| 21 মে 2024
Categories
গীতরঙ্গ

‘গোলাপ সুন্দরী’ : কবি ও ফুলের মৃত্যুগান । নির্ঝর নৈঃশব্দ্য

আনুমানিক পঠনকাল: 6 মিনিট

আমার আলোচ্যবিষয় কমলকুমার মজুমদার প্রণীত ‘গোলাপ সুন্দরী’ গল্প। এইটি প্রথমে ‘এক্ষণ’ পত্রিকায় প্রকাশ হয়। পরে বই আকারে প্রকাশ হয়। কমলবাবু এইটাকে গল্প হিশেবেই লিখেছিলেন। তো, এইটা একটা বড় গল্প। অনেকে এইটাকে নভেলা বা নভেলেট বা উপন্যাসিকাও বলেছেন। তবে এইটাকে কমলকুমার মজুমদারে উপন্যাস সমগ্রে কেন রাখা হয়েছে আমি জানি না।

মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে লেখকের গদ্যভাষা নিয়ে কয়েকটি কথা বলে নেয়া আবশ্যক বলে আমার মনে হলো। কারণ তিনি বাঙলাসাহিত্যে স্বকীয় একটা সাহিত্যভাষা নির্মাণ করেছেন, যা ললিত কিন্তু খানিকটা বা অনেকের কাছে অনেকটা কষ্টপাঠ্য।

কমলকুমারের তৈরি গদ্যভাষার সৌন্দর্য আস্বাদনের আগে আমার মনে হতো এমন আশ্চর্যসুন্দর কাব্যময়, চিত্ররূপময় ভাষায় কেবল পৌরাণিক উপাখ্যান কিংবা লোককথাই রচনা করা যায়। কিন্তু কমলকুমার পড়ে আরো সুন্দর এমন এক ভাষাবিন্যাসের সন্ধান পেলাম যা আমাকে একটা ঘোরের ভিতর নিয়ে গিয়েছিল। এবং যা বরাবরই ঈর্ষণীয় সুন্দর। সচরাচর অনেক পাঠক-সমালোচককে দেখা যায় কমলকুমার মজুমদারকে দুর্বোধ্য বলে বাতিল করতে। কিন্তু আমি মনে করি আগে তাকে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়তে হবে। সমস্ত না পড়ে তাকে বাতিলের এ প্রবণতা অজ্ঞানতা আর কিছু নয়। ফলত তার প্রতিও সুবিচার করা হয় না, আর পাঠকও তার সাহিত্যরস আস্বাদন থেকে বঞ্চিত হন। অবশ্য তাকে পড়তে হলে পাঠক হিশেবে যথা অর্থে শিক্ষিতও হতে হবে। কারণ কেবল অশিক্ষিত পাঠকের কাছেই তার গদ্যভাষা দুর্বোধ্য ও উদ্ভট মনে হতে পারে। তিনি ললিত ভাষার বাক্য নির্মাণ করতে গিয়ে ভেঙেছেন যতিচিহ্নের যথার্থ ব্যবহার। সাধু-চলিত, প্রমিত-লোকজ ইত্যাদি ভাষা মিলেমিশে তার বর্ণবিন্যাসে একাকার হয়ে গেছে। যদিও তার গদ্য প্রকরণবহুল, আলংকারিক—কিন্তু এর রস আস্বাদন করতে পারাটাও এক দুর্লভ অভিজ্ঞতা এবং সক্ষমতার ব্যাপার। বিষ্ণু দে একবার বলেছিলেন যে কমলবাবু ফরাসি সিনটেক্সে লিখেন। হয়তো তার দীর্ঘ বাক্যকাঠামো আর অসম্পূর্ণ ক্রিয়াপদের ব্যবহার দেখে কিংবা ফরাসিভাষায় তার পা-িত্য সম্পর্কে জেনে এই জাতীয় কথা বলেছিলেন। কিন্তু কমলবাবু তা অস্বীকার করেছিলেন নানা জায়গায়। তার সময় অর্থাৎ পঞ্চাশ-ষাটের দশকে সারা পৃথিবীতে শিল্পসাহিত্যে অনেকগুলি আন্দোলন হচ্ছিল। তা সত্ত্বেও তিনি সবকিছুর প্রভাব এড়িয়ে মূল আঁকড়ে ধরেছিলেন, পাশ্চাত্য নন্দনতত্ত,¡ ভাষা কাঠামোকে অনুসরণ না করে এই অঞ্চলের জীবনাচরণ, সংস্কৃতি, শাস্ত্রাবলি, পদাবলি, নন্দনতত্ত্ব, লোকাচার, ধর্ম ইত্যাকার বিষয়কে আশ্রয় করে একটি ভিন্ন সাহিত্যভাষা নির্মাণে সচেষ্ট হওয়ার সাহস দেখিয়েছিলেন।

‘গোলাপ সুন্দরী’র সময়-কাল ধরা যাক, দেশভাগের আগে বা পরে। যদিও এই গল্পে ওইসবের কোনো ছাপ নেই। এই গল্পে মূল চরিত্র দুইটি। কেন্দ্রীয় চরিত্রের নাম বিলাস। নবীন যুবক। দেখতে রাজপুত্রের মতো অতিশয় রূপবান, রাধিকার মতো চোখ, চোখের রং কালো। অনেকটা কবিস্বভাব, সংবেদনশীল, অন্তর্মুখী, তৎকালীন দুরারোগ্য ব্যাধি যক্ষায় আক্রান্ত। টিবি স্যানোটোরিয়াম থেকে ফিরে একটা স্বাস্থ্য নিবাসে বসবাস করে। যেটা একটা বাগানবাড়ির মতোই, যেখানে বেশ কয়েকটি কটেজ আছে, যেখানে গাছপালার সঙ্গে গোলাপ বাগানও আছে।

বিলাস প্রিয়তম মৃত্যুচেতনার ভিতরেই বাগানে গোলাপ ফোটায়, বিশেষত একটি গোলাপ, যার রং ঠিক কেমন লাল হবে তা তার কাছে অজানা, যে-গোলাপ ফোটার জন্যে নির্দিষ্ট হয়ে আছে কোন এক নারী। যে-নারী অমৃত রতি ও সৌন্দর্যে দিয়ে তরঙ্গিণীরূপে রাত্রির ভিতর এক লহমায় বিলাসকে সমস্ত প্লাবিত করে।

দ্বিতীয় চরিত্রের নাম মনিক চ্যাটার্জি। অপূর্ব সুন্দরী, দারুণ স্কলার। অবিবাহিত। সেন্ট স্কুলের হেডমিস্ট্রেস। বয়সে তরুণীই বলা যায়। বটের ঝুরির মতো দীর্ঘ চুল। কলকাতা থেকে এসে একই স্বাস্থ্য নিবাসের বিলেতি কটেজে মানে মিয়ানার লিলি কটেজে উঠেছেন। কারণ তারও অসুখ। তার অসুখটিও তৎকালে দুরারোগ্যই ছিল বলা চলে। অসুখের নাম বেরি বেরি।

বিলাস ও মনিক প্রথম পরস্পরকে যথাঅর্থে দেখে বিলাসের গোলাপ বাগানের বেড়ার ধারে। সেইদিনই পরস্পরের প্রতি বোধকরি দুজনেরই সদর্থক ব্যাপার তৈরি হয় মনের ভিতর।

তারপর মনিকের সঙ্গে বিলাসের প্রথম দেখা হয় এক ঝড়ের রাতে। মনিক শহরে গিয়েছিল কাজে। ফিরতে ফিরতে রাত্রি। রাত্রিতে ঝড়-বৃষ্টি, বজ্রনিনাদ আর বিজলির চমক। পথিমধ্যে বিলাসের কটেজ পড়ে এই কারণে মনিক ঝড়বৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্যে বিলাসের কটেজে আসে। তারপর গোলাপ, ক্রন্দনের ভিতর গোলাপ সুন্দরীর জন্ম হয়, এইসব আলাপের পর বাতাসের টানে বাতি নিভে যায়, ঘটনাক্রমে স্পর্শ আর ঘ্রাণের টানে পরস্পর মিলিত হয়, রচিত হয় মহাকাব্যিক এক বিস্তার। আর ঝড়ের শব্দ পাল্টে যায় মেঘমল্লারে। তবে অকস্মাৎ এই শৃঙ্গার যেহেতু পূর্ব পরিকল্পিত বা চেতনায় ছিল না, সেহেতু এই মিলন দুজনের পক্ষেই অযাচিত ছিল। ফলত পরস্পর অস্বস্তি, গ্লানি তৈরি হলো, বেজে উঠলো বিচ্ছেদের বাঁশি।

এইবেলা আমরা ‘গোলাপ সুন্দরী’ গল্পের শেষটা পড়ি, ‘…এমত সময় একটি টাইপ করা চিঠি আসিল, এখন সে চিঠি খুলিল।
চিঠিতে সনির্বন্ধ অনুরোধ ছিল, এবং গোলাপ সুন্দরীর খবর ছিল, যে তিনি একটি পুত্র রাখিয়া মরিয়াছেন। আঃ মনিক! একবার বিলাসের মনে হইল, যাঁহাকে সে প্রথমে পবিত্র শুদ্ধ বস্ত্র পরিধান নিমিত্ত দেয়, তিনি বলিয়াছিলেন ‘আমার মা—পাগল ছিলেন’এবং একথা শ্রবণে তখন সে, বিলাস, বাহিরের মহাপ্রলয় দেখে ।
বিলাসের নিঃশ্বাস দুর্বল হইয়া আসিয়াছিল তথা আর কয়েকটি নিঃশ্বাস মাত্র সম্বল এ কারণে দীর্ঘ নিঃশ্বাস তাহার ছিল না। শুধু ইতিমধ্যে, সম্ভবত, মনে হইল মৃত্যুকে অমোঘ করিবার জন্য পুনরায় সে শিশু হইতেছে।’

এই শেষ অংশটা মনিকের সঙ্গে বিচ্ছেদের অনেকদিন পার হওয়ার পর। অনেকদিন মানে এক বছরও হতে পারে। এই অংশের চিঠিতে আমরা জানতে পারি, একটা পুত্র সন্তানের জন্ম দিয়ে মনিক চ্যাটার্জির মৃত্যু হয়েছে। ধরে নিই এই সন্তান বিলাসেরই ঔরষজাত। গল্পের শেষ অনুচ্ছেদে সম্ভবত চিঠি পাঠের পরই বিলাসের মৃত্যুর কথা বলা আছে। সে মৃত্যুকে মহিমা দেয়ার জন্যে পুনর্বার শিশু হচ্ছে মানে এই শিশুর মধ্যে আমি মনিকের সেই পুত্র সন্তানের মুখই দেখতে পাই।

এইবার গল্পের শুরুটা পড়ি, ‘বিলাস অন্যত্রে, কেননা সম্মুখেই, নিম্নের আকাশে, তরুণসূর্য্যবর্ণ কখনও অচিরাৎ নীল, বুদ্বুদসকল, যদৃচ্ছাবশতঃ ভাসিয়া বেড়াইতেছে।’ এটা ‘গোলাপ সুন্দরী’র প্রথম বাক্য। এখানে লেখক একটা দৃশ্য আঁকলেন, যার দর্শক বিলাস নামের একজন যুবক, কিন্তু সে নির্লিপ্ত ঘটমান দৃশ্যের প্রতি। কমলবাবুর লেখার একটা বৈশিষ্ট্য হলো, পরিবেশের তিনি সবকিছুর খুঁটিনাটি বর্ণনাও দেন। কিন্তু চরিত্রগুলিকে আঁকেন সিঙ্গেল লাইনে। এমনকি সংলাপে বাক্যও শেষ করেন না, ক্রিয়াপদ অসমাপ্ত থেকে যায় মানে পাঠকের কল্পনার ভিতর ডট দিয়ে ছেড়ে দেন। আমরা জানি যে কমলবাবু একই সঙ্গে একজন চিত্রীও। ফলত তিনি আসলে ছবিকেই লিখেন। তার বর্ণনার চিত্ররূপময়তা বাক্যের খাঁজে খাঁজে দৃশ্য হয়ে ধরা দেয়।

বিলাসকে আমার কাছে একজন কবিই মনে হয়, তার ভিতর যে একজন কবি বসত করে তা শুরুতেই প্রথম অনুচ্ছেদের দ্বিতীয় বাক্যে আমরা জানতে পারি। এই বাক্যটা বেশ দীর্ঘ। এই এক বাক্যেই বিলাসের মনোদৈহিক একটা অবস্থার কথা অনুমান করা যায়।

শুরুতেই বিলাসের যক্ষা জেনেই বুঝতে পারি তার পরিণতি কী হবে। কারণ যে-সময়ের পেটের ভিতর বসে কমলকুমার এই আখ্যান রচনা করেছেন সেই সময় যক্ষা প্রাণঘাতী, প্রচলিত প্রবাদই ছিল, ‘যার হয় যক্ষা তার নেই রক্ষা।’তো পড়তে পড়তে বিলাসের মৃত্যুর প্রতীক্ষার সঙ্গে তৈরি হয় একজন গোলাপ সুন্দরীর প্রতীক্ষা।

একদিন বিলাসের লাগানো গোলাপ গাছ কুঁড়ি আসে, যেদিন মনিক বাগানের পাশে এসে মুহূর্তের জন্যে দাঁড়ায়। যেন তার এই বাগানসংসর্গের কারণেই এই আশ্চর্য কুসুমায়ন। এই গোলাপের উত্থান, হাওয়ার রাতে মনিকের রমণীয় ঘ্রাণ বিলাসের জীবনতৃষ্ণা আর কামনাকেই প্রলম্বিত রূপ দেয়। মনিকের আগমনের পরপরই জেনে যাই তারও বেরি বেরি রোগ। এইভাবে তার মৃত্যুর গন্ধও পেয়ে যাই।

সতেরো-আঠারো বছর তো হবেই—কমলকুমার মজুমদারের উপন্যাস সমগ্র আমার হাতে এসেছিল। প্রথম পড়েছিলাম, ‘অন্তর্জলী যাত্রা’ থেকে ‘আলো ক্রমে আসিতেছে’ এই বাক্য। এ যেনো বেদবাক্য, যেন বাক্য দিয়েই শুরু করতে হয়। তারপর পড়া শুরু করেছিলাম ‘গোলাপ সুন্দরী’ দিয়েই। প্রতিটি লাইন, প্রতিটি অনুচ্ছেদ প্রথমবার কয়েকবার করে পড়তে হয়েছিল। তারপর আবারও পড়েছি ‘গোলাপ সুন্দরী’—আমার কাছে অমৃতের মতো লেগেছে। আর মনিক চ্যাটার্জির কণ্ঠে ‘আলো নিভে গেছে’ এই বাক্য শুনে গোলাপ সুন্দরীর মধ্যে ডুবে যাই। আশ্চর্য বিস্ময়ে পড়ি তৃষ্ণার সৌন্দর্য, ‘…এইভাবে খুঁজিতে খুঁজিতে যে হাতে বিলাসের একদা কাঁটা ফুটিয়াছিল, যে হাতে গ্রন্থ ধরিয়া শ্লোক পাঠ করে, সেই নিমিত্তমাত্র হাতে, উষ্ণতার স্পর্শ লাগিল মানবীর দেহ অথবা নিশ্বাস। বাষ্পসম্ভূত মেঘ, মেঘ উৎপন্ন আলোকে—ভাস্কর্য্যের বিপুলতা বিলাস দেখিল। এইটুকু দেখা লইয়া তাহার মনে হয় যে ঘুম ভাল।’ ঝড়ের রাতে অভিসারের সেই রোমহর্ষ অনুভূতি নিয়ে আমি পড়ি, ‘আমাকে ছেড়ে যেও না, আমি ভীত’ এবং ইহার পর মাথা নত করিয়া মনিক বলিতে চাহিয়াছিলেন যে শুদ্ধ বস্ত্র পরিবর্ত্তনকালে আলো নিভিয়া যায় ফলে…। মনিকের কথার উত্তরে বিলাস গভীর কণ্ঠে বলিল ‘গোলাপ সুন্দরী’ এ কথা সত্যই অনুক্ত ছিল, সে কেবল মাত্র তাহার দিকে চাহিয়াছিল । পুনরায় মনিকের কণ্ঠস্বর ‘গোলাপের মধ্যে আমারই ক্রন্দন—যে কান্না আমি বহুকাল ধরে কাঁদছি। তোমাকে আমি…’ ইহার পর মুহূর্ত্তের জন্য দুজনকে পরাজিত করিবার চেষ্টা করিল, একে অন্যের দেহের সুমধুর আনন্দধারা নিঃশেষ করিয়া শুষিয়া লইতে চাহিল। সহসা অশরীরী বজ্রাঘাতে দুইজনেই বিক্ষিপ্ত হয়। সহসা যেমত পাখী ডাকিয়া উঠিল, লজ্জা আসিল ।’

কারো মতে ‘গোলাপ সুন্দরী’ তার ভালো রচনাগুলির মধ্যে পড়ে না। হতে পারে। কিন্তু আমি তো গবেষক নই। আনন্দপাঠে আমার মাথার ভিতর যতটা ধরেছে গোলাপ সুন্দরীর বাক্যপরম্পরা আমার রক্তের ভিতর ঢুকে গেছে। যেন আমিই বিলাস, যক্ষাতুর একজন কবি—হাসপাতাল থেকে ফিরে আপন বাগানে ফোটাচ্ছি আশ্চর্য সব গোলাপ। হতে পারে এই বইটির ভাষা কমলকুমারের অন্যান্য ফিকশনের ভাষা থেকে তুলনামূলকভাবে সহজ, তাই সহজেই আপন মনে হয়েছে।

বিলাস তার বাগানে গোলাপ ফোটায়। এইখানে গোলাপ মূলত জীবনের প্রতীক বেঁচে থাকার প্রেরণা, মৃত্যু থেকে জীবনের দিকে যাওয়ার অমোঘ বাহন, থ্যানাথোস ভেঙে এই গোলাপ হয়ে উঠতে চায় লাইফ-ড্রাইভ। গোলাপকে আমরা দেখি, বিলাস তথা লেখক রক্তমাংসে রূপ দিচ্ছে, আর গোলাপ মনিক চ্যাটার্জিরূপে হয়ে উঠছে গোলাপ সুন্দরী, এই গোলাপ সুন্দরীই ইরোস। এই যে অত্যাশ্চার্য পার্সোনিফিকেশন এইটা সম্ভব হয় কখনো বেঁচে থাকার একপ্রকার উদগ্র বাসনা থেকে। শেষে দেখি বিলাস দীর্ঘশ্বাস জমিয়ে রাখে, কারণ তাকে নিশ্বাস নিতে হবে আরও কিছু সময় বেঁচে থাকার জন্যে। গোলাপ তার পূর্বাপর অনেক রচনাতেও প্রায় একই ভাবে আমরা আসতে দেখি। যেমন ‘অন্তর্জলী যাত্রা’র এক জায়গায় আমরা পড়ি, ‘আর যে এই ক্ষণেই তিনি মানসচক্ষে অবলোকন করেন, কাহারা যেমত বা এক মধুর গীত গাহিতে গাহিতে আসিতেছে, ইহাদের স্বেদ নেই, ইহারা ক্লান্ত নহে, যে-গীতের মধ্যে আশা, যে-আশার মধ্যে গোলাপের গন্ধ, যে-গোলাপগন্ধের মধ্যে বাল্যকাল, যে-বাল্যকালের মধ্যে নিরীহতা, কাহার অন্তরীক্ষ আলেখ্য বহনে গর্ব্বিত।’

কিন্তু বিলাস নিজেই কখনো মনে করতো জীবন ক্ষুদ্র, শিল্পই ব্যাপ্ত। সে তার ডায়েরিতে এই জাতীয় কথাও লিখে রেখেছিল। তার যক্ষা সত্ত্বেও তাকে সিগারেট খেতে দেখা যায়, হয়তো মদও খায়। মনে করা যেতে পারে সে নিজেই শিল্প যথা রতি, কবিতা, নারী, গোলাপ ইত্যাকার সৌন্দযর্কে মহিমান্বিত করে মৃত্যুকে টান দিয়ে নামিয়ে এনে চাদরের মতো গায়ে জড়িয়ে নেয়। ফলত তার দীর্ঘশ্বাস জমিয়ে রাখাও একার্থে খেয়ালই মনে হয়। এইভাবে কবিতা আর গোলাপের আশ্চর্য প্রস্ফুটন, আপাতচোখে বাঁচার বাসনা, জমিয়ে রাখা দীর্ঘশ্বাসের পরও পরপর মৃত্যু এসে ঢেকে দেয় গোলাপের বাগান। তো বলা যায় ‘গোলাপ সুন্দরী’ মূলত কবি ও ফুলেরই নিশ্চুপ মৃত্যুগান।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত