অতিমারী: থুসিডিডস থেকে জাস্টিনিয়ান পর্যন্ত একটি পরিক্রমা

Reading Time: 20 minutes

ভাষান্তর: অদিতি ফাল্গুনী

 

সভ্যতার ইতিহাস জুড়েই মানুষ বিভিন্ন সময়পর্বে নানা বিপর্যয়কর অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে পার হয়েছে। বেঁচে থাকার জন্য সেসব বিপর্যয় তাকে সহ্যও করতে হয়েছে। এই সব দূর্যোগের ভেতর সবচেয়ে অনির্ণয়যোগ্য একটি ছিল প্লেগ বা মড়ক। গ্রিক ভাষায় প্লেগ বলত যে কোন ধরণের অসুস্থতা বোঝায় আর ল্যাটিনে মড়ককে বলা হয় প্লাগা ও পেস্টিস। প্রাচীন যুগে দুটো সংহারী মড়কের ভেতর একটি ছিল ৪৩০ অব্দের এথেনীয় মড়ক ও আর একটি ছিল ৫৪২ খ্রিষ্টাব্দের জাস্টিনিয়ানিক বা জাস্টিনীয় মড়ক। এই প্রবন্ধে এথেনীয় ও জাস্টিনীয় মড়ক সম্পর্কে আলোচনা করা হবে। আলোচনা করা হবে এই মড়ক দুটো কিভাবে ছড়িয়েছিল এবং যারা বেঁচে গেছিল তারা কিভাবে বেঁচে গ্যাছে। এছাড়াও সেই প্রাচীন যুগের লেখকেরা কিভাবে এই বিপর্যয়গুলো মোকাবেলা করেছেন সেটা নিয়েও এই প্রবন্ধে আলোচনা করা হবে এবং এই প্রসঙ্গে দেবতাদের ভূমিকাও আলোচনা করা হবে। মূলত: ১৪ শতকের কালো মৃত্যু বা ব্যুবোনিক প্লেগ জাতীয় মড়ক সম্পর্কে প্রথাগত ভাবে যা বিশ্বাস করা হয়, তার আলোকেই অতীতের এই দুই মড়ক (এথেনীয় ও জাস্টিনীয়) সম্পর্কেও জনমনে নানা ভাবনা প্রচলিত বিদ্যমান। একে তো এথেনীয় ও জাস্টিনীয় মড়ক সম্পর্কে প্রাপ্ত তথ্যসূত্র গুলো অপর্যাপ্ত, তাতে কালো মড়কের সাথে এথেনীয় ও জাস্টিনীয় মড়কের তুলনা প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক সূত্র নিয়েই মতভেদ আছে।

এথেনীয় মড়কের সূচনা হয়েছিল ৪৩০-২৬অব্দে। পেলোপনেশীয় যুদ্ধের সময় এই মড়কের শুরু। আনুমানিক ৪৩১ থেকে ৪০৪ অব্দে এথেন্স ও স্পার্টার ভেতর যুদ্ধের সময় এই মড়ক ছড়িয়ে পড়ে। নগর এলাকায় জনবহুল পরিবেশেই যুদ্ধ যখন শুরু হলো, তখন মড়কও দ্রুত বিস্তার লাভ করলো। লক্ষ লক্ষ মানুষ তখন মরতে শুরু করে। এই মড়কে এথেন্সের প্রাক্তন নেতা পেরিক্লিসও ক্ষতিগ্রস্থ হন। তবে এথেনীয় মড়ক সম্পর্কে থুসিডিডসের হিস্ট্রি অফ দ্য পেলোপনেসীয়ান ওয়্যার হলো একমাত্র প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বয়ান। থুসিডিডস (জন্ম: খ্রিষ্টপূর্ব ৪৬০- মৃত্যু: ৪০০ অব্দ) ছিলেন এথেন্সের একজন সমরনায়ক ও রাজনৈতিক সমালোচক বা বিশ্লেষক। থুসিডিডস তাঁর হিস্ট্রি অফ দ্য পেলোপনেসীয়ান ওয়্যার-এ ঐতিহাসিক নানা ঘটনাবলীর অর্থ এবং কারণ অনুসন্ধানের জন্য সযতন প্রয়াসে একটি কাঠামো গড়ে তুলেছিলেন এবং সেই কাঠামো কার্যকর ভাবে ব্যবহারও করেছেন। সোফিস্ট দার্শনিক চিন্তা থেকে উদ্ভুত তাঁর বিশেষায়িত রচনাশৈলী ব্যকরণ এবং অলঙ্কারশাস্ত্রের একটি নিরন্তর, বিবেকী বিশ্লেষণের প্রতিফলন ঘটায়। ইতিহাস, থুসিডিডসের মতে, মানবীয় স্বভাবের একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং সেজন্যই নানা গণ আন্দোলন দ্বারা ইতিহাস প্রভাবিত হয়। এজন্যই থুসিডিডস দৈহিক বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিয়েছেন এবং দেবতাদের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ চান নি বা আশা করেননি। এথেনীয় মড়ক সম্পর্কে থুসিডিডসের বিবরণ থেকেই জানা যাচ্ছে যে সেসময় যে কোন মারী বা মড়ককে দেবতার অভিশাপ হিসেবে দেখা হতো। যেমনটা হেরোডোটাস লিখেছেন তাঁর দ্য বুক অফ এক্সোডাস বা হোমার লিখেছেন তাঁর ইলিয়াড-এ। এই কাজের মাধ্যমে, থুসিডিডস একটি ঐতিহাসিক বিবরণধর্মী রচনার ঐতিহ্যের সূত্রপাত ঘটান যা ভবিষ্যতেও অনেক ইতিহাসবিদের আদর্শ হবে। থুসিডিডস যেহেতু নিজেই মড়কে ভুগেছেন, কাজেই মড়কের লক্ষণগুলো সম্পর্কে তিনি একটি খুব নিয়মানুগ বর্ণনা দিয়েছেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল মূলত: “অতিমারী কেমন সেটা বর্ণনা করা এবং রোগের লক্ষণগুলো সণাক্ত করা যাতে করে এই রোগ বিষয়ে জেনে সাধারণ মানুষ রোগটি হলে বুঝতে পারে এবং রোগটি আর ছড়িয়ে না পড়ে।“ এই এথেনীয় মড়ক প্রথম ছড়িয়ে পড়েছিল ইথিওপীয়ায় এবং তারপর সেখান থেকে বিস্তার লাভ করেছে মিশর এবং গ্রিসে।

 

থুসিডিডস, যাহোক, পরে মন্তব্য করেন যে এথেন্স নগরী এই ব্যাধি থেকে চূড়ান্ততম ক্ষতি সয়েছে। অতিমারীর প্রাথমিক লক্ষণগুলো ছিল মাথা ব্যথা, চোখ ওঠা, সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়া এক ধরণের ফুসকুড়ি এবং জ্বর। এরপর এই রোগের রোগীদের কফে রক্ত উঠে আসত আর পাকস্থলীতে তীব্র ব্যথা দিয়ে মোচড়ের পরই বমি হতো বা বমি বমি ভাব হতো। অনেকের নিদ্রাহীনতা ও অস্থিরতা দেখা দিত। থুসিডিডস আরো জানান যে এই মড়কে রোগীদের এমন প্রবল পিপাসা দেখা দিত যে রোগীরা পাগল হয়ে অনেক সময় কুয়ার ভেতর ঝাঁপিয়ে পড়তো। সংক্রমিত ব্যক্তিরা সাধারণত: সংক্রমণের সপ্তম বা অষ্টম দিন নাগাদ মারা যেত। কেউ যদি এতটা লম্বা সময় মানে সাত বা আট দিন পর্যন্তও বাঁচতো, তবে তার দেখা দিত অনিয়ন্ত্রণযোগ্য ডায়রিয়া বা উদরাময় যা প্রায়ই অনেকের মৃত্যুর কারণ হয়ে উঠতো। এই ডায়রিয়া পার হয়েও যে বা যারা বেঁচে যেত, তাদের প্রায়ই বাকি জীবনটা আংশিক পক্ষাঘাত, এ্যামনেশিয়া বা স্মৃতিভ্রংশতা, অন্ধত্বে ভুগতে হতো। সৌভাগ্যক্রমে, মড়কের সংক্রমণ পার হয়ে কেউ বেঁচে গেলে সে এই রোগে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠতো। খুব কম ক্ষেত্রেই দ্বিতীয়বার কেউ এই একই রোগে আক্রান্ত হতো এবং এমনটা ঘটলে দ্বিতীয়বার সংক্রমণ কখনোই মারণ রোগ হয়ে দেখা দিত না।

 

থুসিডিডসের এই বিবরণ এথেনীয় মড়কের অনেক সামাজিক প্রতিক্রিয়া বা ফলাফলকেও অন্তর্ভুক্ত করেছে যা তিনি যুদ্ধের প্রেক্ষিতে বিবেচনা করেছেন। যেমন, ডাক্তার বা রোগীর শুশ্রুষায় জড়িতরা প্রায়ই এই ব্যাধিতে আক্রান্ত হতেন এবং রোগীর পাশাপাশি তারাও অনেক সময় মারা যেতেন। অথচ, এথেন্সকে ঘেরাও করে রাখা স্পার্টীয় বা স্পার্টানরা এই অসুখে সংক্রমিত হয়নি। যদিও তখন পুরো এথেন্সে এই ব্যাধি ছড়িয়ে পড়ছে। মড়কে গোটা এথেন্স নগরী জুড়ে যে হতাশা ছড়িয়ে পড়েছিল, সেই সর্বব্যপ্ত হতাশা সাধারণ মানুষকে দৈব এবং শাসকদের নির্মিত আইনের প্রতি নির্মোহ হতে বলে। অনেকেই এই ব্যাধির সাথে লড়াইয়ের ক্ষেত্রে হালও ছেড়ে দিয়েছিল। থুসিডিডস তাঁর বিবরণে আরো উল্লেখ করেছেন যে সে সময় কেউই ঐতিহ্যবাহী শোককৃত্যের রীতি-নীতি পালন করত না। মড়কের মুখে নাগরিক কর্তব্য ও ধর্মের পতন হয় আর কুসংস্কার হয়ে ওঠে সবার চালিকা শক্তি। মানুষ হত্যে দেয় দৈববানীর স্মৃতিচারণায়। খ্রিষ্ট পূর্ব প্রথম শতকে লুক্রেতিয়াস এথেনীয় মড়ক সম্পর্কে থুসিডিডসের এই বিবরণ এপিকিউরাসের নীতিকে সমর্থনের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করবেন। তাঁর মতে, মড়ক শুধুই মানুষের অসহায়ত্বকে প্রকাশ করে না। একইসাথে এটি ধর্মের অন্তঃসারশুণ্যতা এবং ঈশ্বরে বিশ্বাসের নিরর্থকতাও প্রকাশ করে। যদিও এথেনীয় এবং জাস্টিনীয় মড়কের মধ্যবর্তী সময়ে আরো অনেকগুলো ভয়ানক মড়ক গ্রিসে দেখা দিয়েছিল, তবে কিছু ঐতিহাসিক সূত্র থেকে জানা যায় যে এই মড়কগুলোয় মানুষ তবু কিছুটা হলেও বেঁচেছে। কিন্তু দূর্ভাগ্যজনক বিষয় হচ্ছে এ বিষয়ক ঐতিহাসিক নথি-পত্রগুলো পর্যাপ্ত নয়। এবং এজনই ঐ মড়কগুলোর বীজাণুগত পরিচয় আজ আর সনাক্ত করা সম্ভব নয়। ঐতিহাসিক এই হাতে গোণা সূত্রগুলো থুসিডিডসের সাহিত্যিক প্রকরণ বা কৌশল প্রায়ই অনুসরণ করে। যাহোক, ঐতিহাসিক ঐ সূত্রগুলো থুসিডিডসের লেখার ঢং অনুসরণ করলেও তাঁর মত তারা নাস্তিক নয় এবং মারী বা মড়কের পেছনে দেবতাদের অভিশাপ আছে বলে তারা মনে করে।

 

এমন একটি মড়ক হলো আন্তোনাইন বা আন্তোনীয় মড়ক। আনুমানিক ১৬১-১৮০ খ্রিষ্টাব্দ নাগাদ এবং মার্কাস অরেলিয়াসের শাসনকালে এই মড়ক ছড়িয়ে পড়েছিল। সেলেউসিয়া থেকে ফেরার পথে সৈন্যরা এই মড়ক সাথে করে নিয়ে এসেছিল এবং রোগটি নির্মূল হবার আগেই গোটা এশিয়া মাইনর, মিশর, গ্রিস এবং ইতালীতে আন্তোনীয় মড়ক বিস্তার লাভ করে। কোন কোন এলাকায় এই মড়ক জনসংখ্যার মোট এক-তৃতীয়াংশ ধ্বংস করতে সক্ষম হয় এবং রোমক সেনাবাহিনীকেও নাশ করতে সমর্থ হয়। মার্কাস অরেলিয়াস নিজেই ১৮০ খিষ্টাব্দে মড়কে সংক্রমিত হন এবং তাঁর সেনাশিবিরে মৃত্যু বরণ করেন। দিসিয়াস (২৪৯-২৫১ খ্রিষ্টাব্দ) এবং গাল্লাসের (২৫১-২৫৩ খ্রিষ্টাব্দ) সময়ে আর একটি মড়ক ছড়িয়ে পড়েছিল বলে জানা যায়। মিশরে এই অতিমারী ২৫১ খ্রিষ্টাব্দে ছড়িয়ে পড়ে এবং গোটা সা¤্রাজ্য সংক্রমিত হয়। মিশরীয় সেনাবাহিনীর অনেক পদমর্যাদা বিশিষ্ট সেনা কর্মকর্তারা এই রোগে মৃত্যু বরণ করেন এবং গোটা সেনাবাহিনীতে প্রবল শ্রমিক সঙ্কট দেখা দেয়। এই মড়ক ২৭০ খ্রিষ্টাব্দ নাগাদ চলছিল আর ২৭০ সালেই সম্রাট ক্লদিয়াস গোথিসকাস এই মারীতে মারা যান (২৬৮-২৭০)। খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতকের পর থেকে ষষ্ঠ শতকের মধ্যভাগ বা জাস্টিনীয় মড়ক পর্যন্ত সময়কাল অবধি ইতিহাসে সুলিখিত অন্য কোন অতিমারীর কথা জানা যায় না। এই মহামারী ৫৪১-২ খ্রিষ্টাব্দ নাগাদ সূচিত হয়েছিল ইথিওপীয়ায় এবং মিশর, মধ্য এশীয় স্তেপ ভূমি হয়ে ক্যারাভান বাহক বণিকদের বাণিজ্যপথ জুড়ে মড়কটি ছড়িয়ে পড়ে। এই দুই এলাকার একটিতে অতিমারী গোটা রোমক সাম্রাজ্যের ভুবনে ছড়িয়ে আরো বহুদূর বিস্তৃত হয়। কালো মড়কের মতই (যা কিনা ১৩৮৪ সালে ইউরোপে বিস্তার লাভ করেছিল) জাস্টিনীয় অতিমারী সাধারণত: বাণিজ্যিক পথগুলো ধরে মানুষকে সংক্রমিত করেছে এবং এভাবেই “সংক্রমণ ও বাণিজ্য পণ্যের বিনিময় সম্ভব করেছে“ এবং বিশেষত: সমুদ্র তীরবর্তী বা উপক‚লীয় শহরগুলোয় নিষ্ঠুর সংহারী চেহারায় দেখা দিয়েছে। জাস্টিনিয়ানের অভিযানের সময় সেনাবাহিনীর গতায়াতেও মড়ক বিস্তার লাভ করেছে। এভাবেই বাণিজ্য এবং সামরিক বাহিনীর অভিযানের মাধ্যমে এক প্রবল অতিমারী ছড়িয়ে পড়েছিল এশিয়া মাইনর থেকে আফ্রিকা এবং ইতালীতে এবং সেখান থেকে পশ্চিম ইউরোপে।

 

যদিও ইতিহাসের অনেক লেখকই এই সময়পর্বকে নথিবদ্ধ করেছেন, জাস্টিনীয় মড়কের বিবরণ পেতে তিনটি প্রধান ঐতিহাসিক সূত্রের শরণাপন্ন হওয়া যেতে পারে: এফেসিউসের জন, এভাগ্রিয়াস স্কলাসটিকাস এবং বিশেষত: প্রোকোপিউয়াসের রচনা। এফেসিউসের জন তাঁর “হিস্টোরিকা এক্লেসিয়াসটিকা“ এই সময়পর্বেই রচনা করেন, বিশেষত: যখন তিনি গোটা সাম্রাজ্য জুড়ে ভ্রমণ করছিলেন। এফেসিউসের জনের রচনাবলী অবশ্য এখন শুধুই ভগ্নাংশ আকারে পাওয়া যায়। আন্তিয়োক শহরে বসবাসরত আইনবিদ ও সম্মানিত অধ্যক্ষ এভাগ্রিয়াস তাঁর “হিস্টোরিয়া এক্লেসিয়াসটিকা“ গ্রন্থে ষষ্ঠ শতকের শেষভাগ বা ৪৩১-৫৯৪ খ্রিষ্টাব্দের অতিমারী নিয়ে বিশদ বিবরণ রচনা করেছেন। এভাগ্রিয়াসের রচনাই কিন্তু অতিমারী বিষয়ক প্রাচীন গ্রিক মনীষীদের রচনার ভেতর চরিত্রের দিক থেকে সবচেয়ে ব্যক্তিগত, যেহেতু তিনি নিজেই ৫৪২ খ্রিষ্টাব্দে খুব অল্প বয়সে একবার মড়কে সংক্রমিত হয়েছিলেন। যদিও তিনি কালক্রমে সেরে ওঠেন, তবে পুনঃ পুনঃ মড়কের সংক্রমণে পরে তিনি হারাবেন তাঁর প্রথম স্ত্রী, বেশ কয়েকটি সন্তান, একজন নাতি এবং তাঁর ঘরের বেশ কয়েকজন ভৃত্য। জাস্টিনীয় মড়কের আর একটি তথ্যসূত্র হলো আগাথিয়াসের হিস্টোরিয়া। একজন কবি এবং আইনবিদ এই আগাথিয়াস ঐতিহাসিক প্রকোপিয়াস রচিত ইতিহাসের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখেন। আগাথিয়াস অবশ্য যে মড়কের বর্ণনা দিয়েছেন, সেটি ৫৫৮ সালে কনস্টান্টিনোপলে দ্বিতীয়বারের মত আঘাত হানে। এ বিষয়ক আর একটি কাজ হচ্ছে জন মালালাসের ক্রনিকল, তবে মালালাসের কাজটি প্রকোপিয়াসের কাজের হুবহু অনুকরণ।

 

যদিও উপরোল্লিখিত গ্রিক পন্ডিতদের এই রচনাবলী মড়ক সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করে, ৫৫০ খ্রিষ্টাব্দে প্রকোপিয়াসের কলমে হিস্ট্রি অফ দ্য ওয়ারস বইটিই প্রাচীন যুগের অতিমারী সম্পর্কে সবচেয়ে নিয়মানুগ তথ্য প্রদান করে; এই রোগের যাবতীয় লক্ষণ এবং আশু প্রতিক্রিয়া বিষয়ে আমাদের জানায়। সিজারিয়ায় জন্ম নেয়া প্রকোপিয়াস জেনারেল বেলিসারিয়াসের আইনী সচিব হয়েছিলেন এবং তাঁর সাথেই তিনি জাস্টিনিয়ান পরিচালিত ইতালী, বলকান এবং আফ্রিকায় সাম্রাজ্যের পুনর্দখলের অভিযানে ভ্রমণ করেন। আনুমানিক ৫৪২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি কনস্টান্টিনোপলে মড়ক প্রত্যক্ষ করেন। প্রকোপিয়াসের প্রাথমিক সাহিত্যিক আদর্শ ছিলেন থুসিডিডস, যাকে কিনা ধ্রুপদী যুগের সব লেখকই সচেতনভাবে অনুসরণ করেছেন। মার্কাস অরেলিয়াসের রাজত্বকালে, সামোসাটার লুসিয়ান হাউ টু রাইট হিস্ট্রি নামে একটি রচনা প্রকাশ করেন। এই রচনায় লুসিয়ান বলেন যে ইতিহাস অলঙ্কার শাস্ত্র থেকে আলাদা এবং সত্য রচনাই ইতিহাসের লক্ষ্য হওয়া উচিত। ইতিহাসবিদ হতে চাইলে ব্যক্তির অন্তত দুটো শর্ত পূরণ করা দরকার বা প্রয়োজন। প্রথমত, একজন ঐতিহাসিকের জন কার্যক্রম বোঝার সহজাত প্রতিভা থাকতে হবে এবং দ্বিতীয়ত, তাঁর লেখার ক্ষমতা থাকতে হবে। লেখার ক্ষমতা অবশ্য কোন সহজাত প্রতিভার বিষয় নয়। কঠোর পরিশ্রম ও অনুশীলনের মাধ্যমেই কেবল একজন ভাল লেখক হতে পারে। সেই সাথে ভাল লেখকের আগের লেখকদের পাঠ করা ও অনুসরণ করার অভ্যাসও থাকতে হবে।

 

মূলত, নানা কারণেই অনেকে অনুমান করেন যে প্রকোপিয়াস সচেতনভাবেই থুসিডিডসের কাজ অনুসরণ করতেন। হিস্ট্রি অফ দ্য ওয়ারস গ্রন্থের মুখবন্ধে প্রকোপিয়াস দাবি করেন যে তিনি ““অলঙ্কারশাস্ত্রের জন্য চাতুর্য্যকে লাগসই মনে করতেন, কবিতার জন্য পুরাণের বয়ানকে আর ইতিহাসের জন্য দরকারী ভাবতেন একমাত্র সত্যকে।“ এই মুখবন্ধই থুসিডিডসের কাজকে আয়নার মত তুলে ধরছে। প্রকোপিয়াসও এমনটাই চাইতেন। তিনি চাইতেন যেন তাঁর পাঠকরা ইতিহাসকে বিশ্বাসযোগ্য বা নির্ভরযোগ্য মনে করতে পারে। প্রকোপিয়াস তাঁর কাজগুলো রচনা করেছেন ধ্রুপদী আট্টিক গ্রিক ভাষায় যা কিনা অন্ত্য রোমক সাম্রাজ্য বহুদিন হয় ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ছিল। কিন্তÍ গ্রিক আত্তিক ভাষার অনুরাগী প্রকোপিয়াস অ-আট্টিক শব্দ ব্যবহার করতে চাইছিলেন না। লাতিন ভাষা থেকে শব্দ ধার না করার বিষয়েও তিনি সতর্ক ছিলেন। উদাহরণস্বরূপ, যখনই কিনা প্রকোপিয়াস কোন লাতিন শব্দ যেমন রেফারেনদারি ব্যবহার করছেন, তিনি সেই শব্দের মুখবন্ধে “রোমকরা যেমন বলে থাকে“ ব্যবহার করছেন। সেই সাথে প্রকোপিয়াস হেরোডোটাসকেও খানিকটা বিচ্ছিন্নভাবেই অনুসরণ করেছেন এবং হুনদের তিনি মাসসাগেটে এবং পারসিকদের মেদেস বলে উল্লেখ করেছেন। এই উদাহরণগুলোই প্রমাণ করে যে কিভাবে প্রকোপিয়াস ধ্রুপদী ঐতিহাসিকদের অনুসরণ করেছেন যা শুধুই তার সমসাময়িক ঐতিহাসিকেরা প্রশংসা করেই ক্ষান্ত হননি, তাঁরা প্রকোপিয়াসের কাজ থেকে হেরোডোটাসের মত কাজের ক্ষেত্রে ধ্রুপদী নির্মোহ মনোভাবও আশা করেছেন।

 

তবে কিছু পন্ডিত অবশ্য প্রকোপিয়াসের কাজকে কৃত্রিম বলে বাতিল করেছে। প্রকোপিয়াস ধ্রæপদী ঐতিহাসিকদের কাজকে অনুসরণ করেছেন বলেই এই দায় তাঁর ঘাড়ে চেপেছে। কেউ কেউ এমনটাও দাবি করেছেন যে প্রকোপিয়াস হিস্ট্রি অফ দ্য পেলোপন্নেসিয়ান ওয়্যার থেকে মড়কের বিবরণ ধার করেছেন। অন্ততঃপক্ষে এটা তারা নির্দেশ করেন যে প্রকোপিয়াসের পক্ষে সব ঘটনা নথিবদ্ধ করাটা বিষ্ময়কর। যেহেতু জাস্টিনীয় মড়কের পর আর ১৩৪৮ সালের কালো মড়ক অবধি আর কোন অতিমারী দেখা দেয়নি। অথচ, প্রকোপিয়াস তাঁর “হিস্ট্রি অফ দ্য ওয়্যারস“-এ বলছেন যে ৫৪২ সালের বসন্তে কনস্টান্টিনোপলে যখন মড়ক ছড়াতে শুরু করলো তখন প্রতি দিন ১০,০০০ মানুষ মরতে শুরু করলো এবং চার মাস ধরে এই মড়ক চললো।

 

যদিও মৃত্যুর এই পরিসংখ্যান অতিরঞ্জিতও হতে পারে, তবু এবিষয়ে সন্দেহ নেই যে এই অতিমারী সত্যিই মানুষের অনেক ক্ষতি করেছিল। জীবিত ও মৃত উভয়েরই। কাজেই প্রকোপিয়সের জন্য এটি সত্যিই একটি চিত্তাকর্ষক, ঐতিহাসিক বিষয় ছিল। রাজধানী ধ্বংস হবার পর, মড়ক গোটা সাম্রাজ্য জুড়ে ছড়িয়ে পড়লো এবং ৫৪২ শতক থেকে অষ্টম শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত চললো। তবে প্রকোপিয়াসের যে সমালোচকরা তাকে থুসিডিডসের বিবরণ থেকে হুবহু উদ্ধৃত করার দোষে দুষ্ট করে, তারা জানে না যে এই দু‘জন লেখকের বিবরণে মড়কের লক্ষণ কিন্তÍ ভিন্ন। প্রকোপিয়াস, এফেসিউসের জন এবং এভাগ্রিয়াসের ভাষ্যে জাস্টিনীয় মড়ক আমাদের ব্যুবোনীয় মড়কের আদিতম নথিবদ্ধ বিবরণ। এই প্রত্যেক লেখকই রোগীর ত্বকের উপর ব্যুবোনিক মড়ক ছড়িয়ে পড়ার এক বিশেষ লক্ষণের কথা উল্লেখ করেছেন। যদিও ৪৩০ অব্দের এথেনীয় মড়কের কারণ এখনো সণাক্ত হয়নি, তবু ব্যুবোনিক মড়ক সহ আরো কিছু ব্যাধির কথা এক্ষেত্রে ভাবা হচ্ছে। সাম্প্রতিকতম তত্ত্ব অনুযায়ী এবং ওলসন ও আরো কিছু অতিমারী বিশেষজ্ঞ ও ধ্রুপদী তাত্ত্বিকদের মতে, এথেনীয় মড়কের মূল কারণ ছিল ইবোলা ভাইরাস এবং জ্বরের সাথে রক্তক্ষরণ। এছাড়াও প্রকোপিয়াস ও থুসিডিডসের বিবরণে সংক্রামক রোগের লক্ষণ আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকের বিবেচনায় স্বতন্ত্র ছিল। থুসিডিডস লক্ষ্য করেন যে যারা অসুস্থদের সেবা করছেন তারা এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। কনস্ট্যান্টিনোপলে অবশ্য এমন ঘটনা নিয়মিত ঘটেনি। অন্যদিকে এথেনীয় মড়ক ছিল পরিষ্কারভাবেই একটি চড়া মাত্রার সংক্রামক বা ছোঁয়াচে রোগ। প্রকোপিয়াস, বিপরীত দিক থেকে দেখলে, ব্যুবোনিক মড়কের বর্ণনা দিয়েছেন। এই ব্যুবোনিক মড়ক খুব ছোঁয়াচে ছিল না যতক্ষণ না রোগীর ফুসফুস আক্রান্ত হচ্ছে অথবা রোগীর শরীরে নিউমোনিয়ার কোন বীজাণু বাসা বাঁধছে। যদিও প্রকোপিয়াসের বিবরণে থুসিডিডসের রচনাশৈলীকে অনুসরণ করা হয়েছে, তাই বলে তিনি হুবহু হিস্ট্রি অফ দ্য পেলোপন্নেসিয়ান ওয়্যার থেকে তুলে দেন নি। যেহেতু দু‘জনের রচনা থেকে দেখাই যাচ্ছে যে দু‘টো ভিন্ন ভিন্ন রোগের লক্ষণ আলোচনা করা হচ্ছে।

 

প্রকোপিয়াসের বিবরণ থেকে এটা জানা যাচ্ছে যে ৫৪২ খ্রিষ্টাব্দের বসন্তে ব্যুবোনিক মড়ক কনস্ট্যান্টিনোপলে পৌঁছায়। এই মড়কের বীজাণুর মূল ভ‚মি কোথায় ছিল সে বিষয়ে বর্তমান যুগের গবেষকরা নিশ্চিত না হলেও হালে আফ্রিকার দেশগুলো যেমন কেনিয়া, উগান্ডা বা জায়ারে থেকে ঘন ঘন অনেক সংক্রামক রোগের বিস্তার দেখে অনুমান করা যায় যে হয়তো আফ্রিকা থেকেই ব্যুবোনিক প্লেগের সূচনা। তবু অনেকেই বিশ্বাস করে যে মধ্য এশিয়ার স্তেপ তৃণভ‚মিতে প্লেগ দেখা দেয় এবং পরে বাণিজ্য পথে ছড়িয়ে পড়ে দূর প্রাচ্য অবধি। উল্লেখ্য, ১৩৮৪ সালের কালো মৃত্যুর ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছিল। 

 

প্রাচীন যুগের এই সব মড়ক ঠিক কোন্ দেশ থেকে পৃথিবীর সর্বত্র ছড়িয়েছে সেটা নিয়েও অনেক মতভেদ আছে। প্রকোপিয়াস দাবি করেন যে পেলুসিয়ামের কাছে মিশরেই মড়কের উদ্ভব; আবার এভাগ্রিয়াস বলেন যে এ্যাক্সামে (হালের ইথিওপীয়া ও পূর্ব সুদান) এই মড়কের উদ্ভব। এভাগ্রিয়াসের অনুমান অবশ্য সেই যুগের সনাতনী কুসংস্কার থেকে উদ্ভুত হতে পারে যে রোগ-ব্যাধি সব গরম দেশ থেকে আসে। যাহোক, সব মিলিয়ে বলা যায় যে মিশরেই ৫৪১ খ্রিষ্টাব্দে এই রোগের উদ্ভব হয়েছিল এবং সেখান থেকে কনস্ট্যান্টিনোপল হয়ে যাবতীয় বাণিজ্য ও সামরিক পথ হয়ে এই মড়ক ছড়িয়ে যায় উপক‚লীয় নানা শহর থেকে পৃথিবীর নানা দেশের অভ্যন্তরস্থ বহু প্রদেশেও। এরপর এই মড়ক ইতালীতে দেখা দিল ৫৪৩ সালে এবং একই বছরে সেখান থেকে ছড়িয়ে পড়লো সিরিয়া এবং প্যালেস্টাইনেও। সেখান থেকে এই সংক্রামক রোগ যাত্রা করলো পারস্যে যেখানে এই রোগ সংক্রমিত করলো পারস্য সেনাবাহিনী এবং স্বয়ং পার্সী শাহেনশান খুসরোকে। রোগাক্রান্ত শাহেনশাহ তাইগ্রিসের পূর্ব পাড় ছেড়ে মড়কমুক্ত লুরিস্তানের পাহাড়ি এলাকায় সেনাবাহিনী নিয়ে ছুটলেন জীবনে বাঁচার আশায়।

 

ত্যুরসের লেখক গ্রেগরি স্মরণ করেন যে কিভাবে সন্ত গল ৫৪৩ খ্রিষ্টাব্দের মড়কে গল এলাকার ক্লেরমন্ট-ফেররান্ডের অসংখ্য মানুষের জীবন বাঁচিয়েছেন। সেখান থেকে এই মড়ক ৫৪৫ খ্রিষ্টাব্দে ছড়িয়ে পড়লো আয়ারল্যান্ডে। এছাড়াও, কালো মৃত্যুর মত, জাস্টিনীয় মড়কও একবারেই শেষ হতো না। বারবার এই মড়ক ফিরে আসতো এবং মানুষের দেহে এই রোগের ব্যাক্টেরিয়া পরবর্তী ২৫০-৩০০ বছর পর্যন্ত কাজ করতো। রাজধানীতে ৫৫৮ খ্রিষ্টাব্দ নাগাদ এই রোগের দ্বিতীয় বিস্তার বিষয়ে আগাথিয়াস লেখেন এবং সত্যি বলতে এই মড়ক পুরোপুরি কখনোই নির্মূল করা যায়নি; বরং এই মড়ক ক্রমাগত এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় গেছে। আসলে এটাই প্রথম ব্যুবোনিক প্লেগ যা গোটা ইউরোপকে পর্যূদস্ত করেছিল। চোদ্দ শতকের কালো মৃত্যুর থেকে কম বিখ্যাত এই জাস্টিনীয় মড়কও তাই বলে কম প্রাণ সংহারী ছিল না। ইঁদুরের গর্তে বাসা বাঁধা এক ধরণের নীল মাছির কামড় থেকে ব্যুবোনিক প্লেগ ছড়াতো। কালো ইঁদুরই তার সাথে বহন করতো কালো মৃত্যুর বীজাণু। ষষ্ঠ শতকে কালো ইঁদুরই ব্যুবোনিক মড়কের বাহক হিসেবে দেখা দেয়। তবে ইঁদুর বা নীল মাছিই একমাত্র বাহক ছিল না; কনস্ট্যান্টিনোপলে যে কুকুরগুলো সহসা মরতে শুরু করেছিল, তাদের ভেতরেও ছিল এই রোগের বীজাণু। বাণিজ্যের হাত ধরেও নগর থেকে নগরে ছড়িয়ে পড়েছে মড়ক। ইঁদুরেরা মূলত: শহর এলাকায় পাওয়া যেত যেখানে ব্যবসা-বাণিজ্যের কারণেই প্রচুর মানুষ বাস করতো। এই নাগরিকরা মোটামুটি স্বচ্ছল ছিল বলে তাদের ঘরেই ইঁদুরের ছিল নিশ্চিত আবাস। স্বচ্ছল বনিকের বাসাতেই ইঁদুরের নিরাপদ আস্তানা মিলতো এটা মিথ্যা নয়। সেহেতু রোমক বা পারস্য সা¤্রাজ্যে এই মড়ক অনেক বেশি বিস্তার লাভ করলেও আফ্রিকার যাযাবর বর্বর বা আরব বেদুঈনদের কিন্তÍ এই মড়কে তেমন একটা আক্রান্ত হতে দেখা যায়নি।

 

প্রাচীন যুগের অতিমারী মূলত: তিনটি আঙ্গিকে দেখা দিত ব্যুবোনিক, নিউমোনিক বা নিউমোনিয় এবং সেপটিক্যামিক। নিউমোনিক বা সেপটিক্যামিক মড়কের স্ট্রেইন বা তরঙ্গ ছড়িয়ে পড়ার আগে ব্যুবোনিক মড়ককে আগে দেখা দিতে হতো। ব্যুবোনিক মড়ক প্রত্যক্ষভাবে সংক্রামক নয় যতক্ষণ পর্যন্ত না রোগীর ফুসফুস বা শ্বাসযন্ত্রে সংক্রমণ দেখা দেয়। যেহেতু প্রকোপিয়াস একথা কোথাও আলোচনা করেননি যে অসুস্থদের সেবাকারীরা সংক্রমিত হতো, কাজেই এটা অনুমান করা যায় যে ব্যুবোনিক মড়ক জাস্টিনীয় মড়কের মত অত প্রত্যক্ষভাবে কাজ করতো না। নিউমোনিক মড়ক ছড়িয়ে পড়ে যখন বাসিল্লি বা ইয়েরসিনিয়া পেস্টিস নামের বীজাণু ফুসফুসকে আক্রমণ করে। এই বীজাণু এক ব্যক্তি থেকে অপর ব্যক্তিতে খুব চড়া মাত্রায় এবং দ্রুতই সংক্রমিত হয় আর বায়ুবাহিত জলবিন্দুর মাধ্যমে ছড়ায়।

 

প্রকোপিয়াসের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী মড়ক প্রত্যক্ষভাবে সংক্রামক ছিল না এবং নিউমোনিক প্লেগের প্রধান দুই লক্ষণ অগভীর শ্বাস ও বুকের কাছটা জমাট বেঁধে থাকা এই মড়কের রোগীদের ভেতর দেখা দেয়নি। আর সেপটিক্যামিয়া দেখা দেয় যখন রক্তপ্রবাহে সংক্রমণ দেখা দেয় এবং খুব দ্রুত মৃত্যু ঘনায়। আগাথিয়াস আবার তাঁর রচনায় জানান যে কিছু রোগী সহসা সন্ন্যাসরোগের আক্রমণে মারা গেছেন। এ থেকে বোঝা যাচ্ছে যে ষষ্ঠ শতকের আগেই সেপটিক্যামিক বীজাণুর উপস্থিতি ছিল। ব্যুবোনিক প্লেগের ক্ষেত্রে মৃত্যুর হার যেখানে ছিল প্রায় ৭০ শতাংশ, সেখানে নিউমোনিয়ার হু হু বিস্তারে মৃত্যুর হার হয়েছে ৯০শতাংশেরও বেশি। আর সেপটিক্যামিক মড়কে একজন রোগীও বেঁচে থাকে না। যদিও জাস্টিনীয় মড়কে ব্যুবোনিক, নিউমোনিক ও সেপটিক্যামিয়াক সহ তিন ধরণের বীজাণুই বাতাসে ছিল, তবে ব্যুবোনিকেরই প্রভাব ছিল বেশি। জাস্টিনীয় মড়কে অনেক রোগী অসুখের আগে বিভ্রম বা অধ্যাসের শিকার হতো। মড়কের প্রথম লক্ষণগুলো রোগীর মানসিক বিভ্রম বা অধ্যাসের পিছু পিছু যেত; এছাড়া ছিল জ্বর এবং ক্লান্তি, তবে জ্বর বা ক্লান্তির কোনটাই জীবন সংশয়ী নয়। মুখে দাহ্যতা বা আগুনের মত জ্বালা করা আর গলা ব্যথা এই মড়কের প্রাথমিক লক্ষণ বলে এভাগ্রিয়াস বলেন। কিছু রোগীর শুরুতে উদরাময়ও হয়। এরপরই ফুসকুড়ি দেখা দেয় কোমরে বা বাহুমূলে অথবা কখনো কখনো কাণের পাশে। এই ব্যাধি দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে। আক্রান্ত ব্যক্তি সাধারণত- দুই থেকে তিন দিনের ভেতর মারা গেছে। আক্রান্ত রোগী একটি অর্দ্ধ-চেতন, নিঃসাড় অবস্থায় থাকত এবং কিছু খেতে বা পান করতে চাইত না। এরপরই রোগী পাগলের মত আচরণ করতে থাকতো যাতে করে তার সেবা বা পরিচর্যাকারীরা খুব সমস্যায় পড়তো। অনেকের দেহে ছড়িয়ে পড়া ফুসকুড়িতে গ্যাংগ্রিন হয়ে তারা প্রচন্ড কষ্টে মারা যেত।

 

প্রচুর রোগীর সারা শরীরে কালো কালো ফোঁড়া ছড়িয়ে পড়তো এবং এরা খুবই দ্রুত মারা যেত। আরো অনেকে শুধু রক্ত বমি করে মারা যেত। গর্ভবতী নারীরা কেউ এই রোগে আক্রান্ত হলে গর্ভপাত হয়ে বা সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মারা যেত। কিন্ত কৌতুহলোদ্দীপক বিষয় হলেও আগাথিয়াসের রচনা থেকে জানা যাচ্ছে যে যুবক পুরুষেরা এই অসুখে সবচেয়ে বেশি ভুগেছে। কখনো কখনো আবার রোগীর দেহের ফুসকুড়িগুলো আয়তনে বড় হয়ে ফেটে গিয়ে পুঁজ বের হতো। এরকম হলে সাধারণত- রোগী সেরে উঠতো। যদিও সেরে ওঠার পরও কিছুদিন তাকে মাংসপেশীর খিঁচুনি সইতে হতো। ডাক্তাররা এই প্রবণতা লক্ষ্য করে এবং কিভাবে এই রোগের সাথে লড়াই করা যায় সেটা বুঝতে না পেরে কখনো কখনো এই ফুসকুড়িগুলো খোঁচাতে গেলে দেখতেন যে এগুলো বিস্ফোটকের অবস্থায় আছে। যারা এই সংক্রমণের পর বেঁচে থাকতেন তাদের উরু এবং জিহ্বা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শুকিয়ে যেত। এটাই মড়কের পরবর্তী প্রতিক্রিয়া। এক্ষেত্রে একটি লক্ষ্যনীয় বিষয় হচ্ছে শুধু মানুষই এই মড়কে ক্ষতিগ্রস্থ হয়নি। কুকুর, ইঁদুর এবং এমনকি সাপও মড়কে অসুস্থ হয়েছে।

 

এফেসিউসের জন মড়কের একটি দীর্ঘ এবং আলঙ্কারিক বিবরণ দিয়েছেন- এই মড়কটি দেখা দিয়েছিল প্যালেস্টাইন এবং কনস্ট্যান্টিনোপল নগরে। একজন ক্রিশ্চিয়ান লেখক হিসেবে জন পরিষ্কার ভাবে বলেছিলেন যে প্রলয়ের মূহুর্ত ঘনিয়ে আসছে এবং তিনি মড়কের আরো নানা কৌতুককর বিবরণ দিয়েছেন। তাঁর মতে, মড়ক ছিল দৈবী ক্রোধের এক প্রকাশ এবং পাপীদের প্রতি অনুতপ্ত হবার ডাক। তাঁর রচনা সেই সময় জনপরিসরে যত মানুষ অসম্ভব কষ্টে ধ্বস্ত হয়েছে, ধ্বস্ত হয়েছে মড়কের বিপর্যয়ে-সেসবই প্রাঞ্জলভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। মৃত্যুর পর কবর হবে না আর ঝাড়ুদার বা মেথররা লাশগুলো কোথায় ফেলবে এই ভয়ে মানুষ নিজের গায়ে পরিচয় চিহ্ন সেঁটে রাখতো আর সম্ভব হলে ঘরের বাইরে বের হতো না। সমান্তরাল এমন আর একটি বিবরণে, এফেসিউসের জন একটি বাড়ির বিবরণ দেন যেখানে মানুষ বিকট দূর্গন্ধের কারণে যেত না। শেষপর্যন্ত যখন বাড়িটিতে ঢুকতেই হলো, দেখা গেল সেখানে কুড়িটির বেশি লাশ পচছে।

 

অনেক মানুষ অসুখের ঘোর, মানসিক ভীতি ও কুসংস্কারের প্রভাবে অসুখের আগে ও পরে কথায় কথায় ভূত বা অশুভ প্রেতের ছায়া দেখেছে, দেখেছে ভয়ানক নানা দৃশ্য। প্রথাগত রহস্য-উন্মোচক সাহিত্যিক শৈলীতে যেমন লেখা হয়, ঠিক সেই ঢঙ্গে এফেসিউসের জন এসব “ভূত-প্রেত“ বা “অলীক দৃশ্যাবলী“কে মানসিক অধ্যাস বা বিভ্রম হিসেবে মনে করেননি। তিনি ভেবেছিলেন এটি অন্য ভুবনের বা পরলোকের সব দৃশ্য। এই লেখাটায় আগেই যেহেতু বলা হয়েছে যে বন্দর নগরীগুলোয় বাণিজ্য পথ ধরে মড়ক ছড়িয়েছে, এফেসিউসের জন তাঁর বিবরণীতে উল্লেখ করেছেন যে বহু জাহাজ সমুদ্রে লক্ষ্যহীণ ঘুরে বেড়াবে, আর তারপর তীরে গিয়ে মড়কে মৃত তাদের সব নাবিকের দেহ ধুতে দেবে। প্যালেস্টাইনের সাগর সৈকতে দৈত্যরা দেখা দিয়েছে এবং নাবিকেরা ভুতুড়ে এক তামার জাহাজ দেখতে পেয়েছে যেখানে মুন্ডুহীন নাবিকেরা বৈঠা বাইছে এমন সব বিবরণও জন তাঁর রচনায় উল্লেখ করেন। যদিও সম্রাট জাস্টিনিয়ানের নিজেরই এই রোগ হয়েছিল, তারপরও তিনি দূর্যোগ হ্রাস করতে চেষ্টা করেছেন। কনস্ট্যান্টিনোপলে এই মড়কের বিস্তারের পর জাস্টিনিয়ান থিওডোর এবং প্রাসাদ রক্ষীদের নগরীতে স্তÍপ হয়ে থাকা সব লাশ সরাতে নির্দেশ দেন। কিন্তÍ, ইতোমধ্যে সব কবরের ধারণ ক্ষমতা শেষ হয়ে গেছিল এবং জীবিতদের পক্ষে মৃতদের দেহ রাস্তায় অথবা সমুদ্রসৈকতে পচে পচে নিঃশেষ হবার জন্য ছুঁড়ে মারা ছাড়া আর কোন বিকল্প ছিল না। থিওডোর জাস্টিনিয়ানের আদেশের উত্তরে সাইকে (গালাটায়) সোনালী শৃঙ্গের চারপাশে বড় বড় গর্ত খোঁড়ার আদেশ দেন এবং তাঁর অধীনস্থদের মৃতদেহগুলো সংগ্রহ করতে আদেশ দেন। প্রতিটি গর্তে ৭০,০০০ করে লাশ ফেলা হয়েছিল এবং দেখতে দেখতে গর্তগুলো শবদেহে উপচে পড়ে। এরপর মৃতদেহগুলো প্রাচীরের মিনারের ভেতরে রাখা হয়। ফলে গোটা নগরী দূর্গন্ধে ছেয়ে যায়।

 

এই মড়ক নাগরিক জীবনের উপর এক তীব্র প্রভাব রেখেছিল। যদিও নগর দরিদ্ররাই এই মড়কের ভয়াবহ প্রভাবে প্রথম ভুক্তভোগী হয়েছিল, পরে এই অতিমারী অপেক্ষাকৃত ধনী জেলাগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ে। ক্রমে ব্যাধির থেকেও প্রবলতর হয়ে উঠলো অনাহার। রুটি দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠলো এবং বহু অসুস্থ মানুষ অসুখের চেয়েও অনাহারে মরলো বেশি। অনেক ঘর হয়ে উঠলো কবরখানা যেহেতু পরিবারকে পরিবার মারা যেতে থাকলো। বাইরের পৃথিবীর কেউ জানতেও পারল না। সড়কগুলো সব পরিত্যক্ত হলো এবং ব্যবসা-বাণিজ্য সব বন্ধ হয়ে গেল। মুদ্রাস্ফীতি চ‚ড়ান্ত রূপ পেলো। আনুমানিক ৫৪৪ খ্রিষ্টাব্দে, জাস্টিনিয়ানের মূল্য নিয়ন্ত্রণের আইন আংশিক সফল হয়েছিল, কিন্ত খাবারের দুষ্প্রাপ্যতা অব্যাহত থাকলো। রাজধানী শহরেই খাবারের অভাব আরো তীব্র আকার ধারণ করেছিল। যেহেতু খাজনার ভিত্তি নাটকীয় ভাবে সঙ্কুচিত হয়ে পড়লো, নগরগুলোর উপর আর্থিক চাপ আরো বাড়লো। অর্থনৈতিক কৃচ্ছ্রতা সাধনের লক্ষ্যে, পৌর কর্তৃপক্ষসমূহ শিক্ষক ও ডাক্তারদের জন্য বেতন কাট-ছাঁট করলেন এবং জন বিনোদনের জন্য বাজেটও অনেকটাই হ্রাস করলেন। যদিও মড়কে অনেক গ্রামীণ এলাকা অবশ্য কোন না কোন ভাবে রক্ষা পেয়েছে, কিন্তু সংক্রমিত জনপদগুলো আক্ষরিক অর্থেই অচল হয়ে পড়েছিল। গ্রামগুলোতে মড়কের কারণে ফসলের ফলন ধসে পড়ায় শহরগুলোও ক্ষতিগ্রস্থ হয়। কারণ ফসল ভাল হলে শহরে খাবারের অভাব দেখা দিত না। সিরিয়া এবং প্যালেস্টাইনে, মড়ক দেশের অনেক অভ্যন্তরস্থ আবাদী জমিতেও পৌঁছেছিল। ততদিনে শস্য রোপণ বা বপন করা হয়েছে। কাজেই মড়ক সত্ত্বেও ফসল পাকলো তবে সেই ফসল কর্তন করার কেউ ছিল না। সিরিয়াতে এই সমস্যা আরো ভয়ানক হয় যখন সম্ভবত, এ্যানথ্রাক্স বা এমন কোন ব্যাধি ৫৫১ খ্রিষ্টাব্দে গবাদিপশু আক্রমণ করে এবং জমিগুলো গরুর অভাবে অকর্ষিত পড়ে থাকে। যেসব আবাদী জমির মালিকেরা মড়কে মারা গেছিলেন, তাদের জমির উপর চাপানো কর পরিশোধের দায় গিয়ে চাপে প্রতিবেশী জমির মালিকদের। সত্যি বলতে মহামারীর অনেক আগে থেকে রোমক সাম্রাজ্যে এটাই জমির কর পরিশোধের ক্ষেত্রে প্রমিত ও প্রচলিত আইন ছিল। প্রকোপিয়াস, যাহোক, বরাবরই ছিলেন ভূ-স্বামী শ্রেণির স্বপক্ষের বক্তা এবং তাই এই আইনটির বিষয়ে কড়া মতামত ব্যক্ত করেছেন।

 

এমনটা অবশ্য হওয়াই স্বাভাবিক যে মড়কে মৃত্যুর চড়া হারের প্রেক্ষিতে জমির করের এই আইনটি খুবই কঠিন। আনুমানিক ৫৪৫ খ্রিষ্টাব্দে, জাস্টিনিয়ান তাঁর রাজ্যের জমির মালিক প্রজাদের মৃত প্রতিবেশীর পরিত্যক্ত সম্পত্তির কর মেটানোর দায় থেকে মুক্ত করার আইন প্রণয়ন করেন। আপাতঃদৃষ্টে এই পড়শি সম্পত্তিগুলোর মালিকদেরই পরিত্যক্ত জমির অনাদায়ী খাজনা পরিশোধ করতে হতো। এটাই সম্ভবত: প্রকোপিয়াসের অভিযোগের বিশেষ সূত্র হতে পারে। মড়কের কারণে রাজ্যের আরো যে দুই শ্রেণি ক্ষতিগ্রস্থ হয়, তাদের ভেতর রয়েছে সেনাবাহিনী এবং সন্ন্যাসীদের মঠ বা আশ্রম। মড়কে জনসংখ্যা হ্রাস পাওয়ার কারণে সেনাবাহিনীতে নতুন মানুষ নিয়োগ করা কঠিন হয়ে ওঠে এবং তখন সাম্রাজ্যগুলো বারবার বর্বর, ভাড়াটিয়া সৈন্যদের দ্বারা আক্রান্ত হতে থাকে। রোমক সাম্রাজ্য পূর্ব ও পশ্চিমাংশের পুনঃএকত্রীকরণ ও সাম্রাজ্যের বিস্তারের উদ্দেশ্যে পরিচালিত অভিযানগুলোতে বিপুল সংখ্যক সৈন্য মারা যায়। সত্যি বলতে সম্রাট জাস্টিনিয়ানের শেষ দিনগুলোয় সেনাবাহিনীতে সেবা দেবার বা স্বেচ্ছাসেবক হবার মত আর কোন পুরুষ মানুষই অবশিষ্ট ছিল না।

 

রোমকদের সৌভাগ্যই বলতে হবে যে এই মড়ক পার্সী সাম্রাজ্যকেও আক্রমণ এবং দূর্বল করে। সাম্রাজ্যের নানা এলাকায় অবশ্য রোমক সেনাবাহিনী অপরাজিত ছিল না। ইতালীতে অস্ট্রোগথরা আবার যুদ্ধ শুরু করে এবং আফ্রিকার প্রদেশগুলোয় দমিত বিদ্রোহ পুনরায় মাথা চাড়া দেয়। শাগান বাইয়ান নামে মঙ্গোল নেতা এশিয়ার যুদ্ধপিপাসু গোত্রগুলোকে পুনরায় একত্রিত করেন এবং সাম্রাজ্যের সীমান্তরেখা বরাবর যাত্রা করেন সেনা শ্রেষ্ঠত্ব লাভের আশায় এবং ক্রতিগুর খান বলকান দেশে আক্রমণ করেন। সেসময় মড়কে প্রবলভাবে ক্ষতিগ্রস্থ সমাজের আর একটি অংশ ছিল ধর্মশালা বা সন্ন্যাসাশ্রমগুলো। কনস্ট্যান্টিনোপলের রাজ্যে, ৫৪২ খ্রিষ্টাব্দের আগেই, ৮০টির উপর মঠ বা সন্ন্যাসীদের আশ্রমের কথা নথিতে পাওয়া যায়। অথচ, মড়ক দেখা দেবার পর এসব মঠের অধিকাংশই বিলুপ্ত হয়ে যায়। এবিষয়ে একেবারেই কোন সন্দেহ নেই যে মড়ক মানুষের ক্ষয় ও মৃত্যু ডেকে এনেছে। প্রবল সংক্রামক ও ক্ষতিকর ব্যাধিগুলো (ব্যুবোনিক প্লেগের কথাই ধরা যাক) ঘন জনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতেই দ্রুত ছড়ায়। সেই এফেসিউসের জনের বিবরণে লেখা মুন্ডুহীন নাবিকদের জাহাজ তীরে গিয়ে লাশ সব ধুতে দিচ্ছে গল্পটির মতোই কালো মৃত্যুর সময় মড়কে এক/একটি মঠ বা সন্ন্যাসীদের আশ্রম সব উজাড় হয়ে গেছে। যদিও পুরোহিত বা পাদ্রিদের বিকাশে মড়ক একটি বাধা হিসেবে দেখা দেয়, ষষ্ঠ শতকের সঙ্কটের সময় বাইজেন্টীয় সাম্রাজ্য চার্চের সাথে ঘনিষ্ঠতর মৈত্রী বন্ধনে আবদ্ধ হয়। একটার পর একটা দূর্যোগ দেখতে দেখতে ক্লান্ত মানুষ এসময় আরো বেশি ধর্মভীরু হয়ে পড়ে এবং অতীতে নানা পৌর সেবা কর্মসূচিতে যে বরাদ্দ ছিল, সেই অর্থ বা ব্যক্তিগত অনেক দানের নগদ টাকা চার্চের কোষে জমা হতে থাকে। যদিও সাম্রাজ্যে নানা নির্মাণ কার্য অব্যাহত ছিল এবং এটা মড়ক সত্তে¡ও সমাজে ঐশ্বর্য্য বিদ্যমান থাকার ইঙ্গিত দেয়, তবু মড়কে এসব নির্মাণ কাজের প্রকৃতি বদলে যায়। যেমন, সিরিয়ায় ষষ্ঠ শতকের মাঝামাঝি নাগাদ পৌর নানা নির্মাণ কাজের জায়গায় গির্জা ও মঠ বানানোর প্রবণতা বাড়ে। জন পরিসরের জন্য বরাদ্দ অর্থ যা দিয়ে প্রচুর পৌর নির্মাণ কাজ সঙ্ঘটিত হতো, মূলত, খাজনা বা কর হিসেবে দেয় অর্থের উপর নির্ভর করতো। মড়কে এই করদাতাদের অনেকের মৃত্যু হয়। আর একইসাথে তুলনা করলে দেখা যাবে যে চার্চ কিন্তÍ জনপরিসরের অর্থের পাশাপাশি ব্যক্তিগত স্তরে ধনবান দাতাদের দান থেকেও অনেক টাকা পেত। মৃত্যুর সাথে প্রতিনিয়ত বসবাস ধনবানদের টাকার থলের রাশ আলগা করতে শিখিয়েছিল।

 

দূর্ভাগ্যজনকভাবে, ব্যুবোনিক মড়ক শুধু সেই সময়েরই দূর্যোগ ছিল না। প্রকোপিয়াস তাঁর সিক্রেট হিস্ট্রি-তে মড়ক ছাড়াও নানা প্রাকৃতিক দূর্যোগ এবং বিশেষত: বন্যা ও ভূমিকম্পের কথা উল্লেখ করেন, উল্লেখ করেন বর্বর নানা আগ্রাসনের কথাও। এই যাবতীয় প্রাকৃতিক ও মানব-সৃষ্ট দূর্যোগ রোমক সাম্রাজ্যকে ক্ষতিগ্রস্থ করেছে যতক্ষণ পর্যন্ত না জাস্টিনিয়ান ৫১৮ সালে তাঁর রাজত্ব পরিচালনা শুরু করেন। তিনি দাবি করেন যে শুধু মড়কে নয়, মৃতদের অন্তত অর্দ্ধেক এসব প্রাকৃতিক বা মানব-সৃষ্ট দূর্যোগে মরেছে। এছাড়াও ৫৪১ সালে মড়কের প্রাথমিক বিস্তারের পর, মড়কের পুনঃ পুনঃ আবির্ভাব যেন সংক্রমণের চিরস্থায়ী চক্র প্রতিষ্ঠা করে। এই ঘটনাবলী ব্যখ্যার উদ্দেশ্যে প্রকোপিয়াস তাঁর সিক্রেট হিস্ট্রি-তে বলেন যে ঈশ্বর এই সাম্রাজ্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন যেহেতু এক দানব সম্রাট এখন এই রাজ্য চালাচ্ছেন। তাঁর এই বক্তব্যের সমর্থনেই যেন বা এক প্রতীকী ঘটনা ঘটে যখন একটি ভূমিকম্পে গোটা রাজধানী টালমাটাল হয়ে পড়ে এবং হাগিয়া সোফিয়ার মূল গম্বুজ ভেঙ্গে পড়ে। অবশ্য হিস্ট্রি অফ দ্য ওয়্যারস গ্রন্থের দাপ্তরিক মুখবন্ধে প্রকোপিয়াস বলেন যে মানুষ আসলে এটা বুঝতে সক্ষম নয় যে কেন এসব দূর্যোগ ঘটে।

 

জাস্টিনিয়ানের রাজত্বকালে, রোমকদের ধ্রুপদী সাহিত্যিক ঐতিহ্যকে খ্রিষ্টীয় সংস্কৃতি ও ইতিহাসের ছাঁচে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা চলছিল। ধরা যাক, প্রতিমা পূজারী রোমক লেখকেরা যেমন ইতিহাসের বিশ্লেষণে মৈরা-কে একটি কার্যকারণ হিসেবে ব্যবহার করতেন, সেটা একজন ধর্মান্তরিত, খ্রিষ্টান লেখকের পক্ষে সম্ভব ছিল না। কাজেই তাঁকে খ্রিষ্টান ধর্মে প্রচলিত বিশ্বাস যে পাপের জন্য মানুষ কেমন দন্ড ভোগ করে, তেমন কথা বলে বিষয়গুলো ব্যখ্যা করতে হতো। যদিও প্রকোপিয়াস ধর্মীয় ঘটনালীকে ইতিহাসের জন্য অনুপযোগী মনে করতেন, তবু এক্ষেত্রে তিনিই ছিলেন ধ্রæপদী ইতিহাসবিদদের শেষ প্রতিনিধি। প্রকোপিয়াসের পর অধিকাংশ রোমক ইতিহাসবিদই পাপকে ইতিহাসের একটি কার্যকারণ হিসেবে দেখেছে। খ্রিষ্টান লেখকদের রচনায় মড়কের বিবরণ থেকেই সেটা বোঝা যায়।

 

খ্রিষ্টান লেখকেরা, যাদের কাছে বাইবেলের “প্রত্যাদেশের বহি“-ই ছিল সাহিত্যে মড়ক বিষয়ক আখ্যানের প্রতিরূপ, তারা স্পষ্টত:ই অনুভব করলেন যে মড়ক হলো মানুষের পাপের উত্তরে ঈশ্বরের পাঠানো শাস্তি। “এটা জানাই ছিল,“ মাইটিলেনের ধার্মিক লেখক জাকারিয়াহ লেখেন, “এটা ছিল শয়তানের কাছ থেকে আসা চাবুক, যাকে কিনা খোদ ঈশ্বর মানুষকে ধ্বংস করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন।“ আন্তিওকের পাশে সন্ত সাইমিয়ন দ্য ইয়ঙ্গার খ্রিষ্টের কাছে সাশ্রুনয়নে প্রার্থনা করে এই উত্তর পান, “মানুষের পাপ বহু গুণে বৃদ্ধি পেয়েছে আর তুমি কেন অসুখের কথা ভাবছ? কারণ তুমি তো মানুষকে আমি যতটা ভালবাসি, তার চেয়ে বেশি নিশ্চয়ই বাসো না?“ এই সন্তকে শোকের হাত থেকে বাঁচাতে ঈশ্বর সাইমিয়নকেই একটা বিশেষ আশীর্ব্বাদ দিলেন যাতে সে বিশ্বাসীদের রোগ সারাতে পারে। এভাবেই অনেক মড়কে আক্রান্ত মানুষ সন্ত সাইমিয়নকে ডাকেন এবং তাঁর আশীর্ব্বাদে সুস্থ হয়ে যান। গলের গ্রেগরি অফ ট্যুরস সন্ত গল সম্পর্কে লিখেছেন যিনি কিনা তাঁর এলাকাকে মড়ক মুক্ত রেখেছেন। এসব কাহিনীর মাধ্যমে এটাই পরিষ্কার হয় যে খ্রিষ্টান লেখকেরা মড়কের কারেণ সৃষ্ট যন্ত্রণাকে ঈশ্বরের কাছ থেকে পাঠানো ন্যায়সঙ্গত শাস্তি হিসেবে দেখেছেন। কিন্তÍ সেই সাথে এটাও তাঁরা মনে করতেন যে খ্রিষ্টে বিশ্বাস আনলে তাঁকে রক্ষা করাও ঈশ্বরের দায়িত্ব।

 

আধুনিক পাঠকদের কাছে মড়কের এই সব বিবরণ, এমনকি খ্রিষ্টান লেখকদের বিবরণও, দূর্যোগের ভয়াবহতার তুলনায় প্রকাশভঙ্গীতে খুব মৃদু মনে হয়। সত্যি বলতে প্রকোপিয়াস ও আগাথিয়াস তাঁদের পূর্ববর্তী থুসিডিডসের মতই মড়ক বিষয়ে নির্মোহ এবং বলতে গেলে সংশয়বাদী অবস্থান নিয়েছেন, যখন কিনা খ্রিষ্টান লেখকেরা মড়ককে ঈশ্বরের কাছ থেকে আসা শাস্তি হিসেবে দেখেছেন। কালো মৃত্যুর মত জাস্টিনীয় প্লেগের সময় মানুষের ভেতর গণ হিস্টিরিয়া বা উন্মাদনা, আত্মনিগ্রহকারী বিশ্বসীদের মিছিল অথবা ইহুদিদের উপর অত্যাচার এসব দেখা যায়নি। সাধারণ মানুষের মনোভাবে দূর্যোগকে বরং শান্তভাবে গ্রহণের মত ধীশক্তির ব্যবহার দেখা গেছে। থুসিডিডসের প্রতিবেদন অনুসারে কিছু রোগী এই অসুখের সময় অধ্যাস বা বিভ্রম মূলক দর্শনের কথা বললেও, চোদ্দ শতকের ইউরোপে কালো মৃত্যুর ভয়াবহতার সাথে তার কোন তুলনাই হবার নয়।

 

হেনারি কিংটন, যিনি কিনা কালো মৃত্যুর সময় ইংল্যান্ডে এই মারীর ধারাবাহিক ইতিবৃত্ত লিখেছেন, তিনি দাবি করেছিলেন যে কালো মৃত্যুতে পৃথিবী করিন্থ এবং আকাইয়ায় অনেক শহরকে গ্রাস করেছে এবং সাইপ্রাসে পাহাড়গুলো সমতল হয়ে গেছে। এর ফলে নদীগুলো উপচে আশপাশের শহরগুলো ডুবিয়ে ফেলেছে। এফেসিউসের জনের বিবরণে প্লেগ বা মড়কের সময় মানুষের যে বিভ্রান্তিমূলক অধ্যাস তৈরি হয়, সেটা মড়কের একটা লক্ষণ মাত্র। অথচ, জনের অনেক পরে মধ্যযুুগের ইতিবৃত্তে ব্যাধিকে ঘিরে জনচিত্তে তীব্র উন্মাদনার বিষয়টি প্রতিভাত হয়ে উঠছে। জাস্টিনীয় প্লেগ বা মড়কের সময় চৈনিক যে লেখকেরা রোগের লক্ষণ নিয়ে নানা কিছু লিখেছেন, সেই লেখকেরাই আবার জাস্টিনীয় মড়কের বিবরণ আর চোদ্দ শতকের কালো মৃত্যুর ভেতর সমান্তরাল রেখা টেনেছেন। সেই সাথে তাঁরা এটাও বলেছেন যে এই মড়ক ঈশ্বরের ক্রোধের কারণে সৃষ্টি। অন্যদিকে জাস্টিনীয় মড়ক শুধু যে প্রত্যক্ষভাবেই অনেক প্রাণ-মান-সম্পদের হানি করেছে তা‘ নয়। এটা শেষ রোমক সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনেক ক্ষতি করেছে বলেও প্রমাণ রয়েছে। এসবই মহাদূর্যোগের পক্ষে পরিবেশকে পোক্ত করে তুলেছিল। জাস্টিনিয়ানের রাজত্বকালে অন্যান্য দূর্যোগের সাথে সাথে এই মড়ক গোটা ভ‚মধ্যসাগরীয় এলাকার জনসংখ্যা ৬০০ খ্রিষ্টাব্দ নাগাদ এতটা কমিয়ে দেয় যে সেটা আগের শতকের মোট জনসংখ্যার মাত্র ৬০ শতাংশে নামিয়ে আনে। এমন প্রবল মৃত্যুর হার স্বাভাবিক ভাবেই সেই এলাকায় সামাজিক ও অর্থনৈতিক ধ্বংসও ডেকে আনবে। এছাড়াও, নাগরিক কেন্দ্রগুলোর জনসংখ্যা হ্রাস ভ‚মধ্যসাগরীয় এলাকায় এক কাঠামোগত ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি করছিল যা অদূর ভবিষ্যতে মরুচারী আরবদের পক্ষে একটি সুবিধার বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।

 

উপরোক্ত এই তত্ত্বের প্রধান সমস্যার দিকটি অবশ্য হলো বিগত রোমক সাম্রাজ্যের জনবিন্যাসগত যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ আজকের যুগে অবশ্য পাওয়া যায় না। মড়কে মৃত্যুর হার নির্দ্ধারণ করার আগে আধুনিক পন্ডিতদের প্রয়োজন সেই সময়ের রোমক সাম্রাজ্যে সামগ্রিক জনসংখ্যার একটি হিসাব। দূভার্গ্যজনকভাবে, এই তথ্যও কার্যকরী ভাবে নির্দিষ্ট বা নির্দ্ধারিত হয়নি। সুনির্দিষ্ট জনসংখ্যা নির্ণয়ে আরো নানা সমস্যা আছে। যদিও যে কোন ধরণের অতিমারীমূলক ব্যাধিরই অতীতে এই রোগে আক্রান্ত না হওয়া জনপদের উপর খুবই ধ্বংসাত্মক প্রভাব রাখার সম্ভাবনা আছে, কিন্তÍ একবার সেই জনপদ আক্রান্ত হবার পর ব্যাধিটি বারবার পুনরাবৃত্ত হলেও অসুখটি প্রথমবারের মত মারণ চেহারায় দেখা দেবে না। এছাড়াও বাইজেন্টীয় সাহিত্যের “অন্ধকার যুগ“ জাস্টিনিয়ানের রাজত্বকে অনুসরণ করেও এই মড়কের পুনরাবৃত্তির বিষয়ে যথেষ্ট নথি-পত্র পায়নি। এসময়ে হওয়া অন্য নানা প্রাকৃতিক দূর্যোগের ফলেও নিখাদ মড়কে কত মানুষ মরেছে সেটা বের করা বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এমনকি যদি এটাও ধরে নেয়া হয় যে কনস্ট্যান্টিনোপলে ৫৪২ সালের বসন্তে মড়কে তিন লক্ষ মানুষ মারা গেছিল, তবু একটা প্রশ্ন থেকে যাবে যে এত মানুষ কি শুধু মড়কে মারা গেছে নাকি ভয়াবহ ভূমিকম্পও একটি কারণ ছিল? এজাতীয় তথ্য আবিষ্কার করার ক্ষেত্রে তেমন সূত্র দূর্ভাগ্যজনক ভাবে নেই। যেহেতু পন্ডিতেরা সামগ্রিক জনসংখ্যা নির্দ্ধারণে ব্যর্থ হয়েছেন, সেহেতু তাঁরা প্রাচীন যুগের নথি-পত্রে উল্লিখিত শহরগুলোয় (কনস্ট্যান্টিনোপল যেমন) মৃত্যুর হার বিষয়ে জানতে চেয়েছেন, উপসংহারে আসতে চেয়েছেন। কনস্ট্যান্টিনোপলের জনসংখ্যাও অবশ্য চূড়ান্তভাবে নির্ণীত হয়নি।

 

আধুনিক পন্ডিতদের ব্যবহার করা তথ্য-উপাত্ত আধুনিক পন্ডিতদের দ্বারা সাধারণত: মড়কের বিবরণ দানে ব্যবহৃত হয়ে থাকে এবং এক্ষেত্রে অনেক সময় তথ্য-উপাত্তের অতিরঞ্জনও হতে দেখা যায়। এফেসিউসের জন বলেছিলেন যে মড়কে প্রতিদিন গড়ে ৫,০০০-১৬,০০০ মানুষ মারা যেত এবং নগরীগুলোর দ্বারে ২৩০,০০০ লাশ গোণার পর শবদেহ গণনা করা বন্ধ হয়ে যায়। প্রকোপিয়াস দাবি করেন যে ১০,০০০ মানুষ একদিনে মারা যেতেন এবং কনস্ট্যান্টিনোপলে মড়ক চার মাস ধরে চলতো। উপরোক্ত তথ্য ও পরিসংখ্যানগুলোর উপর নির্ভর করে এটা বলা সহজ যে কনস্ট্যান্টিনোপলে এক-তৃতীয়াংশ থেকে অর্দ্ধেক মানুষ মারা গেছিল। যদিও এহেন উপসংহার খানিকটা চড়া মনে হয়, তবু এফেসিউসের জন (যিনি কিনা মড়কের প্রথম বিস্তারের সময় ভ্রমণ করছিলেন), পর্যবেক্ষণ করেন যে কনস্ট্যান্টিনোপলে মৃত্যুর সংখ্যা অন্য যে কোন শহরে মৃত্যুর হার ছাপিয়ে গেছে। সাম্রাজ্যের অন্যান্য বড় শহরে মৃত্যুর হার বোঝা যাচ্ছে না বা সে হিসাব অনিশ্চিত। কিছু শহর মড়কে আক্ষরিক অর্থেই জনপরিত্যক্ত হয়ে গেছিল যখন কিনা যেসব শহরে বিশেষ কোন ব্যবসা-বাণিজ্য ছিল না, তারা কম ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল। এই বিপদের মুখে পড়ে এবং বাড়তি জনতাত্ত্বিক তথ্য বা উপাত্তের আলোয় গবেষকরা গোটা সাম্রাজ্যের মানুষের জন্য এক সামগ্রিক মৃত্যুর হার নির্দ্ধারণ করেছেন। এই হার সাম্রাজ্যের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের মত হবার কথা। অবাক করা হলেও কালো মৃত্যুতেও হুবহু সমসংখ্যায় মানুষ মরেছিল।

 

কালো মৃত্যুর পর ইউরোপের জনবিন্যাসে যে পরিবর্তন ঘটে সেটা কিছু আধুনিক গবেষককেও এই অনুমান করতে দিয়েছে যে এই মড়কের জন্য সম্ভবত: রোমক সাম্রাজ্যের চিরস্থায়ী বিনাশ হয়নি। চিরস্থায়ী বিনাশের কারণ ছিল অন্য কিছু। এই তত্ত্ব, অবশ্য, অচল তুলনার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত যেটা শুরুতেই অনুমান করে নেয় যে জাস্টিনীয় মড়ক ও কালো মৃত্যু- দু‘টোই ছিল ব্যুবোনিক প্লেগ। যদিও মড়কে সাম্রাজ্যগুলোর ধ্বংস হওয়ার বিষয়ে প্রাপ্ত সাহিত্যিক দলিলগুলো অস্পষ্ট ও পরিমাপযোগ্য নয়, তবু এর বিপক্ষেও কোন স্বাক্ষ্য পাওয়া যায় না। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় যে কালো মৃত্যুর পর বিয়ের হার চড়া হারে বেড়ে যায় এবং মানব-মানবীর মিলনের হারও অনেক বৃদ্ধি পায়। এসময় আগাথিয়াস লক্ষ্য করেন যে সাধারণত: যুবক পুরুষেরাই মড়কে বেশি ভুগছে। এই পর্যবেক্ষণ সঠিক হয়ে থাকলে এবং তাঁর আর একটি বক্তব্য (মড়ক প্রতি পনেরো বছর অন্তর একবার আসে)-এর সাথে মিলিয়ে নিলে সেসময় মড়ক যে সভ্যতার অনেক রাষ্ট্রের জনবিন্যাস বদলে দিত সে বিষয়ে নিঃসন্দেহ হওয়া যায়।

 

একজন গবেষক ইতোমধ্যে নির্দেশ করেছেন যে মিশরীয় প্যাপিরাসে প্রাপ্ত সব লেখা থেকে সেসময় রাজ্যে কোন অর্থনৈতিক সঙ্কট বা এমনকি মিশরে মড়কের সময় জনসংখ্যা হ্রাসের বিষয়েও কোন কিছু পাওয়া যায় না। যদিও এই বিষয়টি উদ্বেগজনক, এফেসিউসের জন কিন্তু জানাচ্ছেন যে আলেক্সান্দ্রিয়া কনস্ট্যান্টিনোপলের মত মড়কে ক্ষতিগ্রস্থ হয়নি। এছাড়াও ইতিহাসের নানা তথ্য-উপাত্ত থেকে এটাও জানা যায় না যে ৫৪১ সালে মড়ক মিশরে আঘাত হেনেছিল। আর একটি লক্ষ্যনীয় বিষয় হলো এই যে মড়কে কবর উপচানো লাশের কথা এত পাওয়া যাচ্ছে, অথচ কোথাও কোন প্রত্ন-তাত্ত্বিক প্রাচ্য দেশে কোন মড়কের কবর খুঁড়ে পেয়েছেন বলে জানা যাচ্ছে না। তবে আরো বেশি বেশি প্রত্ন-তাত্ত্বিক অনুসন্ধান চালানো হলে অন্য রকম ফলাফলও পাওয়া যেতে পারে।

 

এই প্রশ্নগুলো মড়কের অস্তিত্ব অস্বীকার করে না তবে সাম্রাজ্যের উপর মড়কের কোন বিপর্যয়কর অভিঘাত ছিল কিনা সে প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে। মধ্য ইউরোপে কাল মৃত্যুর ফলে অত্যধিক জনবহুল সমাজে সহসা এক মড়কের মাধ্যমে জনসংখ্যা কমে গেছে এমন ম্যালথাসীয় কথা-বার্তাও একটা সময় পর্যন্ত বলা হতো। কালো মৃত্যুর ফলে জনসংখ্যা কমে গিয়ে শ্রমিকদের মজুরিও বৃদ্ধি পায়। আনুমানিক ৫৪৪ খ্রিষ্টাব্দে, সম্রাট জাস্টিনিয়ান একটি আইন প্রণয়ন করেন যা কারিগর, শ্রমিক এবং নাবিকদের বেতন বাড়ানোর বিপক্ষে ভেটো প্রদান করে। যদিও শস্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় শ্রমিকদের প্রকৃত মজুরি কমে যায়, তবু জনসংখ্যার বিপুল হ্রাস এক অর্থে দরিদ্র বা নিম্ন আর্থ-সামাজিক কাঠামোর শ্রমিকদের কিছুটা হলেও উপকার করেছিল। একথা স্মরণে রাখা ভাল যে এই তুলনা একটি নির্দিষ্ট পরিসর পর্যন্তই কেবল চলতে পারে; চোদ্দ শতকের ইউরোপের তুলনায় রোমক সাম্রাজ্য অত্যধিক জনবহুল ছিল এমন কোন তথ্য বা প্রমাণ পাওয়া যায় না। যদিও এটা পরিষ্কার যে মড়ক রোমক সাম্রাজ্যকে অন্তত সাময়িক ভাবে হলেও ক্ষতিগ্রস্থ করেছিল, তবু এটা মনে রাখা দরকার যে ৬০০ সালেও রোমক সাম্রাজ্য একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র যাদের আছে অনুকূল রাজনৈতিক শর্তাবলী এবং একটি সমৃদ্ধ অর্থনীতি।

 

ইতিহাস জুড়েই মড়ক কিন্তÍ মানব সভ্যতাকে নানা ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করেছে। মড়কের প্রভাব বুঝতে হলে অবশ্য জনবিন্যাসগত এবং প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা প্রয়োজন। প্রাচ্যের দেশগুলোয় অনেক প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণাই পর্যাপ্ত নিয়ম-নীতি মেনে করা হয়নি। অনেক সময় সম্পদ খোঁজার উদ্দেশ্যেও এসব অনুসন্ধান করা হয়েছে। এথেন্সে মড়কের ফলে সৃষ্ট সমস্যা বুঝতে অল্প কিছু প্রত্নতাত্ত্বিক খনন করা হয়েছে। এসব প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকার উপর আধুনিক শহরের আরোপ কিছু কিছু এলাকায় প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় বাধার সৃষ্টি করেছে। উদাহরণ হিসেবে কনস্ট্যান্টিনোপল শহরের কথাই বলা যায়। রাজনীতি, দূর্ভাগ্যজনকভাবে, এই বাধার ক্ষেত্রে একটি বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। ভবিষ্যতে হয়তো প্রত্নতত্ত্ব নতুন সব মাধ্যম নিয়ে নতুন নানা অনুসন্ধান পরিচালিত হবে এবং জনবিন্যাস বিদ্যাও এথেনীয় ও জাস্টিনীয় মড়কের প্রতিক্রিয়া বিষয়ে নতুন সব অন্তর্দৃষ্টির সন্ধান দেবে।

         

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>