| 28 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
গীতরঙ্গ

গীতরঙ্গ: ফিউশন আর কনফিউশন । বিদিশা সরকার

আনুমানিক পঠনকাল: 2 মিনিট
 
আধুনিক সংস্কৃতির গ্রহণযোগ্যতা অনেক। উত্তর আধুনিকবেত্তার উষ্মার কারণ হলেও সংগীতের বিষয়ে আমরা যুগের সঙ্গে চলতে বাধ্য । যদিও সময় জবাব দেবে তার। আগের সময়েও একটা তুলনামূলক চর্চা চলত। বিষয় একই –আগের গানের মত গান হচ্ছে না। এ বিষয়ে শিল্পী মান্না দে মহাশয়ের মত জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বকেও নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছিল ওঁর কাকা শ্রী কৃষ্ণচন্দ্র দে’র গান স্বকন্ঠে রেকর্ড করার পর। ” ওই মহাসিন্ধুর ওপার থেকে” গানের রেকর্ডের কথা বলছি। আমরা কিন্তু একটা মডিউলেশন শুনতে পেয়েছিলাম। আসলে বাংলা গানের প্রণেতাদের গানের ক্ষেত্রে কোনো কপিরাইটের ব্যপার ছিল না বলেই হয়ত আমরা মান্না দে’র গানের ওই অমূল্য সম্পদকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে পেরেছিলাম।অন্যদিকে আমরা কিন্তু এখনও মেনে নিতে পারিনি শিল্পী নির্মলা মিশ্রের জনপ্রিয় সেই গানটি অন্য কারো কন্ঠে।এক লাইভে এ বিষয়ে শিল্পী স্বয়ং স্বীকার করেছিলেন। সেই বিশেষ গানটি ” ও তোতা পাখি রে…”। মনে আছে এক সাক্ষাৎকারে শিল্পী মান্না দে, এ আর রহমানের প্রথম প্রকাশিত চলচ্চিত্র ” রোজা’র” গান শুনে বিরক্ত প্রকাশ করে বলেছিলেন ” হুলিগ্যানের গান”। যদিও ওই ফিল্মের গানগুলো জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। হয়ত তখন থেকেই ফিউশনের জন্ম এবং কনফিউশনের। 
অথচ এর অনেক আগে শ্রাবন্তী মজুমদার বা রাণু মুখার্জি পাশ্চাত্য ভাবধারায় গান করে ফেলেছিলেন। 
১) বুসিবল , , কুহেলি রাত ইত্যাদি গান রেডিওতে প্রায়শই বাজত ( রাণু মুখার্জির গান)। 
অন্যদিকে শ্রাবন্তী মজুমদারের গান ১) মধুপুরে পাশের বাড়িতে তুমি থাকতে ২) আমি একটা ছোট্ট বাগান করেছি ইত্যাদি। ভি. বালসারাজী পাকাপাকি ভাবে চলে এলেন বাংলা গানের দুনিয়ায়। এই সময়ও সম্ভবত পরিচিত এই সব গানের সঙ্গে। 
এখন গুরুমুখি তালিমে সীমিত শিক্ষার্থী আদি ঘরাণাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। এর মহিমা যে কতখানি সেটার অভিজ্ঞতা যাদের রয়েছে তারাই বলতে পারবেন। একটা কথা মনে রাখতে হবে যে, গ্রহণযোগ্যতা কোনো পথ্য নয়– রসাস্বাদন। 
 সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তালিম শব্দটি বদলে নতুন নামকরণ হয়েছে ” ভয়েস ট্রেনিং”।মিউজিক আ্যারেঞ্জারের পারদর্শীতা শিল্পীর থেকেও উচ্চতর আসনে বসে আছে সম্ভবত। কিন্তু আমরা ভুলিনি সুরকার সুধীন দাশগুপ্ত’র কথা বা নচিকেতা ঘোষ অথবা প্রবীর মজুমদারের কথা অথবা আরও অনেকে। একই ভাবে হিন্দি গানের ক্ষেত্রেও সেই স্বর্ণযুগের অবসান রাহুল দেব বর্মনের গান দিয়ে। 
পরীক্ষা নিরীক্ষা সব সময় চলেছিল বা এখনও চলছে। এসে গেছেন কবীর সুমন, নচিকেতা আরও অনেকে। মানুষ গ্রহণ করেছেন কারণ শ্রোতারও একটা খিদে থাকে। অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে ” মহীনের ঘোড়াগুলি” র মত কতটা কালজয়ী হবে এদের গান সেটাও সময়ের তূল্যমূল্যে। 
সম্প্রতি একটি ওয়েব সিরিজের নাম না করে পারছি না। Bandish Bandits। ফিউশন বনাম কনফিউশনের এক দ্বন্দ্ব এক অদ্ভুত বাতাবরণের সৃষ্টি করেছে। ফিউশনকে যদি blending বলা হয় তবে তার সঙ্গে আন্দাজের দক্ষতা অনিবার্য। জয়পুর ঘরাণার কিছু উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের পাশে ফিউশন তাৎক্ষণিক বিনোদনে থেমে গেছে। তখনই একজন শিক্ষার্থীকে আমরা দেখতে পেলাম যে তাকে ফিরে যেতে হচ্ছে সরস্বতী আরাধনায়। এখান থেকেই কনফিউশনের জন্ম। নিজেকে এবং শ্রোতাকে যাচাই করার সদিচ্ছা হয়ত আরও উন্নততর প্রসাদ আমাদের হাতে তুলে দেবে। হোক না সে নিমিত্ত মাত্র। 

এই সাধনার ফসল আমাদের উপহার দিয়েছে হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া’র মত এক বংশীবাদক কে, যিনি পন্ডিত রবিশঙ্করের স্ত্রী অন্নপূর্ণা দেবীর কাছে সঙ্গীত জীবনের মধ্যাহ্নে উপস্থিত হয়েছিলেন। ওঁকে তালিম দিতে প্রথমে রাজি হননি অন্নপূর্ণা দেবী। শেষে এক কঠিন শর্ত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া’কে সম্মত করেছিল তালিম নেওয়ার জন্য। রাতারাতি উনি অন্নপূর্ণা দেবীর নির্দেশে বাঁ হাতে বাঁশি তুলে ধরেন। এক কঠিন অধ্যাবসায়। অবশ্যই প্রশ্ন উঠতে পারে এর কারণ বিষয়ে। অন্নপূর্ণা দেবী চেয়েছিলেন অন্য ঘরাণার ছাপ যেন ওঁর ছাত্রের সুরে ও সুর প্রয়োগে না পড়ে। এই অভিনিবেশ সত্যিই অবাক করে দেবার মত। অবশ্যই একে ছুৎমার্গ বলা চলে না। প্রশ্নটা ছিল সিগনেচারের। 
বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তি গানকে অনেক সহজ করে দিয়েছে। অতীতের অনেক শিল্পীই এখন ট্র্যাকে গান গাওয়ায় অভ্যস্ত অথবা ডাবিংয়ে। আসলে এই সমঝোতা সংগীতের প্রতি ভালোবাসার কারণে। কনফিউশন থাকলে রি– টেকের সুবিধাও রয়েছে। তীর্থের পথ এখন দূর্গম নয় । পথ পরিণত হয়েছে রাস্তায়। 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত