গুপ্তধন


বাড়িটার নাম ছিল এককালে চন্দ্রতপা। এখন লোকে ডাকে চাঁদের কলঙ্ক। শেঠলেনের বাড়িগুলো বেশ পরিষ্কার ঝকঝকে। খুব যে হাইফাই ডিজাইন কিংবা মারকাটারি পেন্ট তা নয়। তবে সব বাড়িরই একটা লক্ষ্মীশ্রী আছে। সুন্দর সাজানো, কাচা পরিষ্কার পর্দা হাওয়ায় দুলছে। দু’একটা বাড়ির জানলা বন্ধ, বোঝা যায় এসি চলছে। মাঝখান থেকে এই চন্দ্রতপার যেন শনির দশা লেগেছে। বহুদিন বাড়িটার কোন দেখাশোনা হয় না। কী যেন একটা রঙ ছিল, সব চাপা পড়ে গেছে ময়লাটে শ্যাওলার আড়ালে। সব্বনাশা বটের শিকড় যেন বাড়িটাকে আঁকড়ে ধরেছে। দোতলা বাড়ির পুরোটাই প্রায় ভেঙে গেছে। কর্পোরেশন কেন যে বাড়িটা এখনো পুরোটা ভেঙে দিয়ে যায়নি, ভগবান জানে! শুধু নিচের তলার একটা ঘরই আস্ত আছে। সাপ ব্যাঙ, সব আছে এখানে।

পাড়ার ছোটদের কাছে এ বাড়ি হল হানাবাড়ির চেয়েও ভয়ানক। পড়াশোনা না করলে কিংবা দুধের গ্লাস শেষ না করলে আর উপায় নেই, ওই বাড়ির ডাইনি বুড়ি রাতের বেলা খপ্ করে চুলের মুঠি ধরে নিয়ে যাবে। পাড়ার ছেলে ছোকরাদের কাছে এ বাড়ি গোপন জিনিস লুকানোর আস্তানা। সিগারেটের প্যাকেট, বিয়ারের বোতল আরামসে গুঁজে রাখা যায় এ বাড়ির ফাঁকে ফোঁকরে। আরো কত কী যে লুকানো আছে কে জানে!
মাঝে মাঝে মনে হয় কেউ বুঝি থাকে না এই বাড়ি! কারো সাড়া শব্দ পাওয়া যায় না। কাউকে আসতেও দেখা যায় না। আবার কখনো কখনো কাশির শব্দ পাওয়া যায়। এক বুড়ি থাকে এখানে। লোকে বলে তার নাকি বয়সের গাছ পাথর নেই। একেবারে কঙ্কালসার চেহারা। পড়নের কাপড়খানি শতছিন্ন। অবশ্য তাও বছর দুয়েক হয়ে গেছে। দু বছর আগে বুড়িকে দেখা গিয়েছিল পাড়ার ছেলেগুলোর সাথে ঝগড়া করতে। আবার এমন কথাও শোনা যায় বুড়ি নাকি মরে গেছে এটা নাকি বুড়ির ভূত। ওদের বাড়ি নাকি কী এক গুপ্তধন আছে, তাই আগলে বসে আছে বুড়ির আত্মা।

তা চন্দ্রতপার গুপ্তধন একেবারে মিছে কথা নাও হতে পারে। সে বহুকাল আগেকার কথা, তখন এই এলাকায় একটাই বাড়ি চন্দ্রতপা। আর পুরো এলাকা জুড়ে তাদের বাগান, পুকুর, চাকর বাকরদের ঘর। মানে জমিদারি ব্যাপার যাকে বলে। আজকের চন্দ্রতপাকে দেখলে অবশ্য এসব গল্পকথা মনে হতেই পারে।
তা বুড়ির গুপ্তধন চুরির কম চেষ্টা চলেনি। কিন্তু ওই গুপ্তধনের ধারেকাছে গেলেই সে একেবারে মা কালীর মত ধেয়ে আসে। একবার নাকি কোন চোরের হাত কাটারির এক কোপে কেটে দিয়েছিল। অনেকে দেখেছে, বুড়ি জ্বল জ্বল চোখে সারা রাত একটা কালো ট্রাঙ্কের দিকে তাকিয়ে থাকে। এই ট্রাঙ্কেই আছে বোধহয় বুড়ির গুপ্তধন।

 

২.

– কীরে এ যে ঘুমোচ্ছেই না।
– সত্যি ভাই এ যে এক ভাবে চেয়ে আছে।
পলা আর জটা দুই জাঁদরেল চোর আজ একেবারে পণ করে এসছে। বুড়ির গুপ্তধন তারা চুরি করবেই। পাড়ার কুকুরগুলোও বোধহয় শিখে গেছে। অন্য বাড়িগুলোর আনাচে কানাচে রাতের বেলা পলা আর জটাকে দেখলে সকলে মিলে ঘেউ ঘেউ করে একেবারে পাড়া মাথায় করে দেয়। অথচ পলা, জটা যখন বুড়ির বাড়ি ঢুকবে বলে তোড়জোড় করছিল, তখন পাড়ার সবচেয়ে বড় মাস্তান কুকুরটা বুড়ির ভাঙা জানলার সামনে অপকর্ম করছিল। পলা জটাকে একবার আড়চোখে দেখেই সে নিজের কাজে মন দিল। যেন ভাবটা এমন, যা করতে এসেছ তা করে কেটে পড় তাড়াতাড়ি। বেশি শোরগোল যেন না হয়।
এ বাড়িতে ঢুকতে পলা জটাকে বেশি বেগ পেতে হয়নি। দরজা তো প্রায় একটু টান দিতেই খুলে বেরিয়ে এসেছে। জটা অবশ্য ভয় পেয়েছিল, যদি বুড়ি আবার আওয়াজ পেয়ে হাতে কাটারি নিয়ে ছুটে আসে আর এক কোপে ওর হাতটা ঘ্যাঁচ করে কেটে দেয়। তবে সেরকম কিছুই হয়নি। একটাই ঘর আস্ত আছে এই বাড়ির। সেই ঘরে একটাই ভাঙা চোরা মচকানো খাট। সেখানেই শুয়ে আছে বুড়ি। কালো কালো জ্বলজ্বলে চোখদুটো চেয়ে আছে বাঁ পাশে রাখা কালো ট্রাঙ্কটার দিকে। এই ট্রাঙ্কেই আছে তবে বুড়ির গুপ্তধন। দুই চোর অপেক্ষা করতে থাকে কতক্ষণে বুড়ি একটু ঘুমোবে। কিন্তু সে যে আর হবার নয়, বুড়ি যে আর চোখ বন্ধ করে না। পলা আর জটা যেন হাঁপিয়ে ওঠে।
– চল দেখি একবার চুপি চুপি
পলা বলে
– পাগল নাকি! যদি তেড়ে আসে।
জটা একটু ভয় পায়।
– ধ্যুর সে কবেকার কথা, এখোনো ধরে বসে আছিস, ও কাটারি নিয়ে আসতে আসতে আমাদের দশবার ট্রাঙ্ক সাফ করা হয়ে যাবে।
জটা তাও একটু কিন্তু কিন্তু করে। জাপটে ধরে পলাকে আটকাবার চেষ্টা করে। পলা হাত ছাড়িয়ে এগিয়ে যায় ট্রাঙ্কটার দিকে। কী ব্যাপার হল , বুড়ি যে কিচ্ছুটি বলে না। যেমনটি ছিল, তেমনি পড়ে আছে। চোখ সোজা ট্রাঙ্কটার দিকে।
পলা জটা অবাক হয়ে যায়! পলার কী মনে হল একবার নাকের কাছে হাত নিয়ে গেল। যা ভেবেছিল ঠিক তাই, বুড়ি মরে গেছে। ইস কোন মানে হয় , এতক্ষণ ধরে তারা টেরটি পেল না গো !
– এতো মনে হয়, সক্কাল বেলাই পটল তুলেছে । দেখ, পিঁপড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
জটা বলে।
– আপদ বিদায় হয়েছে। আমাদেরই কপাল খারাপ, এতক্ষণ ধরে মশা মারলাম।
– যা বলেছিস, টেনে একটা চড় মারতে ইচ্ছে করছে নিজের গালে।
– তুই তো, বুড়ি তোর হাত কাটবে বলে ভয় পাচ্ছিলি।
পলা এখন জটাকে ধমকায়!
ওরা বেশ জোরেই কথা বলছে। এখন আর কীসের ভয়। শুধু একটাই ব্যাপার পাড়ার লোক জানতে পারার আগে ট্রাঙ্কটা সাফ করতে হবে।
– নে নে , অনেক দেরি হয়ে গেছে কাজটা শেষ কর।
এসব কাজে জতার হাত খুব ভালো। ওর হাতে জাদু আছে। তালার গায়ে হাত বোলালেই যেন খুলে যায় সব তালা।
বুড়ির ট্রাঙ্ক খুলতে দু সেকেন্ড ও লাগল না।
কিন্তু একি! ট্রাঙ্কে শুধু একটা ছেঁড়া-খোড়া বেনারসি শাড়ি! আর একটা হলুদ হয়ে যাওয়া কাগজ। একটা চিঠি।

৩ 
সালটা তখন বোধহয় ১৯৪৬। বোধহয় বৈশাখ মাস। চন্দ্রতপা রাজদুলালীর মত সেজেছে। আলো আর ফুলে যেন গোটা বাড়িটা ঢেকে গেছে। আরে সাজবেই তো আজ যে এ বাড়ির একমাত্র মেয়ের বিয়ে। নহবত বসেছে। বেনারস থেকে ওস্তাদ জী এসেছেন। সকাল থেকে বাজছে সানাই। গায়ে হলুদ মিটে যাওয়ার পরই পাড়ার মেয়েরা সাজাতে বসেছে কনেকে! আহ! সাজানোর কী আছে, এমনিতেই সে যে অপরূপ সুন্দরি! এক ঢাল কালো চুল। কালো দুটো চোখ যেন সবসময় জ্বলজ্বল করছে। পাত্রটিও শুনেছি এক্কেবারে রাজপুত্তুর।
সাঁঝ পড়তেই হৈ হৈ শোনা গেল! বর এসেছে।
কনের মা বরকে বরণ করলেন । আহ! কী সুন্দর দেখতে বরকে। এমন মেয়ের তো এমনি পাত্রই হওয়ার কথা।
বিয়ে শুরু হবে, কনেকে পিঁড়িতে তোলাও হয়ে গেছে। ঠিক এই সময় বাড়িতে পুলিস এল।
পাত্র নাকি স্বদেশি করে। হায়, হায় সে কী কাণ্ড! পাত্রকে তো আর খুঁজেই পাওয়া গেল না। কে জানে কোথা থেকে খবর পেয়ে পাত্র হাওয়া!
সারা বাড়িতে কান্নার রোল পড়ে গেল। পাত্রর বাবা তো হতবাক। এত কাণ্ড কবে হল, তিনি তো কিছুই জানেন না। এমন সাদা সিধে ছেলে নাকি স্বদেশি করে , এমন আজব কথা কে কবে শুনেছে।
কনের মুখে কোন কথা নেই। এইসময় ঠিক কী করতে হয়, সেটাই তো সে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। সকলকে কাঁদতে দেখে সেও খানিক কেঁদে ফেলল। তারপর গিয়ে নিজের ঘরে গিয়ে বসল। সারাদিন খাওয়া হয়নি, এখন যা কাণ্ড হল এরপর আর খাওয়া জুটবে কিনা তাও জানা নেই। শুনছে সে নাকি লগ্নভ্রুষ্টা হয়েছে। ঠিক কী করা উচিত এখন তার।
হঠাৎ ই একটা কাগজ কে যেন ছুঁড়ে দিল জানলা দিয়ে।
দু লাইনের একটা চিঠি !
বোধহয় , কনের জীবনের প্রথম প্রেমপত্র
“ প্রিয়ে,
অপেক্ষা কোরো, আমি আবার ফিরে আসবো। আজকের মত আবার এমন একটা দিনে আমি ঠিক ফিরে আসব।

ইতি,
তোমার শুভ”

তার জীবনের প্রথম ও শেষ প্রেমপত্র। বুড়ির জীবনের একমাত্র গুপ্তধন।

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত