হিম (পর্ব ৮)

বৃষ্টির ফোঁটা পুকুরের জলের উপরিভাগ ছুঁয়েই বৃত্ত হয়ে যায়৷ এভাবে অনেকগুলো বৃত্ত পরস্পরকে ছুঁয়ে যায়। ক্বচিৎ বুদ্বুদ ওঠে আর ছিপের ফাতনা ডুবে যায় তারপর, বড়ো মাছ হলে খেলাতে হয়, ছোটো মাছ টুপ করে গিলে বসে থাকে। শুভ্রশংকর পুকুরঘাটে একটা মাচায় বসে আছেন- পাশে মাছের নানা লোভনীয় চার। এক নীল ফ্লাস্কে রং চা, একটু পর পর ফ্লাস্কের মুখ খুলে বড় মগে চা ঢেলে নিচ্ছেন। সুপ্রভার বোনঝি মুক্তা খুব ভালো চা বানায়। পুকুরে এভাবে টানা বসে থেকে মাছ ধরার ব্যাপারটা শেখা শান্তিদার কাছে। সহিষ্ণুতা বাড়ে। কিছুদিন নিরিবিলি বিশ্রাম করবার পরামর্শ দিয়েছেন তাঁকে পারিবারিক ডাক্তার। শরীরখানা খুব কমজোরি হয়ে পড়েছে। সুধন্য এসে দিয়ে গেছে। 
শান্তিপদ বিশ্বাস। তাঁর চেয়ে বছর পনেরোর বড়ো। যাকে বলে এলাকার বড়ো ভাই। ষাট দশকের চট্টগ্রামে পড়াশোনার চল ছিলো। অনেক ক’টা দেশী বিদেশী গ্রন্থাগার আবার নানা বাম সংগঠনের অফিসের বই সংগ্রহ। সাংস্কৃতিক সংগঠন বেশিরভাগের তখন নিজেদের ভালো বই সংগ্রহ ছিলো। শান্তিদা কোনোরকম পার্টির সাথে যুক্ত ছিলেন না৷ বামপন্থার সে রমরমার সময় যখন নিজেকে বামপন্থী পরিচয় দেয়া আন্তর্জাতিক রাজনীতির সাথে নিজেকে যুক্ত রাখার একটা ফ্যাশন অনেকের কাছে, সে-ই সময় শান্তিদার নির্দলীয় অবস্থান টেনেছিলো প্রায় কিশোর শুভ্রকে কেন না নিজের বাবা কমিউনিস্ট পার্টির ফুল টাইমার। অনেক দিন পর পর দেখা হয় বাপে ছেলেতে। তখনো শান্তিদার বাবা মা বেঁচে ছিলেন। বাবা সরকারি অফিসে চাকরি করতে করতে চাকরি জীবনের শেষ দিকে চলে এসেছিলেন আর মা কিছু অতিরিক্ত রোজগারের জন্য এলাকার আরো কয়েকজনকে একত্র করে হস্তশিল্পের বিভিন্ন ধরণের কাজ আর পিঠে বানানো শুরু করেছিলেন৷ আশেপাশের দুই চার মাইলের মধ্যে মায়েদের ‘মাতৃমায়া’ সমবায় সংগঠন বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছিলো। কোনো কোনো স্কুল টিফিন হিসেবে এসব পিঠে কিনতো সারাবছর ধরে, তাছাড়া পাড়ার ছোটো ছোটো মেলায় তাঁরা স্টল দিতেন। আর শান্তিদা সবার সেবা করে বেড়াতেন, নিজের ঘরে একেবারেই থাকতেন না, এর চিলেকোঠা, ওর বারান্দা কিংবা শ্মশান ঘাট এভাবে দিন কেটে যাচ্ছিলো। মুক্তিযুদ্ধের ঠিক আগে বিদেশী কিছু পত্রিকায় সাংবাদিকদের আলোচিত আলোকচিত্র দেখে খেয়াল চাপলো আলোকচিত্রী হবেন। বাবার কিছু জমানো টাকা আর তৎকালীন প্রেমিকা, পরবর্তীতে স্ত্রী’র কয়েকটা গহনা বিক্রি করে দিয়ে বসলেন একটা খুবই ছোটোখাটো স্টুডিও৷ গনসালভেস দাদা খুব অল্প পয়সায় খেটে স্টুডিও সাজিয়ে দিলো। স্টুডিওতে ছবি তুলতে আসতো লোকজন আর তিনি নিজের মনের আনন্দে নানা প্রাকৃতিক দৃশ্য কিংবা মানুষের মুখের ক্লোজআপ তুলে বিদেশী নানা পত্রিকার ঠিকানায় খামে পুরে পাঠাতে লাগলেন, ফেরত খামে। অনেক ছবি ফেরত আসতো৷ বড় সম্পাদকরা চিরকুট দিতেন মাঝে মাঝে। প্রাইজ পাননি কোনোদিন। একদিন এক ফটোগ্রাফির প্রবন্ধ পড়তে গিয়ে রঘু রাই নামটার সাথে পরিচিত হলেন, বন্ধুত্ব হলো তাঁদের চিঠিতে। রঘু তখনো অবিখ্যাত, কার্তিয়ে ব্রেসোর চোখে পড়েননি। পরস্পরকে পাঠানো ছবির তারিফ করতেন। ‘আলো’ স্টুডিওতে লোকজন-ও বাড়ছিলো। শান্তিদা আস্তে আস্তে থিতু হচ্ছিলেন। অরুণিমা দি’র সাথে বিয়ে হলো একাত্তরের জানুয়ারির শেষ দিকে। শুভ্রশংকর উপহার দিয়েছিলেন ‘কুয়াশা’ সিরিজের কয়েকটা বই, ‘মাসুদ রানা’ সিরিজের শুরুর দিকের কয়েকটা আর সে মাসের রহস্যপত্রিকা, একটা প্যাকেটে। সব নিজের সংগ্রহ থেকে, তখন ছাত্র মানুষ, আলাদা করে কেনার পয়সা নেই৷ শান্তিদা খুশি হয়েছিলেন, বলেছিলেন, ‘ দেখিস, এরা একদিন জনপ্রিয় সাহিত্যের ধারা নাড়িয়ে দেবে।’ তিনি সিরিয়াস পাঠক ছিলেন বরাবরের মতো তবে মনের দরজা জানালা সব খোলা রেখেছিলেন, গ্রহিষ্ণু এমন মন বড়ো একটা দেখা যায় না। স্টূডিও-র ভেতরে শান্তিদার আড্ডা দেয়ার জায়গা। মুড়ি চানাচুর আর চায়ের অঢেল চালান। সেখানে বসে গল্প করতেন মুড থাকলে, ফেলে আসা দিনের গল্প। পাড়ার কয়েকটি ছেলে তাঁর শ্রোতা। একদিন খুব বৃষ্টি। এক মুঠো মুড়ি মুখে পুরে শান্তিদা শুভ্র আর সামনে উপবিষ্ট গোটা চারেক গুণমুগ্ধ কিশোরকে বললেন- ‘শোন তাহলে, এক গল্প- বছর পাঁচ আগে এক সাধু থানা গেড়েছিলেন আমাদের জন্মভিটের গ্রামে। আশ্চর্য সব কেরামতি দেখাচ্ছিলেন ভদ্রলোক- কোনো পয়সা দাবি করতেন না, যে যা দিতো তা নিয়েই সন্তুষ্ট- গাছের নিচে শুয়ে থাকতেন, রোদে বৃষ্টিতে, একইরকম, টানা কয়েকদিন উপোস দিয়ে একবার চুপচাপ কাঁদছিলেন পেটের জ্বালায়- গভীর রাতে এক পরমাসুন্দরী রমণী এসে তাঁকে স্তন পান করিয়ে গেলেন, এরপর থেকে তাঁর নাকি আর ক্ষুধা লাগতো না- একবার অগুনতি ভক্তের সামনে মা মা করে কাঁদতে কাঁদতে তিনি এই পরমা দর্শনের গল্প বলেন। দুইজন লোক জানায় ভরা মজলিসে, তারা দেখেছে সে দৃশ্য। অমাবস্যার সে ঘুটঘুটে রাতে সাধুর গাছের তলা ছিলো উজ্জ্বলতম দিনের চেয়েও আলোকিত আর ক্ষুধার্ত, প্রাপ্তবয়স্ক সাধুর জায়গায় একটি নধর শিশু এক রমণীর স্তন পান করছে- যে দুজন প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান দিয়েছিলো, পরের মুহূর্ত থেকে তাদের আর কেউ কথা বলতে শোনেনি৷ তারা ছিলো মূলত চোর, চুরি করতে বেরিয়ে অমন অলীকপ্রায় দৃশ্যের মুখোমুখি হয়; যেহেতু দুইজনেই বাকরহিত হয়ে পড়ে, ঘটনাটির বিস্তারিত প্রতিবেদন তদন্ত করতে কারো আগ্রহ দেখা যায় না। সাধুর পসার বাড়ছিলো। নদীর পাড়ে ঘর গড়ে দেয়া হলো তাকে। সে ঘর আস্তে আস্তে বড় হতে লাগলো। তার উৎস কেউ জানতো না। বিকাশ সবার চোখের সামনে। ‘ শান্তিদা আরেক মুঠো মুড়ি চানাচুর মুখে পুরলেন। ‘তারপর শোন, একদিন দেখা গেলো সাজানো আস্তানা ফেলে সাধু উধাও, তার সাথে গ্রামের নেতা গোছের অমর মন্ডলের বউকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলো না। ওরা দীর্ঘদিন নিঃসন্তান ছিলো, অমর আর তার বউ। সাধুর বদান্যতায় অঞ্চলের অনেকগুলো সন্তানহীনের সন্তান জন্মের সংবাদে অমর মন্ডলের বউও গিয়েছিলো- তাঁদের মধ্যে হয়তো একটা শরীর ঘটেছিলো, সংযোগ ছাড়া উৎপাদন তো অসম্ভব। সে তুমি মানুষ বলো আর জিনিস-‘ সমবেত কমবয়সী শ্রোতাদল রসের সন্ধান পেয়ে খিলখিল করে হেসে উঠলো। তিনি বলে যেতে থাকেন,’ অমর মন্ডল ক্রোধে অস্থির হয়ে পড়েন৷ বুঝলি, কোথায় যেন পডেছি সন্তান জন্মদানে অক্ষম পুরুষের রাগ বেশি থাকে। আশেপাশের শতাধিক মাইল তন্ন তন্ন করে সাধু আর নিজের স্ত্রীকে আবিষ্কার করলো বেদেদের নৌকায়। বউ ভাত রান্না করছিলো নৌকোয়৷ প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, ভাজা মাছের সুগন্ধে পরিপার্শ্ব পূর্ণ ছিলো। আকাশে গোল, আয়তনে বৃহৎ চাঁদ ছিলো। ঘাট থেকে অমর বউকে চিৎকার করে ডাকে৷ অদূরেই বাঁধা নৌকা থেকে লাগানো সিঁড়ি বেয়ে নিশিডাকের মতো নেমে আসে সে। আরেকবার চিৎকার দেয় অমর, চিৎকারে ছিলো কান্না আর প্রশ্ন -‘কেন?’ বউয়ের মুখ বিবর্ণ হয়ে যায়, অমরের হাতে উঠে আসে ঝকঝকে ছুরি কোন্ এক মন্ত্রবলে, সে ক্রোধে উন্মাদপ্রায় উপর্যুপরি কোপাতে থাকে- একটি মানুষও বাধা দেয়ার সাহস পায় না। স্ত্রীর লাশটা সে চুলের মুঠি ধরে টেনে জলে ফেলে দেয়। আর তারপর নিজেই ছুরিটা নিজের পেটে বসিয়ে দেয়, রক্তে ভেসে যেতে থাকে চরাচর, সবাই নিরব দর্শক। সারা রাত আর্ত চিৎকার শোনা গেল অমরের।  সকালে দেখা গেলো বিসর্জিত দুর্গা প্রতিমার খড়ের কাঠামোর মতো দু’টি লাশ ভাসছে, জল কম তাই স্থির ও ভাসমান।  কোনো থানাপুলিশ হয়নি। সাধু তখন পুরোদস্তুর সংসারী। কিছু রোজগারের আশায় পাশের গ্রামে গিয়েছিলো। একটু বেলা হলে ফিরে, এ দৃশ্য দেখে চুপ হয়ে গেলো। আস্তে আস্তে মানসিক অসুস্থতার নমুনা দেখা গেলো। মুখের এক পাশ বিকৃত হয়ে গিয়েছিলো। তারপর আর বেশিদিন বাঁচেনি- ‘
শান্তিদার মুড়ি চানাচুর শেষ। আরেক প্রস্থ আনানো হলো। ‘এবার তোরা বল দেখি, প্রেমিক কে সত্যিকারের?’ শ্রোতাদের নিয়ে আগ্রহের চোখে তাকান। ‘এই তিনজনের মধ্যে?’ শুভ্র বলে ওঠে, ‘ কেউ নয় দাদা, সত্যিকারের প্রেম ধ্বংসাত্মক নয়৷ ‘ ‘তুমি ভুল জানো খোকা। প্রেম এমন এক দুরন্তজটিল মনোদৈহিক প্রক্রিয়া যে অমন এক কথায় ব্যাপারটা খারিজ করে দেয়া মুশকিল।’ সেদিনের আলোচনাটা স্টুডিওতে ছবি তোলাবার জন্য দু’টো মানুষ আসায় স্থগিত হয়ে গিয়েছিলো। কেন না ছবি সবসময় শান্তিদাকেই তুলতে হয়। হাতের ছিপে টান লাগায় অতীত থেকে বর্তমানে ফেরেন শুভ্র। পরে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলো। দাদা যুদ্ধে চলে গেলো। এখন, সেদিন শান্তিদার ছেলের সাথে দেখা হওয়ার পর ইচ্ছে করে পুরনো পরিচয় ঝালিয়ে নিতে৷ আর প্রকৃত প্রেমিকের পরিচয় জানবার। বৃষ্টি বেড়েছে। সুজিত কালো ছাতা নিয়ে এসেছে। সে তার মেসোমশাইকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। 
দুপুরের খাবারের সময় হয়ে গিয়েছে। 
****
‘সকাল হলেই অফুরন্ত পাখির ডাকে ঘুম ভেঙে যায় তার তখন একটু আগে ফেলে আসা স্বপ্নটা মনে পড়ে। গোটা ছেলেবেলাটা সেই স্বপ্নের মধ্যে কোথাও একটা লুকিয়ে থাকে  আর তখন ইচ্ছে করে ছেলেবেলার সাথে লুকোচুরি খেলতে। রুমাল চুরি খেলার দিনগুলো মনে পড়ে তখন তো আর শরীর এত ভারী ছিল না যেন একটা নীল ফড়িঙের মতন উড়ে বেড়াতো যেখানে সেখানে। কেমন আছো তুমি? এখন ঘুম আসে নাকি আগের মতই ঘুমের ভেতর তুমি ছটফট করে ওঠো? নানারকম দুঃস্বপ্ন তোমাকে কি এখনো আক্রান্ত করে? আসলে শৈশব আমাদের উপর এমন একটা দাগ ফেলে যায় এমন একটা চিহ্ন কেটে দিয়ে যায় এমন একটা লক্ষণরেখা যার ভেতর থেকে সারাজীবন চেষ্টা করলেও আমরা বেরোতে পারি না। ‘ রাতে সুধন্যের ফেসবুক পোস্ট ডাইরিতে লিখে রেখেছিলো সীতা৷ লোকটার চিন্তা তাকে ভাবায়৷ কখনো মনে হয় বুড়ো দাদু, কখনো নিজের দাদা, কখনো প্রেমিক, একদিন তো বলেই ফেলেছিলো, ‘সুযোগ থাকলে আপনাকে বিয়ে করতাম’, বলেই আবার ডিলিট কিন্তু সুধন্যের চোখে পড়ে গিয়েছিলো সে তৎপরতা, সে এক হাসির ইমোটিকন পাঠিয়েছিলো, ভারি লজ্জা হয়েছিলো সীতার৷ আর তারপরেই দুটো শব্দ পাঠিয়েছিলো সুধন্য, ‘হয়তো আমিও।’ ঘুম আর জাগরণের মধ্যে ভাসতে ভাসতে কখনো চিত্রকর, কখনো সুধন্য, কখনো ছেলেবেলায় জোর করে চুমু খেতে চাওয়া মাসতুতো দাদা এরা সব ঘোরাফেরা করে। কারো মুখ শুয়োরের মতো, কারো মুখে বাচ্চাদের হাসি! কখনো তীব্র যন্ত্রণা আবার কখনো চমৎকার নির্মলতা নিয়ে ঘুমের চাদর সরে যায়। 
‘মামণি উঠে যাও আর কতক্ষণ ঘুমাবে! সকাল হয়ে গেলো।’- বাবার ডাক শুনলেও নড়েচড়ে ওঠে আরেক পাশ ফিরল সীতা। মায়ের অফিস যাওয়ার সময় হয়েছে সে জানে তবে এখন উঠবেনা কেন না উঠলেই আরেকটা দিনের মুখোমুখি হতে হবে। আবার এদিকে মা বেরিয়ে যাওয়ার ঘন্টাখানেক পর বাবা বাইক নিয়ে বেরিয়ে পড়বেন সারাদিনের কাজ সারতে৷ তখন ঘরে আসবেন সারাদিনের কাজের মাসি। তিনি আস্তে আস্তে ঘর মুছবেন। তার কাপড় ধোয়ার শব্দ শোনা যাবে। বাথরুমে জল ছেড়ে ড্রাম ভরিয়ে তোলার শব্দ। তিনি এতো আস্তে কাপড় ধুয়ে তোলার চেষ্টা করেন যাতে বেশি শব্দ না হয়, যাতে সীতা ঘুম থেকে উঠে না পড়ে। তিনি মূলত সীতার মায়ের দিকের দরিদ্র আত্মীয়। কাপড় ধোয়া শেষ হলে তিনি রুটি বেলতে বসেন আর সেই বেলার শব্দে সীতা আস্তে আস্তে আড়মোড়া ভাঙ্গে। কাঠের সাথে কাঠের স্পর্শের শব্দে তার মনে অন্যরকম অনুভূতির জন্ম হয়৷ সারা ঘর ধীরে টাটকা রুটির গন্ধে ভরে ওঠে। তখন সীতা দাঁত ব্রাশ করছে। স্নান করবে তারপর। নিজের শরীর নিজে ছুঁয়ে দেখার ভেতর একটা রোমাঞ্চ আছে৷ নিজের শরীর ছুঁয়ে দেখার মধ্যে একটা সুন্দর আছে সেই সুন্দর প্রতিদিন নিজ হাতে ধরে টের পেতে চায় সীতা,স্নানঘরে। এইজন্যে তাঁর স্নান সেরে বেরোতে সময় লাগে। অবশ্য নিজের শরীর যতো ভালোবাসে ততোটা যদি নিজের বর্তমান আর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সচেতন হতো, তাহলে অনেক অযাচিত জটিলতা থেকে মুক্ত হওয়া যেত হয়তো৷ সারাদিন জুড়ে সে যা করে তার ভেতর অনেকটা সময় জুড়েই পড়াশোনা কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক পড়া নয়। সকালের নাস্তা সেরে ফেলার পর বিকেলের কোচিং এর স্যারের পড়া তৈরি করতে বসার বিশ মিনিটের মধ্যে তার মন ডাইভার্ট হয়ে টরেন্টে ঢুকে যায়৷ তার প্রেমিক তাকে অসামান্য সব সিনেমার নাম বলে। আর সে দেখে। এই সেদিন দেখলো, এইট এন্ড হাফ, ফেলিনির, যদিও প্রায় কিছুই বোঝেনি৷ সিনেমা নিয়ে কথা হলেও সীতার মনে হয়, সেদিন ফিরে যাওয়ার পর দূরত্ব বাড়ছে ওর সাথে। অস্বস্তি হয়৷ শুধু এই একটা কারণকে মেনে নিতে পারে না৷ অবশ্য পুরুষ বলতে ভালো মানুষ বাবা আর পার্টির সুস্নাত দা, আর বাকিরা কেমন যেন হ্যাংলা! সুধন্যকে বোঝা যায় না, কোনো কোনো রাতে সে নিজেকে খুলে দেয়, অজস্র কথা জানায় লিখে লিখে। বেশিরভাগ সময় একেবারে নিরব৷ আজ একটা মানবন্ধন আছে। পাটকল বন্ধের প্রতিবাদে। ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে রেখেছিলো,  না গেলে খারাপ দেখায়৷ যদিও তার এখন ইচ্ছে করছে সিলভিয়া প্লাথের জার্নালটা ঘেটে দেখতে। আন্তর্জালে পেয়েছে। অসম্পাদিত এই দিনপঞ্জিতে একটি সৃজনশীল নারীর শিশুবয়স থেকে পরিণত বয়সের মনটা টের পাওয়া যায়। পাঠিয়েছিলো সুধন্য পিডিএফ, মেইলে। পড়ার ইচ্ছে চেপে রেখে জিন্স আর টি শার্ট পরে বেরিয়ে পড়লো। মানববন্ধনের জায়গাটি ওদের বাড়ি থেকে পনেরো মিনিটের হাঁটা পথ। অল্প কয়েকটা লোক এসেছে। সুস্নাতদা ওকে দেখে একগাল হাসলেন। ‘কি রে পিচ্চি?’- এই ‘পিচ্চি’ শব্দে মাথা গরম হয়ে যায়৷ আবার ভালোও লাগে, সীতা বড়ো স্নেহের কাঙাল। বৃষ্টি শুরু হলো ফোঁটায় ফোঁটায়, জোর বাড়লো তারপর। কেউ অবশ্য মানববন্ধন থেকে সরে গেলো না। আটজন মানুষ ভিজতে লাগলো, যেভাবে গাছেরা ভেজে নির্জন অরণ্যে, ঠায় দাঁড়িয়ে। প্ল্যাকার্ডের লাল লেখা ধুয়ে থেবড়ে যাচ্ছে। আটজন মানুষ নড়ছে না।

মন্তব্য করুন




আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত