মনোরমা-প্রিয়া…এই তিন বোনের পিসী কোরানো নারকেল, চালভাজা আর চায়ের প্লেট আমার সামনে এগিয়ে বলতে থাকেন। শ্রীমঙ্গলে একটি প্রাইমারি স্কুলের হেডমিস্ট্রেস ছিলেন। ইম্ফলে চলে আসার পরও কিছুদিন শিক্ষকতা করেছেন। এখন অবসরে গেছেন।

-আপনি পিসী ভাল বাংলা বলেন ত! এতদিনেও ভোলেন নি।’

-শোন কথা! ওদেশে আমার জীবনের প্রথম পঁয়ত্রিশটা বছর কেটেছে। তোমাকে ত’ দেখেছি। মনোরমার সাথে এক ক্লাসে পড়তে না তুমি?

-আপনি সব মনে রেখেছেন। ১৯৮৮ থেকে ২০০৬…১৮ বছর হয়ে গেল। 

-না মনে রাখার কি আছে? মানুষের জীবনটা দ্যাখো পাখির মতো। কোংপাল থেকে বাংলাদেশের শ্রীমঙ্গল চলে গেছিলাম আমরা ১৯০৪ সালে যখন আমার ঠাকর্দুার মা নূপি লানে যোগ দেন! আবার সেই আমরা কতদিন পর ফিরে এলাম!

-নূপি লানটা কি?

-নারী বিদ্রোহ।

-নারী বিদ্রোহ? আপনার ঠাকুর দার মা? ঠিক কি ধরণের সংগ্রাম ছিল এটা?

পিসী মুচকি হাসেন। তিনি বালবিধবা। চোদ্দ বছর বয়সে বিয়ে হয়ে ষোলতে বিধবা হবার পর আর বিয়ে করা হয় নি। তবে, মনোরমার বাবা আদর করে ছোট বোনকে মেট্রিক-ইন্টার-বিএ পাস করে শিক্ষকতায়ও ঢুকিয়েছিলেন। বোন আর বোঝা হয় নি সংসারের।

-আমি ইতিহাসের বিএ। ১৯৫৩ সালে জন্ম আমার। আমাদের সময়ে বিএ পাস করতে হলেও পড়তে হতো। তাই বলি। এছাড়া এ আমার নিজের জাতের ইতিহাস। ১৯০৪-এ বৃটিশ সরকার মণিপুরে ফ্রি ট্রেড পলিসি চালু করেছিল। এর আওতায় আমাদের কৃষকের ফলানো চাল আমরা মণিপুরীরা খেতে না পেঢে ভারতের অন্যান্য রাজ্যে বা বিদেশে রপ্তানী করতে হতো। তবে এটাও মনিপুরী মেয়েদের রাগের বড় কারণ ছিল না। ঠাকুর দার মা খেপে গেছিলেন। কারণ তার স্বামীকে কাঠ কাটতে গোরা পুলিশ পাঠালো ভিন রাজ্যে। তিন ছেলেকেও যেতে হলো। সেসময় ১৬ থেকে ৭০ বছরের সব মণিপুরী পুরুষকেই এই বেগার খাটনি খাটতে ভিন রাজ্যে যেতে হতো। শুধু ঠাকুর্দা স্কুল পড়–য়া বলে রক্ষা পেয়েছিলেন। পাড়ার মেয়েদের সাথে তাঁত বোনার তেম নিয়ে পুলিশের সাথে রাস্তায় লড়াই করেছিল ঠাকুর দার মা। পাঁচ হাজার মণিপুরী নারী এ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হবার পর দু’বছরের ছোট ভাই আর বাচ্চাদের সাথে নিয়ে সেই দূর শ্রীমঙ্গলে যাবার কথা ভেবেছিল ঠাকুর মা। আর যেমন ভাবা তেমন কাজ। তাঁর স্বামী মানে আমাদের ঠাকুর্দা পরে তাঁর সাথে যোগ দিল।

-বলে কি?

-দ্যাখো…শেষবয়সে গলায় তুলসীর মালা, বৈষ্ণব কণ্ঠি পরা, কপালে চন্দন আঁকা বুড়ির এই সাদা-কালো ছবি…ভাবা যায় যে সে তাঁত বোনার তেম কাঠি হাতে পুলিশের সাথে যুদ্ধ করেছে?

দেয়ালে ঝোলানো একটি সাদা-কালো ছবিতে নিরীহ এক বৃদ্ধার চন্দনের তিলক আঁকা কপাল আর তুলসীর কণ্ঠি গলায় দেখা যায়। তার বাইরে কিছুই বোঝা যায় না।

-যুবতী বয়সে উনি নাকি বসন্ত রাস নেচেছেন। শ্রী রাধিকার সখী সেজেছেন কয়েকবারই। তাঁর হাতে বোনা কিছু নাচের ঘাগড়া আর বিয়ের শাড়ি এখনো এবাড়ির ট্রাঙ্কে আছে। ওনার বোনা শাড়ি পরেই বিয়ের পিঁড়িতে বসেছিলাম যদিও সে বিয়েতে আমি বিধবা হলাম। আমি বিধবা হয়ে ফেরার এক বছরের মাথায় উনি স্বর্গে চলে গেলেন। আমার বিধবা হওয়াটা উনি মানতে পারেন নাই! এটুকু বলে চুপ করে যান থোংজাং থাংবি মঞ্জুশ্রী সিনহা।

-পিসী- এই যে আপনার নাম থাংবি। এর অর্থ কি?

– থাংবি অর্থ জ্যোৎ¯œা। বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত হবার আগে আমাদের নামগুলো হতো এমন। আর বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত হবার পর নামগুলো বদলে গেল। মঞ্জুশ্রী আমার নামের বৈষ্ণব অংশ।

 পিসী নিজেও চায়ের ভেতর মুড়ি ঢেলে চামচে করে নাড়তে থাকেন।

-বৈষ্ণব ধর্মের আগে আপনাদের ধর্মের নাম কি ছিল?

-আপেকাপা। অনেকে একে সানামহী বলতো।

            

 লোক্তক হ্রদের কথা

বরাক নদীর পাশে পতকল উপত্যকা। তারই কাছাকাছি লোক্তাক হ্রদ। সেখানেই ছিল মণিময় পুর নাগরাজা অনন্ত নাগের মাথার মণি। কেউ কেউ বলে এই মনিপুর রাজ্য নাকি ছিল গান্ধর্ব রাজ্য। কেউবা বলতো একে পার্বত্য রাজ্য।  থরে-বিথরে নানা নাম তার। মুঘালয়, মুঘলু কিম্বা কাচ্চি দেশ। অহমিয়ারা ডাকে মেখলি, কাছাড়িরা বলে মাগলি আবার শানরা ডাকে কাজোয়ি। মহাভারতে ব্যাসদেব মনিপুরকেই বলেছেন মেকলি দেশ।

কিšত্ত কিভাবে সৃষ্টি হলো এই মণিময়পুর? সে সেই দ্বাপর যুগের কথা। কার্তিকের হিম ঠাণ্ডা পূর্ণিমা রাতে কার্তিক, শ্রীকৃষ্ণ ও রাধিকা নাচছিলেন। রাসলীলা নৃত্য। মথুরার ব্রজধামের সব গোপিনী তখন এক হয়েছিলেন। রাধা, কৃষ্ণ ও গোপিনীদের গানের সুললিত স্বর পৌঁছালো কৈলাসে দেবাদিদেব শিবের কাণেও। মহাদেবের খুব আগ্রহ হলো এ নাচ দেখার। কিন্তু কৃষ্ণ চান না মহাদেব এ নাচ দেখুন। অনেক অনুনয়ের পর শুধুমাত্র দ্বাররক্ষী হিসেবে সে নাচ দেখার অনুমতি পেলেন শিব। গোপেশ্বরক্ষা  নাম নিয়ে আর নারীর ছদ্মবেশে ঢুকলেন মহাদেব। নিজের চোখে রাস নৃত্য দেখতে না পারা পীড়া বোধ হচ্ছিলো শিবের। সেসময় সেখানে এলেন স্বয়ং দক্ষ কন্যা পার্বতী। নাচ দেখে পার্বতী ও শিব দুজনেরই মনে হলো হিমালয়ের পাদদেশে মণিপুরে এই রাসলীলা অনুষ্ঠানের সেরা জায়গা। শিবের ইচ্ছাতেই সপ্তাহের সাত দিনের দেবতা স্বর্গ থেকে নেমে এলেন।

মুস্কিল হচ্ছে লোক্তক হ্রদের পুরোটাই ত’ জল থৈ থৈ। সেখানে কোথায় নাচবে সবাই? মহাদেব তখন তাঁর হাতের ত্রিশুল দিয়ে পাহাড়গুলোর গায়ে গর্ত করে দিলেন যেখানে গিয়ে হ্রদের জল পড়ে জমা হবে। এভাবে গোটা হ্রদের জল সরে গিয়েও নৃত্যের জন্য খুব যে বড় রঙ্গমঞ্চ হলো তা’ নয়। শিবের অনুরোধে কৃষ্ণ তখন স্বর্গ থেকে পাঠালেন দশ দেবতাকে- ইন্দ্র, কুবের, যম, বরুণ, অগ্নি, অশ্বিনী, ঈশান, বায়ু, নংশেবা ও কংবা মেইরোম্বা। স্বর্গ থেকে নেমে এসে জল থৈ থৈ পুরো লোক্তক হ্রদকে নাচের মণ্ডপ করতে হবে ত’ তাদেরই। কিšত্ত সমস্যা হলো উপত্যকার চারপাশের অগণিত আকাশস্পর্শী বৃক্ষছায়ায় সূর্যের আলো ত’ ভেতরে ঢোকে না। এদিকে রাসনৃত্যের সময় যে বয়ে যায়! তখন ডাকা হলো অনন্ত নাগকে। সে তার মাথার নীল মণির অব্যর্থ আলোক বিচ্ছুরণে উপত্যকার গাঢ় অন্ধকারের ভেতরেই রাসপূর্ণিমার আলোকচ্ছটা এনে দিল। সেই থেকে ঠিক হলো এ স্থানের নাম হবে মণিপুর। আবার এ লোকালয়ের মানুষ ভগবান বিষ্ণুর ভক্ত বলে এ এলাকার নাম বিষ্ণুপুর-ও বলে কেউ কেউ। 

এই লোক্তক হ্রদের পাশেই কি রাজকন্যা থোইবিকে প্রথম দেখেন নি দরিদ্র বীর খাম্বা? অবশ্য তার আগেও ছয়/ছয়টি জন্মে তাদের দেখা হয়েছিল। প্রণয় হয়েছিল প্রতিবারই। মিলন হয় নি একবারও। বিরহে বিরহে কেটেছে ছয়টি জন্ম। লোক্তাক  হ্রদের পাশে থাংজিং পাহাড়ে পৃথিবী সৃষ্টির কিছুদিন পর একদিন উড়ে আসে একটি পুরুষ আর একটি স্ত্রী ঘুঘু পাখি। থাংজিং পাহাড়ের দেবতা থাংজিং ঘুঘু দম্পতিকে দেখে মুচকি হাসলেন। মনে মনে বললেন, দেখি- তোমাদের প্রেম কতটা পরীক্ষা দিতে পারে? দেবতার এ ভাবনার পরপরই কোত্থেকে এক শিকারী এসে একটি তীর ছুঁড়লো আর মারা গেল ঘুঘু দম্পতি। পরের জন্মে ছেলে ঘুঘুটি হলো যুবক হেঞ্জুনহো আর মেয়ে ঘুঘুটি হলো থোংনাং লাইরৌলেম্বী। কিন্তÍ সামাজিক নানা বাধায় প্রেম সফল হলো না তাদের। আজো সমগ্র মোইরাং জনপদ কাঁদে তাদের অপূরিত প্রেমের দু:খে। তৃতীয় জন্মে তারাই জন্ম নিল সাম্বা নহা লমগনবা আর তার প্রেমিকা খামনুং হিসেবে। নাহ…এ জন্মেও পূরিত হলো না তাদের প্রেম। চতুর্থ জন্মে দেবতা থাংজিংয়ের ইচ্ছায় তারাই আবার জন্ম নিলেন ওয়াংলেন পুংদিংহানবা আর চকপ্রম ফিশাহৈবী হয়ে। পরষ্পরের জন্য গভীর আকাঙ্খা সত্ত্বেও এজন্মেও পরষ্পরকে পাওয়া হলো না তাদের। পঞ্চম জন্মে তারাই আবার হলেন প্রেমিক ঙানবা আর প্রেমিকা শংলৌলেম্বী। ষষ্ঠ জন্মে আবার তারা পৃথিবীতে এলেন দরিদ্র যুবক হাউবা আর বিত্তশালী পিতার কন্যা য়াইথিং কোনু হিসেবে। না, য়াইথিং কোনুকে তার বাবা বিয়ে দিলেন রাজপুরুষ খুমন কাউবার সাথে। অবশেষে এল ভাগ্য বিড়ম্বিত এই প্রেমিক-প্রেমিকার সপ্তম জন্ম। অবশেষে এলো চতুর্দশ শতাব্দী। মোইরাংয়ের সিংহাসনে তখন রাজা পুরিৎলাই চীংখুলেম্বা। ছয়/ছয়টি জন্ম আগে যে স্ত্রী ঘুঘুটি তার পুরুষকে হারিয়েছিল আর পরবর্তী পাঁচবার মানবী হিসেবে জন্মেও পায় নি তার আকাঙ্খিত দয়িতকে, সে-ই এবার জন্মালো মোইরাংরাজা পুরিৎলাইয়ের ছোট ভাইয়ের ঘরে মেয়ে হয়ে। রাজকুমারী থোইবি। আর ছেলে ঘুঘুটি? সে-ও মোইরাংয়ের পার্শ্ববর্তী রাজ্য খুমালে এক রাজপুরুষ পরিবারেই থাম্বা হয়ে জন্মেছে। কিন্তÍ খুমালের রাজ পরিবারের নানা অন্তর্ঘাতে থাম্বার বাবা মারা গেলে সে বড় বোন খামনুকে নিয়ে চলে এলো পড়শি দেশ মোইরাংয়ে। খামনু বেঁচে থাকার জন্য কাজ শুরু করলো মোইরাংয়ের রাজ পরিবারে অভিজাত মেয়েদের পরিচর্যাকারীনী হিসেবে। সুশ্রী চেহারার জন্য সে কাজ পেতে সমস্যা হলো না তার। একদিন রাজকুমারী থোম্বির ইচ্ছা হলো সে লোক্তাক হ্রদে গিয়ে মাছ ধরবে।

‘জ্যেঠা- আমি লোক্তাক হ্রদে গিয়ে মাছ ধরবো।’

রাজা প্রিয় ভ্রাতুষ্পুত্রীর আব্দার শুনে এককথায় রাজি হলেন। রাজ্যে ঢোল পিটিয়ে জানানো হলো যে পরবর্তী দিন কোন পুরুষ ধীবর বা সোজা কথায় কোন পুরুষই লোক্তাক হ্রদের ত্রি-সীমানায় যেতে পারবে না। সুন্দরী রাজকন্যা থোইবী খামনু আর অন্য সব সখী, পরিচর্যাকারীনী সহ সাত সকালেই বড়শি, টোপ আর সারাদিনের জন্য নিজেদের খাবার সহ বেড়িয়ে পড়লো লোক্তাক হ্রদের দিকে।

রাজকন্যা থোইবীর সখী আর খাম্বার বড় বোন খামনু আগের দিন রাতেই পই পই করে ছোট ভাইকে সাবধান করে গেছে।

‘খবরদার খাম্বা- আর যাই করিস, কাল কিন্তÍ লোক্তাক হ্রদের ধার-কাছেও যাবি না। রাজ্যের সব ছেলেরই কাল যাওয়া মানে না। তাতে আমরা ভিনদেশী। খুমাল রাজ্যের লোক।’

‘ঠিক আছে দিদি- আমি কাল কোন ভাবেই লোক্তাক হ্রদের ধার-কাছেও যাব না।’

কিন্তÍ কথায় বলে মানুষ ভাবে এক আর হয় আর এক। ঈশ্বরের ইচ্ছা কে বুঝবে? বড় বোন সাত সকালে বেড়িয়ে যাবারও কিছু পরে, ঘুমের ঘোরে খাম্বা স্বপ্ন দেখলো। কি দেখলো? সবটাই দেবী পান্থোইবির মায়া। স্বপ্নে খাম্বাকে তার বড় বোন খামনুর চেহারায় দেখা দিয়ে দেবী অবিকল খামনুর গলাতেই বলেলেন, খাম্বারে- হ্রদের কাছে সারাদিন ঘুরতে ঘুরতে খুব খিদা লেগেছে। আয় না- আমাকে কয়টা শাক তুলে দিয়ে যা না!

ঘুম ভেঙ্গেই দিদি অন্ত প্রাণ খাম্বা ছুটলো লোক্তাক হ্রদের দিকে। ভুলেই গেল সে বড় বোনের নিষেধের কথা। হ্রদে ঢুকে তীরের পাশে শাক কুড়াতে গিয়েই খাম্বার দেখা হলো…হ্যাঁ…পরমা সুন্দরী সেই মেয়ে আর কেউ নয়…স্বয়ং রাজকন্যা থোইবী। বাকি সখীরা ততক্ষণে মাছ ধরে, হ্রদের উত্তর দিকের জঙ্গলের কাছে মাছ কুটে, রান্না করতেও বসে গেছে। বেশ চড়–ইভাতি হবে যা হোক। আর একা রাজকন্যা চলে এসেছেন হ্রদের দক্ষিণ দিকে বিচিত্র শাক-পাতার ঝোপ অবাক চোখে দেখতে দেখতে। সেখানেই দিদির জন্য শাক কুড়ানো খাম্বার সাথে দেখা হলো থোইবীর। এভাবেই শুরু হয়েছিল প্রেম। বাঁধভাঙ্গা বন্যার মতো পরিণতি চিন্তাহীন প্রেম ছুটতে থাকে বর্ষাদিনে তীর উপচানো লোক্তক হ্রদের মতোই। রাজকুমারী থোইবীর কিন্তÍ আর একজন পাণিপ্রার্থী ছিল। সে অভিজাত, ক্ষমতাশালী আর এক রাজপুরুষ নোংবান। থোইবীর বাবাও মেয়ের হবু বর হিসেবে স্বাভাবিক ভাবেই নোংবানকেই পছন্দ করতো। নোংবান দু’চোখে দেখতে পারত না খাম্বাকে।

একবার একটি বুনো ষাঁঢ় এলো মোইরাং রাজ্যে। ভয়ানক উৎপাত করা শুরু করলো ষাঁঢ়টি। সবার চোখের ঘুম উধাও। বাধ্য হয়ে রাজা ঘোষণা দিলেন যে এই ভয়ানক দূর্দান্ত ষাঁঢ়কে যে বন্দী করে রাজ্যের সব প্রজাকে রক্ষা করতে হবে, রাজা তাকে দামি পুরষ্কার দেবেন। চতুর নোংবান এ ঘোষণা শুনেই লাফাতে লাফাতে গেল খাম্বার কাছে।

-খাম্বা- খবর শুনেছো?

-কি খবর বলো?

-বাহ্- সারা রাজ্যের মানুষ জানে আর তুমি জানো না?

-কি জানতে হবে সেটা ত’আগে বলবে?

-মহারাজা পুরষ্কার ঘোষণা করেছেন যে এই যে হতচ্ছাড়া কোথাকার একটা ধর্মের ষাঁঢ় এসে রাজ্যের সবার ফসল আর সব্জির ক্ষেত তছনছ করে দিচ্ছে…এই ষাঁঢ়টাকে যে বন্দী করতে পারবে তাকে বড় বীর হিসেবে রাজা সম্মানিত করবেন। খাম্বা- আমি ত’ দেখি এ কাজ শুধু তুমিই পারো করতে। আর কারোই এমন কাজ করার যোগ্যতা নেই!

তোষামোদের সুরে বললো নোংবান।

খাম্বা বুঝলো সবই। তবু পালালো না সে। ষাঁঢ়ের মুখোমুখি দাঁড়ালো। কৌশল আর অপরিমিত শক্তির জোরে পরাস্ত করলো সে ষাঁঢ়টিকে। বন্দী করলো। চতুর নোংবান আর থোইবীর লোভী বাবা রাজ দরবারে গিয়ে রাজাকে বুঝালো ষাঁঢ়কে পরাস্ত করা গেছে বটে। আর সেটি করেছে নোংবান। শুধু তাই নয়। খাম্বার নামে মিথ্যে চুরির অপবাদ পর্যন্ত তোলা হলো রাজার কাণে। রাজা এত কিছু জানেন না। তিনি বিশ্বাস করলেন সব। কাজেই হুকুম করলেন যে রাজার হাতির পায়ের সাথে শেকল দিয়ে বেঁধে খাম্বাকে টেনে-হিঁচড়ে সারা বাজার ঘোরানো হোক চুরির শাস্তি হিসেবে। তাই করা হলো। নিরীহ, নিষ্পাপ খাম্বাকে হাতির পায়ের শেকলের সাথে ঘোরানো হলো। কিন্তÍ দেবতা থাংজিং ভক্তকে ফেলে দিলেন না। অচেতন, রক্তাক্ত খাম্বাকে সেবা-যতেœ সুস্থ করা হলো। ধীরে ধীরে খাম্বা তার মৃত পূর্বপুরুষদের আশীর্ব্বাদে মোইরাং রাজ্যের বড় বীর হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠলো। রাজসভায় একটি অনুষ্ঠানে রাজকুমারী থোইবীর সাথে তার নাচ দেখে খোদ রাজা খুশি হলেন। রাজা কিন্তÍ তার ছোট ভাইয়ের মত ছিলেন না। মানুষকে তার টাকা-কড়ির বদলে যোগ্যতা দিয়ে বিচার করতেন তিনি। ভ্রাতুষ্পুত্রী থোইবীর জন্য খাম্বাকে পছন্দ হলো তার। কিন্তÍ থোইবীর নিজের বাবা যে রাজি নয়! মেয়েকে তিনি হুমকি দিলেন, ঐ পাশের দেশ থেকে আসা, হাভাতে খাম্বাকে তুমি যদি ভুলতে না পারো তবে তুমি আমার মেয়েই না! আমি তোমাকে নির্বাসন দিচ্ছি। আগামী পাঁচ বছর তুমি দূরে তোমার মামা বাড়ি থেকে কাটিয়ে আসবে যেন খাম্বা তোমার মুখ দর্শন অবধি না করতে পারে।’

বাবার দেওয়া নির্দেশ শান্ত মনে মেনে নিল থোইবী। বাড়ি ফিরলো সে পাঁচ বছর পরে। তবে খাম্বাকে সে তখনো ভোলে নি। বাবাকে সেটা সে জানালোও। দরকারে সে সারাজীবন একা থাকবে তবু খাম্বা ছাড়া আর কাউকেই বিয়ে করবে না।

এসময়েই রাজ্যে আবার হুলস্থূল। কি হয়েছে? না, একটি বাঘ এসেছে। মানুষখেকো বাঘ। প্রতিদিনই তল্লাটের কারো না কারো ঘরে কেউ না কেউ মারচে। কি করা যায়? অধীর রাজা জরুরি সভা তলব করে দেশের দুই প্রধান বীর খাম্বা ও নোংবানকে বললেন যে এই মানুষখেকো বাঘকে হত্যা করতে পারবে তার সাথেই রাজকুমারী থোইবির বিয়ে দেওয়া হবে। রাজার এই ঘোষণায় সাজ সাজ রব পড়লো চারদিকে। খাম্বা ও নোংবান দু’জনেই রণ সাজে বের হলো বাঘের সাথে লড়াইয়ে। না, পারল না নোংবান। মানুষখেকো বাঘটি দু’জনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেও আহত হলো নোংবান। খাম্বা চির প্রতিদ্বন্দীকে সব ভুলে উদ্ধার করলো বাঘের থাবা থেকে। লাভ হলো না। মারা গেল নোংবান। প্রতিদ্বন্দীকে উদ্ধার করে পরে আবার বাঘের সাথে লড়াইয়ে ছুটলো খাম্বা আর জয়ী হলো সে লড়াইয়ে। খুশি হলেন রাজা। বিয়ে দিলেন ভ্রাতুষ্পুত্রীর সাথে মহা ধূমধাম করে।

ইসশ…এখানেই যদি সব শেষ হতো? কথায় বলে সুখে থাকলে ভুতে কিলায়। তেমনি কিল কে যেন মারতে লাগলো খোম্বাকে। প্রেমের এত বছরে সন্দেহ হয় নি। বিয়ের পর খাম্বার কেন জানি প্রায়ই মনে হতে থাকে সত্যিই কি থোইবীর জীবনে তার আগে কেউ আসে নি? থোইবী যদি সতী না হয়ে থাকে? থোইবী যে সুযোগ পেলে অন্য পুরুষের কাছে যাবে না এমন কি হতে পারে? তেমন ভাবনা থেকেই খাম্বা একদিন থোইবীর সতীত্ব পরীক্ষার জন্য দূরদেশে যাবার কথা বলে বিদায় নিয়ে গিয়ে রাতে গোপণে এসে থোইবীর বাড়িতে দরজার ফাঁক দিয়ে একটি লাঠি ঢোকালো। মণিপুরী সমাজে আগে বিশ্বাস ছিল যে কোন একাকী নারীর বাসায় রাতে দরজার ফাঁক দিয়ে লাঠি প্রবেশ করালে মেয়েটি অবিশ্বাসীনী হলে সে লাঠি টেনে নিয়ে সম্মতি জানাবে। আর বিশ্বাসী চরিত্রের নারী হলে সে সাথে সাথে প্রবল ঘৃণায় প্রত্যাখ্যান করবে।

…তেমনটাই করলো খাম্বা। গভীর রাতে নিজের স্ত্রীর ঘরে লাঠি ঢোকালো। ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে উঠলো থোইবী, কে তুমি? কার এত বড় সাহস যে আমার মত পতি অনুগতা নারীকে ভোলাতে আসছো?

নির্বোধ চতুর খাম্বা তখন গলার স্বর বদলে আরো নানা মিষ্টি কথায় থোইবীর মন ভোলানোর চেষ্টা করে। ক্রুদ্ধ থোইবী দরজার পাশে রাখা লোহার বল্লম হঠাৎই জানালা খুলে ছুঁড়ে দেয়। বল্লম বিদ্ধ করলো খাম্বার বুক। œ আর্ত চিৎকার করে উঠলো খাম্বা। গলার স্বরটি কি চেনা লাগছে? ছুটে গেল থোইবী। আলো জ্বেলে দেখে নিস্তেজ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে রক্তাক্ত খাম্বা। প্রচণ্ড অবাক হয়ে থোইবী কোনমতে শুধু বললো, এ কাজ তুমি কেন করলে খাম্বা?

  • এ আমার পাপ থোইবী। তোমাকে সন্দেহ করার শাস্তি পেয়ে গেলাম হাতে-নাতে।’

গোটা ঘটনার ধাক্কায় কিছুক্ষণ নিষ্পন্দ বসে থাকে থোইবী। তারপর ধীর গলায় খাম্বার মাথায় হাত বুলিয়ে বলে, তোমাকে ছাড়া জীবন অর্থহীন। মৃত্যুতেও আমি তোমার পাশেই থাকবো।

খাম্বার রক্তে রক্তাক্ত বল্লম এবার নিজের বুকে বসালো থোইবী।  

…মণিপুরী পুরাণকথার এই লোক্তক হ্রদে শ্রীমঙ্গল সরকারী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়– এর উদীয়মান ভলিবল সেন্সেশন বা আমাদের অনেক বিষ্মিত চোখের আইকন থোংজাং চিত্রা…উঠতি নারী এ্যাথলেট হিসেবে যার ছবি সিলেটের আঞ্চলিক পত্রিকা মায় জাতীয় সংবাদপত্রেও এক/দুবার ছাপা হয়েছে তার সাথে আমি কোনদিন নৌকা চেপে ঘুরে বেড়াব তা’ স্বপ্নেও ভাবি নি।

‘দারুণ রূপকথা শোনালেন কিন্তÍ চিত্রা দি। অসামান্য। এই খাম্বা-থোইবীর প্রণয় কাহিনী! এই লোক্তক হ্রদের পাড়েই সেই নায়ক-নায়িকার প্রথম দেখা হয়েছিল, তাই না?

-এক মিনিট দাঁড়াও অদিতি- বাসার জন্য কয়েকটা মাছ কিনে নেই!

চিত্রা দি বলেন। আজ রবিবার। তাঁর ছুটির দিন।

‘দিদি- আপনারা না বৈষ্ণব? মাছ খান?

‘এখন ত’ক্যাথলিক আমরা। তবু মাংস খাই না এখনো। রান্নায় পেঁয়াজ দিই না। বদলে দিই কিছু সুগন্ধী পাতা। তনিংখক, মায়াংবা আর ফাকফাই। এই আমাদের রান্না তুমি সব খেতে পারছো ত’? সোডা দিয়ে রান্না করা ডাল উতি  বা ইরোনবা বলি যাকে? বাঁশের কোড়লের ভর্তা? সাথে পাহাড়ি মরিচ বাটা?

-খুব পারি দিদি। পার্বত্য চট্টগ্রামে এমন কত খেয়েছি চাকমা বন্ধুদের বাসায়! এই বাঁশের কোড়লের ভর্তা আর পাহাড়ি মরিচ বাটা!

-আচ্ছা চিত্রা দি- আপনাদের এখানে সব সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড বাংলা হরফে লেখা। কিন্তÍ বাংলা হরফে যা লেখা থাকে তা’ আসলে বোধ করি সব মণিপুরীতে লেখা, তাই না?

‘হ্যাঁ-

-কিন্তÍ মণিপুরীদের কি নিজেদের লিখিত বর্ণমালা নেই?

-ছিল। কিন্তÍ বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষা নেবার সময় আমাদের এক রাজার নির্দেশে সব মৈতৈ ভাষায় বই-পত্র পুড়িয়ে ফেলার হুকুম দেওয়া হয়। বাংলা অক্ষরেই লেখা হতে থাকে বই-পত্র। আমাদের প্রজন্ম পর্যন্ত শিক্ষিত মানুষেরা সব বাংলা পড়তে পারে। তবে, আমাদের পরের প্রজন্ম আর বাংলা শিখছে না। প্রাদেশিক সরকার চেষ্টা করছে নতুন করে মৈতৈ বা মণিপুরী বর্ণমালা চালু করতে। চলো- ভেলপুরি খাই।

লোক্তক হ্রদের পাড়ে মাছ কেনা শেষ করে চিত্রা দি আমাকে নিয়ে একটি ভেলপুরি ঠেলার সামনে পাতা কয়েকটি চেয়ারের একটিতে বসে পড়লেন। অনেকটা আমাদের দেশের চটপটি-ফুচকার ভ্রাম্যমান ঠেলাগুলোর মতোই।

-তোমাকে খাম্বা-থোইবীর লম্বা গল্প করলাম কেন বলো ত?

-কেন?

-বোঝ না কেন? আমার জীবনটাও যে অমন। থোইবী তা-ও মরে বেঁচেছিল। আমার যে মরাও হলো না। থোইবীর গর্ভে ত’ সন্তান আসে নি। আমার পেটে যে অরুণ চলে এলো! তাই আমার আত্মহত্যা করা হলো না।’

‘দিদি- এসব কি বলছেন? স্যুইসাইড কেন করবেন আপনি?

-আমার ভালবাসার মানুষ আমাকে বিট্রে করলো আর তুমি বলছো আমি বাঁচবো কেন?

-কিন্তÍ আপনার যে সন্তান আছে?

-তা’ ত’ আছে- কিন্তÍ স্কুলে ওর ক্লাসমেটরা ওকে ওর বাবার কথা জিজ্ঞাসা করে। ও কোন উত্তর দিতে পারে না। এই জীবনটা আমার কি যে অসহ্য লাগে! অথচ বাংলাদেশ থেকে এখানে এসেও খেলা-ধূলায় খুব ভাল করছিলাম আমি। নাম হচ্ছিলো। সব কিছু যার জন্য বিসর্জন দিয়ে সাজগোজ, প্রেমে মেতে উঠলাম…সে কিভাবে পালিয়ে গেল দ্যাখো!

…লোক্তক হ্রদে রবিবার দুপুর সাড়ে এগারোটার স্বচ্ছ রোদে সেরোম লিলি ফুটেছে। মণিপুরের জাতীয় ফুল এই সেরোম লিলি। চিত্রা দি রুমালে চোখ মোছেন। কিছুটা ভারি হওয়া সত্ত্বেও ওনার জল টলটল চোখ হঠাৎ মনে হয় যেন সেরোম লিলি      

 

পুড়িয়ে দাও মৈতৈ অক্ষর

-মহারাজ কয়াম্বা! নগরীর সিংহ দুয়ারের সামনে শান রাজ্যের রাজা পং এসেছেন। তিনি এক নতুন দেবতার বিগ্রহ আপনাকে উপহার দিতে চান!

দূত এসে ঘোষণা করলে রাজা কয়াম্বা অবাক হলেন। শান রাজ্যের রাজা পং হঠাৎ কেন তাঁর রাজ্যে আসবেন?

-আসতে বলো তাঁকে। যথোপযুক্ত সম্মানের সাথে তাঁকে অভ্যর্ত্থনা করে নিয়ে আসা হোক।

সেভাবেই শুরু হয়েছিল মণিপুরে বৈষ্ণব ধর্মের বিস্তার। রাজা কয়াম্বা যেদিন রাজা পংয়ের কাছ থেকে বিষ্ণু চক্র নিলেন, সেদিন থেকেই শুরু হলো এই রাজ্যে ব্রাহ্মণ পুরোহিতদের আনাগোনা। মোইরাং রাজ্যের বিষ্ণুপুরে কয়াম্বা নির্মাণ করলেন বিষ্ণু মন্দির। কয়াম্বার দু/তিন শতক পরে রাজা চারাই  রংবাই প্রথম বৈষ্ণব ধর্মকে রাজধর্ম ঘোষণা করলেন। চারাই রংবার পর পয়হরৈবার সময় শ্রী চৈতন্যের শিষ্য নরোত্তম দাস ঠাকুর নিজেই এলেন মণিপুরে ধর্ম বিস্তারে। পয়হরৈবা যার আর এক নাম ছিল গরীব নেওয়াজ, ভুলে গেলেন বাঙালী নরোত্তম দাসের কথায়।

-আমরা যে পিতৃপুরুষের দেব-দেবী সব ছেড়ে বৈষ্ণব বা হিন্দু ধর্ম গ্রহণ করছি, এর ফলাফল কি? নতুন ধর্মে আমাদের বর্ণ কি হবে?

-আপনারা ক্ষত্রিয় হবেন মহারাজ- যোদ্ধা জাতির শৌর্য পরিচয়ে পরিচিত হবেন আপনারা। এই দেখুন না মহাভারতে খোদ আপনাদের রাজকুমারী চিত্রাঙ্গদাই ছিলেন একজন নারী যোদ্ধা। তাই না মহারাজা?    

নতুন ধর্মের প্রতি সদ্য ধর্মান্তরিতের প্রেম সবসময়ই অধিকতর গাঢ় হয়। সেই মত্ত প্রেমোন্মাদনা থেকেই বোধ করি এক অদ্ভুত নিয়ম জারি করলেন পয়হরৈবা। মণিপুরে আজ থেকে সব ধর্মশাস্ত্র, সব রাজাজ্ঞা বা এক কথায় সব পুঁথি-পুস্তকই বাংলা বর্ণমালায় রচিত হবে। কারণ বাংলা ভাষাতেই প্রভু শ্রীচৈতন্য বৈষ্ণব ধর্ম প্রচার করেছিলেন। আর পুরণো মৈতৈ ভাষায় লেখা সব বই পুড়িয়ে ফেলতে হবে।

-হায়! এ কি অদ্ভুত কথা! মুখের ভাষা যে সাক্ষাৎ মা। সেই ভাষার অক্ষর আমরা ভুলে যাব? কেঁপে উঠলেন রাজ অন্ত:পুরে স্বয়ং রাজমাতা।

-এ ভুল করিস না বাবা- আমরা নতুন ধর্ম গ্রহণ করেছি ভাল কথা- তাই বলে পুরনো সব কিছু ভুলতে হবে কেন?

-মা- তুমি আমার মা। তোমার পায়ের নিচে আমার স্বর্গ। কিন্তÍ রাজ্য শাসনের সিদ্ধান্ত আমাকেই নিতে দাও।’

-মহারাজ- এ কি করে সম্ভব? বাংলার মত আমাদের বর্ণমালাতেও ক, স, ল বা খ রয়েছে। কিন্তÍ আমাদের বর্ণমালা যে সম্পূর্ণ ভিন্ন। মানব শরীরের এক/একটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের নামানুসারে আমাদের এক/একটি বর্ণ। যেমন, আমাদের বর্ণমালার প্রথম বর্ণের নাম হলো কোক যার অর্থ মাথা। পরবর্তী বর্ণ সম অর্থ হলো চুল যার বাংলা প্রতিবর্ণ হলো স। এমন ২৭টি বর্ণ দিয়ে আমাদের বর্ণমালা সাজানো। এমন অনন্য লিপিমালা যদি ভিনদেশী ভাষার জন্য আমার বদলে দিই, তবে আমাদের ভাষা…আমাদের সাহিত্য যে সব ধ্বংস হয়ে যাবে প্রভু!

রাজসভার বহুভাষী পণ্ডিত কর জোড়ে মিনতি করলেন।

ক্ষিপ্ত হলেন রাজা।

-পণ্ডিত- তুমি ভাষা আর সাহিত্যের মানুষ বেশ। কিন্তÍ স্বয়ং রাজার মুখে তর্ক করার সাহস তোমাকে কে দিল? কে আছিস কোথায়? পুরণো মৈতৈ বই সব পুড়িয়ে ফ্যাল্! আজ থেকে আমাদের নতুন ধর্ম আর নতুন ভাষা! 

গরীব নেওয়াজের পর আরো বড় বিষ্ণুভক্ত রাজা এলেন রাজা ভাগ্যচন্দ্র। তাঁকে নাকি স্বপ্নে স্বয়ং ভগবান বিষ্ণু দেখা দিয়ে বলেছেন তাঁর পূজা করতে। রাজা সিদ্ধান্ত নিলেন সমগ্র মণিপুরে রাস-লীলা জাতীয় নৃত্য করা হবে।

প্রকাণ্ড শরীর শুদ্ধ কাঞ্চন বরণ

আজানুলম্বিত ভুজ কমল লোচন।

বাহু তুলি হরি বলি প্রেমদৃষ্ট্যে চায়

করিয়া কল্মষ নাশ প্রেমেতে ভাসায়।

চৈতন্য শিষ্য গুরু শান্তি দাসের প্রবর্তনায় মণিপুর তার পুরণো দেব-দেবী ছেড়ে নাচতে শুরু করে বৈষ্ণব প্রেমের উন্মাদনায়।

মৈরা পাইবী: এভাবে ঘণ্টাধ্বনি

-সপ্তাহের ছয়টা দিন ত’পার্লারে কাটান। সিনিয়র বিউটিশিয়ান আপনি। রবিবার সকালে বাড়ির জন্য বাজার করেন। তারপর?

চিত্রা দি হাসলেন।

-রবিবার দুপুরে খেয়ে-দেয়ে পাড়ার মৈরা পাইবী অফিসে যাই।’  

-মৈরা পাইবী? অর্থ?

-দীপ বাহিকা। মণিপুরের সবচেয়ে বড় নারী আন্দোলন। শুরুটা হয়েছিল কোন দেশোদ্ধার করতে নয়। আমাদের এই পাহাড়ি রাজ্য ড্রাগস পাচারের ভয়ানক রুট। আমাদের পুরুষদের একটু নেশার অভ্যাস আছে। সেটা সেই ১৯৭৫ সালের কথা। আমরা ত’ তখনো বাংলাদেশে। কিন্তÍ এখানে নাকি এক মহিলা তার স্বামীকে মদের দোকান থেকে ফিরিয়ে আনতে গেলে দোকানদার উল্টো মহিলার গায়ে হাত তোলে। মহিলাকে ভয়ানক পিটায়। এর প্রতিবাদে গড়ে উঠলো ‘অল মণিপুর ওমেন সোশ্যাল রিফর্মেশন এ- ডেভেলপমেন্ট’ নামে একটি সংগঠন। মণিপুরী ভাষায় এদের নাম রাখা হলো মৈরা পাইবী  বা দীপ বাহিকা। শুরুতে সিনেমা হলে মর্ণিং শো…আমাদের পুরুষেরা একটু অলস ত’ জানোই…সিনেমা হল আর মদের দোকানের হাত থেকে বাড়ির পুরুষদের রক্ষার আন্দোলন হিসেবে শুরু হলেও বেশিদিন এমনটা রইলো না।

চিত্রা দি একটু চুপ করে থাকলেন।

-বাংলাদেশ থেকে এখানে এলাম যখন…তখন কত আশা নিয়ে এসেছি। কিন্Í এখানে এসে দেখছি পরিস্থিতি ত’ কম ভয়ের না। এমন ভয়ানক সব ঘটনা এখানেও ঘটে যা বলার না।’

-যেমন?

– যেমন ধরো…এখানে…সেটা নাকি ‘৮০ সালের ঘটনা… বিদ্রোহী খুঁজতে সরকার নাকি একটি গ্রামের সব নারী-পুরুষকে সারাদিন রোদে দাঁড় করিয়ে রেখেছিল। এক গর্ভবতী মাকে কোলের শিশুসহ টেনে-হিঁচড়ে এনে গুলি করে নাকি মেরে ফেলেছিল। মারা যায় এক দশ বছরের বাচ্চা।  একই দিনে এক সরকারী অফিসারকে হত্যা করা হয়। মরে এক পঞ্চাশ বছরের নারী। তখন এই মৈরা পাইবীর মেয়েরা…১০,০০০ নারী নাকি রাস্তায় নেমে আসে আন্দোলনে। পুলিশ ৫০০ মৈরা পাইবীকে এ্যারেস্ট করে খোলা ট্রাকে করে নিয়ে যাবার সময় সিনাম পিয়ারী নামে আর এক প্রেগন্যান্ট মহিলাও নাকি ট্রাকের হ্যাঁচকা টানে পড়ে গিয়ে মারা যায়। 

 

 

 সত্যাগ্রহের অস্ত্রগুলো

‘অনশন সত্যাগ্রহের বড় অস্ত্র। যে কেউই এটা করতে পারেন না। শুধুমাত্র শারিরীক ক্ষমতাই এটার জন্য যথেষ্ট নয়। ঈশ্বরের প্রতি নিবেদন ব্যতীত অনশনের কোন অর্থ হয় না। শুধুমাত্র কারোর আত্মার গভীর থেকেই অনশনের আকাঙ্খা জাগ্রত হওয়া উচিত।

…একটি সত্যিকারের অনশনে স্বার্থপরতা, ক্রোধ, বিশ্বাসের ঘাটতি অথবা অধীরতার কোন জায়গা থাকতে পারে না। বরং অসীম ধৈর্য্য, দৃঢ় প্রতিজ্ঞা, উদ্দেশ্যের একাগ্রতা, শান্ত মনোভাব ও অক্রোধই অনশনকে সফল করে তোলার জন্য দরকার। কিন্তÍ যেহেতু একজন ব্যক্তি চাইলেই এতগুলো গুণের অধিকারী মূহুর্তেই হতে পারেন না, শুরুতে সত্যাগ্রহী উপবাসই তার করা উচিত।’

জানালার পর্দা সরিয়ে ইম্ফল প্রিজন হসপিটালের জানালা থেকে বৃষ্টি ভেজা গাছগুলো দ্যাখে শর্মিলা। গান্ধির বই আগে সে পড়ে নি। কোংপালের মেয়ে সে বাবা ইরম নন্দ আর মা ইরম অংবি সখী দু’জনেই বিষ্ণু ভক্ত মানুষ ছিলেন। তাদের বাড়িতে প্রতি বৃহষ্পতিবার মা অংবি সখীই আগে রাধা গোবিন্দের উদ্দেশ্যে উপবাস রাখতেন। ছোট বেলা থেকেই মা’র পূজার ঘরের প্রতি অসীম আগ্রহ ছিল শর্মিলার। পূজার ফুল তোলা, ঠাকুর-দেবতার জন্য শ্বেত ও রক্ত চন্দনের কাঠ ঘষে চন্দন বাটা, ফল কেটে প্রসাদ সাজানো, ধূপ পোড়ানো কি প্রদীপ জ্বালানো…মা’র আঁচল ধরে ঘুরঘুর করে ঘোরা…মা’র পায়ে পায়ে পূজার ঘর যেতে যেতেই মা’র সাথে প্রতি বৃহষ্পতিবার উপবাস রাখার অভ্যাসও হয়ে গেছিল তার শৈশব থেকেই।

২০০০ সালের সেদিনটাও ছিল বৃহষ্পতিবার। সন্ধ্যায় উপবাস ভঙ্গ করে রাধা গোবিন্দকে ভোগ দেবার জন্য বাসমতী চালের খিচুড়ি রাঁধা আর কিছু ফলের প্রসাদ করবে বলে ফল কেনার জন্য শর্মিলা চলে গেছিলো ছোট শহরের বাস স্ট্যাণ্ডটির পাশেই। বাড়ি থেকে বের হবার পরেই চারপাশে কেমন একটা শুনশান আতঙ্কের চেহারা। বিরক্ত হয়ে গলাটা একটু চড়ালো শর্মিলা, করিনো ঙসিসিবু? করি তৌরা জাৎনো? বাস-স্ট্যান্ড রোমদা রিক্সা’মা ফাউ চৎসি যাদ্রিসিবু (আজ কি হয়েছে? কোন একটি রিক্সাও কেন বাস-স্ট্যাণ্ড যেতে চাইছে না)?

-বাস-স্ট্যান্ডতা কাপ্নখ্রে হায়রি (বাস-স্ট্যাণ্ডের ওখানে নাকি গুলি চলেছে)!

-কাপ্নখ্রে? করিগী? কনানা কনাগা (গুলি? কেন? কারা কাদের করেছে)?

-আসাম রাইফেলসনা কাপ্পনি.. মী তরা রোম শিরে (আসাম রাইফেলস গুলি চালিয়েছে… প্রায় দশজন নাকি মারা গেছে)!

‘ করি ওয়ানো? কয়াম কুইরে (বলে কি? কতক্ষণ আগে)?

– মিনিট তরা ফাউ ফাদ্রি (মিনিট দশেকও নাকি হয় নি)।

– চৎসি, য়েংঙুসি (চলেন ত’দেখি)!

– চৎকদ্রো ইচে-নত্রগা যুমদা হল্লদ্রো? আদা মহৈরোই শিংনা শাওদুনা টায়ার মৈ থারি- পুলিশকা সেনাবাহিনীগসু থোকখ্রে- তান্থোক-তানসিন.. দমকলগী হোস পাইপনা তৌনা লম্বীগি ই চাম্থোক্লি হায়রি.. ঐনা খনবদি য়ুম হনবনা ফরনি (যাবেন দিদিমণি- নাকি বাসায় ফিরে যাবেন? ওখানে এর ভেতরেই ছাত্ররা রেগে গিয়ে বাসের টায়ার পোড়ােেচ্ছ- ওদিকে পুলিশ আর সেনাবাহিনীও নামছে- ধাওয়া… পাল্টা-ধাওয়া চলছে…দমকল থেকে হোস পাইপে জল ঢেলে নাকি রাস্তার রক্ত পরিষ্কার করা হচ্ছে…আমি বলি কি বরং বাসায় চলে যান)!

আর বাসা? জীবনেও রাজনীতি নিয়ে না ভাবা ইরম শর্মিলা উঠে বসলো একটি রিক্সায়। বারো ক্লাস করার পর আর পড়া-শুনা না করা শর্মিলা সেসময় একটি অফিসে শর্ট হ্যাণ্ড টাইপিংয়ের চাকরি করে। মাঝে মাঝে পাত্রপক্ষ আসে বিয়ের সম্বন্ধ নিয়ে।

বাস স্টেশনের সামনে যেতে যেতেই বিক্ষিপ্ত সঙ্ঘর্ষ। ছেলেরা আগুন ধরাচ্ছে বাসের চাকায়। গাছের গুঁড়ি কেটে ফেলে রাস্তায় দেওয়া হচ্ছে ব্যারিকেড। রাস্তায় নেমে আসছে বাড়ির মায়েরা- মাসীরা- প্রৌঢ় গৃহিনীরাও।

– মী তরাবু কাপখ্রে (দশজনকে গুলি করেছে)?

-কদাই? অশিবা হকচাংদি (কই? লাশ কই)?

-মাংখ্রে- পুম্নমক মালং ওনখ্রে-পুম্নমক থুপচিনখ্রে-থুপচিনশংদা (উধাও- সব হাওয়া-সব গুম-গুমটিঘরে)!

-লৈশাংবম ইবেতম্বি শিরে- ঐখোয় লৈকাইগী হনুবীদো- চহি হুমফু নিথোই শুবিনি! আহ! মবুক-মপাও তপচখ্রবীনিকো (লেইসাংবাম ইবেতম্বি মারা গেছে- আমাদের পাড়ার ঐ যে বুড়িটা- বাষট্টি বছর বয়স হয়েছিলো! আহা- বড় নরম-সরম মানুষ ছিল)!

-সিনম চন্দ্রমণিসু শিরে- চহি ১৮তা ফারিবা অঙাংনি (সিনাম চন্দ্রমণিও মারা গেছে- তার বয়স ছিল মাত্র ১৮ বছর)!

হোস পাইপে ধুয়ে ফেলা রক্তের অদৃশ্য ঘ্রাণ শর্মিলার নাকে এসে লাগলো কি? একটু কি ধাক্কা দিল? বুঝি বা সেই ধাক্কার টাল সামলাতে না পেরে হেমন্তের সেই মন কেমন করা দুপুরে উপবাসী শর্মিলা বসে পড়েছিল রাস্তার উপরেই। বাড়ি ফিরেছিলো কিন্তÍ শান্ত ভাবেই। সন্ধ্যার সময় সে দিব্যি ফল কেটে, খিচুড়ি রেঁধে রাধা গোবিন্দকে ভোগও দিলো। পূজা শেষ হবার পর মা যখন বাড়ির সবাইকে প্রসাদ বিলি করছিলেন, শর্মিলা বললো, ফরে-ঐঙোন্দা পিরক্লনু (থাক-আমাকে দিতে হবে না)।

-করি তৌরে? হকচাং নুঙাইত্রবা? নুমিৎচুপ্পমা চাক হেল্লুরগা করি’মা চারোই হায়দি কৈনো? ঙরাং নুংথাং মখাদৈ করিমা চাদ্রি নত্রো (কেন রে? শরীর খারাপ লাগছে? সারাদিন নির্জলা উপবাস করে কিছু খাবি না মানে? কাল রাতের পর আর ত’ কিছু খাওয়া হয় নি)!

-মরাল মচেৎমা লৈত্রবা মীশুক যাম্বা শিখ্রবদা- ঙসিদগী ঐ করিমা চাররোই (এতগুলো মানুষ বিনা দোষে মারা গেল- এর পর থেকে আমি আর কিছুই খাব না)।’

-করি ওয়ানো নংনা হাইরিসে শর্মিলা (এ তুই কি বল্ছিস শর্মিলা)?

-অচুম্বনি হায়রিসে (যা বলছি ঠিকই বলছি)।’

এভাবেই শুরুটা হয়েছিল। 

তিন দিন পর পুলিশ এলো বাসায়। হাতে তাদের চার্জ ওয়ারেন্ট। কি অপরাধ? না, ইরম শর্মিলা আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন। এটা ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০৯ ধারার আওতায় এক বিশাল অপরাধ: যদি কোন ব্যক্তি আত্মহত্যার প্রচেষ্টা চালায় তবে ঐ ব্যক্তি একবছর কারাদন্ডে দণ্ডিত হইবেন যাহা এক বছর কাল অবধি বর্দ্ধিত হইবে (অথবা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন)।’ সুতরাং ইরম শর্মিলাকে বন্দী হতে হবে। শর্মিলার এ দূর্দিনে  পাশে এগিয়ে এলো এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং ওয়র্ল্ড মেডিক্যাল এসোসিয়েশন। অনশনকে এ দুই প্রতিষ্ঠান আত্মহত্যার চেষ্টা বলতে রাজি হলো না। অনশনকারীরা বেঁচে থাকার উদ্দেশ্য ও আগ্রহ নিয়েই দিন কাটায় বলে তাঁরা মত ব্যক্ত করলেন। স্বাস্থ্য ভেঙ্গে গেল শর্মিলার। পুলিশ জোর করে তার নাকে গুঁজে দিল নল। সেই নল থেকে ঢুকতে লাগলো স্যালাইন, দুধ আর জুস। নাহ্…সেই থেকে দেখতে দেখতে সাতাশ বছরের শর্মিলার বয়স আজ ৪৩। আর দশটা ছেলে-মেয়ের মত বিয়ে করা, বাচ্চা নেওয়ার সহজ ছকে আর ঢুকলো না তাঁর জীবন। উল্টো জীবন হয়ে উঠলো থানা-জেল হাসপাতাল-ফোর্সড ফিডিং-নাকে ঢুকানো নলের ভেতর দিয়ে গড়াতে থাকা দুধ বা স্যালাইন আর পত্র-পত্রিকা বা টিভি চ্যানেলের ব্যগ্র সাংবাদিকদের হাজারটা প্রশ্ন।

– করিগিনো নংনা চাক হেনগনি হায়রিসে? মীচম অতৈ গুম্না ইচম চম্না হিংবা পুন্সিবু পামদ্রা নংদ্রি (কেন এই অনশন করছেন আপনি? আপনার কি আর দশজনের মত স্বাভাবিক জীবন পেতে ইচ্ছা করে না)?

-য়াম্না পাম্মি। মীচমগুম্না ঐসু চাক-এনসাং-হওয়াই-দই চানিংঙি, নুংথিন ওয়াইরম ইমানবী শিংগা ফুচকা নত্রগা ভেলপুরিসু চানিংঙি। অদুবু ‘আর্মড ফোর্সেস স্প্যাশাল পাওয়ার এক্ট-আফসপা’ লৌথোকত্রিফাওদি ঐনা পামজরসু হান্নগী মীচমগী পুন্সীদুদা হঞ্জিনবদি ওইথোকলরোই। মণিপুর হায়বদি অওয়াং-নোংপোক ভারততা মসি আইনসিগী মীংদা চৎথরিবা ওৎ-নৈবসে হায়নিঙাই লৈতবনি। মসিগী মায়োক্তা মথৌ তারগা ঐখোইগি পুন্সি মতোন লোম্বফাও লাওবা তাবনি (খুব করে। আর দশজনের মত আমারও ভাত-সব্জি-ডাল-দই খেতে ইচ্ছা করে, বিকাল বেলায় বান্ধবীদের সাথে ফুচকা বা ভেলপুরি খাওয়ারও শখ হয়। কিšত্ত যতদিন ‘আর্মড ফোর্সেস স্পেশ্যাল পাওয়ার্স এ্যাক্ট-আফসপা’বাতিল না হয়, ততদিন চাইলেও আমি আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারি না। মণিপুর বা গোটা উত্তর-পূর্ব ভারতে এই আইনের নামে যে সন্ত্রাস চলছে তা’ অকথ্য। এর প্রতিবাদ দরকারে আমাদের গোটা জীবন দিয়েই করতে হবে)।’  

সব মানুষেরই বন্ধু-শত্র থাকে। শর্মিলার কি নেই? ২০০৪ নাগাদ গোটা ভারত জুড়ে যখন প্রতিরোধ আন্দোলনের নেত্রী হিসেবে তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ছে তখন কেউ কেউ আবার তাকে স্ট্যান্টবাজ বা দেশদ্রোহী ট্যাগও দিচ্ছে। ২০০৬-এ জেলখানা থেকে মুক্তি মিললো তাঁর। মুক্তি পেয়েই তিনি ছুটলেন নয়া দিল্লির রাজঘাটে। গান্ধির বেদীতে ফুল দেবার স্বপ্ন যে তাঁর অনেক দিনের! সন্ধ্যায় দিল্লির যন্তর মন্তরে ছাত্র-ছাত্রী, মানবাধিকার কর্মী আর অন্য নাগরিকদের সাথে একটি বিক্ষোভ সমাবেশে যোগ দিলেন।

সে বছরই অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে আবার শর্মিলাকে গ্রেপ্তার করলো দিল্লির পুলিশ। সেই একই আত্মহত্যার অভিযোগ। আবার অল ইণ্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সে তাঁকে নিয়ে যাওয়া। সেখানে বসেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে আলাপ। এবার নোবেল বিজয়ী শিরিন এবাদিও সাথেও তাঁর দেখা হলো। শিরিন বললেন শর্মিলার কথা তিনি জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার কাউন্সিলে তুলবেন।  

২০১১-তে মনিপুরে ভারতের দূর্নীতি বিরোধী আন্দোলনের প্রাণপুরুষ আন্না হাজারেকে আমন্ত্রণ জানালেন। হাজারে তাঁর দুজন প্রতিনিধিকে পাঠালেন শর্মিলার সাথে দেখা করার জন্য। সে বছরেরই অক্টোবরে তৃণমূল কংগ্রেস শর্মিলার প্রতি সহমর্মীতা প্রকাশ করলো আর শর্মিলা মমতা ব্যানার্জিকে বললেন আফসপা তুলে নিতে। ৩রা নভেম্বর আম্বারিতে ১০০ নারী শর্মিলার পক্ষে সংহতি প্রকাশ করতে মানব বন্ধন গড়লো। বিভিন্ন সিভিল সোসাইটি গ্রুপ ২৪ ঘণ্টা অনশন করলো শর্মিলার স্বপক্ষে। ২০১১-এর ডিসেম্বরে শর্মিলার ৩৯তম জন্মদিনে সম্মান জানাতে পুনে বিশ্ববিদ্যালয় ৩৯ জন মণিপুরী ছাত্রীকে ডিগ্রি কোর্সে ভর্তি করালো। এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল শর্মিলাকে বিবেকের বন্দী অভিধায় ভূষিত করে বললো সে তার বিশ্বাসের একটি শান্তিপূর্ণ প্রকাশ।    

– চাক হেনবগী ওয়ারেপ লৌরবা তুংদা অসুক যামবা চহী কয়া মখাদা ঙসিফাও নং ইমাগা উনদ্রি। নুঙাইতবা পোকত্রা (অনশনের সিদ্ধান্ত নেবার পর থেকে গত এতগুলো বছরে মা’র সাথে একবারও দেখা করেন নি। খারাপ লাগে না)?

-য়াম নুঙাইতে। অদুবু করিদি তৌরনি। ইমাগী মাংদা চৎকদবা কিজৈ। চৎপগা হেকতা চাক চাও হায়না তকশিলক্কদবা মতৌদুদা ঐ চাদনা লৈবা ঙ¤োই (খুব খারাপ লাগে। কিন্তÍ কি করবো? মা’র সামনে ভয়ে যাই না। গেলেই ভাত খাবার জন্য এত বলবে যে সে অনুরোধ ফেলতে পারব না)

-অদুদি নং কৈদৌনুংদসু ইমাগী মাংদা চৎলরোই হায়রিব্রা? চাকসু চাররোইদ্রা (কোনদিনই কি তবে মার সামনে যাবেন না? ভাত খাবেন না)?

 আপুনবা লুপ

 আসাম রাইফেলসের সৈন্যদের হাতে থোংজাং মনোরমার নির্মম ধর্ষণ ও হত্যার প্রতিবাদে আপুনবা লুপ আগামীকাল ইম্ফলে ১২-ঘণ্টা সাধারণ ধর্মঘট ডাকছে। আপুনবা লুপের প্ল্যাটফর্মে সমবেত হয়েছে ৩২টি নারী সংগঠন, ছাত্র ও বেসামরিক সংগঠন।

-বন্ধুরা- আমাদের বোন থোংজাং মনোরমার নির্মম ধর্ষণ ও মৃত্যু বিষয়ে নিশ্চিত আপনারা সবাই জানেন। তার গোপণাঙ্গ, স্তন ও ঠোঁটে গুলি করা হয়েছে। এ অবস্থায় আসছে ৫ই সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী শিবরাজ পাতিলের সফরকে স্বাগত জানাতে আমরা ১২ ঘণ্টার ধর্মঘট ডাকছি। সবাই অংশ নিন  (আসাম রাইফেলসকি লান্মীসিংনা থাংজম মনোরমাবু নৈহৎখিবা অমসুং হাৎখিবগী মায়োক্তা অপুনবা লুপনা হয়েং ইম্ফালদা পুং১২ চুপ্না বন্দ কৌখ্রে অপুনবা লুপকি প্ল্যাটফর্মদা নুপীগি সংস্থা, মহৈরোই অমসুং মীচমগী সংস্থা ৩২ পুনখ্রে মরপসিংঐখোয়গী ইচল থাংজম মনোরমাবু নৈহৎপীখিগিবা অমসুং হাৎখিবগী মরমদা ময়াম তঙায়ফদনা খংবিরবনি মাকি হকচাংগী অরোনবা মফমদা, থবাক্তা অমসুং চিনবান্দা গুলি কাপশিনখি ফিভম অসিদা কেন্দ্রগী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী শিবরাজ পাতিলনা সেপ্টেম্বরগী তাং মঙাদা লাক্কদৌরিসিবু ঐখোয়না পুং১২ চুপ্পগী বন্দনা তরাম্না ওকচগনি ময়াম শরক য়াবিউ ।’

দেখতে দেখতে দ্রুতই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে মনিপুর। গেল ১৫ই আগস্ট ভারতের স্বাধীণতা দিবসে মাত্র উনিশ বছরের ছেলে পেবাম চিত্তরঞ্জন মংগং নিজের শরীরে আগুন ধরিয়ে কালা কানুন আফসপা বন্ধের দাবিতে আত্মহত্যা করার পর শান্ত আর দূর্গম এই উপত্যকায় সত্যিই যেন এক ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরি আবার জেগে উঠছে। বিষ্ফারিত হচ্ছে লাভা।

ভারতীয় কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব মণিপুর নিয়ে কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না। রাজ্যের কংগ্রেসী মুখ্যমন্ত্রী ইবোবি সিং একবার বললেন ইম্ফল থেকে আফসপা কালাকানুন বাতিল করবেন। আবার এই বলছেন আপুনবা বিচ্ছিন্নতাবাদী চরমপন্থীদের সংগঠন। কেন্দ্রে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন প্রগতিশীল জোট ইম্ফলে আফসপা  তুলে দেবার কথা বললেও মনিপুরে রাষ্ট্রপতি শাসনের ভয় দেখাচ্ছে।

এদিকে থোংজাম মনোরমার স্তন-যোনি-ঠোঁটে গুলি করে যারা হত্যা করেছিল সেই আসাম রাইফেলস পত্র-পত্রিকা ও সুশীল সমাজের চাপে গড়ে ওঠা তদন্ত কমিশন-কে কোন পাত্তাই দিতে চাইছে না।

-মণিপুরে মূল নিরাপত্তা বাহিনী ত’ এই আসাম রাইফেলস। খোদ ভারতীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর অপারেশন কন্ট্রোলের আওতায় পরিচালিত। গোটা উত্তর-পূর্ব ভারতের সাতটি পাহাড়ি ও বিদ্রোহী রাজ্যে আফসপা আইনটি চালু আছে। সেই বৃটিশের আমলে উত্তর-পূর্বের স্বাধীণতাপ্রিয় পাহাড়িদের দমন করতে এই আইনটি চালু করেছিল বৃটিশ শাসকেরা,’ শেরাম জিতেন্দ্র সামনে রাখা চায়ের কাপে চুমুক দেয়। ইম্ফলের একটি রেস্তোরাঁয় আমি তার মুখোমুখি বসে।

শেরাম জিতেন্দ্র ইম্ফলের নামী তরুণ এ্যাক্টিভিস্ট। থোংজাম মনোরমার মৃত্যুর আগে মেয়েটির সাথে তার একটি প্লেটোনিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। জিতেন্দ্র ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র। এর আগে সে বাংলাদেশে কখনো থাকে নি। কাজেই বাংলা জানেও না। তার সাথে আমার কথোপকথন হচ্ছে সম্পূর্ণ ইংরেজিতে।

-তাই? আফসপা বৃটিশ আমলের আইন?

 -নয় তো কি? সেই উনিশ শতকেই ত’ উত্তর-পূর্বের এই সাতটি রাজ্য দমন করতে বৃটিশের এই আইন তৈরি। ১৯৪৭-এর পর আসাম রাইফেলসকে আরো বাড়ানো হয়। শুনুন- বৃটিশ ঔপনিবেশিকরা ১৯৪২-এ আর্মর্ড ফোর্সেস স্পেশ্যাল পাওয়ার্স এ্যাক্ট চালু করে। গান্ধি আর ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের গড়ে তোলা আন্দোলন ক্যুইট ইণ্ডিয়া থামিয়ে দিতেই আইনটি চালু করা হয়েছিল। ১৯৪২-এর এই আইনে সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন র‌্যাঙ্ক থেকে শুরু করে যে কোন কমিশনড অফিসারকে লিখিত ভাবে যে কোন ব্যক্তিকে হত্যা করার জন্য তার অনুগত সৈন্যদের নির্দেশ দেবার ক্ষমতা দেওয়া হয়।’ 

-বলে কি?

-আপনি এটুকু শুনেই অবাক হচ্ছেন?

 শেরাম জিতেন্দ্র একটি সিগারেট ধরায়।

-১৯৫৫ সালে আসাম সরকার নাগাল্যাণ্ডে সিচ্যুয়েশন কন্ট্রোল করতে আসাম ডিস্টার্বড এরিয়াস এ্যাক্ট বলে একটি আইন প্রবর্তন করে। নাগাল্যাণ্ড তখনো আসামের অংশ। আয়রনি কি জানেন…বৃটিশের আইনে তা-ও মিনিমাম একজন ক্যাপ্টেন

র‌্যাঙ্কের কারোর উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে লিখিত অনুমতি নিয়ে তবে মানুষ মারতে হতো। আর স্বাধীন ভারতের আফসপা আইনে সিপাইয়ের উপরের যে কোন র‌্যাঙ্কের সেনা অফিসার কোন লিখিত অনুমতি ছাড়াই যে কাউকে গুলি করে মারতে পারে।’

-দাঁড়ান-দাঁড়ান-আমার ধাক্কা লাগছে। বাংলাদেশে জিয়াউর এমন একটি বিল করেছিলেন আমরা যখন শিশু সেই সময়ে। বড় হয়ে সে আইনের কথা শুনেছি। পার্বত্য চট্টগ্রামে নানা তামাশাই করেছে আমাদের সেনাবাহিনী। তাই বলে ভারতের মত এত বড় একটা গণতান্ত্রিক দেশেও এমন ঘটনা ঘটেছে? এমন বিশ্রী সব আইন? এই আইন ভারতের সংসদে পাশ হয়েছে বলতে চান?

-নাহলে আমরা দলে দলে মরছি কেন?

জিতেন্দ্র সব্জি কাটলেটের একটি প্লেট কাঁটাচামচ আর ন্যাপকিন সুদ্ধ আমার দিকে এগিয়ে দিতে দিতে বলে, ‘১৯৫৮ সালে ভারতীয় সংসদে খোদ জহরলাল নেহেরুর নেতৃত্বে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা  রক্ষায় এই আইন পাস করা হয়। আইনটির ছয়টি অনুচ্ছেদ হুবহু আসাম রাজ্য সভায় পাস হওয়া আইনটির ভাষা ব্যবহার করেছে। ১৯৯০-এ এই আফসপাই জম্মু ও কাশ্মিরেও সম্প্রসারিত হলো।   এই আফসপার জোরেই ভারতীয় সেনাবাহিনী উত্তর-পূর্বের সাতটি রাজ্য আর জম্মু এবং কাশ্মিরে যা খুশি তাই করতে পারে। এই দেখুন!

কাঁধের ব্যাগটি খুলে আরো কিছু কাগজ-পত্র বের করে জিতেন্দ্র। —এই দেখুন- খোদ ইউএন হিউম্যান রাইটস কমিটি বলছে যে আফসপা আইনের ধারা ৪ ইন্টারন্যাশনাল কোভেন্যান্ট অন সিভিল এ- পলিটিক্যাল রাইটসের সাথে কতটা অসঙ্গতিপূর্ণ! অথচ ভারত সরকার ত’এই আন্তর্জাতিক সনদে স্বাক্ষর করেছিল। সেই ১৯৭৯ সালেই। তবে? আরো মজার ব্যপার কি জানেন…কংগ্রেসের মত সেক্যুলার দাবি করা দল বলেন আর বিজেপির মত গোঁড়া হিন্দুত্ববাদী দল বলেন, আফসপা বাতিল কেউই করবে না। করতে চায় না। এই কালাকানুনের সুযোগ তারা সবাই নিতে চায়।’ 

-কিন্তÍ আসলে উত্তর ভারতের সাথে বা কেন্দ্রের সাথে আপনাদের সমস্যাটা ঠিক কি নিয়ে?

-নানা কিছু নিয়েই। উত্তর-পূর্ব ভারতের আজকের এই যে সাতটি রাজ্য- আসাম, মনিপুর, নাগাল্যা-, মিজোরাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা আর অরুণাচল প্রদেশ- এদের ভেতর নাগাল্যাণ্ড, মিজোরাম আর ত্রিপুরা সবই ১৯৪৭-এর পর আসাম রাজ্যে ছুরি চালিয়ে তৈরি করা হয়।

এই যে সবুজ সব পাহাড় দেখছেন- প্রতিটি রাজ্য কত যে খনিজ আর বনজ সম্পদে ভরা! তারপর ধরুন জীব বৈচিত্র্য। বর্ষার সময়ে এত বৃষ্টি হয় যে অনেক ওষধি গাছ আবার চীন, মিয়ানমার, ভুটান এবং বাংলাদেশের সাথে ভারতের সীমান্তরেখাগুলো এই উত্তর-পূর্ব ভারতের চারপাশেই চলে গেছে। অভ্যন্তরীণ ভাবে আসামে ও পশ্চিম বাংলার সরু জায়গার সাথেও আমাদের ছোট করিডর আছে।’

-কোল্ড ড্রিংকস্, কফি অর কুছ পিয়েগা ম্যাডাম?’

একটি ছোট ছোট চোখের, ঝকঝকে ফর্সা ছেলে ওয়েটার আবার এসে দেখে যায়।

 

বিষ্ণুপ্রিয়া একটি মেয়ের নাম

বিষ্ণুপ্রিয়া একটি মেয়ের নাম। ইসশ্…বুঝি কোন সাধারণ মেয়ের নাম? স্বয়ং শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর স্ত্রীর নাম ছিল বিষ্ণুপ্রিয়া। বিয়ের আগে মেয়েটির নাম ছিল লক্ষীপ্রিয়া। প্রভুই তাকে আশীর্ব্বাদ করে বলেছিলেন বিষ্ণুপ্রিয়া হতে। বিষ্ণুপ্রিয়া  কি করে মণিপুরীদের একটি অংশের নাম? একটি ভাষার নাম? বিষ্ণুপ্রিয়া যেন একটি ভাষা, একটি মেয়ে…সন্ধ্যাবেলায় উঠানের ভিটেতে তুলসীতলায় দাঁড়ানো সেই শাঁখ বাজানো বধূ যাকে সন্ন্যাসগামী যুবক স্বামী বললেন দেবতা বিষ্ণুুুর প্রিয়া হতে। …এই বিকেলটা সিনসম যুদ্ধচন্দ্রের লজ্জা লজ্জা লাগছে। আজ জয়ন্তী সিনহার বাবা আসবেন তার বাবার কাছে বিয়ের সম্বন্ধ নিয়ে। কিšত্ত বাবা যদি রাজি না হন? বাবা যা কট্টর মৈতৈ! জয়ন্তী শুরুতে এ প্রেমে রাজি ছিল না, তোমার বাবা খুব কট্টর। কিছু মনে করো না। উনি থেকে থেকে মৈতৈ আর বিষ্ণুপ্রিয়া বিরোধের কথা তোলেন। আমার ভাল লাগে না! শেষমেশ উনি আমাদের সম্পর্কে রাজি হবেন না। বরং তুমি কোন মৈতৈ মেয়েকেই ভালবাসো!

-এভাবে কি জোর করে ভালবাসা হয়? আজকাল ত’হিন্দু-মুসলিমও কত প্রেম-বিয়ে হয় আর এটুকু পারব না আমরা? এক ভানুগাছের ছেলে-মেয়ে আমরা। কয়েকশ বছর আগে আমাদের পূর্বপুরুষেরা ভারতের মণিপুর বা আসাম ছেড়ে বাংলাদেশের সিলেটে এই ভানুগাছ এসে বসতি গাঁড়েন। আমাদের ধর্ম এক। শুধু ভাষা কিছুটা ভিন্ন। তবু ভালবাসতে পারব না আমরা পরষ্পরকে?

-শেষমেশ এটা হবে না। আর পরিণতিহীন প্রেম খুব বাজে লাগে। মেয়েদের জন্য এর কোন মানেই হয় না। প্রতিটা মেয়ে দিন শেষে চায় সংসার-সন্তান-সম্পর্ক। আমাকে ভুলে যাও।’

-কোনদিন না।

দাঁতে দাঁত চেপে বলে সিনসম যুদ্ধচন্দ্র।

-মানে?

-মানে কোনদিন না- দ্যাখো জয়ন্তী…আমি তোমার বিষ্ণুপ্রিয়া ভাষা বলতে পারি না বা তুমি আমার মৈতৈ ভাষা বলতে পারো না- তাতে কি যায় আসে? তুমি আমারই হবে। অন্য কারোরই হতে পারো না।

-এমন অর্থহীন কথার কোন মানে হয় না।

‘হোয়াট ডু ইউ মিন বাই মিনিংলেস?

 সিনসমের মাথার স্পাইক চুলগুলো একটু খাড়া হয়ে ওঠে। এম্নিতে সে ফ্যাশন দুরস্ত ছেলে। জয়ন্তীর সাথে তার পরিচয় গতবছর মৈতৈ মণিপুরী ছেলেদের ঐতিহ্যবাহী মার্শাল আর্ট প্রদর্শনীর অনুষ্ঠানে। জয়ন্তী তার বোনের সাথে পড়ে। জয়ন্তীই বোধ করি তার লাজুক, নিষ্পাপ চোখে কিছুটা পলকহীন তাকে দেখেছিল যখন স্টেজ থেকে নামার পর বোনের মাধ্যমে পরিচয় হলো। সেই থেকে তিন মাস চিঠি চালাচালির পর আজ নদীর পাশে এই সন্ধ্যার মেদুর, নেশা লাগা জ্যোৎস্নায় এই কিনা জয়ন্তীর সিদ্ধান্ত? একটা বেগুনী মণিপুরী শাড়ির উপর লাল খয়েরি মণিপুরী চাদর পরেছে জয়ন্তী। বেছে বেছে এমন সব রং পরা যেন সিনসমের শরীরে আগুন ধরে যায়। এত সহজ না জয়ন্তী- সিনসম তোমাকে এভাবে যেতে দেবেই না!

-আসলাম!

‘আসলাম মানে? দশ দিন পর এসেই যাওয়া?

-পরীক্ষা ছিল

 মাথা নিচু করে জয়ন্তী। কপালের কাছে তার চুল ওড়ে।

‘সে ত’ জানি। দশ দিন তাই তোমাকে একটাবার আসতে বলি নি। আর এখন এসেই চলে যাবে। এসব কি?

-যা হবে না তা’ নিয়ে কথা বাড়িয়ে লাভ কি? আর তাছাড়া..

–তাছাড়া?

-আমার বাসায় বিয়ের কথা চলছে।

-তাই বলো! পাত্র নিশ্চিত অনেক বড়লোক?

-সিনসম? ধমকে ওঠে জয়ন্তী ক্রোধে। চাঁদের আলোয় বেগুনী শাড়ির উপর খয়েরী চাদরের জয়ন্তীকে হঠাৎই এক টানে কাছে টেনে নেয় সিনসম।

‘থোংবি! 

-থোংবি? অর্থ?

-মৈতৈ ভাষায় এ শব্দের অর্থ জ্যোৎস্না। তুমিই আমার থোংবী।’

‘ছাড়ো সিনসম- পাগলামি করো না।

 -তুমি আমার থোংবি- এলোমেলো জ্যোৎস্না। এই মোইরাং পুরুষ তার বিষ্ণুপ্রিয়া নারীকে নিয়ে…তার প্রেমিকাকে নিয়ে সারা পৃথিবীর সাথে যুদ্ধ করবে। তবু তুমিই আমার থোংবি। তোমাকে পান করা অর্থ জ্যোৎস্নাকে পান করা-

-ছাড়ো বলছি- সিনসমের কঠিন আলিঙ্গনের ভেতর ধীরে ধীরে নরম হয়ে কাঁদতে শুরু করে জয়ন্তী।

-ডাকাত তুমি একটা

-তাইই ত’! অনেক দেরিতে বুঝলে।

-আমাকে নষ্ট করো না!

-থোংবি

-আমি বিষ্ণুপ্রিয়া নারী। চৈতন্যের মতই আমাকে ফেলে যাবে না ত?

প্রতিরোধ ফেলে শিথিল মগ্নতার ঘুমঘোরে অস্ফুটে বলে জয়ন্তী।

-কোনদিন না- তুমি আমার রাধা- ভরা জ্যোৎস্নায় তোমার সাথে ঝুলন খেলবো!

জয়ন্তী চোখ মুদে হাসে, রাধাকেও ফেলে গেছিলেন গোবিন্দ। তেমন হবে না ত’আমার?

-একটু চুপ করো জয়- ভালবাসতে দাও খানিকক্ষণ..

শিরীষ গাছের কাণ্ডে ঠেস দেওয়া অর্দ্ধ-চেতন, নিষ্পন্দ জয়ন্তীকে আদর করতে করতে বলেছিল সিনসম যুদ্ধচন্দ্র।

‘ঢালে কুসুম সুরভভার-

ঢালে বিহগ সুরবসার,

ঢালে ইন্দু অমৃতধার

বিমল রজতভাতিরে!

দেখলো সখী শ্যাম রায়,

নয়নে প্রেম উথল ইয়ায়!

মধুর বদন অমৃত সদন

চন্দ্রমায় নিন্দিছে!

চহী তরেত খুন্তাকপা (সেভেন ইয়ার্স ডিভাস্টেশন)

-তোমরা মৈতৈরা আমাদের বিষ্ণুপ্রিয়াদের মণিপুরী বলে একদম মানতেই চাও না- কেন বলো ত? খোদ পাঙান মণিপুরী বা মুসলিমদের পর্যন্ত মানো অথচ আমাদের মানো না!

রাজেন্দ্র সিনহা, পেশায় শ্রীমঙ্গল কলেজের শিক্ষক, টেবিলে মুখোমুখি বসা মানুষটিকে বললেন।

-কারণ সত্যিই যদি আমরা এক জাতির মানুষ হতাম, তবে এ ওর মুখের ভাষাটা অন্তত: বুঝতাম। একে অন্যের সাথে বাংলা ভাষায় কথা বলে আদান-প্রদান করতে হতো না। পাঙানরা আমাদের মতই মৈতৈ। কয়েকশ বছর আগে যুদ্ধবন্দী কিছু মোগল সৈন্যকে আমাদের রাজারা আমাদের মেয়েদের সাথে বিয়ে দিলে তাদেরই সন্তানরা ধর্মে ইসলাম আর ভাষা-সংস্কৃতি-পোশাক-অলঙ্কার-খাদ্যাভ্যাসে মণিপুরী বা মৈতৈ থেকে যায়…

 সিনসম অমৃত চন্দ্র হাই তুলে বললেন। মাত্রই গরমের দুপুরের ঘুম থেকে উঠেছেন তিনি। প্রায় দু/তিন ঘণ্টা ঘুমিয়েছেন। 

-সব বুঝলাম। কিšত্ত ভারতের মণিপুরে বিষণপুর নামে একটি এলাকা কি নেই? কাজেই আমরাও কি মণিপুরের সন্তান নই?

-কিছু মনে করো না। একটা সময় আসাম থেকে তোমরা বিষণপুর গেছিলে। আবার বর্মী রাজারা যে সাতটি বছর মণিপুরে চূড়ান্ত অত্যাচার চালালো, সেই চহী তরেত খুন্তাকপা বা ‘সাত বছরের যুদ্ধে’র সময় আমাদের মত তোমরাও অনেকে আবার আসাম, কাছাড়, ত্রিপুরা হয়ে বাংলাদেশের সিলেট পর্যন্ত এসে বাসা বেঁধেছো।’

-তার আগে রাজা ভাগ্যচন্দ্রের সময় থেকেই কি তোমরা মৈতৈরা বিশেষ করে এখানে আসো নি?

-হুম। সে ত’ বটেই। বার্মার সাথে সাত বছরের যুদ্ধটা হয় আঠারোশ’ সালের পর। আমরা প্রথম এখানে আসি মহারাজা ভাগ্যচন্দ্রের সময়। রাজার সাথে বনিবনা না হওয়ায় মোইরাং রাজ্যের মোইরাংথেম গোবিন্দের নেতৃত্বে একদল মণিপুরী প্রথম এই শ্রীমঙ্গলের সাতগাঁওয়ে বসতি গাড়ে। মোইরাংথেমের নাতনী রতœাবলীর বিয়ে হয়েছিল ত্রিপুরার রাজা ঈশান চন্দ্রের সাথে।

-কিšত্ত ভানুগাছের ওইনাম ইবুংহোল সিংহ ত’ বলে এগারো পুরুষ আগে তার বংশের মাইমু, য়ৌবা আর মঙলেম্বা প্রথমে কাছাড়, পরে বিশগাঁও আর শেষমেশ ভানুগাছে এসে বসত গড়ে।

-ইবুংবোল জেঠাকে আমি চিনি। তাঁর বাবা ছেঙ্গোই সিংহকেও চিনতাম। ছেঙ্গোইয়ের পিতা দুর্লভ, দুর্লভের বাবা মহেন্দ্র আর মহেন্দ্রর বাবা নাকি ছিলেন বল সিংহ যিনি বাংলাদেশে আসা মণিপুরী এক পরিবারের সপ্তম পুরুষ হিসেবে বংশ লতিকা লিখেছিলেন। এক/এক পুরুষে ২৩ বছর করে ধরলেও এই ওইনাম পরিবার সিলেটে এসেছিল ৩১৬ বছর আগে। সেটা মণিপুরে রাজা পাইখোম্বা, চরাইরোংবা বা গরীবনেওয়াজের সময় হয়ে থাকবে।’

-এই বংশলতিকাটা কার কাছে পাওয়া যায়?

-ওইনাম পরিবারের সবচেয়ে ছোট ছেলে ওইনাম রামেন্দ্রর কাছে পাওয়া যাবে। ওই যে ছেলেটা ইঞ্জিনীয়ার ওদের?

-আচ্ছা- ধরা যাক, আমাদের বিষ্ণুপ্রিয়াদের মণিপুরী বলে না-ই মানলে, চহী তরেত খুন্তাকপা  বা ‘সাত বছরের যুদ্ধ’-এর সময়টা কেন এত মণিপুরী সিলেট চলে আসে জানো?

-অনেকে বলে বার্মিজ আক্রমণের সময় মণিপুরে আমাদের জনসংখ্যা ছিল ছয় লক্ষ। যুদ্ধের সাত বছর পর মণিপুর রাজা যখন আবার রাজধানীতে ফিরলেন তখন রাজধানী ইম্ফলে জনসংখ্যা নাকি মাত্র দুই হাজার। মণিপুরীদের অনেকেই তখন সিলেট এমনকি ঢাকায় চলে গেছিল। ঢাকার মণিপুরীপাড়ায় আজ ত’ আর কোন মণিপুরী নেই।কয়েক বছর আগেও কয়েকটি মণিপুরী পরিবার ঢাকার মণিপুরীপাড়ায় থাকলেও আজ আর একটিও পরিবার নেই।

-খোদ সিলেট শহরের মির্জাজাঙ্গালের মণিপুরী বাড়িটি কি মহারাজ মারজিত বানিয়েছিলেন?

-সে ত’ বানিয়েছিলেন। কিšত্ত  ১৮৯৭-এর ভূমিকম্পেই সিলেট রাজবাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছিল। গোটা সিলেটে প্রলয় নেমে এসেছিল সেদিন। ইয়ে… এবার বলো ত’ রাজেন্দ্র…আজ এত বছর পর আমার বাসায় কেন? অনেকদিন ত’ আসো না!

-দ্যাখো- স্কুল জীবনের বন্ধু আমরা। দু’জনেই মণিপুরী যদিও আমাদের তোমরা মণিপুরী মনে করো না। যাই হোক, তোমার ছেলেটি আর আমার মেয়েটি দু’জনেই যে বড় হয়ে উঠেছে তা’ কি খেয়াল করছো? দু’জনেই দু’জনকে বেশ পছন্দও করে। তাই বলছিলাম…।’

‘আজকাল হিন্দু-মুসলিমেও বিয়ে হয়। আকছার হয়। কিšত্ত.

-কিšত্ত কি? অন্য ধর্মেও করা যাবে তবু বিষ্ণুপ্রিয়াকে নয়? তাই তো?    

 

বরণ দহনির এলা (বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা)

জয়ন্তী গত কয়েকদিন হয় খাওয়া-দাওয়া করছে না। সিনসমদের বাড়িতে বাবা নিজে জয়ন্তীর জন্য সম্বন্ধ নিয়ে গিয়ে অপমানিত হয়ে ফিরে আসার পর থেকে জয়ন্তীর খাওয়া-দাওয়া বন্ধ। বড় ভাই হিসেবে কি বলবে মৃনাল বুঝতে পারে না। পুরো পরিস্থিতিটাই এত নাজুক! আর কই গেল সিনসমের এত পৌরুষ? নাহ্, মেয়েটাকে তুলে খাওয়াতে হবে। এভাবে চললে  মারা পড়বে। বাবার ধমক, মা’র কান্নাকাটি…কিছুতেই কিছু মুখে তুলছে না। কদিনেই শুকিয়ে গেছে। চোখের নিচে কালি পড়েছে। ঠিক যেন বিরহিনী রাধা!

ছোটবেলায় বাংলা স্কুল থেকে ফেরার পর বাবা-মা বাচ্চারা যেন বিষ্ণুুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষা ভুলে না যায় সে জন্য ‘বরণ দহনির এলা (বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা) আর মাদোই সরালেলের এলা (মাদোই সরালেলের গান) শোনাতো। এই গানগুলো বৈষ্ণব ধর্ম আসার আগের কৃষি সমাজের গান । কিভাবে দেবতা পাহাংপরের কৃপায় এক খরা পীড়িত রাজ্যে বৃষ্টি এলো তার গল্প। মাদোই সরালেলের গানে দুই দেবতা সরালেল আর মাদোইয়ের গল্প। জয়ন্তী আজো যেন সেই ছোট মেয়েটি রয়ে গেছে যে দাদার হাতে চকলেট না পেলে, বরণ দহনির এলার গান শুনতে না পেলে ভাত খাবে না! ভক্তদের মনে বেশি আধিপত্যের জন্য সরালেল আর মাদোইয়ের ভেতর লড়াইয়ের নানা খুঁটিনাটি শুনতে না পেলে যে ছোট বোণটি তার ফোকলা দাঁতে হাসবে না। অথচ কত বড় হয়েছে জয়ন্তী এখন! রবীন্দ্রনাথের ভানু সিংহের পদাবলীর গানের সাথে কি সুন্দর নাচে!

-কহ রে সজনী এ দূরইয়োগে কুঞ্জে নিরদয় কানা,

দারুণ বাঁশি কাহ বজায়তে সকরুণ রাধা নাম,

মোতি মো হারে বেশ বনা দে, সিঁথি লগা দে ভালে-

উরহি বিলুণ্ঠিত লোল চিকুর মম, বাঁধ হো চম্পক মালে।

নিজের ভাই বলে বা নিজেও থিয়েটারের সাথে জড়িত বলে নয়, শাঙন গগনের মত্ত বাদল দিনে অভিসার গমনরতা রাধা চরিত্রে জয়ন্তীর নাচে চোখের মুদ্রা সত্যিই দেখার মত। সেই বোণটা একটা প্রেমের ব্যর্থতায় এমন ভেঙ্গে পড়বে?

-জয়ন্তী!

বোণের ঘরের দরজায় করাঘাত করতে করতে মৃণাল দ্যাখে আকাশে পিঙ্গল মেঘ ধেয়ে আসছে! মৌলভিবাজারের কমলগঞ্জের যত মৈতৈ আর বিষ্ণুুপ্রিয়া মণিপুরী গ্রামে কিম্বা পাঙান মণিপুরী মুসলিম গ্রামে ঝড় আর শিলবৃষ্টি হবে। গঙ্গানগর, শ্রীপুর, কাটাবিল, হক্তিয়ারখোলা, ভানুবিল, ভানুগাছ, ছোটধামাই, গৌরাঙ্গবিল, বড়ধামারি, পাথারি, পুথাডহর, হৌজালি আরো কত গ্রামে ধূ ধূ বৃষ্টি নামবে! দরজা আটকে গ্রামে গ্রামে মা-বাবারা শোনাবে ভানু বিল লড়াইয়ের গল্প, বৃটিশ আমলে অত্যাচারী গোরা রাজের সাথে সাহসী মণিপুরী সেনাপতি টিকেন্দ্রজিতের গল্প! 

ড্রাগন  আসার আগেই গড়াবে সাদা মানুষদের কর্তিত মুণ্ডু

মণিপুরে এ প্রবাদ’ বহুদিন ধরেই প্রচলিত ছিল যে এ জনপদে ড্রাগন আসার আগেই সাদা মানুষদের কাটা মুণ্ডু গড়াবে। কিšত্ত এই প্রবাদ যে বিশ্বাস করা কঠিন! যবে থেকে গোরারা এলো তবে থেকে সব কিছুর শাসন তাদের মুঠোয়। নইলে এই দ্যাখো রাজা চন্দ্রকীর্ত্তি কেমন বৃটিশের সামনে সদা হাত জোড় করে চলেন! চন্দ্রকীর্ত্তির আগেই রাজা গম্ভীর সিংয়ের সময় থেকে নাগারা মণিপুরের নাগা পাহাড়ে এসে লুট-তরাজ চালাতো, চালাতো খুন-খারাবি আর গম্ভীর সিং সবটা একা হাতে সামাল দিতে পারতেন না। গম্ভীর সিংয়ের পর রাজা চন্দ্রকীর্ত্তি আস্ত ভিতুর ডিম একটা! বীরত্ব বলতে কিছুই নেই তার। মণিপুরের নয়া নিযুক্ত বৃটিশ রাজদূত জনস্টোন চন্দ্রকীর্ত্তিকে নাগাদের হাত থেকে রক্ষার প্রতিশ্র“তি দিলেন। নাগারা এম্নিতেই বেশ দুর্দ্ধর্ষ জাত। মণিপুরীদের মত নৃত্য-গীত-ললিত কলায় তারা ব্যস্ত থাকে না।

 চন্দ্রকীর্ত্তি  এম্নিতেই ভীতু মানুষ। তার উপর নাগাদের হামলাতে বৃটিশের চরণধূলি নেওয়া ছাড়া তার সত্যিই কোন উপায় রইলো না। ১৮৮১ সাল অব্দি এমন চললো। এর মাঝেই ১৮৭৭-এ বার্মার রাজা সামজক মণিপুরের কোংগল সীমান্তে হামলা করে আট জন মানুষকে খুন করলে রাজা চন্দ্রকীর্ত্তি সেনাপতি থাংগালকে পাঠালেন বৃটিশ জনস্টোনকে সাহায্য করতে। ১৮৭৯ সালে হামলা করলো অঙ্গমি নাগারা। জনস্টোন আবার চন্দ্রকীর্ত্তির কাছে সাহায্য চাইলে চন্দ্রকীর্ত্তি এবার পাঠালেন তার তিন ছেলেকে। যুবরাজ সুরচন্দ্র, মেজর থাংগাল আর তৃতীয় পুত্র টিকেন্দ্রজিতকে। যুদ্ধে জিতলেন জনস্টোন কিšত্ত জেতার পরই ভুলে গেলেন বৃদ্ধ রাজার বন্ধুত্ব। জনস্টোন আরো ভুলে যাবেন ১৮৮৫ সালে তৃতীয় এ্যাংলো-বর্মী যুদ্ধে বুড়ো রাজা চন্দ্রকীর্ত্তির পাঠানো ২,০০০ সৈন্যের কথা। ভুলে যাবেই চিন্দুইন অরণ্যে ইংরেজ ও মণিপুর সৈন্যের সাথে বর্মীদের যুদ্ধের কথা।

জনস্টোন চাকরি থেকে অবসরে যাবার পর এলেন মেজর ট্রথার। মণিপুরে বৃটিশ রাজনৈতিক দূত হয়ে আসার ছসপ্তাহের মাথায় দুম করে মরে গেলেন তিনি। এবার এলেন গ্রিমউড। এদিকে মহারাজা চন্দ্রকীর্ত্তিও মারা গেলেন। যুবরাজ সুরচন্দ্র বসলেন ক্ষমতায়। গ্রিমউড ক্ষমতায় থাকলেন টানা ১৮৯১ সাল অবধি। এ সময়েই সুরচন্দ্রের শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হলেন অমাত্য নর সিংয়ের দুই পুত্র। সুরচন্দ্রও বাবার মতোই। খুব ভাল যুদ্ধ করতে পারেন না। টিকেন্দ্রজিত এগিয়ে এলেন ভাইকে রক্ষায়। এভাবে একরকম চলছিল। কিšত্ত দিন দিন বৃটিশের আচরণ হয়ে উঠতে লাগলো আরো উদ্ধত। সুরচন্দ্র যেন একটা পুতুল। ভাইয়ের আড়াল থেকে রাজ্যের প্রকৃত শাসক বীর যোদ্ধা টিকেন্দ্রজিত। কিšত্ত স্বাধীনচেতা টিকেন্দ্রজিতের ভাল লাগে না বৃটিশের আধিপত্য। ক্ষমতায় টিঁকে থাকার জন্য বড় ভাইয়ের বৃটিশ তোষামুদিও তাঁর মাঝে মাঝে অসহ্য লাগে। অবশেষে এলো সেই দিন। ১৮৯০ সালের ২১শে সেপ্টেম্বর। একদিকে বৃটিশের পুতুল বড় ভাই সুরচন্দ্র ও তার দলবল। অন্যদিকে স্বাধীনতা পিয়াসী টিকেন্দ্রজিত ও তাঁর দুই সহকারী অঙ্গুসেনৈা ও জিল লংগাম্বা। সুরচন্দ্র আবার গ্রিমউডের সাহায্য চাইলেন। গ্রিমউড বললেন সুরচন্দ্র যদি বারবার নিজেকে রক্ষায় অসমর্থ হন, তবে তিনি কি করে তাঁকে বাঁচাবেন?

-তবে আমাকে বৃন্দাবন পাঠান! আমি সব কিছু ছেড়ে-ছুড়ে দিই।

তাই হলো। সুরচন্দ্রকে বৃন্দাবন পাঠানোর ব্যবস্থা করা হলো। এবার ক্ষমতায় বসলেন টিকেন্দ্রজিতের আর এক বড় ভই কুল্লচন্দ্র। এদিকে সুরচন্দ্র বৃন্দাবন থেকে কাছাড় গিয়ে বৃটিশদের আবার অনুনয় করলেন তাকে ক্ষমতার মসনদ ফিরিয়ে দেবার জন্য। সুরচন্দ্র এরপর গেলেন কলকাতা আর বললেন তিনি স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছাড়েন নি। আসামের কমিশনার ল্যাণ্ডসডাউন চারশ রাইফেল নিয়ে এলেন মণিপুরে স্বাধীনতা পিয়াসী টিকেন্দ্রজিতকে দমন করতে। ইম্ফলে বৃটিশ সৈন্য ঢুকলো আর কুল্লচন্দ্র গেলেন তাকে অভ্যর্ত্থনা জানাতে। কুইন্টন, আসামের প্রধান কমিশনার, বললেন দুপুর বারোটায় সবাইকে নিয়ে তিনি দরবারে বসবেন। কিšত্ত নির্দিষ্ট সময় বৃটিশ বললো এখনো সময় হয় নি। কিছু অনুবাদের কাজ বাকি আছে। কুইন্টনের আসল উদ্দেশ্য ছিল স্বাধীনতাকামী টিকেন্দ্রজিতকে গ্রেপ্তার করা। টিকেন্দ্রজিত কিভাবে জানি এটা অনুমান করতে পারলেন। যুবরাজ বড়ভাইকে বললেন তাঁর শরীরটা ভাল লাগছে না; তাই প্রাসাদে ফিরে বিশ্রাম নেবেন। সেদিন দুপুরে যুবরাজ কুল্লচন্দ্র নিজেই অপমানিত হলেন বৃটিশদের কাছে। কুইন্টনের সাথে দেখা করানোর আগে অনেকক্ষণ বসিয়ে রাখা হলো তাঁকে। সেই রাতেই ৪২ গুর্খা রাইফেল বাহিনীকে সাথে নিয়ে ক্যাপ্টেন বুচার ঘুমন্ত মণিপুরী রাজপ্রাসাদে ঢুকলেন। উদ্দেশ্য টিকেন্দ্রজিতকে গ্রেপ্তার। কিšত্ত বুদ্ধিমান টিকেন্দ্রজিত আগেই পালিয়ে গেছিলেন। শুরু হলো নর-নারী-শিশুদের উপর অত্যাচার। মন্দিরের বিগ্রহ সব ভেঙ্গে ফেলা হলো।

পরদিন যুবরাজ কুল্লচন্দ্র আর বৃটিশ সেনাবাহিনীর ভেতর বিস্তর যুদ্ধের পর লেফটেন্যান্ট ব্র্যাকেনবারি সহ ১৪ জন গুর্খা ও বৃটিশ সৈন্য আহত ও তিন গুর্খা সৈন্যের মৃত্যুর পর বৃটিশরাই সন্ধি প্রস্তাব পাঠালো। তার পরের দিন দরবার হলে আবার বৃটিশ আর মণিপুর রাজের মুখোমুখি সভা। কিছুতেই দুপক্ষ সমঝোতায় এলো না।

…ব্যর্থ দরবার শেষে বৃটিশ সৈন্য যখন ফিরে যেতে লাগলো, তখনি টিকেন্দ্রজিতের নেতৃত্বে চারপাশ থেকে বৃটিশ সৈন্যদের আক্রমণ করলো আর সাদা মানুষদের মুণ্ডু গড়াতে লাগলো রাস্তায়। গ্রিমউড বর্শাবিদ্ধ হলেন। লেফটেন্যান্ট সিম্পসন মাথায় চোট পেলেন। অন্য বৃটিশ সৈন্যরা দুঘণ্টা দরবার হলে পালিয়ে থাকার পরও শেষমেশ মণিপুরী সেনা-জনতার হাতে ধরা পড়লো আর সবারই মাথা কেটে ফেলা হলো।

…আর এভাবেই বীর টিকেন্দ্রজিত সত্য প্রমাণ করলেন সেই মণিপুরী ভবিষ্যদ্বাণী যে ইম্ফলে অতিকায় ড্রাগন আসার আগেই এই নগরীর রাস্তার ধূলোয় ¯ত্তপীকৃত হবে সাদা মানুষের কর্তিত মুণ্ডু। 

আমিই খুন করেছি!

সাতসকালে মুচিকান্দি থানায় দলে দলে মণিপুরীরা ভিড় করেছে কেন? আর উত্তেজিত হয়ে ওরা ঈশিম জমাদারের নামই বা করছে কেন? ঈশিমের একটু মেয়ে-ঘেঁষা বাতিক আছে সবাই জানে। তাই বলে ও কি মণিপুরী পাড়াতে গিয়েও ওটা করেছে নাকি? মহা সর্বনাশ ! এই মণিপুরীরা এম্নিতে খুব শান্ত। আজ কয়েক পুরুষ হয় আসাম আর কাছাড় থেকে এরা এই সিলেটে এসে বসতি গেঁড়েছে। প্রায় সময় এদের মেয়েরা হয় তাঁত বুনছে, পুরুষেরা খঞ্জনী বাজিয়ে রাধাশ্যামের গান গাইছে, পূর্ণিমায় নারী-পুরুষ মিলে রাধা-মাধবের নাচ নাচছে। কিšত্ত একটি প্রশ্নে এরা বড্ড কট্টর। এদের মেয়েদের দিকে চোখ দিয়েছো কি মরেছো!

মুচিকান্দি থানার প্রধান প্রহ্লাদ ব্যানার্জি বাবুর দলে দলে ফর্সা আর বোঁচা নাক-মুখের মানুষগুলোকে দেখেই সাতসকালে অস্থির লাগা শুরু হলো। না জানি কি শুরু হবে এখনি! এম্নিতে এই মণিপুরীরা খুব ভদ্র। জমি বা গরু-ছাগল নিয়ে সিলেটি প্রতিবেশীদের সাথে কিছু নিয়ে ঝামেলা হলে খুব শান্তভাবে দরজার ওপাশ থেকে হাত জোড় করে, নমষ্কার জানিয়ে ওদের ভাষার টান মিশানো বাংলায় বলবে, বড় বাবু, আসবো? কিšত্ত আজ দেখি কোন নমষ্কার বা অনুমতি প্রার্থনা কিছুই না করে এরা হুড়হুড় করে বন্যার জলের মতো ঢুকে পড়তে লাগলো তাঁর কক্ষে।

-ঈশিম জমাদার কই?

-আছে। কেন? কি করেছে সে?

-কি করেছে মানে? গতকাল বিশগাঁও পরগণায় আমাদের এক মণিপুরীর বউকে সন্ধ্যাবেলায় পুকুরঘাটে একা পেয়ে সে তার গায়ে হাত দিতে গেল আর তুমি বলো বাবু সে কি করেছে? তোমারই তহশিলদার সে-

-শোন- শোন-

থানার বড় বাবুর কথা কিচ্ছুটি না শুনে ক্রুদ্ধ হাজার খানেক মানুষ ঈশিমকে টানতে টানতে নিয়ে চললো হাটে। থানার দেয়ালে ঝুলতে থাকা দুইটি বন্দুকও নিয়ে নিল তারা। টানতে টানতে ঈশিমকে এলাকার হাটে নিয়ে গিয়ে বন্দুক দিয়ে দুটো গুলি করলো শুধু তারা ঈশিম তহশিলদারের বুক বরাবর। তারপর বন্দুক ফেরত দিতে সোজা আবার এলেন থানায়। আচ্ছা বেকুব ত লোকগুলো! বাঙালী হলে কখন পালাতো! কিম্বা পালানো পরের কথা…কাউকে খুন করতে হলে লুকিয়ে-চুরিয়ে করতো! তা নয় বুদ্ধু, বোঁচা নাক-চোখের লোকগুলো নিজে থেকেই বললো,

-নে বড় বাবু! এখন শাস্তি দে-

-কি? কি করেছো তোমরা?

বাড়িতে খেতে-ঘুমাতে যাওয়া সিপাই-সান্ত্রিরা সব মাত্রই ডিউটিতে ফেরায় সাহস বাড়ে একটু বড় বাবুর।

-দিয়েছি ঈশিম জমাদারকে শেষ করে। এখন আমাদের ফাঁসিতে ঝোলা- 

-মানে?

-হ্যাঁ- বড় বাবু- ঐ যে দ্যাখো লাশ- চাদরে পেঁচিয়ে এনেছি! শাস্তি দাও-

দীর্ঘ ৩০ বছরের দারোগা জীবনে এমন কাণ্ড না দেখা বড় বাবু তোতলাতে থাকেন।

-কে- তোমাদের ভেতর কে খুন করেছে?

-আমি

-না- বড়বাবু- আমি-

-মিথ্যা বলছে বড়বাবু- আমি খুন করেছি-

হাজার খানেক মণিপুরী পুরুষ- পঁচিশ থেকে পঞ্চান্নো বছরের- বলতে লাগলো সে-ই খুন করেছে। শেষমেশ একজনকে ফাঁসি আর ত্রিশজনকে দ্বীপান্তর পাঠানো হলো। আন্দামান থেকে বছর বারো কি চোদ্দ বাদে কয়েকজন ফেরতও এলো। বিশগাঁওয়ের তারিণী চরণ, মদন মোহন আর ময়ালঙবাম তোলেন তাদের ভেতর কয়েকজন। বাকি জীবনটা নির্বিবাদে ঘর-গেরস্থি, ভিটেয় সব্জি চাষের মত কাজগুলো করে গেছে তারা। সন্ধ্যায় চণ্ডী মণ্ডপে কোন কোন দিন মন চাইলে হুঁকোয় তামাক পুড়ে কৌতুহলী চোখের নারী-শিশু-বুড়োদের তারা শোনাতো আন্দামানের জেলের গল্প, সেলের প্রকোষ্ঠ, সেইসব অন্তরীন দিন-রাত্রি, বৃটিশের সাথে লড়াই করে সাজা পাওয়া বাঙালী স্বদেশী বাবু আর রাতে সেলের ভেতর থেকে শোনা হু হু সমুদ্রের গর্জনের গল্প।   

লেইহাও কথা   

প্রিতিমপাশার জমিদার নওয়াব আলী আমজাদ খানের ভানুবিল, জঙ্গলিয়া, উত্তরগাঁও, কুনাগাঁও, সোনাগাঁও, নয়াপত্তন, মাজেরগাঁও এবং তেতাইগাঁও গ্রাম সহ মোট নয় খানা গ্রাম নিয়ে ভানুবিল মৌজা। এর বাঁদিক ঘেঁষেই তিলকপুর মৌজা। দুই মৌজারই কৃষকেরা অধিকাংশই মণিপুরী। জমি-জিরেত চাষবাস করে খায়। নওয়াব আলী আমজাদ খানের পিতামহ নওয়াব মোহাম্মদ আলী খানের সময়ই কাছাড় থেকে মণিপুরীরা এসেছিল। দুই পুরুষ আগেও মণিপুরীরা যখন এই মৌজায় আসে, তখনো ভানুবিল প্রকান্ড এক জঙ্গল। মণিপুরীরাই এই জঙ্গল সাফ করে মৃত্তিকা কর্ষণ করেছিল, করেছিল ধরিত্রীকে আবাদযোগ্য। আলী আমজাদ খান মানুষ স্ফূর্তিবাজ টাইপের। নানা সামাজিক-সাংস্কৃতিক কাজে ব্যস্ত থাকেন। তার তহশিলদারি সামলায় নায়েব রাসবিহারী দাস। প্রায় পঁয়তাল্লিশ হাজার কিয়াড় (পনেরো হাজার একর) জমির ৯,০০০ প্রজাকে সামলানোর কাজটি করেন মহা চতুর রাসবিহারী। সরল মণিপুরীদের কাছ থেকে খাজনা নিয়েও রসিদ দেন না তিনি। বোকা মণিপুরীরা চুক্তি-পত্রের ধারও ধারে না। তারা ভাবত খাজনা দেবার পর দায় পরিশোধকারী হিসেবে তাদের নাম অবশ্যই তহশিলদারি অফিসের কাগজ-পত্রে লেখা হচ্ছে। কিšত্ত একদিন বিনা মেঘে সহসাই দেখা দিল বজ্র। জমিদারের কাছাড়ি বাড়ি থেকে চিঠি এলো যে মণিপুরী চাষীরা সবাই যেন তাদের বকেয়া খাজনা শোধ করে। নাহলে এক্ষুণি তাদের জমি-জমা সব ক্রোক হবে। জমিদার সাহেবের এ হুকুমে সবাই বুঝলো এটা ধূর্ত নায়েবেরই কাজ। কিšত্ত জমিদারকে  নায়েব মশায় ততক্ষণে বুঝিয়ে ফেলেছে যে অলস চাষারা কাজ-বাজ কিছু করে না। খাজনা দেয় না সময়মতো। কাজেই তাদের জায়গা-জমি ক্রোক করতেই হবে। দেখতে দেখতে বছর ত্রিশেকের ভেতর জমির খাজনা কিয়াড় প্রতি বেড়ে হলো দশ আনা থেকে দেড় টাকা। সে ইংরেজি সাল ১৮৫৫ থেকে ১৯২২-এর কথা। ১৯২৭-এ কিয়াড় প্রতি জমির খাজনা হলো আড়াই টাকা। জমিদার একদিন ডেকে পাঠালো মৌজার মণিপুরী সব চাষাকে। লেইহাওয়ের বাবাও গেল পুরুষদের সে সভায়। ফিরে এসে আর ভাত তোলে না মুখে।

-ও লেইহাও- বাবাকে ভাত দে!

মা চুলার আগুনে লোহার কড়াইয়ে মুড়ি ভাজতে ভাজতে বলে।

বাবাকে ভাত কি লেইহাও খেতে দিচ্ছে না? বাবা যে মুখেই তোলে না। অনেক আব্দার করার পর বাবা মুখ খুললো মেয়ের কাছে। এতদিন যে এত খাজনা তহশিলদার অফিসে জমা দিয়ে এসেছে সে, নায়েব’ সবটাই মেরে দিয়েছে। জমিদার আজ তাদের ডেকে একটা কাগজে সই দিতে বলেছিল যেখানে সই দিলে এটা স্বীকার করে নেওয়া হবে যে তারা কোন খাজনা এত বছর জমিদারকে দেয় নি। এখন প্রতি মাসে আবার নতুন নতুন কিস্তিতে খাজনা দেওয়া হবে। তারা অবশ্য খাজনা দিতে রাজি হয় নি। রেগে গিয়ে জমিদারের পেয়াদারা তাদের অনেককে কাছাড়িবাড়ি আটকে রেখেছে। কেউ কেউ পালিয়ে এসেছে।

গঙ্গেচ যমুনে চৈব গোদাবরী, সরস্বতী, নর্মদা, সিন্ধু, কাবেরী..

ভোরে উঠে পুকুরের জলে স্নান করে আর মন্ত্র পড়ে লেইহাও মাত্রই তাঁত ঘরে ঢুকলো। গতকালই বেশ কিছু গাছের ছাল-বাকল, পাতা, ফল এগুলো সে যোগাড় করে রেখেছিল। আজ তাঁত বুনতে হবে। সামনে যদি সত্যি বাবার জমি ক্রোক হয়, তবে তাকে আর মাকে তাঁত বুনেই সংসার চালাতে হবে।

-তুই অমরেশ্বরের পুড়ি?

কর্কশ গলার একটি ডাকে তাঁতঘরে ঢোকার মূহুর্তে পিছন ফিরেই খুব অবাক হয়ে যায় লেইহাও। জমিদারের প্রায় ১৫-২০ জন পাইকের একটি দল এসেছে তাদের উঠানে।

গলা থেকে দ্বিতীয় স্বরটি বের করার আগেই খান খান হয়ে গেল লেইহাওদের উঠানের চুলা, তাঁত ঘরের তাঁত, বাবার চাষের লাঙল। লুট হলো হাঁস-মুরগী, গরু-ছাগল সব। শুধু জমিদারের পাইকেরাই নয়। আলী আমজাদ খানের হাতি বাহিনীর হাতিগুলো তাদের গোদা গোদা পায়ে মাড়াতে লাগালো কান্না আর পলায়নরত মণিপুরীদের ঘর-বাড়ি। তবে দেখতে দেখতে লেইহাওদের কান্নাকাটিতে আশপাশের গ্রাম আর মৌজাগুলো থেকেও মানুষ আসতে শুরু করলো এদিকে। লেইহাও নিজেই বর্শা-বল্লম এগিয়ে দিলো তার বাবা আর ভাইদের। ঘরে ঘরে মণিপুরী মেয়েরা তাদের বাবা, ভাই বা স্বামীদের হাতে তুলে দিল রান্নাঘরের বটি বা দাও, কুড়াল, লাঠি, জাথা, বড় বড় বাঁশ। জমিদার দলের অনেক পাইক-বরকন্দাজ ত বটেই খোদ নায়েব রাসবিহারী দাস মারা পড়লো সম্মুখ সমরে। 

দেখতে দেখতে এ সঙ্ঘর্ষের খবর ছড়িয়ে পড়লো খোদ সিলেট শহর অবধি। কৃষক আন্দোলনের এ খবর পেয়ে ছুটে এলো ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস, বাংলা প্রাদেশিক কৃষক সভা। মণিপুরী কৃষকদের ভেতর থেকেই বড় নেতা হয়ে উঠলো বৈকুণ্ঠ শর্মা, সর্দার কাশেম আলী, পঞ্চানন ঠাকুর, হাজি মোহাম্মদ ফজিজুর রহমান, রূপচাঁন্দ সিং আর বৈকুন্ঠ শর্মার মেয়ে লীলাবতী দেবী ওরফে লেইহাও। জেলে গেল বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী কৃষক গিরীন্দ্র সিনহা, খৌদাল সিনহা, থেম্বা সিনহা, নবদ্বীপ সিনহা, গৌরমণি সিনহা, রামেশ্বর সিনহা। চালান হলো তার সিলেট জেল আর বৃহত্তর সিলেটেরই ধূপদীঘিপুর জেলে। শান্ত-শিষ্ট, রাধা-মাধবের প্রেমে অষ্টপ্রহর নুইয়ে থাকা মণিপুরী কৃষকেরাই তল্লাট থেকে জমিদার ত বটেই, তাড়িয়ে দিল খোদ গোরা পুলিশকেও। আন্দোলন ভানুবিল থেকে ছড়িয়ে গেল গোটা ভানুগাছ উপত্যকায়। মণিপুরী মেয়েরা নিত্যদিনের তাঁত আর চুলা ছেড়ে গ্রামে গ্রামে মিটিং করতে ব্যস্ত হয়ে গেল। ব্যস্ত হয়ে পড়লো লেইহাও নিজেও। দু/তিন মাসের ভেতরেই তার বিয়ে হবার কথা ছিল। লেইহাওয়ের সেসব মনেই পড়ে না। জীবনে এমন কাণ্ড সে দ্যাখে নি কখনো। গায়ের রঙের কি হবে বা চুলের কি হবে এসব না ভেবে রোদের ভেতর টো টো করে বেড়ায় সে গ্রাম থেকে গ্রামে। সবাইকে বলে জমিদারের সাথে লড়তে হবে। নিজেদের বাঁচাতে হবে।

‘‘Honour’able British Parliament and Honura’ble Speaker of the House of Commons,

We, the Members of the Opposition (the Labour Party), wish to draw your attention to the ongoing Manipuri peasant upheaval in the Bhanubil area of greater Sylhet region. 

Me, Miss Wilkinson, one of the three members legislative team for spot verification, have visited the area on recent along with my colleague Krishna Menon (Indian member) and another female member. What we witnessed is really beyond narration. The plight and trauma of the Manipuri peasants and their sheer courage and resilience to fight with their destiny marveled me.

Here, in this regards, I wish to utter name of Leihao, a 16-years old Manipuri village girl who did play a crucial and vital role in mobilizing the peasant movement. Her rock solid courage and determination had imprinted a lasting impression in me and I felt like as if I have discovered the same degree of firmness and faith as Jean D’Arc had possessed.”

 

 উদ্বাস্তু শিবিরে 

সিলেটের ভানুবিল, ভানুগাছ বা বিশগাঁওয়ের প্রায় সব মণিপুরী পরিবারই ত্রিপুরার এই মহকুমা শহর খোয়াইয়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। অতিয়ার বড় ভাই ইপোমকে যেদিন মার্চ মাসের ২৭ তারিখ সুরমা নদীতে রবীন্দ্রনাথের আসার সময় জমিদার আলী আমজাদ খানের বাঁধানো চাঁদনীঘাটের সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসতে দেখে মহা আনন্দে অতিয়া হাততালি হাততালি দিয়েছিল আর দাদা ইপোম ঝরঝর করে কেঁদে উঠে, তাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল ঢাকায় জগন্নাথ হলে দুদিন আগে রাতে সব হিন্দু ছাত্রকে জড়ো করে পাকিস্থানীরা গুলি করেছে আর সে একটি লাশের নিচে বহুক্ষণ মৃতের অভিনয় করে পড়ে থাকায় পাকিস্থানীরা তাকে আর গুলি করে নি আর এক্ষুণি তাদের সব মণিপুরীকে সব কিছু বাঁধা-ছাঁদা করে ভারতে পালাতে হবে প্রাণে বাঁচতে হলে সেদিনটাও তাদের নিজেদের বাড়ি ছিল। সে দিনই ফুড অফিসের ইন্সপেক্টর বাবা তাদের নিয়ে বিশগাঁও গ্রামের দিকে চলে এলেন। তারপর সীমান্ত পেরিয়ে এই ত্রিপুরার খোয়াইয়ে। কেমন ঘিনঘিনে সব রিফিউজি ক্যাম্প- শুরুর কয়টা দিন তারা ছিল রাস্তায়! অতিয়ার সব চেয়ে ছোট বোনটির বয়স মাত্র দুই বছর। রিফিউজি ক্যাম্পের ময়লায় তার চামড়ায় ঘা হয়েছে। ইপোমের ছোট দুই ভাইয়েরও চামড়ায় কি সব ঘা! বাবা রোজ সকালে নিমপাতা এনে গরম জলে ফেলে ওদের ঘা পরিষ্কার করতে গেলেই তিনজনই সমানে চেঁচিয়ে কাঁদতে থাকে। নিষ্ঠুরের মত বাবা ওদের গায়ে নিম পাতা ডলে দেয়।

-ইপোম-

-মা!

কিছু না বলে মা আবার চোখ বুঁজে। এই রিফিউজি ক্যাম্পেই তাদের সবার ছোট, এক মাস বয়সী ভাইটি মারা গেছে। ওপারে ভাই যেদিন হলো, তার পরদিনই তারা বর্ডারের এদিকে হাঁটা শুরু করলো। মার যে শরীর তখন কি খারাপ! এপারে এসে মা যে বিছানা থেকে আর উঠতেই পারে না। রান্নাবান্না করে বড় বোন তাপাবি। সে সিলেটে গার্লস স্কুলে মাত্র ক্লাস সিক্সে পড়তো। দশ বছর বয়স। ইপোম পড়ে ফাইভে। তার বয়স নয়। তাপাবি এ কয় মাসেই বেশ রান্না করতে শিখে গেছে। সব্জি বা কোন কোন দিন মাছ সে-ই কুটে রাখে। ভাত-ডাল চড়ায়। মা মাঝে মাঝে কোনমতে উঠে বসে রান্নাটি করে।

পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছেরক্ত লালরক্ত লাল

পাশের তাঁবুতেই বাঙালী হিন্দুরা কেউ কেউ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র খুলেছে।

 

সারাদিন রজনী অনিমিখে

কবির চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছে। সিলেটের লংলার জমিদার তাঁর জন্য এমন আয়োজন করবেন তিনি ভাবতেও পারেন নি। কি অদ্ভুত সুন্দর এই মণিপুরী মেয়েরা। আর কি নম্র, শীলিত এবং কোমল তাদের নাচ! মহাভারতের বীর অর্জুন এম্নি এম্নি কি ভুলেছিলেন? আচ্ছা, ভারতীয় শাস্ত্রীয় নাচগুলো যেমন ভরত নাট্যম, ওড়িশি, কথাকলি বা কুচিপুড়ি কি কত্থকের পাশাপাশি এই মণিপুরী নৃত্যেরও মর্যাদা পাওয়া উচিত ধ্রপদী নৃত্যের। হোক এটা লোকনৃত্যের ফর্ম। ইউরোপীয় ব্যালের চেয়ে বরাবরই তাঁর ভাল লাগে অত বেশি শারিরীক কসরত অ-নির্ভর জাপানী নাচ বা ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপের নাচ। জাপান যাত্রী বীন্দ্রনাথ-এ সে কথা লিখেছেনও। এই ত ফর্সা, ছোটখাট তবে মেদহীন, পুতুলের মতো মেয়েগুলো অদ্ভুত সুন্দর সব পোশাক পরে তার সামনে নাচছে জয়দেবের লেখা গানের সাথে..অধিকাংশ গানের ভাষা ব্রজবুলি…যৌবনের চাপল্যে তিনি নিজেও ব্রজবুলি ভাষায় বেশ কিছু কবিতা, গান লিখে সেগুলো আবার ভানু সিংহের পদাবলী বলে চালাতেন…আচ্ছা, মহাভারতের তৃতীয় পাণ্ডব মণিপুরে এসে চিত্রাঙ্গদাকে বিয়ে করে থেকে গেলেন না কেন? চলে গেলেন কেন? অবশ্য যেতে ত হতই। সেসময় রাজপুরুষদের অমনটাই নিয়ম ছিল। নানা জনপদে যেতে হত তাদের, রাজত্ব বাড়াতে বিয়েও করতে হতো। এছাড়া পুরুষ মানুষ কি খানিকটা অমনই নয়? তিনি নিজেও কি তেমন নন? প্রথম জীবনের ভালবাসা ছাড়িয়ে যান নি কি পরে আরো নানা প্রেমে? অর্জুন কে আসলে? কে সেই নিপুন শর-সন্ধানী? তিনি নিজেই নন ত? অর্জুন লক্ষ্যভেদ করেছিলেন তীরন্দাজিতে। আর তিনি সাহিত্যে। এশিয়ার প্রথম নোবেল ল্যরিয়েট। ঠাকুর বাড়ির সবচেয়ে অকৃতকার্য, অসফল ছেলেটি একটি সময়ের।

…মাথার ভেতর গুনগুন করে লতিয়ে উঠছে সুর। তিনি যে সারাক্ষণই সুর আর শব্দের ইন্দ্রজালে ধ্যানস্থ থাকেন। তাঁর একটি দেহ জমিদারি দেখা-শোনা করে, খাজনার খাতাগুলো দেখে, সমবায় ব্যঙ্ক বা চামড়ার ব্যবসা অবধি করে। আর একটি সূক্ষè দেহ দেহের ভেতর থেকেই সারাদিন ছবির রেখা মিলায়, যখন তখন মন চায় পিয়ানোতে বসে পড়ে সুর সৃজন করতে, কবিতা লিখতে।

বেলা যায় বহিয়া দাও কহিয়া কোন্ বনে যাব শিকারে

বেলা যায় বহিয়া!

…আরে, এই মণিপুরী নাচ দেখতে দেখতেই মাথায় এ কি সুর এলো? গতরাতেই লর্ড টেনিসনের দ্য প্রিন্সেস পড়ছিলেন। পড়াশুনায় মগ্ন, বিয়েতে অনিচ্ছুক এক তরুণী রাজকন্যার প্রথম প্রেমে পড়ার কাহিনী- হোয়েন লাভ এ্যাণ্ড ডিউটি ক্লাশ! সত্যিই কি নারী আদ্যন্ত পুরুষের জীবন যাপন করতে পারে? কাজপাগল ভাগ্নি সরলার চেয়ে প্রেম-দাম্পত্যে নিপুণ ইন্দিরাই তাঁর অধিকতর স্নেহের পাত্রী। আবার এটাও সত্যি…দিনের পর দিন সঙ্গমই কি ভাল লাগে কারো?

নারীর ললিত লোভন লীলায় এখনি কেন ক্লান্তি?

মাথায় ঝলকে আসছে পংক্তির পর পংক্তি।

ধনবীর লাইশ্রমের সাথে

-উনি ধনবীর লাইশ্রম। মণিপুরের খুব বড় মানবাধিকার গবেষক। তুমি ওনার কাছ থেকেও আমাদের এখানে মানবাধিকার লঙ্ঘন সম্পর্কে জানতে পারবে।

  চিত্রা দি বলেন।

 আমি হাতঘড়ির দিকে তাকাই। রাতের বাসে কলকাতা। সেখান থেকে ঢাকা।

-আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি আমাদের নারী সমাজ। এরা প্রত্যেকেই মৈরা পাইবী- মশাল বাহিকা। চিত্রাঙ্গদার যোগ্য উত্তরসূরী। প্রতিদিনই মৈরা পাইবীরা কোন না কোন ঘটনার প্রতিবাদে মিছিল করছে। দাবি-দাওয়া, স্মারকলিপি পেশ করছে। আশির দশকে প্রথম যখন আন্দোলন শুরু হয়, তখন এত মোবাইল ফোন ছিল না। সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময় পাড়ায় পাড়ায় মন্দিরে ঘণ্টাধ্বনি দিয়ে এ আন্দোলন শুরু হয়েছিল।

-এ পর্যন্ত কালা কানুনের আওতায় কতগুলো রাষ্ট্রীয় খুন হয়েছে?

কত …সিনাম পিয়ারী, পেবম জুগিন্দ্রো, ইঙুদোম মঙ্গী, মোইরাংথেম ইযোবী, পাওনম বসন্তকুমার, মেমচা দেবী, লাইশ্রম সানাহনবী, লৈখাঙবম সুবদনী…কত কত খুন!

য়ারোই-য়ারোই-য়ারোই/ ইমাগী শক্তম কয়বা য়ারোই/

মানবো না- মায়ের আদল ভাঙ্গা মানবো না…

দূর থেকে ভেসে আসে প্রতিবাদী গানের স্বর।  

পুনশ্চ অর্জুন

-চিত্রা দি-

-বলো!

 -আমার ছুটি ফুরিয়ে এলো। বাংলাদেশে ফিরতে হবে!

-তুমি আমাদের নেত্রী ইরম শর্মিলার সাথে দেখা করতে পারলে না।        -সমস্যা নেই- ওনার প্রেমিক গোয়ানিজ খ্রিষ্টান, তাই না?

 -হ্যাঁ- প্রেমটা ওনার খুব সাম্প্রতিক সময়ে। কিšত্ত আমার এখন বহিরাগত কোন ছেলের সাথে প্রেম শুনলেই ভয় করে। সমর্থকরা কেউই সেটা চায় না।

-শ্রীমঙ্গলের কথা মনে পড়ে?

-মনে পড়বে না? ছোট বেলা ওখানেই কেটেছে। তবে আর যাওয়া হবে না।

 -আমি খুব মিস করবো আপনাদের সবাইকে

-এর ভেতর একটা ঘটনা ঘটেছে …

  -কি?

  -ক্যাপ্টেন যশরাজ একটা চিঠি লিখেছে আমাকে গতকাল

-কি বলছে?

 -লিখেছে আমেরিকায় তার পাঞ্জাবি বউয়ের সাথে ডিভোর্স হয়েছে। সে মণিপুরে ফিরে আসতে চায়। অরুণকে দেখতে চায়। আমাদের নিয়ে যেতে চায়।

-আপনি কি বললেন?

 -বললাম অরুণকে সে চাইলে দেখতে পারে। তবে আমার সাথে তার আর থাকা হবে না।

(শেষ)…    

      

      

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত