কবিতা ভাবনা ও একগুচ্ছ কবিতা

 


৩ মে কবি সাংবাদিক হিজল জোবায়েরের জন্মতিথি। ইরাবতী পরিবার কবিকে জানায় শুভেচ্ছা ও নিরন্তর শুভকামনা। পাঠকদের জন্য রইল কবির কবিতা ভাবনা ও একগুচ্ছ কবিতা তাঁর জন্মতিথির শুভক্ষণে।


কবিতা-ভাবনা

প্রতীকের দুনিয়া থেকে, মিথের দুনিয়া থেকে মানুষের মুক্তি নাই

মাস্টার ফিল্মমেকার গদারের ক্রিটিক্যাল রাইটিং ‘গদার অন গদার’র ইন্ট্রোডাকশনে ফিল্মক্রিটিক রিচার্ড রৌড মাস্টার অব মাস্টার বোরহেস’র একটা গল্পের প্রসঙ্গ টেনেছিলেন, সেটা গদারের খুব পছন্দের গল্প বলে জানা যায়।

গল্পটা হলো-
একবার এক লোকে নিজের একটা দুনিয়া বানাবার বাসনা করল, এবং সে একে একে বাড়িঘর, প্রান্তর, উপত্যকা, নদী, মাছ, প্রেমিক প্রেমিকা, দম্পতি অনেক কিছু বানিয়েই চললো; এবং জীবনসায়াহ্নে পৌঁছে খেয়াল করলো যে, অধ্যবসায়ের এই দীর্ঘ-বিস্তৃত গোলকধাঁধা আসলে আর কিছুই নয়- তার নিজেরই প্রতিকৃতি ছাড়া।

এই গল্পটার অনেক অনেক রেফারেন্স নানান মিথে, ধর্মগ্রন্থে আছে নানান ভাবে, নানান রকম প্রতীকে, বয়ানে। এই বিশেষ গল্পটার বয়ান, প্রতীক থেকেও অনেক প্রকারের অর্থ উদ্ধার করার সম্ভাবনা হাজির, এমনকি পরস্পরবিরোধী বক্তব্য উদ্ধারও সম্ভব। আমি সেসবে এই মুহূর্তে আগ্রহী নই।

ধান ভানতে শিবের গীতের মতন একটা কথা বলবার ইচ্ছা দমন করা গেল না যে, গদারের এই বিশেষ গল্পটা  অতি পছন্দ; যেই গদার কিনা একটা বই লিখেছে ‘গদার অন গদার’, অর্থাৎ গদার নিজেও বোরহেসের গল্পের লোকটা হিসেবে নিজেকে চিহ্নিত করেছে যেন সচেতনভাবে, কেননা গদার জানে গদার অন গদার নামকরণ না হলেও গদারের কাজ আসলে গদারই। তারপরেও এমন নামকরণের একটা প্রত্যক্ষ সংযোগসূত্র খুঁজে পাই আমরা এখানে। সেই সংযোগসূত্র খুঁজে পেতে আমাদের সাহায্য করে রিচার্ড রৌড, বইটির ইন্ট্রোডাকশনে। সে যেন ইশারায় দেখিয়ে দেয় কি করে একটি বইয়ের নাম হয় ‘গদার অন গদার’। আর কি আশ্চর্য গদারের নামের শুরুটা! যা কিনা শুরু হয়েছে God দিয়ে।

বোরহেসের গল্পের ঐ লোকটি কি ঈশ্বর নিজেই নন!? এই বিশাল ব্রহ্মাণ্ড কি সেই পরমেরই প্রতিকৃতি নয়?

আমার লেখাও তাহলে আমারই প্রতিকৃতি?

আমি সে ব্যাপারে এক জবাবদিহিতামূলক সংশয় জারি রাখতে চাই নিজের ভেতর। কেননা ‘আমি’ খুঁজে পাবার চেয়ে দুষ্কর কিছু নেই। ফলে, আমি নির্দ্বিধায় ঘোষণা করতে পারি না, আমার লেখাই আমি। সে ব্যাপারে কথা বলার ইচ্ছাও আমি আর রাখছি না।

আমি এই গল্পটা থেকে বরং আরেকটা বিষয় খুঁড়ে বের করতে আগ্রহী। সেটা ‘আত্ম-প্রতিকৃতির’ গল্প না। একটু দূরে সরে গিয়ে বরং সেটা এক্সপ্রেশন আর ইম্প্রেশনের গল্প। এই অপার ব্রহ্মাণ্ড যদি পরমের প্রতিকৃতি হয়, তাহলে এ আসলে পরমের সৃষ্টি বাসনা তার মনে যেই ইম্প্রেশন তৈরি করেছিল, তারই এক্সপ্রেশন। এই জগত-সংসার, দেখা-অদেখা, হাসি-কান্না, বালুকণা থেকে মহাসমুদ্র সব কেবলই এক মহান ইম্প্রেশন থেকে উদ্ভূত; আরেক মহান এক্সপ্রেশনে যার পরিণতি। আমি এই এক্সপ্রেশন দেখি আর সেটা আমার মধ্যে যে বাসনার ইম্প্রেশন তৈরি করে আমি আবার তাকে এক্সপ্রেস করি। সেই এক্সপ্রেশন আবার কোথাও যেয়ে ইম্প্রেশন তৈরি করে হয়তো। এই সূত্র দিয়েই আমি জগত বাঁধা দেখি, সসীমে অসীমে দেখি এক অপার চলাচল। ইম্প্রেশন রুপান্তরিত হচ্ছে এক্সপ্রেশনে, এক্সপ্রেশন রুপান্তরিত হচ্ছে ইম্প্রেশনে এভাবে আবার আবার বারবারেবার…

আর এই বদল, এই রুপান্তর ভেঙে দিচ্ছে মানুষের ভাষার গরিমা… ক্রমধাবমান শুধু এক পরমা ভাষা…

মানুষের স্মৃতি কখনও কখনও অনুভবে উপলব্ধিতে সেই ভাষার কিছুবা আঁচ করতে পারে ভাগ্যাহত মোজেসের মতন, আর তখনই মূর্ছা আসে, আসে বিস্মৃতি, জ্বলে পুড়ে যায় তুর পাহাড়, সুর্মাভস্ম শুধু থাকে…

এই যে প্রতীকচিহ্নে ভাষাকে অপরিচিতিকরণে নেওয়া হয়, এই প্রতীক, এই মিথ এর মধ্যেই কবিতার জন্ম। প্রতীকের দুনিয়া থেকে, মিথের দুনিয়া থেকে মানুষের মুক্তি নাই।

 

একগুচ্ছ কবিতা

 

বাতাস কথা বলে

এখন ভোরবেলা, গোপন রাত্রির অশ্রুভেজা হয়ে আকাশে উজ্জ্বল সুবেহ-সাদিকের তারাটা ভেসে আছে। এ পাড়া শুনশান, বেঘোর কুয়াশায় নদীর জলে ধোয়া বাতাস সমতলে নরম বিছানার সবুজ খেতগুলো পেরিয়ে চলে আসে। শূন্যে দুলে ওঠা গুল্ম-লতাগুলো মাড়িয়ে চলে আসে
ভোরের মসজিদ,
সীমানা ঘিরে রাখা আকাশমুখী, লাল-
মোরগফুলগুলো কাঁপিয়ে চলে যাবো,
আমিও চলে যাবো
কবরখানা দূরে,
পেকেছে আতাফল!
কবরফলকের কিনারা ঘেঁষে
একটুকরা আতরের শিশি ও গন্ধক।
শিশিরে লেপটানো সাপ আর মানুষের মাথার খুলি,
হাড় অন্ধকারে আর
আমাকে বেড় দিয়ে
কিয়ৎ কিমাকার শরীর শুয়ে আছে
বাতাস কথা বলে,
প্লাবিত কুয়াশায় পাথরখণ্ডে সে হঠাৎ উড়ে এসে
পাখির মতো বসে;
পালক ঝাড়ে আর
প্রতিশ্রুতি ভেঙে অর্ধতন্দ্রায় নদীও সরে যায়
সারাটা চরাচর এ ঘোর কুয়াশায়
কেমন উবু হয়ে তলিয়ে যেতে চায়,
বাতাসে নুয়ে প’ড়ে সকল কোলাহল শব্দহীন হয়ে
                                       পিছলে পড়ে যায়
দৃষ্টিসীমানার বাইরে একা নদী একাকী সাঁতরায়
সময় থেকে দূরে
          আরেক সময়ের গর্ভে ঝরে পড়ে
গন্ধ-পুঁজ ভরা সবুজ আতাফল!

এই শাস্ত্র নীতিবিরুদ্ধ

এই শাস্ত্র নীতিবিরুদ্ধ
তবু, পাঠ করি— ইকরা (মুল/মুল), পাঠ করো— অতঃপর থাকিলো বাকি ঈশ্বর, পুনশ্চ তাহার কথা ভাবি— ভাবি ঐ কাঠের আকাশ— ভাবি অতঃপর বিষক্রিয়ায় মরে গেলো বিপুল সাপের বাচ্চারা, গাছে গাছে গুইসাপ প্লেটো (প্লেটও)— লেবু কচলে তিতা, তিতা বারেবার, বার, আবার— এইরূপে ঝরোনার পানি লাল, জলে জ্বলে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট মাছের শরীর— ফলত করহ আনন্দবিধান— আর তিনি ফেমিনিন ফুল; অবয়বহীন উট যতো হাওয়ায় মিশিয়ে দেন। বীক্ষণ করো, মাংসে দিয়েছে পোকা, আর তিনি ফেমিনিন ফুল— প্রসঙ্গত মরুভূমি আসে— এইরূপে, নচেৎ এইরূপে, চেতন-অধিকারী ঘোড়া ঘাস ভেবে তামা খায়— এইরূপে রক্তে চোবানো হলো তিতির পাখির পিত্ত, ডিমের কুসুম। কার্যত এখন আগামীকাল— তা বলে, খচ্চর আমার প্রিয় ফুল সে কথা মিথ্যা— ফলত শয়ন থেকে উঠে বসি রক্তমাখা সাবানের পাশে— অতঃপর সেইসব আবাবিল পাখি, মাথা ছিঁড়ে ছুড়ে মারে তারা; পাথর দিয়ে নব্যতর মাথা বানিয়ে নেয়— আর আমি ঝিনুকে ঝিনুকে সাগর কুড়াই— অধিকন্তু উটের মতন পবিত্র প্রাণী লিঙ্গ তারও আছে— তথাপি কতিপয় তান্ত্রিক গুরু, পাথর পোড়ানোর গন্ধের ভিতর উটের কুজ থেকে হলাহল পান করে— মাদিহাঁস পাতিহাঁস এইসব ম্যালা ম্যালা হাঁপানি রোগীর কফ তারা পান করে সোৎসাহে— আর সেইসব ইহুদিরা, পেনিসকে তারা লিঙ্গ বলিয়া ডাকে— কার্যত খড়ের সে ঘর, লোহার পাতে দরজা ভিড়ানো তাতে, তার কোনও সদুত্তর নাই— কার্যত এই দোষ আমার-তো নয়, এই কথা বলে, যেই জিভ কোনোদিনও কথা বলে নাই, সেই জিভ, পচা জিভ খসে পড়ে ঝরণার জলে।

তথাপি কৃপা

ফাটিলো রে অফাটল— ধাতুর প্রলেপে তাই আকাশ ভরায়ে দিবো— তাহলে এবার, এই বিলোড়ন— স্তনবৃন্তে ফুটে থাকে ফুল, হাওয়া লেগে দোলে রে আকাশ— তাহলে এবার, আমার তীরে মারা পাখি নিয়ে গ্যাছো তুমি, পরিত্রাণহীন কাতরনয়না পাখি— এই বিলোড়ন। খদ্দের না পেয়ে বুড়ি বেশ্যারাও ফিরে গ্যাছে ঘরে— তথাপি সাপের বাকশে সর্প ফিরে যায়— তথাপি ক্লোরোফর্মে চুবানো মগজ। আমি যা দেখেছি তার কল্পনা সব, আমাকে যে দেখেছে রে কল্পনা তাও— তাহলে এবার সত্য খুঁজিয়া ফিরি— আর তুমিও, পুড়ে যাওয়া চামড়া দেখে আমাকে কাফ্রি ভেবেছো, আমি সেই বেটেলোক অগ্নিবলয়ে যার আত্মা হারিয়ে গ্যাছে— ন্যাপথলিন তবুও ন্যাপথলিন, মুখোশের মতো নাকে এসে লাগে— ঘটনার যোগফল সাদা— চোখের ভিতরে কৃমি, ডিমসহ কিলবিল করে— সারারাত মল ঘেঁটে পাখি বলে- এই তবে পরিশিষ্ট মানবের? উদরপ্রদাহ বাড়ে, ব্যথায় কাতর রোগিণীরা কৃপা ভিক্ষা চায়— তথাপি কৃপা— তথাপি পায়ুপথে বিদ্যুৎ সরবরাহ নাই, এই বিলোড়ন— বাস্তব হইতে দূরে অবাস্তব কাঁদিয়া ফেরে, ক্যানো সে বাস্তব হইলো না— তথাপি, মৃত লোকটি নিজেকে জীবিত ভেবে খাদ্য কামনা করে; জানে, তাতে অর্থযোগ নাই, আহার নিদ্রা নাই, তবু এই কমলালেবুর লোভ তাকে ব্যাপৃত রাখে। সূর্যাস্তের ভিতর আমিও আমার আত্মা লুকিয়ে রাখি। সূর্য ডুবে যায়— পৃথিবীর সবকিছু কালো হয়ে আসে, প্রবল জলাতঙ্ক নিয়ে আমিও প্রাণপণে জলের গভীরে তবু ডুবে যেতে থাকি

মেঘের মেশিন

বৃদ্ধ ষাঁড়ের খুর
তৃণভূমি কতদূর
জাইলেম জাইলেম
তৃণভূমি জাইলেম

জিপসাম ফেনা থেকে ভেসে ওঠা মুখ
কহে বাপু, সুরে গাও
ঐ-মুখো ঘুরে গাও
জাইলেম জাইলেম
তৃণভূমি জাইলেম

আর কাঁটা ছিল না
তারকাঁটা ছিল না
বিন্যাস ছিল;
সয়াবিন ফুলের বাগান ছিল নিরঙ্কুশ পাতনযন্ত্রে ঘেরা। শস্যের ভিতর ছিল অভিশাপ— অব্যাহত মেশিন প্রবাহের মুখে প্রার্থনার চাদর উড়ালো যারা সেইসব মানুষেরা প্রার্থনার ভঙ্গী থেকে উঠে আসে বিবেচনাহীন—

স্বয়ম্ভূ তারা শৃঙ্খলাহীন
নিরাশ্রিত ঈশ্বরহীন
তাহাদের মর্ম নিরূপণ
কর্মের মর্ম নিরূপণ
এইসব-সকল-সমূহ গুরুত্বহীন বিবেচনা পর
পরিত্যক্ত তারা
পরিত্যক্ত মানুষেরা তবে রূপক হয়ে ওঠে— শব্দ!
শব্দোত্তর তবে ধ্বনি
তথাগত ধূলায় ছড়ানো দিনে, একটি দোলনকালের ভিতর দুলে ওঠা তারকানিচয়— তরঙ্গে ভাসা স্মৃতি— তথাগত ধূলায় ছড়ানো দিনে আকাশ ফুঁড়ে বেড়ে ওঠে লোহার মিনার— জাহাজের ভার বহে নদী
জাইলেম জাইলেম
তৃণভূমি জাইলেম

এই উপজীব্য—
গড়ে ওঠে লোকালয়— বাতাসে অর্পিত পাখি, পাখিসব চলৎশক্তিহীন— প্রণালীসমূহ, এইসব প্রণালীতে পুঁতে রাখা চোখ, জলে আর্দ্র— এই উপজীব্য

নেপথ্য থেকে উড়ে আসে কফিন
বৃহদন্ত্রময় মৃত এক জন্মপত্রহীন
বিনষ্টিহীন
সস্তা-কফিন
সস্তা-কফিন
তলদেশহীন
মধ্যাহ্ন উগরে আসে নদী— প্র  ল  ম্বি   ত হয়
বাতাসে তখন প্রদাহনাশক
অ্যালোভেরা
উৎকৃষ্ট মধুভরা গাছ
গাছের বাকল

এই উপজীব্য—
অতিক্রান্ত জলরাশির ভিতর
শূন্য হয়ে আসে বিগলিত রৌপ্যে ঠাসা হৃদ্‌যন্ত্রের ক্রিয়া
তথৈবচ
আজবার গুপ্তহত্যার ছুরি
বাতাসে ছড়ানো আজ লোধ্ররেণুর দিন
আজবার আকাশ ক্রমশ ঢেকে ফ্যালে
বজ্রোৎপাদনশীল মেঘের মেশিন

বসতি

চিরহরিৎ এক বন, সেখানে আমরা ছিলাম কিছুদিন হলো। পঞ্চগড়ের পাহাড়ের পর আমাদের বসতিভিটা। সে বন রৌদ্রে শুকায়, বৃষ্টিতে ভেজে, ঘাস আর মাটির গন্ধ বাতাসে ভাসে। আমার বাবা গোত্রপিতা, সেহেতু সে প্রসবযন্ত্রণায় হেসে ওঠে হাতেগোনা দুয়েকজন মাকে বাচ্চাসহ এখানে দাওয়াত করে; তারা মরুভূমি ছাড়িয়ে আসে— জলপাইঘেরা, বানর-অধ্যুষিত উপত্যকা পেরিয়ে। তাদের মুখের ভিতর বালু— দাঁতে লেগে কিচকিচ করে। তারা আমার দিকে মুহুর্মুহু ছুড়ে মারে তীব্র-তীক্ষ্ণ শ্লেষ ও জিজ্ঞাসা, ফুঁসতে থাকে দূরবর্তী সমুদ্রের মতো।

জনশ্রুতি আছে, এরাই একবার আমার বাবা, তাকে অনুসরণহীন শ্লোক ও ধাঁধার জঙ্গলে নির্বাসন দিয়েছিলো, বলেছিলো— সুর, পাথর এবং ধাতু থেকে জন্মাবে যা; দেহভাণ্ড ব্রহ্মাণ্ড, নাই সূর্য নাই চন্দ্র—  সারি সারি ধাঁধা, সারি সারি আলোর মেশিন!

অভিজ্ঞ সব কাঠমিস্ত্রীদের বসতি ছাড়িয়ে সে বন; সতত নীরব। বন থেকে বের হবার পথ, সেও খোদ মীমাংসিত মীমাংসাহীন গোলকধাঁধায়। শোনা যায় বনের গভীরে কোথায় নাকি এক পাতার কুটির, সবুজ দেয়ালে আয়না ঝোলানো তাতে। বার্ধক্যে উপনীত হলে ব্যাধি আর জরা নিয়ে আয়নামহল আপনা থেকেই এসে ধরা দেয়। ধুলায় ভর করে আসে আলো; আলো লেগে কাঁপে— দ্বিমাত্রিক, হাওয়াসঞ্চালিত আয়নামহল। বায়ু উৎপাদনযন্ত্রের সেই বন অজস্রাজস্র তামার খনিতে ভরা।

গত ফাল্গুনই ছিল মুক্তির, তামার খনি থেকে। সেই থেকে এ অব্দি ধাতু নিয়েই মেতে আছে বাবা। তার পায়ের কাছে তৃণমূল কেমন বিন্যস্ত, খামচে ধরেছে মাটি!

সূর্য থেকে দূরে, ছায়া গুটিয়ে ফিরে গ্যাছে মেঘ। নীরবতা। নীরবতা ভাঙে; দূরবর্তী শ্লোগানের মতো দাওয়াতপ্রাপ্ত যারা আমাকে একই প্রশ্ন করে।

আমি আরেক প্রসঙ্গ টানি— আলো-ছায়ার প্রত্যাবর্তন প্রসঙ্গ, অনাবাদি জমিতে শস্যের আবাদ, মাতৃভূমি আর বীরদের কথা, সুলতানাদের বাড়ি কিংবা নির্মিতব্য বাগানবাড়ির নকশা; তারা চায় না, জানায়— সেইটুকু জ্ঞান, যা তুমি জানোনি; হাস্যের দ্বারা দুঃখ, ক্রন্দনের দ্বারা উল্লাস এভাবে মানুষ অস্ত্র ও ফুল বিকিকিনি করে।

ইশারার মতো দুলতে থাকে পাতা।
পরিসরহীন কত অপ্রকাশ প্রকাশিত হল!

আমি চুপ করে যাই। আয়তক্ষেত্রসদৃশ বাড়ি থেকে বাইরে, কেবল পশ্চিমে তাকিয়ে থাকি। গুল্মের ঝাড় ফুঁড়ে ঝাঁঝালো গন্ধ আসে। উঁচু পাথরে বসা তক্ষক পোষা লোকটা; হনহনিয়ে হেঁটে যাচ্ছে— দাবানলে জ্বলা সারি সারি উজ্জ্বল গাছগুলোর দিকে, আগুন আর উত্তাপ এ দুটোই তাকে হাঁটিয়ে নিচ্ছে, গিলছে, আবার উগরে দিচ্ছে। পিছনে শুধু তক্ষক; ডাকছে— বারবার, সুউচ্চ রাবার গাছের মাথায়।

মধ্যআকাশ থেকে স্বচ্ছ পিলারের মতো নেমে আসছে সূর্যরশ্মি, উষ্ণতা দিচ্ছে সবুজ ফলের থোকায় থোকায়।

শব্দ শোনা যায়। রেলস্টেশন। রেলগাড়ি যেন মানুষ নয় বগি-ভর্তি করে নিয়ে যাচ্ছে যাবতীয় কোলাহল; সম্ভবত উত্তরবঙ্গের দিকে, পঞ্চগড়ের পাহাড়ের দিকে।

ধোঁয়ায় ভরে ওঠে সমস্ত আকাশ, ঝাড় ও জঙ্গল। একার ভারে নুয়ে পড়ি আমি, অনেক শিকড়ে প্যাচিয়ে প্যাচিয়ে জন্ম নিতে চাই অনুর্বর মাটির ভিতর থেকে; অতএব উপরে তাকাই, আলোর বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছে সূর্য! আমি চুপ করে যাই, যেহেতু অভিশাপ ডাকছে গতিকে; গতিই বয়ে আনে সময়, শব্দ-আলোক-হাওয়া; শব্দের আড়ালে আমরা মিশে যাই, আমি ও আমার আম্মা, আমি ও আমার আব্বা!

জাগে স্মৃতি! জলে বন্দী তরঙ্গ ছড়িয়ে পড়তে চায় জল থেকে ডাঙায়, শরীর থেকে শূন্যতায়। আমি চুপ করে যাই, স্মৃতি হাতড়াই— সারি সারি গাছ, সারি সারি পাতার মিনার। উঁচু উঁচু স্তম্ভের নিচে আমি একা, ক্ষুদ্র; ঝিম মেরে দেখি পানির ওপর ঝিরিঝিরি পাতার পতন— শীতে না জানি ভয়ে আমার ছায়াটা কাঁপছে, পারলে এখনই লুকিয়ে পড়ে ঝরে পড়া কোনো পাতার আড়ালে, নির্মিতব্য বাগান বাড়ির নকশায় গা ঢাকা দিয়ে কোনোমতে পালিয়ে বাঁচি। এদিকে শরীর পচে কাদা, পাললিক!

তারোপরে সেদিন আলখাল্লার মতন শরীর নিয়ে এক দরবেশ এসে বলে গ্যালো— বাসা-বাড়ি বদলাও, যে-মতো এসেছো সে-মতো যাবে না। আমি যে কোথায় যাই, সামান্য নুড়ি— বিদ্যুৎ জমানো মেঘ— এসবের বাইরে যাওয়াই যাচ্ছে না

নিভে যাবার আগে

চিরকাল বহে নদী— এই জীবন, জগত-সংসার, ভোজবাজি বলে যারা পরস্পর ফিরিয়ে নিয়েছো মুখ, এসো একই পাত্রে খাই— এইটুকু পানীয়, শুকনো রুটি স্বাস্থ্যোপযোগী

শিলার প্রাকার কেঁপে ওঠে— সবুজঘাসের মাঠ সন্তর্পণে ছেয়ে যায় হলুদ সোনালু ফুলে— এও এক দৃশ্য, নিভে যাবার আগে আলোয় কেঁপে কেঁপে জন্মলাভ করে

স্পৃহা, বাতাস-তাড়িত, গন্ধে মাতাল; কোনো বিজন নদীর তীরে ভাঙা মৃৎপাত্রের পাশে স্মৃতির টুকরা হয়ে জেগে থাকে— নিভে যাবার আগে, রাত্রিচারী পশুরা পরস্পর চিহ্নিত করছে নিজেদের— যার যার সঞ্চয়, ভাষা, ভালোবাসা ছুড়ে মারছে উপত্যকার নিচু জঙ্গল থেকে অব্যাহত বাতাসে বাতাসে। বাতাস, তাই বয়ে নিয়ে যায় অবিন্যস্ত শিলা আর জলাভূমির দিকে

গভীর পানিতে নড়ে ওঠে মাছ শ্যাওলার অন্ধকারে বাড়ি খেয়ে— সাদা পাথর থেকে একটি জলের ফোঁটা গলে পড়ে যায়— শেষবার ছিটকে পড়ে বাতাসে পশুর খুর— নিভে যাবার আগে শেষবার আলোয় ঠিক্‌রে ওঠে সীমানা চিহ্নের ধাতু!

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত