| 19 এপ্রিল 2024
Categories
ঈদ সংখ্যা ২০২০

নীপবীথি

আনুমানিক পঠনকাল: 6 মিনিট

অনেকদিন পরে যতীনের সঙ্গে দেখা হল সিদ্ধার্থের। অনেকদিন মানে মাস চারেক তো হবেই। বাজারের ভিতরের দোকান থেকে চা কিনছিল যতীন। সিদ্ধার্থ পেছন থেকে জানতে না দিয়ে হঠাৎ আলিঙ্গনের ভঙ্গীতে আলগোছে জড়িয়ে ধরলো যতীনকে। যতীন ঘুরে তাকাতে সিদ্ধার্থ যথার্থই অবাক হল। পচাঁত্তর বছর বয়সী যতীনকে আশাতীত রকমের উজ্জ্বল এবং টাটকা দেখাচ্ছে। এমনকি জামা কাপড়েও ভারী পরিপাটি যতীন এই মুহূর্তে এমন ফিটফাট সে সারা জীবনে কোনোদিন ছিল কিনা সিদ্ধার্থ মনে করতে পারল না। তিন-চার মাস আগে যতীন নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিলো। সেটা ছিল গত পাঁচ বছরের মধ্যে তৃতীয় আক্রমণ। সে সময় তাঁর চিকিৎসা সংক্রান্ত ব্যাপারে সিদ্ধার্থকেও কিছুটা ব্যস্ত হতে হয়েছিলো। পাড়ার ডাক্তার যখন এক্সরে করে বলে দিল যে তার আবার নিউমোনিয়া হয়েছে এবং বাঁচতে হলে হাসপাতালে যেতে হবে। যতীন বলেছিল সে কোথাও যাবে না, ঘরে শুয়েই মরবে। তার কারণ তার আর টাকা নেই। সে আর বাঁচতে চায়ও না। পারিবারিক জীবনে যতীন সুখী ছিল না। তার স্ত্রী পুত্র কোনো দিনই কোনো দিনই কোনো ব্যাপারে তাঁর সঙ্গে একমত হতো না। সেও তথৈবচ। প্রথম থেকেই সম্পর্কের দুধে ছানা কেটে গিয়েছিল। তা দিয়ে আর ক্ষীর, ননি তৈরি হলো না। তবুও তারা আরো অসংখ্যক মানুষের মতো একত্রে সারাজীবন বসবাস করল। ফলে আগের দু-বারের মতো এবারও সিদ্ধার্থকে যতীনের বাড়িতে যেতে হলো। তার স্ত্রী-পুত্র জানত যে যতীন যদি কারো কথা শোনে, সে সিদ্ধার্থ। কাছাকাছি একটা নার্সিং হোমে যতীনকে ভর্তি করার ব্যবস্থা করেছিল তার ছেলে। সিদ্ধার্থ গিয়ে তার বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে বলেছিল ‘যতীন, ওঠো, নার্সিং হোমে যেতে হবে। তার যথার্থই মনে হয়েছিলো যতীন অন্তিম শয্যায়। তার মনে হয়েছিল এই অন্তীম সময়ে লোকটাকে কষ্ট দিয়ে লাভ কী? যতীন খুব কষ্ট করে বলেছিল ‘উঠে লাভ কী? কেন কোন আশায় বেঁচে থাকব, সিদ্ধার্থ?

এসব কথাও ঠিক। তার জীবনটা সত্যিই অর্থহীন। প্রবল কষ্টেরও। অপরিসীম যন্ত্রণার। সারা জীবন ধরে অসফল মানুষ সে। মোটামুটি চলবার মতোও অর্থ উপার্জন করতে পারেনি কোনদিন। একটা মাত্র ছেলে। সামান্য রোজগারে তাকেও আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী মানুষ করতে পারেনি যতীন। ছেলেও অতি সাদামাটা। যথেষ্ট পয়সাকড়ি থাকলে সে বিশেষ কিছু হতো, এমন সম্ভাবনা কমই ছিল। সিদ্ধার্থ এমন ওজর আপত্তি শুনল না। তারা দুজনই কলকাতার একই পাড়ার মানুষ। ছোটবেলা থেকে না হোক, কলেজ জীবন থেকে একই সঙ্গে বড় হয়েছে। ফলে দুজনেই দুজনকে ভালো করেই চিনত। অল্প বয়সের হৃদ্যতাও এক সময় বেশ হয়েছিল। সে বলেছিল, ‘ছেলেমানুষি কোরো নাতো! ওঠো, ছেলেকে বলেছিল, ওঠা, নেও চল। যতদিন বাঁচবে, কষ্টটা তো লাঘব করতে হবে। যতীনের যাবতীয় আপত্তি অগ্রাহ্য করে তাকে নার্সিং হোমে ভর্তি করিয়ে বাড়ি ফিরছিলো সিদ্ধার্থ। চারদিন পর ইনসেনটিভ কেয়ার ইউনিটের শয্যায় অক্সিজেন, নেবুলাইজার, ড্রিপ, ইত্যাদির নল, ছুচঁ, মাস্ক, এসব পরিবৃত থেকে যতীন জানতে পেরেছিল ইতিমধ্যেই নার্সিং হোমের বিল দেড়লাখ টাকা পার হয়ে গেছে। ফলে বউকে, ছেলেকে একরকম বাধ্য করেই মুচলেকা দিয়ে নার্সিং হোম থেকে বেড়িয়ে এসেছিল সে। বাইরে বেড়িয়ে এসে যতীনের ছেলে রাজীব সিদ্ধার্থকে ফোন করেছিল নিরুপায় হয়ে।
‘কাকা, বাবাতো জোর করেই বের হয়ে এলো নার্সিং হোম থেকে।
‘সে কী! এখন কী করবি, চিকিৎসাতো পুরো হয়নি?
‘তাতো হয়নি। কিন্তু তাকে বুঝাবে কে?’
‘এখন কী করবি?’
‘আপনাদের পাড়ার সেবা ক্লিনিকে আজ তো চেষ্ট পেশালিস্ট ডাক্তার সুবীর সরকার আছেন?
‘আজ কী বার’
‘আজতো সোমবার, সোম, বুধ, শুক্র তো ওনার আসার দিন।
‘হ্যাঁ, তো নিয়ে আয়, সন্ধ্যা বেলা। আমি একটা অ্যাপয়নমেন্ট করে রাখছি।
সন্ধ্যায় নয়, রাজীব তখনই নিয়ে এসেছিল যতীনকে। কারণ ওদের ছেটো ফ্ল্যাট চারতলায় তার উপরে লিফট নেই । তাই এই ব্যবস্থা। সন্ধ্যাবেলা ডাক্তার দেখিয়ে একেবারে স্ট্রেচারে করে ওঠালেই হবে এই ছিল রাজীবের পরিকল্পনা।
ডাক্তার সুবীর সরকার সিদ্ধার্থদের পরিবারের অনেকদিনের চিকিৎসক। সেই সূত্রে যতীনের আগের দুবারের চিকিৎসা সুবীর সরকারই করেছিলেন। সিদ্ধার্থ নিজেই ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেল যতীনকে সে বারেও। যতীনকে চেম্বার থেকে রাজীব বের করে নিয়ে গেল। ডাক্তার সিদ্ধার্থকে বলছিলেন, ‘বাড়িতে রাখা খুবই ঝুঁকির কাজ হবে, সিদ্ধার্থ বাবু’ সিদ্ধার্থ তাকে বাড়িতে পৌঁছে দিতে গিয়েছিল। ফেরার আগে যতীনের সামনেই রাজীবকে বলেছিলাম, ‘ডাক্তার বাড়িতে রাখতে নিষেধ করেছেন। প্রেসক্রিপশনে সে কথা লিখেও দিয়েছেন। অবস্থা বেগতিক বুঝলে সময় নষ্ট না করে-
যতীন ডুকরে কেঁদে উঠেছিল। বলেছিল ‘তোমাদের মাথা খারাপ হয়ে গেছে, সিদ্ধার্থ। এত টাকার দেনা আমি কোথা থেকে শোধ করবো। যদি বরাত জোরে এবার বেঁচেও যাই- সে ফোঁপাতে লাগল সম্পূর্ণ হতাশাগ্রস্ত মানুষের মতো।
তার স্ত্রী সুম্মিতাকে সিদ্ধার্থ বলে এসেছিল ‘যদি প্রয়োজন হয় টাকার ব্যাপারে আমাকে বলতে সংকোচ কোরনা, সুম্মিতা। আমারও দেওয়ার মতো বেশি টাকা নেই। তবে, যতীন এবং আমার বন্ধু-বান্ধব তো কিছু আছে-’
কিন্তু সে যাত্রাও বেঁচে গিয়েছিল যতীন। ডাক্তারের পরামর্শ মতো ড্রপ, নেবুলাইজার, অক্সিজেনের ব্যবস্থা বাড়িতেই করা সম্ভব হয়েছিল।
নিয়মিত খবর নেওয়া ছাড়া দিন পনের পরে সিদ্ধার্থ যতীনকে পুনরায় দেখতে গিয়েছিল। সুস্থ সে হয়েছে বটে বেশ খানিকটা কিন্তু সাদা বিছানার চাদরের উপরে যেন একখানা ফ্লেকসে ছাপানো ছবির মতো পড়ে আছে সে।
‘কেমন আছো যতীন? সিদ্ধার্থ জিজ্ঞেস করেছিল। উঠে বসার চেষ্টা করতে করতে যতীন বললো ‘ভালো’। কিন্তু এটুকু প্রয়াসেই সে যেন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ল। আচমকা একটা কাশির আক্রমণ হলো তার গলায়। একবার কেশেই ডান হাতখানা দিয়ে নিজের গলাটা চেপে ধরলো সে। এবং প্রচণ্ড ক্লেশে কাশিটা সামলাতে চেষ্টা করতে লাগল সে এবং শেষমেশ সামলেও ফেলল।
‘কাশিটা উঠছে এখনো? সিদ্ধার্থের কথায় উত্তর দিয়েছিল সুম্মিতা। বলেছিল, উঠবে কী করে? উঠতে দিলে তো! দেখলেনতো নিজের চোখে।
ব্যাপারটা সিদ্ধার্থ জানত। বিশ-বাইশ বছর বয়সে যতীনের জীবনের পরপর দুটি দুঘর্টনা ঘটে। প্রথমটা হলো নীপবীথি নামে একটি মেয়ের প্রেমে পড়ে সে। নীপবিথি ছিল আশ্চর্য্য রূপসী। সেই বয়সে যতীনও ছিল চোখে পড়ার মতো স্নিগ্ধ চেহারার তরুণ। সে হাসলে তার মুখের ডানদিকে একটি অস্ফুট গজদন্ড দৃশ্যমান হতো। তাতে সে সময়কার বোম্বাই ফিল্মের একজন নায়কের সঙ্গে তার চেহারার সাদৃশ্য ফুটে উঠত। তার বন্ধুবান্ধব অনেকেই তখন সেই নায়কের নামে ডাকত তাকে। দ্বিতীয় দুর্ঘটনা হল, সুন্দরী নীপবীথির অচিরেই বড়লোক বাড়িতে বিয়ে হয়ে গেল এবং তাঁর তিন-চার মাসের মধ্যে যতীনের ফুসফুসে যক্ষা ধরা পড়ল। বন্ধুরা এই দুই ঘটনাকে পরিপূরক মনে করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সোজা কথা নয়, পঞ্চাশ, বাহান্ন বছর আগের যক্ষা তখনো রাজরোগ। তবে, ততদিন অ্যান্টিবায়োটিক এদেশেও এসে গেছে।

যতীন চিত্তরঞ্জন হাসপাতাল এবং বাড়ি মিলিয়ে প্রায় বছর দেড়েক ভুগে মোটামুটি সুস্থ হলো। শরীরের দিক থেকে সুস্থ হলো বটে, কিন্তু অবচেতনে ক্ষয়রোগ চিরস্থায়ী হয়ে রইলো। পরবর্তী জীবনে কতবার যে সে এক্সরে মেশিনের সামনে দাঁড়িয়েছে, তার হিসাব সে শেষপর্যন্ত নিজেই আর রাখতে পারেনি। শেষে কোনো কারণে গলা খাকারি দিয়ে উঠলেও, সে নিজের গলা নিজেই চেপে ধরে। কাশি কখনো উচ্চকিত হতে দেয় না। কেশে থুথু ফেলা তো দূরের কথা। থুথু ফেললেই যে রক্ত দেখবে! সুম্মিতার কথাতে সেই ইঙ্গিত। চিরস্থায়ী হয়ে রইল আরো একটি জিনিস, ষাটের দশক পর্যন্ত পৃথিবীর প্রায় সর্বত্র এই যা ছিল পবিত্র নৈতিক বাধ্য-বাধকতার, যতীন মাত্র একবারের জন্য নীপবীথির সঙ্গে যৌনমিলনে আবদ্ধ হয়েছিল। যতীন সিদ্ধার্থকে সেই সময় একবার বলেছিল উদ্যোগটা তার ছিল না, ছিল নীপবীথির। কিন্তু কী যে পাগলামো পেয়ে বসেছিল নীপবীথিকে, যতীনও শেষ পর্যন্ত ভেসে গেল। সেই সীমা তারা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। তাতে শেষ পর্যন্ত নীপবীথির কি হয়েছিল যতীন জানতে পারেনি। কিন্তু তার মনের মধ্যে একটা স্থায়ী পাপবোধ এবং অপরাধবোধ তাকে বহুকাল পর্যন্ত ক্লিন্ন করেছে। অনেকদিন পর্যন্ত বন্ধু সিদ্ধার্থের কাছে একাধিকবার এ কথা বলেছে। শেষে সিদ্ধার্থ বিরক্ত হয়ে তাকে একসময় বলেছে, ‘ও! তোমাকে এরপরে চার অক্ষরের গালিটা দিতে ইচ্ছে করছে আমার। একদম তাই!’
চায়ের প্যাকেট হাতের থলেতে ফেলে সে সিদ্ধার্থের দিকে ঘুরে দাঁড়াল। বাঃ! তোমাকে তো দারুণ ফ্রেশ দেখাচ্ছে। ওজনও বেশ খানিকটা বাড়িয়েছো মনে হচ্ছে! যতীন লাজুক হেসে বলল, দুর ওসব কিছু নয়। মনে হচ্ছে জল জমেছে শরীরে। সারা জীবন ধরে শত চেষ্টা করেও এক ছটাকও ওজন বাড়াতে পারলাম না। তো, এই বয়সে মনে হচ্ছে জল জমেছে শরীরে।
‘নারে, ভাই তুমি বেশ চকচকে হয়েছো। ব্যাপারখানা কী বলতো? আবার একবার প্রেমে পড়েছো নাকি?

দুই বন্ধু হাঁটতে হাঁটতে বাজারের বাইরে এলো। যতীন যাবে পূর্বদিকে, সিদ্ধার্থ যাবে পশ্চিমদিকে। দুজনে রাস্তার পাশের হিন্দুয়ানী চা-ওয়ালার দোকান থেকে দু ভাঁড় চা কিনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গল্প করতে লাগল। চা খাওয়া হয়ে গেলে পয়সা মিটিয়ে সিদ্ধার্থ বলল, ‘যাই বল, তোমার চেহারা কিন্তু ফিরে এসেছে। বলতে কী, তুমি যেন সেই অল্প বয়সের মতো দেখতে সুন্দর হয়েছো। ঠিক আছে, ভালো থেকো। আমি যাই।
সিদ্ধার্থ দু পা এগোতেই যতীন বলল ‘আরে শোন শোন। একথা কথা তোমাকে বলব বলে ভাবছি, তুমি আবার কী মনে কর।’
‘হ্যা বল, কী কথা?’
যতীন কেমন যেন একটা অস্বস্তি নিয়ে ইতস্তত করতে লাগল। প্রথমে বলল ‘না, মানে ব্যাপারটা হল কী-মানে- তারপর রাস্তারই একটা অপেক্ষাকৃত নির্জন ধারে আকর্ষণ করল সিদ্ধার্থকে। বলল কিভাবে যে বলি তোমাকে কথাটা-মানে- সিদ্ধার্থ অধৈর্য্য হয়ে বলল ‘আরে বলই না কথাটা। টাকা পয়সা দরকার কী? সেতো তোমার অসুখের সময়ই বলেছিলাম, তুমি তো নিলে না।’ সিদ্ধার্থ জীবনে টাকা পয়সা ভালোই রোজগার করেছে। বন্ধুর প্রয়েজনে নিঃশর্তে দিতে আপত্তিও নেই তার।
‘না-না টাকা পয়সা নয়, মানে অন্য ব্যাপার মানে-আচ্ছা নীপবীথিকে মনে আছে তোমার?। ‘নীপবীথি! কে নীপবীথি? একই বিস্মিত হয়ে সিদ্ধার্থ মনের ভেতরে হাতড়াতে লাগল। কোথাকার নীপবীথি?
যতীন বলল ‘আরে ওই যে কলেজে পড়ার সময়ে-আরে আমরা যখন থার্ড ইয়ারে নীপবীথি তখন ফাস্ট ইয়ারে এসে ভর্তি হল।
‘ওরে বাবা, সেতো পঞ্চাশ বাহান্ন বছর আগের কথা হবে! সিদ্ধার্থ ভারী অবাক হয়ে বলল। হ্যাঁ সেই যে খুব সুন্দরী। খুব ভালো রবীন্দ্র সঙ্গীত গাইত মেয়েটা। হ্যাঁ নীপবীথি তো নাম! তো?
‘হ্যাঁ হ্যাঁ, মনে পড়েছে তোমার? রাস্তার পাশের ছলকে আসা আলোয় যতীনের তিয়াত্তর বছরের চোখদুটো কেমন লাজুক এবং স্বপ্নময় দেখালো সিদ্ধার্থের চোখে। সে নিজে বাহাত্তর, নীপবীথি নামটা যতই কাব্যিকই হোক, যত মধুর রবীন্দ্রসঙ্গীত সে না হোক গাইত, তার বয়সওতো অন্তত সত্তর হয়েছে।
সিদ্ধার্থ বললো ‘হ্যা নীপবীথি, তো কী?
নীপবীথির সঙ্গে হঠাৎ সেদিন দেখা হয়ে গেল। কী যে সুন্দর এখনো তাকে দেখতে। কী অবাক কাণ্ড, সেই সময়ের পরে আর কতবারই দেখা হয়েছিল। তাও তো হয়ে গেল পয়তাল্লিশ ছেচল্লিশ বছর।
‘কবে দেখা হয়েছে? কতবার দেখা হয়েছে তোমাদের? সিদ্ধার্থের কণ্ঠস্বরে কেমন যেন জেরা করার ভঙ্গি, এমন মনে হল যতীনের।
‘এইতো! মাস দেড়েক আগে’, যতীন বিব্রত গলায় বলতে লাগল, যেন একটা অন্যায় কাজ হয়ে গেছে। ‘বলল ডাক্তার সরকার তো সেই তিনমাস আগেই পুরুলিয়া না কোথায় যেন বদলী হয়ে গেল। তাই শ্যামবাজারের একটা ক্লিনিকে ডাক্তার নন্দী, ডাক্তার সরকারই ওর নাম আমায় বলে গিয়েছিলেন।
‘ডাক্তার নন্দীর চেম্বারেই দেখা হল, ও, তারপর? সিদ্ধার্থের ভঙ্গিটা ক্রমশ; পুলিশী জেরার অনুরূপ হয়ে উঠল।
যতীন বলল, ‘ডাক্তার নন্দীর চেম্বারেই মাস দেড়েক আগে দেখা হল। তারপরে আরো দুবার নীপবীথির বাড়িতে। একা থাকে তো, ভারী নিঃসঙ্গ। স্বামী মারা গেছে বছর দুয়েক হয়েছে। ছেলেমেয়ে দুজনেই ইউরোপে। ভারী নিঃসঙ্গ।
‘নিঃসঙ্গ শব্দটা দ্বিতীয়বার মনে মনে বলল সিদ্ধার্থ। কিন্তু মুখে বলল ‘এখন আর নিঃসঙ্গ কোথায়? তুমি তো সঙ্গী হলে। ভালো, খুব ভালো। তাইতো ভাবী হঠাৎ এই বয়সে তোমার চেহারার শ্রীবৃদ্ধি কী করে হল। আচ্ছা, আমি! কেমন একটা ঈর্ষা আক্রান্ত জ্বালা তার স্নায়ুতন্ত্রে ছড়িয়ে পড়তে লাগল।
যতীন শশাব্যস্ত হয়ে বলল, ‘আরে দাঁড়াও, দাঁড়াও। আসল কথাটাই বলা হয়নি তোমায়, একটা পরামর্শ চাই তোমার কাছে।
সিদ্ধার্থর মন বলল ‘বটে আসল কথা!’ পরামর্শ! আচ্ছা!’
যতীন পুরনো কথার খেই ধরে বলল ‘মানে নীপবীথি আমাদের বাসায় আসতে চাইছে মাঝে মধ্যে। একটু ভেবে বলতো, ব্যাপারটা কী সম্ভব? মানে, সুম্মিতা, মানে মেয়ে মানুষের মন তো! ভিতরে ঈর্ষার জ্বালা থাকলেও অট্টহাস্য করে উঠল সিদ্ধার্থ। আসলে উচ্চ হাসির আড়ালে সত্যটাকেই আড়াল করতে চাইল সে। ‘কী বলছ, যা, তা,- মেয়ে মানুষের মন। আমারই তো হিংসা হচ্ছে তোমাকে। অমন কম্মটি করো না-আচ্ছা আসি!’

সিদ্ধার্থ হন হন করে পশ্চিম দিকে হেঁটে চলে গেল। কী আশ্চর্য্য সে কিছুতেই নিজেকে আড়াল করতে পারল না। তীব্র অসূয়া তাকে ক্রমশ আরো অস্থির করে তুলছে। কী আশ্চর্য্য! কেন? জীবনের কী বাকি আছে আর? কী বাকি থাকে?

খানিকদূর হেঁটে তারপর গতি ধীর হয়ে এলো। আস্তে আস্তে মনজুড়ে বসল এক গভীর বেদনা। বাড়ির গলি রাস্তাটায় আর একজনও লোক দেখতে পেল না সে। বড় নিঃসঙ্গ মনে হল নিজেকে। বড় একা।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত