প্রত্যেকটা উপন্যাসই আত্মজৈবনিকঃ নলিনী বেরা

বাংলা সাহিত্যে নলিনী বেরা আজ একজন জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক। সম্প্রতি আমার সৌভাগ্য হয়েছিল তাঁর সঙ্গে দুর্লভ কিছু মুহূর্ত অতিবাহিত করার। টেলিফোনের মাধ্যমে দেখা করার সময়টা ঠিক করে নিয়েছিলাম। নির্দিষ্ট দিনে অনেকক্ষণ ধরে কফি হাউসে অপেক্ষা করার পর তিনি এলেন। প্রণাম করলাম। প্রাথমিক কথাবার্তার পর তিনি আমার যাবতীয় জিজ্ঞাসার যথাসম্ভব নিরসন করলেন। খুব ভালো লাগল। ভীষণ ভালোমানুষ তিনি। লেখকোচিত বিনয় এবং ঔদার্য দুইই তাঁর সহজাত। সাক্ষাৎকারের পর কফি আর টোস্ট খেতে খেতে শুরু হল আলাপচারিতা। তাঁর শৈশব, জন্মস্থান সুবর্ণরেখা নদীতীরে জঙ্গলাকীর্ণ বাছুরখোঁয়াড় গ্রাম, লোকায়ত মানুষ, তাদের ভালোবাসা, ভূ-প্রকৃতি। তাঁর মুখে শোনা একটি গল্প, না ঠিক গল্প নয়, তাঁর জীবনের এক নির্মম বাস্তব অভিজ্ঞতা, যা এই প্রসঙ্গে না বললে আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
নলিনীদার দিদি ওই গ্রামের এক আদিবাসী রমণীর সঙ্গে ‘সই’ পাতিয়ে ছিলেন। সেই সূত্রে সেই রমণীকেও নলিনীদা ‘দিদি’ বলেই সম্বোধন করতেন। নলিনীদার দিদির বিয়ে হয়ে যাবার পর সেই আদিবাসী রমণীরও বিয়ে হয়ে যায়। এর কিছুকাল পর ওই রমণীর স্বামীর পায়ে পক্ষাঘাত হয়। ডাক্তারে খালি পায়ে চলতে নিষেধ করে। চটি জুতো কেনার মতো অর্থ ওই পরিবারের কাছে না থাকায় বাধ্য হয়ে ওই নারী নলিনীদাকে একজোড়া চটি কিনে দিতে বলে। কিন্তু সেসময় নলিনীদার আর্থিক স্বচ্ছলতা না থাকায় বহু কষ্টে একজোড়া চটি এনে দেয়। কিন্তু সেই দিদিকে তিনি বলেন যে ‘দিদি আর কখনও তুমি আমার কাছে কিছু চেওনা।’
ইতিমধ্যেই ওই নারীর স্বামী মারা যায়। তাকে ওই চটিজোড়া পায়ে দিতেও হয় না। তার আগেই ওনার মৃত্যু হয়। নলিনীদা খবর পেয়ে ওই দিদির বাড়ি ছুটে যান। তখন দিদি কাঁদতে কাঁদতে ওই চটিজোড়া কাপড়ের আবেষ্টনি থেকে খুলতে শুরু করেন। খুলছেতো খুলছেই। নলিনীদার মনে হয়, এ তো শুধু কাপড়ের আবেষ্টনি নয়, এ যেন আদিম অনার্য সভ্যতার ইতিহাস প্রতিটি পরতে পরতে উন্মোচিত হচ্ছে।

কিছু সময়ের জন্য কফিহাউসের কোলাহল যেন মুছে গিয়েছিল। আমিও যেন চোখের সামনে এই দৃশ্য অভিনীত হতে দেখছিলাম। কখন যে কফি শেষ হয়ে গেছে বুঝতেই পারিনি। আবার তাঁর মূল্যবান সময় অপচয় করার অনুমতি নিয়ে বিদায় নিলাম।
— অন্তরা চৌধুরী, গবেষক, বাংলা সাহিত্য।


অন্তরাঃ আপনার উপন্যাসে যে লোকউপাদানগুলি ব্যবহৃত হয়েছে সেগুলি কি সরাসরি মাটি থেকে নেওয়া হয়েছে, নাকি তাতে কিছু কল্পনার মিশ্রণ আছে?

নলিনী বেরাঃ লোকউপাদান বিশেষত আমি যেগুলো ব্যবহার করি সেগুলো আমি যেখানে জন্মেছি, সেই স্থানটি হল সুবর্ণরেখা নদীর দক্ষিণ তীরবর্তী অঞ্চলটা এবং এটা উড়িষ্যা সংলগ্ন। এর মধ্যবর্তী অঞ্চল মূলত ‘শবরচরিত’ উপন্যাসের আধার। এই অঞ্চলের যে সমস্ত লোধা, শবর সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করত মূলত তাদের জীবনকে আধার করেই এই উপন্যাস। ফলে এখানে যে সমস্ত লোকউপাদান ব্যবহার করা হয়েছে, সেগুলি বিশেষ করে তাদের যে মিথ, জীবনযাপন, তাঁদের দৈনন্দিন সংগ্রাম, তাদের মধ্যে উচ্চবর্ণের মানুষ যারা আছে তাঁদের সঙ্গে এই সমস্ত মানুষের সংঘর্ষ কখনো প্রত্যক্ষে চলে আসে, কখনো পরক্ষে চলে। কিন্তু একটা দ্বন্দ্ব দুই দলের মধ্যে চলে। ফলে এইগুলো আমি একেবারেই ছেলেবেলা থেকে নিজের চোখে দেখে আসছি, এমনকি তাদের যে ছেলেমেয়েরা, যারা বিশেষ করে ছেলেরা তারা আমার সঙ্গে খেলাধুলা করত। ফুটবল খেলতাম একসঙ্গে। ওদের গ্রাম এবং আমাদের গ্রাম দুটোই প্রায় জঙ্গলের মধ্যে। ফলে ওরা আমাদের প্রতিবেশী শুধু নয়, একর্থে ওরা আমাদের আত্মীয়-পরিজনের মধ্যে পড়ে। ফলে এই উপাদানগুলো আমাকে খুব একটা বানাতে হয়না। কিন্তু যে কোনো রচনায়, সে যত বাস্তবই হোক, রচনাকারকে যখন কোনো রচনা করতে হয় ,সে আখ্যানই হোক আর উপন্যাসই হোক, তখন শুধু মাত্র রূঢ় বাস্তব দিয়ে উপন্যাসটা তৈরি হয় না; সেখানে কিছু কল্পনাও থাকে। তবে মিথগুলো তো আর কল্পনা করা যায় না। মিথগুলো যা প্রচলিত থাকে সেটাকে অবিকৃত ভাবেই তুলে আনতে হয়, যে লোকউপাদানগুলো আমার গল্প উপন্যাসে ব্যবহৃত হয় তা প্রকৃত প্রস্তাবে সত্য এবং বাস্তবিক।

অন্তরাঃ এই ধরণের উপন্যাস লেখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলেন কেন?

নলিনী বেরাঃ যে কোনো লেখকের, সে আমাদের বাংলা সাহিত্য বা ভারতীয় সাহিত্যে, বা শুধু ভারতীয় কেন, বিদেশী সাহিত্যে, বিশেষত লাতিন আমেরিকার সাহিত্য যাকে বর্তমান পৃথিবীতে ‘concern of litureture’ বলা হচ্ছে, সমস্ত উপন্যাসগুলো যদি দেখা যায়, তার আখড়া বা ধরণ-ধারণ যদি সেভাবে অধ্যয়ন বা অনুধাবন করা যায়, তাহলে দেখা যাবে যে প্রত্যেকটি লেখকই তাঁর নিজস্ব একটা ভুবন তৈরি করেন। তারই নিজস্ব একটা ভুবন, যে ভুবনে চরিত্রগুলো ঘোরাফেরা করে, সেগুলো তাঁরই জীবনের প্রতিরূপ। যখন সেগুলো তিনি লিখছেন তখন তাঁরই নিজস্ব ভুবন মনে হচ্ছে। কিন্তু যখন ছাপা হয়ে বেরিয়ে যায় তখন সেটাতে অনেকেই তার সঙ্গে অংশীদার হয়। কিন্তু গোড়া থেকেই একজন লেখক তাঁর জীবনকে জড়িয়ে রাখেন ঐ ভুবনে। কারণ তিনি যে দৃষ্টিতে যে ভঙ্গীতে দেখছেন সেটাই তাঁর লেখালিখিতে উঠে আসে, ফলে এই জীবনটা তিনি দেখেছেন। সেই ভাবে তিনি তাঁর ভুবনটাকে তৈরি করেছেন। সুতরাং প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে লেখকের জীবন তাতে জড়িয়ে থাকে। একটা কথাই আছে যে লেখক তাঁর নিজেকেই লেখেন। অর্থাৎ তাঁর জীবনকেই তিনি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বারবার একাধিক উপন্যাসে বিভিন্ন আদলে বিভিন্ন ভঙ্গিতে লেখেন বটে। কিন্তু যেন নিজেকেই লেখেন।

অন্তরাঃ আপনার উপন্যাসে আত্মউপাদান কতটা উঠে এসেছে?

নলিনী বেরাঃ প্রত্যেকটা উপন্যাসই আত্মজৈবনিক। উপন্যাসে আত্মউপাদানতো আছেই। যেমন কখনো নায়কের সঙ্গেই তিনি নিজেকে মিলিয়ে নিয়েছেন। কখনো মেয়ের চরিত্রে নিজেকে মিলিয়ে দিয়েছেন। কারণ এই সব চরিত্রের প্রতি তাঁর একটা দরদ বা সংবেদনশীলতা থাকে বলে সেটা লিখতে প্রেরণা দিয়েছে। সেই মানুষটার প্রতি যদি তার একটা সহমর্মিতা, আন্তরিক আগ্রহ না জন্মায় তাহলে সে লিখতেই পারবে না।

অন্তরাঃ প্রচলিত উপন্যাসের থেকে লোকউপাদান কেন্দ্রিক উপন্যাস সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেক্ষেত্রে এই জাতীয় উপন্যাস লেখার ব্যাপারে কি কোথাও লোকজ উপাদানের প্রতি কোনো সহমর্মিতা কাজ করেছে?

নলিনী বেরাঃ এইটা কিন্তু ঠিক নয়। লোকউপন্যাস বলে কোন উপন্যাস হয় না, লোকগল্পও কখনো হয় না। আসলে যে কোন উপন্যাস বা গল্প সে তো জীবনকে আধার করে লেখা। সেই জীবনটা উদাহরণ। লেখক যেখানে জন্মেছে সেই জায়গাটা লোকায়ত হতে পারে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে মানুষগুলো ‘লোক’। আমাদের বাংলা সাহিত্যে যত উপন্যাস আছে, সব উপন্যাসগুলোর চরিত্র বিশেষত বিভূতি, তারাশঙ্কর, মাণিক এদের ‘পথের পাঁচালী’ বা অদ্বৈত মল্লবর্মণের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ এগুলো কোনোভাবেই লোকউপন্যাস আমরা বলতে পারি না। কিন্তু এই উপন্যাসের মধ্যে যাদেরকে আধার করা হয়েছে, এরা হয়তো ওখানকার স্থানীয় মানুষ, তারা লোকায়ত হতে পারে। লোকায়ত অর্থাৎ কোলকাতাও তো একটা লোক, এখানকার মানুষের জীবনকে নিয়ে লেখা উপন্যাস সেটা লোক হতে যাবে কেন? সুতরাং লোকউপন্যাস বলে কিছু হয় না। লেখক যেখানে জন্মেছেন, যেমন আমি যদি আমেরিকায় জন্মাতাম তাহলে সেখানের প্রেক্ষাপট ও মানুষদের নিয়ে লিখতাম। আমি যেখানে জন্মেছি ও যাদের দেখেছি, তাদেরকে নিয়েই তো আমার উপন্যাস লেখা। আমাদের আগেও তারাশঙ্করের ‘হাসুলী বাঁকের উপকথা’ বা মাণিকের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ অদ্বৈত মল্লবর্মণের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’, সমরেশ বসুর ‘গঙ্গা’ বা সতীনাথ ভাদুড়ীর ‘ঢোড়াই চরিত মানস’ বা অমিয়ভূষণ মজুমদারের ‘গড় শ্রীখণ্ড’ প্রভৃতি উপন্যাসে লোকজ উপাদান থাকলে উপন্যাসগুলো কখনোই লোকউপন্যাস বা প্রান্তিক হয়ে যাচ্ছেনা। উপন্যাস উপন্যাসই থাকছে। যেমন বিদেশী কোনো সাহিত্যকে ধরো গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের ‘ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ারস অফ সলিটিউড’-এ শতাব্দীর নিঃসঙ্গতা ফুটে উঠেছে, এটাওতো লোকজ উপাদানকে নিয়েই লেখা। মাকন্দ বলে একটা শহরে তাঁর নিজস্ব যে পরিবার যেভাবে যেভাবে জীবনযাপন করে এসেছে, তার সমস্ত মিথ, মিথোলজি, মিথোপোন্যাস নিয়েই সেই উপন্যাসটা লিখেছেন, এবং তিনি যে আদলে লিখেছেন আমরা এখানকার সমালোচকেরা বা ওখানকার সমালোচকেরা একে ম্যাজিক রিয়ালিজম বা যাদুবাস্তবতা বলব।

অন্তরাঃ আপনাদের পূর্বসুরী অর্থাৎ তারাশঙ্কর, মাণিক, বিভূতিভূষন বা সতীনাথ ভাদুড়ীর লেখা উপন্যাসের সঙ্গে আপনাদের উপন্যাসের পার্থক্য কোথায়?

নলিনী বেরাঃ যে কোন লেখক তাঁর সময় দেশকালকে ধরে। তাঁরা যে সময় উপন্যাস লিখেছেন সেই সময় দেশকালের পরিস্থিতি যা ছিল সেগুলোই তাঁরা তাঁদের উপন্যাসে ব্যবহার করেছেন। এবার আমরা যে দেশকালের কথা লিখছি সেই দেশকাল আগেকার দেশকালের থেকে অন্যরকম পরিবর্তন হতেই পারে, কারণ এর মধ্যে অনেক জল গড়িয়ে গেছে সময়ের। এই সময়ে দেশকালের পরিবির্তনের ফলে এটাই হয়েছে, তাঁরা তাদের সময় জীবন বা কালকে যেমন দেখেছেন, তেমন ভাবেই উপস্থাপন করেছেন, আর অন্য কিছু নয়।

অন্তরাঃ এই উপন্যাসের মাধ্যমে আপনারা পাঠক বা সমাজকে বিশেষ কোনো বার্তা দিতে চেয়েছেন কি?

নলিনী বেরাঃ যে কোনো লেখাতেই ঔপন্যাসিকের একটা জীবনবোধ থাকে, যেটাকে জীবনবীক্ষা বলা হয়। এটা লেখক তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতা, জীবনযাপন্ন থেকে সংগ্রহ করেন। সেটাই তাঁর লেখার মধ্য দিয়ে আসে। বার্তা তো একটা যায়ই। সেটা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটা বার্তা বা মেসেজ থাকে। সে লেখকের জ্ঞাতসারেই হোক বা অজ্ঞাতসারে। তাঁর লেখার মধ্যে একটা বার্তা থেকেই যায়, যাতে পরবর্তী সময়কাল সেটাকে উদ্ধার করতে পারে। এর মধ্যে থেকেও লেখকের একটা স্বাতন্ত্র্য বোধ কাজ করে। লেখক হয়তো জানেন না যে এই ভেবে তিনি লিখেছেন, অর্থাৎ উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে কোনো লেখা হয় না। আর কোনো প্রশ্ন আছে?(হেসে)]

অন্তরাঃ না না। আর কোনো প্রশ্ন আপাতত নেই আমার।

নলিনী বেরাঃ থাকলে ভবিষ্যতে জানিও। উত্তর দেবার যথা সম্ভব চেষ্টা করব।

স্থান- কফিহাউস
সময়-সন্ধ্যে ৬ টা

২৫/৩/২০১৪

( সাক্ষাৎকারটি ‘দ্বৈপায়ন’- এর বইমেলা সংখ্যা-২০১৫ তে প্রকাশিত।)

.

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত