ফেরা

।।তমাল বন্দ্যোপাধ্যায়।।

তোমার কাছে ফিরছি। প্রায় বাইশ বছর পর সব পিছুটান ছেড়ে, সব সংকোচ, দ্বিধা-দ্বন্দ্ব পেরিয়ে শুধু তোমার কাছে ফিরব বলে রওনা দিয়েছি। আজ তোমার সঙ্গে দেখা হবে। তোমার সামনে গিয়ে দাঁড়াব, তোমার মুখোমুখি। তোমার মুখোমুখি মানে সে কি আমার মুখোমুখি না? আমার সেই পুরনো আমি, সেই দ্বিধাজর্জর ভিতু ভিতু অসফল আত্মমর্যাদাহীন ছেলেটা যে পালিয়ে গিয়েছিল। তোমার সামনে দাঁড়ানোর তার মুখ ছিল না, সামর্থ্য ছিল না নিজের ভিতর ঠেলে উঠে আসা কিছু প্রশ্নের সামনে দাঁড়ানোর, তাই পালাতে চেয়েছিল। ত্রিসীমানা থেকে দূরে, অনেক দূরে কোথাও পালিয়ে গিয়েছিল।

রাজধানী এক্সপ্রেস থেকে নেমে সেই মেদুর মফস্বল টাউনে ফেরার জন্য একটা ভাড়া-গাড়ি বুক করলাম। যথারীতি অতি আর্দ্র পড়ন্ত দুপুর, চিটচিটে ঘামের হাত থেকে রক্ষে নেই। তবু এসি চালাতে বারণ করলাম, খুলে দিতে বললাম সব জানলাগুলো। শরতের অন্তিম দিন, আগামিকাল পয়লা কার্তিক, দেশজুড়ে আলোর উৎসব দীপাবলি আর বঙ্গে শ্যামাপূজা। খাতায় কলমে হেমন্ত সমাগত, কিন্তু বাতাসে হিমের পরশ লাগেনি ছিটেফোঁটাও। তবুও হু হু করে ছুটে এসে মুখে বুকে ধাক্কা দিয়ে সর্বাঙ্গে লেপ্টে যাওয়া এই হাওয়ারা আমার চিরচেনা। আজ বহুদিন বাদে তবু ওরা যেন আমায় চিনতে পেরেছে! হায়, যদি হাট করে খুলে ধরতে পারতাম পাঁজরের এই দোর-কপাট, সরাসরি প্রাণে এসে লাগত এই অভিমানী দাপট। তবু শান্তি, আহা এ কী আশ্চর্য সুখোদয়!

মহানগর ছাড়িয়ে, শহরতলি পেরিয়ে হাইওয়ে দিয়ে ঝড়ের বেগে এগোচ্ছে গাড়ি। সহসা মন গুনগুনিয়ে উঠল ‘মনে হল যেন পেরিয়ে এলেম অন্তবিহীন পথ আসিতে তোমার দ্বারে, মরুতীর হতে সুধাশ্যামলীম পারে, মনে হল…।’ আচমকা দুরু দুরু করে উঠল বুক, কীসের আশ্বাসে এত দূর এসে পড়লাম? মাঝখানে বিশটা বছর চলে গেছে। যাদের সঙ্গে কোনও রকম যোগাযোগ নেই, তারা বেঁচে আছে কি মরে গেছে জানা নেই, কোনও চিঠিপত্র বা ফোন কল নেই, কানে আসা খবর ইত্যাদি কিছুমাত্র নেই, কী করে এতটা নিশ্চিত হওয়া গেল ওরা ওখানে আছেই। বাড়ি বিক্রি করে চলেও তো যেতে পারে, অন্য কোনও শহরে বা কোথাও উঠে যেতেই পারে। ধক করে উঠল হৃদযন্ত্র, সত্যিই তো এই শেষ ক’টা দিনে একবারও কেন এই কথাটা মাথায় আসেনি!

যাই হোক বেরিয়ে যখন পড়েছি তখন তো যেতেই হবে। সশরীরে কচুরিপানায় ঢাকা মরা নদীর সোঁতার ধারের ছায়াচ্ছন্ন সেই পাড়ার সেই দালান-কোঠাটার সামনে গিয়ে স্বচক্ষে দেখতে হবে ওরা নেই না আছে। না থাকলে আশপাশের বাড়িগুলোয় ঢুকে খোঁজ নিতে হবে কোথায় গেল। আশুতোষ অধিকারীর মতো নামডাক থাকা মানুষের খবর তো পাড়া প্রতিবেশী রাখবেই। মানুষ তো আর কর্পূর নয় যে উবে যাবে। আছে তো বটেই, কোথাও না কোথাও তো আছেই। আর থাকলে তো দেখা হবেই, টলটলে জলে ভেসে থাকা জামপাতার মতো ওর চোখদুটোর সামনে দাঁড়াতে শিরদাঁড়া যেভাবেই কেঁপে উঠুক না কেন, ওকে দাঁড়াতেই হবে। ‘কেমন আছ?’ জিজ্ঞাসা করতে পারলে ভাল, না পারলেও ক্ষতি নেই। ওই দুটোতেই সব লেখা থাকবে আশা করা যায়।

রেলগেট পেরিয়ে গাড়ি যখন টাউনে ঢুকছে তখন প্রায় অন্ধকার নেমে গেছে। এই শহরেই আমার জন্ম, স্কুল-কলেজ জীবন, কৈশোর, যৌবনযাপন, তাই এই হাওয়ার আওতার ভিতর ঢুকলে কিছুক্ষণ থমকে না দাঁড়িয়ে পড়ে উপায় নেই। রাত পেরলেই কালীপুজো। তাই আজ চতুর্দিকে উচ্ছ্বসিত আলোর রোশনাই থাকবেই। তবু ছাতিমতলার কোণে কী অসামান্য কোমল ও স্নেহার্দ্র এই অন্ধকার। খানিকটা এগিয়ে রাত কাটানোর মতো একটা ভদ্রস্থ হোটেলের খোঁজখবর নিয়ে রাখলাম। আমূল পালটে যাওয়া টাউনের উপর যতদূর সম্ভব চোখ বুলিয়ে নিয়ে আবার উঠলাম গাড়িতে। না, পথে আর কোথাও থামার প্রশ্নই নেই, এবার সোজা সেই দিকেই যাব যার জন্য আসা।

পাড়ায় ঢুকতেই গেটের জোড়া থামে বসা মুখোমুখি সিংহওয়ালা বাড়িটা সেই একরকমই আছে। নীচের রাস্তাটা অবশ্য পিচের হয়েছে। হ্যাঁ, সেই অতিকায় নিমগাছটা, বুড়োশিবতলা, খাঁ পুকুরের বাঁধানো ঘাট, বারোয়ারি চত্বর ডানে রেখে বাঁ দিকে বাঁক নিয়ে জয়ন্তী সঙ্ঘের খেলার মাঠ পেরিয়ে অঞ্জনা নদীর ছেড়ে যাওয়া সোঁতাটার দিকে যেতে হবে। কাউকে জিজ্ঞাসা করার প্রশ্নই উঠছে না। কুড়িটা বছর এ তল্লাটে পা মাড়াইনি তো কী, এই রাস্তাটা দিয়ে এক সময় এত হেঁটেছি যে ভুল হওয়ার কোনও সম্ভাবনা নেই। রাত বলে আজ অন্তত অসুবিধের কিছু নেই, কারণ প্রত্যেক বাড়ির ছাদে, বারান্দায়, পাঁচিলের মাথায় দাঁড়িয়ে রয়েছে সারি সারি মোমবাতির শিখা বা জ্বলছে-নিভছে নানা রঙের টুনি বাল্বের চেন।







এই তো রাস্তার দিকে বেরিয়ে আসা সেই উত্তুঙ্গ পাইন গাছটা আর তার নীচেই চুনসুরকির গাঁথনি দেওয়া সেই বাইরের গেট। “এই তো। এই তো চলে এসেছি। দাঁড় করাও, এখানেই এপাশে পার্ক করে দাও,” ড্রাইভারকে বলে চকিত উত্তেজনায় গাড়ির দরজার লকিং-হ্যান্ডল টেনে নেমে এলাম। এই তো সব ঠিকই আছে, সেই উঁচু পাঁচিল, সেই আলকাতরা লেপা কাঠের সাবেকি দু-পাল্লা দরজা। সেই ছাদের আলসে, চিলেকোঠার মাথা আর সেই বরাবর সাজানো রয়েছে জ্বলন্ত মোমবাতির দল।

ডান দিকের থামের গায়ে লোহার নতুন একটা প্লেট, “অমিয়নাথ স্মৃতি সঙ্গীত শিক্ষানিকেতন।” তা ছাড়া সব সেই আগের মতো, অবিকল সেই আগের মতো! তা হলে ওরা কোথাও যায়নি, নিশ্চয়ই এখানে আছে। লাফিয়ে ওঠে হৃৎপিন্ড, স্পন্দনের বেগ তিনগুণ বেড়ে গিয়েছে। তা হলে ঝোঁকের মাথায় বেরিয়ে পড়ে আজকে এখানে এসে পড়াটা বিফলে যাবে না। চোখ বুজে, কপালে হাত ঠেকিয়ে অদৃষ্টকে ধন্যবাদ জানিয়ে এগিয়ে যাই।

দরজায় ঝোলানো লোহার বালাটা ধরে সজোরে নাড়াতেই ভিতর থেকে “কে?” বলে কর্কশ উঁচু গলায় সাড়া দিল কে যেন। মহিলাকণ্ঠ কিন্তু নয়, এ আর যার হোক ওর গলার স্বর কিছুতেই হতে পারে না। আমি আবার কড়া নাড়তেই গলাটা বলল, “যাচ্ছি দাঁড়ান, যাচ্ছি।”

দরজা খুলে দাঁড়াল এক মাঝবয়সি পৃথুলা মহিলা। “কে? কাকে চাইছেন?” বাংলায় বললেও উচ্চারণে দেহাতি টান আছে, কাপড় পরার ধরনটাও খুব একটা বাঙালিসুলভ নয়। “আশুতোষবাবু আছেন?” নম্র স্বরে আমি বলি।

“না তো, কুথা থেকে আসছেন?”

“আমি আশুতোষবাবুর ছাত্র। বলুন জয় এসেছে, দিল্লি থেকে জয়দীপ কাঞ্জিলাল এসেছে। বলুন, বললেই চিনতে পারবেন।”

মহিলা আমার পা থেকে মাথা অবধি চোখ বুলিয়ে বলল “মাস্টারজি তো ওনেক বছর, লগভগ সাত-আট সাল হল মারা গেছেন।”

“মানে? কী বলছেন!” আকাশ থেকে পড়ি আমি। শুকনো গলায় ঢোঁক গিলে বলি, “আর ঋতি, ঋতি কোথায়? এখানে থাকে? নাকি অন্য কোথাও? বিয়ে থা-র পর শ্বশুরবাড়ি বা অন্য কোথাও?”

“না না দিদি আছেন। দাঁড়ান…।” গলা ছেড়ে হাঁক দেন মহিলা, “দিদি দেখেন তো কে একজন ভদরলোক ডাকছেন।”

“কে? দাঁড়াতে বলো, আসছি।” অনেকটা ভিতর থেকে ক্ষীণ সুরেলা একটা চেনা গলা কানে এল।

শুনেই মুহূর্তের জন্য বন্ধ হয়ে গিয়েছিল হৃদস্পন্দন। আমার সামনে দাঁড়ানো মহিলা দরজার পাল্লাটা কিছুটা খুলতেই চোখে পড়ল সেই বিরাট উঠোন আর বড় ইঁদারাটা। ছড়ানো চাতাল জুড়ে প্রায়ান্ধকারের মধ্যে নানা কোণে বসানো রয়েছে কাঁচা মাটির অনেক প্রদীপ। কাল অমাবস্যার আগে আজ ভূত-চতুর্দশী। আজ বাংলার ঘরে ঘরে বাড়ির বিভিন্ন প্রান্তে হাতে গড়া চোদ্দো-প্রদীপ দেওয়ার রীতি। এই আলোয় পথ চিনে নাকি পরলোক থেকে পূর্বপুরুষেরা আজ নাকি বাড়িতে আসেন। তাঁদের উদ্দেশ্যেই দেওয়া এইসব আলো… মাটির নরম বুকে ঢালা সরষের তেলে ভেজানো সলতেগুলোর মাথায় ফুটে থাকা নরম সব আলো।  

পরিত্যক্ত ইঁদারার দিকটায় চোখ পড়তেই সচকিত হয়ে উঠলাম। বেড়টার উপর একটা প্রদীপ রেখে এদিকে পা বাড়াল ক্ষীণাঙ্গী এক ছায়ামূর্তি। দু’হাতে ধরা একটা মাটিরই গড়া প্রদীপ, তবে এটা পাঁচমাথা বড়দানির। হাওয়ায় নিভে যেতে পারে, তাই খুব আস্তে আস্তে এগিয়ে আসছে। বুকের কাছে ধরা পাঁচটা শিখার আলোয় ক্রমশ স্পষ্টতর হচ্ছে মুখমণ্ডলের পরিচিত প্রান্তরেখাগুলো। অন্ধকারের প্রেক্ষাপটে এমনতর মৃদু আলোর বিচ্ছুরণেও ভাস্বর লাগছে উর্ধ্বদেশ। লম্বাটে মুখ, তীক্ষ্ণ নাক, ফালা ফালা চোখ, সাঁট করে বাঁধা চুল, রোগাটে গলা, অপ্রশস্ত কাঁধ, “কে? একটু দাঁড়ান, এটা রেখেই যাচ্ছি।”

“কী জয় না কী যেন নাম বলছেন। দেহ্‌লি থেকে এসেছেন বলছেন।” দরজার পাল্লাটা ধরে ওইদিকে তাকিয়ে বলে উঠল সেই দেহাতি মহিলা।

“আচ্ছা যাচ্ছি …। কে? জ-জ-য়…? দিল্লি…?” উঠোনের মাঝামাঝি থমকে দাঁড়াল ছায়ামূর্তি। সামনের দিকে নিচু হয়ে সযত্নে মাটিতে রাখল পঞ্চপ্রদীপটা। দরজার দিকে তাকিয়ে দু’তিন পা এগিয়ে এসে আবার থমকে দাঁড়াল। বৈদ্যুতিন আলোর মতো স্পষ্ট না হলেও চারদিকের এত সব আলোক উৎসের সম্মিলিত প্রভাবকে তুচ্ছ করা যায় না মোটেও। আমার চেহারাটা কিছুটা হলেও ঠাহর করেই কি ওইভাবে দাঁড়িয়ে পড়ল? চতুর্দশীর এমন নিকষ কালো অন্ধকারে ভূত দেখার মতো করে চমকে উঠল, তাকিয়ে রইল ফ্যালফেলিয়ে।

আমার গলা দিয়ে স্বর বেরচ্ছে না, তবুও ভিতর থেকে জোরালো একটা ঠেলা তুলে এনে বললাম, “ঋতি, আমি জয়…।” দ্বাররক্ষীর মতো দাঁড়িয়ে থাকা ওই মহিলার মনোযোগের ফাঁক কাজে লাগিয়ে চৌকাঠটা পেরিয়ে দু’পা ভিতরে ঢুকে এলাম আমি। “জয়… জয়দীপ, চিনতে পারছ তো, নাকি?”

কথা বন্ধ হয়ে গেছে যেন ঋতির, নিশ্চল দাঁড়িয়ে আছে। আমি আরও তিন-চার পা এগিয়ে যাই, “কী হল, চিনতে পারছ না নাকি? বেশ খানিকটা মুটিয়ে গেছি, কিন্তু এতটাও পালটাইনি মনে হয়, কি বলো?”

দেহাতি মহিলা চেঁচিয়ে ওঠে, “কী হল? ভিতরে ঢুকে এলেন কেন?”

বলতে বলতে গেটের কাছে একজন বেশ ষণ্ডা চেহারার লোক এসে ঢুকল। মোটা গোঁফ, একেবারে অবাঙালি চেহারা। মহিলার গলার উদ্বেগ আর মুখ চোখের ভাষা বুঝে বলল, “কী হল? কী হল দাদা? অন্দর কিঁউ ঘুস আয়ে?”

“আরে তোমাদের চিন্তা নেই, আমি এঁদের পরিচিত, হমারা পহেচান বহুত পুরানা হ্যায়। চিন্তা নেই, আমি চোর-ডাকাত না।” হাত নেড়ে ওদের দু’জনকে বলে উঠি আমি।

“কী হল দিদি? কী বলছেন, আপনি ইনাকে চিনেন?”

“হ্যাঁ চিনি। ঠিক আছে দুলারির মা, অসুবিধে নেই। তোমরা যাও, আমি কথা বলছি।”

মহিলা আড়চোখে একবার তাকিয়ে এগিয়ে গেল লোকটার দিকে। আমি এগিয়ে গেলাম আরও দু-পা। আচমকা চরম অপ্রত্যাশিত কিছু দেখলে মানুষের হয়তো এমনই হয়, আপাদমস্তক যাকে বলে এক রকম ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে যেন ঋতি। ঘোরটা কাটাতে কিছুটা নড়ে ওঠে, সামান্য নড়ে ওঠে দুটো পাতলা ঠোঁট, “তুমি… তুমি হঠাৎ?”

“হ্যাঁ হঠাৎই।”

“এখানে কোথাও এসেছিলে? সমরেশ জেঠুদের বাড়িতে…?”

“না, সরাসরি এখানে, একেবারে তোমাদের এখানেই। মাস্টারমশাই গত হয়েছেন শুনে আমি তো একেবারে স্তম্ভিত। কী হল? না, মানে ইয়ে, কী হয়েছিল…?”

“কিডনির সমস্যাটা তো ছিলই, ডায়ালিসিস চলছিল। তারপর হঠাৎই খুব অবনতি। ওই আর কী, যা হয়…।”

“ওফ্, ভাবতে পারছি না। ভেবেছিলাম ওঁর সঙ্গে দেখা হবে।”

“কী আর করা যাবে, মেনে নিতে হবে …।” স্বর চেপে আসে ওর।

“হ্যাঁ, সে তো ঠিকই। না মেনে আর উপায় কী থাকে?”

“হুম।” বড় একটা নিশ্বাস ফেলল ঋতি। বড্ড বেশিই নিস্তব্ধ লাগে চারপাশ। কৃষ্ণপক্ষের নিবিড় ঘন রাত। বছরের এই তিথিতেই বোধহয় অন্ধকার ঘনতম, তাই চারদিকে এত আলোর আয়োজন। আকাশে তারা নেই, সব যেন মাটিতে নেমে আসে আজ।

এই নীরবতা ভাঙার কোনও দায় নেই ঋতির, ভাঙতে হলে সেই আমাকেই ভাঙতে হবে, “এমনি সব ঠিক আছে তো, নাকি?”

“হ্যাঁ এক্কেবারে।”

“এখন কি তুমিই গান শেখাও?”

“হ্যাঁ। শেষদিকে কাকামণি তো আর গাইতে পারত না, তখন থেকে অগত্যা আমিই…।”

“তুমিই তো শেখাবে, তুমিই তো ওঁর যোগ্য উত্তরসূরি। বিন্দুমাত্র অতিরঞ্জন ছাড়াই বলছি, আমি সারা ভারতবর্ষের অনেক জায়গায় ঘুরেছি, অনেক আচ্ছা আচ্ছা গায়ক-গায়িকাদের গান শুনেছি। কিন্তু তোমার মতো নিখুঁত সুর লাগাতে খুব কম জনকেই দেখেছি।”

“না না, ছি ছি, কী যে বলো! আমি আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করি। কিন্তু জানি, তেমন কিছুই পারি না।”

“সে তুমি যাই ভাবো… ভাবলেই তো হল না, বাস্তব তো বাস্তবই।”

“কী জানি!” ঠোঁটের কোণটা সামান্য মোচড়ানো এই হাসিটা যেন প্রসঙ্গটা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা।

“না না, সিরিয়াসলি। তোমার এই ইমপেকেবল সুর লাগানোর ক্ষমতাকে আমি চিরকালই কুর্নিশ জানিয়ে এসেছি। দিল্লিতে আমার ছাত্রছাত্রীদের কতবার যে তোমার কথা বলেছি। তোমার গাওয়া কিছু খেয়াল, ঠুংরি আমার কাছে রেকর্ড করা ছিল, ওদের শুনিয়েছি।” এরপর স্মিত হেসে বলি, “মুখ ফুটে না বললেও এই ব্যাপারে অন্তত তোমায় গুরু বলে মেনেছি, আবার কখনও কখনও ঈর্ষাও করেছি। ঈর্ষা কোনও কোনও ক্ষেত্রে পরম সম্মান তৈরি করে, অস্বীকার করতে পারো না নিশ্চয়ই।”

আগের মতোই মৃদু সৌজন্যের হাসি হাসে ঋতি। ভাবটা স্পষ্ট, এসব কথা অবান্তর, এসব কথা বলে আর কী হবে। মাথা তুলে তাকিয়ে বলে, “বসবে না?”

“হ্যাঁ, সেই জন্যই তো এত দূর থেকে এসেছি। সত্যি কথা বলতে কী, তোমার সঙ্গে দু’দণ্ড কথা বলার জন্যই এসেছি। মাস্টারমশাইয়ের আশীর্বাদ চাইতে তো এসেইছি, কিন্তু মূলত তোমার জন্যই আসা, একেবারেই তোমার জন্য।” বলেই অপরাধীসুলভ কুতকুতে চোখে তাকাই।

অপাঙ্গে তাকায় ঋতি, “আমার জন্য? কেন, হঠাৎ আমার জন্য কেন?”

“হঠাৎ কিছুই না, হঠাৎ কিছুই হয়নি। শেষ দশটা বছর খালি এমন একটা মুহূর্তের কথাই ভেবেছি। কিন্তু বিশ্বাস করো, এমনভাবে জড়িয়ে ছিলাম, নানা ঘটনা-দুর্ঘটনা, চাপ-ব্যস্ততা, দায়দায়িত্ব নিয়ে এমন জেরবার হয়ে ছিলাম যে, বারবার চাইলেও শেষমেশ বেরিয়ে পড়তে পারিনি। সর্বোপরি ভয়ানক একটা লজ্জা, ভীষণ একটা পাপবোধ, দারুণ এক সংকোচবোধ সব সময় আমার রাস্তা আটকে দাঁড়িয়েছে, কিছুতেই আমায় এদিকমুখো হতে দেয়নি।”

“কেন, কীসের পাপ? কীসের লজ্জা?’’ পৌঠেটার দিকে এগোতে এগোতে অবলীলায় বলে ঋতি।

ছোপ খেয়ে দাঁড়াই, বেশ দু’পা পিছিয়ে পড়ি, “ঠিক আছে, ঠিক আছে। তুমি না চাইলে ওইসব অনভিপ্রেত কথা তুলব না। না তোলাই ভাল, কাল উৎসবের দিন, আজও সুন্দর একটা দিন। তা ছাড়া এতদিন পর দেখা, কী যে ভাল লাগছে…।”

বারান্দার সিঁড়িতে পা দিয়ে পিছন ফেরে ও, “না না, সত্যিই আমি বুঝতে পারছি না পাপবোধ, লজ্জা এসবের প্রসঙ্গ উঠছেই বা কেন? তুমি একজন স্বাধীন, স্বতন্ত্র মানুষ, তোমার ইচ্ছা-প্রয়োজন-বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী সেই পরিস্থিতিতে যেটা ভাল মনে হয়েছে, করেছ। তাতে নিজেকে অপরাধী ভাবার তো কোনও কারণ দেখছি না!”

ওর পিছন পিছন কড়িবরগায়ালা সেই বিশাল দালানঘরটায় ঢুকলাম। সদর দরজার উপরেই টাঙানো রয়েছে মাস্টারমশাইয়ের গুরুগম্ভীর মুখের একটা ছবি। কেমন যেন খর চোখে তাকিয়ে আছেন আমার দিকে, মুখের পেশিগুলো টানটান। বেঁচে থাকলে আজ অবশ্য এর চেয়েও ভয়ানক দৃষ্টিতে তাকাতেন। চোখের কোণ আরও ধারাল, ঠোঁটের কোণে তীব্র শ্লেষ… আর তাতেই কেঁপে উঠত আমার শিরদাঁড়া। যথারীতি তুতলে উঠতাম, “না মানে মাস্টারমশাই, ইয়ে মানে, আসলে যেটা হয়েছিল, বিশ্বাস করুন আমি কিন্তু…।”

মানুষটা এমনিতে ছিলেন নিরীহদর্শন, ফতুয়া-ধুতি পরা বেঁটেখাটো নম্রভাষী। কিন্তু গানের ক্লাসে রীতিমতো এক প্রকার ত্রাস। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে পাণ্ডিত্য ছিল অগাধ। প্রখ্যাত সঙ্গীতবেত্তা অমিয়নাথ সান্যালের ছাত্র, পাশাপাশি এস্রাজ, বেহালা, সারেঙ্গী তিনটে যন্ত্র বাজাতে পারতেন সমান দক্ষতায়। হারমোনিয়াম বস্তুটাকে মোটে পছন্দ করতেন না। নিজে বসতেন এস্রাজ নিয়ে আর আমাদের গাইতে হত তানপুরায়। শুধু এই শহর বলে না, তামাম জেলার লোকজন এই একটা ব্যাপারে অন্তত একমত ছিল, ক্লাসিক্যাল গানবাজনা ঠিকঠাক শিখতে গেলে তোমাকে আশু অধিকারীর কাছে যেতেই হবে।             

আমার পায়ের নীচের এই ঠান্ডা স্যাঁতসেঁতে লাল মেঝেতেই শতরঞ্চি পেতে ক্লাস বসত মাস্টারমশাইয়ের। প্রায় তিরিশ ফুট লম্বা, বিশ ফুট চওড়া এই ঘরে গিজগিজ করত ছাত্রছাত্রী। আশুদার ক্লাস বলতে তখন সে এক ভয়ানক ব্যাপার। ঘরটার বাইরে এলে এমন অমায়িক ভদ্রলোক আর দুটি হয় না। কিন্তু ক্লাস শুরু হলেই যেন আপাদমস্তক আর একটা লোক। জিভ তো না, আস্ত চাবুক। সামান্যতম সুরচ্যুতিও পৌঁছে যাবে খাড়া কানে আর কপালে জুটবে অবধারিত কষাঘাত। প্রত্যেকের কাছ থেকে আলাদা আলাদা করে হোমটাস্ক নিতেন, শ্রুতিকটু রকমের ভুলচুকের ক্ষেত্রে কপালে জুটত সর্বসমক্ষে তীব্র ভর্ৎসনা, কাউকে কাউকে তো বাইরে পর্যন্ত বার করে দিতেন। তাঁর সেই এক কথা, মার্গসঙ্গীত হল ঈশ্বরের ভাষা, বিশুদ্ধতম শিল্পরূপ। এখানে কাউকে ছাড়ান নেই, সে তুমি যত বড় ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, নেতা-হাতা, জজ-ব্যারিস্টারের ব্যাটাবেটি হও না কেন। লোকটাকে আমি যমের মতো ভয় করতাম।   

কিন্তু লোকটার একটাই সমস্যা ছিল। খুব বেয়াড়া এক ধরনের ফ্যারেঞ্জাইটিস। এক সময় হয়তো গলা যথেষ্ট ভালই ছিল। কিন্তু আমি যে সময়টা নাগাদ ওঁর কাছে শিখতে যাই, তখন স্বরভঙ্গটা রীতিমতো ভোগাচ্ছে। গলা সব জায়গায় পৌঁছচ্ছে না, অথচ সেই সব সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ণ পরদায় স্বর না লাগলে তো কিছুতেই বোঝানো যাবে না রাগরাগিনীর আন্তরিক সৌন্দর্য। আর সেই সময় থেকেই ক্লাসে ক্রমশ অপরিহার্য হয়ে উঠছিল ঋতির ভূমিকা। আশুবাবু মুখে মুখে সরগম বলে গেলেও সেগুলো কণ্ঠে ধারণ করত ওঁর এই ভাইঝি। সঙ্গীত শেখার ব্যাপারে চরমতম তার নিষ্ঠা আর সূচের মাথার মতো অবিচল একাগ্রতা। ছোট থেকেই কাকার তালিমে এমন উৎকৃষ্টভাবে তৈরি হয়েছে, যে কোনও লেভেলে, তাবড় শিল্পীদেরও পর্যাপ্ত বেগ দিতে পারে। কিন্তু কাকার কঠোর অনুশাসন মেনে তার মঞ্চে ওঠা মানা। রেডিও-টিভিতে অডিশন দেওয়া তো দূরস্থান, ছোটবড় কোনও মিউজ়িক কনফারেন্সেও গাওয়া যাবে না। তাঁর কথা ঋতির কাছে বেদবাক্য… সঙ্গীত হল আত্মউন্মোচনের পথ, মাচায় গেয়ে সস্তা হাততালি কুড়োনোর জন্য আমরা কেউ গান শিখছি না।

লোকটা বলেছিল নিজের কান যতদিন চূড়ান্ত সায় না দিচ্ছে, ততদিন নো স্টেজ, নো কনসার্ট, নো রেকর্ডিং। সেই কথাই শিরোধার্য করে অতিরিক্ত লাজুক, খুঁতখুঁতে আর আত্মসংশয়ী ঋতির আর কোনওদিনই ওই বাড়ির গণ্ডির বাইরে বেরনো হয়নি। অন্তত আমি শেষ যতদিন অবধি দেখেছি, ততদিন তো ভুলক্রমেও না। এখনও মনে হয় না নিজের অবস্থান পালটাতে পেরেছে। এই ঘরের দেওয়ালে সেরকম কোনও ঘটনার কোনও সাক্ষী নেই, হোমরাচোমরা মানুষদের হাত থেকে গলায় মেডেল পরা বা সংবর্ধনা নেওয়ার ছবি-ফবি, এমনকী মিউজ়িক বোর্ড পাস করার ফাইনাল সার্টিফিকেটটিও না, যেসব দিয়ে সাধারণত এই জাতীয় সব সঙ্গীতায়নের দেওয়াল ভরা থাকে।

দেওয়ালগুলোর দিকে তাকিয়ে আমি অর্ধবৃত্তাকারে ঘুরছি, পিছন থেকে একটা বেতের চেয়ার বাড়িয়ে ধরে ঋতি, “বোসো।”

“হ্যাঁ বসছি। তুমি বোসো।”

“হ্যাঁ বসব। দু’মিনিট বোসো, একটু চা করে আনি।”

“প্রশ্নই ওঠে না, এত দূর থেকে এতদিন পর এসেছি, একটা মুহূর্তও নষ্ট করতে পারব না। তুমি বোসো প্লিজ়। আমার সামনে বোসো।”

টেবল থেকে সেকেলে ডিজ়াইনের কালচে চৌকো ফ্রেমের একটা চশমা তুলে চোখে গলায় ঋতি। আঁচলটা গুটিয়ে বসতে যাবে, এমন সময় একটা পাঁচ-ছ’বছরের দু’দিকে ঝুঁটি বাঁধা ছোট্ট মেয়ে দরজাটা ধরে ভিতরে উঁকি মারে। “আয় দুলারি, ভিতরে আয়। ওই দ্যাখ, জানলার কাছে তোর রংমশাল, ফুলঝুরি, তুবড়ি সব এনে রাখা আছে। আজ না কিন্তু, কাল পোড়াবি।” ওকে আদুরে গলায় হাতছানি দিয়ে ডাকে ঋতি। প্রাইভেসিটা নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনায় মুখে কিছু অন্তোষের রেখা ফুটে ওঠে আমার। ব্যাপারটা আঁচ করে ঋতি বলে, “ও থাকলে অসুবিধে নেই। তুমি বলো, কী বলছিলে বলো।”

“হ্যাঁ, যা বলছিলাম আর কী… বাকি সব কথা যদি অনুচ্চারিতও রাখি, কিছু অতি ব্যক্তিগত বিষয়ের পবিত্রতা নষ্ট করতে যদি নাও চাই, তবুও এ কথা তো না বললেই নয় যে মাস্টারমশাই আমার গুরু হলেও গানের অনেক জটিল, সাট্ল, ইন্ট্রিকেট জিনিস আমি তোমার কাছে শিখেছি। যে যাই বলুক সঙ্গীতের অন্দরমহলের এমন কিছু রহস্য আছে, এমন কিছু কৃৎকৌশল আছে, যেগুলো হাতেকলমে না দেখালে কিছুই শেখানো যায় না। মাস্টারমশাই আমাকে খুব স্নেহ করতেন আর সেই জন্যই তোমার কাছে আলাদা ভাবে এসে শেখার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। আজ যার জন্য আমার এত কিছু, যা করে আমার এত নাম-সুখ্যাতি, উপার্জন, প্রতিষ্ঠা, বাঙালি হয়েও দিল্লির মতো জায়গার বুকে শুধু গানের টিউশন করে বড়সড় একটা স্কুল খুলে বসা। এইসব কোনও কিছুই সম্ভব হত না যদি তোমরা না থাকতে। এই বাড়িটার কাছে আমার ঋণ কোনওদিনও শোধ করতে পারব না, অথচ আমি কী করলাম… ভাবলেই লজ্জা-ধিক্কারে খানখান হয়ে যাই।”

“এভাবে ভাবছ কেন? এসব ভেবে কষ্ট পাওয়ার কোনও মানে হয়? গান চর্চা করা, শেখানো এগুলো আমাদের কাজ, আমরা করেছি। এর জন্য কৃতজ্ঞতা চাইতে যাব কেন আর কেনই বা আশা করব তুমি বা কেউ তার জন্য আজীবন ঋণী থাকবে?”

“ব্যাপারটা কি এতই সহজ? বিষয়টা কি এতটাই ক্যাজ়ুয়াল?”

“তা ছাড়া কী? আমি অন্তত সেই ভাবেই নিয়েছি। আমার মনে হয় না ব্যাপারগুলো এর চেয়ে খুব একটা বেশি গুরুত্ব দাবি করে।”

ওর এই ধরনের নির্মোহ, নির্বিকার প্রতিক্রিয়া আমার কাছে বড্ডই পীড়াদায়ক। জানি ভিতরে ভিতরে ও ক্ষুব্ধ, তাই আমার প্রতি এই জাতীয় বিরূপ প্রতিক্রিয়া খুবই স্বাভাবিক। তবে আর যে কেউ এইরকম সুরে কথা বললে মেনে নিতে পারতাম। কিন্তু ও বললে সেটা কী করে মেনে নিতে পারি? ওর প্রতি আমার অধিকারবোধ যে বড়ই তীব্র। আমি যাই করি, যত বড় অন্যায়, অমানবিকতা, প্রবঞ্চনাই করে থাকি না কেন, ও কী করে আমার প্রতি উদাসীন হতে পারে? কাতর হয়ে ওঠে আমার গলার স্বর, “কিন্তু আমরা কী করে অস্বীকার করতে পারি যে আমাদের সম্পর্কটা ছিল একেবারেই অন্য পর্যায়ের? এটা তো যেমন তেমন কোনও রিলেশন না। একেবারেই আলাদা, বিশেষ, বিরল এক ধরনের সম্পর্ক, যার শেকড় ছিল মাটির অনেক নীচ অবধি ছড়ানো। যাই ঘটুক, আমরা যাই করি না কেন, মুখে যাই বলি না কেন, বাস্তবে সেটাকে অস্বীকার করা কি অতই সোজা?”

নিরুত্তর হয়ে তাকিয়ে থাকে ঋতি, শুকনো ঢোঁক গেলার জন্য গলার কাছটা সামান্য নড়ে ওঠে যেন। তারপর চোখটা সরিয়ে নেয় সামান্য, “কী জানি, আমার মাথা থেকে সে সব মনে হয় কবেই বেরিয়ে গেছে। কত পুরনো সব কথা, বেশির ভাগ কথাই আমি ভুলে গেছি। সময় সবই ভুলিয়ে দেয় জয়দীপ। সময় আসলে অতিকায় একটা রোডরোলারের মতো, যার সামনে এবড়োখেবড়ো, উঁচু-নীচু, শক্ত-অশক্ত যা কিছুই আসুক, তাদের উপর দিয়ে গড়িয়ে গিয়ে সে সবকিছু সমান, মসৃণ, সহজ করে নেয়।”

“সে যাই হোক, কিন্তু ভুলে গেছ মানে? ওইসব দিন ভোলা যায় নাকি? ভোলা কী করে সম্ভব বলতে পারো? না না, আমি বিশ্বাস করি না। আমাদের দু’জনের কারও পক্ষেই আদৌ এটা কোনওদিন সম্ভব বলে বিশ্বাস করি না।” কতকটা যেন অবিশ্বাসের সুরে, শিশুসুলভ জেদে বলে উঠি।

“বিশ্বাস না করলে আর কী করতে পারি বলো, কীই বা আর করার থাকে?”

“কী করার থাকে বলতে… ?” অস্থির হয়ে উঠি, স্খলিত শোনায় উচ্চারণ, “হ্যাঁ ঠিকই, সে তুমি বলতেই পারো যে তুমি ভুলতে পারো। আমি পারি না। মনে থাকলে তুমি কি ওই ভাবে পালাতে পারতে? একবারের মতো এসে সামনে দাঁড়িয়ে যেখানে খুশি যেতে পারতে না? যাওয়ার পর ভুলেও কি একটা চিঠি বা ফোন করে খোঁজ নিতে না? জানি দোষটা পুরোপুরিই আমার, আমার অপরাধের কোনও মার্জনা হয় না, তবু…।”

“থাক না, ওইসব কথা থাক না।” হাত তুলে বাধা দেয় ঋতি, “ওসব কথা তুলে আর কী হবে, ওসব কথার আর তো কোনও মানে নেই।”

“মানে? কোন মানের কথা বলছ? আমার কাছে এখনও বিষয়টার মানে যে ঠিক কী, সেটা যদি বোঝাতে পারতাম! মাস্টারমশাই ঠিকই বলতেন, মানুষের ভাষা খুবই অক্ষম একটা জিনিস, যা বলতে চাই তার প্রায় কিছুই বোঝাতে পারি না। কী বলতে চাইছি, আর কী বোঝাচ্ছি জানি না।” ডান হাতের তালুতে কপাল পেতে দু’পাশে দুলিয়ে মাথা তুলি, “হঠাৎ করে চলে গিয়েছিলাম ঠিকই। শেষ কুড়িটা বছর কোনও যোগাযোগ ছিল না। কিন্তু তার মানে কি এই তুমি আমার সঙ্গে ছিলে না? প্রতিটা দিন ছিলে, প্রতি পলে। আসলে তুমি তো নিছক রক্তমাংস নও যে আলাদা করে জায়গা দিতে হবে। তুমি তো আমার প্রতিটা স্নায়ুতে ছিলে, মগজের প্রত্যন্ত সব কোষ কলাতেও। যেখানেই থাকি, যত দূরেই থাকি সেই সন্ধেগুলো কোনওদিনও আমার পিছু ছাড়েনি। খোলা জানলার ওপারে বিকেলের আলোয় বিন্দু বিন্দু কালির ফোঁটার মতো অন্ধকার মিশছে আর চিলেকোঠার ওই ঘরটায় বসে তুমি আমায় সন্ধিপ্রকাশ রাগগুলোর সূক্ষ্ণাতিসূক্ষ্ম ফারাক চেনাচ্ছ, মনে পড়ে…?”

অদ্ভুত চোখে তাকায় ঋতি, ঠোঁটের আশপাশে জেগে ওঠা ওগুলো কি কৌতুকের গুঁড়ো? অসহায় চোখে তাকাই, “নিশ্চয়ই ভাবছ কাব্য করছি। অসার, অর্থহীন এইসব কথার কথা বলে কী হবে? নিশ্চয়ই ভাবছ, আমি কি অতই স্থূল, নির্বোধ মহিলা যে এইসব বলে আমায় ভোলানো সম্ভব?”

“না না, আমি তেমন কিছুই ভাবছি না। তুমি বলো না, বলো।” এমন ভাবে বলল যেন আমি এসব ছাঁইপাশ যা-ই বকে যাই না কেন, ওর তাতে কিছু এসে যায় না। অনেকদিন পর এখানে এসে খুব স্বাভাবিকভাবেই আমি হয়তো একটু ভাববিহ্বল হয়ে পড়েছি, তাই ভাবমোক্ষণের স্বার্থে যা মনে আসে আমায় বলতে দেওয়া দরকার। আমি বলে যাই আর ও ফ্যাকাশে, নিষ্প্রাণ সাদা পাথরের মূর্তির মতো নিরুত্তর তাকিয়ে থাকে।

এই চৌহদ্দির মধ্যে ঢোকার পর আনচান করে উঠেছে পাঁজরের ভিতরটা, শ্যাওলাটে এই চাতাল ফাটিয়ে কত চাপা পড়ে থাকা ছবিরা মাথা তুলছে। সব কথাই যে ওর জানা, তা তো হতে পারে না। ওর নিস্পৃহ মুখের সামনে ক্রমশ নিরুপায় হয়ে এক সময় বলে ফেলি সেই কথাটাও, যেটা ওর জানার কথা নয়। আমি চলে যাওয়ার পর ভয়ানক ক্ষুব্ধ আশু অধিকারী যদি ওকে না বলে থাকেন, তা হলে ও কী করে জানবে সেবার অগ্নাশয়ের অপারেশনের আগে নার্সিংহোমের বেডের পাশে ডেকে নিয়ে মানুষটা আমার কাছে কী চেয়েছিলেন? দাপুটে লোকটা আমার দু’হাত ধরে কাঁচুমাচু মুখে বলেছিলেন, তিনি আমার কাছে আজীবন কৃতজ্ঞ থাকবেন আমি যদি তাঁর ভাইঝি ঋতিকে বিবাহ করে ভবিষ্যতে তাঁকে কন্যাদায় থেকে মুক্ত করি। আমি রাজি হয়েছিলাম আর অম্লানবদনে জানিয়েছিলাম, “সে আমার পরম সৌভাগ্য।” কিন্তু তারপরেও আমি এ কী করলাম! দুঃস্বপ্নেও ভাবিনি এমন কিছু একটা করে বসব একদিন। কিন্তু কোথা থেকে যে কী হয়ে গেল!  

এমন গুরুতর কথা শুনেও সামান্যতম বিচলিত দেখায় না ঋতিকে। চোখ মুখের পাথুরে ভাবটায় চিড় ধরে না এতটুকুও। একটি শব্দও উচ্চারণ করে না ভুলেও। ওর নিশ্চয়ই আমার মতো ভ্রষ্ট মানুষের মুখ থেকে এসব কথা শুনতে মোটেও ভাল লাগছে না। এই প্রতিক্রিয়াহীনতাই হয়তো ওর সচেতন উপেক্ষা। এই শীতলতার চেয়ে বেশি কীই বা আশা করতে পারি আমি? চরম নির্ভরতার ছাপ মারা চকচকে কয়েনটার উলটোপিঠের এই নিরুচ্চার ঘৃণা ছাড়া কীই বা বরাদ্দ থাকার কথা ছিল?    

কুড়িটা বছর কম সময় না, এর মধ্যে বাইরের পৃথিবীটা কত বদলে গেছে, ভিতরেরও। আমি সদ্য পঞ্চাশ ছুঁয়েছি। ঋতি আমার চেয়ে তিন বছরের ছোট। রূপবান বলে আমার যে সুখ্যাতি ছিল, কোথা থেকে সুপ্রচুর মেদ এসে জুটে প্রচ্ছন্ন সেই অহমের সিংহভাগ ধুলোয় লুটিয়ে দিয়েছে। কিন্তু ঋতি সেই এক। বয়সের কারণে গাল, চোখের নীচগুলো কিছুটা ফুলেছে, কিন্তু শরীরে উন্নতি বা অবনতির কোনও চিহ্নই নেই। শুধু সেই সময় খুব মুখচোরা ছিল, অপ্রতিভ, সব কিছুতেই কেমন যেন নার্ভাস, অনেকটা আনস্মার্টও। কিন্তু আজ তার মুখের সেই কাঁপা কাঁপা রেখাগুলো অনেক শক্ত হাতে বাঁধা, তাকানোয় অনমনীয় এক প্রকার দৃঢ়তা, কঠোর কোনও ব্রতধারিণী তপস্বিনীর মতো মৌন সংযমী মুখচ্ছবি। এহেন আত্মসমাহিত পরিপক্কতার পাশে নিজেকে সহসা বড্ড অগভীর, পলকা লাগে আমার।

“আমি জানি তুমি কিছুই বলবে না। তুমি মিতবাক, সম্ভ্রান্ত স্বভাবের মেয়ে। তাই এই নীরবতা দিয়ে আজ আমায় প্রত্যাখ্যান করবে। ঠিক করবে, এটাই আমার প্রাপ্য ছিল। এই আমার কৃতকর্মের উপযুক্ত শাস্তি। আমি মাথা পেতে তোমার দেওয়া এই সাজা গ্রহণ করলাম। পারলে আমায় ক্ষমা কোরো।”

নিশ্চল বসে ছিল ঋতি। নড়েচড়ে উঠল শুনে, “এসব কী বলছ? কীসের শাস্তি, কেন শাস্তি? আমার নীরবতা একান্তই আমার সমস্যা। একে নিজের মতো ধরে নিয়ে নিজের ঘাড়ে এইভাবে দায় টেনে নেওয়ার মানে কী? আমি তো তোমায় কোনও দোষারোপ করিনি, তুমি কেন এভাবে ভাবছ?”

“আর কীভাবে ভাবব? কী হয়েছিল, কেন হয়েছিল, কী পরিস্থিতি ছিল সে তো কেবল আমি জানি। আর জানি বলেই বলছি, সবটার জন্য আমি দায়ী। তোমার এই পরিণতি, এই নিঃসঙ্গ জীবনের জন্য শুধু আমি দায়ী।”

“একেবারেই না, যা হয়েছে তার দায় তোমারও না, আমারও না। আমার ধারণা এটা একদিন না একদিন হতই। আজ না হয় কাল হতই।”

“কেন, এমনটা বলছ কেন?” সামনে এগিয়ে আসি বেশ খানিকটা।

“দ্যাখো, জোর করে বা বাধ্যবাধকতার মধ্যে কাউকে কিছু করানোয় আমি বিশ্বাস করি না। আর সব শোনার পর আজ আরও বিশ্বাস করতে পারছি না যে, সম্পর্কটা ওই ভাবে ভেঙে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য একা দায়টা তোমার।”

ভ্রু কুঁচকে তাকাই আমি, ওর চোখজোড়া কৌণিক ভাবে সরে যেতে থাকে জানলার দিকে। “তোমার সমস্যাটা আমি বুঝি জয়, হাজার হোক তুমি তো মানুষ, আর দশটা মানুষের মতোই রক্তমাংসের মানুষ। আজ থেকে কুড়ি-পঁচিশ বছর আগে তুমি তখন টগবগে তরুণ, যৌবন মধ্যগগনে, রক্তে ঢেউ তোলা সেই সময়টা তোমার মতো তরতাজা এক পুরুষের কাছে কেমন হতে পারে তার কিছুটা আন্দাজ আমি করতে পারি। আর তার উলটোদিকে আমি সিড়িঙ্গে রোগা, হাড় জিরজিরে, ফ্যাকাশে, রক্তশূন্য কৃকলাস…।”

“তাতে কী এসে যায়? তুমি তো সাধারণ মানবী নও, তুমি তো যাকে বলা যায় গন্ধর্বকন্যা। অমন উৎকৃষ্ট যার কণ্ঠ-বাদন, সে কেন নিছক একটা স্থূল শরীর হতে যাবে? সে তো মূর্তিমান আত্মা, বিরলতম সুন্দর এক আত্মা। যার গলায় তুলে নেওয়া সুর শুনলে চোখ বন্ধ হয়ে আসে, চোখ খুলে তাকে দেখতে যাব কেন?”

“কিন্তু কী আর করা যাবে বলো, আমাদের এই জীবন তো আর শিল্পের মতো উর্ধ্বলোকের বিষয় না, এ ঘোর জৈবিক। দুর্ভাগ্য হলেও এখানে যে আমাদের সব কিছুই চোখ খুলেই পেতে হয়, আর সেখানেই যে আমার সংকট। চোখ খুললে যে আমি প্রায় না থাকার মতোই জয়, চোখ খুললে যে আমি আর মোটেও শিল্পিত থাকি না।”

“কী বলছ এসব?”

“খুব ভুল বলছি কি? সত্যিটাকে সহজভাবে নেওয়াই তো ঠিক, জীবন যেমন, তেমন ভাবেই।” করুণ চোখে তাকায় ঋতি, ঠোঁটের কোণে মুচড়ে ওঠে ম্লান হাসি, “শিল্প তো কয়েক মুহূর্তের। কিন্তু জীবন যে দীর্ঘ। আর সেখানে যে আমি পা থেকে মাথা পর্যন্ত সরলরেখায় আঁকা একটি মেয়ে। শরীর রমণীরই, কিন্তু সেখানে যে কিছুমাত্র রমণীয়তা নেই। সেখানে যে কোনও উত্থান নেই, পতন নেই, ঢাল-বাঁক-বিভঙ্গ কিচ্ছুটি নেই।”

হাত বাড়িয়ে বাধা দিয়ে যাই, কিছু একটা বলতে মুখ খুলি, কিন্তু কথা বেরয় না। ঋতি বলে, “তোমরা বলো আমি নাকি নির্ভুল সুর লাগাতে পারি, প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে পারি সুরে। কী জানি, হয়তো পারি। যখন গাই ‘পিয়া কি নজ়রিয়া জাদুভরি, মোহ লিয়ো মন প্রেম ভরি…’ প্রাণপণ চেষ্টা করি সেই জাদুটাকে ধরতে। কিন্তু স্বর দিয়ে যা ধরতে যাই, জীবন দিয়ে যে পারি না। আমার চোখে কোনও জাদু নেই, দেহে কোনও ভাষা নেই, আবেদন নেই। সঙ্গীতের বাইরে আমি কোনও কলা বুঝি না, আমি যে খালি ধ্বনিতে তরঙ্গ তুলতে পারি, জীবনে যে পারি না।”    

“পারতেই হবে কে বলেছে? কোন মানুষ সবটা পারে? প্রকৃতি ক’জনকেই বা সবটা দেন?”

“কিন্তু মানুষের যে সবটাই চাই।” কেঁপে ওঠে ওর গলা, কেঁপে ওঠে আমার মেরুদণ্ড। “না না, তাতে আমি দোষ দেখি না। তাতে কোনও দোষ নেই। আমি বুঝি, মানুষ হয়ে মানুষের অসহায়তাগুলো বুঝি। কী করবে, মানুষের যে একটাই জন্ম, একটাই মৃত্যু। তাকে যে যা পাওয়ার এর ভিতরেই পেতে হবে। শেষ বিন্দু অবধি সবটুকু এই জীবনের মধ্যেই পেতে হবে।”

চোখ সরিয়ে নেয় ঋতি, চুপ করে থমকে থাকে। হেঁট হয়ে আসে আমার মাথা। এক ভাবে মাথা ঝুলিয়ে বসে থেকে বেশ কিছুক্ষণ পর তুলি। গলা শুকিয়ে কাঠ, তবু বলে উঠি, “কী করব ঋতি? আমি চাইনি, কিন্তু দিস ইজ় আওয়ার ড্যাম ব্লাডি লাইফ! ঠিকই বলেছ। এই জৈব জীবন সে এক বিষম বস্তু, পশুবৎ হাড়মাংসের দলা এই শরীর! আমি প্রলোভন এড়াতে পারিনি। আমার চোখ ধাঁধিয়ে গিয়েছিল। সেবার দুর্গাপুজোয় দিল্লিতে অনুষ্ঠান করতে গিয়ে ওই রকম ঝাঁ চকচকে বৈভবের জীবন দেখে আমার কেমন যেন মাথা ঘুরে গিয়েছিল। মনে হয়েছিল উপযুক্ত জীবন যদি কোথাও থেকে থাকে, তা হলে তা এখানেই। ওখানে ক্লাস করানোর প্রস্তাবটা চিত্তরঞ্জন পার্কের ওই পুজোর উদ্যোক্তাদের অন্যতম একজন, ত্রিদিব করগুপ্তই দিয়েছিলেন। দেখি না কী হয় ভেবে প্রথম একটা মাস শেখাতে বসে জীবনে সেই প্রথমবার মনে হয়, এখানে বেঁচে থাকা সহসা কী বিপুল সম্ভবনাময়।   

এখানে থাকতে যে আমি নিজেকে প্রকাণ্ড একটা ফেলিয়োর ছাড়া কিছু ভাবতে পারত না, সে আচমকা ওখানে গিয়ে যেন প্রথম সাফল্যের স্বাদ পেল। তুমি জানো আমার বাবা একজন সফল উকিল আর কাকা-জ্যাঠারা কেউ ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, অধ্যাপক, চাটার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট। খুড়তুতো-জেঠতুতো দাদা-ভাইদের সবার কেরিয়ারই প্রায় আকাশছোঁয়া। তাই এখানে থাকতে দিনরাত হীনমন্যতায় ভুগে কুঁকড়ে থাকতাম আমি। কিন্তু চিত্তরঞ্জন পার্কে সেটল করার পর একের পর এক দরজা খুলে যেতে শুরু করে আমার সামনে। মনে হয় যেন পুনর্জন্ম হয়েছে, না হলে এত আলো, এতো সুবাতাস আসছে কোথা থেকে! মনে হতে শুরু করে আমিও পারি, একদিন আমিও সবাইকে দেখিয়ে দেব।

সাফল্যের রাস্তা… সেও এক ভয়ানক জায়গা ঋতি। এখানে শুধু সামনে এগোতে হয়, ভুলেও কোথাও না থামাই দস্তুর সেখানে। সেখানে ফিরে তাকাতে নেই, পিছন ফিরে দেখতে নেই। ভাবতেই পারিনি আমারও কোনওদিন এত চাহিদা হবে, দিল্লির মতো জায়গায় নিজের একটা স্কুল শুরু করতে পারব। আর সেই সূত্রেই ঘনিষ্ঠতা মৌলির সঙ্গে, ওদের জমিটা প্রায় জলের দামে না পেলে হয়তো অত তাড়াতাড়ি কিছুই ঘটাতে পারতাম না। সেক্ষেত্রে তাই অস্বীকার করতে পারি না ওর বাবা সুনীল মুখোপাধ্যায়ের অবদান। মৌলির সম্পর্কে আর কী বলব, একপলকে ওকে মনে হয়েছিল ঝলমলে আলোর মতো বা এক দমকা ফুরফুরে হাওয়া। সুন্দরী, আধুনিকা, একাধিক ভাষা জানা, নৃত্যপটিয়সী, দুর্দান্ত ব্যবসায়িক বুদ্ধিসম্পন্না একটি মেয়ে। ডান্স আর মিউজ়িক নিয়ে কোলাবরেশনে দারুণ লাভজনক একটা ব্যবসা ফাঁদি আমরা, বিয়ে করি, কিন্তু বছর দশেকের মধ্যে পুরোদস্তুর বুঝতে পারি উই আর নট মেড ফর ইচ আদার। ফলে অনিবার্য ডিভোর্স। ভাগ্যিস আমরা সন্তান নিইনি। নিলে সেটা আরও এক দুঃস্বপ্ন হত, সন্দেহ নেই। যাই হোক, যা হওয়ার তা হয়েছে, হয়তো আমাদের জন্মের আগেই সব এইভাবেই লিখে রাখা ছিল।”

ফুসফুস খালি করে শ্বাস ছাড়ি, কিছুক্ষণ মাথা ঝুলিয়ে চুপচাপ বসে থাকার পর বলি, “ভবিতব্যে বিশ্বাস করো ঋতি?”

“না। তবে কেমন যেন মনে হয় সবটা মানুষের হাতেও থাকে না।”

“জানি না, হতে পারে। আর তাই বোধহয় জীবনের ভুলচুক সব শেষ অবধি ক্ষমার্হ, নাকি?”

“হবে হয়তো।”

লম্বা ঘরটায় আড়াআড়ি পায়চারি করতে করতে বাঁক নিই আমি। “আচ্ছা, আজকের আমি আর সেদিনের আমি কি এক? না, মানে কোনও মৌল ফারাক কি আছে, নাকি সেই একই, আদি অকৃত্রিম?”

“ফারাক তো থাকবেই, যেমন এই আমিও আর সেই আমি নই। সেই মেয়েটা নির্বোধ ছিল, সেই মেয়েটার চোখে অনেক ধাঁধা ছিল। কিন্তু এখন সে সব জিনিস অনেক স্পষ্ট দেখে।”

“আমারও তাই। আসলে তাকানো আর দেখা তো এক জিনিস নয়। তখন হয়তো তোমার দিকে লক্ষবার তাকিয়েছি। কিন্তু একবারও দেখা হয়নি। কী করে দেখব? তখন তো আমি দেখতেই জানতাম না।”

ধীরে ধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় ঋতি। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াই আমি, “আসলে তখন মনে হয় আমার মধ্যে তোমাকে বোঝার ম্যাচিয়োরিটি আসেনি। সুর গলায় নিয়েছি, কিন্তু তার মর্ম বুঝিনি। যা আপাদমস্তক একটা মন, সেখানে শরীর খুঁজেছি। আর সেই ভুল হবে না। শরীর পেরিয়ে তোমার কাছে এসেছি ঋতি। এখন আমি শরীরের অসারতা বুঝি।”

চোখ তোলে ঋতি, মাটির প্রদীপের স্নিগ্ধ আলোর মতো তাকায়। সাহস করে চোখে চোখ রাখি, “মনে আছে তোমায় কী বলে ডাকতাম?”

“হ্যাঁ, পূরবী।”

“তোমার গলায় আমার প্রিয়তম রাগ, তাই পূরবী। এমনই কোনও এক সন্ধেয় এই ঘরে বসেই তুমি একদিন গেয়েছিলে, ‘বহর বাজাও বংশী…।’ সুরটা আজও কানে লেগে আছে। সেইদিন শুধু শুনেছিলাম, কিন্তু আজ দেখতে পাই। প্রাণবায়ু দিয়ে শূন্যে আঁকা ছবিটা স্পষ্ট দেখতে পাই। সেদিন তো চোখ ছিল না, কিন্তু আজ আছে। আজ হয়তো আর ভুল হবে না, অশরীরের শরীর চিনে নিতে ভুল হবে না। যদি পারো সেইদিনের জন্য আমায় ক্ষমা কোরো।”

“কীসের ক্ষমা? ক্ষমা করার আমি কে?” মুখটা আষাঢ়ে মেঘের মতো থসথস করছে, গলা আটকে আসে ঋতির।

“তুমি কেউ নও, আর কিছু হও মোটেও চাই না। তুমি আমার সন্ধের রাগিনী।”

আঁচল টেনে মুখের কাছে আনে ঋতি, “সন্ধে কোথায়, রাত হয়ে এল প্রায়। দুলারির মা-কে বলি তা হলে, রাতের খাওয়া সেরেই নয় রওনা দিয়ো।”

“হ্যাঁ সে তো বটেই, তবে কাল সকালে আবার ফিরব কিন্তু।”

“ইচ্ছে হলে ফিরো।”

আচমকা ভয় লেগে গিয়েছিল, দরজার ফ্রেমের ওপার থেকে দু’দিকে দুটো বিনুনি বাঁধা একটা বাচ্চা মেয়ের মাথা ঢুকে আসায়, “মডামদি? দিদি?”

“কী হল দুলারি, কিছু বলবি?”

“বাইরে তো সবাই তুবড়ি-রংমশাল জ্বালাচ্ছে। আমিও জ্বালাব?”

“আচ্ছা ঠিক আছে। কিন্তু আজ বেশি না। আর হ্যাঁ, একা একা নয়, বাবাকে বল ম্যাডাম বলেছে সঙ্গে দাঁড়িয়ে জ্বালিয়ে দিতে।”

“আচ্ছা মডামদি…।”

মেয়েটা নেচে ওঠে, উঠোন বরাবর তিরের বেগে ছুটে যায়।






 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত