| 21 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
ইতিহাস

ইতিহাস: কে কবে কখন ছাতা আবিষ্কার করেছিল

আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট

রোদ থেকে ত্বককে সুরক্ষা করার জন্য ছাতার (Umbrella) আবিষ্কার হলেও বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে বৃষ্টি থেকে সুরক্ষা পাবার জন্য। বৈজ্ঞানিকভাবে বলতে গেলে ছাতা শুধু রোদের তাপ বা বৃষ্টি থেকেই রক্ষা করে না, ক্ষতিকর অতি বেগুনি রশ্মি থেকেও শরীর বাঁচায়, ত্বককেও রক্ষা করে।


Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com


ছাতা চিহ্নটি সুরক্ষার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। হাল আমলে ফ্যাশনের উপাদান হিসেবেও ছাতার ব্যাপক ব্যবহার চোখে পড়ছে। আমরা জানি, ফ্যাশন করার জন্য স্থান-কাল-রূপ-রঙ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ষড় ঋতুর বাংলাদেশে ঋতুভেদে পোশাক ও ফ্যাশন উপাদানও পরিবর্তিত হয়ে থাকে।

ছাতার ইংরেজি প্রতিশব্দ ‘Umbrella’,। তবে সম্প্রতি ‘ব্রুলি’ ও ‘গ্যাম্প’ নামে দুটি শব্দও এর সঙ্গে যোগ হয়েছে। আমব্রেলা শব্দের সঙ্গে আমাদের পরিচিতি থাকলেও ব্রুলি ও গ্যাম্প শব্দ দুটি নতুন। আমব্রেলা শব্দটি এসেছে লাতিন ভাষার মূল শব্দ ‘আমব্রা’ থেকে, যার অর্থ ‘ছায়া’। আর ছাতা নামটি এসেছে লাতিন শব্দ ‘টগইজা’ থেকে, যার অর্থও ছায়া।

কে, কবে, কখন ছাতা আবিষ্কার করেছিল, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। কেউ বলে মিশরীয়রা কেউ বলে চীনারা ছাতার আবিষ্কার করেছে। তবে প্রায় চার হাজার বছর আগের ইতিহাস থেকে জানা যায় মিসর, গ্রিস ও চীন দেশের চিত্রকর্মে ছাতার নিদর্শন রয়েছে। মিশরীয় চিত্রলিপিতে এবং সমাধিতে-মন্দিরে আঁকা ছবি থেকে বোঝা যায়, খ্রিস্টপূর্ব ২৫০০-২৪০০ অব্দের দিকে রাজা ও দেবতাদের ছায়াদানের জন্য চারকোণা সমতল ছাতা ব্যবহার করা হত।


Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com


ছাতার রয়েছে এক রাজকীয় ইতিহাস। এক সময় অভিজাত ব্যক্তিগণই ছাতা ব্যবহার করতো। এক সময় চীনা রাজদরবারগুলোতে অসংখ্য ছাতার ছবি আঁকা থাকত। ১২৭৫ খ্রিস্টাব্দে পরিব্রাজক মার্কো পোলো গিয়েছিলেন কুবলাই খানের দরবারে। সেখানে তিনি দেখেছেন, সেনাপতির মাথার উপর সম্মানসূচক ছাতা মেলে ধরা হয়েছে। চীন থেকেই রাজছত্রের ব্যবহার জাপান এবং কোরিয়ায় চালু হয়। জাপানে কয়েক শ’ বছর ধরে কেবল রাজারাই ছাতা ব্যবহার করতে পারতেন। কোরিয়ায়ও ছিল একই রীতি। সেখানেও ছাতাকে রাজকীয় প্রতীক হিসেবে মনে করা হত। সে সময় রাজার ছবি আঁকার উপরও নিষেধাজ্ঞা ছিল। শিল্পীরা ঘোড়ার উপর রাজছত্রের ছায়া এঁকেই রাজার উপস্থিতি বোঝাতেন।

মিশরে চারকোনা ছাতা আবিষ্কারের কয়েকশ বছর পর মেসোপটেমিয়া (বর্তমানে ইরাক) অঞ্চলে রাজছত্র আবিষ্কার হয়। প্রাচীন আসিরিয়া নগর ছিল টাইগ্রিস নদীর তীরে। সে নগরের নানিভে এক খোদাইচিত্রে দেখা যায়, গোলাকার একটি ছাতা রাজার মাথার উপর ধরে রাখা হয়েছে। পরে মেসোপটেমিয়ার পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলেও রাজছত্রের প্রচলন হয়।


Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com


আফ্রিকা মহাদেশেও ছিল রাজছত্রের প্রচলন। ইথিওপিয়ার দ্বাদশ শতকে আঁকা ছবি ও প্রাচীন গ্রন্থে প্রমাণ আছে রাজছত্র ব্যবহারের। এখনও সেখানে সেই ঐতিহ্য অক্ষুণ্ন রয়েছে। বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতার রচনাতেও পূর্ব আফ্রিকায় রাজকীয় ছাতা ব্যবহারের উল্লেখ রয়েছে। তিনি ১৪ শতকে পূর্ব আফ্রিকা ভ্রমণ করেছিলেন। তার রচনায় উল্লেখ আছে, রোদ থেকে রক্ষা পেতে সে সময় সে দেশের রাজারা ছাতা ব্যবহার করতেন।

ভারতবর্ষের রাজছত্রের ইতিহাসও অনেক প্রাচীন। খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ অব্দে রচিত বৌদ্ধদের প্রাচীন গ্রন্থ থেকে জানা যায়, তখনও ভারতবর্ষে ছাতার প্রচলন ছিল। ভারতীয় রাজাদের মধ্যে রাজছত্র ব্যবহার ছিল ঐতিহ্যের অংশ। খ্রিস্টীয় নবম শতকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় রাজছত্রের প্রসার ঘটে। কম্বোডিয়া, লাওস, মায়ানমার, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম এবং জাভার বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ রাজছত্র ব্যবহার শুরু করে।


Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com


পারস্য পর্যটক ও লেখক জন হ্যানওয়ে সপ্তদশ শতাব্দীতে পর্তুগাল থেকে প্রথম ইংল্যান্ডে ছাতা নিয়ে আসেন। তিনি যখনই ঘর থেকে বের হতেন, ছাতাটা তাঁর হাতে থাকতই, যেন শরীরেরই একটি অঙ্গ! ফলে এ বস্তুটি নিয়ে মানুষ কৌতূহলী হয়ে পড়ে। লন্ডনে বসবাসরত মানুষ ক্রমে ব্যবহার শেখে ছাতার। মূলত তিনিই ইংল্যান্ডে পুরুষদের মধ্যে ছাতার ব্যবহার জনপ্রিয় করে তোলেন, যে কারণে ইংরেজদের মধ্যে ছাতার আরেক নাম ‘হ্যানওয়ে’। শুধু লন্ডন নয়, যেসব এলাকায় প্রচুর বৃষ্টিপাত হতো, সেখানেই ছাতার ব্যবহার দেখা যেত। ইংরেজরা যদিও ছাতা আবিষ্কার করেনি, কিন্তু সপ্তদশ শতকে তারাই পানি রোধক ছাতার আবিষ্কার ও ব্যবহার শুরু করে। এটি খুব মজবুত না হলেও একটি প্রয়োজনীয় উপকরণ হিসেবে বিভিন্ন দেশে গ্রহণযোগ্যতা পায়। ছাতা আবিষ্কারের কাহিনী অনেক পুরনো হলেও অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত ছাতার আকৃতি ছিল অনেক বড় এবং ওজনও ছিল বেশি। যেহেতু ছাতার রডগুলো ছিল কাঠের বা তিমি মাছের কাঁটা দিয়ে তৈরি এবং হাতল ছিল প্রায় দেড় মিটার লম্বা, তাই ছাতার গড় ওজন বেশি ছিল, আনুমানিক চার-পাঁচ কেজি। ইউরোপে ছাতার ব্যবহার শুরু হয় ফ্যাশন হিসেবে। অভিজাত শ্রেণীর মহিলারা প্যারিস থেকে সিল্ক ও দামি ঝালর বসানো লেসের ছাতা আনত, যার হাতলে ব্যবহৃত হতো অ্যানামেল। কিছু কিছু হাতল ছিল দেখতে ব্যানারের মতো। এমনকি সে সময় মহিলারা যে ধরনের স্কার্ট পরিধান করত, সে রকম মডেলেরও ছাতার ব্যবহার ছিল। বর্তমানে হংকং ও জাপানের ছাতা বেশ নামকরা।


Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com


বিশ্বের প্রথম ছাতার দোকান ‘জেমস স্মিথ অ্যান্ড সন্স’ চালু হয় ১৮৩০ সালে এবং এই দোকান লন্ডনের ৫৩ নিউ অক্সফোর্ড স্ট্রিটে আজো চালু আছে। ১৮৫২ সালে স্যামুয়েল ফক্স স্টিলের চিকন রড দিয়ে রানী ভিক্টোরিয়ার জন্য ছাতা তৈরি করেন। ইংল্যান্ড, বিশেষ করে লন্ডনে প্রচুর বৃষ্টি হয়। এ জন্য সেখানে ব্যাপকভাবে ছাতার ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। যে কারণে লন্ডন ছাতার শহর হিসেবে পরিচিত।

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত