হিরো

অনবরত ঝরছে বৃষ্টি।চারদিকে থৈ থৈ জল।খেত খামার, বস্তি ভেসে গ্যাছে এই বন্যার জলে। সর্বান্ত হারা মানুষ, জলের তাড়া খেয়ে আশ্রয় নিয়েছে এই বিশাল এলাকার একমাত্র বেড়িবাধের ওপর।মাথার ওপর খোলা আকাশ বৃষ্টি থামার কোন লক্ষণ নেই যেন! জলের গতি ক্রমশ বেড়েই চলেছে।ঝড় আর বৃষ্টিতে মানুষগুলো শ্বাস নিতে বড় কষ্ট হচ্ছে। একমাত্র আশ্রয়স্থল এই একটি বেড়িবাঁধ।এখানে আশ্রয় নেয়া মানুষের জায়গা যেমন কম,তেমনি আশ্রিত মানুষের তুলনায় সাহায্যের পরিমাণ ও অপর্যাপ্ত।

মাঝে মধ্যে হ্যালিকাপ্টারে করে ছোট ছোট কিছু খাবারের প্যাকেটআসে। যা তুলনায় অনেক কম। তাছাড়া ভিড়ের মধ্যে হুড়মুড় করার কারণে অনেকেই বঞ্চিত হয়। বেড়ি বাঁধের ওপর ; যে,যেভাবে পারছে নিজের জায়গা করার চেষ্টাকরছে। কেউ কেউ পলিথিন দিয়ে মাথার ওপর ছাদবানাবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। শিশুরা তাদেরমত করে খেলার চেষ্টা করছে।

সকালে প্রথম যে সাহায্য এসেছে,তা থেকে যারা সংগ্রহ করতে পেরেছে; কেউ কেউরান্না করার চেষ্টায় ব্যাস্ত। গত দু’দিন বড় কষ্টে গ্যেছে।কোনও সাহায্য আসেনি। আজ সকালে হ্যালিকাপ্টারথেকে যখন নিচের দিকে খাবারের প্যাকেট ফেলাহয়েছিলো; সবাই প্যাকেট ধরতে লাফালাফি করছিলো,নারী পুরুষ ছোট বড় সবাই। ক্ষুধার কাছেসবকিছুই ঝাপসা হয়ে যায়। কারও কোনও দিকে খেয়াল থাকে না। লাফালাফিতে হিরো ও এসেছে। বড়দের মতলাফিয়ে প্যাকেট ধরার অনেক চেষ্ঠা করছে। ব্যার্থ হয়েছেবার বার। একসময় ভিড়ের ভেতর একটি প্যাকেটি নিচেপড়ে যায়। আর হিরো সে প্যাকেট পেয়ে যায়।তার চোখেমুখে খুশিতে ফুলে ওঠে।হিরো। পুরোনাম বেলাল আহমদ। বয়স এগারো। তার ছোট এক ভাই আছে। নাম হেলাল  আহমদ। বয়স ছয়-সাত বছর হবে। বন্যার আগে যখন তারা বস্তিতে ছিলো; তখন হিরো লুকিয়ে লুকিয়ে ছলিম ব্যাপারির বাসায়টেলিভিশন দেখতো। একদিন জ্যাকি শ্রফের অভিনিতহিন্দি ছবি ‘হিরো’ দ্যেখে।এরপর একটা রুমাল গলায়জড়িয়ে তার ভাই হেলাল ও হেলালের বয়সি সবাইকে ডেকে এনে বলে,এই সবাই শোনো ; তোমরা সবাইআমাকে আজ থেকে হিরো বলে ডাকবা। হিরোর কথাশোনে ভাঙ্গা দাঁত বের করে হেলাল সহ সবাই খিল খিলকরে হেসে ওঠে। বেলাল উরফে হিরো হেলালকে ক্যারাটেষ্টাইলে,চাইনিজ ভাষায় ইয়া-উঁ বলে হাত পা নাড়াতেথাকে।সেই থেকে বেলাল হোসেন তাদের হিরো। হিরোওরিলিফের ঐ প্যাকেট মা’কে দিয়ে বলল মা,একটু জলদিকরে রান্না করোনা,অনেকদিন হলো পেট ভরে খাইনি।

কোথাও থেকে তিনটুকরো আধলা ইটেরও ব্যবস্থাও  করেদিয়েছে। মা, জলে ভেসে আসা গাছের আধভেজা ডালেআগুন ধরানোর ব্যার্থ চেষ্টা অব্যাহত রাখলেন।হিরো যখন খাবারের প্যাকেট নিয়ে আসে এবং কায়দা করে যখন মার হাতে দ্যায়, সে দৃশ্য দেখে সে যেন সত্যিকারের হিরো এটা তার ভাই হেলাল বিশ্বাস করতে শুরু করে।জল এখন বাঁধের ছাদ ছুঁই ছুই।

আশ্রিত মানুষের উৎকণ্ঠাবেড়েই চলেছে। হঠাৎ করে দুর থেকে হ্যালিকাপ্টারের আওয়াজ শোনা গ্যালো। সকলের কান খাড়া হলো। হয়ত খাবার নিয়ে আসছে। সাহায্য নিয়ে আসছে। সবাই আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। আজ সকালে বন্যা কবলিত মানুষের বিপন্ন জীবন নিয়ে একটি প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে জরুরী ভিত্তিতে আবার খাবার নিয়ে একটি হ্যালিকাপ্টার আসছে।ধীরে ধীরে আওয়াজ স্পষ্ট হতে লাগলো। সবাই সবকিছু ফেলে আকাশের দিকে তাকাচ্ছে। হ্যালিকাপ্টারটি অনেকটা নিচে এলে,সবাই জড় হতে লাগলো। ভীড়ের ভেতর হ্যালিকাপ্টার থেকে খাবারের প্যাকেট নিচে ছুঁড়া হলে;  সকলের হাত উপরদিকে তুলে খাবারের প্যাকেট ক্রিকেট বলের মত ধরারচেষ্ঠা করতে লাগলো। কার ঠেলায় কে কোথায় পড়ছে কোনো খেয়াল নেই কারোর। হিরো আর তার ভাই হেলালমার পাশে বসা ছিল।হিরো বল্লঃ মা, রান্না শেষ করো।আমি আরও কিছু নিয়ে আসি বলে দৌড় দিয়ে গেলো ভিড়ের কাছে।  চিপায় চাপায় ঠেলা ধক্কা দিয়ে ভিড়ের ভেতর চলে এলো। সবার মতো সে ও লাফিয়ে লাফিয়ে খাবারের প্যাকেট ধরার ব্যর্থ চেষ্ঠা করছে।প্যাকেট নিচে এলেই কাড়া-কাড়ি শুরু হয়। কারও প্রতি কারোরই কানো খেয়াল নেই।একসময় হ্যালিকাপ্টার চলে যায়। যার ভাগ্যে যা জুটেছে তাই নিয়ে সবাই ফিরে যায় । যারা বেশি ধরতে পেরেছে,তাদের মুখে কিছুটা স্বস্তি দেখা যাচ্ছে।নিভু নিভু আগুনে চাল ডাল স্বেদ্ধ করেছেন হিরোর মা।অপেক্ষা করছেন হিরোর।দুই ছেলেকে নিয়ে খাবেন। সবাই ফিরে এসেছে কিন্তু হিরো এখনও ফিরেনি। মাহেলালকে বললেন যা’তো তোদের হিরোকে ডেকে নিয়াআয়।খাবার হয়ে গ্যাছে। মা’র কথায় হেলাল হিরোকেডাকে। কিন্তু কোথাও হিরোকে খোঁজে পাওয়া গেলো না।মা ডাকাডাকি করতে লাগলেন। কিন্তু কোনো সাড়া নেই।হেলাল আর তার মায়ের ডাকা-ডাকিতে বাঁধের উপর সবাই জড় হয়ে হিরোকে খোঁজতে লাগলো।হিরোর বয়সি কালাম বল্ল,হিরোকে খাবারের প্যাকেটের জন্য লাফাতে দেখেছে। সবাই  বাঁধের ঐ জায়গায় গিয়ে হিরোকে খোঁজলেন যেখানে, কিছু সময় আগে হ্যালিকাপ্টার ত্রাণ দিতে এসেছিলো।হঠাৎ হেলাল চিৎকার করে বলে, ওই যে আমাদের হিরো।হাত দিয়ে দেখায়। সবাই ঐ দিকে তাকান। দেখেন-  জলের ওপর উপুড় হয়ে ভাসছে হিরোর নিথর দেহ।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত