‘ওই পাখিজন্মে আমার মুক্তির পথ’ -গৌরব চক্রবর্তী


‘বিবেক তাড়না না দিলে আমি মনে করি, আমার কবিজন্মই বৃথা!’

আজ ২০ এপ্রিল। স্মৃতিতুত মেঘালয়-র কবি গৌরব চক্রবর্তীর জন্মতিথি ইরাবতী পরিবার এই শুভক্ষণে কবি গৌরব চক্রবর্তীকে জানায় জন্মতিথির শুভেচ্ছা।


 

 

কতদিন ধরে না-খাওয়া পেট কতটুকু বেঁচে থাকে
কতবার কত হুমকি-রাঙানি শুনতে হবে যে তাকে
স্বেচ্ছায় যারা নিরুপায় হয়ে বেছে নেয় এই পথ
তাদের ওপরে চাপিয়ে দেবে কি প্রশাসন তার মত?
কী মত? কখন কতটুকু খাবে ওগরাবে কতখানি
কথার এদিক-সেদিক হলেই শুরু হবে মানহানি
বহুকাল বহু বছরের আশা বুকে বেঁধে আগাগোড়া
অনশনে এসে এখন বসেছে– চাকরি পায়নি ওরা
চাকরি তো আছে! শূন্যপদের সিটগুলো আজও খালি
রোজ কত কত অবসর হয়, ভি.আর.এসে জোড়াতালি
নিয়োগের দিন পিছিয়ে চলেছে যেন সে অতীতগামী
অনশনে বসে চেঁচিয়ে বলছে– ‘চাকরি পাইনি আমি’
তবু সে আওয়াজ কানে উঠছে না, দু’চোখে মাপছে সব
ছাব্বিশ দিনে টনক নড়েছে– কেন এত কলরব?
এখুনি থামাও! জনতা জাগলে হিসেবের বাড়াভাতে
ছাই উড়ে এসে মাখামাখি হবে– গদিটা পুড়বে তাতে
সমাধান নয় আপাতত ভয় দেখিয়েই সারো কাজ
সময় শুধু যে নিজেকেই মানে নিজেরই সে মহতাজ
যোগ্যতা আছে অথচ যাদের এখনও চাকরি নেই–
তাদের জন্যে কবিতা লিখছি নিজের লজ্জাতেই
বহুকাল বহু স্বপ্নের আশা বুকে বেঁধে আগাগোড়া
অনশনে কেন এখন বসেছে? চাকরি পায়নি ওরা…

#

 

ঠিক শহরের পায়ে চৌকাঠ
আর ভাঙা মন দেবে কুর্নিশ
রোজ তিস্তাকে দেব পিপাসা
আর আঁচল পাতবে চুর্ণী
ভেজা যানযট ধরে টানবে
কোনও জ্যোৎস্না-মেশানো ক্যানভাস
কত দৃশ্যে রং লাগবে
তবু ভাঙা মন আঁকা যাবে না

আমি পাত পেড়ে খাই কৌশল
শুধু ঝিম-লেগে থাকে দৃশ্যে
ওই দৃশ্য মাফিক গোধূলি
কত স্মৃতিভার নিয়ে মুগ্ধ
জানি যত্নে ছড়ানো কুয়াশা
তার সারা গায়ে রেখে স্পর্শ
ফিরে আসবেই যদি ডাক দিই–
তবু ডাকার রাস্তা খুঁজি না

দেখো, না-বলা কথার প্রান্তে
কত নদী ডুবে যায় মোহনায়
কত মোহনার আমি সন্তান
আমি কত মোহনার জননী
যাও যতদূর যাবে চলে যাও
যাক পথটাও… খুশি যতদূর
তবু তোমারই পথের বাঁকটায়
আমি বসে আছি, আমি যাব না

আমি ছিলাম, আছি, থাকব
আমি তোমারই বুকের চোরাটান
আমি তোমার জোছনা-রাত্রি
আমি রোদ্দুর, সাঁঝ, গোধূলি
দূরে সরে যায় পথ-প্রান্তর
তুমি ফেলে রেখে গেছ ক্যানভাস
আমি নিজেই নিজেকে এঁকেছি–
তবু ভাঙা মন আঁকা যাবে না…

আমি নিজেই নিজেকে এঁকেছি
তবু ভাঙা মন আঁকা যাবে না…

#

#

ফাগুন সন্ধ্যায় তোমার বুক থেকে একটা নদী নেমে গেল হঠাৎ
তোমার আকাঙ্ক্ষার দিকে ভেসে গেল অন্য কারও জ্বেলে দেওয়া দীপ
তুমি ‘বেহেশত’ কল্পনা করে হাত রাখলে ভক্তের গানে
প্রণয় মুদ্রায়
চাঁদসাক্ষী রেখে উড়িয়ে দিলে চুল, কদম্বকবরী
জলের ওপরে ওই ভেসে যাওয়া আলোগুলো দেখেনি তোমাকে
জলের ওপরে ওই ভেসে যাওয়া ডিঙিগুলো চিনতে পারেনি
জলের ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া পাখিগুলো শুধু
তোমার শরীর থেকে সান্ধ্য জহরতটুকু ঠোঁটে করে নিয়ে চলে যায়

আমি কল্পনা করেছি– ওই পাখিজন্মে আমার মুক্তির পথ
কতখানি প্রশস্ত হয়ে আছে
কতটা নাব্য হলে নদী ভেসে যায় কারও প্রার্থনা নিয়ে…
সম্মুখে ছড়িয়ে থাকা এই অনন্তের হাতছানি দেখে ভাবি–
কতদূর চলে গেলে ফিরে দেখা কোনোদিন মিথ্যে হয় না…

#

“শ্রুতস্বর– চোখ এক সুদীর্ঘ বিবৃতি
ধ্বনিপ্রবণতা নিয়ে দেহ ডুবে যায় যে অতলে
বাতাসও সুস্বাদু লাগে, হরিদ্রাভ ঘ্রাণ
অথচ অতল… এই সনাদ প্রতীক্ষাটুকু নাও
শ্রাবণ আসতে আর মাত্র কয়েকটা
দিন বাকি…”

#

“ক্ষমা– এই শব্দটি ওঁত পেতে আছে
হয়ত করাই যায়…
হয়ত করার আগে তবুও আরেকবার ভেবে দেখা ভালো
এখন দুজনের মাঝে ঠান্ডা একটা হাওয়াই চলুক
নীরবতা স্থির হোক, চোখাচোখি বন্ধ হয়ে থাক
যাবৎ সমর্পণ নাহয় ঝুঁকেই থাক অন্য কোনও দিকে

তুমি তবে কার দিকে
তাকাবে ভেবেছ… আর তাকাতে পারোনি
আমিও যে কোনদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে শেষে
হাঁপিয়ে গিয়েছি
অতএব কিছুকাল এইটুকু দূরে থাকা ভালো
দূরত্ব ভরাট করে রাখা থাক শুধু নীরবতা…”

#

 

বিবাহ

কী স্পষ্ট আহ্বানে আমার ঘুমের মধ্যে খেলা করে
গেছ তুমি নীলাভ নীলিমা ধুয়ে, ক্ষত ধুয়ে, পূর্বজন্ম ধুয়ে
শরীরে ফিরেছ ফের– স্নায়ু, রক্ত, অশ্রু নিয়ে ফিরেছ
আবার ফের দাহ হবে বলে! অথচ চিন্তার কথা–
এ জগতে রোগগুলো দাহ করা যায় না কখনও
ব্যর্থতা, বিষাদ আর অনুভূতিগুলো কেউ লুপ্ত করতে কখনও পারেনি
তবু কিছু অনর্গল বর্ণসংস্থাপনে নিজেকে সন্দেহ হতে থাকে
নিজেকে প্রশ্ন করি, প্রশ্নের আড়ালে থাকা বিষটুকু পুনর্বার খাই
আর ভাবি, আমার পর্যাপ্ত ঘুমটুকু খেতে এসে তুমি রোজ
কী স্পষ্ট আহ্বানে শরীরে ফিরেছ ফের– সম্পর্কে ফেরোনি।

 

 

#

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত