| 14 জুলাই 2024
Categories
গল্প ধারাবাহিক সাহিত্য

বড়গল্প: কাঠ কয়লা ছাই (শেষাংশ)

আনুমানিক পঠনকাল: 25 মিনিট

নেতা মানুষকে খুঁজে পেতে দেরি হয় না। সবাই চেনে। আকলিমা কত বছর এখানে আছে, শহরের গাছপালা কাকপক্ষী যেমন তাকে চেনে না, তারও জানা নেই রাস্তাঘাট অলিগলি। মুনা সহজ শর্টকাট রাস্তায় নিয়ে এসেছে বালুবাড়ি ট্যাংকি মোড়। স্কুলের উত্তর পাশে এক বটগাছ। ছোটখাটো ঝাঁকড়া গাছের ডালাপালা চারপাশ ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে কোনো চায়ের দোকানে চুলো জ্বলে। সাদা ধোঁয়া উঠে যায় আকাশে। নেতার নাম বলতেই কেউ একজন দেখিয়ে দেয়। বেগুনি রঙের চারতলা বাড়ি। অমন ভোর-সকালেও মানুষজনের ভিড়। তাদের হাতে বিবিধ কাগজপত্র। ফিসফিস কি মৃদু কথাবার্তায় আশা-প্রত্যাশর স্বপ্নদোলা। একটি গ্যারেজ ঘর। দোকানের মতো শাটার দরজা। উত্তর-দক্ষিণে কয়েকটি বেঞ্চ। পুব দেয়ালে টেবিল আর চেয়ার। টেবিলের উপর অ্যাশট্রে। আকলিমা আর মুনা দরজার কাছাকাছি উত্তরের বেঞ্চে বসে পড়ে। এতক্ষণে যেন একটু দম ফেলার সুযোগ আসে। অনেকখানি রাস্তা, হেঁটে আসতে ক্লান্তিতে হাঁসফাঁস ধরে যায়। তাদের হাতে কোনো কাগজপত্র নেই। মনের মধ্যে হাজার কথা উসখুস করে।

আকলিমা যেমন ভেবেছিল তেমন নয়, ইকবাল আজিজ মধ্যবয়সি মানুষ; চেহারাছবিতে অদ্ভুত হাসি হাসি আলো। আকলিমার মনে অলীক ভরসা এসে ভিড় করে। নিজেকে নির্ভার হালকা লাগে। মনের কোনায় বিশ্বাস খুঁজে পাওয়া যায়। আশা-প্রত্যাশার চঞ্চল গতায়াত। এবার হয়তো বিফল হবে না। কাজ হবে। এই মানুষ একটি ফোন করে দিলে হাসতে হাসতে বেরিয়ে আসবে তার কলিজার টুকরো। সে কি সকলের আগে তড়িঘড়ি সামনে এগিয়ে যাবে? কেড়ে নেয় কথা বলার সুযোগ? সে পারে না। কেউ একজন মানুষের ভিড় সামাল দেয়। ইকবাল আজিজ ধোঁয়া ওড়ান। কি তার সুবাস! এরমধ্যে আরও কয়েকজন মহিলা এসে জড়ো হয়। আকলিমার বিস্ময়। কেউ একজন পাশে থেকে বলে, –

‘বেটি তুমার কার্ড হয়নি মা? এত অল্প বয়সে বিধবা হইছ। হায় কপাল!’

‘অনেক আগে গো চাচি। মানুষটা আগুনে পুড়ে মারা গেল।’

‘আহা! কী হইছিল?’

আকলিমার কথা বলতে ইচ্ছে করে না। এতক্ষণে সব বোঝা হয়ে গেছে। কেউ বিধবা ভাতা, স্বামী পরিত্যক্তা বা বয়স্ক ভাতা অথবা কোনো আশায় এসেছে। তার তো কোনো ভাতা চাই না। এই দুটি হাত আর শরীর যদি ঠিক থাকে, আল্লাহর দুনিয়ায় কারও করুণার দরকার নেই। এখানে-ওখানে কাজ করতে পারে সে। শখ করে রান্না শিখেছিল। কত রকম রান্না। সেই বিদ্যেয় হোটেলে কাজ। মহাজন দিলশাদ খান মানুষ ভালো। সময়মতো বেতন-বকশিশ। এটা-ওটা যা রান্না, কখনো খাওয়ার জন্য কিছু তুলে দেয়। সমীহ করে কথা বলে। মানুষের সম্মান হলো জীবনের বড় মুলধন। এটি চলে গেলে আর কিছু থাকে না। এই বোধ শিখিয়ে গেছে আবদুর রশিদ। কারও কাছে কিছু চাইতে নেই। কোনো অতিপ্রত্যাশা বা কারও সঙ্গে তুলনা উচিত নয়। এতে দুঃখ বাড়ে। কিন্তু সেই সময় আর আজকের দিন এক নয়। আকলিমা আজ কারও সামান্য করুণার জন্য এসে দাঁড়িয়েছে। মানুষের দরবার। কেন জানি আবদুর রশিদের মুখছবি একঝলক ভেসে উঠেই মিলিয়ে যায়। উজ্জ্বল সেই চেহারা ধীরে ধীরে কাঠ-কয়লা-ছাই। আকলিমা আকস্মিক শিহরে উঠে। মুনার হাত চেপে ধরে। কোনোকিছু আর মনে করবে না। অতীতদিনের সুখ ডেকে কষ্ট কেন? তার দম বন্ধ হয়ে আসে। মামুনের মুখ ভেসে ওঠে। হায় বড় কষ্টে আছে ছেলে তার!

‘বেটি এটা তোমার কে? মেয়ে?’

‘হ্যাঁ।’

‘আহা একেবারে পরির মতো চেহারা গো! ও রে আনছ ক্যান? যা রোদ!’

‘মা তো কিছু জানে না। তাই সাথে আসছি।’

মুনা নিশ্চুপ শুনতে শুনতে টুপ করে জবাব দিয়ে বসে। এরপর কী কথা, কথামালা; সময় বয়ে যায়। বাইরে রোদ বাড়ে। মেহগনির গাছ দুটোয় নতুন চকচকে পাতায় আলো খেলা। বাতাসে থিরথির কম্পন। শাখার কোনো আড়ালে কোকিল ডেকে ওঠে ’কু-উ-উ’। বড় চেনা-অচেনা সময় সময় ভুলিয়ে দেয়। ইকবাল আজিজের কণ্ঠ বেশ ভারী। আঙুলের ফাঁকে সিগারেট। আকাশে নীল-সাদা খুশবু ধোঁয়া ভেসে যায়। সকলের কথায় গভীর মনোযোগ। সব শুনে সহজ সমাধান। পাশে দাঁড়ানো মানুষ সব শিখিয়ে-বুঝিয়ে দেয়। কার কাছে যেতে হবে, কী করা দরকার ইত্যাদি। আকলিমার দু-চোখে মুগ্ধছায়া। মানুষ এমনি এমনি নেতা হয় না। নিজের ঘরদোর সামলে মানুষের কত কাজ করতে হয়। হাজার সমস্যার সমাধান। আজ তার সমস্যার ইতি ঘটবে। মামুন বেরিয়ে আসবে চোদ্দো শিকের খাঁচা থেকে। ছেলেকে এবার তাবিজ পরিয়ে দেবে। মাথা ঠান্ডা হয় এমনকিছু। একদিন দশমাইলে জাকিরুল হাজীর কাছে যেতে হয়। সে নিশ্চয়ই যাবে। মুনাও সঙ্গে থাকবে। মেয়ে অনেক বুদ্ধিমতী। এক বোতল পানি নিতে হয়। সেই বোতল মাটিতে রাখা যায় না। যেখানে-সেখানে নয়। হাজী সাহেব নিজে থেকে সব বলে দেয়। কোনো অপচ্ছায়া মাথার উপর ছায়া ফেলেছে নিশ্চয়। মামুন এত গম্ভীর কেন তবে? এইসব এলোমেলো হাজার ভাবনায় বেলা বাড়ে। মামুন কী খেলো? কে দেবে খাবার? আকলিমার বিষণ্ন নিশ্বাস। এখানের কাজ সেরে যেতে হবে। অনেক দীর্ঘ সময়। মানুষের হাজার সমস্যা। কেউ ভাতা পায়নি। কারও ঘরবাড়ি ভাঙাচুরা। আকলিমার শ্রুতিতে মনোযোগহীন কাহিনি। তারপর একসময় সিরিয়াল আসে। সে টেবিলের দিকে এগিয়ে যায়। কী বলবে? কীভাবে? ইকবাল আজিজের হাসি মুখ। চোখে জাদু মায়া। আওয়াজে ভরসা-বিশ্বাস।

‘কী বিষয় আম্মাজান? সমস্যা কী? ভিজিডি কার্ড লাগবে?’

‘বাবা আমার ছেলে…আমার ছেলে।’

মুনা ধরে রাখে মাকে। আকলিমা যে পড়ে যায় যায়। সারারাত জেগে আছে। কোনোকিছু মুখে তোলেনি। মুনাও তো। সে না হয় সহ্য করতে পারে, কিন’ অসুস’ এই মানুষ? মামুন না জানি কী খেয়ে রাত পার করে। পুলিশ কী মারধর করেছে? কে জানে। মুনার দু-চোখ ভিজে আসে। ঘোলাটে চারপাশ।

‘স্যার আমার ভাই রে পুলিশ ধইরা লইছে কাল। সে কিচ্ছু জানে না। কলেজে পড়ে। কাল সন্ধ্যার সময় যখন প্রাইভেট পড়াইতে যাইব, তহন পুলিশ আইস্যা থানায় লইছে। সে নাকি মাদক কারবারি। সে তো প্রাইভেট পড়ায়। এসব কিচ্ছু জানে না। পুলিশ আইলে কে যেন ঘরে ঢুইক্যা কী কী সব করে…। তারপর ফেনসিডিল আর ট্যাবলেট পাইছে।’

‘এত কথা বলার দরকার নাই। আসল কথা কও। কী করতে হবে?’

‘বাবা আপনে যদি থানায় কিছু কন, ছেলেডা ছাড়া পায়। তারা ভুল করছে।’

‘পুলিশ আমার কথা শুনবে? তারা সরকারি লোক। আর তোমার পোলারে পুলিশ ধরবে কেন?’

‘স্যার…স্যার একটা ঘটনা হইছে। কদিন আগে সজল ভাইয়ের লগে কাজিয়া হইছিল তার। তাই কেউ কিছু করছে কি না?’

‘সজল? ও দাঁড়াও দাঁড়াও।…কাশিম যাও তো সজলকে ডাকো।’

‘সজল ভাই তো রংপুর গেছে ভাই। মিটিং আছে। রাতে ফিরতে পারে।’

‘আচ্ছা। তোমার নাম কী?’

‘আমি মুনা স্যার। আমার মা আকলিমা বেগম। আমার বাবা জজকোর্টে ভেন্ডার ব্যবসা করত স্যার। আগুন লাগছিল না এক বছর, তখন পুইড়া মারা যায়। স্যার যদি একটু ব্যবস্থা করে দেন।’

‘বাবা তুমার পায়ে পড়ি, পোলাডারে মাফ কইরা দেন। আর কক্‌খনো কিছু করব না বাবা।’

‘তোমার ছেলে কী করছে? অন্য কারুর মাল রাখছিল না কি?’

‘না স্যার…আমারে মাফ কইরা দেন স্যার। ভাই সজল ভাইরে ভুল বুইজ্যা থাপ্পড় মারছিল। সে জানত না কিচ্ছু।’

‘আচ্ছা…আচ্ছা। তোমরা যাও। আমি সজলের সাথে কথা বলি। সে কী বলে।’

‘বাবা কোর্টে চালান দিলে আর পারব না বাবা। আমরা বড় গরিব মানুষ। হোডলে কাজ করি। দেখেন বাবা আমার শরীরে কিচ্ছু নাই। হাত দুইডা জ্বইলা গেছে।’

আকলিমা খুব ব্যস্তত্রস্ত কবজি দুটো তুলে ধরে। নেতার সময় কোথায়? মুনা সত্যি এতদিন খেয়াল করেনি। মায়ের আঙুলগুলো প্রায় জ্বলে গেছে। মা এত কষ্ট করে? সে আর কষ্ট করতে দেবে না। যেভাবে হোক এই কাজ হয়ে গেলে ভাইয়ের সঙ্গে বসে সেই পুরোনো আলোচনা ঠিক করে নেবে। কয়েকটি টিউশন নিলে কী এমন ক্ষতি? মাকে একটু শান্তি দেওয়া দরকার। মুনা আর কোনো কথা শুনবে না। বিবিধ ভয়ে আধমরা হয়ে বেঁচে থাকা যায়? মেয়েরা কাজ করছে না? মুনা শত ভাবনার মধ্যে নিশ্চুপ শোনে দরবারের ঘোষণা। ইকবাল আজিজ বলে, –

‘আচ্ছা…আচ্ছা। দেখি কী করা যায়। কাশিম এদের বুঝিয়ে বিদায় করো। হ্যাঁ কী যেন নাম…মুনা, মুনা তুমি বিকালে, না না দুপুরের পর পর একবার খবর নিয়ো। আমি এরমধ্যে থানায় বলে দেব। ঠিক আছে?’

‘জি স্যার। আমরা তা হলে যাই স্যার।’

‘হ্যাঁ…হ্যাঁ যাও।…তারপর আর কে আছে?’

ঘরের দমবন্ধ বাতাস থেকে মুক্তি। সেই কারণে নাকি দিশাহীন বুকের কোনায় আশার একটু আলো। আকলিমা বুকে স্বস্তি খুঁজে পায়। মুনা তার হাত ধরে রাখে। আবদুর রশিদের কাঁধে যেমন সকল নির্ভরতা সঁপে দেয় আকলিমা, মেয়ে তার সেই সাহস জাগিয়ে তোলে। এখন মোবাইলের জামানা। ইকবাল আজিজ একমিনিট কথা বলে জেনে নিতে পারে সবকিছু। তার মনে থাকবে তো?

লোকাল বাস কলেজ মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। টারমিনাল থেকে পঁচিশ মিনিট পর পর বাস চলে। কোনো বাস রংপুর যাত্রা করে। কোনোটি ঠাকুরগাঁ। প্রত্যেক বাস দশমাইলে চার-পাঁচ মিনিট ব্রেক দেয়। কলেজ মোড় প্রথম ব্রেক। সেখানে একপাশে একটি মেয়ে তীর্থের কাকের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। তার অগোছালো মুখছবিতে অচেনা বিষাদ সবটুকু সৌন্দর্য-মায়া কেড়ে নিতে পারে না। সে কি তাই ওড়নায় চেহারার একপাশ ঢেকে রাখে? কেউ একজন শেষ সকালে সেই ওড়না কেড়ে রাস্তায় ফেলে দিয়েছিল। হায় তারপর অন্তর্গত সমুহ বিষাদ! বাসে দু-চারজন মানুষ উঠে গেলে নিজেকে গলিয়ে নিতে পারে সে। এরমধ্যেই দু-চারজন সুপারভাইজার চিনে রেখেছে। সেদিন মহিদুল হেসে হেসে জিজ্ঞেস করে বসে।

‘কি রে মুনা এখনো জোগাড় হয়নি? মায়ের অপারেশনে কত লাগবে?’

‘কুড়ি হাজার ভাই।’

‘কত জমা হইছে?’

‘আর কয়েকটি টাকা ভাই। তারপর বাসে আর উঠব না।’

মুনা অবশেষে বাস ছেড়ে দিলে মানুষের কাছে আঁচল পাতে। ওড়নার একটি কোনা অথবা হাত। করুণ স্বরে দুটো কথা আবদার। যে কথা কখনো বলতে চায়নি সে। নিজেকে এভাবে অপমান করতে ভালো লাগে না। কারও কাছে হাত পাততে ঘৃণা হয়। উপায় কী? সেদিন দুপুরের দিকে মাথায় রোদতাপ নিয়ে হাজির হয়েছিল। গ্যারেজের মতো ঘর, তার শাটারের নিচে বড় বড় দুটো তালা। সে অসহায়ের মতো কী করবে বুঝে উঠতে পারে না। মেহগনি গাছের চকচকে পাতায় উত্তরে বাতাস। আচমকা শুকনো ধুলো ওড়ে। বেভুল বেরিয়ে আসা আধশুকনো শাখায় একটি কাক। বিশুষ্ক দৃষ্টিতে রোদ খেতে খেতে এদিক-ওদিক দেখতে থাকে। মুনার গলা আরও শুকিয়ে যায়। কী করবে সে? নির্জন রাস্তার এপাশ-ওপাশ তাকিয়ে কোনো গলি খোঁজে। কোনো রাস্তা। আশাহত সন্দিগ্ধ এগিয়ে যায়। এক গলি থেকে অন্য গলি ঘুরে পুনরায় ফিরে আসে সেই শাটার ঘর। তারপর নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকা। তখন মসজিদের পাশে পান-সিগারেট টং দোকানের মানুষ নিচে নেমে আসে। দোকানের সামনে পানি ছিটোয়। বাতাসের রোদ হিম স্পর্শে খেলায় মাতে। মুনার অপেক্ষার শেষ নেই। কতক্ষণ কে জানে। আইন কলেজের দিক থেকে অসম্ভব সাদা এক কার এসে দাঁড়ায়। ইকবাল আজিজ ভুলে যায়নি। তার দু-চোখে হাসি হাসি মুগ্ধতা অপার।

‘মুনা কখন এসেছ?’

‘এখনি স্যার। স্যার…?’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ থানায় বলে দিয়েছি। খোঁজ নিয়ে দেখ কেমন।’

‘অনেক অনেক কৃতজ্ঞতা স্যার। আমি এখনই যাচ্ছি। আসি স্যার।’

‘কোথায় যাবে? কার কাছে?…এই মেয়ে শোনো।’

মুনা অনেক কথা শোনে অথবা একটি-দুটি কথা যার অনেক অর্থ। সে আর কোতয়ালি যায় না। মাকে আনতে পারেনি। সকালে এখান থেকে ফিরতে ফিরতে রাস্তায় ক্লান্তি-অবসাদে বমি করে ফেলে। প্রেশার বেড়েছে নাকি কমে গেছে তার হাত-পা বেশ ঠান্ডা। মুনা রিকশা ডেকে ঘরে আসে। মাকে কলতলায় নিয়ে মাথায় পানি ঢেলে দেয়। আকলিমার মাথার দপদপানি থামে না। চোখের মণিতে দুপুরের আলো অসহ্য লাগে। মুনা সব বোঝে। সে উনুন জ্বালিয়ে চাল ফোটায়। আলু সেদ্ধ করে ভরতা। সেই ভাত মুখে তুলতে না তুলতে চোখ ভেজা আক্ষেপ। আকলিমার গলা দিয়ে ভাত নামে না। হায় মামুন এখনো না খেয়ে আছে! কোনোদিন যাতে কোনোরকম কষ্ট না পায় কত চেষ্টা আকলিমার। আজ কীভাবে এত কষ্ট চলে এলো? কোন পাপে? মুনা কী করে? সেও সকল ব্যথার সাক্ষী অবশেষ দুটো ভাত মুখে তুলে রাস্তায় নামে। কোতয়ালি যেতে হবে।

শহরের রাস্তায় ভিড় থেমে নেই। মানুষের যথারীতি তড়িঘড়ি ব্যস্ত চলাচল। রিকশার হই-হুল্লোড় দুদ্দাড় গতি। নিমতলার বটছায়া শুধু উদাস লাগে। চায়ের কাপে চামচের টুং টাং নেই। বুধারুর চা-স্টল কালো পলিথিনে ঢেকে রাখা। বন্ধ। তপন দোকানে বসে আছে। স্টুডিও’র সামনে জাপানি মডেলের প্রমাণ সাইজ হার্ডবোর্ড পোস্টার। হালকা সবুজ সুইমিং স্যুটে জলপরি মনে হয়। তার ঠোঁটের হাসি আপাদমস্তক সকাল-সন্ধ্যা। কেউ ভোলে…কারও মন ভোলায়। তপন সেদিকেই ড্যাবড্যাব তাকিয়ে আছে। মুনা কী ভেবে এগিয়ে যেতে যেতে থমকে দাঁড়ালে বাতাসের ঝাপটা ঢেউ। একরাশ ধুলোর সঙ্গে জলভেজা হিমছোঁয়া। কোনো দোকানি রাস্তায় পানি ছড়াতে থাকে। তপন সেদিনের কথা কেন বলেছে? এটা উচিত হয়নি। যখন যেখানে যা বলার সেই সাহস না থাকলে কেমন মানুষ? মুনা কি বোঝে না? এইসব ভাবনার মধ্যে কোথায় কী জন্যে কীভাবে সব করতে পারে অথবা পারবে মন উদ্‌বেল হয়। কোনোদিন এমন সমস্যার মধ্যে পড়তে হবে কখনো ভাবেনি সে। নিজেকে বড় অসহায় লাগে তার।

মামুন থানায় নেই। কোতয়ালি গেটের কাছে মায়াবী সুবাস। ঘোড়ানিম গাছের সবগুলো ফুল বুঝি মাটিতে ছড়িয়ে আছে। মুনা কাকে কী বলে অথবা কীভাবে জানা নেই। সে সামনের একজন সিপাহির কাছে যায়। কেউ একজন ছাই রং ভবনের ভেতরে চেয়ার-টেবিলে বসে কিছু লেখে। একবার চোখ তুলে তাকায়। সেই মানুষ জানিয়ে দেয় সবকিছু। মামুনকে চালান করে দেওয়া হয়েছে। বিকেল বা সন্ধেয় জেলে নেওয়া হবে। মুনা কী করে? তার হাত-পা কাঁপে। এই পৃথিবীর এত নিয়মকানুন কোন্ সৃষ্টিকর্তা তৈরী করেছেন? কেন? কোন্‌ মহৎ সাধনা তার? সে দিগ্‌ভ্রান্ত কীভাবে হেঁটে হেঁটে দুপুর গড়িয়ে বিকেল ঘরে ফেরে, আর সব ইতিহাস নাকি রূপকথার গল্প শুনিয়ে দেয়; আকলিমার দু-চোখে অন্ধকার নেমে আসে। কী করবে এবার? তখন কেন জানি খুব করে মনে পড়ে সেই মানুষ, যার কাঁধে সবকিছু ছেড়ে দিয়ে কোনোদিন কোনো ভাবনা-দুর্ভাবনা নিজের কাছে রাখেনি। একটি মানুষ না থাকলে কত শূন্যতা নেমে আসে। তারপর নিজের কাজ নিজেকেই করতে হবে। কারও জন্য সময় থেমে থাকে না। সে ধীরে ধীরে উঠে বসে। মুনা তার সকল কাজে সাক্ষী।

‘চল মা মানিক উকিলের লগে বুজ-পরামর্শ কইরা আসি।’

‘যাইতে পারবা? তুমার তো মাথাব্যথা। মাথাই তুলতে পারছ না।’

‘তাও যাইতে হবো রে মা। কেডায় যাইব? তুরে একলা ছাড়ন যাইব না। এ্যাহন কি ছুডো আসছ?’

‘চলো তাইলে।’

মানিক রঞ্জন উকিল মধ্যবয়সি মানুষ। চোখে ভারী চশমা। বসার ঘরে তিন-চারটি আলমারি। মোটা মোটা বইয়ে ঠাসা। একপাশে লম্বা ফাইল কেবিনেট। টেবিলে অনেক কাগজপত্র। ডানপাশে কম্পিউটার। মনিটর স্ক্রিনে মোনালিসার রহস্য হাসি। আকলিমার সব কথা বলা শেষ হলে কিছুক্ষণ ভাবেন। তারপর পরিষ্কার বুঝিয়ে দেওয়া শুরু। সরকার মাদক অপরাধের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স অ্যাকশনে আছে। বেইল মুভ বা জামিন হবে না। এই কেস তাই খুব রিস্‌কি। এদিকে আসামি জেলহাজতে, বের করে আনার কোনো গ্যারান্টি নাই; তবে চেষ্টা করে দেখা যায়। এখন কোন্‌ কোর্টে উঠবে কে জানে? ম্যাজিট্রেট যদি দয়া করেন। কোতয়ালির চার্জশিট বা এফআইআর সহজ হলে অবশ্য কেস অন্যরকম। সেখান থেকেই শুরু করতে হবে। উকিলের ভারী দৃষ্টি। কোনো অভিব্যক্তি আছে কি নেই দুর্বোধ্য। আনন্দ-হাসি-বিষাদ-আশ্বাস কিছু না। সহসা যেন ফিসফিস কথা জেগে ওঠে। ঘরে বেজে চলে ফ্যানের নিশ্চুপ ঢেউ।

‘কোনো নেতার সঙ্গে খাতির আছে?’

আকলিমা আর মুনা নিজেদের মধ্যে একবার তাকিয়ে নেয়। অনেক ভরসা পেয়েছে। ইকবাল আজিজ আন্তরিক মানুষ। অবশ্য থানায় ফোন দিয়েছে কি না সত্য জানা নেই। অথবা ফোন করার আগেই পুলিশ ভ্যানে উঠে গেছে মামুন। সব নসিব। কেউ বুঝি ছোট এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দেয়। আকলিমার ঝাপসা চোখ। কোনোমতো জবাব রাখে।

‘ইকবাল আজিজ সকালে ফোন করার কথা কইছিল। এ্যাহন করছে কি না কেডায় জানে।’

‘ও! তা হলে এক কাজ করো। কালকে আরেকবার দেখা করো। নিরিবিলি কথা বলতে হবে।’

‘কী কথা কমু?’

‘সে আমি শিখিয়ে দিচ্ছি।’

আকলিমা পরদিন নয়, সেই রাতে আবার দেখা করতে এগোয়। রাত বাড়ে। বালুবাড়ির রাস্তা অনেক নিরিবিলি। সারাদিনের তাপ শেষে চমৎকার বাতাস। চাঁদের আলো। শজনে গাছের ঘি-রং ফুল চারপাশ ছড়িয়ে আছে। কোথাও শাখায় শাখায় কচি শজনের ছন্দময় দোলা। আকলিমার ভালো লাগে। মাথায় আগুন যন্ত্রণা আর নেই। বিবমিষার চক্কর দেওয়া চাপ সেরেছে। মুনার মনেও কোত্থেকে আশাবাদী সাহস। এতক্ষণে মনে হয় আশার আলো দেখা যায়। সকাল-দুপুরের সকল ঘটনা-আশা-হতাশা মুছে গেছে প্রায়। এবার মামুন নিশ্চয়ই বের হয়ে আসবে। মানুষ এভাবেই নতুন করে উজ্জীবিত হয়। দিনকাল এগিয়ে যায়।

ইকবাল আজিজ আসলেই ভদ্র অমায়িক। গতরাতে সাক্ষাৎ হয়নি বলে অনুতাপের শেষ নেই। পার্টি অফিসের মিটিং-এ থাকতে হয়। আকলিমা শোনে। মুনা বোঝে। তাদের আফশোস নেই। আজ সকাল সকাল চলে এসেছে। এবার তাদের হাতে লাল চা চলে আসে। চা পানের আগ্রহ নেই, বারকয়েক ‘না-না’ বলে; তারপরও কাচের গ্লাসে চুমুক দিতে হয়। এর মধ্যেই সব গল্প-আলাপ কিংবা আবেদন নিবেদন। নেতার চোখে-মুখে ভাবনা। কুঞ্চিত ভুরু আর কপালের ভাঁজে বিবশ ভাবনা। যারা তার দরবারে, তারা বসে থাকে কোনো দিশার নির্দেশনায়। নেতা মোবাইল বের করে কথা বলে। সেই স্বরে যেন অন্য এক মানুষ মূর্তিমান উঠে দাঁড়ায়। সব শেষ হলে কি অপূর্ব মায়া! আকলিমার মন ভরে যায়। মুনার দু-চোখে কৃতজ্ঞতার জলছাপ খেলা করে। জনারণ্যে একলা মানুষের মতো দুপুরের রোদে হেঁটে যাওয়া চঞ্চল দুশ্চিন্তা আর দিগ্‌ভ্রান্ত বেভুল সময় ভুলে যায়।

‘আম্মা শোনেন, মানুষ আজকাল কথা শোনে না। একটা ফাইল নিয়ে বারবার ঘুরতে হয়। আবার দেখেন, ঘুষ দেন, মিনিটেই কাজ কমপ্লিট। বুঝছেন তো কী বলছি?’

‘আমরা বড় গরিব বাবা। একটু সজল রে ডাকেন না। সে মাফ দিলে ছেলেটা বের হয়ে আসে। মাফ চাই বাবা।’

‘আহ্‌হা আম্মাজান! বিষয় সেটা নয়। পুলিশের খাতায় নাম উঠে গেছে, সেই নাম মুছে ফেলতে হবে বুঝলেন।’

‘উনি তো ঠিকই বলতাছেন মা। টাকা ছাড়া কাজ হইব না।’

‘এই তো মুনা সুন্দর বুঝতে পারছে। শোনেন কিছু টাকা দেন ওদের। কাজ হয়ে যাবে। আর সজল কী করবে? সে তো মনে হয় আসেনি।’

‘সজল ভাই রে দেখলাম তো।’

‘ও তা হলে এসেছে। খেয়াল করিনি।…এই সজল, সজল? এদিকে আয় তো।’

সজল এলে যেন সব মুশকিল আসান। মামুনের বয়সি কিংবা আরও দু-চার বছর বড়, বিদেশি খেলোয়াড়ের মতো চুল, পরনে লাল গেঞ্জি, দু-হাতে রবারের  চুড়ি, না না ব্যান্ড; আকলিমা থমকে দাঁড়ায়। সজলের রাগি রাগি চেহারা। উদ্ধত নাক, চিকন গোঁফ আর মোটা কালো ঠোঁট অদ্ভুত করে রাখে সারা অবয়ব। আকলিমা তাকে চেনে কি চেনে না, সে-ই সকল ভরসা, দ্রুত এগিয়ে হাত চেপে ধরে। চোখের পাতায় মেঘজল। মুনার হাতে তখনো লাল চায়ের গ্লাস। কেন জানি বড় কষাটে বিস্বাদ লাগে। অতিরিক্ত মিষ্টি। আকলিমার অসহায় মায়ের কান্না।

‘বাবা আপনে আমার পোলাডা রে মাফ করে দেন বাবা। না বুইজ্যা আপনারে আঘাত করছে। আমি মাফ চাইতাছি।’

‘আপনি বসেন আম্মা। সজল একটু বদরাগি, তবে ভালো ছেলে। সে ওইগুলা মনে রাখে না।’

‘কী ব্যাপার ভাইয়া?’

‘তুই কি কোনো ছেলের নামে কমপ্লেইন করেছিস? ইনি তার মা। গরিব মানুষ। কেন অভিশাপ কুড়াস বল তো?’

‘ও এবার বুঝলাম। মুনার ভাই। আ রে সে তো না জেনে না বুঝে ঝগড়া করল।’

‘বাবা যা হওনের হইছে। আপনে মাফ কইরা দেন বাপ। ছেলেডা কাল থাইক্যা জেলে।’

‘ঠিক হইছে।’

‘এসব কী বলিস সজল? স্বপনকে বলেছিস কিছু? এত সামান্য জিনিস নিয়ে থানা-পুলিশ করতে আছে? তারা চাকরি করে। আজ এখানে কাল ওখানে। আর এরা আমাদের লোক। প্রতিবেশী মানুষ। এদের ভালো-মন্দ দেখতে হয়। এদের সাথে গোলমাল করে নেতাগিরি? পলিটিকস্‌ বাদ দে।’

‘না ভাইয়া খুব বাজে ছেলে। একটু শাস্তি হওয়া দরকার।’

‘তুই চুপ।…আম্মা শোনেন, ওদের কিছু টাকা দিয়ে দিন। চার্জশিট হালকা হবে। আপনার ছেলে বের হয়ে আসবে।’

‘কত টাকা বাবা?’

‘এই ধরেন পাঁচ-সাত হাজার।…সজল তুই ব্যাপারটা দেখ তো। মহিলা মানুষ। শোন্‌ মানুষের উপকার করতে শেখ। একদিন এরাই তোর জন্য ভোট এনে দেবে।…আম্মাজান আপনি যান, সজল কাজ করে দেবে। চিন্তা করবেন না।’

তারপর যখন ফেরার পথ, মুনা একঢোকে চা শেষ করে গলা তেতো করে ফেলে। তবু মনে শান্তি কিংবা সান্ত্বনা, ভাই বেরোবে। সজল আর বিরক্ত করবে না। নতুন করে পরিচয় হলো। আসলে মানুষের হাজার চেহারা হাজার পরিচয়, এসবের মধ্য দিয়ে তৈরি হয় সম্পর্ক আর দিনযাপন। সে তার সঙ্গে কথা বলে। মনে স্বস্তি। তারই পরামর্শে সকাল শেষ শেষ দুপুরে জেলগেটে হাজির। আকলিমা মেহগনির ছায়ায় বসে থাকে। জেলখানার নিয়মকানুন বুঝে নেয় মুনা। আসামির নাম, পিতার নাম, ঠিকানা এবং সম্ভব হলে কয়েদি নম্বর আর কী কেস? তারপর হাতে আসবে স্লিপ। সিরিয়াল ধরে হাঁকডাক। আসামির দেখা মিলবে তখন। তাকে কোনো খাবার দেওয়া যাবে না। অফিসে জমা দিতে হবে। সেখানে টাকা বা খাবার নেওয়ার মানুষ আছে। আসামির নামে নগদ টাকা জমা হয়। সেই টাকায় কারাগারের দোকানে খরচ করতে পারে। মুনা স্লিপ হাতে এগিয়ে মায়ের কাছে বসে। ডাকের অপেক্ষা। সি’র দুপুর। বাতাস থমকে আছে। কোথায় যে এক কোকিল ডেকে ওঠে করুণ। মন বড় উন্মন করে দেয়। আকলিমার সময় গণনা। হায় কত যুগ দেখে না ছেলেকে! মুনার বিশুষ্ক দৃষ্টি দুপুরের মতো কিছু হাতড়ে বেড়ায়। আজ যদি বাবা বেঁচে থাকত।

তিন ফুট দুরত্বে দাঁড়িয়ে মানুষ মানুষের সঙ্গে দেখা করে। মানুষের ভিড়। ঘামের গন্ধ। এপারের মানুষ খুঁজে নেয় ওপারে নিজের মানুষ। সেভাবেই যত কথা। চিৎকার কান্না। আকলিমা ঠিক করেছে, কাঁদবে না। মুনাকেও সাবধান করে দেয়। চোখের জল দেখলে কষ্ট পাবে মামুন। তার মনে সাহস থাক। পুরুষের জীবন ঘাত-প্রতিঘাতের। কত আঘাত কত কষ্ট আসবে। এই তো জীবন। অবশেষে মুনা খুঁজে পায়। এ যেন পাওয়া নয়, স্পর্শ নয়, শুধু চোখের দেখা আর দুটো কথা বলা। সান্ত্বনার বদলে বুকে তুলে নেওয়া হাহাকার। হায় জীবনের এত কষ্ট! এ কোন সভ্যতার তৈরী করেছে মানুষ? কোথায় ঈশ্বর? মুনার চোখ ভারী হয়। মনের মধ্যে কেউ ডুকরে ওঠে। ‘ভাই ভাই গো’। মুনার কাঁদে না। মামুন বলে, –

‘কান্দো কেন মা? কাইন্দো না। আমি ঠিকই বের হয়ে আসব।’

‘বাজান কিছু খাইছস?’

‘ভাই তোরে মারছিল নাকি?’

‘আহা রে দুই রাতেই কেমন শুকায়া গেছে তোর ভাই!’

‘মা আমারে বাইর করো। খারাপ জায়গা। খুব খারাপ জায়গা।’

আকলিমা নয়, মামুন কেঁদে ফেলে। তারপর যেভাবে আকাশের এককোনায় মেঘ ডেকে নেয় অপর দিগন্তের বৃষ্টি, শোকাকুল সময়ে বিষাদ বড় সংক্রামক, তারা হু-হু কাঁদে। কাঁদতে থাকে। আশপাশেও কেউ কেঁদে ওঠে। কেউ চিৎকার দেয়। অপরপ্রান্তের কারও সান্ত্বনা মুখোমুখি দুই দেয়ালের ঘুলঘুলি বেয়ে ভেসে বেড়ায়। ‘তোমরা চিন্তা কইরো না। অমুকের সাথে দেখা করো। তোমরা কেমন আছো? এই তো কয়েক সপ্তাহের ব্যাপার…ঠিক বের হয়ে আসব।’ মুনা সব শোনে। মানুষের মানুষ আছে। যত্ন নেওয়ার কাছে ডাকবার দেখভালের কেউ। তাদের কেউ নেই। অসহায় মা। তারও কেউ নেই। ‘ভাই ভাই গো’। নিজেকে বুঝি ধরে রাখতে পারে না সে। চোখে বাধভাঙা জল নামে। বাইরের উত্তাপ হলকা হয়ে জেগে থাকে চারপাশ।

বাস চলে। হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে বাস থামে। মানুষ কিছু নেমে যায়। কয়েকজন ডানাকাটা পরি। তারা কেউ পড়ে। কারও চাকরি। মুনা একদিন এখানে পড়বে। সেই স্বপ্ন মানুষের ভিড়ে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে বাইরের পথরেখায় হেঁটে যায়। কল্পনায় অনেক সুখ। সেই সুখ সয় না। সে দশমাইলে নেমে অন্য বাসে ওঠে। আবার কলেজ মোড়। এই তো আসা-যাওয়া। মানুষের কাছে দুটো টাকার আবদার। ভাই কিংবা স্যার সন্বোধন। ‘মায়ের কিডনি অপারেশন করতে হবে। কুড়ি হাজার টাকা দরকার। দশ হাজার হয়েছে। বাকি টাকা আপনারা সহৃদয় মানুষজন। যদি একটু সাহায্য-সহায়তা করেন। আমি মাকে খুব ভালবাসি। আপনিও মাকে ভালবাসেন। নিজের মা মনে করে যদি একটু দয়া হয়। আল্লাহ্‌ আপনার মঙ্গল করুন।’ মানুষের মন নরম। কেউ হাত এগিয়ে দেয়। কেউ নিশ্চুপ ইশারা। ‘সরে যাও যতসব ঝামেলা। এই সুপারভাইজার একে বাসে উঠতে দিয়েছ কেন?’ অনেক কটু কথা। মুনা গায়ে মাখে না। পৃথিবীর এই নিয়ম। কেউ কথা বলে কেউ শোনে। কেউ খায়। কেউ অভুক্ত থাকে বলেই খাবারে এত স্বাদ। সে তাই দশমাইলের পুবকোনায় আজমল বিহারির সামনে দাঁড়ায়। শেষ-দুপুরে ভুট্টা পোড়ানো শুরু হয়। মুনা দশ টাকা দিয়ে একটি কেনে। ইউক্যালিপটাস গাছের চিরল ছায়া। সবুজ ঘাস। সে ভুট্টা খায়। কখনো দমকা বাতাস ওঠে। বিরতি দিয়ে হামলে পড়ে। পশ্চিমের রাস্তায় দোকানঘরের পেছনে একজোড়া শিমুল গাছ। লালে লাল আকাশ। কতগুলো তুলো আকাশে ভেসে যায়। ‘জীবনটা কিছু নয় শুধু একমুঠো ধুলো…চৈতি বাতাসে ওড়া শিমুলের তুলো।’ মামুন কলতলায় গান গায়। গোসল করে। ভারি সুরেলা গলা। মুনা মন রেখে শোনে। কবে বের হবে ভাই? একে একে পাঁচদিন চলে গেল। কুড়ি হাজার টাকা। মায়ের কাছে মোট সতেরো হয়েছে। আরও তিন হাজার। সেই সন্ধেয় সজল হিসাব কষে। পাঁচ-দশ হাজার নয়, কমপক্ষে কুড়ি হাজার লাগবে। একে-ওকে দিতে হয়। সাহেব মানুষ তো একলা খায় না। সবাইকে দিয়ে রেখে খায়।

জেলখানা থেকে ফিরে সন্ধেয় মায়ের সঙ্গে চকবাজার ঘোরে মুনা। আকলিমা সোনার বালা বিক্রি করা ছাড়া কোনো উপায় পায় না। আবুদর রশিদের শেষ চিহ্ন। অনেক যত্নে রেখেছে। একদিন মুনার হাতে পরিয়ে দেবে। মেহেদির রঙে রঙে বড় মানাবে তাকে। এ ছাড়া আর কী দিতে পারে? কোনো সঞ্চয় নেই। কোনো নিরাপত্তা। কোনো সাধ-আহ্‌লাদ। জীবনের শুধু ক্ষয়। সোনা ক্ষয় হয় না। আগলে রেখেছে সেই দিনের আশায়। আজ আর পারল না। তার চোখে কোনো মেঘ নেই। অদম্য মনের শক্তি। বিক্রি করে কমপক্ষে আঠারো-কুড়ি হাজার টাকা পাওয়া যাবে। সোনার দাম অনেক। আরও বাড়বে। অথচ চকবাজারের কেউ নিতে চায় না। কেউ হাতে নিয়ে দেখে। আসল না কি নকল পরখ হয়। তারপর সরাসরি জিজ্ঞেস করে, –

‘মেমো কই? দেখি কত ক্যারেট?’

‘মেমো তো নাই। নিজের জিনিস। অনেক আগের।’

‘সে তো দেখেই বোঝা যায়। দাম পাবেন না তো।’

‘কত টাকা পামু?’

সেই সোনা এগারো হাজার দুই শত টাকায় বিক্রি। কিনতে গেলে সাড়ে একুশ-বাইশ। পৃথিবী কেনাবেচার জায়গা। কেউ বেচে কেউ কেনে। কারও লাভ কারও ক্ষতি। আকলিমার লাভ-লোকসান হিসাব নাই। বিপদের সময় কাজে লেগেছে এই ঢের। মামুন কলেজের পড়া শেষ হলে চাকরি করবে। সে কিনে দেবে। একটিই তো বোন। কত আদর করে তাকে। দিলশাদ খান সেদিন দেড় হাজার টাকা দিয়েছিল। সেই টাকা খরচ হয়ে গেছে প্রায়। জেলখানায় মামুনের হিসাবে তিন শত। উকিলকে দিতে হলো। হোটেল মহাজনকে আরও একবার বলবে নাকি? এই কয়েকদিন তো কাজে যাওয়া হলো না। আকলিমা ভাবতে ভাবতে এক সন্ধেয় হাজির। মাগরিবের আযান পড়েছে। দিলশাদ খান একগোছা আগরবাতি হাতে নিয়ে আগুন জ্বালায়। বাতাসে সুবাসিত ধোঁয়া। ইন্ডিয়ান আগরবাতি। আজকাল এসব জিনিস সব দোকানে পাওয়া যায়। ভারি সুবাস! মন ভালো করে দেয়। এখন মহাজনের মন ভালো থাকলে তারও মন ভালো হয়। দিলশাদ খানের শত অভিযোগ।

‘কি ব্যাপার মামুনের মা, তোমার কোনো খবর নাই। কাজের জন্য অলটারনেট লোক তো দিবা নাকি? মানুষজন পাওয়া যায় না।…তা তোমার বেটার খবর কী? ছাড়া পাইছে?’

‘না ভাই। হের লাগি তো হোডলে আসতে পারি নাই।’

‘সে ঠিকাছে, তবে খবর দেওয়া উচিত।…তোমার বেটা এসব কাজ করে কিসের জন্য? বড়লোক হতে চায়? শর্টকাট রাস্তা।’

‘সে এসব করে না ভাই। কেউ ফাঁসাইছে।’

‘কেউ আন্দাজে এমনি এমনি ফাঁসাবে ক্যান? কি জানি হতেও পারে। জামানা খারাপ। তোমার বেটা তো ভালোই। তদবির করছ? খবর কী?’

‘ভাই কিছু ট্যাকা লাগব।’

‘কদিন আগে তো টাকা দিলাম।…অবশ্য বিপদের সময়।’

দিলশাদ খান ক্যাশবাক্সের উপর হাত রেখে বিড়বিড় করে। কোনো সুরা পড়ছে নিশ্চয়। আকলিমা তীর্থের কাক। মহাজনের মাথায় নতুন টুপি। সোনালি জরির উপর আলো ঠিকরে পড়ে। চেহারায় চকচকে রোশনাই। মনের মধ্যে তেমন আলো আছে কি? আকলিমার বুক জুড়ে অন্ধকার। রাস্তায় এত আলো এত সাজসজ্জা কোনো আনন্দ দেয় না। এখন কিছু টাকা পেলে খুশি হয়। সে অপেক্ষা করে। সন্ধের সময় টাকা বের করতে নাই। সময় বয়ে যায়। অবশেষে এক হাজার টাকা হাতে পেয়ে ঘরে ফিরতে পারে। একটি কালচে-বেগুনি নোট। কাগজের কত ক্ষুদ্র টুকরো। সেও অনেক শক্তি রাখে। আকলিমার কোনো শক্তি নেই। সে মনে মনে সঞ্চয়ের হিসাব কষে দৃষ্টিতে আনন্দ-বিষাদ ডেকে নেয়। মুনা চেষ্টা করছে। হতভাগা সন্তান। কতদিন আর অপেক্ষা? কুড়ি হাজার টাকা। চোখের পাতায় মেঘজল জমে যায়।

মুনা এই নিয়ে কতবার আপ-ডাউন করে এলো বুঝতে পারে না। হিসাব রাখা হয়…হয় না। মন বড় চঞ্চল অসি’র। মানুষের করুণা-ভ্রূকুটি-অপমান বুকে বড় বাজে। নিজের উপর ভালবাসা ভক্তি আর আত্মবিশ্বাস সে-সবও বুঝি হারিয়ে যায়। সে তবু বাসের ভিড়ে নিজেকে শেষমাথায় নিয়ে আসে। পাঁচজনের সিটে বসে থাকা মানুষ দিয়ে শুরু হয় অভিযাত্রা। কোনোদিন বাঁশেরহাট নেমে পড়ে। অন্য বাসের অপেক্ষা। এভাবে সাত-আটটি বাসে ওঠা-নামা। যেতে যেতে দশমাইল। সারাদিন যাওয়া-আসা চলে। সন্ধেরাতে ঘরে ফিরে পায়জামার কোঁচড়ে দোমড়ানো-মোচড়ানো কাগজের নোট হাতে তুলে দেয়। কত জমা হলো? আকলিমা অনেক যত্নে একে একে গোনে। শক্তি দৃঢ় হতে থাকে। মুনার মুখের দিকে তাকাতে পারে না। যদি দুটো কথা শুনতে হয়। মন তবু আকুল। সে খায় না কেন?

আজ মুনার অনেক দেরি। দশমাইল ছেড়ে ভূষিরবন্দর হয়ে রানিরবন্দর চলে যায়। ফেরার পথে কোনো বাসে উঠতে পারে না। কাউন্টারের মানুষ বাধা দেয়। অবশেষে হেঁটে হেঁটে অনেকখানি পথ। সেখানে কাউন্টার নেই। বাস থামে। তখন নিজেকে বড় ক্লান্ত লাগে। কারও কাছে কিছু চাইতে ইচ্ছে জাগে না। সে ফাঁকা এক সিটে বসে মন-ব্যাকুল বাইরে তাকিয়ে থাকে। বাস নতুন ব্রিজ পেরিয়ে যায়। নিচে নদীর মতো আধশুকনো খাল। এ যেন তার জীবন। একদা সুখ ছিল, স্বস্তি আর শান্তি; একটি মানুষ নেই বলে সব হারিয়ে গেছে। সুপারভাইজার এসে ভাড়া চায়। মুনা হাতে মুঠোবাঁধা টাকার বের করে। সে ভিক্ষুক। বয়সি মানুষ আর কিছু বলে না। তারপর আবার দশমাইল। অন্য বাস অন্য জীবন। যে জীবন সে চায়নি। সন্ধেরাতে ঘরে ফিরে টাকা বের করে। আকলিমার বিশুষ্ক চোখ-মুখ।

‘মা গুইন্যা দেখ তো বিশ হাজার পুরছে?’

এত খুচরো টাকা তো ভদ্রলোকের হাতে দেওয়া যায় না। নেতা মানুষ কি দু-পাঁচ টাকা গুনে রাখে? টাকা তো টাকা। ছোট নোট বড় নোট সব সমান। মানুষের জীবনে শুধু ছোটবড় ভেদাভেদ। আকলিমা সব শেষে কী করবে ভেবে নেয়। কুড়ি হাজারের উপর টাকা জমে গেছে। সে টাকা গোনে। রাতের বাতাসে বুঝি হাসনাহেনার হালকা সুবাস। কে জানে উত্তরে বিশাল খালের ওপারে সেই বাতাবিলেবু ফুলের সৌরভ। বড় ভালো লাগে যা হোক। মামুন নিশ্চয়ই কাল ফিরে আসবে। মুনার ক্লান্ত মুখছবিতে তাই হাসির রেখা। তারা পরস্পরের দিকে তাকিয়ে আস্বস্ত হয়।

‘মা আর দুই-একটা দিন। ভাই ফিররা আইলে কাজে যাইতে পারবা। এ্যাহন তোমার শরীর কেমন? আজও ভাত রান্ধো নাই? আমার খুব ক্ষিদা লাগছে। ঘুম পাইতাছে।’

‘ভাত চড়াই মা। তুই একটু শুইয়া থাক। দম নে।’

‘তার মানে আজও বাসিভাত খাইছ। ফের অসুখ হইব।’

‘কিছু হইব না রে মা।…আইচ্ছা শোন, একটু হোডল থাইক্যা আসি। খুচরা টাকা বড় নোট কইরা আনি।’

‘তার কুনো দরকার আছে?…আইচ্ছা যাও।’

‘তুই দুয়ারে কপাট লাগাইয়া দে।’

আকলিমা ফিরে আসতে সময় নেয়। মুনা তখন সারাদিনের ক্লান্তি ভুলে স্বপ্নের রাজ্যে ভেসে বেড়াতে শুরু করে। কেউ তার মাথায় হাত বুলোয়। মুনা চোখ মেলে দেখে বাবা শিয়রে বসে আছে। চোখ-মুখ শুকনো। এত ম্লান লাগে কেন? সারারাতের ট্রেনজার্নি। বাহাদুরাবাদ ঘাটে ফেরি ধরতে বালিয়াড়িতে দৌড় দিতে হয়। তারপর হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে নিজেকে কম্পার্টমেন্টে তোলা। ট্রেন চলে। মুনা বাবার কোলে বসে আছে। রাজধানী ঢাকা কেমন শহর? বাবা সেখানে চাকরি করে। তারা সকলে ট্রেনে উঠেছে। রাতের নিস্তব্ধতায় ট্রেন ছুটে চলে। অনেক মানুষ ঘুমোয়। মুনা তাকিয়ে রাত দেখে। রাতের আলাদা সৌন্দর্য আছে। ট্রেনের গতিতে সুর বাজে। ঘটাং ঘট ঘটাং ঘট। শেষমেশ ঢাকা ভালোমতো দেখা হলো না। জাদুঘর-চিড়িয়াখানা-শিশুপার্ক। মধুমতিতে খুব ভালো ছবি চলছিল। আবদার করেও দেখা হলো না। এক-দুইদিনের সফর। কী হয়? বাবা আরেকবার নিয়ে যাবে। মুনা পাশ ফিরে কাত হয়। বাবা কোথায় গেল? এখানেই তো মাথার কাছে বসে ছিল! মুনা আকাশে ওড়ে। তার দুটো সাদা ডানা। চাঁদের আলোয় নিজেকে ঘুড়ির মতো লাগে। মামুন ভাই ঘুড়ি ওড়ায়। অনেক দুর আকাশে ভেসে ভেসে ছোট্ট পাখি। মুনা বুঝি সাদা ঘুড়ি। কে জানে সোনালি চিল। বাতাসে ভর দিয়ে ভেসে যেতে কি মজা লাগে। অনেক নিচে মানুষজন ছায়া ছায়া আলোয় হেঁটে যায়। কাজ করে। গল্প-আলাপ। মানুষের জীবন। সুখ-অসুখের মধ্যে বেঁচে থাকা। একটি দিঘি। তার সবুজ-নীল জল। কতগুলো হাঁস আলগোছে ছড়িয়ে থাকে। সাঁতরে বেড়ায়। আকস্মিক কোথা থেকে এক সাপ এসে মাথা উঁচু দাঁড়ায়। গভীর নিশ্বাস নাকি ফোঁস? হাঁসগুলো ডানা ঝাপটে পাড়ে উঠতে মরিয়া। ডানায় ফট ফট বিকট শব্দ। মুনার ঘুম ভেঙে যায়। দরজায় করাঘাত। ঠক ঠক ঠক। মা এসে গেছে।

পরদিন আকলিমা মুনাকে নিয়ে রিকশায় ওঠে। আজ হেঁটে যাওয়া উচিত নয়। কুড়ি হাজার টাকা। অনেক কষ্টের সঞ্চয়। রক্ত জল করা ভিক্ষে। টাকার বুকে সেই কথা নেই। লেখা থাকে মূল্য। ময়লা-নতুন ফারাক নেই। সেই টাকায় কি না হয়। ইকবাল আজিজের হাতে তুলে দিতে পারলে সব সমস্যার সমাধান। আজ দুপুর কি বিকেলের মধ্যেই বের হয়ে আসবে মামুন। তার কলিজার টুকরো। আকলিমার মন সকালের বাতাস স্পর্শ করে যায়। ভোর সকালের নিরিবিলি রাস্তা। কখনো আশঙ্কা আসে। ছিনতাইকারি সম্পর্কে সাবধান। কয়েকজন নারী-পুরুষ জগিং করে। তিনজন মহিলা শ্রমিক সিমেন্ট-বালু মিক্সিং মেশিন টেনে নিয়ে যায়। আশপাশে ছড়িয়ে পড়ে বিকট আওয়াজ। মুনা মায়ের পাশে বসে এসব দেখে। আজ টারমিনাল বা কলেজমোড় যেতে হবে না। বাসের ভিড়ে কোনো আকুতি নেই। বড় হালকা লাগে তার। সকল কষ্টের বুঝি অবসান হতে চলে। রাস্তার বাঁ-দিকে সারি বেঁধে কয়েকটি শজনে গাছ। সেগুলোর শাখাপ্রশাখায় কচি শজনে বাতাসে দোল খায়। বেশ সুন্দর। দোতলা বাড়ির পেছনে সাদা ধোঁয়া আকাশে ওড়ে। সকাল সকাল রান্না। রুটিন কাজ। কেউ কেউ ভোরবেলা নাশতা খায়। তারা মা-মেয়ে সকালে মুখে কিছু দিতে পারেনি। মামুনকে যেদিন সন্ধেয় নিয়ে গেল, তারা কেঁদে কেঁদে রাত পার করে দেয়, একটুয়ো ঘুমোতে পারে না; তেমনই রাতগুলো কেটে যায়। একমুহূর্ত চোখের পাতায় ঘুম আসে না যতটুকু তন্দ্রাঘোর। গতরাতে সেই ঝিমঝিমও নেই। এবার যে কান্নার রাত নয়। আবছায়া আনন্দ-খুশি ঢেউ খেলে মনের কোনায়। মামুন ফিরে আসবে। তাদের জীবন যেমন চলে যায় আবার তেমন দিনকাল। মুনা ড্রেস পরে স্কুল যাবে। তখন কি কেউ ড্যাবড্যাব তাকিয়ে থাকবে? তপন বড় গাধা। মুনা মনে মনে হেসে ওঠে।

ইকবাল আজিজ বাসায় নেই। সজল ঘুমিয়ে আছে। গ্যারেজের মতো ঘর খুলে বেঞ্চে বসে আছে কাশিম। তার স্মরণশক্তি অসাধারণ। সহজেই চিনে ফেলে। মানুষ আর কাজ মনে রাখার দায়িত্ব। তার ঠোঁটে কি মৃদু হাসি? মুনা রিকশা থেকে নেমে মায়ের হাত ধরে। বড় কাহিল হয়ে গেছে মা। এই কয়েকটি দিন তো নয়…হাজার বছর। কষ্টের দিনগুলো বড় লম্বা হয়, যেমনভাবে আনন্দের সময় খুব ছোট। আজ মাকে শত ক্লান্তির মধ্যেও নির্ভার লাগে। এইটুকু যা শান্তি। কাশিম কথা বলে।

‘তোমার ভাইয়ের খবর হয়নি?’

‘না ভাই।…স্যার আছেন?’

‘তিনি গোরস্তান গেছেন। মা-বাবার কবর জেয়ারত। এসে যাবেন। তোমরা বসো।’

‘বড় ভালো মানুষ। মা-বাবাকে আজকাল কয়জন মনে রাখে?’

আকলিমার মন্তব্যে বাতাসে বুঝি ঢেউ ওঠে। মেহগনি গাছের সেই আধশুকনো ডালে একটি কাক। এদিক-ওদিক নিশ্চুপ দেখতে দেখতে চঞ্চল হয়। এটা কি সেই কাক, সেদিন দুপুরের রোদে বসে ছিল? মুনা হাঁপিয়ে ওঠে তখন। তার গলা শুকিয়ে যায়। আকণ্ঠ পিপাসা। কোথাও পানি নেই। সেই কাক অথবা অন্য কোনো কে জানে। কোনো কোনো মানুষের জীবন কাকের মতো। তারা এই জগতে শুধু কষ্ট কুড়োয়। কষ্ট হলো ময়লা-আবর্জনা। তারা পিপাসা নিয়ে চলে যায়।

সময় যেতে যেতে আট-নয় বেজে গেল। ঘরের বেঞ্চ কয়েকটি মানুষের ভারে কচমচ করে। ঘামের বিদঘুটে গন্ধ। মুনা উত্তরের বেঞ্চে টেবিলের খুব কাছে বসে আছে। আকলিমা পাশে তার। তাদের দৃষ্টি এদিক-ওদিক ঘুরে সামনের খোলা হাওয়ায় ছড়িয়ে যায়। নেতা এখনো আসে নাই। দেরি হয়ে যায় যে। এইসব ভাবনা-উৎকণ্ঠার মধ্যে গাড়ির হালকা মৃদু শব্দ আর কাশিমের ব্যস্ত হয়ে ওঠা জানিয়ে দেয় অপেক্ষার শেষ। ইকবাল আজিজ এসে বসেন আরও আধঘণ্টা কিংবা তারও পর। আজ তার হাতে সিগারেট নেই। পাঞ্জাবি থেকে অচেনা সুগন্ধ মাতাল করে রাখে ঘরের বাতাস। তারপর সরাসরি মুনার দিকে তাকায়।

‘হ্যাঁ বলো কী সমস্যা? তুমি এর আগেও এসেছিলে না?’

‘জি স্যার। আমার নাম মুনা। সেই যে আমার ভাই…।’

‘ও হ্যাঁ হ্যাঁ ড্রাগ কেস। কী খবর তার?’

‘স্যার আপনি বলেছিলেন।’

মুনার কথা শেষ হয় না। ইকবাল আজিজ কী ভাবেন? আজ তাকে কি বড় অস্থির লাগে? মুনা নির্বাক নিশ্চুপ। এরপর কী বলবে, কী বলা যায় অথবা কোন্‌ নির্দেশ শোনার অপেক্ষা। নেতা মানুষ। আউল-বাউল কথায় রেগে গেলে মুশকিল। কাশিম সব আসান করে দেয়।

‘ভাই সেই যে কেসটা। এই তো কয়দিন আগে এসেছিল মেয়েটা।’

‘বুঝতে পেরেছি। দেখ তো সজল উঠেছে কি না? আর এদের ভেতরে বসার ব্যবস্থা করো।…আম্মা আপনারা ভেতরে যান। সকালে কিছু খাননি তো মনে হয়। নাশতা করেন।’

কাশিম তাদের ইশারা করলে উঠতে হয়। তখন গ্যারেজ ঘরের মধ্যে কোনো শিশু কেঁদে ওঠে। তারস্বর চিৎকার। মুনা সেই রেশ শুনতে শুনতে এগিয়ে যায়। সজল বারান্দার সিঁড়িতে বসে আছে। আঙিনার দিকে নিশ্চুপ স্থির দৃষ্টি। ঘুমঘোর কাটেনি বোধহয়। পুব-উত্তর কোনায় ডালিমের গাছ। ডালে ডালে কমলা রং শত ফুল। সেদিকে তাকিয়ে আছে। কয়েকটি চড়ুই নাচে। কিচিরমিচির। সজলকে শেয়ালের মতো চিকন লাগে। মোটা কালো ঠোঁট ঝুলে পড়েছে।

বেশি দূরের রাস্তা নয়। সজল টাকা বুঝে নিয়ে এই কথা বলে। যোগ হয় আরও কিছু। ‘সাহেব মানুষ বুঝলেন। সব কাজ তো যেখানে-সেখানে হয় না। এ হলো তদবির। বাসায় যেতে হয়।’ তখন আকলিমার সেই কথা মনে পড়ে। মানিক রঞ্জন বলেন। ‘পৃথিবী হলো তকদির আর তদবিরের জায়গা। যদি তকদিরে কিছু না হয় তদবির করুন। হয়ে যেতে পারে।’ আকলিমার কপালের দোষ। তকদির খারাপ। অল্প বয়সে বিধবা হলো। আবুদর রশিদের অপমৃত্যু ভোলা যায় না। লাশ পেতেও কত সমস্যা। মাটির নিচে শুইয়ে দেওয়ার আগে গোসল দিতে পারল না। কীভাবে সম্ভব রক্ত-লাল কাঠ-কয়লা ধোয়? প্রতিবেশী দু-একজন এগিয়ে এলো। মেয়েমানুষ গোরস্তানে যেতে নেই। তারপরও সীমানা প্রাচীরের ওপাশ থেকে দেখে গেল মানুষের শেষযাত্রা কেমন। হায়! আকলিমার বুকে কতদিন কান্না গুমরে ওঠে। কোনো আপনজন কাছের কিংবা দূরের, কেউ এসে দু-ফোঁটা অশ্রুর সহযাত্রী হলো না। বড় দুই ভাই। মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দেয়। তারাও বলে গেল কথা। বিনে পয়সার উপদেশ। আকলিমার খেদ নেই। একলা জীবন একাই চলে এলো অনেকখানি পথ। রাস্তায় নেমে পেছন ফিরে তাকাতে নেই। সে আর পেছনে তাকায়নি। এই কয়েকটি দিন এত যে কষ্ট কাউকে খবর দেয়নি। দেবে না। মনকে বোঝায়। সে কি তবু বোঝে? কত কথা মনে আসে। বুকের কোনায় লুকোচাপা দীর্ঘশ্বাস অগ্নুৎপাত হয়ে বেরোতে চায়। লাভ কি? কোনো লাভ নেই। জীবন লাভ-লোকসান খোঁজে না? তবু আক্ষেপ হয়। আজ আর কোনো খেদ রাখবে না।

অটোরিকশা বালুবাড়ি শহিদ মিনার এলে সজল কথা বলে। আকলিমা বরং একবার জেলখানায় যাক। সকাল এগারো বেজে এসেছে। কিছুক্ষণ পর কয়েদি দেখার সময়। মামুনের সঙ্গে দেখা করে নিক। তাকে আশার কথা বলে আসতে পারে। মনে সাহস পাবে। আকলিমার সব শুনে সাধ হয়। পরশুদিন শেষ দেখা হয়। প্রথমদিন দু-চোখ অশ্রু ভার ভার, পরশু হতাশার চাদরে মুখ ঢাকা; বুকে না জানি কত কষ্ট। তেমন করে কথা বলল না। চোখের সামনে থাকা ছেলে কত দূর। আকলিমার মন পোড়ে। চৈত্রের দাবদাহ বুকে ঢেউ তোলে। ছেলে এই কয়েকদিনে শুকিয়ে লাঠি। সজল মনের কথা বলেছে। তারপরও মুনাকে একা ছেড়ে দেয় কীভাবে? দোলাচল মন। অবশেষে অটো থেমে যায়। আকলিমা আলগোছে নেমে পড়ে। বড় বিস্রস্ত অস্থির মন। কী করা যায় অথবা কী করা উচিত ভেবে ভেবে ক্লান্ত সন্দিহান। মুনা বলে, –

‘তুমি যাও গো মা। দেখা কইরা বাড়িত যাও। আমি মানুষডার লগে দেখা কইরা আইতাছি।’

‘হ্যাঁ আন্টি আমরা আধঘণ্টার মধ্যে ফিরে আসব। আপনি চিন্তা করবেন না। আমি তো আছি।’

‘আচ্ছা বাবা, তুমি দেইখ্যা রাখো।…মা মোবাইলটা রাখ।’

তারপর অটোরিকশা আবার চলতে শুরু করে। নিমনগর-বালুবাড়ি বাসস্ট্যান্ডে দু-জন ওঠে। সজলের মতো কালো-ঢ্যাঙা মানুষ। ঘোড়ামুখ যেন ঝুলে পড়েছে চৈত্রের রোদে। অন্যজন পিটপিট হলুদ চোখ মধ্যবয়সি। পেটানো শরীর। পান খেয়ে জবজবে লাল ঠোঁট। রাগি রাগি চোখ-মুখ। এদের কোথায় দেখেছে মনে হয়। চেনা চেনা তবু অচেনা। মুনার অকারণ ভয় আসে। তারা সামনে নেমে যাবে। তাদের নির্বিকার পাথর চোখ সামনে তাকিয়ে থাকে। রাস্তায় তাপ বাতাসের দমকা ঢেউ। একদিকের ধুলো আরেকদিকে ছড়িয়ে যায়। লোকাল একটি বাস এসে থামে। মানুষজন নেমে যাওয়ার তড়িঘড়ি ভিড়। অটোরিকশা সেই জট সামলে দক্ষিণে চক্ষু হাসপাতাল পেরিয়ে চিকন রাস্তায় নেমে যায়। সজলের চোখে কালো সানগ্লাস। সেই কাঁচের ছায়ায় অচেনা পথ। বিশাল গাছপালা আর ঝোপঝাড়ের নিচে খালের মতো চওড়া নর্দমা। ময়লা কালো জল গড়িয়ে চলে। ছায়া ছায়া নিশ্চুপ অন্ধকার বুঝি অশুভ ইঙ্গিত দেয়। মুনা অজান্তে কেঁপে ওঠে। কোনোদিন এই রাস্তায় আসেনি। একবার ইচ্ছে হয় জিজ্ঞেস করে। সজলের রূঢ় কর্কশ চেহারা। সে কি বিরক্ত? মুনা জানে না। কত দূর আর যেতে হবে? এইসব ভাবনায় কোন্‌ পথ অলিগলি, সামান্য পথ নাকি অতিদূর, কিছু বুঝতে না বুঝতে সব থেমে যায়। সেই দু-জন যাত্রী নড়ে উঠে। সজল নেমে যায় কেন? এখানেই কি শেষ তবে?

কয়েকটি পাশাপাশি ভুট্টার ক্ষেত। ক্ষেতের মধ্য দিয়ে ফ্যাকাশে-হলুদ ধুলোর সরু রাস্তা। শেষমাথায় একাকী টিনচালার ঘর দেখা যায়। প্রাচীরের ওপাশে নতুন ঘর নির্মাণের কাজ। লাল ইটের চকচকে দেয়াল। আরসিসি পিলার। লোহার রড মুখিয়ে আছে। কাজ বন্ধ। সেদিকেই হয়তো যেতে হবে। উত্তরে উন্মুক্ত ছোট এক পুকুর। শ্যালোমেশিন ধক ধক শব্দে পানি তোলে। ইরি ক্ষেত প্রস্তুতি পর্ব। বড় ভয়ানক নিরিবিলি নির্জন। মুনার ভালো লাগে না। মনে কেমন কেমন কু-ডাক সন্দেহ দোলা। এ কোথায় নিয়ে এলো তাকে? মাকে ফোন দেবে? সেই দু-জন মানুষ সঙ্গে সঙ্গে হেঁটে আসে কেন?

‘আমরা কোথায় এলাম সজল ভাই?’

‘এই তো চলে এসেছি।…তুই কি ভয় পাচ্ছিস?’

‘না না, তা কেন?’

‘যে মিডিয়া ধরেছি না, সেই লোক এখানে আছে। বাড়ি তৈরির কাজ দেখাশোনা করে।’

‘তাকেই টাকা দিতে হবে?’

‘আ রে না। সেটা তো ভাইয়াকে দিয়েছি। লোকটাকে খবর দিতে হবে।’

‘মোবাইল করে দিলেই তো হতো।’

‘মোবাইল করেছি তো।’

‘তবে এখানে কী জন্য আসা হলো?’

‘তুই বড্ড চালাক মুনা। জেরা করছিস।’

‘হা হা হা!’

সেই দু-জন মানুষের কেউ একজন আচমকা অট্টহাসি ছুড়ে দেয়। সজল হাসির রেশে নিজেকে ছড়িয়ে রাখে। মুনা এবার সত্যি ভয় পেয়েছে। তার হাত-পা ঠান্ডা স্থবির হতে শুরু করে। এখন কী করবে? কোন্‌ জায়গা কী নাম কিছু জানা নেই। কোনো বুদ্ধি আসে না। সব যেন গোলকধাঁধা। তারপর সহসা কি হয়, মোবাইলের স্পিড ডায়াল ডিজিট খুঁজে আলগোছে চেপে ধরে। মামুনের মোবাইল বাসায় আছে। যদি মা ধরে। ‘মা, ও মা আমারে বাঁচাও…বাঁচাও গো মা।’ মা কি বাসায় আছে? তার তো জেলা কারাগারে যাওয়ার কথা। কেন যে ওই মোবাইল সঙ্গে রাখা হয় না? মুনা দিশাহীন কী করে নাকি দৌড় দেয় সিদ্ধান্ত নিতে নিতে দেরি হয়ে যায়। তখন সজল না কি অন্য সেই ধুমসো আধবুড়ো ধাক্কা মেরে ঠেলে দেয়, মুনা কিছু দেখে না; বোঝে না। চারিদিক নিকষ অন্ধকার। গরম ভাঁপ। সবকিছু চোখে সয়ে এলে নিজেকে ঘরের মধ্যে খুঁজে পায়। বিশাল তিন দৈত্যছায়া দরজা আগলে রাখে। দেয়ালের চারপাশ, উঁচু শিখরদেশ আর ঘুলঘুলি গলিয়ে হালকা আলো জাগিয়ে তোলে জ্যামিতিক কারসাজি কিংবা তামসিক আঁধার। অনেক দূর থেকে হাতছানি দেয় কেউ। মুক্তির পথ। মুনা সত্যি সত্যি ছুটে যায়। ততক্ষণে পথ বন্ধ হয়ে গেছে। আলোছায়ায় হামলে পড়ে বোটকা অন্ধকার।  মুনা পুনরায় ধাক্কা খেয়ে আছড়ে পড়ে। সে বালুময় মেঝেয় হতবিহ্বল বসে থাকে। ঘরের কোনায় কয়েক বস্তা সিমেন্ট। সেগুলোর পাশে কোদাল-কড়াই আর কী কী কে জানে। পশ্চিম দেয়ালের পেছনে আচমকা দমকা বাতাস বয়ে যায়। টিনের চালে বাঁশকঞ্চির উদ্ভট শব্দ। মাথা ঝিমঝিম হট্টগোল। মুনা বুঝতে পারে না কী করা যায়। তার দু-চোখ কাতর অবিশ্বাসে চারপাশে তাকিয়ে কিছু বুঝে নিতে চায়। অথবা সব দুঃস্বপ্ন ভেবে ভুলে যেতে।

সজলের মোটা ঠোঁট আরও ঝুলে পড়ে। নির্বিকার এক জল্লাদ যেন দাঁড়িয়ে আছে। দীর্ঘাকার কোনো নেকড়ে? নিমতলায় বুধারুর চা স্টল। সাদা-ধূসর ধোঁয়ায়  মিশে থাকে চা-এর সুবাস। পশ্চিমে স্টুডিওর সামনে বসে থাকে নেড়িকুকুর। কখনো চোখে তার হিংস্র দৃষ্টির খেলা। মুনা স্কুলে যায়। সাদা ড্রেসের উপর পারস্য-নীল ওড়না আকাশে রংধনু আলো তোলে। কুকুর উঠে দাঁড়িয়ে দু-কান ফট ফট ঝাঁকিয়ে শরীর ঝেড়ে নেয়। চোখে তার বড় মুগ্ধ দৃষ্টি। মুনা বোঝে অথবা বোঝে না, কী বোঝে কি যায় আসে? তপন কী বলতে চায়? কোনো আবাহন নাকি গোপন ইচ্ছেডানা? মুনা জানে না…জানতে চায় না। সে মাথা নিচু আস্তে হেঁটে চলে যায়। তখন কেউ কি ফিসফিস গুনগুন শুরু করে? কোকিলের ডাক? মন বড় অবুঝ…বাতাসে দোল খায়।

অন্ধকার নাকি পাতালের গুহা? তিনজন দৈত্য পাহাড়ের মতো সবটুকু আলো শুষে নিতে থাকে। মুনা বুঝি আচমকা সম্বিত ফিরে পেয়ে অকারণ দিশা হাতড়ায়। কী করবে সে? তার মাথা ঘোরে। শরীরে কোনো শক্তি নেই। রাজ্যের সকল ঘুম নাকি তন্দ্রা সাপলুডুর মতো পেঁচিয়ে ধরতে চায়।

‘জিলাপি ওটা এনেছিস?’

‘জি বস্‌…এই যে আসল মাল।’

মুনা ঘরের মধ্যখানে দিশাহীন অসহায় কুণ্ডলিত দাঁড়িয়ে থাকে। এ ছাড়া আর কী করতে পারে? পুনরায় আরও একবার স্পিড ডায়াল। তার হাত-পা কাঁপে। সে বুঝি পড়ে যায় যায়। তার বিস্ফারিত চোখের সামনে চকচকে জলরং বোতল। হাত থেকে হাতে ঘুরে সজলের আঙুলে তরল ঢেউ নেচে নেচে ছলকে যায়।

‘আ বে ওর হাত থেকে মোবাইলটা নে।…দে দে আমাকে দে। শালি মহা চালু মাল।’

সজল নিজেই মোবাইল কেড়ে নিয়ে মেঝেতে ফেলে দেয়। বোতলের মুখ খোলে। মোবাইলের উপর ঢালতে থাকে উষ্ণ তরল। প্লাস্টিক গলে গলে পুড়তে থাকে। ঘরের চারপাশে উদ্ভট গন্ধ। মুনা দিশাহীন বুঝিবা অচেতন একছুটে কারও পা চেপে ধরে। সে কি সজল নাকি অন্য কেউ কোনো বোধ নেই। নিজেকে তার কোনোদিন এত অসহায় লাগেনি। সেই থেকে কম্পমান নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। মুখে কথা নেই। সে বোবা হয়ে গেছে। কথা বলতে জানে না। সে বাকরুদ্ধ। কয়েকটি শব্দ বলার শত চেষ্টা। প্রাণভয় আকুতির মরিয়া মায়াজাল। সেগুলো শব্দ নাকি আর্তনাদ চার দেয়ালের মধ্যে ঘুরপাক খেতে খেতে তারই মতো ভেঙে ভেঙে পড়ে। ঝাপসা অন্ধকার নেমে আসে চারপাশ।

‘তোর পায়ে পড়ি ভাই, আমার ক্ষতি করিস না, ভাই গো আমরা বড় গরিব ভাই। একটু দয়া কর। দয়া কর ভাই।’

‘অনেক অহংকার মুনা। তোর রূপের দেমাগ। এবার অহংকার নামিয়ে দেব।’

‘তোর পায়ে পড়ি ভাই। ও আল্লাহ ও আল্লাহ। ভাই আমাকে ছেড়ে দে ভাই। আমি তো কিছু করিনি।’

সজল সজোরে এক থাপ্পড় মেরে বসলে খুব সহজে নেতিয়ে পড়ে মুনা। তাকে ঘরের মধ্যখানে আবার দাঁড় করানো হয়। শিকারির ক্রুর লোভাতুর দৃষ্টি। আবছায়া অন্ধকার দেয়ালে দেয়ালে ভেসে থাকে হাজার চোখ। মুনা দু-চোখ বুজে ফেলে। সজল অস্থির চিৎকার দেয়, –

‘খোল…সব কাপড় খোল। দেখি তোর কত রূপ কত অহংকার!’

‘এ্যাঁ!’

‘খোল হারামজাদি। রিমুভ অল ইয়োর ক্লথস্‌। অপেন অপেন। বোতলের সবটা মুখের উপর ঢেলে দেব কথা না শুনলে।’

‘ভাই…ও ভাই, আমাকে মাফ করে দে রে ভাই। ও ভাইজান, না না আপনে আমার বাপের মতো। আমারে বেইজ্জত কইরেন না বাবা।’

‘বস ছেমড়িকে এত তোয়াচ করেন ক্যান? আমাকে বাপ ডাকে। বলেন তো…।’

‘তুই চুপ কর আলাল। একটু খেলিয়ে নিতে হবে না? অনেক দেমাগ। হা হা হা!’

মুনার তীক্ষ্ণ আর্তনাদ অট্টহাসির কোরাসে দিগভ্রান্ত হতে থাকে। বদ্ধ ঘরের দেয়াল থেকে দেয়ালে আছড়ে পড়ে চাপা উল্লাস। তার কোনো বোধ নেই। সে একমুহূর্ত নাকি অনন্তকাল দ্রৌপদীর মতো, মৃত মানুষের মতো যন্ত্রচালিত আস্তে আস্তে নিজেকে বেআবরু করতে থাকে। তারপর ছায়া-ছায়া অন্ধকারের সবটুকু জুড়ে কোনো এক পরি আলোকিত করে দেয় চারিদিক। তার ভয়ার্ত বিশুষ্ক লজ্জার মুখছবিতে সম্ভ্রম আর বেঁচে থাকার হাজার আকুতি। ছোট ছোট দু-হাতে বুক আগলে শরমে মরে যায়। তখন মানুষের দমবন্ধ উষ্ণ নিশ্বাস। বাইরের বাতাসে বুঝি ঝঞ্ঝা দোলা। পশ্চিম দেয়াল আর টিনের চালে বাঁশের ডালপালার চঞ্চল গতিবেগ। কোথাও কি কোনো বিকট বজ্রপাত আছড়ে পড়ে? আচমকা তাপিত করে যায় দুপুরের আবরণ? মুনা কি অকারণ কোনো কথা বলে ফেলে? সেও তো অসহায় স্বগতোক্তি। সে নারী, সে পৃথিবী; মায়ের জাত। তারা মাকে বিবস্ত্র করে রাখে। আসলে কোনো কথা বলতে পারে না সে। তারা এবার হয়তো মেরে ফেলবে। মুনার হাত-পা স্থবির। সকল চেতনা অনড়-অবশ। সে মেঝেতে ঝপ করে পড়ে যায়। আদিগন্ত বালুর পাথার। আচমকা ঘুলঘুলি বেয়ে তাপদাহ ধেয়ে আসে। কেউ দরজা খুলে বেরিয়ে যায়। মুনার দৃষ্টিতে প্রকাণ্ড এক কালো ছায়া।

কোনো প্রলম্বিত চিৎকার অথবা কান্না বাতাসে ছড়িয়ে যাওয়ার আগে কেউ মুখ চেপে ধরে। মুনা অচেতন। কোনো বোধ নেই। কোনো বাধা নেই। নিজেকে বুঝি প্রকৃতি কিংবা অচেনা ঈশ্বরের হাতে ছেড়ে দেয়। কেউ কি তার দু-হাত চেপে উপরে উঠে বসে? সে বোধকরি সজল। হায়! মুনা কোনো গোঙানি আর্তনাদে তীব্র যন্ত্রণা ছেড়ে মূর্ছা যায়। আর কিছু মনে নেই। তার ভাসা ভাসা অস্বচ্ছ দৃষ্টি। সে বুঝি কোনো পাখি। আকাশে ভেসে যায়। কোনো উপলব্ধি নেই। কোনো অস্তিত্ব নেই। সে মরে যেতে থাকে। তার মৃত শরীরের উপর শেয়াল-কুকুর। তাদের মুখ মুখের কাছে নেমে আসে। চেহারা দেখা যায়। অস্পষ্ট ঘোলা কালো কুৎসিত। সেই ছবি কখনো সজল কখনো অন্যকেউ। আরেকজন। পুনরায় সজল। মুনার দু-চোখে রাত গভীর কালো পরদা চেপে বসে। চারিদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার। আশপাশে জেগে থাকে শুধু উচ্চিংড়ে-ঘুগরের তারস্বর ডাক। কে জানে কোনো হিসিহিস অট্টহাসি। শীৎকার শেষে আনন্দ উল্লাস হই-হুল্লোড়। কোথাও কি কোনো সুরেলা তরঙ্গ বেজে ওঠে? মোবাইল রিং টোন?

‘বহুত মজা পেলাম বস। অনেক অনেক মজা!’

‘দাঁড়া শফিকের ফোন এসেছে।…কী বে কেমন আছিস? আমি রামপুরে। আলাল-জিলাপিও আছে। আড্ডা মারছি। চলে আয়…গ্রিল খাওয়া চলছে। একেবারে ফ্রেশ ব্রয়লার। হা হা হা!’

মুনার শ্রুতিতে বীভৎস গুঞ্জন। গোলকধাঁধা সুড়ঙ্গ গহ্বরে ধ্বনি-প্রতিধ্বনি। সে তলিয়ে যেতে থাকে প্যাচপেচে গহিন গভীরে। নিচে আরও নিচে কোন্‌ অচিন তলায়। কোনো তল নেই। সে ভেসে আছে। ভেসে ভেসে মেখে নেয় রক্তনদী। আঙুলের নখে জমে আসে থকথকে রক্ত কাদা। সে আর নিজেকে খুঁজে পায় না। সে নিজের মধ্যে নেই। হারিয়ে গেছে। কোথায় হারিয়ে গেল? সে কি মৃতদের দেশ?

রাস্তায় বাস চলে। বাসের নাম ‘মা-বাবার দোয়া’। মানুষের প্রচণ্ড ভিড়। চাপাচাপি ঘামের দুর্গন্ধ নিশ্বাস। সে কারও একটু দয়া একটু সহায়তার জন্য আঁচল পাতে। কেউ দু-পাঁচটাকা ফেলে দিলে মন-উন্মন। এবার ভাই বেরিয়ে আসবে। কেউ তিরস্কার ছুড়ে দেয়। কারও দু-চোখে কুৎসিত ইঙ্গিত। লোভ। মুনা বোঝে। মুনা কিছু বোঝে না। বাস ইপিল ইপিল গাছের সারি পেরিয়ে যায়। রাস্তায় ধুলো ওড়ে। একটি কাক মেহগনির আধমরা ডালে রোদ খেতে থাকে। আকণ্ঠ পিপাসা। কোথাও পানি নাই। মুনা একটি কাক। সে এরপর অন্য বাসে উঠে উড়ে যাবে। কত দূর জানা যাই। বাস থামে না। মুনা নামতে পারে না। তার হাত-পা বাঁধা। দম বন্ধ হয়ে আসে। মুনার চোখ আবার খুলে যায়। কে বাইরে কথা বলে? কিসের হাসাহাসি? কোন্‌ উল্লাস? তার বুকের উপর কালো ধুমসো খামচে ধরে। সে নেমে যায় না। তার ছায়া-আবছায়া বীভৎস মুখ। বড় বড় দাঁত নেমে আসে। সাপের হিসহিস। কতক্ষণ? সময় কি থেমে আছে? মুনার বোধহীন শরীর। একপাশে গড়িয়ে আছে মাথা। বিস্রস্ত চুল ধুলো মাখামাখি। চোখে না বলা বোবা দৃষ্টি। সেখানে কোন কান্নার অশ্রুপাত? তখন ফাঁকফোকর গলিয়ে আচমকা কোনো শব্দ ভেসে ভেসে বেজে যায়। মটরসাইকেল আসে। কারও স্থির হেঁটে চলা হালকা ধ্বনি। বাতাসে সুবাস ভেসে যায়।

‘শালারা প্রোগ্রাম করবি আগে জানাবি না? গ্রিল কই?’

‘আলাল খাচ্ছে। এরপর তুই যা। মাসুদ তুই শেষে। তোর তো শালা অনেক টাইম লাগে।’

‘হা হা হা! মাল এনেছিস? দে সিগারেট দে একটা।’

তারপর কতক্ষণ, সময় চলে গেলে, সে কি একদিন নাকি এক মাস কিংবা অনন্তকাল? মুনা কিছু বুঝতে পারে না। আশপাশ নিজঝুম নীরব। কেউ নেই। বাতাসে শব্দহীন শুকনো পাতার মর্মর অভিযাত্রা। ছায়া-আবছায়া অন্ধকার প্রগাঢ় হতে থাকে। সে চিত্‌ হয়ে নিজেকে ভেবে নেয় রক্তভেজা একলা নদী। বিবমিষার ক্লেদ দুর্গন্ধের মধ্যে ভেসে যায় একা একা। নিজেকে তার টেনে তুলতে কেন এত ভারী লাগে? সে কি বেঁচে আছে? অথবা মৃত প্রেতাত্মা? কোনো বায়বীয় অস্তিত্ব? সে এক লাশ। কবরের অন্ধকার। সেই অন্ধকারের এককোনে জ্বলজ্বল করে সাদা পায়জামা। কামিজের হালকা সবুজ ফ্যাকাশে কপিশ। নিজেকে টেনে টেনে এবার বের হয়ে আসা। সে পারবে তো? আকাশে গোধূলির আলো প্রায় মিশে গেছে। পুকুরের জলে দু-একটি শাপলা বাতাসে দোল খায়। তারা অদ্ভুত মায়াগন্ধ ছড়িয়ে রাখে। মুনার অচেনা পথ কি চেনা হয়ে যায়? সে হেঁটে চলে। সামনে নাকি পেছনে জানা নেই। অনেকখানি পথ পেরিয়ে কাচারির মোড়। এখানে একদিন এসেছিল। কবে? মনে নেই ঠিক। সেদিন মা সঙ্গে ছিল। তারা কারও কাছে এসে কিছু গল্প করে। সেই মানুষ তাকে অনেককিছু কিনে দেয়। কোলে তুলে আদর করে। তার বাবা। আগুনে পোড়া রক্ত-ধূসর শরীর। কাঠ-কয়লা-ছাই মৃতদেহ। মুনার চোখ ফেটে অশ্রু নেমে আসে। আজ সেও এক মৃতদেহ। আগুনে পোড়া কালো কুৎসিত রক্তাক্ত ক্লেদ। কাঠ-কয়লা-ছাই। তাই বুঝি সন্ধের ছায়ায় অকারণ সবকিছু ঝাপসা লাগে। ওই দূরে রেললাইনের সিগন্যাল দেখা যায়। পুব আকাশে স্থির জ্বলজ্বলে আগুন লাল টিপ। স্টপ। থেমে যাও। সে থেমে যায়। একবার চোখ বুজে কত কী ভেবে নেয়। মামুন হয়তো বাড়ি ফিরে এসেছে। মা তাকে জড়িয়ে কষ্ট ব্যথা ভুলে যায়। এই তো গরিবের বেঁচে থাকা। একটু প্রশান্তির মধ্যেই জীবন চলে যায়। এর চেয়ে আর সত্য কী আছে? কখনো সত্য মিথ্যে হয়ে যায়। অনেক কুৎসিত মিথ্যে সত্য হলে পরে। কেউ সত্য চেনে…কেউ জানে না। পৃথিবী এখন কুৎসিত সত্যের দাস। মুনা শিহরে ওঠে। আলগোছে দু-ফোঁটা অশ্রু রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে। কার কাছে অভিমান? কার কাছে রেখে যায় অভিযোগ? তখন অন্ধকার আরও নেমে আসতে থাকে। বোধকরি অনেক তমসার রাত।

রাত-দুপুরে নয়, সন্ধের পর পর কোনো এক কম্পার্টমেন্টে নিজেকে তুলে নেয় মুনা।                                                      

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত