মঈন চৌধুরীর কবিতাগুচ্ছ

Reading Time: 5 minutes
আজ ১০ মে কবি,প্রাবন্ধিক,সম্পাদক,প্রকৌশলী,চিত্রশিল্পী মঈন চৌধুরীর জন্মতিথি। ইরাবতী পরিবার তাঁকে জানায় শুভেচ্ছা ও নিরন্তর শুভকামনা।
দুর্যোধনের বোন দুর্যোধনের বোন, তোকে আমি চাইছি মনে মনের কথা শোন,  দুর্যোধনের বোন। আমার মনের গণিতে শুধু ত্রিকোণমিতি আছে এ চিন্তায় যদি আল্ট্রা-নারীবাদের পতাকা তুলে ধর তবে তুমি ভুল করেছ। আমি তোমার কমলা বাগানে কমলা তুলতে চাইনা, কমলা ফুলের রঙে আর নির্যাসে আমার ইতিহাস খুজতে খুজতে আমি ইডেনের ঈভকে পেয়েছিলাম এবং কোন ভণিতা না করেই তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, দোষ ছিল কার ? সে আমাকে বলেছিল X=Z, তার মানে আকাশ আর পাতালে কোন পার্থক্যই নেই যদি মনের নিরব কোটর থেকে চুম্বকের ঐশ্বর্য বিকিরিত হয়। এ সত্য তুমি অবশ্যই জান। কিন্তু সেই বিকিরিত E=mc2 কে তুমি গ্রহণ করনি ভারসাম্যের তাগিদে, তুমি ভেবেছিলে তুমি এবং তুমি শুধুমাত্র নারী, ত্রিকোণমিতির জঞ্জাল। তবে এখনো সময় আছে, তুমি দাড়িয়ে হাত ধর আমরা পাহাড়ের অপর দিকে অবশ্যই যাব আর তারপর একদিন এ্যালজেব্রার কঠিনতম গণিতের সমাধান শেষে বলবো, A=B, C হল ভালবাসা। দুর্যোধনের বোন, ডাকছে সময় শোন, তোকে এবার জাগতে হবে দুর্যোধনের বোন!

    পরমা গণিত বারবার শুধু ভুল হয়ে যায়। পুকুরকে ভাবি দিঘি, শাপলাকে ভাবি পদ্মফুল। নিজেকে চেনার অসম্ভব ব্যার্থতায় নিজেকে হারাই তৃষ্ণার দ্বীপে, কেমন যেন এক অর্থহীন নেশায় শূন্যতাকে তূলে ধরি… ভুল করে ভেঙে ফেলি কুসুম হৃদয় ক্ষত বিক্ষত দেখি কেবল নিজেকে। এভাবে আর কত যাত্রা অজানায় কেন আমি উঠে বসি অন্ধের রথে ? জানা নেই, শুধু জানি গহীনে আমার ভুলের প্রবাহে থাকে পরমা গণিত, এবং নিজেকে চেনার চরম ব্যার্থতায় এ গনিত হঠাৎ পরাবাস্তবে গিয়ে দুর্বোধ্য কবিতা হয়ে যায়।       চন্দ্রগ্রস্থ আজ চাঁদ আছে, চাঁদ আছে, আকাশের চাঁদ আলোর বন্যায় ভেসে যাচ্ছি যে আমি কই ! ওহ্, তাই! তোমার মাঝে বিলিন হচ্ছি বুঝি ? আজ পূর্ণিমা, পূর্ণ তোমাকে পূর্ণ আজ করবই। চাঁদ আছে আজ, আছে চাঁদ, চাঁদ আকাশের চাঁদনী দ্রবণে তীর্থে গিয়েছে তৃষ্ণার ক্রিয়ামুল, চন্দ্রগ্রস্থ আলোর প্লাবনে মিশে গেছি তোমাতে আজ পূর্ণিমা, তবুও তোমাকে পূর্ণিমা বানাবোই। আছে চাঁদ, আকাশের চাঁদ, আছে চাঁদ আজকে প্রমা আলোতে শত বনলতা লাবণ্য নীরারা থাকে, চন্দ্রবিভাতে স্বপ্ন শ্রাবণে প্লাবনে ভেজার পর আমি লুনাটিক হৃদ কল্লোলে, বিশ্বাসে তুমি ধ্রুব।       সমুদ্র কাতর সেদিন ঝড় হয়েছিল রজনীগন্ধা বনে, আজ সুনামিতে রজনী বিফলে যায়। চলে আস ফুল শুকনো বকুল তুমি, জল দিয়ে প্রান দেব সুনামির শেষে ছিন্নভিন্ন আমি। নিশ্বাসে বিশ্বাস রেখে এসে দেখ রাত জেগে বসে আছে ঐ বেলা অবেলার প্রেম, সমুদ্র কাতর, রজনীর শেষে আর তাকেতো পাবেনা।       পিপড়া পিঁপড়েদের কাছে নিয়ম শিখেছি মিষ্টি পেলে আমি ঠোট লাগাবই, কোথায় পালাবে এখন তুমি বল তোমার শরীরী মিঠা ধুলেও যাবেনা। কি করবো আমি, ইনসুলিনে ঘৃণা সমস্ত স্বপ্নে আমার চুম্বকের গঠন, জাগি আমি ইচ্ছে-কাতর অপূর্ণ সময়ে পিপড়ার সুখে আমি তোমাকে নেবই।       পুষ্প একটা পুষ্পকে প্রাণে চাই তাই তাকে বলি,—দাওনা আমাকে ফুল একটা শেফালি কিংবা বকুল যাকে পুষ্পের নামে বুকে তুলে নেব। কততো পেয়েছি সুখ, পৃথিবী আমার তবু চিৎকারে হাহাকারে বলি চাই ফুল একটা বকুল কিংবা শেফালি যে হবে আমার প্রাণ গঙ্গার প্রবাহিত রূপ। আমি বিলীনটা চাই সুগন্ধ বিলাসে রাধিকা বাগান পেড়িয়ে যখন মোহনার পথে তাকিয়ে আছি আকাশের দিকে দুহাত বাড়িয়ে একটা পুষ্প ঝরাও প্রিয়, দাও বুক ভরা সুখ।       আমাবস্যা আমাবস্যায় রাতে আসে চম্পকনগর আকাশে তারা আর জোনাকির সুখ, আমি আর পূর্ণিমা আলোর ফোটনে আকাশে তারা আর জোনাক থাকে না। অন্ধকার চাই আজ, অন্ধকারই চাই সিঙ্গার বিলে এসে থেমে যাও কেন ? আলোর নগ্নতা দেখে বিচলিত হই তারার অন্ধকারে জোনাকি জ্বলুক।       আত্মা আত্মার মতো আজ শূন্যতায় আছি হৃৎপিণ্ডে হাত রেখে পাবে না কিছুই, তৃষ্ণার মরুতে লাল স্বপ্ন সাগরে বৃষ্টির লবনে রাখি জীবন প্রবাহ। চেনো কিনা, এ প্রশ্ন করবোনা আজ ফসিলেই দেখা যাবে ইলিশের নুন, তোমাকে জড়িয়ে নিয়ে তৃপ্ত ধ্রুবক আত্মার মতো আজ শূন্য হয়েছে।       ইতিহাস কতো কথা আজকাল বলতে ইচ্ছে করে আমার সেই স্বপ্নের নদীটা এখন আর নেই, মরা গাঙে লাঙলের ফলা সীতাচিহ্ন আঁকে আর আমি তোমার চিহ্নতে এখনো অমর। কই গেল অই সব পাটপচা সুগন্ধের কাল তুমি তো এখনো ঘাটে রৌদ্রতে ঢাকো স্তন, আমি কোন সময় নিয়ে ধ্রুব অব্যয় হবো সে শুধু তুমিই জান, তুমি প্রনয়ের ইতিহাস।       শিকড় বন্যা তুমি চলে যাবে, কই যাবে তুমি? আমি কি সাগর নই, চেননা আমাকে! আবারো তাকিয়ে দেখ ভাঙনের মুখে পাহাড়ের পাদদেশে ফেলে এলে যাকে। দেখ দেখ, চোখ কই, জলজ প্লাবন? লবনের জলে মিশে হারিয়েছ সব! তাই যদি হয় তবে দুফোটা দিলাম লবন দ্রবণে রেখে করো অনুভব। একদিন ঐ দিনে পাহাড়ের পাশে ঝর্নার পাশে ছিল প্রিয় বৃক্ষের ঘর, হঠাৎ প্লাবনে তুমি নদি হয়ে গেলে আমি আছি ঐ দেখ ওখানে শিকড়।       নরক বন্দনা সম্মুখে আতরের নদী, পরীরা নগ্ন হয়ে হেসে আমাকে তুলে দিচ্ছে নেশার মাতাল সুখ, সারাদিন বসে থাকি, শুয়ে থাকি, শুয়ে থাকি পরী আর মদ, সুগন্ধি জল, ভালতো লাগেনা। নাহ্, বোর হয়ে গেছি, আমি নরকেই যাব পৃথিবীতে থেকে নরকের স্বাদ পরাণে গেথেছি, হও তুমি আগুনের হুরী, পোড়াও আমাকে নরকেই যাবো, যন্ত্রণা সহ তুমিই আমার।       চক্রান্ত দশচক্রে ভগবান ভুত, এ কথা জেনে একই চক্রে হয়ে গেলাম ভুতেরও বাপ, এ চক্রান্ত কার ছিল জানিনা কিছুই গহীনে নিশ্চয় ছিল শত্রু বিভীষণ। কি নিয়ে চক্র ছিল জানিনাতো তাহা তবে প্রেম যৌনতা ছিল প্রিয় এজেন্ডা, এর মাঝে তুমি এলে বাগান সাজিয়ে ফুল চুরির অভিযোগে দণ্ড দিল রাজা। মন শত্রু বিভীষণ, হৃৎপিণ্ড আরকে কি নেশা জাগাইলে ত্রিভুজের দেবী, তব চক্রে বিসর্জনে সর্বভূত বিস্মরণে তীর্থের রাজা হই, তুমি হইলা রানী।       বৃষ্টি বুকের ভেতর জলকোলাহল, আগুন লেগেছে বাষ্পগুলোর আকাশ নেই, কই যে যাবে তারা ! মেঘগুলো সব বৃষ্টি হবে বুকের ভেতর তবে দেখবে না কেউ, তুমিও না, থাকো না সুন্দরে। ফুলগুলোকে পাঠিয়ে দেব ? বৃক্ষ সহ নিও আমিতো আর মুখোশ পরে বাগান করবো না, ভেতর আমার আগুন মেখে বৃষ্টি নিয়েছে সময় এখন তোমার পাশে, নষ্ট করোনা।       শেষ চিঠি আমি কাঁদতে কাঁদতে এ চিঠি লিখছি এ আমার শেষ চিঠি তোমার কাছে, আবারো তোমার দ্বারে ভিক্ষুক হবো এমন চিন্তা তুমি আর কখনো করোনা। গাজাতে কি করছ তুমি, চোখ খুলে দেখ আমার সন্তান ওখানে মরে পাখির মতন, পরকালে তুমি করবে এর চূড়ান্ত বিচার এমন ভাঁওতাবাজিতে আর বিশ্বাস রাখিনা। তোমার কসম আর কিতাবের কসম আমি উত্তর চাই আজ, তোমাকেই চাই, বল, তোমার রাজ্যতে কেন এত লাশ বান্দা বানিয়ে রেখে নাও মৃত্যুতে সুখ ! এ আমার শেষ চিঠি, এখনো সময় আছে গাজাতে আমি আর গুণতে চাই না লাশ, আমি বিশ্বাস রেখে বলি চূড়ান্ত আবেগে আর একটা লাশ পেলে বিশ্বাস তুলে নেব।       নন্দনতত্ত্ব বিখ্যাত কবিরা সব দূরদেশে নন্দনকাননে থাকেন এ সত্য জানার পর আমার ইচ্ছে হয় মেরাজে যাই, কিন্তু পঙ্খিরাজ ঘোড়ার হ্রেষাধ্বনি বাস্তবে যখনই শুনি কেমন যেন এক দুশ্চিন্তায় আঁকাবাঁকা হই আমি। চারদিকে দেখি, আমগাছ, বাঁশঝাড়, গাংনির বিলে, বট গাছে, কাঁঠাল বাগানে নান্দনিক তত্ত্বরা ঝোলে, নিজেকেও মনে হয় জলজ সত্তায় কবিতাগ্রস্থ প্রেমী কতো আর ক্ষুধা থাকে কবিতাময় মধুমালার দেশে ? রিমোট কন্ট্রোলে আজকাল ডিজিটাল চুম্বন দেয়া যায় দূরে থেকে কাছে আনা যায় সমেহনের তান্ত্রিক মজা, হাততালি দিয়ে দূরবর্তী কবিকে বলি বাহারে বাহা ! প্রানে আঁকি সবুজ প্রনয়ে আলো জ্বলা জোনাকির সুখ।       ভাস্কর সেদিন সৃষ্টি এসেছিল প্রিয় ঐ বৃক্ষের নিচে উড়ছিল চুল তার বাতাসে, ঢাকা ছিল মুখ, ইলোরা দেখিনি আমি, বিব্রত হয়ে তাই স্বপ্নকে জড়ো করে আমি এক পাথর বানাই। তারপর শুরু করি মনোজাত খোদাইয়ের কাজ চুলগুলো আঁকলাম কেটে ঐ পাথরের দেহ, কিছু কালো আঁধারের টুকরো রাখলাম সাজিয়ে সবই যদি দেখা যায় চশমায়,কবিতা কোথায়? আঁকা হল খোদাইয়ে পাহাড়ের পাদদেশ-চিত্র সমতট পেড়িয়ে স্বপ্নরা চলে গেল মোহনায়, আঁকা হল ভেনাসের জ্যামিতিক তীর্থের আদলে সৃষ্টির সুন্দরে প্রকাশিত স্বর্গের চিত্রিত বিম্ব। তারপর দেখি এক বিপরীত পুরুষের তৃষ্ণা নগ্ন আদিম গন্দম-ইচ্ছাতে বৃক্ষের তলে এসে অঙ্কিত দেবীরূপ নারীতেই কামনা খুঁজছে, ইলোরা সব বুঝে হেসে বলে আমি তবে কার? আমার কবিতা সেতো, পাথরে খোদাই মেয়ে সৃষ্টিতে আমি আছি, ভালবাসা লিখেছে পাথর, তবু কি পুরুষ তার পৌরুষে, প্রাকৃতিক রসে, তুলে নেবে ইলোরাকে, যে ছিল শুধুই আমার ?        

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>