হিম (পর্ব-১৭)

বিমলার ছোটোজন ভাই, সবে উপুড় হতে শিখেছে। বড়োজনের বিয়ের বয়স হয়েছে,
পয়সার অভাবে হচ্ছে না। বড়োজন শ্যামলী কয়েকটা বাচ্চাকে পড়ায়। গ্রামের এদিকটায় সকলেই গরিব। ছেলেমেয়েরা গায়ে গতরে বড়ো হলেই শহরের দিকে চলে যায়। প্রাইমারি স্কুল নামকাওয়াস্তে আছে, হাইস্কুল যা আছে সেটি অনেক দূরে। মাইল তিনেক, পড়বার ইচ্ছে অনেকের থাকলেও আর্থিক টানাপোড়েনে ঝরে পড়ে।
প্রাইমারি উতরে যাওয়াটাই অনেকের বড়ো পাওয়া। ছেলেরা মধ্যপ্রাচ্যের দিকে চলে যায় চড়াসুদে ঋণ নিয়ে। মেয়েরা চলে যায় গার্মেন্টসের দিকে, কেউ কেউ হারিয়ে যায়। তাদের আর খুঁজে পাওয়া যায় না। শ্যামলী নিজেদের ঘরের দাওয়ায় পাটি পেতে পাঁচ সাতজন পড়োকে নিয়ে বসে আর তারপর মাস গেলে দু’তিনশো করে কখনো হাজার বারোশো কখনো হাজার পনেরোশো। বেশিরভাগ অনিয়মিত, অনাদায়ী থাকে। দু’চার মাস টানা পড়ে কেউ আর আসে না। ঐ টাকাটা মার যায়। ইচ্ছে করে দেয় না এমন নয়, দিতে পারে না বলে দেয় না। শ্যামলীর শহরে যেতে ইচ্ছে করে না। ওর বন্ধু বিলকিস হারিয়ে গিয়েছে। শহরে গিয়েছিলো কাজ করতে, হাতে সস্তার নোকিয়া সেট  আজ আড়াই বছর হলো বন্ধ। মাঝে এলাকায় কানাঘুষো শুরু হলো। এলাকায় মোবাইল রিচার্জ, গান আর থ্রি এক্স সরবরাহ করা একমাত্র দোকানে ওর ভিডিও পাওয়া যাচ্ছে। পুলিশ এসে রেইড দিলো একদিন স্থানীয় পত্রিকায় খবর হওয়ায়। আহকাম খন্দকারকে ধরে নিয়ে গেলো, দোকানের মালিক কিছু পয়সা খরচ করে পরদিন বেরিয়ে এসে তার আকামের দোকানদারি চালিয়ে যেতে লাগলো। বিলকিসের পরিবারের ছিলো এক অন্ধ ভাই আর মা। ভাইয়ের বিয়ে করা হয়ে ওঠেনি। কে-ই বা এমন পরিবারে মেয়ে দেবে।
ভাই তো আর জন্মান্ধ নয়। টুকটাক কাজকর্ম করতো। দেশের রূপ রস দেখেছে অনেক। চাকরি ছিলো জেলায় জেলায় ঘুরে কোম্পানির জিনিস বিক্রির। একেকটা জেলা তার চোখে একেক রঙের।  রংপুর টাউন হলের সৌন্দর্য দেখে অকারণে দুইদিন বেশি থেকে গেলো। টাঙ্গাইলের এক মিষ্টির দোকান মোহিত করে রাখলো তাকে৷ আবার দিনাজপুরের কান্তজীর মন্দির দেখে দেখে তার আঁশ মেটে না। একদিন এক বাস দুর্ঘটনায় তার পৃথিবী রং হারিয়ে ফেললো। সে বাসে বাবা ছেলে ফিরছিলো বাড়ির দিকে। বাবা হাসপাতালে গড়ালেন অনেকদিন, পরিবার আস্তে আস্তে সর্বস্ব হারিয়ে বসলো একদিন, ধার-দেনায় এক গলা তারপর তো চলেই গেলেন তিনি। বাবার এই চলে যাওয়া দেখতে হলো না ছেলেকে, তার কদিন আগেই বোঝা গেছে তার চোখের আলো চিরতরে নিভে গেছে। আলো ফেরাবার খরচান্ত চিকিৎসার সক্ষমতা পরিবারটির নেই। বিলকিস এই অভাব আর নিতে পারছিলো না। এক ভোরে বেরিয়ে গেলো, ফিরে এলো না। ত্রিশ পেরোনো ভাই গান গেয়ে কিছু পয়সা উপার্জনের চেষ্টা করতো, ভিক্ষাবৃত্তিই বলা চলে। মায়ের মুখে সারা পৃথিবীর মানচিত্র ভাঁজ ভাঁজ- অশক্ত বুড়ো মানুষ। রাস্তার পাশের ক্ষেত থেকে নামারকম শাক তুলে আনতেন, জলে নেমে শাপলা, মাটি খুঁড়ে আলু কচু, পাড়া ঘুরে গোবর কুড়িয়ে ঘুটে দিতেন। লোকের বাড়ি বাড়ি ঘুরে কাজ করতেন, একটু হয়তো ধান ভানার কাজ, শরীরে কুলিয়ে উঠতে পারতেন না বলে কাজ তেমন পেতেন না, অনেক সময় প্রতিবেশী মানুষজন দু দশ টাকা দিতো। বিলকিসের ঘটনাটা গ্রামে ছড়ানোর পর তাদের একঘরে করা হলো। গ্রামের নেতাগোছের লোকজনের আদেশ লঙ্ঘনের সাহস কেউ করতে পারলো না। অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটছিলো মা ছেলের। শ্যামলী, বিমলা দু’একবার লুকিয়ে চাল, ডাল দিয়ে এসেছে কিন্তু তাদেরও তো সাধ্য কম। বেশিদিন পারেনি। আরো দু’একজন যারা বিলকিসের সাথে প্রাইমারি স্কুলে পড়তো সাহায্যের চেষ্টা করেছিলো। 
একদিন শীতের ভোরে, আলো ভালো করে ফোটেনি, অন্ধ মানুষটির কান্নায় আরো হিম হয়ে উঠলো পরিবেশ- মায়ের শরীরে নেমে এলো হিমযুগের শৈত্য। শ্যামলীরা গিয়েছিলো।  মা বাবা, গ্রামের আরো কেউ কেউ। এই সুন্দর পরিবারটির ধারাবাহিক বিপর্যয়ে ক্ষত কমবেশি সংবেদনসম্পন্ন মানুষের মনে তৈরি না হবার কারণ তো নেই। কবর দেয়ার ব্যবস্থা কেমন করে হবে তা এক দুশ্চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়ালো। আস্তে আস্তে ভীড় ফাঁকা হয়ে এলো। লোকজন যার যার কাজে ফিরে গেলো, গ্রামদেশে ছুটির দিন বলে আলাদা কিছু কোনোকালেই তো ছিলো না। বিলকিসের ভাইয়ের বন্ধু সালাম একটু বেলা হতে কোথা থেকে যেন খবর পেয়ে এলো। সালাম শহরে গার্মেন্টসের সুপারভাইজার। গ্রামে এসেছিলো ছুটিতে। সে তার খালাম্মাকে ভালোবাসতো। খালু যখন বেঁচেছিলেন তিনি আগলে রাখতেন সবাইকে। বিলকিস খালাখালুর শেষ বয়সের সন্তান, তাদের একটা মেয়ের শখ ছিলো। সালাম গ্রামের নেতাদের নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা করলো না। লোকজন ডেকে খালাম্মাকে কবর দিলো। দুই বন্ধুর সামান্য কথাও হলো-
– বন্ধু, আম্মা খুব কষ্ট পেয়ে গেছে না?
পুত্র তখন স্থির, সালামের কান্না থামে না। 
– তোদের এই অবস্থা আমাকে একটু জানালি না বন্ধু!
– তোর ফোন নাম্বার ছিলো না তো ভাই-
কবর হয়ে যাওয়ার পর গোরখোদক আর অন্যেরা চলে গেলো।  দুই বন্ধু ঘরের দাওয়ায় বসে। আরেকটা শীতের বিকেল ঘন হচ্ছে। দুপুরে দুই বন্ধু শুকনো খাবারই খেয়েছে। 
– বোনটা হারিয়ে গেলো, মা আজ চলে গেলো। আমি একলা হয়ে গেলাম।
সালাম তাকালো বন্ধুর দিকে। চুপ করে রইলো কিছুক্ষণ। কিছু একটা ভাবলো। পরদিন সালাম বন্ধুকে নিয়ে নিজের বাড়িতে তুললো। কয়েকদিন বাদে ছুটি শেষ হলে দুই বন্ধু শহরে চলে গেলো। বিলকিসদের ঘর তালাবন্ধ পড়ে রইলো। 
স্কুল থেকে ফেরার পথে বিমলা বন্ধুর বাড়ির সামনের জাম আর কাঁঠাল গাছ দুটো দেখে। কাঁঠাল গাছের গায়ে কাঁটা কম্পাস দিয়ে লেখা বিমলা প্লাস বিলকিস সমান চিহ্ন বিবি। বি বর্ণটা বড়ো করে দুইবার লেখা। জায়গাটা শুনশান।  লোকজন কম। একটা ঝরা পাতা উড়ে এসে বিমলার গায়ে এসে পড়ে। সেই মৃদু স্পর্শে খানিকটা কেঁপে উঠতে হলো। গ্রামের সব মিলে আটজন দূরের হাইস্কুলে পড়তে যায়। ঝরে পড়তে পড়তে এই কয়জন টিকে আছে। নিজেদের ঘরে ঢোকার আগে মূল রাস্তা থেকে নামার সময় এক বেল গাছ, ঠাকুমা বলতেন এখানে ব্রহ্মদৈত্য আছে। কেউ পড়া না করলে রাতে নেমে আসবে। ব্রাহ্মণ পন্ডিতদের মতো তার গায়ে পৈতা। নেমে এসে শাস্তি দেবে। ঘরে ঢুকে বিমলা মা’কে হাত পাখা নিয়ে বাতাস খেতে দেখলো৷ ভাই এখন কিছু একটা ধরে দাঁড়াতে পারে টলোমলো পায়ে। দূর থেকে দেখা যায় বাবা হেঁটে আসছেন। সে তাড়াতাড়ি মাঝারি বালতিতে জল নিয়ে রাখে। বাবা হাত পা ধোবেন। শ্যামলী ছেলেমেয়েদের ছুটি দিয়ে দিয়েছে আগে আগে। আজ তার গঞ্জের এক এনজিওতে  যাওয়ার কথা। একটা চাকরি পেয়ে গেলে পরিবারটা বেঁচে যায়। বাবা হাতমুখ ধুয়ে জল খেয়ে ধাতস্থ হলেন। অনেকক্ষণ চুপ থাকার পরে বিমলাকে ডেকে মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করলেন। তারপর একসময় কেঁদে উঠলেন। বিমলা অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকায়। মা চুপ বরাবরের মতো। হাতপাখাটি নাড়িয়ে তিনি বাবা মেয়েকে বাতাস দিয়ে যাচ্ছেন। শ্যামলী বেরিয়ে গেলো একটু আগে৷ 
***
মনোরঞ্জন পাল অনেকক্ষণ ক্যাশ কাউন্টারে বসে আছে। তার সমস্যা ঘন্টাখানেক গেলেই ঘরে একলা বউকে মিস করা শুরু করে। লাঞ্চে বাসায় চলে যায় সেইজন্য। বেশ টাকা বেরিয়ে যায় আসা যাওয়ায়, তবুও। চারজন কন্টিনিউ কাজ করে যাচ্ছে। জুতোর নানা সাইজ আর ডিজাইনের বিজ্ঞাপন তো প্রতিদিন পত্রিকায় যায়, টেলিভিশনে যায় ফলে বিক্রির একটা ধারাবাহিকতা আছে। পাশের দোকান থেকে চিৎকার শুনে ক্যাশবাক্সে তালা মেরে বেরোলো। একটা ছেলেকে বেধড়ক মারা হচ্ছে, শো পিসের দোকান, ছোটো এক জিনিস তুলে নিয়েছিলো, সিসিতে সরাসরি দেখেই তাকে ধরা হয়েছে। আর বাঙালি মারধোরের সুযোগ পেলে সাধারণত ছাড়ে না। একটা চোখ ফুলে গেছে তার মার খেয়ে৷ ছেলেটির সহ্যশক্তি ভালো। দেখে, ভালো ঘরের ছেলেই মনে হলো। মনোরঞ্জনের সাথে পাশের দোকানদারের হৃদ্যতার সম্পর্কই। ‘ছেড়ে দেন না।’ মনোরঞ্জনের তিনটে শব্দে ভিড় একটু থমকালো। মার্কেটে কেউ কখনো মনোরঞ্জনকে একটি অতিরিক্ত শব্দ বলতে দেখেনি। তাই মারটা থামে। একজন বলে ওঠে,’ওর বাপরে খবর দেন।’ মনোরঞ্জন আবার ঘটনার মধ্যে ঢুকে পড়ে। ‘ ও আমার পরিচিত। ছেড়ে দেন। বাচ্চা ছেলে ভুল করেছে, শাস্তি পেয়েছে, ছেড়ে দেন।’ ছেলেটা ছাড়া পেলো। মনোর জুতার দোকানের ভেতরের দিকে এক স্টোররুম আছে। দু তিনজন বসে বিশ্রামও নিতে পারে। ছেলেটাকে ওখানেই বসিয়ে রেখে ফ্যান চালিয়ে দিলো। ‘খানিক বসে রেস্ট নাও।’ মনোরঞ্জন ওর জন্যে ফান্টা আনালো৷ দোকানের লোকজন অন্য এক মনোরঞ্জনকে দেখে অবাক হচ্ছিলো। ছেলেটা চলে গেলো এক সময়। সেদিন লাঞ্চে বাসা ফেরা হলো না। রাতে ঘরে ফেরার সময় রিক্সায় যেতে যেতে অনেক বছর পর মনোরঞ্জন একটা সিগারেট ধরালো। অনেক বছর আগে এক বইদোকানে বই এভাবেই মার খেয়েছিলো সে। চুরির সন্দেহে। অথচ কাজটা সে করেনি। পরদিনই তার সব বই ঠেলাগড়িতে তুলে সে পুরনো দোকানে বিক্রি করে দেয়। আর কোনোদিন বই হাতে তোলেনি। ছেলেটিকে দেখে তার নিজেকে মনে পড়ে গিয়েছিলো অনেকদিন পর। নিজেকে মানুষের যখন মনে পড়ে তখন আর নিয়ন্ত্রণ থাকে না নিজের উপর। রিক্সায় বসে কিশোরবেলার অপমানিত, নতমাথা মুখটি মনে পড়তে মনোরঞ্জনের বুক ব্যথায় ভরে উঠলো। 

মন্তব্য করুন




আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত