গুনগুন বৃষ্টি

গুমোট আকাশ গত দুসপ্তাহ ধরে।গোটা বর্ষাকালটা চুরি গেছে কলকাতা শহরের বুক থেকে। এমন অনাবৃষ্টির আষাঢ় মাস কখনো দেখেনি সমাপিকা। কেউ দেখেছে কি কলকাতায়? জুন গেল, জুলাই প্রায় শেষ। একদিন একঘন্টা বৃষ্টি হয়েছে মাত্র।আকাশের বুক থেকে সমস্ত জল শুষে নিয়েছে মানুষের লোভ। প্রকৃতির প্রতিশোধের রক্তচোখ তাকে পোড়াচ্ছে। সমাপিকার এই ক’টা দিন খুব ব্যস্ততা চলছে। গত তিন সপ্তাহে পাঁচটা বড় ইভেন্টে পারফর্ম করতে হয়েছে। এত বর্ষার গান গাইল ও মঞ্চে, তা না শুনে লোকে ব্যাঙের ডাক শুনতে চাইছে আসলে।

” আয় বাবা আয়, ধান-টান মেপে দেবনা, যা চাইবি উজাড় করে দেবো। শুধু আয় বাপ।” রোজ বলে সমাপিকা। কিন্তু বৃষ্টি পাত্তাও দেয়না। সমাপিকা বরাবরই ভাবালু প্রকৃতির। বন্ধুরা তার জন্য ক্ষেপায় ও।” হ্যাঁ রে, খাতার পাতায় এত বৃষ্টি নামালি, দুফোঁটা আকাশের দিকে ও ছুঁড়ে দে বস্।”

কোন কোন বন্ধু টিটকারি করে বলে তোর লেখায় নায়ককে এত প্রেমে-বৃষ্টি তে ভেজালি যে মোর দ্যান রিয়াল লাইফ হয়ে গেল কেসটা। এপারের সব বৃষ্টি তোর নায়কের ছাদে পড়ছে। কী জন্ডিসকেস করলি বলতো!
সমাপিকা কখনো কপট রাগ দেখায়, কখনো ইগনোর করে।‌গত চারমাস ওর শরীরে বৃষ্টি পড়েনি। জমি শুকিয়ে শুকনো ধুলো উড়েছে শুধু। ওরই একটা মারাত্মক ভুলে অভিমানে দূরে সরে গেছে সুহৃদ। দূরত্ব মানুষের মাঝখানের সবটুকু জলকে কেড়ে নিয়ে খরায় দাঁড় করায়। দুটো মানুষ একে অপরের ডাক শুনতে পায়না। কতবার ও ডেকেছে ‘সু উউ হৃ ই ই দ….. সু উউ হৃ ই ই দ’, ঘুমের ওপার থেকে সে ডাক প্রতিধ্বনি তুলে ফিরে গেছে।
দূরত্বে মানুষ ঘুমিয়ে থাকতে চায়, স্বপ্নহীন।

আজ অফিসে যাওয়ার পথে দেখে ঝকঝকে আকাশ, যেন শরৎকাল। ঘন নীইল আকাশ টা।‌ এত নীল বহুদিন পরে দেখাচ্ছে পার্ক স্ট্রিট এর আকাশ।একটা বর্ষাকাল লোপাট হয়ে আষাঢ় মাসে শরতের আকাশ। চিন্তা হয়। খুব চিন্তা হয়।এ তো অশনি সংকেত।
অফিসে ঢুকে হাজার কাজের মধ্যে ডুবে যায় সমাপিকা। লাঞ্চের সময় সঙ্ঘমিত্রার ফোন আসে।
– কী রে, তোদের প্যাচ আপটা হলো?
– হলো‌ তো।
– গ্রেট! উচ্ছ্বসিত সঙ্ঘমিত্রা।
– এটা তো তোর একটা অ্যাচিভমেন্ট রে! আমি কোনদিন ভুলবনা ওজোরাতে কুড়ি তলায় বসে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলি; আমি ঠিক ফিরিয়ে আনব ওকে, ঠিক! তা এ অসম্ভব টি ঘটালি কী করে?

– ধৈর্য্য রেখে আর ভালোবেসে।
– ধৈর্য্য তোর আছে‌। অসম্ভব রকমের আছে। আমি কোনদিন তোর মতো পারবনা ধৈর্য্য ধরতে। তা, এখন সব ঠিকঠাক?
– সব ঠিকঠাক হতে গেলে সময় দিতে হয়। সেই সময়টাই দুজনের কাজের চাপে হচ্ছে না।
– হোক, হোক। জয় গুরু! কিছু তেমন ঘটলে চেপে যেওনা , আমরা রুখুসুখু মানুষ, ওইটুকু রসের খবরে খুশি হয়ে চেটেপুটে মোচ্ছব করি।
– ভাগ তুই। যত আজেবাজে কথা।
– আচ্ছা রাখছি। বস আসছে, মাথা চাটতে, বাই।
– বাই।
সঙ্ঘমিত্রা পুরো পাগল। কিন্তু সমাপিকার দুঃখগুলো বোঝে।গত চারমাস সুহৃদের থেকে দূরে থাকার ট্রমাটা সঙ্ঘমিত্রা জানে।জানে যে, সমাপিকা আর কিছু জানতে চায়না সুহৃদ ছাড়া।

গত চার মাসে সুহৃদের উপর রাগ হতনা সমাপিকার, নিজের ভুলের জন্য আফসোস হয় খুব। অর্থহীন এক বোকামির জন্য তিরস্কার করতো নিজেকে, যে বোকামি ওকে দূরে করে রেখেছে সমাপিকার থেকে। তবে সব খারাপের একটা ভালো আছে। এই খারাপ দিনগুলো সমাপিকাকে প্রথমবার বুঝিয়েছে সুহৃদ ওকে কতটা ভালোবাসে। এই ব্রেক আপটা আসলে দুজনকে নতুন করে চেনালো দুজনের কাছে।কাছে থাকার মধ্যে একটা মোহের আস্তরণ বিছানো থাকে। দূরত্ব সে চাদর টেনে ছুঁড়ে ফেলে আসল মানুষটাকে দাঁড় করায়, নগ্ন। সুহৃদ যে অকারণ আস্তরণ টা টেনে রাখতো, তার বাইরের কোমল মানুষটাকে বড্ড দেরি করে চিনল সমাপিকা। ক’দিন হল ওরা আবার পুরোনো ছন্দে ফেরার চেষ্টা করছে, কিন্তু বৃষ্টিটুকু আর পড়ে না মাঝখানে। ওদের ইন্ডাস্ট্রি এক, রোল এক, শুধু কোম্পানি আলাদা। দুজনেই স্ট্র্যাটেজিক ইনিশিয়েটিভ টিমের মিড লেভেল ম্যানেজমেন্ট এ আছে, দুটো আলাদা কোম্পানি তে। বয়স ও কাছাকাছি ই। ওরা সব কাজকর্মের হিসেব সামলে, পিরিয়ডের ডেটের হিসেব করে ঠিক করেছে সামনের বৃহস্পতিবার যাবে ওদের পুরোনো আদর-আস্তানায়।গত দুদিন আগে পূর্ণিমা ছিল।তাই কাল চাঁদ খুব জ্বলজ্বল করছিল, মেঘ কেটে গিয়েছিল রাতে। ছেলের সঙ্গে ছাদে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ চাঁদ আর তারাদের বিছানা দেখছিল সমাপিকা।নির্মেঘ আকাশ দেখে বহুদিন পরে মনের মধ্যে আশার সঞ্চার হচ্ছিল। আচ্ছা! আমরা আবার নিশ্চয়ই ঠোঁটে ঠোঁট রাখতে পারব। পরক্ষণেই আবার টেনশন কাজ করছিলো একটা। ওর যদি তখনই রাগের কথাগুলো মনে পড়ে?
চঞ্চল, অস্থির হচ্ছিল সমাপিকা। এত স্নিগ্ধ চাঁদ ওকে স্বস্তি দিতে পারছিলোনা। অনাবৃষ্টির আষাঢ়! বড় অলুক্ষণে।
আজ সকাল থেকে ঝরঝরে, ফুরফুরে আকাশ কিছুতে নিশ্চিন্ত হতে দিচ্ছে না। কে জানে কী ঝঞ্ঝা লুকিয়ে আছে এই অকাল শরতে!

আজ একঘন্টার জন্য দেখা হবে সুহৃদের সঙ্গে। এ ক’দিন বোঝাপড়া যা চলেছে, ফোনেই চলেছে। বহুদিন বাদে সামনাসামনি দেখা হবে। তবু দুপশলা বৃষ্টির দেখা নেই। চারদিক পুজো পুজো আলোয় ভরে উঠেছে,একটা খুশি খুশি আকাশ হেসে তাকিয়ে আছে।

সমাপিকা ভাবতে থাকে- খুশি হওয়া উচিত নিশ্চয়ই আমার! কিন্তু ‘ভালো’ বোধটা কিছুতেই আসছেনা। দোলাচলের মধ্যে আধঘন্টা অপেক্ষা করিয়ে এসে দাড়ালো সুহৃদের গাড়ি। বুকের ভিতর হৃৎপিণ্ডটা লাফাচ্ছে। ড্রাইভিং সিটে বসে শুনতে পাচ্ছে কি সুহৃদ? যথাসম্ভব স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছে দু’জনেই। বেশিরভাগটাই নীরবতা। কিছুটা অংশ ভরে উঠছিলো অনাবশ্যক কিছু কেজো কথায়। ঘন নীল একটা আকাশ মায়াবী আলোয় ভাসছে উইন্ড স্ক্রিন জুড়ে। সুহৃদের একটা কাজে ওরা এলো একটা অফিসে। সেখানে কিছু কাগজ পত্র নিয়ে যখন তিনতলা থেকে লিফটে উঠল ওরা, সমাপিকা দেখলো সুহৃদ চারদিকে দেখছে ক্যামেরা আছে কী না। আশ্চর্য ভাবে ক্যামেরা ছিল না। সমাপিকার খুব মজা লাগছিল দেখে। কিন্তু কেউই এগোতে পারলনা, গ্রাউন্ড ফ্লোর এসে গেল। সেই কিশোরী বেলার মতো একটা ভয় কাজ করছে। গাড়িতে উঠে একবার আঙুল ছুঁয়েই ছেড়ে দিচ্ছে সমাপিকা। উল্টো দিকের লোকটাতো কখনোই কোন রিঅ্যাকশন দেবে না। উফফ। দুচারবার আঙ্গুল ছুঁয়ে ছেড়ে দেবার পরে দু-তিন মিনিট একবার ধরে থাকলো হাতটা। দুটো আঙুলের মধ্যে একটা রোদ্দুরের আকাশ বেঁচে আছে যারা বৃষ্টি চাইছে।

একটা কফিশপ। প্রথমে বিপরীত প্রান্তে বসা। উসখুস।
পরে পাশাপাশি বসা। উসখুস।
এক-দুবার আলতো করে গালে হাত বুলিয়ে দেওয়া।
হাত ধরা-ছাড়া। ছাড়া-ধরা।
কিশোর এক প্রেম অজানা আশঙ্কায় ডানা মেলতে পারছেনা যেন। একটা ফোন এলো। একটা ফোন গেল প্রিয় বান্ধবীর কাছে। সেই সময় ওয়াশরুমে যাওয়ার জন্য উঠে গিয়েছিল সমাপিকা।
“এই রে,ভাবলো বুঝি ওকে লুকিয়ে কাউকে ফোন করলাম।কল ডিটেইলটা দেখাই? নাহ্ , বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে। থাক।” মাঝেমাঝে চোখে চোখ পড়লে দু’জনেই সরিয়ে নিচ্ছে চোখ।বাকি সময়টা ফোনে হিজিবিজি বা অফিসের কিছু চেনা প্রসঙ্গ। যাক গে!এই প্রসঙ্গগুলোই বাঁচিয়েছে নীরবতার বিড়ম্বনা থেকে।
– ওঠা যাক
– হুঁ
গাড়িতে উঠেই কানের পাশে নাক ডুবিয়ে চুমু খায় সমাপিকা। সুহৃদ কিছু বলেনা। সামনে একটা গাড়ি তাড়া দিচ্ছিল পার্কিং এ ওদের জায়গাটায় গাড়ি রাখবে বলে, অগত্যা স্টার্ট হল গাড়ি। আর কিছুটা মাত্র পথ বাকি। দোলাচলটা এখনো কাঁপন ধরাচ্ছে বুকে। সারা রাস্তা গান গাইছে সুহৃদ। সমাপিকা জানে, ওর মন ভালো থাকলে এই গুনগুন টা চলে বরাবর। যাক গে! তাহলে নিশ্চিন্তি। তবু বৃষ্টি তো পড়েনা।
গন্তব্য এসে গেছে। এখান থেকে দুটো পথ আলাদা হয়ে যাবে।এখান থেকেই দুই বিপরীত মুখে যাবে দু’জন। নামার আগে চোখে ডাকে সমাপিকা। ঠোঁট দুটো ঠিক পুরোন ছন্দে ডুবে যায় ওর ঠোঁটে। নেমে যায় সমাপিকা। এই প্রথম বার আষাঢ়ের নির্মল, পরিস্কার আকাশ দেখে ওর আর ভয় করছেনা। খুব করে চাইলে বৃষ্টি নামে ঠিক। ও বুঝে গেছে। বাড়ি গিয়ে আজ প্রার্থনায় বসবে আষাঢ়ের থেকে বৃষ্টি চেয়ে।
সারা রাস্তা গুনগুন চলে, “সে যে ঝরে ঝরে পড়ে/ আমার বিজন এ অন্তরে।”

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত