মন খারাপের ঘুড়ি

ফেলে আসা দিনের ভালো নাম  স্মৃতি। কোন এক বিষন্ন সন্ধ্যায় নাপথ্যালিনের গন্ধ লাগা স্মৃতিতে পেয়ে বসে মন। ভালোলাগায় জারিত হতে হতে মনে পড়ে যায় সব এক এক করে— হয়ত সেটা খারাপ পাওয়া ছিল, কিন্তু ফেলে আসা দিন তা আর মনে রাখে না যত্ন করে তোয়ালে দিয়ে মুড়ে রাখে।

বিদায়ী বাপের  বাড়ির দেওয়ালে আমার টানা দাগ পেন্সিলের। বাবা বলতেন আমি যখন খুব ছোট ছিলাম তখন ডিঙ্গি মেরে মেরে দাগ টানতাম। পরে রঙ হবার পর ও সিঁড়ি ঘরের জোড়াতালি দিয়ে করা রঙ কিছুতেই ওটা মুছতে পারেনি নাকি! বছরের পর বছর থেকে গেছে আমার ছোট থাকার স্মৃতি নিয়ে–শেষ বার বাড়ি বিক্রি হবার আগে ওই দাগ টা ছুরি হয়ে বসে গেছিল শরীরে–
সামনের বারান্দায় বাবা গেঞ্জি আর লুঙ্গি পরে বসে কাগজ পড়তেন,  সামনে জমিতে টগর আর জবা মায়ের রোজের ফুল দিত। আর ওদের তলায় ছিল আমাদের কালু ঘুমিয়ে—ওকে রেখেই চলে আসতে হয়েছিল। যে ছিল আমাদের বাড়ির ছেলে তাকে রাখতে পারিনি।

আমাদের বাপের বাড়ির ছাদ থেকে ট্রাম লাইন দেখা যেত। তারাতলা টু জোকা এই হল রুট।স্কুল থেকে ফিরেই ছাদে ঊঠে ট্রাম গোনা, ট্রাম লাইনের তারে ঝুলতে থাকা কাটা ঘুড়ির সংখ্যা বাড়ল না কমল দেখাই ছিল আমার কাজ।এক এক দিন বাবার ফিরতে বড় দেরী হত, আমি আর মা ট্রাম লাইনের  উপর দাঁড়িয়ে থাকতাম আর ট্রাম থেকে নামা কালো চশমা হাতে ব্যাগ নেওয়া লোক দেখলেই মনে হত ডেকে উঠি বাবা…এক এক করে সব ট্রাম চলে যেত আর মায়ের মুখ হয়ে উঠতো শুকনো পান্ডুর…সিঁদুর পরা কপালে পড়ত ভাঁজ– আবার বাবা কে দেখতে পেলেই দু হাত মাথায় ঠেকিয়ে বলে উঠত… নারায়ণ  নারায়ন… বেরোনোর সময় দূর্গা, ফেরার সময় কেন নারায়ণ  জানতাম না, জানি এটাই নিয়ম…
বাপের বাড়ি যখন ভেঙে ভাগাভাগি হল ঠাকুমার ঘর টা কাকুদের ভাগে পড়ল সেই প্রথম আমার জীবনে বিচ্ছেদ দেওয়াল আলাদা হওয়া- হয়ত  ইট কাঠ পাথরের তবু ছোট মন বুঝেছিল কি একটা চলে গেল বরাবরের মত– ওই দিকে আমরা আর যেতে পারব না– গোনা হবে না ট্রাম আর ট্রাম লাইনের তারের কাটা ঘুড়ি– পেছনে পড়েছিলাম আমরা –তাই সোজাসুজি  তাল গাছে আটকানো ঘুড়ি দেখা ছাড়া আর উপায় ছিল না।

কালী পুজোর সময় অনেক রাত পর্যন্ত বাপের বাড়ির ছাদে প্রদীপ জ্বালানো দেখতাম। তখন তো এল ই ডি আলোর ছড়াছড়ি ছিল না, হয়ত কোথাও কোথাও টুনি ছিল, মন খারাপের দিনে কার্ত্তিকের আকাশ প্রদীপ কোথাও একটা আপন করে নিত যেন। হেমন্তের কুয়াশা মাখা ধুসর গোধুলিতে নেমে আসা সন্ধ্যার সাথে কথা বলতাম — সেই কথার কোনো মানে ছিল না! শুধুই ভাললাগা ছিল — ফিরে পাওয়ার। বড় হওয়ার।

বড়বেলাতেও ছাদেই যাওয়া ছেদ পড়েনি। ছাদে ঠাকুর ঘর হওয়ায় আমার নিজস্ব জায়গায় যেন টান পড়লো। পুরোনো টালি ঘর ভেঙে নতুন ঘর হল, মার্বেলের ঠাকুর ঘর এলো কিন্তু টালি ঘরের পেছনের তাল গাছ টা কি করে থেকে গেছিল আমায় মনে করে—

পাতাহীন শিমুলের মতই সময় কেটে গেছে গতানুগতিক ভাবে। পর্নমোচী দিন রাত একা একা হেঁটে গেছে নিজের মত। বিয়ের হলুদ গায়, বাসি বিয়ের প্রথম সিঁদুর পরা সব ই বাপের বাড়ির ছাদে– সেও চুপ, আমিও চুপ ছিলাম। তারপর কখন মন খারাপের ঘুড়ি উড়িয়ে চলে গেছি ছাদ ফেলে অন্য বাড়ির ছাদে—সেখানের ছাদ অনেক বড় এ মাথা ও মাথা দেখা যায় না– তবু বাপের বাড়ির ছাদ, শেওলা ধরা দেওয়াল নোনা লাগা মেঝে বড় টানতো
শুধু আকাশ– সে ছিল আমার এ বাড়ি ওবাড়ির মস্ত বড় সেতু– সব বিকেলে সে নিয়ে আসত বাপের বাড়ির রঙ।
স্মৃতি কে তারাই আবছা বলে, যারা মনে রাখতে জানেনা। ব্রেনে সংকলিত গদ্য পাতায় স্মৃতি ঠিক থেকে যায়। অন্ধকার ঘরে প্রজেক্টর চলে ঘর ঘর করে। এই ছাদ সারাজীবন এর ছিল না হয়ত,  বাবা দুম করে চলে যাবার পর অন্ধকার থাকত সব বিকেল সব রাতে নেমে আসত শৈত্যতা। মার ফ্যাকাসে সিঁথিতে থাকতো হারিয়ে যাওয়া আনন্দ — বাবার বাড়ির ছাদের মতই ক্রমশ ফাঁকা হতে থাকল মায়ের সিঁথির দু পাশ এই ফাঁকা হওয়া মাথার মাকে দেখলে মনে পড়ে ভাই হবার সময় মায়ের সাধের দৃশ্য আর বাবার লুকিয়ে দেখা চোখ–সেই চোখ আজ ছবিতে পান্ডুর লাগে চশমার আড়ালে— বাবার বাড়িতে বাবার ছেলের আর ফেরা হবেনা। কৃতী ছেলেদের ফেরা হয় না আর আসলে–

মাকে নিয়ে চলে আসার দিন মা চুপ ছিল অনেকদিন। আমার ফ্ল্যাট বাড়ির জানলা দিয়ে মা কি মিল খুঁজতো আমাদের বেহালার বাড়ির– জানতে চাইনি কারন সেই ছাদ তো আমি আর ফেরাতে পারব না। তার থেকে মাও  খুঁজে নিক আমার মতন আকাশ এখানেই। বাপের বাড়ীর ছাদ বিক্রি হুওয়ার পর মাকে শেষ দেখানো দেখাতে নিয়ে যাই নি, বাবা মারা যাবার দিন শ্মশানে নিয়ে যাইনি, মৃত শরীর স্পর্শ করে জলে চান করলেই  সব মোছা যায় কি আমার কাছে আমার বাবা কত উষ্ণ আজো!! শুধু আমি গেছিলাম অন্ধকারে কাঁদতে—
ছাদে উঠে কাটা ঘুড়ি দেখতে চেয়েছি যে আমার মতই ঠিকানা হীন ছিল। শুধ সিঁড়ির ঘরে বাবার সযত্নে রাখা আমার বড় হওয়ার স্মৃতি টাকে বুকে করে নিয়ে এসেছিলাম–  জানি, এই ছাদও একদিন আমায় ছাড়তে হবে– শুধু জানি আর কোনো শোক আমার কাছে স্মৃতি হয়ে উঠবে না– এই প্রথম আর এই শেষ…

.

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত