গুপ্তহত্যা..অতঃপর (পর্ব-৪)

গত পর্বের পরে… 

সারাদিন অস্থি’র সবাই। রহিম রাশেদ বিনু আপা গিনি আপা রুনি আপা কচি আপা। ছোট ভাইয়া। খালা । কাজের মেয়েরা। মুন্সীভাই। সব। ভীষণ এক গুমোট পরিবেশ বাড়িটাতে। এমন কখনো দেখেনি রাশেদ। বেলা গড়ায়। সকালের নাস্তা কোনোমতে খাওয়া হয়। খালাকে খুব বিস্ত্রস্ত লাগে। খালু মারা গেছেন কয়েক বছর। সেই থেকে এই বিশাল বাড়ির ভার পুরোটাই খালার মাথার উপর। দুপরের খাওয়া দাওয়াও কোনোমতে চলেছে আজ। পুরো বাড়িটাতে এক অদ্ভূত নিস্তব্ধতা। কি এক বিষণ্নতা নাকি আশঙ্কা ভর করেছে সবার উপর। অবসন্ন দুপুর যেন। বাইরে ঝাঁঝালো রোদ। সেদিনের পর থেকে পায়রাগুলো ভয় পেয়েছে কি না কে জানে। পায়রাদেরও আনাগোনা হঠাৎ কমে গেছে। কী আছে ওই পায়রাগুলোর মাঝে । বিছানাটায় শুয়ে শুয়ে ভাবছিল রাশেদ। হঠাৎ চোখ যায় রাশেদের আলমারিটার ওই কোণে .. কেন যে ঝট করে উঠে পড়ে সে বিছানা থেকে

-আরে রহিম? কোরআন শরীফ দু’টা গেল কোথায়? হ্যা ওখানেই তো ছিল দুটো। এখন নেই তো? এই রহিম রহিম?

রাশেদের গলার স্বরে কেমন একটা ভীতির স্বর এই প্রথম শুনতে পায় রহিম। অমনি ছুটতে ছুটতে আসে

-কিতা অইছে ভাইজান। ভাইজান। কিতা কইবাইন। কিতা অইছে?

রহিম ঘরটার ভেতর ঢুকতে না ঢুকতেই দরজাগুলো বন্ধ হয়ে যায় বিকট শব্দে। পুরানো আমলের বিছানায় মশারী টাঙাবার যে স্ট্যান্ডগুলো ছিল। ওগুলো সব খুলে কী করে যেন শূন্যে উঠে যায়। আর এক একটা করে এসে ভয়ঙ্করভাবে আঘাত করতে থাকে রাশেদ আর রহিমের গায়ের উপর। প্রথম বাড়িটা খায় রাশেদ।

-ওমা গো ও ও ও

কোনোমতে সামলে উঠে রাশেদ রহিমকে ধরতে যায়। অমনি আরও একটা স্ট্যান্ডের বাড়ি এসে পড়ে রহিমের পিঠের উপর

-আম্মা । ও আম্মা মরলাম গো। আম্মা.. আফা.. ওই রাবেয়া আফা

-মুন্সীভাই। বিনু আপা।

রাশেদ আর রহিমের চিৎকারে চারপাশ প্রকম্পিত। কিন্তু কারো কোনো সাড়াশব্দ নেই পুরো বাড়িটাতে।

-আশ্চর্য!! কেউ কী শুনতে পারছেনা কেউ। এত চিৎকার

-বিনু আপা। কোথায় তোমরা? মুন্সীভাই। কে কোথায় আছ? কেউ কী শুনতে পাচ্ছনা??????????

বলতে বলতে রাশেদ এগিয়ে যায় দরজাটা খুলতে । আর অমনি আর একটা কাঠের স্ট্যান্ডের বারি এসে পড়ে ঠিক রাশেদের হাতে উপর

-উহহহহহ…হাতটা কি ভেঙেই গেল । রহিম..

বলে রহিমের নাম ধরে ডাকতেই রহিম পেছন থেকে এসে কাঠের স্ট্যান্ডটাকে ধরতে যায়

-ভাইজান আমি ধরছি। আপনে দরজা খুলেন। খুইল্যা ফালান একটানে সিটকিনিটা। খুলেন ভাইজান

ততক্ষণে রহিমের গলার দুপাশে চেপে বসেছে দুটো স্ট্যান্ড। আর কিছুই দেখা যাচ্ছেনা। চারপাশ ধোঁয়া ওঠা অন্ধকার। কিছুই বুঝতে পারেনা রাশেদ।

-খক্ খক্ খক

রহিম কাশতে থাকে। দু’হাত দিয়ে দুটো স্ট্যান্ড ঠেলতে থাকে। আর চেচাতে চেষ্টা করে। গলা দিয়ে ফ্যাসফ্যাশে একটা শব্দ বের হয়

-ভাইজান। ভাইজান। আমি মইরা যাইতাছি। বাঁচানগো । আমারে বাঁচান। আমার মা কই? ও মা? আম্মা কই? আমার আম্মা। ও আম্মা

এইসব একটানাই বলবার চেষ্টা করে যাচ্ছে রহিম। কিন্তু শরীরের সব শক্তি যেন আজ কোথায় হারিয়ে গেল। কাঠের শক্ত আর ভারি স্ট্যান্ডদু’টো রহিমের গলার দু’পাশে অনড় হয়ে গেঁথে থাকলো। রাশেদের হাতের কব্জির পাশে কেটে গিয়ে দরদর করে রক্ত বের হয়ে গড়িয়ে পড়ছে। রহিমের গায়ে জামা ছিলনা। খালি পিঠের উপর কাঠের ভারি স্ট্যান্ডের আঘাতে কেটে গিয়ে রক্ত ঝরছে। প্রায় আধমরা দু’জনই। কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে রহিমের গলার উপর থেকে কাঠটা সরাতে যায়। রাশেদ। আর অমনি বাড়ি খায় দরজার উপর। হঠাৎ খুলে যায় দরজাটা

-অ্যা

চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকে রাশেদ । সামনে দাঁড়ানো সেই সৌম্যকান্তি। তেমনি আলখাল্লা গায়ে। তার হাতে ধরা কোরআন শরীফ দুটো

রাশেদ ভয়ে চিৎকার করে ওঠে

-আ আ আ । কে? আপনি কে? দরজা খুললেন কী করে?

রাশেদের ঘোর কাটেনি তখনও। এই বুঝি ওই সৌম্যকান্তি লোকটি আরও কোনো আঘাত করতে আসবেন রাশেদকে তেমনি করে নিজেকে সামলাতে নেয় রাশেদ। দু’হাতে নিজেকে যেন আরও একটি আঘাতের হাত থেকে রক্ষা করছে এমন করে মুখ ঢাকে। পেছন থেকে ছোট খালা বিষ্ময়ে অবাক হয়ে চিৎকার করতে করতে ঢুকেন

-কীক্‌ কীক্‌ কী হয়েছে তোদের?

-কে মারলো তোদের এমন করে?

ততক্ষণে রহিম মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। খালা চিৎকার করে ওঠেন।

-এই রহিম।

রহিম কোনোমতে চোখ খুলে তাকায়

-আম্মা। আমারে উডাইন। ওরা আমারে মাইরালাইছে আম্মা..আমি শ্যাষ। আমার মায়েরে খবর দেন। আমি মইরা গেলে আমার মায়ের আর কেউ নাই। আমি মায়ের পরাণ পাখি

সবাই নিশ্চুপ। রাশেদ অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখে হঠাৎ চিৎকার করে ওঠে

-আরে ওইতো। ওইতো কাঠের স্ট্যান্ডগুলো ঠিক জায়গায় লাগানো রয়েছে। ওই তো। কিন্তু খালা ..কী অদ্ভূত জানো তুমি? বল তুমি?

-হ্যা বল? কী। কী অদ্ভূত? কি ঘটেছে এখানে এতক্ষণ

উত্তেজনা আর কিছুক্ষণ আগের মার খাওয়া দুটো মিলে অসম্ভব জোরে কাঁপছে রাশেদ

-হ্যা খালা। আমি স্পষ্ট দেখেছি ওই স্ট্যান্ড।

-হ্যা কী হয়েছে?

ছোট খালার চোখে মুখে প্রশ্ন আর বিষ্ময়।  

-ওই স্ট্যান্ডগুলো দিয়ে আমাদের কারা মেরেছে। হ্যা। ওগুলোই। কিছুক্ষণ আগেও রহিমের গলায় দুদিক থেকে দুটো চেপে ধরেছিল

-এ্যা! বলিস কী?

-হ্যা খালা। এখন দেখ  

রাশেদ খাটের চারকোণায় লাগানো স্ট্যান্ড দুটো ধরে খুব জোরে জোরে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলতে থাকে

-অদ্ভূতভাবে ঠিক জায়গায় লেগে আছে এখন আবার। দেখো খালা। দেখো তুমি নিজেই এসে দেখ?  অথচ একটু আগেই এগুলো শুন্যে উঠে যাচ্ছিল…

সৌম্যকান্তি লোকটি অবশেষে মুখ খোলেন

-আম্মা। আমি বেশ বুঝতে পারছি বিষয়টি।

– কী ? কী হয়েছে বলুন না? বুঝিয়ে বলুন আমাদের।

-এখন সময় নয় আম্মা। তবে হ্যা একটু বুঝতে পারছি আমি এখন। এসব করবার জন্যই ওরা পায়রাগুলোকে বাড়ি ছাড়া করবার চেষ্টা করে চলছিল অনেক দিন। আর এই ঘরে কোরআন শরীফের জন্যই ওরা আসতে পারছিলনা। আজ কোরআন শরীফ আপনার ঘরে নিয়ে গেছি যখন পড়বার জন্য। তখনই ওরা এখানে ঢুকেছে।

-আচ্ছা

রাশেদ চিৎকার করে ওঠে

-ওরা? ওরা কারা?

-ধৈর্য ধরুন বাবা রাশেদ।

রহিম ব্যাথায় ককিয়ে ওঠে

-আহ। আহ। মরে গেলামগো আম্মা। আম্মা। ও আম্মা আমারে উডান আম্মা

তাড়াতাড়ি রহিমকে ধরে বিছানার উপর শুইয়ে দেন তিনজনে। ততক্ষণে মুন্সী এসে দাঁড়িয়েছে। ওর চোখ তো চড়ক গাছ। সৌম্যকান্তি ভদ্রলোকটি মাথা নিচু করে হেঁটে আলমারিটার দিকে যান। আর কোরআন শরীফ দুটো আলমারির উপরে রাখতে রাখতে বলতে থাকেন

-গত শেষ রাতে বিনু মাটিতে পড়ে জ্ঞান হারাতেই আমরা ছুটে এসেছিলাম

-হুম

ছোট খালা মাথা নাড়েন।

-এই ঘর থেকে নিয়ে যাওয়া কোরআন শরীফ দুটো এ ঘরে আর আনা হয়নি। আর এই সুযোগটাই ওরা নিয়েছে

-ছোটখালা এবার বুঝতে পারেন সব।

রহিম রাশেদ ছোটখালা কিছু একটা সমাধানের উপায় বাতলে দেবেন এই বিশ্বাসে তাকিয়ে থাকেন সৌম্যকান্তি সেই ভদ্রলোকের দিকে।

তিনি মাথা নিচু করে পায়চারী করতে থাকেন মেঝেতে। খুবই চিন্তিত তার চোখ। কপালের মাঝখানে চিকন চিন্তার রেখা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তার চলার পথের দিকে তাকিয়ে বিষ্ময়ে অবাক রাশেদ

-আরে। এর তো পায়ের পাতা উল্টো !

আৎকে ওঠে।  নিজের মনেই বলে ওঠে

-মানে কী! মানে কী! এই ভদ্রলোক জ্বিন? ওর পায়ের পাতা উল্টো? হ্যা ওইতো। ওইতো দেখতে পাচ্ছে। আমাদের যেদিকে গোড়ালি থাকে ওদিকে ওর আঙুল। আর আমাদের আঙুলের দিকে ওর গোড়ালি।

ততক্ষণে পর্দার আড়াল থেকে বিনু আপা এসে দাঁড়িয়েছে। রাশেদ বিনু আপার দিকে এগিয়ে গিয়ে ওদিকে নির্দেশ করে কিছু একটা বলতে যেতেই বিনু আপা ধমক লাগান

-চুপ কর রাশেদ।

ভদ্রলোক ছোট খালার দিকে তাকিয়ে

-আম্মা। আমি মাগরেবের নামায শেষ করে আসছি। আপনারাও সবে নামায পড়ে নিন। আজই বিহিত না করলে আরও ভয়ানক ঘটনা ঘটে যেতে পারে। ওদের সাথে আলোচনায় বসতে হবে।

-কাদের সাথে আলোচনা? বিনু আপা? ছোট খালা কাদের সাথে? কী আলোচনা?

ভদ্রলোক একবার রাশেদের দিকে তাকান। তারপর তার কথার কোনো উত্তর না দিয়ে হন্ হন্ করে ভীষণ চিন্তিত মুখে বের হয়ে যান। ঘরে ঢুকছিল ফাইয়াদ তখন । ধাক্কা লাগে তার সাথে ফাইয়াদের

-আসসালামু আলাইকুম

বলে ভদ্রলোক এগিয়ে চলে যান আর কোনোদিকে না তাকিয়ে। ফাইয়াদ ঘরে ঢুকতে ঢুকতে পেছনে তাকিয়ে ভাবতে থাকে

-কী অদ্ভূত? এ কে মুন্সী?

মুন্সী কোনো উত্তর না দিয়ে মাথা নিচু করে থাকে। ফাইয়াদও তেমন কিছু না বলে ভাবতে ভাবতে ঘরে ঢুকতে থাকে ..

আগামী পর্বে… 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত