| 5 মার্চ 2024
Categories
ঈদ সংখ্যা ২০২০

রাই ফুল

আনুমানিক পঠনকাল: 7 মিনিট

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com

গাঁয়ে পাশাপাশি দুই বাড়ির দু’টি বউ।

প্রায় সমবয়সী। কতো হবে তাদের বয়স?  বড় জোর ঊনিশ, বিশ!

একজনের নাম ফুল, আরেক জনের জবা।

গলায় গলায় ভাব তাদের।

প্রতি বিকেলেই একসাথে কলসী কাঁখে ওরা চৌধুরীদের বাড়িতে যায় তাঁদের ডীপ টিউব ওয়েল থেকে এক কলসী করে খাবার জল তুলে আনতে। চৌধুরীরা যথেষ্ট জনদরদী। পাড়ার লোকজনকে এক আধ কলস কলের জল দিতে কার্পন্য করে না।

যেতে আসতে প্রত্যেকদিন-ই বৌ দুটিকে পার হয়ে যেতে হয় সরকারদের বিশাল ভিটাখানি। বড় রাস্তাটি যেখানে কোমর বেঁকিয়ে আবার সোজা চলতে শুরু করেছে, ঠিক সেখানেই শুরু সরকারদের বাড়ির চৌহদ্দি। তাদের কাচারী ঘরটি একেবারে রাস্তা ঘেঁষে।

মাস খানেক হলো, এই সময় প্রতিদিন সেই কাচারী ঘরের সামনে খোলা বারান্দায় একটি বেতের বুননী দেয়া বাদামী কাঠের চেয়ারে বসে থাকে এক যুবক। তাকে আগে কখনো এ গাঁয়ে দেখেনি ফুল কিংবা জবা। তরুণটির বয়স পঁচিশ ছাব্বিশের বেশি হবে না। হাল্কা পাতলা গড়ণ। সরু অথচ ঘণ কালো গোঁফ। চুল ঈষৎ এলোমেলো।  পরনে প্রায় প্রতিদিন-ই থাকে সাদা পায়জামার সঙ্গে নানা ধরণের রঙিণ পাঞ্জাবী। কখনো সূতার কাজ করা, কখনো ছাপা, কখনো চেক চেক, কখন-ও  বা লম্বা রেখা রেখা। পায়ে পেছন-খোলা চামড়ার স্যান্ডেল। চোখে কালো ফ্রেমের ভাড়ি কাচের চশমা। যখন-ই তাকে দেখে তারা, সে হয় বসে বসে একাগ্র চিত্তে বই পড়ছে, না হয় সামনের গোল টেবিলে কিংবা’পায়ের ওপরে একটি বাঁধানো খাতা রেখে মাথা নীচু করে কিছু লিখছে। অথবা চুপচাপ তাকিয়ে রয়েছে রাস্তা কিংবা আকাশের দিকে। কিন্তু এই অন্যমনস্কভাবে তাকিয়ে থাকা দেখেই বোঝা যায় কোন এক দিকে চেয়ে রইলেও বিশেষ কিছু দেখছে না সে। তাকিয়ে তাকিয়ে ভাবছে বুঝি কিছু।

একদিন হলো কী, ভরা কলসী কাঁখে দুই বৌ যথারীতি ঘরে ফিরছে সেই চেনা পথ ধরে। হঠাৎ বলা নেই কওয়া নেই, কোথা থেকে একটা বিশাল কালো গাভী ছুটে এলো তাদের দিকে। গরুটির গলায় তখনো ঝুলছে একটা লম্বা রশি – পাটের তৈরি – পাকানো। বুঝতে কষ্ট হয় না কারো, মালিক মাঠ থেকে খুঁটি খুলে ঘরে নেবার সময়ে ছুটে পালিয়েছে গাইটি। বহুদিন পর হঠাৎ একটু স্বাধীনতার স্বাদ পেতে সাধ হয়েছে হয়তো তার।  গরুটির কাছ থেকে নিষ্কৃতি পাবার  আশায় ওরা দুই বউ ভরা কলসী কাঁখে রাস্তার সীমানা ঘেঁষে জায়গীরদারদের বাগানের বেড়ায় পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।  প্রচুর জায়গা ছেড়ে দেওয়া হয়েছে রাস্তায় ছুটে আসা বিশাল প্রাণীটির চলাফেরা, যাতায়াতের সুবিধের জন্যে। ওরা এটা বিশেষভাবে করেছে, যাতে করে ওদের কোন ঝক্কিঝামেলা না করে নির্বিঘ্নে গরুটি চলে যায় ওখান থেকে।

কিন্তু কী ছিল ঐ পশুর মনে কে জানে? কোন্‌ মতলবে সে সোজা এসে চড়াও হয় ফুলের ওপর। গরুটির চেপ্টা ও লম্বা মাথার ওপর ছোট ছোট দু’টি ছাই রঙের শিং এবং শিং-এর নীচে কোণাকুণি করা লম্বাটে দু’খানা সতেজ উজ্জ্বল চোখ। শিং দুটো ঈষৎ নামিয়ে নিয়ে এসে সে ফুলের কাঁখের কলসীটাকে সমানে গুঁতোতে থাকে। অযথা। কোনরকম প্ররোচনা ছাড়াই। তবুও যতক্ষণ সম্ভব কলসীটি ধরে রাখার চেষ্টা করে ফুল।

কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই, হয়তো ভয়ের কারণেই অথবা শক্তির অসামর্থে,  এক সময় ফুলের কাঁখ থেকে কলসীটা পড়ে যায় মাটিতে। কাঁত হয়ে পড়া ভরা পিতলের কলসীর জলে ভেসে যায় শুকনো রাস্তা। চারপাশের ধুলোবালি। এতো বড় ও উত্তেজিত পশুটির পাশে ভয়ে ক্লিষ্ট ছোটখাটো ফুলকে বড়-ই ম্রিয়মাণ দেখায়। বুঝতে অসুবিধে হয় না, খুব- অসহায় বোধ করছে সে। এদিকে নিজের করণীয় ঠিক করতে না পেরে ফ্যাল ফ্যাল করে কেবল তাকিয়ে তাকিয়ে সব দেখে পাশে গুটিসুঁটি মেরে দাঁড়ানো জবা, ফুলের সঙ্গে আসা অন্য বউটি, যার দিকে, আশ্চর্য, একবার ফিরেও তাকায় না কালো গরুটি।

শুধু কলসীটা মাটিতে ফেলে দিয়েই কিন্তু ক্রোধ কমে না গরুর। সে এবার ফুলের দিকে ছুটে আসে সম্পূর্ণ মাথা উঁচিয়ে। উপায় না দেখে জোরে দৌড়ুতে গিয়ে ইঁট-পাথরের এবড়োথেবড়ো রাস্তায় উঁচু হয়ে থাকা এক টুকরো ইঁটে হোঁচট খেয়ে সটান নিজের বুকের ওপর উপুড় হয়ে ধপাস করে পড়ে যায় ফুল।  মুহূর্তের ভেতর কী ঘটে যায়। শাড়ির সাথে এমনভাবে পা পেঁচিয়ে পড়ে সে যে চেষ্টা করেও সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াতে পারে না। কিন্তু সবকিছু ভালোভাবে বুঝে ওঠার আগেই ফুল টের পায়, দুটো শক্ত হাত তার দুই বাহু ধরে তাকে মাটি থেকে টেনে তোলার চেষ্টা করছে। প্রায়  সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসা শেষ বিকেলের  ম্লাণ আলোয় বেকায়দায় রাস্তায় পড়ে থাকা ফুল দেখে তার রক্ষাকর্তাকে। দেখে অবাক হয়। অপরিচিত মুখ নয় এটি।  অথচ তাকে পরিচিতও বলা যায় না। সে কে, কী নাম ত্তার, কিছুই জানে না ফুল। আর ফুলকে তো তার চেনার কথাই আসে না। বড় জোর তার কাছে ফুল একজন নিত্য পথচারী। তবু, সত্যের খাতিরে বলতেই হয়, পরিচয় না থাকলেও পরস্পরের সম্পূর্ণ অজানা নয় তারা।

ফুল দেখে, সন্ধ্যা ঘণিয়ে আসা এই নিস্তব্ধতায় আশেপাশে যখন আর কেউ নেই, তাকে দু’হাতে টেনে তুলে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে আর কেউ নয়, সরকার বাড়ির কাচারী ঘরের সামনে প্রতিদিন চেয়ারে বসে থাকা সেই যুবকটি। এখনো তার পরণে সাদা পায়জামা, খয়েড়ি পাঞ্জাবী, পায়ে সেই কালো চামড়ার স্যান্ডেল। এতো কাছে থেকে তাকে এখন আরো সুদর্শন, আরো তরুণ দেখায়।

মাটি থেকে তাকে তুলতে তুলতে উদ্বিগ্ন কন্ঠে সে ফুলকে জিজ্ঞেস করে। “খুব লাগেনি তো?” হয়তো প্রশ্নটা নেহায়েৎ সৌজন্যমূলক। কিন্তু ফুলের কানে তা অমৃতের মতো শোনায়। কী মধুর, কী মিষ্টি সে গলা! কী দরদ! আবেগ! কী দুশ্চিন্তা! আহা, সত্যি সত্যি আজ লাগতেও তো পারতো আরেকটু?

“না, না,” সংকোচে লাল হয়ে যায় ফুল।

ওমা! সে কী?

লোকটি করে কি? করে কী?

নিজের ডান পা’টি দ্রুত কাছে টেনে আনতে ব্যস্ত হয়ে ওঠে ফুল।

সে টের পায়নি, ইঁটের টুকরোয় হোঁচট খাওয়ায়, তাঁর খালি পায়ের আঙ্গুলে লেগেছে বেশ। ফুল দেখে, তার ডান পায়ের বুড়ো আঙ্গুলের ডগা থেকে, নখের পাশ দিয়ে,  রক্ত ঝরছে তখন। লোকটি রাস্তায় পড়ে থাকা পিতলের কলসীটা কাঁত করে জল নিঙড়ে প্রথমে নিজের দু’হাত ভালো করে ধুয়ে নেয়। তারপর বাঁ হাত দিয়ে ফুলের ডান পায়ের গোড়ালীর পেছনটা ধরে কলসী থেকে অনেকখানি জল ঢেলে ফুলের পায়ের রক্তাক্ত বুড়ো আঙ্গুলটি ভাল করে ধুয়ে পরিস্কার করে দেয় নিজের ডান হাতের আঙ্গুল দিয়ে ঘষে ঘষে।

“এই সব রাস্তায় কত রকমের যে জার্ম রয়েছে!  ঘরে গিয়ে আবার পা’টা ভালো করে সাবান দিয়ে ধুয়ে মুছে একটু এন্টিবায়োটিক মলম লাগিয়ে নেবেন।“ একটু থেমে আবার নিজেই বলে, “আচ্ছা, এরকম উঁচুনিচু  সদর রাস্তায় খালি পায়ে কেউ হাঁটে?” ফুল ছেলেটির মুখের দিকে তাকায়। শেষের বাক্যটি বলার সময় তার কন্ঠস্বরে- বলার ধরণে কি ধমক ছিল? নাকি সেটা শাসন বা শিক্ষা! ঠিক বুঝতে পারে না। তবে ফুল লক্ষ্য করে অন্য দিনের মতো আজো লোকটির চোখে রয়েছে কালো ভারি ফ্রেমের চশমা। কালো চুল গুলো ঈষৎ এলোমেলো। বাইরে আজ একটু জোরেই হাওয়া বইছে।

আছাড় খেয়ে পেটের দিকে বিশাল টোল-পড়া আধ-খালি কলসীটি মাটি থেকে নিয়ে ফুলের হাতে তুলে দেয় ছেলেটি। ফুলকে মাটিতে ফেলে দিয়ে গরুটি মুহূর্তে কোথায় কোন দিকে উধাও হয়ে যায় ওরা কেউ টের পায় না। এতক্ষণে দেখা যায় গরুর মালিকটিকে।  গরুর নাম (“কালা”) ধরে ডাকতে ডাকতে রাস্তা দিয়ে তাকে এলোমেলো খুঁজে বেড়াতে শুরু করেছে সে।

“আহা। কলসীটি একটু বাঁকা হয়ে গেছে। শাশুড়ি যদি বকে এজন্যে, বলবেন, আপনার পায়ের ব্যথার কাছে ওটা তেমন কিছুই নয়।“ বলে নিজের রসিকতায় নিজেই একটু শব্দের সঙ্গে  হো হো করে হেসে ওঠে ছেলেটি।  ওর কথা বলার ধরণে এতোক্ষণে ওপাশে দাঁড়ানো জবাও খিল খিল শব্দ করে হাসে। লোকটি একবার মুখ তুলে জবাকে দেখে। তারপর আর দেরী করে না। দ্রুত সরকার বাড়ির দিকে পা বাড়ায়।

আছোঁয়া কুমারী মেয়ে নয় ফুল, দেখতে যতই কিশোরী কন্যার মতো লাগুক তাকে। রাতের অন্ধকারে স্বামীর প্রবল ইচ্ছা আর উচ্ছ্বল আনন্দের কাছে অহরহ নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করে আমূল বিদ্ধ হওয়া প্রাত্যহিক জীবনের অতি স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু আজ পর্যন্ত এই একান্নবর্তী পরিবারে ফুল কোনদিন দিনে দুপুরে বা প্রকাশ্যে একটিবারের জন্যেও স্বামীর হাত কিংবা আঙ্গুলের স্পর্শ পর্যন্ত টের পায়নি তার  কপালে-গালে-হাতে, কোথাও, এমন কি জ্বরে কিংবা মাথা ব্যথায় শরীর টনটন করে ফেটে পড়লেও।

এর পর থেকে প্রতিদিন কলসী কাঁখে জল আনতে যাওয়ার সময় সরকার বাড়ির সামনে এলেই ছেলেটির কথা মনে পড়ে ফুলের। কলসী খালি হোক আর ভরা হোক, একবার ঐ মুখের দিকে তাকাবেই ফুল। কী অসীম মমতা মাখা চোখদু’টি দেখেছিল সে সেই পড়ন্ত বিকেলে! কেবল একটি পায়ের একটিমাত্র আহত আঙ্গুলের ডগায় অতি সামান্য একটু ছোঁয়া! কিন্তু ওকথা ভাবতে গেলে এখনো শরীরে উষ্ণ এক শিহরণ টের পায় সে। কোমরের খালি কলসী যেন হঠাৎ টুস টুস করে পূর্ণ হয়ে যায় টলটলে পরিস্কার জলে।

অথচ কী আশ্চর্য্য! সেদিন বিকেলের পর আর একদিনও ছেলেটি ফুলকে জিজ্ঞেস পর্যন্ত করেনি তার পা’টা কেমন আছে। খুব ব্যথা করে কিনা। ভদ্রতা করেও তো মানুষ এই প্রশ্ন করে! অথচ দেখে মনে হয় তাকে যেন চেনেও না সে। কচিৎ এদিকে, মানে তার দিকে তাকায়। কিন্তু বারান্দা ছেড়ে উঠে আসেনি একদিন-ও।

আরো সপ্তাহ খানেক পরে একদিন ফুল আর জবা যাচ্ছে জল আনতে। হঠাৎ ফুল লক্ষ্য করে, সরকার বাড়ির কাচারী ঘরের সামনে আজ আর কেউ বসে নেই। সেই বেত-কাঠের মজবুত চেয়ারটি খালি পড়ে আছে। বলতে গেলে সমস্ত কাচারী ঘর আর বিশাল বারান্দাটা ফাঁকা ধূ ধূ করছে। চারদিক খালি খালি লাগছে। ফুল ভাবে, কোন কারনে হয়তো আসতে দেরি হচ্ছে তার। প্রতি বিকেলে যে এখানে বসে থাকে সে আজ একেবারে আসবেই না, এটা তো হয় না! ফেরার পথে নিশ্চয় দেখবে তাকে। কিন্তু ফেরার পথেও কাচারী ঘরের সামনেটা ফাঁকা। কেউ বসে নেই চেয়ারে। হঠাৎ ফুলের কাছে কাঁখের পূর্ণ কলসীটিকে সম্পূর্ণ শূন্য মনে হয়। অথচ পুরো জলে ভরা বড় কলসীটা রীতিমতো ভারী।  কাঁখের কলসীর ভেতর জলের ওপরের স্তরের দিকে তাকিয়ে, যেন বিরক্ত হয়েছে তেমন সুরে, জবার উদ্দেশে বলে ফুল,  “ধ্যাৎ! একটা গান্ধী পোকা পড়েছে জলে।“

বলেই তাড়াতাড়ি সবটা জল উপুড় করে রাস্তার ধারে মাটিতে ফেলে দিয়ে আবার চৌধুরীদের বাড়িতে গিয়ে জল ভরে আনে ফুল আস্তে আস্তে টিউব ওয়েলের হাতল চেপে চেপে। ততক্ষণে সন্ধ্যা নামতে শুরু করেছে। সরকারদের কাচারী ঘরের সামনেটায় এক দলা অন্ধকার পুরো বাড়িটি লেপ্টে আছে। 

বারান্দাটা আগের মতোই ফাঁকা। কেউ এসে বসে না সেখানে। একই রকমভাবে চলে পরের দিন-ও।

তার পর দিন।

তার পর দিন।

তারপরের দিন।

পুরো এক সপ্তাহ।

একদিন সকালে কলসী ছাড়াই, সরকারদের বাড়িতে এসে হাজির হয় ফুল। এ বাড়ির ছোট মেয়ে মায়ার সঙ্গে খানিকটা জানাশোনা আছে তার। তাই অসময়ে ফুলকে একা এ বাড়িতে আসতে দেখে কেউ অবাক হয় না।  এটা সেটা কথার পর  মায়াকে সঙ্গে নিয়ে কাচারী ঘরের সামনে যেখানে এখনো সেই চেয়ারখানা পাতা, সামনে ছোট গোল টেবিল, সেখানে গিয়ে দাঁড়ায় ফুল। কোন কথা না বলে কেবল শূণ্য চেয়ারটির পিঠটার ওপর আলতো করে তার হাত দু’টি রাখে।  মায়া চেয়ারটির দিকে তাকায়। কী মনে করে নিজের থেকেই বলে, বি.এ পরীক্ষা শেষে তাঁর মেজো কাকির ছোটভাই শহর থেকে কিছুদিনের জন্যে বেড়াতে এসেছিল এখানে। প্রতি বিকেলে এ জায়গাটায় বসে বসে গল্পের বই পড়তে ও হাওয়া খেতে খুব পছন্দ করতো সে। কবিতাও লিখতো মাঝে মাঝে। পরীক্ষার ফল বেরিয়েছে। সেকেন্ড ডিভিশনে পাশ করেছে সে। এই গেল সপ্তাহেই জানতে পেরেছে।  তাই বাড়ি ফিরে গেল। আরো নাকি পড়ার ইচ্ছা আছে তার।

“ওঃ।“ আর কোন শব্দ বেরুলনা ফুলের কন্ঠ দিয়ে। তার বোঝা উচিত ছিল এ গাঁয়ের মানুষ সে নয়। চলে তো যাবেই একদিন। কী আছে এই গাঁয়ে যা তার মতো কলেজ পাশ করা তরুণকে ধরে রাখতে পারে!

ফুল দুই হাত বাড়িয়ে চেয়ারের পিঠটাতে আস্তে হাত বুলোয়। চোখ বুজে অনুভব করার চেষ্টা করে চেয়ারের হাতল,  পেছন, মাথার দিকটা।  যেন চেয়ারটি খালি নয়। শান্ত পরিশীলিত এক তরুণের শরীরের উত্তাপ ছড়িয়ে আছে সেখানে। অঘ্রাণ মাসের সকাল। কিন্তু পরিত্যক্ত চেয়ারটি আসলেই ঠান্ডা নয়। উষ্ণ-ই। এই  ঘরের বারান্দাটি কি পূব দিকে মুখ করা? সকালের তীর্যক আলো এসে পড়েছে কি সোজা বারান্দার ওপর। এই উত্তাপের উৎস কি তাহলে জাগতিক নয়? বহিবৈশ্বিক?  সূর্যের কিরণ থেকেই কি তা ধার করা?  আকাশের দিকে তাকিয়ে মধ্য সকালের ঘড়ির সময় নিরুপনের চেষ্টা করে ফুল।  তারপর দু’ হাত দিয়েই পরম মমতায় কাঠের চেয়ারটির পেছনটা শক্ত করে ধরে থাকে। আর সেভাবেই নিশ্চুপে দাঁড়িয়ে থাকে অনেকক্ষণ।

প্রতি বিকেলে এখনো চৌধুরীদের বাড়িতে কলসী কাঁখে জল আনতে যায় দুই বউ – ফুল আর জবা।

যাবার সময় প্রতিদিন তার কথা মনে পড়ে ফুলের। অন্তত একবার বারান্দাটির দিকে, খালি চেয়ারটির দিকে তাকায়।

মনে পড়ে সেই উল্টাপালটা দিনটির কথা। পাগলা গরুর পাগলাটে চোখদুটোর কথা। কোন কারণ ছাড়া শিং উঁচিয়ে তাঁর দিকে ধেয়ে আসার সেই ভয়ার্ত সন্ধ্যার কথা।

আর তারপর বোকার মতো সোজা উপুড় হয়ে তার সেই মাটিতে পড়ে যাওয়া। সে স্পষ্ট টের পায় তাঁর ডান পায়ের বুড়ো আঙ্গুলে অন্য এক পুরুষের উষ্ণ মমতাময় স্পর্শ।

ফুল নীচু হয়ে নিজের হাত দিয়েই ডান পায়ের বুড়ো আঙ্গুলটির ডগায় হাত বুলোয়।

জবা জিজ্ঞেস করে,”কী হয়েছে রে?”

“ব্যথা পেয়েছি! আবার। সেখানেই। বড্ড যন্ত্রণা!” 

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত