| 4 মার্চ 2024
Categories
গীতরঙ্গ

গণিত সংখ্যা: একটি বসন্তের গল্প । তন্ময় সরকার

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট

একজন বিচ্ছিরি কড়া ধাঁচের মাস্টার হল দ্যুতি মাস্টার। দ্যুতিমান মিশ্র। সকাল-সকাল যার মাথা গরম হয়ে যায় যদি ভোর ছ’টায়ঘুম থেকে ওঠার ঠিক সাড়ে চার মিনিটের মাথায় দিদি চা না দেয়। একমাত্র রোজগেরে দ্যুতির মেজাজের ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকে বাড়ির সবাই, যতক্ষণ সে বাড়ি থাকে। ঠিক সকাল সাড়ে ছ’টায় দ্যুতি পড়াতে যায় তার নাইনে পড়া ছাত্র অঞ্জনকে।

“আরে গর্ধভ!”

এক হুংকারেই অঞ্জন এইটুকু হয়ে গেল।সে খুব ভাল করে জানে, রেগে গেলে কী ভয়ংকর রূপ ধারণ করতে পারে এই দ্যুতিস্যার।

“দেখে-দেখেও অঙ্কটা ঠিক করে টুকতেপারিস না? হাঁহ্‌? কোন চ্যাপ্টার করছিস এটা? বল্ এটা কী অঙ্ক?”

অঞ্জন প্রায় কাঁদোকাঁদো মুখ করে বলল, “কোয়াড্রেটিক ইক্যুয়েশন।”

“অকাট মূর্খ! করছিস কোয়াড্রেটিক ইক্যুয়েশন, আর এক্স-এর মাথায় স্ক্যোয়ার নেই! অঙ্ক পারিস না! লাইফে তোর কিস্যু হবে না! বাজারে গেলেমাছওয়ালা-বেগুনওয়ালা ঠকিয়ে দেবে তোকে।”

অঞ্জন কিছুতেই বুঝে উঠতে পারে না, মাছ কিনতে কোয়াড্রেটিক ইক্যুয়েশন কী কাজে লাগবে! তবু সে প্রাণের ভয়ে চুপ করে থাকে।পড়াতেপড়াতে দ্যুতি স্যার তিনবার নিজের মোবাইলের দিকে তাকায়।

দুই

ভয়াবহ মেজাজি দ্যুতিবাবুকে হেডমাস্টার ও ভাল করে চিনে গিয়েছেন গত সাড়ে তিন বছরে। দ্যুতিবাবুর বয়স অল্প। হয়তো বাঙালি ছেলে হিসেবে এখনও বিয়ের বয়সই হয়নি। কিন্তু সে খেপলে হেডমাস্টারও কেমন যেন কুঁকড়ে যান।

হেডমাস্টার একটু ভয়ে-ভয়ে বললেন, “বলছিলাম, দ্যুতিবাবু…”

“হ্যাঁ, বলুন। তবে আপনার বলার ঢঙ শুনে বুঝেছি, আপনি নিশ্চয়ই কোনও অন্যায় আবদার করবেন!”

“বলছিলাম, আজ আপনাকে পরপর দুটো পরীক্ষার গার্ড দিতে হবে। রজতবাবু আমাকে বললেন, আমি যেন এ-ব্যাপারে আপনাকে অনুরোধ করি।”

রজতশুভ্র মজুমদার এ-স্কুলের অ্যাসিস্টেন্ট হেডমাস্টার।

“রজতবাবুর কি আমার সঙ্গে কথা বন্ধযে, কথাটা আপনাকে দিয়ে বলাচ্ছেন? উনি যদি একটু অঙ্ক ভাল করে শিখতেন তাহলে এরকম আনসায়েন্টিফিক রুটিনগুলো হত না। কাকে দিয়েছেন রাজার পাট! আর যত গাধার খাটুনি খাটানোর জন্যে কি আপনারা আমাকেই সিলেক্ট করেছেন? আমি পারব না।”

“প্লিজ একটু দেখুন।”

“আচ্ছা, দেখছি।”

হেডমাস্টারের সঙ্গে কথা বলতে বলতে মাঝে মাঝেই নিজের মোবাইলের দিকে তাকাচ্ছিল দ্যুতিবাবু।

তিন

প্রথম সারির ছাত্রছাত্রী ছাড়া বদমেজাজি দ্যুতিস্যার ক্লাসের কারও কাছেই ভাল নয়। পরীক্ষার হলে একের পর এক নকল আবিষ্কার করছেসে। আর সেসব ছেলেমেয়েদের খাতা ও জীবন— দুই-ই বরবাদ হয়ে যাচ্ছে। এক অক্ষরও তাদের আরলিখতে দিচ্ছে না রাগি আর মারকুটে দ্যুতিস্যার। ফাইনাল পরীক্ষায় ডাহা ফেল লেখা আছে এদের কপালে।

হঠাৎ সে গিয়ে দাঁড়াল একটা মেয়ের সামনে।হুংকারে কেঁপে উঠল পরীক্ষার হল, “ওটা বের করো।”

“আমি টুকলি করি না, স্যার! ওসব আমারকাছে নেই!” সন্ত্রস্ত কিন্তু প্রত্যয়ের সঙ্গে বলল মেয়েটি।

“চোপ! আমি কি বলেছি যে, তুমি কপি করছ? আমি বলছি, মোবাইলটা বের করো।”

মেয়েটি কাঁপতে-কাঁপতে বুকের বাঁদিক থেকে মোবাইল বের করে হৃদয়হীন দ্যুতিস্যারের হাতে দিল।

“পরীক্ষার হলে ফোন নিয়ে আসা হয়েছে? গেট আউট!” মেয়েটিকে বের করে দিল দ্যুতিস্যার।

কী নিষ্ঠুর পাষাণ এই দ্যুতিমান মিশ্র! এখুনি ওই মোবাইলটায় কত-কত ফোন আসবে। মেয়েটির প্রেমিকের ফোন। মেয়েটি বাইরে দাঁড়িয়ে খুব কাঁদছে।

সত্যি একটা কল এল। দ্যুতিমান কলটা রিসিভ করল, কিন্তু কোনও কথা বলল না। ও-প্রান্ত থেকে স্বর ভেসে এল, “কী ব্যাপার, রিয়া? পরীক্ষা দিচ্ছো বলে কি আমাকে একেবারে ভুলে বসে থাকবে? টয়লেটে যাওয়ার নাম করে বেরিয়ে একবার কল করতে বলেছিলাম। তাও করলে না!”

ওদিকে এ-দৃশ্য দেখে ভয়ে আধমরা হয়ে গিয়েছে মেয়েটি। প্রেমিকের সব কথা শুনে নিয়েছেন দ্যুতিস্যার। কী বলেছে কে জানে! দ্যুতিস্যার কে এখন ক্ষুধার্ত সিংহের চেয়েও ভয়ানক দেখাচ্ছে। দ্যুতিস্যার প্রেমিকের কলটা কেটে নিজের মোবাইল পকেট থেকে বের করল। কী যেন দেখল। তারপর মেয়েটির মোবাইল মেয়েটির হাতে দিয়ে গম্ভীর ভাবে বলল, “ফোন করে কথা বলে নাও।”

বিস্ময়ে মেয়েটি বিস্ফারিত চোখে চেয়ে রইল। তার সারা শরীর কাঁপছে। এবার চিৎকার করে উঠল দ্যুতি মাস্টার, “নাও!”

মেয়েটি থরথর হাতে মোবাইলটা নিয়ে টয়লেটের দিকে চলে গেল।

 চার

স্কুল থেকে ফিরে সোজা দেবীদের বাড়ির দিকে যাচ্ছে দ্যুতিমান। খুব স্পিডে, খুব রাগান্বিত ভাবে চলেছে সে। গেট খুলে হনহন করে এগিয়ে কলিংবেল বাজাল। দরজা খুলে দেবী প্রথমে জোরে বলে উঠল, “তুমি চলে এসেছো?” তারপর ফিসফিস, “বাবা রয়েছে বাড়িতে!”

“কে এলো রে, দেবো?”

“কেউ না, বাবা। কেউ ইয়ার্কি মেরে কলিংবেল বাজিয়ে চলে গেছে হয়তো।”

এক হেঁচকা টানে দ্যুতিকে পাশের ঘরে টেনে নিল দেবস্মিতা।

স্বভাবত মাস্টারি ঢঙে চিৎকার করে উঠল দ্যুতি, “সারাদিনে কি একটা ফোন করতে নেই?”

পাশের ঘর থেকে দুর্জয় বাবু আবার ডেকে উঠলেন, “কেউ কথা বলল নাকি রে, দেবো?”

“কই, বাবা, না তো!”

“অ। তেমন যেন শুনলাম।”

দেবী আবার ফিসফিস করল, “তুমি জানো না, আজ থেকে আমার এম.এ ফার্স্ট ইয়ার পরীক্ষা শুরু হয়েছে? সারাদিন খুব টেনশনে আর চাপে ছিলাম। তাই কল করতে পারিনি।”

দ্যুতি আবার চিৎকার করবে প্রায়, দেবীমুখ চেপে ধরল। এবার ভীষণ রাগে গজগজ করতে-করতে দ্যুতি ফিসফিস করে বলল, “অঙ্কটা যদি ঠিকমতো শিখতে তাহলে বুঝতে পরীক্ষা দিয়েও কীভাবে কল করা যায়! পরীক্ষা দিচ্ছো বলে কি আমাকে একেবারে ভুলে থাকবে? কী টেনশনে কেটেছে আমার সারাদিন তুমি জানো? তোমার রেস্ট্রিকশনের জন্যেই তো যখন তখন তোমাকে আমি কল করতে পারি না। তাই বলে তুমি সারাদিনে একটা ফোন করবে না? তুমি ভেবেছ টা কী, হাহ্?”

মারাত্মক রেগে গিয়েছে দ্যুতি। দেবস্মিতা তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল, “সরি!”

চুপ করে রয়েছে দ্যুতিমান। দেবস্মিতা কাঁধের কাছে ভেজা-ভেজা কিছু অনুভব করল। দেবী আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে বলল, “এক্সট্রিমলি সরি, ডিয়ার!”

“তুমি আমার কাছাকাছি না থাকলে, তোমার সাড়া না পেলে আমার খুব কষ্ট হয়! তুমি বোঝো না!”

ঝরঝর করে কাঁদছে বিচ্ছিরি কড়া ধাঁচের মাস্টার, দ্যুতি মাস্টার।

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত