ইসলামী উপখ্যানে বন্ধু

নবীজী  ও আবু বকর

রাত তখন গভীর। মক্কার আকাশে জ্বলজ্বল করছে লক্ষ তারা। পুরো শহর গভীর ঘুমে। ঠিক তখনই তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে নেমে আসেন রাস্তায়। এগিয়ে যান চুপি চুপি; নি:শব্দে। বার বার পেছনে ফিরে তাকান। হায় মাতৃভূমি! কষ্টে বুকটা ফেটে যায়!!
কত রাতইতো তিনি জেগে জেগে কাটিয়েছেন। অন্ধকারে হেঁটেছেন মক্কার অলি-গলি। কখনোই তাঁর প্রিয় শহরটাকে এতো অসহায় মনে হয়নি। আজ তাঁর বুকটা ফেঁটে যাচ্ছে বিচ্ছেদের বেদনায়। ভালোবাসা বুঝি একেই বলে! তিনি বার বার পিছনে ফিরে তাকান। “বিশ্বাস করো, ওরা যদি আমাকে তোমার বুক থেকে বের করে না দিতো তাহলে কখনোই তোমাকে ছেড়ে যেতাম না।” নিজের মাতৃভূমির দিকে ফিরে ফিরে বার বার তিনি চোখ মুছেন।
আবারো হাঁটেন। হাঁটতে হাঁটতে একসময় পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে কাছের বন্ধুটির দরোজার সামনে এসে দাঁড়ান। কড়া নড়ে উঠার আগেই খুলে যায় দরোজাটা। তিনি অবাক হয়ে দেখেন, বন্ধু যে তাঁর আগে থেকেই জেগে আছেন তাঁর অপেক্ষায়।
“যেদিন থেকে আপনার মুখে হিজরতের কথা শুনেছি সেদিন থেকেই তৈরি হয়ে আছি। রাতকে হারাম করে দিয়েছি; কখন আপনি আসেন তাই।” বিনয়ের সঙ্গে মুহাম্মদ সা. কে বলেন বন্ধু আবু বকর রা.।
এই তো প্রকৃত বন্ধুত্ব। এই তে বন্ধুর জন্য বন্ধুর ভালোবাাসা! বন্ধুর অকৃত্রিম ভালোবাসায় তিনি আবেগে আপ্লুত হয়ে ওঠেন। গভীর ভালোবাসায় নিজের বাহুবন্ধনে জড়িয়ে নেন বন্ধুকে।
তখনো পুরো শহর ঘুমিয়ে। রাত জাগা পাখির কিচির-মিচির আকাশে বাতাসে। তারাগুলো ঠিক আগের মতোই জ্বলছিলো। সবার অজান্তে পেছনের দরোজা দিয়ে বেরিয়ে পড়েন তারা। যেভাবেই হোক সূর্য উঠার আগেই ছাড়তে হবে মক্কাভূমি। চলে যেতে হবে শত্রুদের নাগালের বাইরে।
ঘর থেকে বেরিয়ে পথে এসে দাঁড়ান তারা। কোন পথ ধরে এগুবেন ভাবতে থাকেন। উত্তরের প্রধান সড়কটি চলে গেছে মদিনার দিকে। সকালে যখন কাফেররা বুঝতে পারবে তাদের শিকার হাত ছাড়া হয়ে গেছে তখন প্রথমেই তারা এ পথটি ধরে খুঁজতে থাকবে। মদিনায় যাওয়ার এ পথটিই তাদের প্রধান টার্গেট হবে। আর মক্কা থেকে দক্ষিণে যে পথটি বের হয়েছে সেটি চলে গেছে ইয়েমেনের দিকে। শাখা পথ হওয়ায় কাফেরদের সন্দেহ এ দিকটায় পড়বে না। তিনি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছিলেন কোন পথ দিয়ে মক্কা থেকে বের হবেন। তার ভাবনা দেখে সফরসঙ্গী; প্রিয় বন্ধু আবু বকর রা. বলে ওঠেন, “ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমার মনে হয় দক্ষিনে ইয়েমেনগামী পথটি ধরে হাঁটলেই সবচে ভালো হয়।”
তিনিও এমনটাই ভাবছিলেন। ওদিকে সকাল হয়ে এলো বলে। তিনি আর সময় ক্ষেপণ করতে চাইলেন না। বন্ধু আবু বকর রা. কে বললেন, আবু বকর, চলো দক্ষিণের পথটি ধরেই এগিয়ে যাই। ওরা সকালে যখন আমাদের দেখবে না তখন উত্তরে মদিনার পথটি ধরেই আগে খোঁজবে।
চাঁদের আলোয় র্দীঘ পাঁচ মাইল পথ অতিক্রম করে অবশেষে ‘গারে সওরের’ সামনে এসে দাঁড়ান তারা। ততক্ষণে সূর্য রাঙিয়ে দিয়েছে আরবের আকাশ। হয়তো কাফেররা খুঁজতে বেরিয়ে গেছে তাদের। তিনি ভাবলেন, দিনের আলোয় এভাবে মক্কা ছাড়া যাবে না। সিদ্ধান্ত নিলেন, আপাতত গারে সওরের কোনো একটি গুহায় আশ্রয় নিবেন।
চোখের সামনে আকাশছোঁয়া পর্বত। এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে পাথরের পর পাথর। জায়গাটায় কখনো কোনো মানুষের ছোঁয়া লেগেছে বলে মনে হয় না। তিনি ও আবু বকর রা. দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছেন, কীভাবে আশ্রয় নেবেন পর্বতের গুহায়। পেছনে শত্রুরা। এদিকে সময়ও বেশি নেই। এতো কিছুর পরও তাঁর চেহারায় চিন্তার লেশমাত্র নেই। ভাবলেশহীন কন্ঠে আবু বকর রা. কে ডেকে বলেন, “আবু বকর! চলো এখানেই কোনো গুহা খুঁজে নেই।”
তিনি তাঁর পবিত্র জুতা মুবারক খুলে হযরত আবু বকর রা. এর হাতে দিয়ে পায়ের এক কোণ দিয়ে হাঁটতে লাগলেন। তিনি এই কৌশল অবলম্বন করেছেন যাতে শত্রুরা তাঁদের অবস্থানের ব্যাপারে জানতে না পারে।
কন্টকাকীর্ণ পথ পেরিয়ে অবশেষে একটি গুহা খুঁজে পেলেন। হযরত আবু বকর রা. চিন্তিত কন্ঠে আরজ করলেন, “ইয়া রাসুলুল্লাহ! আমি আগে এতে প্রবেশ করে ভালোভাবে দেখে নেই তারপর আপনি প্রবেশ করুন।”
হযরত আবু বকর রা. গুহায় প্রবেশ করে অনেকগুলো সাপের গর্ত দেখে চিন্তায় পড়ে যান। “হায় এতে আমার প্রিয় নবি কীভাবে থাকবেন!” সব ভেবে নিজের কাপড় ছিড়ে ছিড়ে গর্তের মুখগুলো বন্ধ করে দেন। তারপরও দুটো গর্ত বাকি রয়ে যায়। আবু বকর রা. গভীর দু:শ্চিন্তায় পড়ে যান, এই ছিদ্র দুটিই যদি বন্ধুর বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়! তাহলে উপায়?
তিনি সিদ্ধান্ত নেন নিজের পা দিয়ে বন্ধ করে রাখবেন ছিদ্র দুটি। করলেনও তাই। এবার তিনি নিশ্চিন্ত। প্রাণের বন্ধু; আখেরি নবী সা. এবার নিরাপদ। গুহা থেকে মুখ বের করে ডাকেন, “ ইয়া রাসুলাল্লাহ! দয়া করে গুহায় প্রবেশ করুন।”
দীর্ঘ সফরের ক্লান্তিতে আবু বকর রা. এর কোলেই মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েন তিনি। হযরত আবু বকর রা. জেগে থাকেন। দুচোখের পাপড়ি এক করেন না একটি মূহূর্তের জন্যও। যদি প্রিয় নবীর কিছু দরকার হয়, তাই।
হঠাৎ এক সাপ এসে দংশন করে হযরত আবু বকর রা. এর পায়ে। মূহূর্তেই পুরো শরীর নীল হয়ে যায়। ফুরিয়ে যেতে থাকে সব শক্তি। কিন্তু তখনো তিনি ছিদ্রের মুখ থেকে পা নড়ান না। যদি এতে হুজুর সা. এর ঘুম ভেঙে যায়। যদি তিনি কষ্ট পান। কিন্তু বিষের জ্বালা আর কতক্ষণ সহ্য করা যায়। তাইতো নিজের অজান্তেই দুফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে হুজুর সা. এর পবিত্র চেহারা মুবারকে। ঘুম ভেঙে লাফিয়ে ওঠেন তিনি “আবু বকর! তোমার চোখে পানি কেনো?”
কি উত্তর দেবেন খুঁজে পান না হযরত আবু বকর রা.। তিনি আবারো জিজ্ঞেস করলেন, কি হয়েছে তোমার আবু বকর?” হযরত আবু বকর রা. ভাঙা ভাঙা কন্ঠে বলেন, “ইয়া রাসুলাল্লাহ. আমাকে বিষাক্ত সাপ দংশন করেছে।”
তিনি অবাক হলেন, “তুমি আমাকে ডাকলে না কেন?” “ইয়া রাসুলাল্লাহ, আপনার ঘুমে ব্যঘাত ঘটবে বলে ডাক দিইনি।”
অবাক হয়ে রাসুল সা. দেখলেন তাঁর প্রিয় সাহাবী বন্ধু হযরত আবু বকর রা. কে। দেখলেন নবীপ্রেমিক এক মহান ব্যক্তিকে। খুশিতে তাঁর বুকটা ভরে ওঠলো। দ্রুত নিজের পবিত্র লালা মুবারক লাগিয়ে দিলেন দংশিত স্থানে। দ্রুত সেরে উঠলেন হযরত আবু বকর রা. আর তাতেই পৃথিবী পেলো একজন খাঁটি নবীপ্রেমিক। নবীর ভালোবাসায় উৎসর্গীত এক মহান পুরুষকে।

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত