গুপ্তহত্যা…অতঃপর (পর্ব-৫)

 

গত পর্বের পরে…

পরদিন সারাটা দুপুর কোনোমতে কেটে যায় সবার। দুপুরে রাশেদ কিংবা রহিম কাউকেই আর ওই ঘরটাতে শুতে বা যেতে দেননা খালা। রাবেয়ার ঘরে রাশেদ খুব নীচু স্বরে গল্প করে। বিকেলে আলোটাও ক্ষীণ হয়ে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। হালকা কুয়াশার চাদর পড়েছে চারপাশে। শীত আসতে বেশি দেরী নেই বোধ করি। বাড়িটা ক’দিন ধরে খুব শান্ত চুপচাপ।রাশেদের কেমন কেমন লাগে। ঠিক মেনে নিতে পারেনা। এত ছোটবেলা থেকে এ বাড়িতে আসা যাওয়া তার। এত লোকের কথা হৈ চৈ এসব দেখে দেখেই অভ্যস্ত। এত শান্ত চুপচাপ এ বাড়িটাতে যেন মানায়না। একটা গল্পের বই এ মন দেবার চেষ্টা করে রাশেদ। রাবেয়া রহিমের গায়ের ক্ষতগুলোতে আবারও অয়েন্টমেন্ট লাগিয়ে দিচ্ছে। আর বিছানার উপর পা তুলে শূন্য দৃষ্টি মেলে কী যেন ভাবছে বিনু। বাইরে রাতের অন্ধকার পুরোপুরি নেমেছে ততক্ষণে। রহিম বিছানা ছাড়ে

-রাবেয়া আফা। আমি বাইরে যামু

রাবেয়া বুঝতে পারে রহিম টয়লেটে যাবে

-যা। আমি আছি। হাঁটতে কষ্ট হইলে আমারে ডাকিছ।

রহিম আচ্ছা বোধক মাথা নাড়িয়ে বের হয়ে যায় ঘর থেকে। রাবেয়া বিনুর ‍দিকে তাকায়। উদাস চোখে বাইরে তাকিয়ে আছে। রাশেদ বই পড়ছে। কথা বলবার মতো পরিবেশ নেই এখানে এখন। অন্য সময় কাজ না থাকলে রাবেয়া বিনুর কাছে এসে বসে।

-আফা মাথায় তেল দিয়া দেই? আফা আফনের বিয়ার সুময় আমারেও একটা লাল শাড়ি কিন্না দিবাইন? কন? দিবাইনতো?

-হ্যা দেবতো।

-আফা আফনেরে বউ সাজলে কী যে সোন্দর দেহাইবো..

-আচ্ছা ।

-তা তোর মনের কথাটা বল এবার?

তখন রাবেয়া মুখ নীচু করে লজ্জায় লাল হয়ে বলতো

-আফনের বিয়া হইলেই আমারও বিয়া হইবো।

রাবেয়া হেসে উঠে বলতো

-হা হা হা। আচ্ছা । এই তাহলে তোর মনের কথা!

এসব গল্প করতে করতে দুজনে খুব হাসাহাসি করতো। আজ বিনুর মুখ থমথমে।

 

সারাদিন প্রায় বাইরে কাটিয়ে সন্ধ্যের কিছু পর বাড়িতে ঢোকে ফাইয়াদ। মুন্সী সদর দরজাটা লাগিয়েই তার ঘরে গেছে। ফাইয়াদ পুকুর পাড়ে চলে যায় সোজাসুজি। প্রায়ই সে বাড়ি ফিরে পুকুরের স্বচ্ছ্ব জলে হাত মুখ ধোয়। কিছুক্ষণ পুকুর পাড়ে বসে বসে পুকুরের জলে চাঁদের ছায়া দেখে। ফুলের ঘ্রাণ উপভোগ করে। পুকুর পাড়ের গাছ। সেখানে একটা আলো লাগানো থাকে সব সময়।

-আলোটা আজ নেই কেন?

ফাইয়াদ নিজের মনেই ভাবে। আর চিৎকার করে ডাকতে থাকে।

-রাবেয়া? রহিম ? তোরা সব কোথায় রে?

কারো কোনো সাড়া শব্দ নেই।

-এমন চুপচাপ কেন আজ বাড়িটা?

-বিনু? এ.. ই বিনু। আমার খিদে লেগেছে। খাবার দিতে বলতো রাবেয়াকে। আমি পুকুর পাড়ে হাত মুখ ধুয়ে আসছি। আর রহিমকে তোয়ালেটা দিতে বল। সব গেল কই? আলোটা বন্ধ কেন রেররররররররররররররররররর

আনমনে  হাত মুখ ধোয়।আকাশে চাঁদের আলোর সামান্যই আজ পড়েছে। পুকুরের জলে।সেখানে পুকুরের জলে রহিমের ছায়া পড়ে। পেছনে দাঁড়িয়ে আছে রহিম। সন্ধ্যার আলো শেষ হয়ে অন্ধকার বেশ প্রগাঢ় তখন। তবু মহাজাগতিক আলোয় বেশ দেখা যাচ্ছে। পুকুরের জলে ফাইয়াদের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা রহিমের ছায়া। তোয়ালে হাতে। হালকা পার্থিব আলোয়। কী অস্বাভাবিক লম্বা লাগছে রহিমকে। পুকুরের সিঁড়িটা বেয়ে উপরে উঠতে উঠতে রহিমের দিকে তোয়ালের জন্য হাত বাড়ায় রাশেদ

-এই রহিম..তুই এত লম্বা হলি কবে রে?

একেবারে মুখোমুখি দাঁড়াতেই দেখতে পায় চোখদুটো জ্বলছে রহিমের।

-আরে এ কে? এত রহিম নয়!

ফাইয়াদের বুকের উপর সজোরে এক লাথি মারে রহিম। কিছু বুঝে উঠবার আগেই লাথি খেয়ে ছিটকে পড়ে যায় পুকুরের জলে। উপুর হয়ে কয়েক ঢোক্ পানি গেলে। কোনোমতে একটা লম্বা শ্বাস নেবার জন্য মুখটা উপরে তুলতেই ফাইয়াদের ঘাড়টা ঠেসে ধরে রহিম আবার জলের ভেতর। এত ভালো সাঁতার জানে ফাইয়াদ। তবু মাথাটা তুলতে পারেনা জলের উপর। রহিম ফাইয়াদের মাথাটা আরও জোরে ঠেসে ধরে। জলের ভেতর দম আটকে আসতে থাকে। হাতটা তুলে কোনোমতে একটা ধাক্কা দেবার চেষ্টা করে। নাহ্ …পারেনা। মৃত্যুর সাথে যুদ্ধ করতে করতে ফাইয়াদ যেন পরাজিত হতে লাগে। শেষ হয়ে আসছে সব আলো। চারপাশ অন্ধকার হয়ে আসছে। শেষ বার চেষ্টা করে। পেছনে কিছু না বুঝেই সজোরে একটা লাথি লাগায় শূন্যে।সত্যি সত্যি লাথিটা গিয়ে লাগে একবারে রহিমের বুকে।

-আহ্ হহহহহহহহহহহহহহহহহহহহহহহ

একটা আর্ত চিৎকার জলের তলেই শুনতে পায় ফাইয়াদ। ঠিক তখনই রহিমের হাত আলগা হয়ে পড়ে তার ঘাড়ের উপর থেকে। সেই সুযোগে সে মাথা উঠিয়ে জোড়ে এক নিঃশ্বাস টানে। ঘুরে জোর সাঁতার লাগায়। প্রায় ঘাটের কাছাকাছি উঠে আসে।মুহূর্তেই নিজেকে সামলে নেয রহিম। পেছনে আবার জ্বলে ওঠে তার চোখ।নিজেকে কয়েক সেকেন্ডেই সামলে নেয় রহিম। মাঝ পুকুর থেকে ছুটে যেতে বড়জোর তিন সেকেন্ড সময় লাগে রহিমের।যেন আলোর গতিতে ছুটছে।পুকুরের ঘাট বেয়ে প্রাণপণে উপরে উঠতে চেষ্টা করে ফাইয়াদ। অনেক্ষণ পানিতে চুবানি খাওয়া আর আলোর অভাবে ঠিক ঠাহর করতে পারেনা। পুকুরের সিঁড়িটার দিকে না গিয়ে উল্টো দিকের ঘাটে পৌঁছুতে পারে কোনোমতে। মাটি কাদা বেয়ে উঠতে যেতেই পেছন থেকে ফাইয়াদের পাটা টেনে ধরে রহিম। কোনোমতে একটা ছোট বরই গাছের ডাল ধরে প্রাণপণে নিজেকে বাঁচাতে। ততক্ষণে রহিম এক কামড়ে ছিঁড়ে ফেলে ফাইয়াদের পায়ের বড় রগটা। গলগল করে রক্ত বের হতে থাকে। চুক্ চুক্ করে কিছু রক্ত চুষে নেয় রহিম। তারপর এই অন্ধকার রাতে আকাশের দিকে পিশাচের মত তাকায়। জোড়ে একটা নিঃশ্বাস নেয়। পা ধরে ফাইয়াদকে এক হাতের হ্যাঁচকা টানে আবার নামিয়ে আনে পুকুরের জলে। ছ্যাচড়া খেয়ে টাল সামলাতে গিয়ে বরই গাছের ডালটা ভেঙে ফাইয়াদের হাতেই রয়ে যায়। রহিমের টানে চিৎ হয়ে এসে পড়ে যায় ফাইয়াদ আবার জলে। আর সেই সুযোগে ফাইয়াদের বুকের উপর চড়ে বসে রহিম। পুরো শরীরটা দিয়ে উঠে বসে ফাইয়াদের বুকের উপর। এই প্রথম ফাইয়াদ রহিমকে ঠিকমতো দেখতে পায়। চোখ দু’টো যেন ঠিকরে বের হয়ে আসছে রহিমের। ঠোঁটৈর কোণায় কোণায় লেগে আছে তারই পায়ের শুষে খাওয়া রক্ত। তখনও বেয়ে পড়ছে কিছু রক্ত রহিমের ঠোঁট দিয়ে । রহিম ফাইয়াদের চুলের মুঠি ধরে মাথাটা খানিক ওঠায়। গলায় কামড় বসাতে যায়। উল্টো হয়ে ভেসে থাকা ফাইয়াদের বুকের উপর তখন একটা আস্ত মানুষের ভার। তলিয়ে যেতে থাকে সে। তবু শেষ শক্তি দিয়ে বলে ওঠে

-রহিম। কীরে তুই? তুই আমাকে মারতে চাইছিস?কী অপরাধ আমার? একবার শুধু বল আমাকে। তারপর তোর যা খুশি—খক খক খক

গলার ভেতর জল ঢুকে দম আটকে আসতে থাকে। কাশতে কাশতে আরও তলিয়ে যেতে থাকে ফাইয়াদ। ঠিক তখনই বুকের উপর থেকে টেনে চুলের মুঠি ধরে যেন শুন্যে তুলে ধরে রহিম ফাইয়াদকে। এই প্রথম কথা বলে

-কী অপরাধ এখনও জানিস না?

কী অস্বাভাবিক রহিমের গলা। ফ্যাসফ্যাসে। বিচ্ছিরি। আর এই প্রথম ফাইয়াদ লক্ষ্য করে রহিমের গা থেকে উৎকট একটা গন্ধ আসছে। মাঝে মধ্যেই এই ঘ্রাণ সে পেত সেই ঘরটায়। যখন হুজুর সাহেব মার ঘরে কোরআন শরীফ দু’টো নিয়ে যেতেন তখন। ওই ঘরটায়। হ্যা। ঠিক মনে পড়ছে ফাইয়াদের। প্রায়ই.. । তাহলে কী কোরআন শরীফ দু’টোর কারণেই ওরা ওঘরে আসতে পারতো না? আর যখনই কোরআন শরীফ দুটো থাকতো না তখনই ওঘরে ওরা চলাফেরা করতো! অশরীরী!!!!রহিমের ফ্যাসফ্যাসে গলার শব্দে আবার ফিরে  আসে বর্তমানে।

-আমরা বহুদিন তোদের ওই ঘরের মাটির তলায় চাপা পড়ে আছি।

-কী বলছিস তুই। তোরা মানে কী?

-হ্যা। আমি। আমরা। যাদেরকে বিনা অপরাধে একদিন খুন করা হয়েছে

-খুন করা হয়েছে মানে?

-হ্যা। তোর বাবা যখন এই বাড়িটা কিনেছিল। তারও আগে আমাদের খুন করে ওই যে …ওই ঘরটা

বলে রহিম সেই ঘরটাই দেখায়

-ওখানে কত কত জনকে চাপা দিয়ে রেখেছে তুই জানিস?

-কী বলছিস কী তুই রহিম!!!!!!!

-হ্যা। অথচ আমাদের কোনো অপরাধ নেই। আমার বাবা খাজনার টাকা দিতে পারেনি। তাই আমার বাবা আর আমাকে খুন করে ফেলে রাখলো। ওই যে খলিল চাচা। আজমল ভাই। সাবিত্রী। আহারে সাবিত্রী

বলে কেমন একটা বুকফাঁটা আর্তনাদ করে ওঠে রহিম। কিছুক্ষণ কি ভাবতে থাকে।

-বল রহিম আমাকে সব খুলে বল। কী হয়েছিল তারপর?

বদলে যায় রহিমের ভাষা। যেন কবেকার সত্যিকার কোনো কেউ বলে চলেছে তার আর বহুজনের মৃত্যুর কিংবা খুনের ইতিহাস

-খলিল চাচার তিন কিয়ার জমি আছিল। সেটা নিবার জন্যে কী যে অত্যাচার করলো চাচারে। শেষে মাইরা ফালাইয়া রাখলো ওইখানে। তারপর আমারে বাবারে। সাবিত্রীরে তার মা বাপের লগে পুড়াইয়া মারলো। তারপর ওগো হাড়গোড় ফেলল ওইখানে। হিন্দু মুসলমান কিছু ভেদ নাই। সব এক মানুষ। সব মরা লাশ। মাটি চাপা। -আহ্ আহ আহ্

করে রহিম এমনভাবে কাঁদতে থাকে। এই প্রথম তাকে সত্যিকারের মানুষের মতো লাগে ফাইয়াদের কাছে। অথচ এতো রহিম নয়। এ তো রহিমের আকার চেহারা।কথায় মনে হয় রহিমের চেয়েও অনেক বড়। প্রায় তার নিজের সমান বয়সী।

-আহা হা হা হা।

ভয়ঙ্কর এক আর্তনাদ বের হয়ে আসে রহিমের গলা দিয়ে

-তোর মা সব জানে। কেন? তুই জানিস না? আর তাইতো জ্বিনের বাদশাকে এনে রেখেছে ওই তালগাছের উপর তোর মা। জ্বিনের দুই চেলাকে কবুতর বানিয়ে রেখে দিয়েছে পাহারায়। ওদের গুলি করে মেরে ফেলেছি আমরা। এবার তোদের রক্ষা নাই।

-এ্যা??? কী বলছিস রহিম। তুই তবে এতদিন আমাদের বাড়িতে মানুষ সেজে ছিলি?

ফ্ইায়াদের বোকা বোকা প্রশ্ন শুনে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে রহিম। অন্ধকারে। এই মৃত্যুর আগ মুহূর্তের এমন বীভৎস লাগে রহিমের হাসি আর মুখ ফাইয়াদের কাছে। ফাইয়াদের বুজে আসতে থাকা চোখেও জঘন্য লাগে। রহিমের এই যন্ত্রণাকাতর সময়টাকেই বেছে নেয় ফাইয়াদ। আর শেষ মুহূর্তের চেষ্টা হিসেবে হাতেই বরই গাছের ডালটা শরীরের যত শক্তি আছে তাই দিয়ে মারে রহিমের মাথায়। অদ্ভূত আলোর একটা ঝটকা যেন উল্কার গতিতে রহিমের শরীর থেকে বের হতে দেখলো ফাইয়াদ। আর রহিমের শরীরটা পুরো ভার নিয়ে আছড়ে পড়লো জলে ফাইয়াদের চিৎ হয়ে থাকা শরীরটার উপর। ততক্ষণে ফাইয়াদের সব শক্তি শেষ। রহিমের পুরো শরীরটা ওর উপর ঝুকে পড়েছে। চিৎ হয়ে থাকা ফাইয়াদের শক্তি নেই ওই অবশ দেহ নিজের বুকের উপর থেকে সরাবে। পায়ের রক্ত সব যেন বের হয়ে গেছে এতক্ষণে। সব আলো নিভে আসছে। তলিয়ে যাচ্ছে সে গভীর জলের নিচে। পায়ের  রগ বেয়ে সব রক্ত বের হয়ে পুকুরের জল লালে লাল…। দূরে অনে…ক দূরে যেন কত যুগের ওপার থেকে মায়ের মতো কেউ আসছে মনে হল ফাইয়াদের। ওইতো আলো আসছে। মনে হয় কত কত লোক আসছে ওকে বাঁচাতে। কী জানি। মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে ফাইয়াদ আধো আলো আধো অন্ধকারে মাকে ডাকে

-মা। মা। ওমা ? মা।

– আরে ওটাতো বিনু। বিনু না?

ওই তো বিনুই আসছে তাকে কোলে তুলে নিতে ছোট বেলার মতো। দেখা যাচ্ছে রাবেয়াকেও। আর সেই হুজুর.. -আহ্ । এত ঘুম..।  

এত ঘুম কোথা থেকে আসছে যে আজ ফাইয়াদের। চোখটা বড় করে তাকানোর চেষ্টা করে শেষবারের মতো ফাইয়াদ

-হ্যা আসছে ওরা। আসছে। আর … আর একটু হলেই ছুঁতে পারবে ফাইয়াদকে ওরা। ফাইয়াদ হাতটা বাড়ায়।নাগাল পায়না কিছুই। বিনুর হাতও নয়..। গভীর ঘুমে ঢলে পড়ে ফাইয়াদ পুকুরের লাল লাল জলের গভীরে।

 

আগামী পর্বে…

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত