গুপ্তহত্যা…অতঃপর (পর্ব-৭)

আলো ফুটতে শুরু করেছে মোটে। ছোট খালা রহিমের মৃত দেহের পাশে নির্বাক বসে আছেন। পাশে রাশেদ রাবেয়া মুন্সীভাই । বিনু আর রূমী গেছে হাসপাতালে। হালকা আলো ফুটতে থাকা সুবেহসাদিকের সময়টাতে এসে দাঁড়ায় জ্বিন। ছোট খালার কাছে

-আম্মা। নামাজের সময় হলো। লাশ ধুয়াতে নিতে লোক এসেছে। ফজরের পরই জানাজা হবে। আপনি ভেতরে যান

-কি হলো নওজির.. কি লাভ হলো? এক চেষ্টা করেও শেষ রক্ষা হলোনা?

এই প্রথম কেউ ছোটখালার মুখে জ্বিনের নাম শুনলো। রাশেদের তবু কেমন বুক ছম্‌ ছম্‌ করে। ওর উল্টো পায়ের দিকে একবার তাকিয়েই রাশেদ চোখ ঘুরিয়ে নেয়। ছোট বেলায় গল্পে পড়া জ্বিনের উল্টো পা কিংবা জ্বিন এই প্রথম সে নিজের চোখে দেখতে পেল। এই বাড়িতে এসে।

-চিন্তা করবেননা আম্মা। এখন খুব তাড়াতাড়ি করতে হবে আমাদের।

চিন্তিত হয়ে ওঠেন ছোটখালা । সাথে রাশেদ রাবেয়া মুন্সী ভাইও

-কি ? কি করতে হবে আর? ওদের তুমি দেখতে পেলে?

-জ্বি আম্মা। অবশেষে দেখা হলো।

-অত বছর পর? হ্যা ??????সত্যিই

-জ্বি আম্মা । আমার সাথে কথা হয়েছে?

-বলেছে? বলেছে ওরা কী চায়? আর কী চায় ওরা? এটাই কি ওদের চাওয়া ছিল? রহিমের প্রাণ? আমার ফাইয়াদের প্রাণ?

বুক ফেটে এতক্ষণে খালা রহিমের মুখটা ধরে চিৎকার করে কেঁদে ওঠেন। রাবেয়া মুন্সী রাশেদের চোখও জলে ভরে ওঠে।

-না আম্মা। শুধু এই নয়। ওরা একে একে সবাইকে.. এ বাড়ির সবাইকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চায়।  

– অ্যা কি বললে?

আঁতকে ওঠেন ছোটখালা।

-সবার? আমাদের সবাইকে মেরে ফেলবার জন্য এতকাল এই পঞ্চাশ বছর ধরে ওরা এখানে? এভাবে? কি ক্ষতি করেছি ওদের। বলতো ঠিক করে। বলেছে তোমাকে?

-জি আম্মা। বলেছে।

-কি বলেছে? কি বলেছে? ঠিক করে বল আমায়।

ছোট খালাকে এমন বিমর্ষ এতটা উদভ্রান্ত এতটা নিয়ন্ত্রণহীন এই প্রথম দেখছে রাশেদ। জ্বিন ইতস্তত করে। হয়তো সবার সামনে বলতে চায়না সব খুলে।

-আম্মা। সে ব্যবস্থা করতে হবে। খুব তাড়াতাড়ি করুন আম্মা। আজ দিনটাই সময়। দিনের আলো নিভে যাবার সাথে সাথে ওরা আবারও চড়াও হবে। আমি নিশ্চিত আজ রাতে আবার ওরা হানা দেবে।

রাশেদ আর্তচিৎকার করে ওঠে

-আজই!আবার!

-হ্যা। হাতে সময় নেই বেশি। যা করার আজই করতে হবে।

-এখন কান্না কাটির সময় নয়। জামাতের সময় হলো। মুন্সী লাশ নিতে লোক এসেছে। জায়গা করে দাও। আর তুমি নামাজে আসো।

বলে জ্বিন চলে যায়। কিছু লোক ধরে রহিমের মৃতদেহটা খাটিয়ায় তুলে নেয়। রাবেয়া আর রাশেদ খালাম্মাকে নিয়ে চলে ভেতরে ।

সেই বড় ঘরটার সব মালপত্রগুলো বের করা হচ্ছে। ফজরের নামাজের পর থেকেই শুরু হয়েছে এই কাজ। জ্বিন নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সব কাজ তদারকি করছে। মুন্সী ভাই রাশেদ রাবেয়া সবাই হাতে হাতে জিনিষ পত্র সরিয়ে নামাচ্ছে। রাশেদ বুঝতে পারে খানিকটা। কী ঘটতে যাচ্ছে। কিছু মুটে মুজুর ধরণের লোকজন চলে এসেছে শাবল খুন্তি ঝুড়িটুরি নিয়ে। ফ্লোরটি ভাঙা হবে। এরই মধ্যে এসে উপস্থিত হলেন ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্র্যাট হায়দার আলী খান। ছোট খালাও আছেন এখানে। আছেন বিনু আপা আরও আরও সব খালাত বোনগুলো। বাড়ির সবাই উপস্থিত। এই ঘটনাটা সবাই দেখতে ভীষন উৎসুক। ছোট খালার মুখ গম্ভীর। তিনি এলেন ভেতর বাড়ি থেকে এই মাত্র। একবার চারপাশে চোখ ঘুরিয়ে নিলেন

-সালাম আপা

-ওয়ালাইকুম সালাম

ম্যাজিস্ট্রেটের সাথে সালাম বিনিময়ে শেষ করেই মেয়েদের উদ্দেশ্যে বললেন

-তোমরা সকলে ভেতর বাড়ি যাও। এখানে অকারণে লোক জামায়েত করোনা। রাশেদ তুই থাক এখানে। মুন্সী আর ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের লোকজন তো আছেই

সবাই বেশ মুখ গম্ভীর করেই ভেতরে গেল। কিন্তু ছোটখালা নয়, রাশেদও জানে সবাই এদিকে চোরাচোখ দিয়ে রাখবে।

-আসলে কী হলো বলুনতো?

ম্যাজিস্ট্রেটের কথার উত্তরে ছোট খালা

-কী আর হবে। এই লেখা ছিল হয়তো। উপরওয়ালার ইচ্ছে। পাপ করে একজন । তার দায় ভোগ করে অন্যে

-হুম।

ঘরটার উল্টোদিকের বারান্দায় চেয়ারে বসে আছেন ছোট খালা আর ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব। রাবেয়া চা দিয়ে যায়। ম্যাজিষ্ট্রেট আবার মুখ খোলেন

-এভাবে এতগুলো বছর পার হলো। কিছুই জানলেননা?

বাইরে জমে গেছে সাংবাদিকদের ভীড়। স্থানীয় আর জাতীয় গণমাধ্যমের লোকজনও জমে গেছে। পুরো এলাকাটিতে মারাত্মক রকমের জনসমাগম হয়ে গেছে। কিছু পুলিশ সদর দরজার বাইরে আর ভেতরে মুন্সী ভাই এদের সামাল দিচ্ছে

-জানতামনা যে তা ঠিক নয়

-তাহলে?

-জানার মাঝে ফাঁরাক ছিল এটাই হলো বড় বিষয়। তাছাড়া হিন্দু রাজার কাছ থেকে কেনা বাড়ি। কখন কি ধরণের অন্যায় কিংবা খুন গুম করে গেছেন তা তো আমার পক্ষে জানা সম্ভব নয়।

-হুম

একজন পুলিশ এসে ডেকে নিয়ে যায় ম্যাজিষ্ট্রেটকে

-আপনিও আসুন আপা।

দুজনেই এগিয়ে যান ঘরটির দিকে। পুরো ফ্লোরটি ততক্ষণে ভেঙে ফেলা হয়েছে।

-প্লিজ আমাদের ভেতরে ঢুকতে দিন

বাইরে থেকে টিভি চ্যানেলের লোকজন হৈ চৈ করছে।

-বুঝতে পারছেন না কেন আপনারা। এটাতো একটা ইতিহাস। এই ইতিহাসের সাক্ষী হতে দিন আপনারা দেশবাসীকে

-দেখবেন খুব শীঘ্রই। কোনো অসুবিধা নেই। ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব বললেই আমরা সদর দরজা খুলে দেব। অনুরোধ করছি আপনাদের। শান্ত হোন আপনারা।

ছোট খালা আর ম্যাজিষ্ট্রেট উঁকি দেন। ভাঙা ফ্লোরের ভেতরে। উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে একজন পুলিশ অফিসার বলেন

-দেখুন স্যার। ভেতরে তাকিয়ে দেখুন

অসংখ্য মৃত মানুষের হাড়গোড় পড়ে রয়েছে এক চোরা গর্তের ভেতর। অসংখ্য । অসংখ্য। কোনো ভাবেই চেনার উপায় নেই।

-পঞ্চাশ বছরের লাশের কঙ্কাল দেখে কী চেনা সম্ভব কে কোন ধর্মাবলম্বী ছিলেন!

ছোট খালা বলে ওঠেন।

রাশেদের বিষ্ময়ের ঘোর কাটেনা। এই উৎকট ঘ্রাণটাই সেদিন এই ঘরের ভেতর পেয়েছিল রাশেদ। হঠাৎ চিৎকার করে ওঠে

-এই ঘ্রাণটাই। হ্যা এই ঘ্রাণটাই সেদিন আমি পেয়েছিলাম এই ঘরে। ছোট খালা ওই যে সেদিন। যেদিন রহিম আর আমি এই ঘরে ঘুমিয়েছিলাম।

ততক্ষণে আর কারো বুঝবার বাকি নেই যে এইসব মৃত মানুষদের অতৃপ্ত আত্মারাই এতকাল এই বাড়িটাতে আছর করে রেখেছিল। তাদের সঠিক সৎকার না হবার কারণেই তারা এখানে সেখানে ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। আর জ্বিন এই বিষয়টা খানিকটা আঁচ করতে পেরেছিল। তাকে এখানে এনে দিয়েছিলেন বড় মসজিদের ঈমাম হুজুর ।

-তবে কী জানিস রাশেদ। ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব আপনিও শুনুন। মানুষের সাধ্যে তো সব নেই।তাই শেষ রক্ষা হলোনা। রহিমটাকে চলে যেতে হলো।

-হুম।

ম্যাজিস্ট্রেট মাথা নাড়েন।

ততক্ষণে ষ্ট্রেচার নিয়ে ঢুকছে পুলিশের পেয়াদা র্আদালিগুলো । আর এক একটাতে করে তুলে নিয়ে চলেছে লাশের হাড়গোড় পুলিশের গাড়িগুলোতে।

-ফাইয়াদও তো প্রাণে বেঁচে গেল আপা। সেটাই শুকরিয়া করুন। কী আর করা যাবে?

একটা ফোন রিং বেজে ওঠে ম্যাজিষ্ট্রেটের ফোনে

-হ্যা। হ্যা। চিন্তা করবেননা। লাশের গাড়িগুলো কিছুক্ষণের মধ্যেই রওনা হয়ে যাবে মেডিক্যাল কলেজের উদ্দেশ্যে।

কথা শেষ করে ছোট খালার উদ্দেশ্যে তিনি আবার বলতে নেন কিছু একটা। তখনই ঈমাম সাহেব ঢুকে পড়েন দ্রুত সেখানে। পেছনে পেছনে জ্বিনও আসেন। ঈমাম সাহেবকে সালাম দেন ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব।

-সালাম হুজুর

-সালাম। আপা। ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব দু’জনেই আছেন । ভালো হলো। লাশের সবগুলো গাড়ি রেডি।

-কোথায় নিচ্ছেন বলুনতো লাশগুলোকে?

-ম্যাডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক ডির্পাটমেন্টে।

-আচ্ছা। ইমাম সাহেব জানেনতো?

-জি আপা।

ম্যাজিস্ট্রেট আবার বলতে শুরু করেন

-আপা। সময়ও বেশি নেই। লাশগুলোকে হিন্দু মুসলিম সনাক্ত করবার জন্য ডি এন এ টেষ্ট করবার দরকার আছে। সঠিক মতো সৎকার না হলে আবার ঝামেলা হতে পারে। উৎপাত হতে পারে নানা রকম। তাই সরকারী সিদ্ধান্ত হলো এই বাড়িটির র্পূণ নিরাপত্তার জন্য সবগুলো হাড়ের ডিন এন এ টেষ্ট করে তবেই সৎকার করতে হবে।

-কিন্তু এ তো এক বিশাল কাজ। এতকালের মরে যাওয়া মানুষের হাড় থেকে..

-হ্যা সম্ভব।

-কার পারিবারিক জিন সেটাই বা কিভাবে সনাক্ত করা যাবে?

-আমরা এখানে পঞ্চাশ বছর ধরে বসবাসকারী হিন্দুদের তালিকা করেছি অলরেডি। তাদের কাদের কাদের পরিবারের মানুষ নিখোঁজ কিংবা গুম হয়েছেন তাদের লিস্ট করা হয়েছে?

-কিন্তু তাতে কী?

-ওদের ডি এন এ টেষ্টের রিপোর্টও আমাদের কাছে আছে।তাদের ডি এন এর সাথে যাদের ডি এন এ মিলে যাবে তবেই বোঝা যাবে সেই হাড় হিন্দু পরিবারের কারোর। তাছাড়া খুব বেশি পরিবার তো আর হিন্দু নেই এখানে।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত