ঈদের এইদিন সেইদিন

বছর ঘুরে আবার এল পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর। শান্তি, সৌহার্দ্য আর আনন্দের বার্তা নিয়ে আসে মুসলিমদের বড় এই উৎসব। ঈদ হচ্ছে সব ভেদাভেদ ভুলে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে মিলিত হওয়ার দিন। ধনী-দরিদ্র, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী সব মুসলমান মিলেমিশে ঈদের আনন্দ সমান ভাবে ভাগ করে নেন, পারিবারিক হিংসা-বিদ্বেষ, অহংকার ভুলে খুশি মনে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সুদৃঢ় করেন। রোজা ও ঈদে ধর্মীয় অনুভূতি ও উৎসবের আমেজ দু’য়ে মিলে আনন্দ দ্বিগুন হয়ে ওঠে সবার। ছোট বেলার ঈদের আনন্দ অন্য রকম ছিল। সবচেয়ে বেশি আনন্দ ছিল ঈদের দিন সকালে নতুন জামা-কাপড় পড়ে ঈদের সালামি কিংবা ঈদি সংগ্রহ করা।

এক আনা, চার আনা, আট আনা—একসময় ঈদের সেলামি হিসেবে বরাদ্দ থাকত। এখন অবশ্য সেটা মাঝেমধ্যে ৫০০ টাকাও ছাড়িয়ে যায়। আগের মতো যৌথ পরিবারেও ঈদ কাটানোর সৌভাগ্য অনেকের হয় না। সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে বদলে গেছে অনেক কিছু। নতুন কাপড়, ঘুরতে যাওয়া, রান্না করা আর পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো।

চাঁদ কি উঠেছে?

২৯ রোজার দিন ছাদে উঠে ঈদের চাঁদ দেখার রেওয়াজ এখনো আছে। কম বয়সীদের মধ্যে এই উৎসাহ বেশি। কাল কি ঈদ হবে? চাঁদ দেখা গেলে নিশ্চিত হওয়া যায় কাল ঈদ। আর তখনই মেয়েরা হাতে মেহেদি লাগানো শুরু করে। মেহেদি লাগানোর এই চল অবশ্য অনেক আগে থেকেই, তখনকার দিনে, ঈদের আনন্দ ও প্রস্তুতি শুরু হয়ে যেত চাঁদরাত থেকেই। ছেলে মেয়েরা হাতে বাটা মেহেদি ব্যবহার করতো। গায়ে হলুদ মাখতো আর সোন্দাগিলা (সুগন্ধিযুক্ত একধরনের ভেষজ) বেটে মাথায় দিতো।

আজকালকার ছেলেমেয়েরা চাঁদরাতে বাড়ির ভেতরেই ভাইবোনেরা মিলে ভিডিও গেমস, বালিশ খেলা ও দাবা খেলে সময় কাটায়। এ কারণে দেরি হয় ঘুমাতে যেতে।

বাংলাদেশ ঢাকার ষাটের দশকের দিকে চাঁদরাতের দৃশ্য ছিল কিছুটা আলাদা। মূল বাজার বলতে ছিল একটাই, সদরঘাট। চাঁদরাতে সারা রাত কেনাকাটা চলতো। এখনকার মতো এত জমজমাটভাবে এক মাস ধরে কেনাকাটা করা হতো না।’

বাংলাদেশের পঞ্চাশ দশকে ঈদের দিন সবার আকর্ষণ ছিল চকবাজারের মেলা। সকালে পাড়া ঘুরে ঘুরে সেলামি সংগ্রহ করা হতো। তখনকার দিনে আট আনাই ছিল সর্বোচ্চ ঈদি (সেলামি)। সারা দিন ঘুরে ও কেনাকাটা করে ওই টাকা শেষ হতো না। মেলা থেকে মাটির টোপাটাপি (হাঁড়ি-পাতিল) ও মাটির পুতুল কেনা, বায়োস্কোপ দেখা এবং ডুগডুগি কেনা চলত; সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের খাবারও কেনা হতো বলে জানান অগ্রজেরা। ঈদ মেলা পুরান ঢাকায় এখনো হয় নিয়মিত। পুরান ঢাকায় ঈদের দিন সকালে মেয়েরা বাড়িতে মাকে সাহায্য করে। ছেলেরা বাবার সঙ্গে মসজিদে যায়। নামাজ পড়তে যাওয়ার আগে মিষ্টিমুখ করে যেতে পছন্দ করে অনেকে। নামাজ পড়ে এসে মিষ্টি কুমড়া দিয়ে গরুর মাংস ও খিচুড়ি খেয়ে থাকে সবাই। খাবারের এই ঐতিহ্য অনেক আগে থেকেই প্রচলিত, যেটা রয়ে গেছে। নতুন প্রজন্মের সবাই জানায়, ঈদের তিনটি দিন তারাও বাড়িতে তৈরি ঐতিহ্যবাহী খাবার খেতে পছন্দ করে। অতীতে নামাজ পড়তে যাওয়ার সময় আতর লাগানোর প্রচলন ছিল। এই প্রজন্মের সবাই অবশ্য আতর ব্যবহার করে না। নামাজ শেষে পরিবারের মৃত সদস্যদের কবর জিয়ারত করে আসেন। ঈদের তিন দিন পরিবারের সঙ্গেই সময় কাটাতে পছন্দ করেন। বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হলেও সেটা তিন দিন পরে।

ঈদ মিছিলের কথা বিভিন্ন বইয়েও পাওয়া যায়। মুনতাসীর মামুনের লেখা পুরানো ঢাকা উৎসব ও ঘরবাড়ি বইটির তথ্যমতে, দেড়-দুই শ বছর আগে নিরানন্দ ঢাকা শহর দু-এক দিনের জন্য হলেও ঝলমল করে উঠত। এর মূলে ছিল তিনটি উৎসব—ঈদ, আশুরা ও জন্মাষ্টমী। এই তিনটি উৎসবের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল বর্ণাঢ্য মিছিল। ঢাকার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি চর্চা প্রতিষ্ঠান ঢাকা কেন্দ্র। প্রতিষ্ঠানটির সভাপতি মো. আজিম বখ্শ মিছিলের কথা তুলে ধরেন এভাবে: ঈদ মিছিলে রাজনৈতিক ও সামাজিক বক্তব্য ফুটিয়ে তোলা হতো। মিছিলে থাকত সজ্জিত হাতি, উট, পালকি প্রভৃতি। ঈদ মিছিল বন্ধ হয়ে গিয়েছিল ১৯৫৪ সালে। আবার শুরু হয় নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে। ঢাকার ঈদ মিছিল ছিল বেশ বর্ণাঢ্য। মিছিলে সাধারণ মানুষই অংশগ্রহণ করেন। মিছিল দেখার সময় ছাদ থেকে সবাই দড়ি নামিয়ে চিনাবাদাম কিনতেন।

ঈদের নতুন পোশাক

হালফ্যাশনের বাহারি নকশার তৈরি পোশাকই বেশি পছন্দ করে আজকের প্রজন্ম। আগে তৈরি পোশাকের প্রতি তেমন একটা আকর্ষণ ছিল না। কাপড় কিনে দরজির (তখন বলা হতো খলিফা) দরজাতেই সবাই ধরনা দিত।

এখনকার মতো এত নকশা করা পোশাক তখন বানানো হতো না। একটি থান কাপড় দিয়ে সবার জন্য পোশাক বানানো হতো। অধিকাংশ ভাইবোনের কাপড় এক রকমই হতো। এর বাইরেও হয়তো কেউ বিশেষভাবে জামা বানাত। কোনো কোনো পরিবারে ছোটদের মধ্যে কাপড় লুকিয়ে রাখার প্রবণতা দেখা যেত। নতুনদের মধ্যে যেটা এখন আর কেউ করেন না। ঈদের দিন পরার পরই সবাই সেটা দেখতে পারত। ঈদের জন্য বিভিন্ন রঙের কাগজের টুপি পাওয়া যেত। সেটা একবারই ব্যবহার করা যেত। দাম ছিল এক আনা, দুই আনা।

অতীতের ঈদ ছিল পারিবারিক আর জমকালো। যেখানে বাইরের জাঁকজমক থেকে মুখ্য ছিল আত্মিক বন্ধন। সে তুলনায় এখনকার ঈদ যেন অনেকটা মেকি। অগ্রজদের ধারণা এমনটাই। নতুন প্রজন্ম কিন্তু মনে করে উল্টোটা। তাদের মতে, নাগরিক জীবনে ঈদ সুযোগ করে দেয় পরিবারের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানোর।

 

 

 

.

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত