দুইশ বছরের ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস

আজ ২৮ নভেম্বর জার্মান সমাজ বিজ্ঞানী, লেখক, রাজনৈতিক তাত্ত্বিক, দার্শনিক এবং মহামতি কার্ল মার্কসের সাথে মার্কসবাদের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ফ্রেডরিখ এঙ্গেলসের শুভ জন্মতিথি। ইরাবতী পরিবারের বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।


 

১.
ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস, জার্মান সমাজ বিজ্ঞানী, লেখক, রাজনৈতিক তাত্ত্বিক, দার্শনিক এবং মহামতি কার্ল মার্কসের সাথে মার্কসবাদের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। সমাজতন্ত্র ও মার্কসবাদের অন্যতম প্রবক্তা ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দের ৫ আগস্ট লন্ডনে মৃত্যুবরণ করেন। মানুষের চিন্তার জগতে আলোড়ন সৃষ্টিকারী মহান এই মনীষীর স্মৃতির প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি। উল্লেখ্য যে, মহান দার্শনিক এঙ্গেলস ১৮২০ খ্রিস্টাব্দের ২৮ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। আমার কাছে প্রকৃত চিন্তন বন্ধুত্বের পরম শ্রেষ্ঠ উদাহরণ মার্কস-এঙ্গেলস জুটির নাম। পুঁজিবাদি সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার নানান প্রতিক্রিয়ায় সৃষ্ট অস্থির সময়ে, সভ্যতার চরম সংকটকালে সরকার ও রাজনীতির একজন উৎসাহী ছাত্র হিসেবে মার্কস-এঙ্গেলস-এর নানা ভাব-ভাবনা আমাকে তাঁদের চিন্তার প্রাসঙ্গিকতা, গুরুত্বকেই বারংবার স্মরণ করিয়ে দেয়। শুরুতেই স্বীকার করতে সংশয় নেই যে, এঙ্গেলস-এর ‘পরিবার ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি’বইটিকে আমার চিন্তাকে জাগ্রত ও প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে অন্যতম ভাবনার খোরাক জাগানো একটি গ্রন্থ হিসেবে বিবেচনা করি। সেই সাথে মার্কসের সঙ্গে যুক্তভাবে রচিত ‘কমিউনিস্ট ইশতেহার’ বইটিও আমাকে জীবন দর্শনকে নিয়ত নাড়া দেয়। মার্কস-এঙ্গেলসকে যতই পড়ি, ততই তাদের চিন্তার নানান বৈচিত্র্য ও গভীরতা আমাকে আকৃষ্ট করে। আমি আরো বেশি পাঠের প্রেরণা অনুভব করি।বিশেষ করে এঙ্গেলস-এর ‘পরিবার ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি’বইটির শিরোনামটিই অনেক কিছু সরাসরি ব্যক্ত করে।

২.
এঙ্গেলস-এর বিষয়ে দর্শনকোষে সরদার ফজলুল করিম যথার্থই লিখছেন, ‘আধুনিক সমাজতন্ত্রবাদী আন্দোলন এবং দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদী দর্শনের প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে কার্ল মার্কসের সঙ্গে ফ্রেডারিক এঙ্গেলস –এর নাম যুক্তভাবে উচ্চারিত হয়। চিন্তা, আদর্শ এবং সংগ্রামী আন্দোলনের ইতিহাসে যৌথ প্রয়াস এবং অবিচ্ছিন্ন সাথীত্বের এরূপ দৃষ্টান্ত খুবই বিরল। জার্মানিতে জন্ম হলেও এঙ্গেলস তাঁর সংগ্রামী জীবনের অধিকাংশকাল ইংল্যাণ্ডে অতিবাহিত করেন। ইংল্যাণ্ড আগমন করেন কার্ল মার্কস-এর (১৮১৮-১৮৮৩) সঙ্গে পরিচিত হবার পর থেকে তাঁর আমরণ সংগ্রামী সাথীতে পরিণত হন। কার্ল মার্কস বিপ্লবী চিন্তা এবং আন্দোলনের জন্য জার্মানির তৎকালীন সামন্ততান্ত্রিক সরকার কর্তৃক বহিষ্কৃত হয়ে ইংল্যাণ্ডে নির্বাসিতের জীবন যাপন করেছিলেন।’ 

৩.
ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস লিখিত ‘দ্য কন্ডিশন অব ওয়ার্কিং ক্লাস ইন ইংল্যান্ড’১৮৪৫ সালে প্রকাশিত হয়, যা ছিল তার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ এবং গবেষণার ফসল।অর্থাৎ তিনি নিজের গভীর প্রত্যক্ষণ এবং ব্যাপক গবেষণার ভিত্তিতে ইংল্যান্ডে শ্রমিক শ্রেণির প্রকৃত অবস্থা প্রকাশ করেন। ১৮৪৮ সালে কার্ল মার্কসের সাথে যৌথভাবে ‘কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার’ রচনা করেন, পরে কার্ল মার্কসকে বহুল সমালোচিত ‘পুঁজি’ গ্রন্থটি গবেষণা ও রচনার জন্য অর্থনৈতিকভাবে সহায়তা করেন। মার্কসের মৃত্যুর পরে তিনি সেই বইয়ের দ্বিতীয় ও তৃতীয় খণ্ড-দুটি সম্পাদনা করেন। তিনি মার্কসের ‘উদ্বৃত্ত মূল্য তত্ত্ব’ বিষয়ের নোটগুলোও একত্রিত করেন এবং এগুলো পরে ‘পুঁজি’র চতুর্থ খণ্ড হিসেবে প্রকাশিত হয়। তিনি পরিবার অর্থনীতি বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তার ‘পরিবার, ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি’ একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। ‘বানর থেকে মানুষের বিবর্তনে শ্রমের ভূমিকা’ রচনা করেও তিনি আলোচিত হন।

৪.
দার্শনিক ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস ১৮২০ খ্রিস্টাব্দের ২৮ নভেম্বর কিংডম অব প্রুশিয়ার বারমেনে জন্মগ্রহণ করেন। এঙ্গেলসের বাবা ফ্রেডরিখ সিনিয়র ছিলেন জার্মানীর এহজন ধনাঢ্য তুলা ব্যবসায়ী। অত্যন্ত রক্ষণশীল এবং গোঁড়া ধর্মীয় পরিবেশে ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস ছোটবেলায় লালিত পালিত হয়েছিলেন। কিন্তু অতিমাত্রায় ধর্মীয় নিয়ন্ত্রণ তাঁর মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খ্রিস্টধর্ম বিশ্বাসে তার চিড় ধরতে শুরু করে। অচিরেই তিনি ধর্মের ব্যাপারে সংশয়ী হয়ে উঠলেন। নিরীশ্বরবাদী চিন্তাধারার ফলে বাবা-মার সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি হয়। ব্যবসা ও রাজনীতির প্রতি তাঁর ছিল বিশেষ ঝোঁক। এ কারণে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়াও ছেড়ে দিয়েছিলেন। ছোটবেলায় তিনি কবিতা লিখতেন, তাও তিনি বাদ দিয়েছিলেন। তিনি পিতার ব্যবসায় হাত লাগাতে লাগলেন এবং তৎকালীন রাজনৈতিক বিষয়ে এবং হেগেলীয় দর্শনের পঠন-পাঠন শুরু করলেন। হেগেলীয় দর্শন অধ্যয়নে তিনি এর বিশেষ ত্রুটিসমূহ লক্ষ্য করতে লাগলেন এবং তাঁর মনে এর বিপুল সমালোচনা জমা হতে লাগলো। তিনি বিভিন্ন বস্তুবাদী দর্শন দ্বারা আকৃষ্ট হতে লাগলেন এবং তৎকালীন কিছু কিছু প্রচলিত সাম্যবাদী চিন্তার সাথে পরিচিত হতে থাকেন, তবে এ সম্পর্কে তাঁর মনে সংশয় দেখা দেয়।

৫.
সরদার ফজলুল করিম লিখছেন, ‘কিশোর বয়স থেকেই এঙ্গেলস চিন্তাধারায় বস্তুবাদী এবং সংগ্রামী অগ্রসর মানুষের পক্ষভুক্ত ছিলেন। ১৮৪২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি জার্মান দার্শনিক শেলিং-এর ভাববাদী দর্শনকে সমালোচনা করে একখানি বই লিখেন। ১৮৪৮-৪৯ খ্রিষ্টাব্দ জার্মানীতে সামন্তবাদের বিরুদ্ধে কৃষক ও শিল্পের শ্রমিকদের বিপ্লবী আন্দোলনের কাল ছিল। এই বিপ্লবী আন্দোলনের পরাজয়ের পরে তিনি দেশ ত্যাগ করে ইংল্যাণ্ড গমন করেন। ধনতান্ত্রিক সমাজের বিকাশে ইংল্যান্ড তখন শীর্ষস্থানে ইংল্যাণ্ডের শিল্পে নিয়োজিত শ্রমিকদের বাস্তব জীবনের সাক্ষাৎ অভিজ্ঞতা এঙ্গেলসকে ধনতন্ত্রবাদের মৌলিক বিরোধ সম্পর্কে নিঃসন্দেহরূপে প্রত্যয়ী করে তোলে। এই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এঙ্গেলস ‘ইংল্যাণ্ডের শ্রমিক শ্রেণীর অবস্থা’ নামে তাঁর অন্যতম বিখ্যাত গ্রন্থ রচনা করেন। ১৮৪৮ খ্রিষ্টাব্দে মার্কসের সঙ্গে যুক্তভাবে তিনি ‘কমিউনিস্ট ইশতেহার’ রচনা করেন। ‘কমিউনিস্ট ইশতেহার’ ছিল তখনকার সাম্যবাদী দলগুলোর ঘোষণাপত্র। কমিউনিষ্ট ইশতেহার তখন থেকে কেবল বিপ্লবী দলের ঘোষণাপত্র নয়, মার্কসবাদী তত্ত্বের স্পষ্টতম এবং অতুলনীয় ঘোষণাসার হিসাবে পৃথিবীময় পরিচিতি আসছে। এঙ্গেলসের আর্থিক আনুকূল্য ব্যতীত মার্কসের পক্ষে ইংল্যাণ্ডে জীবন ধারণ করা এবং তাঁর সমাজবাদী গবেষণা চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ত। পুঁজিবাদী সমাজের বিশ্লেষণ ও সমালোচনার গ্রন্থরাজি হিসাবে মার্কসের ‘পুঁজি’ বা ‘ক্যাপিটাল’ সুবিখ্যাত। এ গ্রন্থসমূহের রচনাতে মার্কস এঙ্গেলসের ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা এবং বাস্তব সাহায্য লাভ করেন। মার্কসের মৃত্যুর পরে তাঁর ‘ক্যাপিটালের’ দ্বিতীয় ও তৃতীয় খণ্ডের সম্পাদনা কাজ এঙ্গেলস সমাধা করেন। এই গ্রন্থের ভূমিকা, ‘এ্যাণ্টিডুরিং’, ‘লুডুউইগ ফয়েরবাক’, ‘পরিবার ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি’ প্রভৃতি গ্রন্থ এঙ্গেলস-এর মনীষার উদাহরণ।’৬.
ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস (জন্ম : ২৮ নভেম্বর, ১৮২০ – প্রয়াণ : ৫ আগস্ট ১৮৯৫) ১৮৪২ সালে প্রুশীয় সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন এবং এক বছর সেখানে চাকরি করেন। এর ফলে বার্লিনে যাওয়া তার সহজ হয়। এখানে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষণগুলোতে উপস্থিত হওয়ার পাশাপাশি তরুণ হেগেলিয়ানদের সান্নিধ্য লাভ করেন। সারা জীবনই এঙ্গেলস নিজের বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষের জন্য জার্মান দর্শনের কাছে ঋণের কথা স্বীকার করেছেন। ম্যানচেস্টারে অবস্থানকালে এঙ্গেলস মেরি বার্নস নামে সংস্কারপন্থী তরুণীর সংস্পর্শে আসেন। মেরির মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাদের সম্পর্ক টিকে ছিল। বিয়ে বিরোধী মানসিকতার কারণে তারা আবদ্ধ হননি। ম্যানচেস্টারের বস্তি পর্যবেক্ষণকালে শিশুশ্রম, দরিদ্র শ্রমিক এবং হাড়ভাঙা খাটুনি ও কম মজুরির মতো বিষয়গুলো তাকে বেশ স্পর্শ করে। এই অভিজ্ঞতা তিনি নিবন্ধ আকারে মার্কসের কাছে পাঠাতেন। এগুলোই পরবর্তীকালে দ্য কন্ডিশন অব ওয়ার্কিং ক্লাসের মতো বিখ্যাত রচনা হয়ে প্রকাশিত হয়। 

৭.
ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস সেনাবাহিনীতে থাকাকালীন অবস্থায় সমকালীন বিশ্বের রাজনৈতিক ও সামরিক নীতি সম্পর্কে বিশেষ জ্ঞান অর্জন করেন। সেনাবাহিনী থেকে ফেরার পরে তিনি তাঁর পিতার নির্দেশে ইংল্যান্ড গমন করেন। তবে এটা ছিল তাঁর পিতার অধীনে স্রেফ কেরানীর চাকরিমাত্র। তিনি প্রায় দুই বছর ইংল্যান্ডে অতিবাহিত করেন। তিনি সেখানে থাকাকালীন কারখানা শ্রমিকদের দুর্দশা সম্পর্কে বিশেষভাবে অবগত হন এবং রীতিমত গবেষণা করে ইংল্যান্ডে শ্রমিক শ্রেণির অবস্থা নামে এক গ্রন্থ রচনা করেন।এই গ্রন্থে তিনি শ্রমিকদেরকে তাঁদের ন্যায্য অধিকার সম্বন্ধে সচেতন করে তোলার চেষ্টা করেন। তিনি আরো দেখান যে, পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় পুঁজিপতি কারখানা মালিকদের দ্বারা শ্রমিকগণ আবশ্যিকভাবেই শোষিত হন। তবে এই ব্যবস্থা বেশিদিন চলতে পারে না, চলা সংগতও নয়। এই ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত মালিক-শ্রমিক দ্বন্দ্বের কারণে তা ভেঙে পড়তে বাধ্য।

৮.
ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস ১৮৪৫ থেকে ১৮৪৭ সাল পর্যন্ত সময়টা এঙ্গেলস ব্রাসেলস ও প্যারিসে কাটান, এবং তাঁর বৈজ্ঞানিক চর্চার সঙ্গে সঙ্গে ব্রাসেলস ও প্যারিসের জার্মান শ্রমিকদের মধ্যে ব্যবহারিক কাজ মিলিয়ে নেন। এইখানে গুপ্ত জার্মান সমিতি কমিউনিস্ট লিগের সঙ্গে মার্কস ও এঙ্গেলসের যোগাযোগ হয়, এ সংঘ তাঁদের ওপর ভার দেয় তাঁদের রচিত সমাজতন্ত্রের মূলনীতি উপস্থিত করার জন্য। এভাবেই জন্ম নেয় ১৮৪৮ সালে ছাপা মার্কস ও এঙ্গেলসের সুবিখ্যাত ‘কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার’। ছোট্ট এই পুস্তিকাখানি বহু বৃহৎ গ্রন্থের মূল্য ধরে সভ্য জগতের সমস্ত সংগঠিত ও সংগ্রামী প্রলেতারিয়েত আজও তার প্রেরণায় সজীব ও সচল। ১৮৪৮ সালের যে বিপ্লব প্রথমে ফ্রান্সে শুরু হয়ে পশ্চিম ইউরোপের অন্যান্য দেশেও বিস্তৃত হয় সেই সময় মার্কস এঙ্গেলস দেশে ফেরেন। সেখানে, প্রুশিয়ার রাইন অঞ্চলে তাঁরা কলোন থেকে প্রকাশিত গণতান্ত্রিক ‘নতুন রাইনিশ গেজেটের’ প্রধান হয়ে ওঠেন। রাইনিশ প্রুশিয়ার সমস্ত বিপ্লবী গণতান্ত্রিক প্রচেষ্ঠার প্রাণকেন্দ্র হয়ে ওঠেন দুই বন্ধু।

৯.
বিশেষ রাজনৈতিক কারণে মার্কস যখন ইংল্যান্ডে স্থায়ী বসবাসের জন্য নির্বাসন নেন, তখন এঙ্গেলসও ইংল্যান্ড চলে আসেন। ব্যক্তিগত জীবনে এঙ্গেলস ছিলেন অত্যন্ত উদার এবং হাসিখুশি ধরনের মানুষ। জীবনে বড় হবার লোভ তাঁর ছিল না। তিনি যা কিছুই করতেন তা কর্তব্য মনে করে বা ভালো লাগার তাগিদে করতেন। মার্কস-এর সহযোগিতা করার মানসিকতা থেকে তিনি দর্শন চর্চা করেছেন বলে স্বীকার করেছেন। মার্কস-এর মৃত্যুর পরেও ইংল্যান্ডে ছিলেন। তবে ১৮৯১ সালে তিনি ম্যানচেস্টার ছেড়ে লন্ডনে চলে আসেন এবং সেখানেই ১৮৯৫ সালের ৫ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন।

১০.
ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস ১৮৭০ সালে লন্ডনে ফেরেন এবং ১৮৮৩ সালে মার্কসের মৃত্যু পর্যন্ত তাদের কর্মভারাক্রান্ত মিলিত মানসিক জীবন চালিয়ে যান। এর ফল হল মার্কসের দিক থেকে পুঁজি আর এঙ্গেলসের দিক থেকে ছোট বড় একসারি বই। পুঁজিবাদী অর্থনীতির জটিল ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ নিয়ে কাজ করেন মার্কস। আর অতি সহজ ভাষায় প্রায়ই বিতর্কমূলক রচনার সাধারণ বৈজ্ঞানিক সমস্যা এবং অতীত ও বর্তমানের বিভিন্ন ব্যাপার নিয়ে ইতিহাসের বস্তুবাদি বোধ ও মার্কসের অর্থনৈতিক তত্ত্বের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে লেখেন এঙ্গেলস। এঙ্গেলসের এইসব রচনার মধ্যে উল্লেখযোগ্য দ্যুরিঙের বিরুদ্ধে বিতর্কমূলক রচনা, পরিবার ব্যক্তি মালিকানা ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি (১৮৯৫), ল্যুদভিগ ফয়েরবাখ (১৮৯২), রাশিয়ার প্রসঙ্গে এঙ্গেলস (১৮৯৪)। মার্কস মারা যান, পুঁজি বিষয়ে তার বৃহৎ রচনা সম্পূর্ণরূপে গুছিয়ে যেতে পারেননি। খসড়া হিসেবে অবশ্যই তৈরি হয়ে গিয়েছিল। বন্ধুর মৃত্যুর পর পুঁজির ২য় ও ৩য় খন্ড গুছিয়ে তোলা ও প্রকাশনের গুরুভার শ্রমে আত্মনিয়োগ করলেন তাঁরই অকৃত্রিম বন্ধু শ্রমিক শ্রেণির মহান শিক্ষাগুরু কমরেড ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস।

১১.
মহামতি মার্কস সম্পর্কে তার মতামত, মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ। যেমন তিনি বলছেন, “সবকিছুর উপরে মার্কস ছিলেন বিপ্লবী। জীবনে তাঁর সত্যিকার লক্ষ্য ছিল পুঁজিবাদী সমাজ ও সেই সমাজ যেসব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জন্ম দিয়েছে যেকোনো প্রকারে তাদের উচ্ছেদে অবদান যোগানো; আধুনিক যে-প্রলেতারিয়েতকে তিনিই প্রথম তার নিজস্ব অবস্থান ও তার প্রয়োজনাদি সম্পর্কে সচেতন করে তুলেছিলেন, সচেতন করেছিলেন তার মুক্তির পক্ষে আবশ্যিক শর্তাবলী সম্পর্কে, তারই শৃঙ্খলমোচনে অবদান যোগানো ছিল তাঁর মূল লক্ষ্য। সংগ্রাম ছিল তাঁর চারিত্র্যবৈশিষ্ট্য। আর এমন প্রচণ্ড আবেগ, নাছোড়বান্দা ভাব আর সাফল্যের সঙ্গে তিনি লড়তেন যার তুলনা ছিল বিরল।” (১৭ই মার্চ ১৮৮৩)

১২.
এঙ্গেলস ‘বানর থেকে মানুষের বিবর্তনে শ্রমের ভূমিকা’য় বলেছেন, “সমস্ত সম্পদের উৎস হলো শ্রম – অর্থতত্ত্ববিদরা একথা বলেন। যে প্রকৃতির কাছ থেকে পাওয়া উপাদানকে শ্রম রূপান্তরিত করে সম্পদে, সেই প্রকৃতির পরেই শ্রমের স্থান। কিন্তু শুধু এই নয়, এর চাইতেও তার গুরুত্ব অপরিসীমভাবেই বেশি। সমস্ত মানবিক জীবনের প্রাথমিক মূলগত শর্ত হলো শ্রম এবং তা এতোটা পরিমাণে যে একদিক থেকে বলতে হবে যে, স্বয়ং মানুষই হলো শ্রমের সৃষ্টি।”

১৩.
এন্টি-ড্যুরিং-এর ভূমিকায় সমাজতন্ত্র বিষয়ে এঙ্গেলস বলছেন,”সমাজতন্ত্র কোনো অলৌকিক প্রাজ্ঞের আকস্মিক আবিষ্কার নয়। সমাজতন্ত্র হচ্ছে ইতিহাসের সৃষ্টি, দ্বন্দ্বমান শ্রেণি: প্রলেতারিয়েত এবং পুঁজিপতির সংগ্রামেরই পরিণাম।”

১৪.
এঙ্গেলস ‘কমিউনিজমের নীতিমালা’য় লিখছেন,‘কমিউনিজম হল প্রলেতারিয়েতের মুক্তির পদ্ধতি সংক্রান্ত মতবাদ।’ আর ‘প্রলেতারিয়েত হলো সমাজের সেই শ্রেণি যে শ্রেণির সদস্যরা সম্পূর্ণ জীবিকার সংস্থান করে কেবল শ্রমশক্তি বিক্রি করে, কোনো রকমের পুঁজির মুনাফা দ্বারা নয়। প্রলেতারিয়েত তাঁদের নিয়েই গঠিত যাদের সুখ-দুঃখ, যাদের জীবন-মৃত্যু, যাদের সম্পূর্ণ অস্তিত্ব নির্ভর করে শ্রমশক্তির চাহিদার উপর_অর্থাৎ ব্যবসায়ের উঠতি-পড়তির পালা বদলের দ্বারা সৃষ্ট অবস্থার উপর, নিয়ন্ত্রণহীন প্রতিযোগিতার খেয়ালখুশির উপর। এককথায় প্রলেতারিয়েত বা প্রলেতারিয়ানদের শ্রেণি হল উনিশ শতকের শ্রমিক শ্রেণি।’

১৫.
সরদার ফজলুল করিম লিখছেন, ‘তাঁর অনবদ্য আকর্ষণীয় রচনা-রীতি মার্কসবাদের সামাজিক বিশ্লেষণ ও দার্শনিক অভিমতসমূহকে জনপ্রিয় করে তুলতে বিরাটভাবে সাহায্য করেছে। তাঁর রচনার বৈশিষ্ট্য এই যে, প্রত্যেক গ্রন্থেই তিনি মার্কসবাদের প্রতিপক্ষীয়দের অভিমতকে খণ্ডন করে ব্যাখ্যার মাধ্যমে মার্কসবাদের তত্ত্বে আপন মনীষার সংযোজন ঘটিয়েছেন। দর্শনের ক্ষেত্রে তিনি প্রচলিত ধারণাকে সমালোচ৬না করে দেখা নযে, দর্শনকে বিজ্ঞানের বিজ্ঞান বা এরূপ অতি-বাস্তব উচ্ছ্বাসমূল আখ্যাদান কৃত্রিম এবং অজ্ঞানতার পরিচায়ক। দর্শন কোনো রহস্যলো কনয়। দর্শনের ভূমিকা হবে জ্ঞান-বিজ্ঞানের সকল শাখাকে সংযুক্ত করে জানার কৌশল উদ্ভাবনে মানুষকে সাহায্য করা, কোনো অতি-বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব আবিষ্কার নয়। তাঁর সমস্ত গ্রন্থেই তিনি যে-কোনো যুগ বা ব্যক্তির দর্শনের শ্রেণীচরিত্র প্রকাশ করার চেষ্টা করেছেন। দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদকে ব্যাখ্যা করে এঙ্গেলস দেখিয়েছেন যে, স্থুল বস্তুবাদ বা ইতোপূর্বকার যান্ত্রিক বস্তুবাদের সাথে দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের পার্থক্য আছে। দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ মনকে যেমন বস্তুর অতিরিক্ত স্বাধীন কোনো সত্তা বলে স্বীকার করে না, মনকে বস্তুর জটিল বিকাশের বিশেষ পর্যায় বলে বিচেচনা করে, তেমনি মনকে অস্বীকারও করে না। বস্তুর সঙ্গে মনের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার সম্পর্ককে সে গুরুত্বপূর্ণ বলে গণ্য করে। সমাজে বিকাশে মানুষের জীবিকার ভূমিকা প্রধান; কিন্তু ইতিহাসে ব্যক্তির ভূমিকাকেও মার্কসবাদে নস্যাৎ করে না। জীবিকা যেমন ব্যক্তিকে নিয়ন্ত্রিত করে, তেমনি আবার ব্যক্তিও তার মস্তিষ্ক ও মনের চিন্তা-ভাবনা দ্বারা সেই বাস্তব জীবিকার অবস্থা পরিবর্তন করার ক্ষমতা বহন করে। এঙ্গেলস-এর রচনাবলীতে বস্তু এবং গতি, সময় ও স্থানের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক জ্ঞানের ক্ষেত্রে বাস্তব অভিজ্ঞতার সাথে মনের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার সম্পর্ক, অজ্ঞেয়বাদের অসারতা, বস্তুর উপাদানের জটিল গঠন এবং তার উন্মোচিত অসীমতা প্রভৃতি বিষয়ের আলোচনা এবং এ সব সমস্যায় তাঁর সুস্পষ্ট মার্কসবাদী অবদানের সাক্ষাৎ পাওয়া যায়।’

 

 

 

(তথ্যসূত্র : দর্শনকোষ, উইকিপিডিয়া, ইন্টারনেট)

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত