হিম (পর্ব-১২)

সকালে মৃদু বৃষ্টি হয়েছিলো। রাস্তার এক স্নান হয়ে গেছে। দোকান পাট এখনো বন্ধ। দু’একজন তরুণ পত্রিকাবিক্রেতা ফ্ল্যাটবাড়ির দরজার নিচে গুঁজে দিচ্ছে তাজা কাগজ৷ আজ এক হাত লম্বা কবিতা ছাপানোর দিন৷ আজ শুক্রবার। শুক্রজাতীয় কাব্যভাব আজ বেরিয়ে যাবে কোনো কোনো কবির। সুধন্য অনেক রাত পর্যন্ত সিনেমা দেখেছে। সপ্তম বারের মতো ‘ইন দ্য মুড ফর লাভ’ – ওং কার ওয়াইয়ের। গ্রেট পরিচালক। শিষ্যরা কেউ কেউ অস্কার পেয়ে গেলেও তিনি পাননি। অবশ্য তাঁর এসবের দরকার পড়ে না। সুধন্য’র প্রিয়তম পরিচালক তিনি। তার অনেকদিনের ইচ্ছে এই ভদ্রলোককে নিয়ে একটা বই লেখে৷ অনেকগুলো চিঠি ওং কার ওয়াইয়ের চরিত্রদের কাছে। প্রেমপত্র সংকলনের মতো। যেমন, হ্যাপি টুগেদারের পুরুষ দুটিকে তার লিখতে ইচ্ছে করে৷ যে পুরুষ অন্য একটি পুরুষকে ভালোবেসে জীবন কাটাতে পারে সে জীবনকে আশ্চর্য মনে হয়। যেমন, এক নারী অন্য নারীকে৷ মূলত, ভালোবাসা-ই আসল। মূল কথা, পূর্ণতার অনুভূতি৷ তোমাকে ভালোবেসে আমি পূর্ণ হলাম কি না কিংবা আমাকে ভালোবেসে তুমি! যখন মানুষ পরস্পরে বিলীন হয়ে যায় তখন অন্য পক্ষের উপস্থিতি খুব একটা জরুরি থাকে না৷ তুমি আছো এটুকুই যথেষ্ট৷ পৃথিবীতেই তো আছো। কিংবা হয়তো তোমার শরীরটা মৃত কিন্তু স্মৃতি চিরজীবিত। তার মৃত্যু নেই৷ 
ভোর বেলা নিজে নিজে একটু চা করে নিলো৷ ফেসবুকে ঢুকে দেখলো সীতা অনলাইনে। সে বিপ্লবের স্বপ্নে বিভোর। ঐ বয়সে সুধন্যও অনেক মিছিল করেছে তারপর দেখলো বিপ্লব জিনিসটা এমন এক জ্যামে আটকেছে তার আর নিস্তার নেই৷ তবে আশা ছাড়েনি এখনো অবশ্যি। আহা! মেজদির মতো সীতাও দিনরাত এক করে ফেলছে। কিন্তু মেজদি তো পড়াশোনা করেছিলো ঠিকঠাক৷ এ তো পড়াশোনার ধারে কাছে নেই৷ তবে আরেকটা কথা-ও মনে হয়। সীতার ব্যাপারে এতো অধিকারবোধ জন্মালো কখন তার! এবং কেন? যদিও মনের অলি গলি তস্য গলি অনুসন্ধান করেও কোনো সদুত্তর পায়নি৷ যে শার্প পোস্ট সে ফেসবুকে দেয় তার ভাষাবোধ দেখেই সুধন্য বোঝে নিদেনপক্ষে তার বয়সে নিজে এতো ভালো গদ্যভাষা লেখা দূরে থাক, কল্পনা-ই করতে পারত না৷ এখনো যে পারে তা নয় কিন্তু বিশাল এই লেখার ক্ষমতাটুকু কেবল ব্যবসাসফল সিনেমার আলোচনা লিখে কাটালে তো মুশকিল অবশ্য মেয়েটি রাজনৈতিকভাবে শিক্ষিত, এটি আশার কথা। বামপন্থী পার্টিগুলো আর কিছু পারুক না পারুক, কর্মীদের একটা দৃষ্টিভঙ্গী তৈরি করে৷ একটা জিনিসকে দেখার চোখ। 
– সুধন্যদা, সুপ্রভাত
– সুপ্রভাত, রাত জাগলে না ঘুম থেকে উঠলে?
– আমি পড়া করছিলাম খানিক আর তারপর অদ্বৈত’র অনুবাদে ‘জীবন-তৃষা’ পড়লাম এতোক্ষণ- আপনি কি করলেন?
– ইন দ্য মুড ফর লাভ দেখলাম। দেখেছো?
– না, কেমন ছবি? ভালো?
– সপ্তমবার দেখলাম আজ।
বিস্ময়ের ইমোটিকন। 
– বিষয় কি ছবিটার? 
-একস্ট্রা ম্যারিটাল এফেয়ার-
– আচ্ছা, আপনি বিষয়টা কিভাবে দেখেন?
সুধন্য একটু বিব্রতবোধ করে। সকাল সকাল উচ্চ মাধ্যমিকের মেয়েকে এ জিনিস কেমন করে বোঝায়? 
– দেখো সীতা, ভালোবাসার তো কোনো প্রি পোস্ট নেই। যেমন কি না আধুনিকতা,  মর্ডানিজম। আধুনিকতা সব সময় আধুনিক। আবার ভালোবাসা সব সময় তো ভালোবাসা-ই, বুঝলে?
– বুঝলাম- কিন্তু কি সে-ই স্পেসিফিক কারণ?  আপনাকে যার জন্য সাতবার দেখতে হলো?
– এক কথায় বোঝানো কি যায় সব? তুমি একবার দেখে নিতে পারো- 
চপ্পলের শব্দ। বাবা উঠে পড়েছেন। ছাত্রেরা আসবে একটু পর-
– কি রে সু, ঘুম হলো না জেগেই কাটালি?
বাবা ঝকঝকে হাসেন৷ ওয়াশরুমে ঢুকে পড়েন তারপর। জল পড়ার শব্দ শোনা যায়৷ 
– সুধন্যদা, একটা কথা ছিলো-
– বলে ফেলো চাঁদ- 
– আমি একজনকে ভালোবাসি।
– ভালোবাসা তো প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হবার মত ব্যাপার, তারপর?
– সে ভালোবাসে কি না জানি না
– জানবে হয়তো আরো কিছু সময় গেলে। কিছু অনুভূতিকে অনেক সময় দিতে হয়।
সীতা চুপ হয়ে গেলো। হয়তো কিছু ভাবছে। ইশরাত ঘুম থেকে উঠলো কি? একটা সুপ্রভাত টেক্সট পাঠিয়ে রাখা যাক৷ সকালে ঘুম থেকে উঠে দু চারলাইনের ভালো কথা পড়লে মন ভালো হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। 
বাবা স্নান সেরে বেরোলেন৷ 
– শোনো বাবা, তোমাকে একটু হাজারী গলি যেতে হবে
– আচ্ছা বাবা
– লিস্টটা নিয়ে যেও মনে করে।
সাতটা বাজলো ঘড়িতে। 
– বাবা, নয়টার দিকের বেরোলে হবে?
– হবে হবে।
ফ্লাস্ক থেকে রং ঢেলে দুধ মিশিয়ে একটা জিরো ক্যাল ট্যাবলেট ফেলে বাবা চুমুক দিতে দিতে পত্রিকা পড়তে লাগলেন৷ মা ফুল তুলতে এলেন, সকালের পুজোর। বড়ো বারান্দার এক কোণায় বেশ কয়েকটা ফুলের টব। বাবা মায়ের দিকে তাকিয়ে হাসলেন। মা-ও৷ সুধন্যর হঠাৎ মনে হলো, আমাদের এখনকার প্রজন্ম এভাবে ভালোবাসতে পারে না। 
দুই তিনটা পাখি একসাথে ডেকে উঠলো৷
 সুধন্য বাবাকে ডেকে দিতে বলে ঘুমোতে চলে গেলো বিছানায়। 
‘আজ তোমাকে ভয়ানক মনে পড়ছে। হয়েছে কি, মেসেঞ্জারে কি একটা চেক করতে গিয়ে আমাদের সাত বছর আগের মেসেজগুলোতে চোখ পড়লো। আর কান্না পেলো। এক জায়গায় লেখা ‘আমাদের স্বপ্নগুলো কোনোদিনই পূরণ হবে না’। জানি যে, এইসব ফুরিয়ে যাওয়া দিনের কথাবার্তা শোনার আগ্রহই নেই আর তোমার। তবু জানালাম যে, মনে পড়লো। মন আছে তাই মনে পড়লো। কয়েকদিন আগে ফ্রোজেন টু দেখার সময়েও সেম কান্ড। মন খারাপ হলো পার্ট ওয়ানের মেমোরি মনে আসায়। ভালো থেকো অনেক। এমনি জানালাম। কিছু এসে না গেলেও জানালাম আর কি। তোমার জন্মদিনে রিপ্লাই পেয়ে আনন্দ হয়েছিলো। ফর্মাল ধন্যবাদ শব্দে আনন্দ৷ চার বছর পর। আবারো হয়ত আট বছর পরের কোনো জন্মদিনে তোমাকে উইশ করে ধন্যবাদ পাবো, বেঁচে থাকলে। একটু লিখতে ইচ্ছে করলো৷ তাই। দয়া করে গালিটালি দিও না। আমি জানি, বিবাহিত লোকের পুরনো স্মৃতি রোমন্থন অন্যায্য কিন্তু স্মৃতির তো আর থানা পুলিশ নেই৷ তাহলে তো বেঁচে থাকাই অসম্ভব হয়ে যেত।’
পুরনো মেলটা দেখে আরো পুরনো অনেক কথা মনে পড়লো মনোরঞ্জন পালের। সে বিবাহিত। প্রাকবিবাহ প্রেমের স্মৃতি এখনো ভুলতে পারেনি৷ যদিও তা বলে বউকে ঠকায়নি। সমস্যা হলো, স্মৃতির কোনো সীমানা নেই৷ বউ ঘুমিয়ে পড়লে অনেক রাতে বারান্দায় বসে সেসব ছেলেমানুষী দিনের কথা ভাবতে তার ভালো লাগে। কোনো আইনে তো আর লেখা নেই, হে নাগরিক বিয়ের পর তুমি প্রাক্তন প্রেমের স্মৃতি রোমন্থন করতে পারবে না। অবশ্য কমরেড আর প্রেম কখনো প্রাক্তন হয় বলে মনে করে না মনোরঞ্জন৷ কারণ প্রেম বেঁচে থাকে নানা ফর্মে৷ এই যে আমি বেঁচে আছি তা তো প্রেম বেঁচে আছে বলেই। বউ যে ডালে ফোড়ন দেয় আর তার ফলে ডালের প্রতিটি চুমুক সুস্বাদু হয়ে ওঠে তা তো প্রেম আছে বলেই। কিংবা সে নিজে যে একটা যে কোনো দিন চলে যেতে পারে টাইপ বেসরকারিতে আছে তার কারণও তো প্রেম৷ ইনফ্যাক্ট, পারিবারিক বিয়ের সূত্রে দেখতে পাওয়া মেয়েটিকে প্রথম দেখাতেই কেমন একটা মায়ায় পড়ে গেলো। মায়া মানে কি? ঐ জড়োসড়ো বসে থাকবার ভঙ্গি?  না খানিক বাদে বাদে অনিশ্চিত চোখ তুলে দেখাটুকু? কিংবা সেদিনই আংটি পরিয়ে দেয়ার সময় হঠাৎ ফুঁপিয়ে ওঠা? মেয়েটির দিকে তাকিয়ে তখন তার মনে মনে বলতে ইচ্ছে করলো, দেখো আমিও তোমার মতোই নিরুপায়, আশা করা ভুলে যাওয়া একজন মানুষ৷ এসো না কিছুদিন একসাথে থেকে যাওয়া যায় কি না দেখি! 
পুরনো মেলটা ফেলে দিয়ে বউয়ের দিকে ফিরলো সে। বউ অঘোরে ঘুম৷ সে খানিক তাকিয়ে থাকে তার দিকে। যত দিন যাচ্ছে এই মেয়েটির মায়ায় জড়িয়ে যাচ্ছে না কি? তার তো অন্য পরিকল্পনা। মায়ায় জড়ালে তো বিপদ। 
কপালে একটা চুমু দিয়ে সে উল্টো দিকে ফিরে কোলবালিশ জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়লো। 
মেয়েটির মুখে ঘুমঘোরে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠলো, ঘুমঘোরে। 

মন্তব্য করুন




আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত