লোকাচার আর বেড়ে ওঠা


সোনালী মুখোপাধ্যায় ভট্টাচার্যের বাবা বলাই ভট্টাচার্য।

প্রত্যেক গোষ্ঠীর কিছু নিজস্ব রীতিনীতি, সামাজিক নিয়ম, সময়ের সিঁড়ি বেয়ে তৈরি হয়েছে। আমার মা জননী, লাল পাড় শাড়ি, ফর্সা হাতে ধবধবে শাঁখা পলা আর টুকটুকে সিঁদুর পড়ে থাকতেন সব সময়। অফিসে যাবার সময় ও মাথা থেকে ঘোমটা সরত না।

অথচ পড়াশুনো, চলাফেরায় মানে ইংরিজি উচ্চারণ বা নভেল পড়ার নেশা, আমার ইশকুলের প্রজেক্ট অথবা চীজ,কর্নফ্লেক্স দিয়ে ব্রেকফাস্ট, কেটে গেলেই টিটেনাস ইংজেকশান, আর ভ্যাকসিন, এসব এ একেবারে মেমসাহেব। সেটা বাইরের মধ্যবিত্ত পাড়া চট করে টের পেতো না।শুধু বুঝতো কোথাও আমি,আমরা অন্য রকম।সমীহের বেড়া লক্ষ্মণের গন্ডি কেটে রাখত আমাদের ছোট্ট সংসারের চার দিকে।

আমি এত দিনে পিছু ফিরে দেখতে বসে খেয়াল করছি চারপাশের পরিবারের থেকে মা বাবা কতটাই অন্যরকম, কত কস্মোপলিটান।তখন ভাবতাম সবাই এমনই বড় হয়। বাবা মাকে সবাই জানত ট্রাডিশন মেনে চলা মানুষ। আমায় বাংগালির প্রথা সব শিখিয়েছেন। আকাশপ্রদীপ জ্বালানো হোক,বা পুজোর আলপনা। মৃত্যুকে সম্মান জানিয়ে,মৃত মানুষকে স্পর্শ করে এলে তাই এখনও বাড়িতে ছোটদের বলি ভিতরে ঢোকার আগে আগুন দাও,তেতো কিছু দাও,লোহার জিনিষ ছুঁয়ে ভিতরে ঢুকব।ঢুকেই স্নান সারব।এইটাই নিয়ম।

আমার ছেলে প্রশ্ন করে কেন নিয়ম?

আমি ভাবতে বসি। হাইজিনের অংশ ত আছে।তা ছাড়া….

তখন দেখি,হ্যাঁ,পূর্বজ বাংগালির ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আমায় শিখিয়ে তো গেছেন দুই জন,কিন্তু এনফোর্স?

এর সংগে,রোজ কব্জি অব্ধি নানা ধরনের মরা টিসু মেখে খালি হাতে লাশ কেটে আসা ১৮ বছরের পুপুর তো কোন যোগ নেই।কোন লোকাচার,মৃত্যু সম্বন্ধে কোন ট্যাবু,মৃত দেহ সম্বন্ধে কোন ভীতি তার বাড়িতে ত ছিল না।বাড়ি ফিরেই ডেটল জলে জামাকাপড় ভিজিয়ে রেখে চান সেরে আসা স্বাভাবিক ভাবেই পরিচ্ছন্নতার নিয়ম মেনে ছিল। কিন্তু এই বাড়ির মেয়ে যে রোজ লাশ রাখা লম্বা বাক্সের ওপরেই বসে বন্ধুদের সংগে ঠ্যাং দুলিয়ে দুলিয়ে টিফিন খায়,খালি হাতে কাঁচের বয়াম থেকে বের করে কত যুগের বাসি মড়ার লিভার বা কিডনি নিয়ে ক্লাসে পড়ে শুনে আসে, কই কোন রিয়্যাকশান ত ছিল না।!

জলখাবার খেয়েই ফার্স্ট ইয়ারে একবাক্স খুলে রাখা কংকাল কে টেনে এনে যে হাড়টা পড়ানো হয়েছে ক্লাসে তাকে নিয়ে বই খুলে খাটে বসে পড়তাম পড়তে।আনাটমিটাই সবচে বেশি মুখস্ত করতে হয়।পার্ক সার্কাস অব্ধি যাতায়াত আর কলেজের ক্লান্তিতে লম্বা হাড্ডিতে মাথা রেখেই ঘুমিয়ে পড়তাম কত। বাবা মা অফিস থেকে ফিরে দেখতেন মোটকা গ্রে’স আ্যানাটমি আর হাড় মাথায় ঘুমোচ্ছে কন্যা। বাবা মশাই স্বভাবসিদ্ধ ভংগীতে বলতেন,মোটা বই মাথায় দিয়ে ঘুমোলে ডাইরেক্ট পড়ারা ভিতরে ঢুকে যায় কি বল?

মা বলতেন,খাবার আগে সাবান দিয়ে হাত ধোয়।বিছানা ত ধামসাচ্ছ আমার।

ব্যাস।ও টুকুই।

অবশ্য লাশ কাটার গল্প শুনতে শুনতে রাতে খাবার টেবিলে বাবা মনে করাতেন, আগেকার দিন হলে লোকেরা আমাদেরকেই শব সাধনাকারী তান্ত্রিক বলত। শিব,আমাদের প্রথম দিকের ভিষগ, চিকিৎসক। তাই তাঁকে শ্মশানচারী,অস্থি ধারী ইত্যাদি বলেছে মূর্খ আমজনতা। পরে ফোরেন্সিক ক্লাসে টক্সিকোলজি পড়তে গিয়ে এ কন্সেপ্ট আরও ঠিক মনে হয়েছে।সাপের বিষ, ধুতরাফুল ফল,ইত্যাদি চিকিৎসাবিদ কেই জানতে হয়। বিজ্ঞানমনস্কতা, স্বচ্ছ চিন্তা,এর সংগে লোকাচারের কখনো সংঘাত বাধেনি আমার বড় হবার রাস্তায়। এইটাই স্বাভাবিক বড় হওয়া বলে ভেবেছি। আজ চারপাশে তাকিয়ে মনে হচ্ছে, বুঝিবা সব ছোটরা এত সহজ করে বড় হয় না।হলে আরও অনেক সরলরেখায় চিন্তা করতে পারা মানুষকে সমাজে দেখতে পেতাম।

আমার বাবা শ্রী বলাই ভট্টাচার্য এবং মা আইনি সম্পাদিকা শ্রীমতী দীপালি ভট্টাচার্য মহাশয়ার সম্পাদনায় , ” বিদ্যার্থী রঞ্জন” নামে একটি মাসিক পত্রিকা দশ বছরের ও বেশি কলকাতায় প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৬৭ সাল থেকে। সেটি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের আদর্শে তাঁর জন্মদিনে ইউনিভার্সিটি ইন্সটিটিউট হলে প্রথম প্রকাশিত হয়। আর সেই জন্যে তার দু দিন পরে জন্মানো আমি হবার সময় মায়ের কাছে বাবা বিশেষ থাকতে পারেননি বলে মায়ের সারা জীবন নালিশ । এই পত্রিকা বানিজ্যিক ভাবে দক্ষিণ কলকাতায় বহুদিন চলেছে। ন্যাশানাল লাইব্রেরি,  গোলপার্ক রামকৃষ্ণ মিশন লাইব্রেরী ইত্যাদিতে এখনো কপি সব পাওয়া যায়।  পত্রিকা ছাড়াও এই একই লোগো তে মুদ্রিত হত বিভিন্ন মনীষার ছবি, উদ্ধৃতি ও সংক্ষিপ্ত জীবন সহ ছোটদের লেখার খাতা।  সমস্ত অপূর্ব স্কেচ এঁকেছিলেন বাবার ঘনিষ্ঠ বন্ধু শ্রী মনোজ চক্রবর্তী। এই খাতার মধ্যেও এ পংক্তিরা রয়েছে আমার কাছে।

ইদানীং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে নিয়ে বাংগালি আবারও চর্চা করছে দেখে বাবার কথাই বড় বেশি করে মনে পড়ল।

যদক্ষরং পরিভ্রষ্টং মাত্রাহীনঞ্চ যদ ভবেৎ

পূর্ণং ভবতি তৎসর্বং তৎপ্রসাদানো পরমেশ্বরী

কি জানি এখানে ও ভুলভাল কিছু লিখলাম কিনা। লিখলে আর কি করা,আমার কন্যে যেমন থেকে থেকেই হেসে বলে,ক্ষমস্য পরমেশ্বরী। সেইই আর কি।সমসকৃত তো জানি না, কচুও।নেহাৎ অনর্গল দেবভাষা বলা এবং পড়া মা জননী, সব সময় সব ভাষার শব্দ ভাংগবার অভ্যাস করিয়েছেন অজ্ঞান বেলা থেকে,তাই বুঝি।

যারা অক্ষর থেকে পরিভ্রষ্ট হয়ে ক্ষয়াটে হয়ে গেলো, যারা মাত্রাহীন হয়ে বেপথু হয়ে নষ্ট হতে যায়,তারা।যাদের হাতের লেখা আমার মতই টেরাবাঁকা, মাত্রা ছাড়া, তারাও। তাদের সব অপূর্ণতা তুমি পূর্ণ করে দেবে বলে কোল পেতে বসে আছ।তোমার প্রসন্নতার প্রসাদ, আজ পিতৃপক্ষএর সুরুতে শরতের আকাশ বাতাস আমার কাছে পৌঁছে দিয়ে গেলো সকাল সকাল।

সেই দুহাজার চার থেকে তর্পণ করতে শেখা।আজ বসে ভাবছি।কি দিয়ে করে চলেছি তর্পণ।

সতিল গংগোদকং, তার সংগে তোমাদের শেখানো এত অক্ষর আর এত প্রেম, সেও দিই তোমাদের।অঞ্জলিতে পুপুসোনালির, “তস্মৈ স্বদা‘‘।

.

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত