শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের গল্প হারানো জিনিস

নস্যির কৌটোটা কোথায় যে রাখলেন সুধন্য, কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছেন না। নাক দিয়ে জল আসছে, সুড়সুড় করছে, ভারী অস্বস্তি। সম্ভব অসম্ভব সব জায়গাতেই খুঁজেছেন। দু-একবার মিনমিন করে বউ হেমন্তবালাকেও জিগ্যেস করেছেন, জবাব পাওয়া যায়নি। হেমন্তবালা রেগে আছেন, ছোট মেয়ে কুঁচি পুরোনো তেঁতুলের শেষ একটা ডেলাও চুরি করে নিয়ে গেছে। পুরোনো। তেঁতুলের একটা মাখা করতে গিয়ে হেমন্তবালা ডেলাটুকু বের করে ধনেপাতা, গুড়, লংকা সব গুছিয়ে রেখেছিলেন। পুরোনো তেঁতুলের এই মাখাটা তাঁর বড় প্রিয়। সবই পড়ে আছে। ধনেপাতা, লংকা, গুড়, কেবল তেঁতুলটুকুই নেই। একটু আগে ফ্রকের কোঁচড় ভরে মুড়ি নিয়ে গেল রান্নাঘর থেকে ওই হতচ্ছাড়া মেয়েটা। ওরই কাজ। সেই থেকে হেমন্তবালা কারও কথার উত্তর দিচ্ছেন না।

সুধন্যও তেমন সাহস পাচ্ছেন না বেশি জিজ্ঞাসাবাদ করতে। যৌবনকালটা এই নস্যি নিয়ে বড় অশান্তি গেছে।

ফুলশয্যার রাতে বউয়ের সঙ্গে প্রথম পরিচয়ের প্রাক্কালে সুধন্য এক টিপ প্রচণ্ড নস্যি নিয়ে স্নায়ু ঠিক রাখার চেষ্টা করেছিলেন। নতুন বউ হেমন্তবালা প্রথম কাছে এসে খুব অবাক হয়ে বলল, তুমি নস্যি নাও?

লজ্জিত সুধন্য বললেন, নিই মাঝে-মাঝে।

—এ মা গো। ননাংরা জিনিস। সিগারেট খেতে পারো না?

সুধন্য নিভে গিয়েছিলেন। নতুন বউ নস্যি ঘেন্না পায়, কিন্তু তিনি করেন কী! ইস্কুলের নীচু ক্লাস থেকে নেশা ছাড়ানোও যায় না।

তবুনতুন বউয়ের ঘেন্না দেখে বিয়ের পর-পর নস্যি ছেড়ে সিগারেট ধরেন। কিন্তু তাতে চোখে জল আসে, গলা খুসখুস করে। নেশা আসে না। উপরন্তু নস্যির অভাবে সারাদিন নাকে জল আসে, হাঁচি আসে, মাথাটা ঘোলাটে লাগে। এক টিপ নস্যির জন্য প্রাণ আনচান করে।

হেমন্তবালা বলতেন, নস্যি নেওয়া পুরুষ বড় বিশ্রী।

সুধন্যর বিশ্রী হওয়ার ইচ্ছে ছিল না। তবু পুরুষকার দিয়ে নস্যির ওপর জয়ী হওয়া যায়নি। তাঁর অবস্থা দেখে অবশেষে তাঁর মা তাঁকে ডেকে বলেন, বাবা, নস্যি না নিলে তুই কি বাঁচবি? সারাদিন তোর মুখচোখ কেমনধারা জলেডোবা মানুষের মতো দেখায় যে! নতুন বউ রাগ করে তো করুক, মেয়েরা বড় ট্যাটন হয়। ওসব মন বুঝে অত চলতে নেই। পেয়ে বসবে। তুই পুরুষ, পুরুষের মতো হ। নস্যি ধর আবার, নইলে শরীর পাত হয়ে যাবে। নেশা কি সহজে ছাড়া যায়?

মায়ের আদেশে সুধন্য আবার নস্যি ধরেন। নস্যি ধরে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন বটে, কিন্তু হেমন্তবালা এক সপ্তাহ কথা বললেন না। তারপর যখন বললেন সেই কথাও আগ্নেয়গিরির মুখ। থেকে বেরিয়ে আসা লাভা ছাড়া কিছু নয়। তবু সুধন্য যেমন নস্যি ছাড়তে পারলেন না, তেমনি হেমন্তবালাও স্বামীকে ছাড়তে পারলেন না। তবে নস্যি তাদের বিবাহিত জীবনের একটা স্থায়ী অশান্তির কারণ হয়ে রইল। পরে হেমন্তবালা সুধন্যর নস্যির ন্যাকড়াও কেচে দিয়েছেন, তবু এই বুড়ো বয়সেও সুধন্যকে নস্যির জন্য কথা শুনতে হয়। রাগ হলে হেমন্তবালা এখনও সুধন্যর নস্যির কৌটো বাইরে ছুড়ে ফেলে দেন। কতবার নতুন ডিবে কিনতে হয়েছে।

আজ সকালেও নস্যি নিয়েছেন বেশ কয়েকবার। আজকাল কিছু বেশি নেন। সম্প্রতি চাকরি থেকে অবসর পেয়েছেন, হাতে কাজ নেই, ফালতু দিন, ফালতু সব সময়। এত ছুটি কাটাবেন কী করে তাই ভাবতে-ভাবতে টিপের-পর-টিপ নস্যি নিয়ে নেন। হিতাকাঙ্ক্ষীরা বলে—কপালে নস্যি জমে নাকি মানুষ মরে যায়!

সুধন্য ভাবেন—তা হবে। সিগারেট, তামাকপাতায় ক্যানসার হয়। মদে লিভার সিরোসিস হয়। আফিং খেলেও কিছু-না-কিছু হয়। নেশা করলে ওসব তো আছেই।

নস্যির কৌটোটা খুঁজে না পেয়ে খুবই অস্বস্তি হচ্ছিল। বিছানার তোশক উলটে দেখলেন, খাটের তলা খুঁজলেন, তাকটাকগুলো সবই খুঁজলেন। কোথাও নেই। একটা জীবন ধরে নিজের একটু বাড়ি করতে পেরেছেন তিনি। মফসসল শহর বলে জমির দাম বেশি লাগেনি, চুন-সুরকির গাঁথুনি দেওয়ার খরচ কমই হয়েছে। দু-খানা মাত্র ঘর মাঝখানে একটু উঠোন, ওধারে রান্না আর স্নান ইত্যাদির ঘর। কিছুই না। তবু খুব কষ্ট গেছে এটুকু করতেই। দেওয়াল ওঠে তো ছাদ হয় না, ছাদ হল তো পলেস্তারা বাকি থাকল, সেটা করলেন তো বারান্দা সিমেন্ট করা বাকি থাকল। সে একটা লড়াই গেছে। লড়াই যখন শেষ হয়েছে তখন বয়সও শেষ। বাড়ি ভোগ করার বাকি আর অল্প দিনই। তবু একটু তৃপ্তি, শেষ তো হল। সারা জীবনে নিজের বাড়ি’ বলে বলার মতো কিছু

তো হল।

অন্যমনস্কভাবে ডিবেটা খুঁজতে-খুঁজতে বাইরের দিককার ঘরটায় এলেন। জোড়া বিছানায় বুঁচি আর তার দিদি শেফালি শোয়। দুটোই মেয়ে সুধন্যর। বেশি বয়সে বেশ পরপর দুটো মেয়ে হল। বিয়ে দেওয়ার সময় পাওয়া যাবে কি? বড় মেয়ে শেফালির বিশ বছর বয়স চলছে, বঁচির মোটে বারো। শেফালির জন্য তোড়জোড় করতে হয়। হাত খালি বলে তেমন উৎসাহ পান না। মেয়ে তেমন সুন্দর নয়, যদিও খুবই আদরের।

এ-ঘরটায় পড়ার টেবিল রয়েছে কেরোসিন কাঠের। সস্তা আলনা, বইয়ের র্যাক। এসো-জন বোসো-জনের জন্য কয়েকখানা টিনের চেয়ার। তাতে শেফালি আর হেমন্তবালার নিজেদের হাতে কাজ করা সব ঢাকনা। দেওয়ালে রবি ঠাকুর আর বালগোপালের ছবি। পড়ার টেবিলের ওপর একটা সস্তা ট্রানজিস্টার রেডিও, নেভানো হারিকেন, ছড়ানো বইপত্র। সবই হাতড়ে দেখেছেন সুধন্য, তবু আর-একবার দেখলেন। হারিকেনের তলায় নস্যির ডিবে থাকার কথা নয়। তবু সন্দেহ থাকে কেন ভেবে সুধন্য হারিকেনের তলাও দেখলেন।

নাকটা সুড়সুড় করছে, জল আসছে। দীর্ঘ চল্লিশ বছরেরও বেশি কালের নেশা। নস্যি না হলে পাগল-পাগল লাগে।

দেওয়ালের পেরেকে একটা লাল ভ্যানিটি ব্যাগ ঝুলছে। শেফালির। আজকাল গরিবের মেয়েদেরও এসব থাকে—ভ্যানিটি ব্যাগ, লিপস্টিক, ঘড়ি। তাঁর মেয়েরও আছে। একটা জীবন। ধরে ল্যান্ড সেটেলমেন্ট অফিসের কেরানি ছিলেন, বুড়ো বয়সে রিটায়ারমেন্টের আগে কিছুদিনের জন্য বড়বাবু হয়েছিলেন। কিন্তু নিজেরই পুরোনো অফিসের বড়বাবু হওয়ায় পুরোনো সহকর্মীরা তেমন মানসৎমান করত না, মানতও না খুব একটা। তবু বড়বাবু হয়েছিলেন। কিন্তু গা থেকে গরিব-গরিব গন্ধটা আর গেল না। নস্যির গুঁড়োর মতো লেগে রইল গায়ে। কিন্তু মেয়ে বউকে কষ্ট দেননি তেমন। যথাসাধ্য অভাব মিটিয়ে গেছেন। যতদিন মা বেঁচেছিলেন ততদিন মাকেও সুখেই রেখেছেন। ধকল যা কিছু নিজের ওপর দিয়ে গেছে।

সেটেলমেন্ট অফিসের লোকদের কিছু উপরি আয় থাকে। সে তেমন কিছু নয়। সুধন্যরও ছিল। এ-বাড়ির গাঁথুনিতে সবই গাঁথা হয়ে গেছে। হাতে তেমন কিছু নেই।

ভ্যানিটি ব্যাগের মধ্যে ডিবেটার যাওয়ার কথা নয়। তবু তিনি শেফালির ব্যাগটা পেরেক থেকে নামিয়ে আনলেন। কিন্তু খুলতে পারছিলেন না। এ সময়টায় শেফালি তার কোন বান্ধবীর বাড়িতে পড়া বুঝতে যায়। পার্ট টু পরীক্ষা দিচ্ছে এবার। ধারেকাছে কেউ নেই। ব্যাগটার মুখ এমন হাঁসকল দিয়ে লাগানো যে নানা রকম টিপ আর চাপ দিয়েও অনেকক্ষণ খুলতে পারলেন না।

তারপর হড়াক করে টান দিতেই সহজে খুলে গেল। ভিতরে বেশি কিছু নেই। কয়েকটা খুচরো পয়সা, লিপস্টিক আর খুদে গোল আয়না, কলেজের মাইনের রসিদ বই, পেন, ভুরু আঁকার পেনসিল, একজোড়া গগলস। ডিবেটা নেই। কলেজের মাইনের রসিদ-বইটার ভিতর থেকে একটা ভাঁজ করা চিঠি বেরিয়ে আছে।

আজকাল সময় কাটে না। তাই চিঠিটা দেখে খুশি হলেন সুধন্য। মেয়ে চিঠিপত্র পাচ্ছে তাহলে! দেখতে ভালো নয় মেয়েটা, চিঠি পাওয়াটা সুলক্ষণ। ছেলেটা যদি জাতের হয় তো বরং উৎসাহই দেবেন!

চিঠিটা খুলে চশমা এঁটে দেখে একটু হতাশ হলেন। প্রেমপত্র নয়। আবার নয়ও বলা যায় না। অমল নামে একটা ছেলের চিঠি। সে পলাশি ছেড়ে কলকাতায় চলে গেছে। সেখান থেকে পলাশির জন্য মন-কেমন-করা চিঠিতে নানা জনের খবর জানতে চেয়েছে। কেষ্টনগর কলেজে একসঙ্গে পড়ত বোধ হয় একসময়ে। চিঠির শেষে ‘ভালোবাসা’র বদলে ‘প্রীতি ও শুভেচ্ছা জানিয়েছে। নীরস চিঠি। বানান ভুলও অনেক চোখে পড়ে। বাঙাল ছেলে বোধহয়। বাড়ি বানান ‘বারি’ লিখেছে।

যথাস্থানে চিঠিটা রেখে দিলেন। ডিবেটা পাওয়া গেল না। কোথায় যে নিজেই রাখলেন, বা হেমন্তবালা ফেলে দিলেন—তা বোঝা যাচ্ছে না। আবার নতুন ডিবে আর নস্যি কিনতে বাজার পর্যন্ত ধাওয়া করা বড় ঝামেলার ব্যাপার।

পলাশিতে বাড়ি করাটাই কি ভুল হয়েছিল? এ অঞ্চলটা আসল পলাশি নয়, এর নাম মীরবাজার, আসল পলাশি অনেকটা দূর, সেখানে চিনিকল হয়েছে, আশেপাশে আখের চাষ হয়। সিরাজদ্দৌল্লার যুদ্ধক্ষেত্র এখন মাঠ জঙ্গল পড়ে আছে। সে আমবাগানও নেই। তবু পলাশি নামটা বড় বেশি ইতিহাসপ্রসিদ্ধ। কিন্তু স্টেশনের কাছে এই মীরবাজারও সেই আদ্যিকালে পড়ে আছে। কলকাতা চার ঘণ্টার পথ লালগোলা প্যাসেঞ্জারে। কেষ্টনগর না গেলে ভালো জিনিস পাওয়া মুশকিল। কলেজও কেষ্টনগরে। সেখানেই চাকরি করতেন সুধন্য। ত্রিশ টাকায় ঘর ভাড়া করে থাকতেন। তারপর বন্ধু সুধীর বাঁড়ুজ্যের পাল্লায় পড়ে মীরবাজারে বাড়ির জন্য জমি কিনলেন। কোনও মানে হয় না। কতগুলো টাকা বাড়িটায় আটকে রইল। কেউ-কেউ পরামর্শ দিয়েছিল আরও ক’খানা ঘর তুলে ভাড়া দিতে। সেটা করেননি ভালোই করেছেন। কারণ ভাড়া নেওয়ার লোক জুটত না। মীরবাজারে কে আর থাকতে আসবে? তাই ভাবেন বাড়িটা করাই ভুল হয়েছিল। ত্রিশ টাকা করে বছরে তিনশো ষাট টাকা টেনে গেলেও হাতের পাত্রে কিছু থাকত, শেফালির বিয়েটা দিতে পারতেন; বঁচিরও একটা গতি হত।

বুঁচি কোথায় খেলতে গিয়েছিল। সারাদিনই পাড়া বেড়ায়, ঘেমো শরীর নিয়ে হাঁসফাঁস করতে-করতে দৌড়ে ঘরে এল। বিছানার তোশক থেকে একটা ন্যাকড়ার পুতুল বের করে নিয়ে চলে যাচ্ছিল, হেমন্তবালা তক্কে ছিলেন, উঠে এসে ডাকলেন বুঁচি?

বুঁচি দৌড়।

হেমন্তবালার হাতে একটা বেলনা। সেইটে বাগিয়ে নিয়ে তিনিও দৌড়ে বেরোলেন।

–বুঁচি-ই!

সুধন্যর সময় কাটে না।

তিনিও দৌড় প্রতিযোগিতা দেখতে বাইরে বেরিয়ে এলেন। খুবই চমৎকার দৌড় হচ্ছে। বুঁচি হরিণের মতো দৌড়োয় বটে, কিন্তু হেমন্তবালাও যে এ-বয়সে এত জোর ছুটতে পারেন তা সুধন্যর জানা ছিল না।

সামনের একটু মাঠ মতো, তারপর রাস্তা। বুঁচি রাস্তায় উঠে গিয়েও রেহাই পায়নি। হেমন্তবালা শাড়ি সামলে চমৎকার দ্রুতবেগে ঝুঁচির চার হাতের মধ্যে চলে গেছেন।

বুঁচি একবার পিছু ফিরে চেয়ে এত অবাক যে প্রায় ধরা পড়ে গিয়েছিল আর কি? একেবারে এক চুলের জন্য বেঁচে গেল। ‘উ মা গো!’ বলে আবার উধ্বশ্বাসে বুঁচি দৌড়ে নাগালের বাইরে চলে গেল।

হেমন্তবালা কদমগাছটার তলায় দাঁড়িয়ে হাঁফাচ্ছেন।

কষ্ট হয় সুধন্যর।

হেমন্তবালা করুণ সুরে চেঁচিয়ে বললেন, বুঁচি!

বুঁচি দূরে দাঁড়িয়ে হিহি করে হাসে।

হেমন্তবালা প্রায় কান্নার মতো স্বরে বলেন, বঁচি রে, তোর ধর্ম কি এই বলে? অ্যাঁ? তোর ধর্ম তোকে এই বলে?

কী করুণ আবেদন! শুনে সুধন্যরও মায়া হয়।

কিন্তু হেমন্তবালার গলার স্বর হঠাৎ বদলে গেল। হাতের বেলনাটা তুলে পুলিশের মতো আস্ফালন করে চিৎকারে পাড়া মাত করে কর্কশ স্বরে বলতে থাকেন, আসিস আজকে। ভাতের পাতে ছাই বেড়ে দেব। খাবি না বুঁচি, অ্যাঁ? খেতে আসবি না? তখন দেখিস।

এই বলে হেমন্তবালা ফিরে আসছিলেন।

এ সময়টায় মুখোমুখি হওয়া ভালো নয়। অভিজ্ঞতাবলে সুধন্য জানেন, মেয়েদের ওপর রাগ করলে হেমন্তবালা আবার সুধন্যর ওপরেও অকারণে চটে যান।

সুধন্য ঘরের পিছনদিকে গা ঢাকা দিয়ে রইলেন একটু।

হেমন্তবালা যখন উঠোন পার হয়ে রান্নাঘরে যাচ্ছেন, তখনই সুধন্য দেখলেন চোর একটা বেড়াল দুটো খয়রা মাছ মুখে নিয়ে জবা গাছটার তলায় গিয়ে বসল। সুধন্য বড় ব্যথিত হলেন। সপ্তাহে তিনদিন মাছ হয়। একপো খয়রা মাছ কিনতে আজ তাঁকে দুটো টাকা নগদ দিতে হয়েছে। তার দুটো ওই গেল বেড়ালের পেটে।

বেড়ালটাকে তেড়ে গেলেন না সুধন্য। গিয়ে লাভ কী? বেড়ালের মুখের মাছ তো হেমন্তবালা আর হেঁশেলে তুলবে না, খাচ্ছে খাক।

হেমন্তবালার চিক্কার শোনা গেল একটু বাদেই, চোখের পলকে দু-দুটো মাছ হাওয়া হয়ে গেল। বুঁচির বাপ কি একটু চোখে-চোখেও রাখতে পারে না বাড়িঘর, না কি! কোথায় গেল লোকটা, অ্যাঁ?

নস্যির ডিবেটা এখনও পাওয়া যায়নি। সুধন্যর খুব অস্বস্তি হচ্ছে। বুঁচিটা বাড়ি ফিরলে ওর মায়ের হাতে আজ খুব পেটান খাবে।

দুপুরের কলকাতা যাওয়ার ট্রেনটা এসে স্টেশনে ঢুকল। সামনের মাঠ ভেঙে দুজন ধুতিপরা লোক গাড়ি ধরতে দৌড়োচ্ছ। চমৎকার দৌড়, কিছুক্ষণ চেয়ে থাকেন সুধন্য। পাবে কি? না, পাবে। স্টেশনের হাতায় প্রায় পৌঁছে গেছে। ঘন্টি বাজল, গার্ড হুইশল দিল, ইঞ্জিন কু দিল, সব। নিয়ম মাফিক। ছেলেবেলা থেকে দেখে আসছেন, ঠিক একইভাবে ট্রেন ছাড়ে। লোক দুটোর একজন সিগন্যালের তারে হোঁচট খেয়ে পড়তে-পড়তে সামলে গেল। সুধন্য হাঁ করে চেয়ে আছেন।

শেফালির গলা পেলেন–বাবা!

উত্তর দিলেন না, দেখছেন। না, পেয়ে গেল। ওই প্রথম লোকটা উঠে পড়েছে কামরায়। উঠে হাত বুলিয়ে দ্বিতীয় লোকটাকে চলন্ত গাড়িতে তুলে নিল টেনে।

বাঁচা গেল।

—বাবা! হাঁ করে দেখছ কী?

—উঁ!

মনটা ভালো নেই। কেন যে বুঁচিটা তেঁতুল চুরি করতে গেল! আজ দুপুরে খাওয়ার সময়ে ফিরে এলে খুব মার খাবে মেয়েটা। ছোট মেয়েটা যতই দামাল দুষ্টু হোক, ওর কান্না শুনলে সুধন্যর বুকটা কেমন করে যেন। ওটার ওপর তাঁর বড় মায়া। ছোট মেয়েটা।

–কী দেখছিলে? শেফালি জিগ্যেস করে ফের।

—দুটো লোক দৌড়ে ট্রেন ধরল, তাই দেখলাম। আজকাল আর দেখার আছেটা কী? যা চোখে পড়ে দেখি।

শেফালি এমনিতে শান্ত মেয়ে। কিন্তু খুব জেদি। রাগিও। তা ছাড়া বাপকে বাপ বলে বিশেষ গ্রাহ্য করে না। বেশি আদর দিলে যা হয়। যারা আদর দেয় তাদের ওজন কমে যায় এদের। কাছে।

শেফালি বিরক্ত হয়ে বলল শোনো, আমাদের বায়োসায়েন্স থেকে মহারাষ্ট্রে পাঠাচ্ছে স্পেসিমেন কালেকশনে। প্রায় কুড়িজনের টিম যাবে।

—ও।

–কলেজ একটা গ্র্যান্ট দিচ্ছে, যাতায়াতের ভাড়া ওরাই দেবে। থাকাখাওয়ার খরচ আমাদের। পার হেড দেড়শো টাকার মতো লাগবে।

—ও। আমাকে সিলেক্ট করেছে।

সুধন্য চুপ করে থাকেন, শোনেন হেমন্তবালা বেড়ালের চোদ্দপুরুষ উদ্ধার করছেন, সেই সঙ্গে বুঁচি আর সুধন্যকেও।

–টাকাটা দেবে বাবা?

–টাকা!

–টাকা মোটে দেড়শো। আচ্ছা, না হয় তুমি আরও কম দিও। একশোতেই আমি চালিয়ে নেব। একটা জায়গায় ঘোরাও হবে।

সুধন্য শ্বাস ফেলেন। দেবেন বইকী! না দিয়ে যাবেন কোথায়! বরাবর দিয়ে আসছেন। বুঁচিটা বড্ড মার খাবে আজ। বেড়ালটা দুটো মাছ নিয়ে গেল, মোট পাঁচটার মধ্যে দুটো। শেফালি একশো টাকার ধাক্কায় ফেলে দিল। বাড়িটায় কত টাকা আটকে আছে। ছেলেও নেই যে ভোগ করবে। কী লম্বা ছুটি চলছে রে বাবা!

নস্যির ডিবেটা কখন কীভাবে হাতে এসে গেল কে জানে! ঠিক ম্যাজিশিয়ানের মতো, কোথাও কিছু না, হঠাৎ হাতে চেয়ে দেখেন, নস্যির ডিবেটা হাসছে।

বড় খুশি হন সুধন্য। ভগবান মঙ্গলময়। সুধন্য পৃথিবী ভুলে নস্যির ডিবের মুখে টোকা মারেন। খুব জোর একটা টিপ নেবেন।

.

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত