| 22 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
গল্প ধারাবাহিক সাহিত্য

হিম (পর্ব-৭)

আনুমানিক পঠনকাল: 5 মিনিট
জ্বর হলে ঘোরের ভেতর ফিরে আসো তুমি, অকপট যেন আমরা একই রকম আছি, একটু পরেই কলাবাগানহীন শিল্পকলায় বসে মামার দোকানের ঝুলে থাকা কলা ছিঁড়ে খাবো, তুমি রবীন্দ্রনাথ পড়বে।  প্রত্যেকেই কী দারুণ বাধ্য ভালোবাসতে! বিবাহিত হলে নিজের সমস্ত অনিচ্ছে একত্র করে দৃঢ় হতে হয়, মজ্জার ভেতরকার অসুখ সেরে উঠলেও তোমার শরীর প্রমথ চৌধুরীর সনেটের মত মনে হবে। চুমু খাওয়ার কালে সকল নারীকে কেন যে দন্তসুখ মনে হয়! আমি তো জ্বরনিরপেক্ষ চেয়েছি স্মল সাইজের কবি হতে সিন্ডিকেট রেটোরিক সেক্সসিম্বলহীন। 
জ্বরের ঘোরে মনে হয়, তোমার চকিত বিবাহ হতে পারতো ইউরোপিয়ান ফিল্মের মাস্টারপিস। তুমি জানো দুজনকেই, আকৃতি প্রকৃতি। সে হয়ত হতো ভালো বন্ধু আমার! পিথাগোরাসের উপপাদ্যের কথা মনে পড়ে গেলো। ইদানীং রাতে ভালো ঘুম হতে হতে আমি রোদ পোহানো কুমীরের মত মোটা হয়ে যাচ্ছি।  আয়নায় চুল আঁচড়াতে গেলে গলকম্বল চোখে পড়ে। ভাবি, এই গলকম্বল চাটাচাটি আছে সাহিত্যের সুফলা মাঠে। যখন ঘুম হত না ভাবতাম, ওগো কে আছো খানিক ঘুম দাও…। বাপের রেজারে দাড়ি কামাতে ভুলে যেতাম, ভুলে যেতাম প্রণয়ের সম্ভাবনা। ভাবি, সেসব অপুষ্টির দিন বড় সুষমাময় ছিলো… যারা সীমান্তের বাইরে যারা সীমান্তের ভেতরে, সকলে কররেখার দিকে তাকায়; মাঝে মাঝে আমি উড়ে যাওয়া জেটের ফেলে যাওয়া সাদা লেজ দেখি, মনে হয় প্রবাসী বন্ধুর হাতে ওড়ানো অতিকায় ঘুড়ির উড়ালপথ। গ্যাসবেলুনে বন্ধুতার চিঠি বেঁধে বাল্যে উড়িয়ে দিতাম। উত্তর পাইনি, উত্তর না পাওয়া একমাত্র আন্তর্জাতিক সমস্যা। কাক কাকের মাংস খায়না,কবি কবির মাংস খায়। ওহে লেখা হত্যাকারী সম্পাদক, নিজের সন্তানের গালের ওম টের পাও? এতো একা একা ঘুম ভাঙ্গে আজকাল! সন্দীপন, এখন জীবন অনেক সতেজ স্বাস্থ্যে ভরা বলতে চাই আমিও, নিজের পুরনো লেখার সামনে নিজেকে অতিকায় লাগে। বেবি ডল পিঙ্ক লিপস কোথায় পালালো আবহ থেকে! এখন কুয়াশাজীবন, এখন মনোরম কাক দেখে যাওয়া।  জিইসি-তরুণীর ছেনালিপনা ভালো লাগে।  ভালো লাগে কার পার্কিং- লিপলক; আধো আধো নেকুপুশি, খুকিপনা জিহবা উত্তম, স্বাদু মুখরোচক, কোচিং ফেরত কিশোরীর কানে সেলফোন, ভালো লাগে তার আধো ভান, মিথ্যে বার্গারে খানিকটা সততার সস, অভ্যস্ত স্বরে-ফুলতুসি, জান! ডেকে ফেলা যায়, ভেবে ফেলা যায় সত্যিরাতো যাদুঘরে থাকে, গভীর শীতরাতে দেখি ফুটপাথে শিশু খোঁজে তার মাকে এমন জীবনজুড়ে। 
জ্বরের ঘোরে নানা রকম আবোলতাবোল ছবি স্বপ্নের ভেতরে তৈরি হয়, সুধন্য মাস কয়েক হলো, ‘ড্রিম বুক’ লেখা শুরু করেছে।  নানারকম স্বপ্নের বিবরণ, এক বিন্দু না বানিয়ে, যা দেখলো তা-ই। কিন্তু নিজেই লিখে ফেলার পর পড়লে বুঝে উঠতে পারে না। কোথাও একটা ফিচারে পড়েছিলো, ইতালিয়ান পরিচালক ফেদেরিকো ফেলিনি পরিচালক জীবনের মাঝামাঝি গিয়ে গভীর মানসিক সংকটে পড়েছিলেন। পরে ইয়ুং প্রভাবিত এক মনোসমীক্ষকের চিকিৎসা নেন, সে সময়েই ইয়ুং এর প্রাপ্তব্য সকল বই পড়ে ফেলেন এবং চিকিৎসক তাঁকে পরামর্শ দেন স্বপ্নের বিবরণ লিখে রাখতে ডাইরিতে৷ তো, পরে এ বই বেরিয়েছে, বেরোলেও লাভ নেই কতো দাম! আর আমাদের গ্রন্থাগারগুলো তো বই কেনার সময় হলে রাজনীতির নেতানেত্রীদের মুগ্ধ করতে বই কেনে। 
দুইদিন হলো জ্বর। মাঝে মাঝে চোখ মেললেই কাউকে না কাউকে দেখে। আজ একটু ভালো। দুপুর নাগাদ শরীরে একটু শক্তি পাচ্ছে। টিউশনে যাবে কি না ভাবে! তার আগে একটু ড্রিম বুক লেখে। নিজের ড্রিমবুক।  ‘কেমন লাগছে বাবা এখন?’ বাবা ঘরে এসে জিজ্ঞাসা করেন। ছোটো স্টিলের থালা থেকে আপেলের টুকরো দেন। বাবার পরনে গামছা, খালি গা। প্রতিদিনের পুজো অনেক সময় নিয়েই দেন৷ বাবার মধ্যে পুজো পার্বণের ঝোঁক ছেলেবেলায় একদম চোখে পড়েনি। তখন, ছেলেবেলার চোখে বাবাকে জেটবিমানের চেয়েও স্পিডি মনে হতো। সে ক্লান্ত মাথা নাড়ে। এখন বাবা ঘুরে ঘুরে বাসার সবাইকে আপেলের কাটা টুকরো দেবে। আজ একটু ভালো রান্না বান্না হচ্ছে। বাবার ছাত্র একজন থোক টাকা দিয়েছে। অনেকদিন টাকা দিতে পারছিল না। বাবা কাউকেই জোর করেন না অবশ্য। জেটবিমানের চেয়েও স্পিডি বাবা, সকল প্রাপ্য কড়ায় গন্ডায় উশুল করে নেয়া বাবা এখন কিরকম শান্ত হয়ে গিয়েছেন৷ কোনো অভিযোগ নেই, মন খারাপ নেই। কিছুই না। বড়দি এসে এক বাটি মাংস রেখে যান মাথার পাশে। ‘ একটু খেয়ে দেখ তো ভাই, রান্না মনে আছে কি না ছাই!’ বিয়ে হয়ে যাওয়ার পরে দিদি বিশেষ রান্নাবান্না করে না। শখ হলো তো একদিন করে, রান্না বান্নার মূল ডিপার্টমেন্ট এখনো ছোটো বোন আর মা, কখনো রুলি। কিন্তু রুলি এতো চাপা হয়ে গেছে! শেষ কবে রুলির মুখে হাসি দেখা গেছে আজ আর কারো মনে আছে বলে মনে হয় না। মুখে এক টুকরো মাংস দিয়ে মাংসের ঝালটা ভালো লাগে। মাংসের সুস্বাদ আস্তে ছড়িয়ে পড়ছে বেঁচে থাকা জুড়ে টের পায়। জ্বর আস্তে ছেড়ে যাচ্ছে হয়তো। 
স্নান করে ভাত খেয়ে ফেলে দিদির ফ্ল্যাটের দিকে হাঁটা দিলো, আজ আর টিউশন যাবে না৷ পাবলিশারের অফিসেও না। আজ পুরো বিকেল বিশ্রাম, নিজের মতো। ফোনে অল্প কিছু টাকা ভরলো। রাস্তায় পরিচিত কুকুর তিনটেকে বিস্কুট কিনে দিলো। মানুষের সভ্যতায় কুকুর এক পুণ্যবান প্রাণ। কুকুরের সভ্যতায় মানুষ এক অভিশপ্ত প্রাণ। ফ্ল্যাটের দরজা খুলে আবার বন্ধ করে দিতে একদম নিজের পৃথিবী। একটু লিখবে আজ। তার আগে একটা সিনেমা, দ্বিতীয়বারের মতো। জোয়াকিম ফনিক্স অভিনীত ‘জোকার’ মাসখানেক আগে একবার দেখা হয়েছে। মঞ্চস্থাপত্যের মত সিকোয়েন্স আছে কয়েক জায়গায়। এমন একটি অত্যন্ত ডার্ক ছবি কেন ফেনোমেনাল হলো! ছবি দেখতে দেখতে ভাবছিলো, আমাদের নিজেদের জীবনের ভেতরের ব্যথাগুলো উগরে বের করে দিয়েছে সিনেমাটা। দর্শককে সুযোগ দিয়েছে নিজের কান্না ঝরিয়ে ফেলবার কিংবা বিক্ষোভে ফেটে পড়বার। ডায়েরি খুলে লিখে রাখলো খানিক…।
ধারাবাহিক আহত হওয়ার একটা শেষ সীমা আছে। বিক্ষত অতীত নিয়ে বিপন্ন কেউ যখন উঠে দাঁড়াতে চাইছে বারবার, ধাক্কা দিতে দিতে তাকে একেবারে খাদের কিনারে নিয়ে এলে তখন সে যদি ঘুরে দাঁড়ায়, তার নাম জোকার। সকল প্রকার বিপন্নতার সশস্ত্র বিপ্লবী সমাধান এই চলচ্চিত্র। কোনো সভাসেমিনার কিংবা বোঝানোর গান্ধীবাদী চেষ্টা নয়, আমি যখন বার বার তোমার অপমান এড়ানোর চেষ্টা করছি বার বার আর তুমি করেই যাচ্ছ তা-ও, তখন একমাত্র সমাধান ডিরেক্ট শুট। তখন বুলেটে তোমায় ছিঁড়ে ফেলা-ই সমাধান। এখন, পৃথিবীর রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে অবরুদ্ধ মানুষ যদি জোকার হয়ে ওঠে। কি হবে তখন? সেই চির ক্যাওস সুন্দর।
লেখাটা শেষ হয়ে যাওয়ার পর সন্ধ্যে নেমে আসা দেখলো কিছুক্ষণ। প্রকৃতির চেয়ে বড় চিত্রকর নেই৷ আকাশ বিশাল এক ক্যানভাস। অফুরন্ত রঙের মেলা! একটা সিগারেট ফুরিয়ে গেলো সেই ফাঁকে। দিনের প্রথম। জ্বরের ঘোরে সিগারেট বিস্বাদ লাগে। একদিন ছেড়ে দিতে হবে এই নচ্ছার জিনিস। প্রায় দেড় মাস ইশরাত কোনো যোগাযোগ রাখছে না। সুধন্য ভাবে, ওর জন্ম কোনো অভিশপ্ত নীল গ্রহে৷ কারো সাথেই সম্পর্ক বেশিদিন টেকে না। সম্পর্কের সুতো খুলে খুলে যায়। ডিজাইন ফেটে যায়। অসংখ্য মেইল ইশরাতের উত্তররহিত পড়ে আছে। তবু আরেকটা শেষ মেইল লেখা যাক, যদিও এই শেষ মেইল কথাটা প্রায় প্রতিদিন, আমার তো আর বন্ধু নেই কথা বলার, আমার আর কি করবার আছে! আবার লিখতে বসে-
কেউ কেউ আসে, অঝোর কথার অভ্যেস তৈরি হয়,  বলে দিই শুরুতেই- দেখো, আমি কিন্তু শেষের দিনটি জানি৷ তাও শুনে ভালো লাগে, সবাই একরকম নয়। সবাই চলে যায় না। কেউ কেউ থাকে। থাকে তো বটেই। এই  যে ছিন্ন মশারির জীর্ণ দড়ি ক্ষয়ে আসা হুকে ঝুলে থাকে সেও তো থাকা। এই যে শৈশবের মার্বেল আর খুঁজে পাচ্ছি না সেও তো মনের কোথাও না কোথাও আছে৷ চলে যখন যায়, অফুরন্ত কথার অভ্যেস নিয়ে যায় মাত্র৷ পরে ভাবি,আরেকটু সতর্ক হবো। পারি না। পরপর ঘটনাগুলো ভবিতব্যের মতন ঘটে যায়৷ যেতে থাকে। শব্দেরা ছিঁড়ে যায় তারপর। শেষ আর কিছু থাকে না। এখন আর মদ খাই না। ভেবে দেখলাম, একদিন খাবো এ-ই ভাবনার মধ্যেই আনন্দ আছে। যেমন কম্পিউটারে গুগল ম্যাপ জুম করে নানা জায়গা দেখি, সেসব জায়গার তথ্য পড়ি। কোনো কোনো সমুদ্রশহরেরর ছবি দেখতে দেখতে আমার কানে আছড়ে পড়ে সমুদ্রের শব্দ আর গাংচিলের ডাক। বন্ধুদের কোনো সম্মিলিত আয়োজনেও ইচ্ছে করেই যাই না। পরে গ্রুপ ছবির ফাঁকা জায়গায় নিজেকে কল্পনা করি। ভাবি যে, ওদের সাথে অই ছোটো পাহাড়ে আমিও উঠেছিলাম। কেউ যখন অন্য বন্ধুর বউয়ের হাতের সাথে হাত খানিক লেগে যাওয়ার কথা বলে চা খেতে খেতে দেখি আমার হাতের রোমেরা অত্যন্ত চঞ্চল হয়ে বাতাসে হাঁটছে। ভালো থেকো। আর লিখবো না তোমায়। 
লেখা শেষ করে আরেকবার গুপী গাইন বাঘা বাইন দেখতে বসলো। সত্যজিতের রাজনীতি ঋত্বিকের মতো অসম্পাদিত নয়। ঋত্বিক মেলোড্রামাটিক কারণ রাগের কিংবা আমাদের মৌলিক আবেগের সম্পাদনা হয় না।  রিমাস্টার্ড কপি। কী ঝকঝকে সব! ডুবে গিয়েছিলো, নিজেই গুপী বাঘার সাথে যেন বেড়াচ্ছিলো, সেই কোন ছোটোবেলায় কি এক ফিল্ম ফেস্টিভালে বাবার হাত ধরে গিয়ে দেখে এসেছিলো, মাঝে অন্তত বাইশ বছর কেটে গেছে কিংবা আরো বেশি৷ লিখে রাখছিলো, কয়েকটা সংলাপ। পিন্টুদা সুধন্যকে লেখা দিতে বলেছেন। আনোয়ার হোসেন পিন্টু৷ সত্যজিৎ গবেষক। আবার এগিয়ে পিছিয়ে মিলিয়ে নেয়- 
-ও খুড়ো 
-কী?
-এদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে গো?
-রাজার বাড়ি
-কেন?
-বিচার হবে
-(গুপী) কেন?  এরা কি ডাকাত নাকি?
-না না খাজনা দেয় নাই তাই বিচার হবে
-কেন খাজনা দেয় না কেন
-আরে যে রাজা খেতে দেয় না তারে আবার খাজনা দেবে কি?’
এই শেষ কথাটা আমাদের শহরের আয়কর কমাবার  আন্দোলনের কর্মীদের সাথে কী চমৎকার মিলে যায়! টুং করে একটা শব্দ৷ টেক্সট মেসেজে একটি শব্দ, -‘আসবো?’, সুধন্য চমকায়৷ কোনোদিন আসতে চায়নি ইশরাত। সে-ও একটি শব্দে  উত্তর দেয়, -‘এসো’।
সিনেমা বন্ধ করে ঘরটা একটু গুছিয়ে তোলার চেষ্টা করলো। পনেরো মিনিট পরেই কলিং বেল৷ দরজা খুলতেই ইশরাত জাহান পুষ্পা৷ কিন্তু এই মানুষটিকে সুধন্য চেনে না। সে নিজেই ঘরে ঢুকে সুধন্যকে জড়িয়ে ধরে প্রচন্ড কান্নায় চূর্ণ হতে থাকে। আর স্তব্ধ, অপ্রস্তুত দাঁড়িয়ে থাকে আমাদের নায়ক, দেয়ালে হেলান দিয়ে। 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত