গ্যালিলিও এবং তার ‘জারজ মেয়ে’

ফ্লোরেন্সের জাদুঘর থেকে গ্যালিলিওর কন্যা ভার্জিনিয়ার শতাধিক চিঠি পাওয়া গেছে, কিন্তু কন্যাকে লেখা গ্যালিলিওর কোনও চিঠিই কিন্তু পাওয়া যায়নি। ও-সব কবেই আগুনে পোড়ানো হয়েছে। ওই কনভেন্টেই পোড়ানো হয়েছে, যেখানের নান ছিলেন ভার্জিনিয়া। জন্ম ওঁর ১৬০০ সালে, যে বছর জিয়োর্দানো ব্রুনোকে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল, সে বছরই। মেয়ের যখন মাত্র বারো বছর বয়স, দক্ষিণ ফ্লোরেন্সের এক কনভেন্টে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন গ্যালিলিও, সেখানেই ভার্জিনিয়া নাম পাল্টে মারিয়া সেলেস্ত হয়েছিলেন, থেকেছেন সারা জীবন, আর সারা জীবনই গ্যালিলিও চিঠি লিখেছেন ওঁকে, আর মারিয়াও লিখেছেন ডিয়ার লর্ড ফাদারকে। গ্যালিলিও সম্পর্কে সবাই জানে, গ্যালিলিও পিসার হেলে যাওয়া টাওয়ার থেকে কামানের বল ফেলেছিলেন নিচে, জানে গ্যালিলিও পুরো জগতের বিশ্বাসের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিলেন বলে যে, পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘুরছে, যখন পৃথিবীকে এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কেন্দ্র বলে জানত সবাই, জানে যে, এ-কারণে তাঁকে শাস্তি পেতে হয়েছিল, কিন্তু কেউ কি জানত গ্যালিলিওর এক ‘জারজ কন্যা’ ছিল যাকে বিষম ভালবাসতেন তিনি এবং যাঁকে চিঠি লিখে গেছেন পাতার পর পাতা এমনকী যখন তিনি ঘরবন্দি! কীরকম হতে পারে সে-সব চিঠি, একজন ঈশ্বরে বিশ্বাসী, আরেকজন ঈশ্বরের তথ্য উড়িয়ে দেওয়া বিজ্ঞানী! তখন ইটালিতে, সেই সপ্তদশ শতাব্দীতে, গির্জার দাপট ভীষণ রকম, কনভেন্টে থাকা নিজের মেয়ের সঙ্গেও তাঁর দেখা করার সুযোগ হতো না, অথচ মেয়েকে ভালবেসে তিনি যতদিন বেঁচেছিলেন, লিখেছেন। বিজ্ঞান, বিশ্বাস এবং ভালবাসার গল্প সে-সবে।

গ্যালিলিওর নিজের জন্ম পিসায়, ফেব্রুয়ারির পনেরো তারিখে, ১৫৬৪-তে। তাঁর বাবা ভিনসেনজিও ছিলেন সংগীত শিক্ষক, ছেলেকে অর্গান বাজাতে আর গান গাইতে শিখিয়েছিলেন। দশ বছর বয়সে গ্যালিলিও পিসা থেকে ফ্লোরেন্স এলেন, ওখানে তিন বছর ইস্কুলে পড়লেন, এর পর চলে গেলেন এক মঠে গ্রিক আর লাতিন ভাষা শিখতে, গ্যালিলিওর ইচ্ছে সন্ন্যাসী হবেন। কিন্তু হিসেবি বাবা দেখলেন, মেয়েদের বিয়ে দিতে গিয়ে যৌতুকে যাবে প্রচুর টাকা, মেয়ে হল খরচার জিনিস, আর ছেলে যদি সন্ন্যাসী হয়ে বসে থাকে, সংসার চলবে কী করে! ভিনসেনজিও ছেলেকে ধরে এনে ভর্তি করে দিলেন পিসা বিশ্ববিদ্যালয়ে, গ্যালিলিও ওখান থেকে মেট্রিক পাস করলেন, তারপর দু’বছর ডাক্তারিতে মন বসেনি গ্যালিলিওর, তাঁর আকর্ষণ অঙ্কে, পদার্থবিজ্ঞানে। সে আমলে ডাক্তারি পড়তে গেলে অঙ্ক কিছু শিখতে হয়। ফ্লোরেন্সে এদিক-ওদিক অঙ্ক বিষয়ে নিজের যা বিদ্যে আছে, ঝেড়ে, এক সময় পিসা বিশ্ববিদ্যালয়ে অঙ্কের মাস্টার হবার আবেদন করলেন, হয়েও গেল। ওই তখনই, পিসার টাওয়ার থেকে কামানের বল ফেললেন নিচে। অ্যারিস্টটল বলেছেন, একশো হাত ওপর থেকে একশো পাউন্ডের বল যদি নিচে ফেলা হয়, আর একই সময়ে এক হাত ওপর থেকে এক পাউন্ডের বল, তবে একশো হাত ওপর থেকে ফেলা বল আগে মাটি ছোঁবে। গ্যালিলিওর কথা হল, দু’বলই একসঙ্গে মাটি ছোঁবে, আগে পরে নয়। এ-নিয়ে পিসা বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্যালিলিও নিজের জনপ্রিয়তা কম হারাননি। তিনি দুঃখ করে বলেছেন, আমার ভুল নিয়ে তোমরা এমন খেপে গেছ, আর অ্যারিস্টটলের ভুল নিয়ে তো মোটেই টুঁ শব্দ করছ না।

ভিনসেনজিও, গ্যালিলিওর বাবা, মারা যাবার পর সংসারের দায়িত্ব গ্যালিলিওর কাঁধে এসে পড়ল, খুব একটা যে উপার্জন তখন গ্যালিলিওর তা নয়, বছরে ষাট টাকা, ওই ষাট টাকার মধ্যে বোনের বিয়ে দেয়া, ছোটভাই মিকেলেঞ্জেলোর লেখাপড়ার খরচ, মায়ের মাসোহারা সবই সারতে হতো। ১৫৯২-তে গ্যালিলিও পিসা ছেড়ে পাদোবা বিশ্ববিদ্যালয়ে যান। ওখানে আঠারো বছর অধ্যাপনা করেন। পাদোবাতে তিনি জীবনের সবচেয়ে চমত্কার সময় কাটিয়েছেন, নিজেই পরে বলেছেন। টাকা পেতেন ভাল, তিনশো থেকে চারশো আশি টাকা বছরে। ওই পাদোবাতেই তাঁর পরিচয় মারিনা গামবার সঙ্গে। প্রায়ই রাত কাটাতেন মারিনার বাড়িতে, না, নিজের বাড়িতে মারিনাকে তোলেননি কোনও দিনই, বিয়ে তো করেনইনি, যদিও মারিনাই জন্ম দেন গ্যালিলিওর তিন সন্তান; ভার্জিনিয়া, লিভিয়া আর ছেলে, গ্যালিলিওর বাবার নামে নাম, ভিনসেনজিও। নথিপত্রে সন্তানদের বাবার নাম না থাকলেও গ্যালিলিও স্বীকার করে নেন যে, তিনি বাবা। পাদোবা বিশ্ববিদ্যালয়ে অঙ্কের মাস্টার থাকাকালীনই মেদিচি পরিবারে একখানা চাকরি জোটে তাঁর, রাজপুত্র কসিমোকে অঙ্ক শেখানোর চাকরি। অঙ্ক শেখাতে শেখাতে আকাশের গ্রহনক্ষত্রও শেখাতে থাকেন, কসিমোর ওপর কোন গ্রহের কী প্রভাব পড়ছে কখন, এ-নিয়ে তিনি বিস্তর সময় ব্যয় করতে থাকেন, এমন বিদ্যেধরকে কেবল এক রাজপুত্রের ঘরে বসিয়ে রাখবে কেন, চাকরিতে তাঁর পদোন্নতি হয়, পুরো মেদিচি পরিবারের অঙ্কবিদ হয়ে বসেন গ্যালিলিও। সে-সময় তিনি সৈন্যদের জন্য দিগদর্শন যন্ত্র বানালেন, এর পরেই টেলিস্কোপে হাত দিলেন, অনেকে মনে করেন গ্যালিলিও টেলিস্কোপ আবিষ্কার করেছিলেন, তা নয়, টেলিস্কোপ হল্যান্ডে বানানো হয়েছিল, তিনি ওটিকে আরও উন্নত করেছিলেন এই যা। অ্যারিস্টটল বলেছিলেন গতি সম্পর্কে অজ্ঞ হওয়া মানে প্রকৃতি সম্পর্কে অজ্ঞ হওয়া। গ্যালিলিও এই অজ্ঞতা থেকে মুক্ত হতে বিষম ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। শীতের রাতে টেলিস্কোপে চোখ রেখে বসে থাকেন, হাত জমে যায় ঠাণ্ডায়, কাচ ঝাপসা হয়ে যায় কুয়াশায়, তবু সে শীতেই দেখে নিলেন একরাশ স্থির নক্ষত্রকে পেছনে রেখে জুপিটার, ভেনাস, মার্স, মারকারি আর স্যাটার্নের অস্থিরতা, এদের শরীরে স্পষ্ট দেখতে পেলেন গতি। কেবল এটুকুই নয়, গ্যালিলিও আরও বললেন, জুপিটারকে ঘিরে চার-চারটে চাঁদ ঘুরছে। অজ্ঞতা কাটল বটে, গ্যালিলিও কিন্তু পদে পদে অ্যারিস্টটলকে খণ্ডাতে লাগলেন, এমনও হল, রাতারাতি দুটো দল গড়ে উঠল, এক দল গ্যালিলিওর পক্ষে, আরেক দল অ্যারিস্টটলের, সে বছর, ১৬১০ সালে, গ্যালিলিওর প্রথম বই ‘নক্ষত্রবার্তা’ বেরোল, সঙ্গে সঙ্গে বিষম আলোড়ন। এক সপ্তাহের মধ্যে বইয়ের সব কপি বিক্রি হয়ে গেল। সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ল খবর। ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত স্যার হেনরি উওটন ভেনিস থেকে ইংল্যান্ডের রাজা জেমসের কাছে জরুরি চিঠি লিখলেন, ‘পাদোবার এক অঙ্কের মাস্টার বলছেন জুপিটারকে ঘিরে নাকি চারটে চাঁদ ঘুরছে, আজ অবধি যে জিনিস কেউ আবিষ্কার করতে পারেনি, আরও কিছু স্থির তারাও নাকি দেখেছেন, আশ্চর্য, এ-সব আগে তো কেউ দেখেনি! আবার ছায়াপথের আসল কারণও বর্ণনা করেছেন, এ লোক হয় খুব বিখ্যাত, নয়তো জঘন্য কিছু হতে যাচ্ছেন। লোকটি যা বলছেন তা পাগলের প্রলাপ নাকি এতে সত্য কিছু আছে তা যাচাই করে দেখা উচিত। এঁর টেলিস্কোপ যন্ত্রটি এর পরের জাহাজে আমি পাঠিয়ে দিচ্ছি।

গ্যালিলিও সাঁইসাঁই করে উপরে উঠছেন। রাজপুত্র কসিমোকে নিজের তৈরি একটি টেলিস্কোপ আর একখানা নক্ষত্রবার্তা পাঠাবার পর উত্তরে কেবল শুকনো ধন্যবাদ জোটেনি গ্যালিলিওর, জুটেছে পিসা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রধান অঙ্কবিদদের পদ, আর গ্র্যান্ড ডিউকের ব্যক্তিগত দার্শনিক আর অঙ্কবিদ হওয়ার সুযোগ। গ্যালিলিওর আকাশে আলো করে নক্ষত্র ফুটছে, কিন্তু ওদিকে কেবল মারিয়া সেলেস্তই নয়, গ্যালিলিওর আরেক কন্যা লিভিয়াও কনভেন্টের কর্তা, যেহেতু গ্যালিলিওর এতে সায় ছিল না, চিঠি লিখে, আগেভাগে ঈশ্বরের সেবা করার কাজে নামা যে মন্দ নয়, বরং ভালই তা বোঝাতে চাইলেন, বুঝতে মন সায় দেয় না গ্যালিলিওর।

গ্যালিলিও আরও একটি বই লিখলেন, ‘জলের ভেতর শরীর’। লিখলেন ইটালিয়ান ভাষায়, ইচ্ছে, প্রচুর পাঠক পাওয়া। গ্যালিলিও লিখছেন ঠিকই বই, একটির পর একটি, অ্যারিস্টটলকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিচ্ছেন, টলেমিকেও, কিন্তু কোনও এক পোলিশ ধর্মগুরু কোপারনিকাসের গুণ গাচ্ছেন। কে এই কোপারনিকাস! নিকোলাস কোপারনিকাস ইটালিতে কিছুকাল ডাক্তারিবিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা আর অঙ্কবিদ্যা শিখে তিরিশ বছর বয়সে ফিরে গিয়েছিলেন নিজের দেশ পোল্যান্ডে, ফেরার পর তাঁর এক কাকা, বিশপ, কোপারনিকাসকে ফ্রমবর্ক ক্যাথিড্রালের কর্তা বানিয়ে দিলেন। কোপারনিকাস ওই ফ্রমবর্কে বসে খোলা চোখে আকাশ দেখে, কিছু পড়ে, আর কিছু ভেবে ‘দে রেভুলুশনিবুস’ নামে লাতিন ভাষায় একটি বই লিখে ফেললেন, বইটি ছাপালেন ১৫৪৩ সনে লেখার কয়েক দশক পর, যখন তাঁর সত্তর বছর বয়স, শয্যাশায়ী (বুঝি না এত সময় নেন কেন এঁরা যখন জগত্কাঁপিয়ে দেওয়া কিছু লেখেন, দ্য অরিজিন অব স্পিসিস বাই মিনস অব ন্যাচারাল সিলেকশন বইটি লেখার কুড়ি বছর পর, ছাপাতে দিয়েছিলেন ডারউইন। ) দে রেভুলুশনিবুস যেহেতু লাতিনে লেখা গুটিকয় শিক্ষিত লোক জানতেন সে ভাষা, খুব একটা যে হইহই পড়ে গেল বইটি বেরোনোর পর তা নয়। এ বই আবার পোপকে উত্সর্গ করা, পোপ তৃতীয় পল, ধর্মচ্যুতির জন্য যিনি বিচারব্যবস্থা চালু করেছিলেন (যে বিচারব্যবস্থায় গ্যালিলিওকে পরে ফাঁসতে হয়, আর ঠিক এই বইটির পক্ষ নেবার জন্য। ) বইয়ের বিষয় টলেমির ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত। আলেকজান্দ্রিয়ার বিজ্ঞানী টলেমি বলেছিলেন পৃথিবী মাঝে আর চাঁদ, সূর্য, গ্রহ পৃথিবীকে ঘিরে আছে, কোপারনিকাসের মত হল পৃথিবী কেন্দ্র নয়, কেন্দ্র হল সূর্য। বইটি বেরোনোর পর, গ্যালিলিও টলেমির পৃথিবীকেন্দ্রিক ব্রহ্মাণ্ড উড়িয়ে দিয়ে কোপারনিকাসের মতটিকে মেনে নিলেন। সূর্যের ভেতর কিছু দাগ দেখতে পেয়ে গ্যালিলিও ভাবতে বসলেন, মূল অঙ্ক কষতে বসলেন, কী হতে পারে দাগের কারণ। জার্মান জ্যোতির্বিদ ওয়েলসারের সঙ্গে গ্যালিলিওর চিঠিতে আলোচনা হয় দাগের কারণ নিয়ে। গ্যালিলিও বললেন, হতে পারে গ্রহনক্ষত্রের ছায়া, যে গ্রহগুলো সূর্যের চারদিকে ঘুরছে, হতে পারে সূর্য নিজের অক্ষপথেই ঘুরছে, বছরে একবার করে, বছর বছর দাগগুলো তাই পাল্টাচ্ছে, আকার বদলাচ্ছে, উবেও যাচ্ছে কিছু দাগ। গ্যালিলিও বছর ধরে সূর্যের দিকে টেলিস্কোপ পেতে বসে রইলেন। আর লিখতে লাগলেন চিঠি ওয়েসলারকে। এই চিঠিগুলোই পরে বই হয়ে বের হয়। এ বই বেরোলে দ্বিগুণ খেপে গেল লোক। গ্যালিলিওকেই, যেহেতু কোপারনিকাস আর বেঁচে বেই, সূর্যকেন্দ্রিক ব্রহ্মাণ্ডের সব দায়ভার একাই বহন করতে হল। ১৬১২ সনে ফ্লোরেন্স গির্জার পাদরি ঘোষণা করে দিলেন, কোপারনিকাসের বক্তব্য পবিত্র গ্রন্থ বাইবেলের বিপক্ষে যায়।

গ্যালিলিওর বিরুদ্ধে তখনকার জ্যোতির্বিদ আর দার্শনিকরা এমনই মুখর হয়েছিলেন যে, তাঁর প্রিয় ছাত্র বেনেদেত্তো কাসতেলি তাঁর পক্ষে জনমত গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিলেন, আত্মপক্ষ সমর্থন করে লেখা গ্যালিলিওর চিঠিও তিনি ছেপে বিলি করেছিলেন, কিন্তু পিসা বিশ্ববিদ্যালয়ে অঙ্কবিদ হিসেবে যোগ দিতে গিয়ে কাসতেলি পড়লেন বিপাকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালক বলে দিলেন, পৃথিবী ঘুরছে এমন অদ্ভুত বিষয় যেন কিছুতে ছাত্রদের না শেখানো হয়। কেবল তাই নয়, খুব শীঘ্রই কাসতেলিকে দাঁড়াতে হয় হাজারো প্রশ্নের সামনে, মেদিচি পরিবারে। গ্রহনক্ষত্র বিষয়ে, সব চেয়ে বেশি আগ্রহ রাজপুত্র কসিমোর মা গ্র্যান্ড ডাচেস ক্রিশ্চিনার। কাসতেলি যতই সূর্যকেন্দ্রিক ব্রহ্মাণ্ডের কথা বললেন, ততই বিরক্ত হন ক্রিশ্চিনা। বাইবেল খুলে জসোয়ার বই থেকে পড়ে শোনান, পৃথিবীকে রাখা হয়েছে স্থির, চিরকালের জন্য স্থির, কোনও অবস্থাতেই যেন এটি না নড়ে। তবে? বেকায়দায় পড়ে কাসতেলি গ্যালিলিওকে চিঠি লিখলেন। সে চিঠি পেয়ে কাসতেলিকে দীর্ঘ চিঠি লিখলেন গ্যালিলিও, ক্রিশ্চিনাকেও। গ্যালিলিওর ভাষ্য বাইবেলের সঙ্গে বিজ্ঞানের কোনও বিরোধ নেই। প্রকৃতির সত্যকে জানা মানে বাইবেলের ভেতরে যে সত্য, তা আবিষ্কার করা। গ্যালিলিও দোষ দিলেন বাইবেলের যাঁরা আক্ষরিক অনুবাদ করে ভুল ব্যাখ্যা করেন তাঁদের। পবিত্র গ্রন্থ এবং প্রকৃতি দুটোই ঈশ্বরের সৃষ্টি, সুতরাং দুটোতে কোনও বিরোধ থাকতে পারে না। জসোয়ার বই থেকে আরও এক উদাহরণ টেনে বললেন গ্যালিলিও, এও তো লেখা আছে, জসোয়া প্রার্থনা শেষে বললেন, হে সূর্য তুমি স্থির থাকো, হে চাঁদ তুমিও স্থির থাকো, যতক্ষণ না জাতি তার শত্রুদের নিশ্চিহ্ন না করে। আকাশের মাঝখানে সূর্য স্থির হয়ে রইল, এমন দিন আর কখনও আসেনি আগে।

জসোয়া ঠিকই বলেছেন, গ্যালিলিও বললেন, আকাশের মাঝখানে সূর্য স্থির হয়ে আছে, ঠিক কোপারনিকাস যা বলেছিলেন, আর স্থির সূর্যকে ঘিরে ঘুরছে পৃথিবী এবং অন্যান্য গ্রহ। গ্যালিলিওর যুক্তি কে শোনে! গ্যালিলিও আবার বললেন, ঈশ্বর আমাদের বুদ্ধি দিয়েছেন আর সে বুদ্ধি কাজে না লাগিয়ে কি বসে থাকবো পবিত্র গ্রন্থ ধরে, যেখানে কোনও গ্রহনক্ষত্রের যৎসামান্যও উল্লেখ নেই। বাইবেলের কাজও তো নয় লোককে জ্যোতির্বিদ্যায় পণ্ডিত বানানো। গির্জার লোকেরা যতই তার বক্তব্য ভুল বলে উড়িয়ে দেয়, ততই গ্যালিলিও যুক্তি খোঁজেন। ক্রিশ্চিনাকে লেখা চিঠিতে তিনি জানালেন, ‘কোপারনিকাসের বই নিষিদ্ধ করা মানে বাইবেলের একশ পাতা নিষিদ্ধ করা, যেখানে ঈশ্বরের মহানুভবতার কথা তাঁর অসীম ক্ষমতার কথা বলা হয়েছে। আর ক্যাথলিকের স্বার্থের জন্যই ভাবো না কেন, মহাজাগতিক সত্য অন্যরা, ওই প্রোটেস্টোন্ট ব্যাটারা এক সময় ঠিকই আবিষ্কার করবে, কিন্তু ওদের আগেই যে ক্যাথলিকেরা আবিষ্কার করে গেছে, তা লুকিয়ে না রেখে বরং প্রকাশ করো, ক্যাথলিকদের বাহবা কুড়োতে দাও। ’ গ্যালিলিওর মিঠে কথায় চিঁড়ে ভেজেনি। গ্যালিলিও ধর্মবিরোধী, এ-রকম রব উঠল। তিনি প্রমাণ খুঁজছেন তখন, সূর্যকেন্দ্রিক ব্রহ্মাণ্ডের প্রমাণ! টেলিস্কোপটি একা যথেষ্ট নয় প্রমাণ জোগাতে। আকাশ বাদ দিয়ে প্রমাণ খুঁজতে গ্যালিলিও পৃথিবীর দিকে তাকালেন। সমুদ্রের জলের কথা পাড়লেন, জোয়ারভাটার উদাহরণ দেখিয়ে বললেন, পৃথিবী যদি স্থির হতো, জলও স্থির থাকত। গ্যালিলিওর এ-ধারণা ভুল ছিল অবশ্যই, তিনি তখনও জানতেন না জোয়ারভাটার কারণ, কারণ তখনও তিনি চাঁদের সঙ্গে জলের আকর্ষণ মেলাননি। জানেন না পৃথিবী স্থির হলেও চাঁদের কারণে জলে ঢেউ উঠতই, জোয়ারভাটা হতোই।

পরে জার্মান বিজ্ঞানী কেপলার চাঁদের আকর্ষণের ব্যাপারটি খোলসা করেন। গ্যালিলিওকে রক্ষা করা তাঁর সমর্থকদের পক্ষেও অনেকটা অসম্ভব ছিল। পোপ নিজে ব্যাপারটিতে জড়ালেন। গ্যালিলিওর কোনও যুক্তিই ধোপে টেকে না যেখানে বাইবেলে স্পষ্ট লেখা আছে, সূর্য উদয় হয়, সূর্য অস্ত যায়, আর সূর্য সেখানেই ফিরে আসে যেখানে উদয় হয়েছিল। পোপের অনুমতি নিয়ে কার্ডিনাল জানিয়ে দিলেন, ঈশ্বরের সাজানো মহাজগেক শোধরাবার দায়িত্ব কাউকে দেওয়া হয়নি। পৃথিবীকে তিনি যেমন স্থির রেখেছেন তেমনই স্থির থাকবে, আর সূর্য-চন্দ্র-গ্রহ-নক্ষত্রকে পৃথিবীর চারদিকে যেমন ঘোরাচ্ছেন, তেমনই ঘুরবে এরা। ১৬৬১ সনে, গ্যালিলিওর তখনও পোপের কাছে জবাবদিহি শেষ হয়নি, নিজের মতবাদের পক্ষে কোনও প্রমাণাদি আর গ্রহণ করা হবে না জানিয়ে দেওয়া হল, আর কোপারনিকাসের মতকে মিথ্যে এবং বাইবেলবিরোধী বলে ঘোষণা করা হয়ে গেল, বলা হল কোপারনিকাসের বইটি ততক্ষণ নিষিদ্ধ থাকবে, যতক্ষণ না এটি সংশোধিত হয়। রোম থেকে ফ্লোরেন্স ফিরে গিয়ে, গ্যালিলিও অসুস্থ শরীর নিয়েই, ম্যালেরিয়া নাকি রিউমেটিক, কী বাঁধিয়েছেন কে জানে, বই লিখতে শুরু করলেন, জোয়ারভাটার ওপর লিখলেন একটি। তারপর তো সেই বিখ্যাত বই, ১৬৩২ সনে বেরোল, ডায়ালগ অন দা টু চিফ ওয়ার্ল্ড সিস্টেম, টলেমিক অ্যান্ড কোপারনিকান। জার্মানি থেকে প্লেগ রোগ তখন ঢুকেছে উত্তর ইটালিতে, ফ্লোরেন্স শ্মশানমতো হয়ে যাচ্ছে, আর এদিকে গ্যালিলিও রোমে দৌড়াচ্ছেন, বই বের হচ্ছে। বেরোনোর পরই ডায়ালগ নিষিদ্ধ হল আর গ্যালিলিওকে দাঁড়াতে হল ধর্মযাজকের বিচারসভায়। সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন মারিয়া সেলেস্ত, বাবার জন্য প্রার্থনা করছেন, চিঠি লিখে যাচ্ছেন, চিঠি পাঠাচ্ছেন গোপনে, চিঠি পাচ্ছেন, নিষিদ্ধ সব চিঠি। বিচারে গ্যালিলিওকে নজরবন্দি করা হল। প্রিয় কন্যাকে একটিবার দেখার উপায় ছিল না তাঁর। কন্যা মারা গেলেন হঠাত্ অসুখে, গ্যালিলিওকে, একা মানুষটিকে, আরও একা করে দিয়ে। কন্যার মৃত্যুর পর প্যারিসে এক বন্ধুর কাছে গ্যালিলিও লিখেছিলেন ‘আমার অনুপস্থিতিই মারিয়াকে অসুস্থ করেছে, নিজের স্বাস্থ্যের যত্ন নেয়নি মোটেই। ওর অভাব আমি সইতে পারছি না। ও ছিল অসাধারণ, এ উওমেন অফ এক্সকুইজিট মাইন্ড, সিংগুলার গুডনেস অ্যান্ড মোস্ট টেনডারলি অ্যাটাচড টু মি। ’

একাকিত্বে, অভাবে, অসুখে ভুগতে ভুগতে গ্যালিলিওরও যাবার সময় হল, গালিলিও গেলেন, আইনস্টাইনের মতে, আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের জন্মদাতা, গেলেন। মারিয়া সেলেস্ত বিশ্বাস করতেন, বাবার সঙ্গে তাঁর মিলন হবে নক্ষত্রের ওপারে। গ্যালিলিওর কি সে বিশ্বাস ছিল! ঈশ্বরে, তিনি কখনও বলেননি যে, তাঁর বিশ্বাস নেই। বিশ্বাস থাকলেও, জেনে বা না জেনে ঈশ্বরকে হত্যা করেছেন গ্যালিলিও, আর দুশো বছর পর চার্লস ডারউইন ঈশ্বরের কফিনে পেরেক লাগিয়ে দিয়েছেন।

[কৃতজ্ঞতা  : বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১৪ জানুয়ারি, ২০১৬]

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত