অতুল ছায়ারা দূরে, বাবা ডাকছেন


সাজ্জাদ সাঈফের বাবা আব্দুল কুদ্দুস সরকার
স্থানীয় সরকার
জনপ্রতিনিধি(১৯৮৭-২০১২)
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি- শেখদী পঞ্চায়েত পরিষদ, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা।

 

সেই দিনগুলি ভাবি, যেদিন নিঃস্বতা পকেটে নিয়ে বাবা ফিরতেন, গাছপালা আঁকা স্টুডিওতে নিয়ে ফটো তোলা হত আমাদের; সেই দিনগুলি আবছা আলোর ভিতর ঢুকে গিয়ে সন্ধ্যা হয়ে যায়, আমি চুপচাপ দেখি, আমরা নিস্তরঙ্গ দেখি।

আমাদের ঘরের চালে বৃষ্টির আওয়াজ নিয়ে রাতভর বিস্ফোরণ, রাতভর হত্যাচেষ্টার ভিতর দিয়ে বাবাকে দেখেছি দৈব কোনও যতিচিহ্নের মতো শান্ত, স্থির আর অনিশ্চয়ের পিঠে সওয়ার কোনো বিজেতার মতো সিনাটান হয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন মূল দরোজায়, মৃত্যু ও অপঘাত এসে কতো করে বুঝিয়ে গিয়েছে তাঁকে, গণমানুষের রাজনীতি দমে যেতে দেয়নি বাবাকে।

সেই দিনগুলি ভাবি, আমাদের ঘুমন্ত কপালে বাবার আলতো ছোঁয়া যেনো নক্ষত্রস্পর্শের মতো লাল এক ভোরের কল্লোল। আর, আজ কোনো জার্নির ভিতর যখন আটকে পড়ে আছি, যখন ছটফট করছি স্টিম বয়লারের ভিতর গলা বরাবর অস্তিত্বের কাটাদাগ নিয়ে, বাবাকে জড়িয়ে থাকে ছায়াপারানির রোদ, যেই রোদে শুকাতে দিচ্ছেন তিনি আমাদের নিয়ে যতো উৎকন্ঠাকে।

ছুটিহীন রেলগাড়িটির নাম ধরে, বাবা ডাকছেন; ত্রুটিহীন পাঁজর বিছিয়ে দিয়ে, বাবা ডাকছেন; পৃথিবীর গলনাংকে এসে ফুটছে চাহনী তার, থৈহীন নদী, উৎরোল পারাপার!

সেই কবে এক রাগসঙ্গীতের আলোয় দেখেছিলাম বুকের ভিতর বাবা পুষছেন মাচান, চারিদিকে আষাঢ়ের ঘের, বাবা ভাবছেন, সেই মাচানে জড়ানো পুঁই ফুলে রঙীন পতঙ্গ এসে বসে, বাবা ডাক দেন হেসে!

সাইরেনে ভাসে জ্বরের আভাস, শতাব্দী প্রচন্ড উল্লাসে ধ্বংস ও ধ্বংস্তুপে জড়ো করে লাশের পর লাশ, বাবার উদ্বেগ বাড়ে, আমরা চেয়ে দেখি আর সন্ত্রস্ত হই, তারুণ্যে শঠতার বিপরীতে বুক দিয়ে আগলে রেখেছিলেন সততা ও দেশপ্রেম। আজ যখন মানুষ কাঁদছে, পুড়ে যাচ্ছে নগরসভ্যতা, উজাড় হচ্ছে শিশুদের প্রাণের স্পন্দন, বাবা উদ্বিগ্ন। আমরা সামলাতে চাই তাঁর বার্ধক্য। আমরা নিরাপদ পৃথিবীর আগামী নিয়ে গল্প করি, বাবা শান্ত হন।

আমরা গল্প করি কিংবদন্তীর-
টানা একুশদিন সাগরে ভেসে কলম্বাস ও তাঁর মাল্লারা হতাশ হতে শুরু করলেন, দিক ও উদ্দেশ্য নিয়ে গুঞ্জন শুরু হলো, শুরু হলো মাল্লাদের ভিতর ভীতি ও জাহাজ ফিরিয়ে নেবার জন্য বিদ্রোহের আভাস, তখন কলম্বাস বারবার ঈশ্বরের নামে সবাইকে শান্ত হয়ে ধৈর্য ধরে এগিয়ে যাবার তাগাদা দিতে থাকলেন। এবং একদিন ঠিক রাত বারোটায় অভিযানরত পিন্টা জাহাজ থেকে গর্জে উঠলো কামান, কলম্বাস আতঙ্কিত হয়ে ভাবলেন এটি হয়তো নাবিকবিদ্রোহ, কিন্তু হৈচৈ শুনে
তিনি নিশ্চিত হলেন যে রাণী ইসাবেলাকে দেয়া কথা তিনি রাখতে পেরেছেন, জনপদ আবিস্কৃত হয়েছে। মৃত্যু অব্দি তিনি বিশ্বাস করতেন যে তিনি ভারত আবিস্কার করেছেন। ইতিহাস এখন এটা জানে যে কলম্বাসের আবিস্কৃত জায়গাটি বর্তমান বিশ্ব মানচিত্রের ওয়েস্ট ইন্ডিজ। পরদিন সকালে স্পেনের পতাকা উড়লো সেই দ্বীপে। ছয়মাসের সেই লম্বা অভিযানে কলম্বাস সেবারে কিউবা ও হাইতি আবিস্কার করলেন, দেশে ফিরে বীরের সম্মান পেলেন।

ইতিহাস হতে এই ঘটনাটি উল্লেখ করলাম দুটি কারণে-
১. বাবা জীবনভর গণমানুষের রাজনীতি করতে গিয়ে নিজস্ব সম্পদ খুঁইয়েও এই ঐতিহাসিক ব্যাক্তিত্ব কলম্বাসের মতো চিরকালীন একজন কবি স্বভাবের মানুষ ছিলেন, চরিত্রে ছিলো বৈচিত্র, সামান্যতেই হো হো করে হাসতে ভালোবাসেন, আবার অল্পতেই অগ্নিশর্মা হয়ে ওঠেন, কৃতজ্ঞতা প্রকাশে তিঁনি অকুন্ঠ, কারো সামান্য অপমানে ভেঙ্গে পড়তেন ভীষণরকম।

২. আমাদের বাবা নিমেষেই ছড়িয়ে পড়া লু হাওয়ার মতো আকর্ষনীয় ব্যাক্তিত্ব ছিলেন আগাগোড়া, ছিলেন স্পষ্টবাদী। কিন্তু কলম্বাসের মতো বিশাল কিছু ভুল তাকে একসময় একদম নিঃসঙ্গ করে দেয়। এবং স্বাধীনতাপন্থী রাজনীতির সততায় তাঁর জনপ্রিয়তা উঠতি রাজনীতিকদের ভালো লাগেনি, কলম্বাসের গড়ে তোলা দ্বীপরাষ্ট্রে তাঁর জনপ্রিয়তাও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত করেছিলো একদমই রাজনীতি না জানা লোকদের। ফলাফল যা হবার তাই হলো।
আমাদের বাবাকেও সত্য-মিথ্যা মিশিয়ে অপমানের চেষ্টা করা হলো পড়ন্ত মধ্যবয়সে। এরপর আমাদের বাবাকে নিবৃত্ত করি রাজনীতি হতে।

ছড়িয়ে পড়ছে হাওয়া, ছড়ানো মেঘের থোরে গান, বাবা টানটান, রোদের সমান উঁচু, বেলাভূমি খেলা করে সকাল দুপর তাঁকে ঘিরে।

আজ বাবার প্রায় বার্ধক্য, আজ সবুজ শেকড়ে দাগ পড়ে গেছে শ্যাওলার, বাবা ডাকছেন, মেঘের আঘাতে খুলে গেছে দরোজা, তুমি ঘরে যাও, অতুল ছায়ারা দূরে, ঘন হলো মেঘের ডিজাইন, হাত নেড়ে বাবা ডাকছেন, ঝড় আসে যদি?

:::

2 thoughts on “অতুল ছায়ারা দূরে, বাবা ডাকছেন

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত