জর্জ ফ্লয়েড, মহামারী ও ইনভিজিবল ম্যান

আমেরিকার মিনিয়াপোলিসে শ্বেতাঙ্গ পুলিশের হাতে কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর পর সে দেশে তোলপাড়। দাঙ্গা, প্রতিবাদ সব শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানকার অভিজ্ঞতা জানালেন প্রবাসী লেখক ও সাংবাদিক মনিজা রহমান।  তাঁর দেখা আমেরিকার বর্ণবাদ ও জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর পর ছড়িয়ে পড়া দাঙ্গাকে তিনি অন্যচোখে অনুসন্ধান করেছেন।


 

‘আমার ছেলে রেসিসমের শিকার’। চিৎকার করে বলল একজন কালো মহিলা। ওনার চিৎকারে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলাম। তখন আমেরিকায় আমাদের সব কিছু নতুন। রাস্তা দিয়ে চলার সময় জোরে জোরে উচ্চারণ করে সাইন বোর্ডের লেখা পড়ি। ছেলেকে জ্যাকসন হাইটসের স্কুলে ভর্তি করার পরে বলা হল, ওর ‘রিডিং লেভেল’ উন্নত করতে হবে। এরজন্য প্রতিদিন একটা বই পড়ে শেষ করতে হবে। স্কুলের নির্দেশমত কুইন্স লাইব্রেরীর জ্যাকসন হাইটসের শাখায় গেলাম। ফ্রন্ট ডেস্কে দাঁড়িয়ে আছি লাইব্রেরী কার্ড বানানোর জন্য- হঠাৎ শুনি এই চিৎকার। কৃষ্ণাঙ্গ ওই মহিলার ছেলে সম্ভবত লাইব্রেরীতে কোন সমস্যার মুখে পড়েছে, সঙ্গে সঙ্গে মা চিৎকার করে বলতে শুরু করেছে- আমার ছেলে রেসিসমের শিকার।

ওই শুরু। রেসিসম বা বর্ণবাদ জিনিষটা কি বাংলাদেশে থাকতে আমি সেভাবে শুনিনি কিংবা শুনলেও সেটা মাথার ভিতরে কোন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেনি। আমেরিকা এসে দেখলাম- এদেশে এটাই সবচেয়ে বড় সমস্যা। আমেরিকা বিশেষ করে নিউইয়র্ক সিটির মতো এত বারো জাতের মানুষ পৃথিবীর কোথাও নেই। যে কারণে রেসিসম শব্দটা ঘুরে ফিরে আসে। আমার অটিস্টিক ছেলে ঘরে জোরে আওয়াজ করলে, সাদা প্রতিবেশী এসে রাগারাগি করে, আমরা তাকে মনে মনে বলি রেসিস্ট। প্রথমেই এই শব্দটা মাথায় আসে। শত শত বছর চলে আসা ক্ষমতাশীলদের ঘুনে ধরা মানসিকতার বিরুদ্ধে এটা হল একটা বহি:প্রকাশ। জর্জ ফ্লয়েডের নির্মম মৃত্যু ও পরবর্তী বিভিষীকাময় পরিস্থিতি ছিল মানুষের মনে জমে থাকা বহুদিনের সেই ক্ষোভের উদগীরণ।

জ্যাকসন হাইটসের সেই লাইব্রেরী মা-ছেলের জীবনে খুব প্রভাব রেখেছিল। আমেরিকায় প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসে প্রত্যেক লাইব্রেরী আয়োজন করে ‘কালো মানুষদের ইতিহাস’ পাঠচক্র। আমি যখন চাকরী করতাম না, তখন একবার সেখানে অংশ নিয়েছিলাম। ওই পাঠচক্রে অংশ নিয়ে বিভিন্ন বই থেকে দেয়া নোট ও বক্তাদের কথা থেকে জানতে পারি আমেরিকায় কালোদের করুণ ইতিহাস সম্পর্কে। কালোদের ‘সিভিল রাইটস’ অর্জনের পথ ছিল অত্যন্ত কঠিন। মার্টিন লুথার কিং ও ম্যালকম এক্স হল তাদের নেতা। সেই আঠারোশ শতকে আমেরিকার দক্ষিণের এক মানুষ জর্জ ওয়াশিংটন কার্ভার আর তার কৃষি বিপ্লব সম্পর্কে জানলাম। নিউইয়র্কের হারলেম থেকে কালোদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনের উদ্ভব হয়।

 বিখ্যাত লেখক রালফ এলিসনের- ‘ইনভিজিবল ম্যান’ উপন্যাসটি পড়েছিলাম সেই সময়। ১৯৫২ সালে প্রকাশিত এই বইয়ে লেখক  কৃষ্ণাঙ্গ সম্প্রদায়ের আত্নপরিচয়ের সংকটকে তুলে ধরেছেন। যেখানে কালোদের স্কুল ও কলেজে পড়া গল্পের মূল চরিত্র বলেন, নিজেকে আমার সব সময় মনে হত আমি যেন অদৃশ্য। আমার মাংস আছে, হাড়, রক্ত, চামড়া সব আছে, আমি নিঃশ্বাস নিতে পারছি, হাঁটতে পারছি, কিন্তু কেউ যেন আমাকে দেখছে না। আমি যেন অদৃশ্য মানব। আমি যখন বাজারে যেতাম, দেখতাম আমার প্রতিবেশী সাদারা চারপাশের সবকিছু দেখছে, কিন্তু তারা আমাকে শুধু দেখতে পাচ্ছে না, তখন আমার মনে হত আমি কি আসলেই অদৃশ্য। উপন্যাসটির মূল ভাবনা মনে খুব প্রভাব ফেলেছিল। তারপর থেকে ওদের সম্পর্কে জানতে শুরু করি। উল্লেখ্য, এই উপন্যাসকে মডেল করে আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা লিখেছিলেন তাঁর অসামান্য বই- দি ড্রিমস অব মাই ফাদার।

মিনিয়াপলিস পুলিশের হাতে জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যু আমেরিকাতে কালো হয়ে জন্মানো সেই ‘ইনভিজিবল ম্যান’ এর কষ্টকেই মনে করিয়ে দেয়। তবে এটি কেবল একটি মৃত্যু নয় যা কেবল বর্ণবৈষম্যকে চিত্রিত করে। এই যে করোনা ভাইরাসের মধ্যে ঝুঁকি নিয়ে কালো মানুষদের বাইরে কাজ করতে হচ্ছে সেটাও চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।  ফ্লয়েডকে কাজের জন্য বাইরে আসতে হয়েছিল, যদি সে লকডাউনে বাসায় থাকতোআরো সব সুবিধাপ্রাপ্ত আমেরিকানদের মতো, তবে তাকে মরতে হত না।

৪৬ বছর বয়সী ফ্লয়েড একটা রেস্টুরেন্টে কাজ করতো, কিন্তু মহামারীর কারণে তার চাকরী হারাতে হয়। পরে সে সিকিউরিটি গার্ডের চাকরী নেয়। করোনা ভাইরাস চারদিকে ছড়িয়ে পড়ার পরে আমেরিকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়., চাকরী হারাতে হয় অনেককে, এক্ষেত্রে সাদাদের তুলনায় অনেক বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হয় কালো মানুষেরা। বাইরে থেকে বিশাল দেখালেও কালো মানুষদের অনেকে নানা রোগে আক্রান্ত। ফ্লয়েডকে মাটিতে চেপে ধরতে ও তার গলায় হাঁটু চেপে শ্বাসরুদ্ধ করে মেরে ফেলতে যে কারণে পুলিশ অফিসার ডেরেক চাওভিনের বেশী বেগ পেতে হয়নি। ডাক্তাররা ফ্লয়েডের মৃত দেহ পরীক্ষা করে এই কথা বলেন। এই যে করোনা ভাইরাসে আমেরিকায় কালোরা সবচেয়ে বেশী আক্রান্ত হচ্ছে ও মারা যাচ্ছে- এটা প্রমাণ করে তাদের শরীরের ইমিউনিটি খুব দুর্বল , অস্বাস্থ্যকর জীবন যাপন যার মূল কারণ। স্বাস্থ্যগত ও অর্থনৈতিক দুই দিক থেকে তারা পিছিয়ে।

শতাব্দীর পর শতাব্দী জুড়ে বর্ণবাদ ও প্রাতিষ্ঠানিক অসমতা ঘুন ধরিয়েছে কালোদের জীবন ‍যাপনে। দুষ্টচক্রের মতো সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না তারা। একের পর সংকটে ভুগছে কালো আমেরিকানরা। অপরাধ চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে। সামান্য কিংবা নামমাত্র অপরাধ করে ব্রেয়োনা টেইলর, আহমাদ আরবেরি ও সর্বশেষ জর্জ ফ্লয়েডকে প্রাণ দিতে হয়েছে। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, করোনা ভাইরাসে একের পর আপনজনের মৃত্যু, অন্ধকার ভবিষ্যত সব মিলে তারা পরে সংকটের অতলে। যে কারণে ফ্লয়েডের মৃত্যুর পরে এতটা ফুঁসে উঠেছে তারা। দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাবার পরে ‍এ যেন তাদের অস্তিত্বের লড়াই।

মহামারীর মধ্যে যে সব কালো আমেরিকানরা তাদের চাকরী টিকিয়ে রাখতে পেরেছে, তাদের মধ্যে বাড়িতে থেকে কাজ করার সংখ্যা খুব কম। অন্তত শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় সংখ্যাটা হাতে গোনা। রেস, এথনিটি ও ইকোনোমি বিশেষজ্ঞ ভ্যালেরি উইলসন বলেছেন- ‘করোনা মহামারীতে আমেরিকায় এক লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। তবে মৃত্যু সংখ্যা বিশেষভাবে একটা সম্প্রদায়ে কেন্দ্রীভূত হয়েছে, যে কারণে করোনাকে মহান সমতা আনয়নকারী বলা যাবে না।’

সাদাদের তুলনায় আমেরিকায় করোনাতে ২.৪ গুন বেশী কালো মারা গেছে। পুলিশের হাতে সাদাদের তুলনায় কালোরা মারা যায় অনেকগুন বেশী। অথচ কালোরা আমেরিকার জনসংখ্যার তের ভাগের সামান্য বেশী। এক গবেষণায় বলা হয়েছে- ‘করোনা ভাইরাস মহামারীর অভিজ্ঞতা প্রত্যেক আমেরিকানের জন্য এই প্রথম। তবে এর প্রভাব এক শ্রেণীর মানুষের ওপর মারাত্নক প্রভাব ফেলেছে। শত শত বছর ধরে চলে আসা সামাজিক, অর্থনৈতিক অন্যায়-অবিচার মানুষের মনে বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি করেছে। স্বাস্থ্য সুবিধা, সম্পদ, কর্মসংস্থান, মজুরী, গৃহসংস্থান, আয় ও দারিদ্র – সব মিলে অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্যগত যে বৈষ্যম্য সেটা চোখে আঙ্গুল দিয়েছে এই মহামারী।

করোনা ভাইরাসের কারণে এক দল লোক চাকরী হারিয়েছে, আরেক দল ইসেনশিয়াল ওয়ার্কার হিসেবে কাজ করছে এবং আরেকদল বাড়ি থেকে কাজ করছে, এই তিন দলের মধ্যে কালোরা মূলত প্রথম দুই দলে অবস্থান করছে। শুধু যে মহামারী তাই নয়, আগে থেকেই কালো শ্রমিকদের মধ্যে বেকারত্বের হার বেশী।  গত ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে ছয় জন কালো শ্রমিকের মধ্যে একজন তাদের কাজ হারিয়েছে। আমেরিকার অর্ধেক প্রাপ্ত বয়স্ক কালো জনগন বেকার বর্তমানে। কালো পরিবারগুলোর আর্থিক সঞ্চয় বলতে কিছু নাই। ২০১৯ সালে এক হিসাবে দেখা গেছে- কালোদের যেখানে গড় মজুরী ২১.০৫, সাদাদের সেটা হল- ২৮.৬৬ ভাগ।

যুগ যুগ করে ধরে চলা বর্ণবাদ আর দারিদ্রের কারণে কালোরা নানা রকম শারীরিক অসুখে ভুগে। এই মহামারীতে তারা কাজ হারিয়ে ইসেনশিয়াল ওয়ার্কারের খাতায় নাম লেখায়। গ্রোসারি শপ কর্মী, ফার্মেসির চাকরী, পাবলিক ট্রান্সপোর্ট চালু রাখা, নার্স কিংবা এম্বুলেন্স ওয়ার্কারের তারাই এখন পুরো আমেরিকায় শীর্ষ তালিকায়। মহামারীর সময়ে দেখেছি- আমার বাড়ি পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্ব যে কালো বৃদ্ধ মানুষটি তিনি তার কাজ বন্ধ করেননি। উনি লনের ঘাস কাটছেন, ময়লা নিয়ে যাচ্ছেন, সিড়ি ঘর মুছে রাখছেন- কারণ এটাই তার নিয়তি। দারিদ্রের সঙ্গে বাস করার জন্য যেন জন্ম হয়েছিল তার। এভাবে একদিন হয়ত করোনা কিংবা অন্য কোন রোগে আক্রান্ত হবেন তিনি এবং দুর্বল স্বাস্থ্যের কারণে মৃত্যু হবে। ডায়বেটিস, বা হার্ট সমস্যা কিংবা কিডনি সমস্যা তার আগে থেকেই ছিল, এখন করোনা মহামারী তাকে চূড়ান্ত পরিণতির দিকে নিয়ে যাবে।

ফ্লয়েডের মৃত্যু আসলে একটা উপলক্ষ,  পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ শ্বেতাঙ্গদের জিনের মধ্যে বর্ণবাদ মনোভাব আর আমেরিকার রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে লূকিয়ে থাকা শত শত বছর ধরে জমে থাকা ক্ষোভের উদগীরণ।

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত