আমি মাটির কবিতা লিখি: হলধর নাগ

লোককবিরত্ন নামে বহুল পরিচিত সম্বলপুরী-কোশলী ভাষার কবি হলধর নাগ এমন এক বিস্ময়কর প্রতিভা যাকে নিয়ে চর্চা চলছে সারা পৃথিবী জুড়ে। ১৯৫০ সালের ৩১ শে মার্চ এই কবি ওড়িশার বড়গড় জেলার ঘেস গ্রামে একটি অতি দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহন করেন। ২০১৭ সালে ভারত সরকার তাকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করে। লেখাপড়া মাত্র তৃতীয় শ্রেণী অবধি। একটি স্কুলে রাধুনীর কাজ করতেন তিনি। আজ তাঁর কবিতা সম্বলপুর বিশ্ববিদ্যালয় সহ বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে পড়ানো হচ্ছে। তাঁকে নিয়ে গবেষনাও করছেন বেশ কয়েকজন পিএইচডি স্কলার। হলধর নাগ এমন একজন মানুষ যাঁর কবিতাপাঠ হবে শুনলেই জমে যায় হাজার হাজার সাধারন মানুষের ভিড়। ওড়িশার প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে তিনি তাঁর ব্যস্ততার ফাঁকেও আমাদের সময দিয়েছেন। আলাপচারিতায় উঠে এসেছে আধুনিক কবিতা থেকে গ্রামীন জীবনযাত্রার চালচিত্র।

প্রশ্ন: ছোটবেলা থেকেই কি আপনার কবিতার প্রতি আকর্ষণ ছিল?

উ: হ্যাঁ কবিতা, লোকগীতি আমায় ছোটবেলা থেকেই টানত।

প্রশ্ন: কবিতা লেখার ক্ষেত্রে কারা আপনার কাছে অনুপ্রেরণা?

উ: কবি গঙ্গাধর মেহেরা, ভীম ভোয়ী এঁদের কবিতার ভাষা, বিশেষত কবি গঙ্গাধর মেহেরার প্রাকৃতিক বর্ণনা আমায় ভীষণ মুগ্ধ করে।

প্রশ্ন: আপনার প্রথম লেখা সম্পর্কে যদি কিছু বলেন-

উ: সেই অর্থে প্রথম লেখার কথা যদি বলতে হয় তবে বলতে হবে প্রথম প্রকাশিত লেখা ‘ধোড়ো বড়গাছ’ (বুড়ো বটগাছ) কবিতাটির কথা। যার বিষযবস্তু একটি বটগাছ। গ্রামের কত জন্ম-মৃত্যু, মান-অভিমান একমনকী একটা ছোট্ট চুরির ঘটনারও সাক্ষী সেই গাছটি। দীর্ঘদিন এক জাযগাতে দাঁড়িয়ে থেকে সে দেখে যাচ্ছে পরিবর্তনের ইতিহাস।

প্রশ্ন: আপনি যে ‘পদ্মশ্রী’ সন্মান পেইয়েছেন এটা একজন কবির কাছে অনেক বড় প্রাপ্তি। কবিদের জনপ্রিয়তা বা প্রচারের আলোকে আসার ক্ষেত্রে সন্মানপ্রাপ্তি কতটা জরুরি বলে আপনার মনে হয়?

উ: কবি সন্মানের কথা ভাবেন না বা সন্মানপ্রাপ্তির জন্য লেখেন না। যিনি সন্মানপ্রাপ্তির জন্য লেখেন তিনি কবি নন, তিনি লেখক নন, তিনি সাধক নন।

প্রশ্ন: সন্মানপ্রাপ্তির পর কবি বা লেখকের লেখায় কি কোনও পরিবর্তন আসে বলে আপনার মনে হয়?

উ: কবি সন্মান পেতে পারেন তবে তার সাথে লেখায় প্রভাব পড়ার কোনও যোগসূত্র নেই। কবি নিজের মতো জীবনধারণ করেন এবং কলমের মাধ্যমে জীবনপ্রকৃতি বহিঃপ্রকাশ করেন। তার মধ্যে থেকেই বেরিযে আসে কালজয়ী কবিতা। এক্ষেত্রে কবি আর পাখি সমান। পাখি বিভিন্ন গাছের ফল-মূল খেয়ে উগরে দেয়। কখনও কখনও তার মধ্যে থেকেই একটা আস্ত বটগাছ জন্মায়।

প্রশ্ন: ‘পদ্মশ্রী’ গ্রহণের জন্য রাষ্ট্রপতি ভবনে যাওয়া ও ওখানে কাটানো কিছু স্মরণীয় মুহূর্ত যদি আমাদের সাথে ভাগ করে নেন…

উ: রাষ্ট্রপতির হাত থেকে পদ্মশ্রী গ্রহণের মুহূর্ত তো অবশ্যই একটি স্মরণীয় মুহূর্ত। আরেকটি স্মরণীয মুহূর্তের কথা আপনাকে বলি, রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে পুরস্কার নেওযার পর জলখাবারের জন্য এক জাযগায় যেতে বলা হল। গেলাম। তারপর সেখানে যখন চা খাচ্ছি তখন পেট্রোলিযাম মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান বললেন, হলধরবাবু প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আপনার সাথে দেখা করতে এসেছেন। আমি কোনওক্রমে উত্তেজনায় চায়ের কাপটা সরিয়ে রেখে উঠে দাঁড়ালাম। উনি(নরেন্দ্র মোদি) আসলেন এবং হাত মেলালেন। তারপর বললেন,‘আপ ওড়িশাকা স্বভিমান বাড়হা দিহা।’

প্রশ্ন: এবার একটু কবিতার কথায় আসি। আপনি কবিতায় মূলত কী ধরনের বিষযবস্তুকে প্রাধান্য দেন?

উ: আমি মাটির কবিতা লিখি। আমাদের সংস্কৃতি আজ বিপন্ন। কবির কলমের উচিত সেই সংস্কৃতিকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা। সে হোক পৌরাণিক, হোক ঐতিহাসিক বা মনগড়া যাই লিখিনা কেন তা সমাজকে শুধরাবার জন্য।

প্রশ্ন: বর্তমানে পৌরাণিক ঐতিহাসিকের কথা আসলে বেশিরভাগ মানুষ নাক শিটকায়। বর্তমান যুগে শীততাপ নিযন্ত্রিত ঘর, ফাইভ স্টার হোটেল তার ভেতরে চলে কবিতাপাঠ, সেখানে পৌরাণিক কবিতাকে নেহাত  গ্রাম্য বা গেঁযো বলে ব্যাঙ্গ করা হবে। আপনি কখনও এমন পরিস্থিতির সন্মুখীন হয়েছেন?

উ: দেখুন কবিতার জীবন আছে। কবির কোনও ভেদাভেদ নেই। কবিদের অন্তরাত্মা একই। সে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হন বা রাম, শ্যাম, যদু, মধু।

প্রশ্ন: বর্তমানের কবিতাচর্চা সম্পর্কে আপনার মতামত কী?

উ: এখানকার অনেক কবিতার মানেই আমি বুঝতে পারি না। কবি তো অন্যের জন্য কবিতা লিখবে। যদি অন্যরা বা সমাজ তার কবিতা না বোঝে তাহলে কী জন্য সে কবিতা লেখে? এই দেখুন না জগন্নাথ দাস উড়িষ্যা তথা সারা ভারতে পরিচিত হয়ে গেলেন ধর্মগ্রন্থ ভগবত লিখে। তিনি কী করেছিলেন, অতি সরল ভাষায সর্বসাধারণের জন্য লিখেছিলেন।

প্রশ্ন: আচ্ছা কখনও রাজনীতির প্রসঙ্গ বা বিষয় আপনার কবিতায় উঠে এসেছে?

উ: হ্যাঁ এসেছে তো। যেমন একটা কবিতার উদাহরণ দিই, কবিতাটির নাম ‘কাহি এ বাহিরচি ঘরু’। গ্রামে মন্ত্রী এসেছেন সবাই মন্ত্রীকে নিজেদের সমস্যার কথা জানাতে যাচ্ছে। এক অন্ধ, সেও আর ঘরে বসে থাকতে পারল না। ভাবল তারও তো সমস্যা কম না। যদি মন্ত্রী মহোদয়কে জানালে কিছু সুরাহা হয়। রাস্তায় বেরিয়ে সে মন্ত্রীর গাড়ির নীচে চাপা পড়ল। যখন মন্ত্রীর গাড়ির নীচে অন্ধ চাপা পড়ে গেছে তখন গ্রামের সবাই বলল- কাহি এ বাহিরচি ঘরু? (কেন এ ঘর থেকে বেরিইয়েছে?)। এক্ষেত্রে মন্ত্রীর কোনও দোষ দেখল না কেউ।

প্রশ্ন: আপনার ছেলেবেলা ও জীবনসংগ্রাম সম্পর্কে কিছু বলুন।

উ: তিন ক্লাস পড়তে পড়তে আর পড়াশোনা হয়নি। মা-বাবা দুজনেই মারা গেলেন। আমার তখন বয়স দশ। পেটের জ্বালায তখন আর পড়া! প্রথম দু-বছর হোটেলের কাপ-প্লেট ধুযে পেট চালালাম। তারপর সরপঞ্জ(গ্রামপ্রধান) স্কুলের(ঘেস হাই স্কুল) হোস্টেলে রাঁধুনির কাজ যোগাড় করে দিলেন। সেখানে ষোল বছর রান্নার কাজ করি। স্কুলটা আমার বাড়ির মতো হযে গিয়েছিল। এরপর মালতীকে বিয়ে করলাম, তারপর মেয়ে হল। মেয়ে বড় হল তার বিয়ে দিলাম। তারপর এই এখনও চলছি জীবনের উঁচু-নীচু পথ ধরে।

প্রশ্ন: আপনি যখন পদ্মশ্রী আনতে দিল্লি গেলেন তখনও এই সাদামাটা পোশাকেই পায়ে জুতো ছাড়াই পেঁছে গেলেন দিল্লি। জুতো পরেন না কেন?

উ: আমার ছোটবেলা থেকে কখনও জুতো পরার অভ্যেস নেই। জুতো পরলে আমি হাঁটতে পারি না। তাছাড়া আমাদের বদ্যিমশাই বলতেন খালি পাযে থাকলে মাধ্যাকর্ষণের সাথে ডাইরেক্ট কানেকশন থাকে, সেই থেকেই এই অভ্যাস। আর এই বেশভুষা আমাদের ঐতিহ্য। আমাদের সংস্কৃতি। তাই এই বেশভূষাতেই দিল্লি চলে গেলাম। টাই-স্যুট ওগুলো এমনি আমার সাথে খাপ খায না। আমি সাদামাটা মানুষ।

প্রশ্ন: আপনি নিজের একটি ধারা তৈরি করে ফেলেছেন সম্বলপুরী-কোসলী ভাষায (হলধর ধারা) যে ধারায় শতাধিক কবি কাব্যচর্চা করছেন। এ এক অভূতপূর্ব ব্যাপার। আপনি যখন কোথাও কবিতা বলতে যান সেখানে নাকি হাজার হাজার মানুষের ভীড় জমে, যারা কবিতা বা বই-ই কখনও পড়েনি বা পড়ে না এমন মানুষও আপনার কবিতা শুনতে আসে। আপনার কবিতাতে কী এমন যাদু আছে যা এত মানুষকে টেনে আনে?

উ: যাদু-টাদু কিছ নেই। আমি মানুষের কথা লিখি। সহজ সরল ভাষায় লিখি।

সাক্ষাত্কারটি নিয়েছেন: সুশান্ত কুমার মিশ্র ও বর্ণদীপ নন্দী

সৌজন্যে : নবাঙ্কুর পত্রিকা

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত