| 18 এপ্রিল 2024
Categories
দুই বাংলার গল্প সংখ্যা

বুধ গ্রহে  চাঁদ উঠেছে 

আনুমানিক পঠনকাল: 8 মিনিট
Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.comজয়নুল আবেদিন  বুধ গ্রহে গেছেন।  কানিজ ফাতেমা’র এ কথা  কেউ বিশ্বাস করলনা। সারাদিনে ১৩/১৪ বার এই ঘটনা বাসার মানুষকে বলেছে।  প্রতিবার প্রশ্নের সংখ্যা এবং অবিশ্বাসের মাত্রা বেড়েছে বই কমেনি।  
“তুই কি বলতে চাস?”
-“আমি বলতে চাই জয়নুল আবেদিন  এখন বুধ গ্রহে আছেন।”  
“তুই চিনিস জয়নুল আবেদিনকে? দেখেছিস তাকে?”
-“দেখবনা কেন? বইয়ে ছবি আছে।  রাস্তার মোড়ে মূর্তি ও আছে।  শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন।  আমাদের এলাকার ছেলে। ছোটবেলায় জয়নুল আবেদিনের  বাড়ি ঘুরতে গেছি না তোমাদের সাথে।   চিনবনা কেন?”
“তা তোকে এসে সে বলে গেছেন, উনি বুধ গ্রহে থাকেন?”
-“উনি আমাকে কিভাবে বলবেন? উনি তো আমাকে আর চিনেন না।”
“তাইলে তুই কি স্বপ্নে পাইলি?”
-“স্বপ্নে পাইনি।  ঘুম থেকে জাগার পরই  দেখেছি ঘটনা।”  
“কি ঘটনা?”
কানিজ ফাতেমাকে আবার প্রথম থেকে গল্প বলতে হয়।  গল্প এই যে, 
কানিজ ফাতেমার ঘুম ভেঙে গেছে মাঝরাতে। আনুমানিক ৩টা বাজে।  ঠুক ঠুক আওয়াজ।  টুকটুক আওয়াজ না,  তার চেয়ে বেশি, গভীর।  ঠুক ঠুক।  যেন কাঠে পেরেক রেখে কেউ ঠুকছে। জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দেখে, ইয়া বড় এক মই।  কত বড় মই সেটা কানিজ ফাতেমা হিসাব করে বলতে  পারবেনা।  তবে সে তার ২৬ বছরের জীবনে এত বড় মই দেখেনি। মই আকাশের মধ্যে আটকে আছে। আড়াআড়ি। এটা ঠিক বোঝানো কঠিন।  কানিজ ফাতেমা নিজে না দেখলেও তো বিশ্বাস করতো না।  তাও সে চেষ্টা করল।  হাত পা এঁকে বেঁকে নানা ভঙ্গিমায় বোঝানোর জন্য মই কেমন করে আটকে ছিল।  
মই আড়াআড়ি, পাতালি  করে আটকে ছিল আকাশের গায়ে।  যদি দুইটা বড়  মেঘ পাশাপাশি থাকে, এবং এক মেঘ থেকে আরেক মেঘে যেতে যেমন করে মই শুয়ে দিতে হবে আকাশের গায়ে, তেমন  করে মই আটকে ছিল।  আকাশের গায়ে।  অনেক বড় মই।  মইয়ের এক দিকের অংশ সে দেখতে পাচ্ছেনা পুরোটা।  মেঘে আটকানো।  যে অংশটা দেখতে পাচ্ছে, তা, একটা রকেটের গায়ে আটকানো। 
এখানে এসে কানিজ ফাতেমাকে আরেকবার থামতে হয় প্রতিবার।  প্রশ্ন আসে, “তুই রকেট চিনিস?”
সে রকেট চেনে।  শিক্ষিত একটা মেয়ে।  বিএ পাশ করেছে।  রকেট তো সে অবশ্যই চেনে। কিন্তু এটা সে রকেট বলছে বটে।  কিন্তু সে শতভাগ নিশ্চিত না এই জিনিসটি ও রকেট কিনা।  সবাইকে বোঝানোর জন্য সে রকেট বলছে।  কিন্তু একটি উঁচু পেট মোটা গোল সিন্দুকের মতন দেখতে রকেট বলা যেতে পারে।  গায়ে এবার থেবড়ো কারুকাজ।  সেই সিন্দুকের মতন রকেটের দরজার সামনে একটা স্টিলের টুপি পড়া লোক দাঁড়িয়ে, যাত্রী উঠাচ্ছে।  যাত্রীরা আকাশের গায়ে পাতালি করে শুয়ে থাকা মই দিয়ে হেঁটে আসছে, সহজে, সাবধানে।  আর কোন যাত্রী কে সে খেয়াল করতে পারেনি।  কারণ কানিজ ফাতেমা লক্ষ্য করেছে জয়নুল আবেদীন কে শুধু।  সে সিন্দুকের মতন দেখতে সেই রকেটে ঢুকছে।  
এখানে এসেও কানিজ ফাতেমা কে থামতে হয়।  আর কোন যাত্রী কে সে দেখলনা কেন? 
সে উত্তর দেয়, কারণ সে তাদের চেনে না।  
এর পরের প্রশ্ন আরো জটিল।  “তুই আর কাউকে চিনিস না, জয়নুল কে চিনলি কেমনে?
কিন্তু কানিজ ফাতেমা  ঘাবড়ে না যেয়ে ঠিক উত্তর দেয়।  কারণ সে যা দেখেছে  ঠিক তাই বলছে।  
– “আমি দেখেই চিনলাম।”
“তারা না আড়াআড়ি মই দিয়ে রকেটে উঠল। তো তুই  সাইড থেকে তার  চেহারা দেখে বুঝে গেলি যে উনি জয়নুল।”
-“উনাকে পিছন থেকে একজন বলল যে, জয়নুল আমরা  কই  যাচ্ছি?  উনি যখন মুখ বাম দিকে ঘুরিয়ে পেছন ফিরে  কথা বলছিলেন, তখন আমি উনার পুরা চেহারা দেখেছি।”
“তারপর?”
-“তারপর জয়নুল আবেদিন  উত্তর দিলেন বুধ গ্রহে।”
“তারপর?”
-“তারপর উনি ওঠে গেলেন। আমি পর্দা টেনে আবার ঘুমাতে চলে আসলাম।”
“কেন?”
-“আমার আর দেখতে ভয় লাগছিল। কেমন অদ্ভুত …”
“ভয় পেলে তো  বাড়ির কাউকে ডাকলেই পারতি?”
-“বাড়ির কাউকে ডাকার কথা মাথায় আসেনি।”
কানিজ ফাতেমা যা বলছে সত্য বলছে।  সে যতবারই এটা বোঝানোর চেষ্টা করে, লাভ হয়না।  ১৩/১৪ বার প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষে, আব্বা বাসার সবাইকে ডেকে জানাল যে, এই ঘটনা যেন বাইরের মানুষ না জানে।  কানিজ ফাতেমার শ্বশুরবাড়ির দিককার কোন আত্মীয়ের কানে যেন ভুলেও এ কথা না যায়।  মাত্র আকদ হয়েছে।  পাত্রপক্ষের জন্য বিয়ে ভেঙে দেয়া তো এক-দুই খেলা মাত্র।
কানিজ ফাতেমাকে পইপই করে বোঝানো হল, যে সে তার প্রবাসী জামাইকে যেন এ বিষয়ে কোন গালগল্প না করে।  একে বিয়ে হয়েছে নতুন নতুন, তাও ঘটকের মাধ্যমে।  প্রেম ভালোবাসার বিয়ে না।  এত অল্প পরিচয়ে বিয়ে, বিয়ের ৭ দিন পর জামাই বিদেশে চলে গেছে।   নিউজিল্যান্ড সেখানে চাকরি করে। বিয়ের পর এক বছর হল। এখনো আসেনি দেশে।  কানিজ ফাতেমাকে নিয়ে যাবার জন্য ব্যবস্থা শুরু করবে।  এর মধ্যে জামাই যদি জানে, যে তার নতুন বৌয়ের মাথায় সমস্যা দেখা দিচ্ছে, এ বিয়ে ভাঙবে নিশ্চিত। 
কানিজ ফাতেমার সাথে তিন দফা বৈঠক হলো বাসার মানুষদের- তার বাবা, মা, আর ভাইজানের।  সে প্রতিবারই মাথা নেড়ে বলেছে, সে এ কথা কাউকে বলবে না।  তাও বোধহয় তারা ঠিক বিশ্বাস করছে না।  বাসায় আরো একজন মানুষ আছে।  কানিজ ফাতেমার ভাবি।  ভাইজানের বৌ, নাম সায়মা।  কানিজ ফাতেমার চেয়ে বয়সে ২/ ৩ বছরের ছোট । বয়সে ছোট হলে ও সম্পর্কের খাতিরে, ভাবি বলেই ডাকে  সায়মাকে। সায়মা ভাবি তার সাথে কোন বৈঠকে বসেনি। একমাত্র তার প্রশ্নের ধরণে কানিজ ফাতেমা কিছুটা আগ্রহ খুঁজে পেয়েছে, তার চোখে বিশুদ্ধ বিস্ময় খুঁজে পেয়েছে। বাড়ির আর মানুষদের মতন অবিশ্বাসী চোখে প্রশ্ন করেনি। 
সায়মা পাশে বসে কানিজ ফাতেমার হাত ধরে বলেছে, “পৃথিবীতে নানা অদ্ভুত ঘটনা ঘটে বুঝলা।  সব কিছুর ব্যাখ্যা পাওয়া কঠিন। থাক বোন তুমি চুপ করেই থেকো। সবকিছু কি আর সবাইকে বুঝিয়ে বলা যায়?”
কানিজ ফাতেমা সেই থেকে চুপ করেই থেকেছে।  
২৬ বছরের কানিজ ফাতেমা।  ব্রহ্মপুত্রের ধারে  বড় হয়ে ওঠা কানিজ ফাতেমা। ময়মনসিংহের এক অতি মধ্যবিত্ত ঘর, যা আকালের দিনে নিম্নবিত্তের পর্যায়ে নেমে এসেছে কখনো।  আবার সংগ্রাম করে কষ্টে সৃষ্টি মধ্যবিত্ত হয়ে উঠেছে।  এমন এক পরিবারে সন্তান কানিজ, আদরের নাম  কান্নি, পুরো নাম কানিজ ফাতেমা।  আনন্দমোহন কলেজ থেকে সমাজকল্যাণে অনার্স করে, গেল ক’বছর কয়েকটা টুকটাক টিউশনি করিয়েছে।  অনার্স পরীক্ষা দেবার আগের বছর থেকেই পরিবার থেকে বিয়ের জন্য খোঁজখবর চলছে। কানিজ ফাতেমার  কোন ভালবাসার মানুষ ছিলনা জানা মতে।  এ জীবনে তার প্রেমের অভিজ্ঞতা আছে কিনা, তাও প্রকাশিত না। তাই পরিবারের আয়োজনে বিয়েই ভরসা। 
অনার্স শেষ করে আরো ৩ বছর গড়িয়ে গেল।  বিয়ের জন্য একটা ভাল পাত্র পাওয়া গেলনা।  চাহিদা এমন কিছু ছিলোনা, ভাল পরিবারের সাধারণ ভাল এক ছেলে।  তো এই ভাল, সাধারণের বিশেষত্ব ভেঙেচুরে খুঁজে দেখতে প্রথম বছর গেল।  আবার দেখা গেল, যাকে ভাল লাগে তাদের ভালোর হিসাব নিকাশে কানিজ ফাতেমা পাশ করেনা। এই খোঁজ খবরের আয়োজনে, কানিজ ফাতেমার ও খুব একটা অনাগ্রহ ছিলনা। সে নিজেও ভাল দেখে বিয়ে করতে চায়। এই ভালোর মিলেমিশ হতে বেশ কিছু বছর গেল।  এর পর এক ঘটকের সূত্রে আপাত ভালো এক প্রবাসী পাত্রের সাথে কানিজ ফাতেমার বিয়ে হল।  ছেলের আয় রোজগার ভাল, বিদেশে নিজের একটা গাড়ি আছে। ভবিষ্যতে বাড়ি কেনার ইচ্ছা আছে। বৌ কে নিয়ে ও যাবে। কাগজপত্রের যোগাড়যন্ত্র চলছে।  
কিন্তু এই যে এত বছর লেগে গেল, কানিজ ফাতেমার জন্য পাত্র জোগাড় করতে, এই নিয়ে আত্মীয় স্বজনদের মধ্যে কানাঘুষা আছে।  মেয়ের কোন সমস্যা-টমস্যা আছে কিনা, এই ব্যাপারে আলোচনা চলে।  কানিজ ফাতেমার গায়ের রঙ বিয়ের বাজারের জন্য দশে প্রায় নয়।  ফর্সা।  চেহারা কাটাকাটা। তবু কেন এই মেয়ের বিয়েতে এতো দেরি হল, এই নিয়ে আলোচনা এক সময় হত, এখন ও তার রেশ আছে।  বিয়ের পর মেয়ে কেন এখনো স্বামীর ঘরে যায়না? ভিসা পায় না নাকি স্বামী নেয় না?
তবে কানিজের বাপের সংশয় অন্য বিষয় নিয়ে।  তার মেয়ের মানসিক কোনো গন্ডগোল আছে।  একটু ভাবুক গোছের।  একা একা থাকে।  নিজে নিজে কথা বলে।  আর এই নতুন জয়নুল আবেদিনের গল্প ফেঁদে বসার পর, কান্নি মানে কানিজ ফাতেমার বাপ আরো সাবধান হলেন।  এই কথা বাইরে প্রকাশ করা যাবে না।  
স্ত্রী কে ডেকে বললেন, “মেয়েকে দেখেশুনে রাখ।  ওর তো মাথায় সমস্যা আছে হালকা, আগেই বুঝছিলাম। একা একা কথা বলে।  এখন তাকে নিজের  সংসারে মানে মানে পাঠানো দরকার।”
সবাই সাবধান হয়, আব্বা, আম্মা, ভাইজান, ভাবিও।  কানিজ ফাতেমার  স্বামী যখন ইমো’তে ফোন দেয়, আম্মা আসে পাশে ঘুরে। কখনো ভাবিকে পাঠায়। কানে কানে শোনে, যদি সেদিনের অদ্ভুত গল্প সে তার স্বামীকে বলে দেয়? কিন্তু সে বলে না।  এমন অদ্ভুত চিত্তহর্ষক গল্প বলার মতন সহজ সখ্য স্বামীর সাথে তার নেই।  প্রতিদিনের ডাল ভাত রোদ বৃষ্টির গল্পই যথেষ্ট, সম্পর্কের খুঁটি ঠিক রাখবার জন্য।  তার স্বামীর কাছে।  
তাই  সে চুপ থাকে সবার সামনে।  কথা বলে নিজের সাথে।  সব সময়ের মতন।  বলে, ‘জয়নুল আবেদিন  বুধ গ্রহে গিয়েছে।’  
সে যা চোখে দেখল, তা কেন মিথ্যা হবে তাও সে বোঝেনা।  মন হুহু করে যখন ব্রহ্মপুত্রের ধারে যায়।  
শহরের পাশ ধরে হেঁটে গেলে, ভিড় গিঞ্জির মধ্যে ও একটু বসবার জায়গা পায়, হাত পা ছড়িয়ে। বিয়ের পর বাইরে বের হবার যখন-তখন ইচ্ছায় তালা পরেছে। কিন্তু ব্রহ্মপুত্রে ধারে আসবার জন্য নিয়ম  ব্যতিক্রম।  এই শহরের কোন মানুষই বোধহয় প্রতিদিনের স্বাভাবিকতা থেকে ব্রহ্মপুত্রকে আলাদা করে না।  ঘর-বাড়ির মতন।  সেই কারণেই, কানিজ ফাতেমাও বাড়ি থেকে আধা কিলোমিটার দূরে, ব্রহ্মপুত্রের ধারে এসে নিজের মতন সহজ হতে পারে।  
চারপাশে সেতু ধরে, নৌকা করে, এ পার ওপর করা মানুষ।  শম্ভুগঞ্জ,  নেত্রকোণা, কিশোরগঞ্জ, টাঙ্গাইল থেকে ব্রহ্মপুত্র ধরে নিয়মিত আসা যাওয়া করা, কিছু পরিচিত চেহারা চোখে পরে।  কেউ হাসে, কেউ কুশল বিনিময় করে, কেউ চোখ সরিয়ে নেয়। কানিজ  ফাতেমা জানেনা, প্রতিদিনের জীবন ব্রহ্মপুত্র ছাড়া কেমন। তেমন সে জানে না, ব্রহ্মপুত্রের আসে পাশের ভিড় জমানো মানুষবিহীন বিকেলগুলো কেমন হয়।  
সে বসে বসে ভাবে, নিজের সুরে একমনে বলে, ‘জয়নুল আবেদিন তো বুধ গ্রহে গিয়েছে।’  
সে ঠিক তার কথা রাখে, বাবা মা আর ভাইকে-ভাবিকে দেয়া কথা।  কাউকে কিছু বলে না।  কেউ শোনে না কেউ জানে না – সেদিন কি ঘটেছিল।  কানিজ ফাতেমা নিজের সাথে কথা বলে। ব্রহ্মপুত্রকে সামনে রেখে বলে।  সময়ের সব না-বলা গল্প  পলি জমা হতে হতে কখন ভেসে যায় নদের জলজ শরীরে,  সেই আদি থেকে।  জমে থাকা সময়ের গোপনটুকু  জলে ভাসাতেই অভ্যস্ত নদ, তাতে তার জল ভাসানোর সহজ খেলায় কিই বা আসে যায়? ভাসানোই তো তার কাজ। নির্বিকার ব্রহ্মপুত্রের সামনে বসে তাই, কানিজ ফাতেমার নিজের সাথে কথা বলে যাবার এই সময়টুকু তার একান্ত, সাবলীল।
কানিজ ফাতেমার দাদি বলতেন, “তুই যদি ৩ লক্ষ ৭০ হাজার বার মুখে বলে বলে কিছু চাস, মন থেকে বিশ্বাস করে, তোর সেই মনের ইচ্ছা পূর্ণ হয়। আমার মায়ের কাছে শুনছি।” 
কানিজ ফাতেমা তো গুণে দেখে না ঠিক কত লক্ষবার হলে।  গুনে দেখলে তিন লক্ষ কিংবা ৫ লক্ষ কিংবা কোটি – সে জপে গেছে, বলে গেছে বিশ্বাসে, সে যা দেখেছে “জয়নুল আবেদীন বুধ গ্রহে গেছে।”  গভীর বিশ্বাসে। কানিজ ফাতেমার বিশ্বাসের তীব্রতার কাছে ফিকে হয়ে যায় আঙ্গুল গোনা লক্ষ-কোটির হিসাব। 
ঠিক তার ২৫ দিন পর, বিদেশি সংবাদপত্রে একটি খবর ছাপা হল।  দেশের অল্প কিছু দৈনিক, ছোট্ট করে সেই খবর ছেপেছিল বটে সপ্তাহখানেক পর।  কিন্তু কানিজ ফাতেমার পরিবার খবরের কাগজ রাখে না, আর অত  ছোট্ট কোণায় গোঁজা খবর এ এলাকার কারো চোখে ও হয়তো পড়েনি।  কানিজ ফাতেমার কিংবা তার পরিবারের তো নয়ই।    
যদি খবরটা চোখে পড়ত, তাইলে কানিজ ফাতেমা জানতে পারত যে, 
বুধগ্রহে শিল্পাচার্য্য! শিরোনামের সেই খবরে ছোট্ট করে লেখা আছে, 
“নাসার স্পেসক্র্যাফ্ট মেসেঞ্জার ২০০৮-এ বুধ গ্রহ নিয়ে অনুসন্ধান চালানোর সময় এর উত্তর ভাগে বেশ কিছু জ্বালামুখ দেখতে পায়। এখানে তার মধ্যে সবচাইতে বড়গুলির একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে, যার পরিধি ১১০ কিলোমিটারেরও বেশি। নাসা বুধগ্রহে নব আবিষ্কৃত এই ক্রেটার বা জ্বালামুখগুলির নামকরণ করে পৃথিবীর নানা বিখ্যাত শিল্পী ও লেখকদের নামে। যারা আর বেঁচে নেই। আনন্দের বিষয় এই যে, আমাদের শিল্পাচার্য্য জয়নুল আবেদিন ও আছেন সেই তালিকায়। তাঁর নাম অনুসারে বুধগ্রহের একটি জ্বালামুখের নামকরণ করা হয়েছে আবেদিন’স ক্রেটার (Abedin’ Crater)।”
কানিজ ফাতেমার চোখে পড়েনি বলেই হয়তো সে এখনো ঘোরাচ্ছন্ন, নীরব, ভাবনার ভাঁজ জোড়াতালিতে তাকে জড়িয়ে রাখে। শহরে জয়নুলের সাদা বাড়িটার সামনে দাঁড়িয়ে ভাবে – “জয়নুল আবেদিন কেন বুধ গ্রহে গেলেন?”
কানিজ ফাতেমার বাসা থেকে বের হলে যে সরু গলি সেটির বাম দিকে ঘুরলেই মুদির দোকান। মুদির দোকানের আদি মালিক দীনেশ দাদা। নাতিরা এখন দোকান চালায়। বুড়ো নুয়ে যাওয়া শরীর দীনেশ দাদার। বুড়ো চোখ। ভাঁজ পড়া শরীরে সে এখনো দোকানের কোণের বেঞ্চিতে সারাদিন আসনপিঁড়ি হয়ে বসে থাকে। বুড়ো বটগাছের মতন বাতাসে দুলে দুলে, বসে থাকে। বুড়ো শুকনো চামড়া আর রগ বেরুনো হাতে থাকে বই। বসে বসে দুলে দুলে দীনেশ দাদা বই পড়ে। সেই বইগুলো তার মতনই বুড়ো কিংবা তার ও বেশি। পুরোনো সব আদ্দিকালের পঞ্জিকা, আয়ুর্বেদ, গ্রহ নক্ষত্রের বই পড়তে থাকে, কাঠের ওই ক্ষয়ে যাওয়া বেঞ্চির উপর বসে বসে, দুলে দুলে।
কানিজ ফাতেমার যদি বন্ধুদের একটা তালিকা করা হয় তবে সর্ব সাকুল্যে যে ২/ ৩ জনের নাম পাওয়া যাবে, তার মধ্যে দীনেশ দাদা অন্যতম। ছোটবেলা থেকে এখনো, দীনেশ দাদার কাছে তার সব প্রশ্নের উত্তর আছে। দীনেশ দাদা কানিজ ফাতেমা কে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। আর দীনেশ দাদার চোখে কানিজ ফাতেমা গোলমেলে মাথাওয়ালা মানুষ নয়, সহজ সাধারণ একজন।
দীনেশ দাদা কে সে যখন বলে, “দাদা তুমি বুধ গ্রহ চেন?”
-“তা সে চিনব না? সূর্যের একদম কাছে থাকে, যেন তার ছোট সন্তান।”
দীনেশ দাদা আরো বলে, “তুই জানিস, বুধ গ্রহের কোন চাঁদ নাই। এমন পিচ্চি এক গ্রহ এর চাঁদ থাকবে কি?”
কানিজ ফাতেমা প্রশ্ন করে, “তুমি বুধ গ্রহ দেখেছ?”
দাদা বলে, “আমি তো খুঁজিনি। তুই খুঁজলে পেতে পারিস। কিন্তু কঠিন। সূর্যের একবারে কাছে তো, সূর্যের এই কড়া আলোতে একবারে ডুবে থাকে।”
কানিজ ফাতেমার মন ভার হয়। “তবে কেমন করে দেখব?”
-“দাঁড়া চিন্তা করিস না। আমি বই পত্র ঘেটে জানাব তোকে।
দীনেশ দাদা জানিয়েছিল।  শোন, বইয়ে লেখা আছে, দিগন্ত থেকে পূর্ব বা পশ্চিম আকাশের গায়ে ভোর রাত্রে এবং সন্ধ্যায় বুধকে দেখা যায়।”
সূর্যের আলো থেকে ছিটকে আসা সময়টাতে পৃথিবীর গা ঘেঁষে বুধ যখন চলে যায়, কানিজ ফাতেমা নিয়ম করে বসে থাকে,সবার চোখ এড়িয়ে পালিয়ে, লুকিয়ে একা হয়। সূর্য জাগবার সময়ে, সূর্য ফিরে যাবার সময় ধরে মাঝিরা হল্লা করে নদের চারপাশে, নৌকা আর মাছ নিয়ে। আর সেই সময়ে কানিজ ফাতেমা ব্রহ্মপুত্রকে সামনে রেখে খুঁজতে থাকে বুধ। তবে ঠাউর করে উঠতে পারে না – বুধ কোনটা?
তবে কাল মাটির গড়া বুধ, চাঁদহীন বুধ, খাদে ভরা, শুষ্ক, বৃষ্টি বাদলহীন বুধ, আর সূর্যের তাপে পোড়া বুধে, যদি একবার ঘুরে আসা যেত তো দেখা যেত, সেখানে এখন চাঁদের মেলা। কাঁচা রঙের গন্ধে, সেতার আর নানা তারের সুরে, গল্পের অক্ষরে, ছন্দের কাঁপনে এ যেন আলোয় ভরা বুধ। কালো মাটির বুধে তাঁরা মরিচবাতির আনন্দ আলো হয়ে লিখে যাচ্ছেন গল্প, বাঁধছেন সুর, খুঁজে যাচ্ছেন রং।
বুধে একবার গেলে দেখা যেত যে, এবড়ো থেবড়ো কালো মাটির গায়ে, জয়নুল আবেদিনের আঁকা আর সই করা একটা ছবি। ব্রহ্মপুত্রের ধারে অবাক চোখে অপেক্ষায় থাকা এক তরুণীর ছবি।
তার পাশে পাবলো নেরুদা কবে যেন লিখে দিয়ে গেছেন – “a nadie te pareces desde que yo te amo” –
“তুমি খুব তোমার মতন
অন্যরকম,
আমার ভালোবাসায়।”

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত