| 18 জুন 2024
Categories
ধারাবাহিক লোকসংস্কৃতি

নারী পুরুষের মিলন কাহিনী (পর্ব-২০)

আনুমানিক পঠনকাল: 5 মিনিট

বিবাহ  মানব সমাজের প্রাচীনতম প্রতিষ্ঠান। যুগে যুগে প্রতিষ্ঠানটি এর আদি রূপ থেকে বর্তমান কাঠামোয় উপনীত হয়েছে। বিবাহপ্রথাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে প্রধানত ধর্ম। বিয়েসংক্রান্ত সকল নিয়মকানুন বিধিবদ্ধ হয়েছে ধর্মীয় অনুশাসনে। প্রাচীনকাল থেকে বাংলায় ধর্মীয় শাস্ত্রের বিধানই ছিল সামাজিক আইন, ধর্মীয় আইনের দ্বারাই শাসিত হতো সমাজ-সংসার। ধর্মীয় এবং রাষ্ট্রীয় আইনের পাশাপাশি লোকজ সংস্কৃতিও বৈবাহিক জীবনকে প্রভাবিত করেছে নানাভাবে। মনুস্মৃতি এবং অর্থশাস্ত্রে আট প্রকারের হিন্দু-বিবাহ পদ্ধতির উল্লেখ আছে। ‘ব্রাহ্ম’, ‘দৈব’, ‘আর্য’, ‘প্রজাপত্য’, ‘অসুর’, ‘রাক্ষস’, ‘পৈশাচ’ ও ‘গান্ধর্ব’ এই আট ধরনের বিবাহের মধ্যে ব্রাহ্ম বিবাহই শুধু গ্রহণযোগ্য ছিল। দায়ভাগ গ্রন্থে জীমূতবাহন উল্লেখ করেছেন যে, ব্রাহ্ম, দৈব, আর্য, প্রজাপত্য এবং গান্ধর্ব বিবাহ অনিন্দনীয়। ধর্মশাস্ত্রের বিধান অনুযায়ী নিজ বর্ণের মধ্যে বিবাহ ছিল সাধারণ নিয়ম। সবর্ণে বিবাহ উৎকৃষ্ট হলেও মনু ব্রাহ্মণ পুরুষকে নিজ বর্ণ ছাড়া নিম্নতর তিন বর্ণে বিবাহের অধিকার দিয়েছিলেন। মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যে, যেমন চন্ডীমঙ্গলে, মুসলমানদের নিকা বিবাহের কথা বলা হয়েছে। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে, এমনকি বিশ শতকেও মুসলমানদের মধ্যে বহুবিবাহ ব্যাপক হারে প্রচলিত ছিল। উচ্চশ্রেণীর অবস্থাপন্ন মুসলমানদের একাধিক স্ত্রী থাকত। বিশ শতকের শুরুতে কুলীনদের বাইরে হিন্দু সমাজে বহুবিবাহ তেমন প্রচলিত ছিল না। বিয়ের এমন অনেক জানা অজানা বিষয়ে আলো ফেলেছেন ড. রোহিণী ধর্মপাল তাঁর এই ধারাবাহিক ‘নারী-পুরুষের মিলন কাহিনী’-তে। আজ থাকছে নারী-পুরুষের মিলন কাহিনীর ২০পর্ব।


রাম লক্ষ্মণের সঙ্গে কথা বলছেন, এমন সময় সেখানে এসে হাজির হল শূর্পনখা, রাবণের বোন। দণ্ডকারণ্যের খর আর দূষণেরও বোন। সে রামকে দেখে মুগ্ধ হয়ে বিয়ের প্রস্তাব দিল। লক্ষ্মণ আর সীতাকে খেয়ে নিলেই তো হল!
এখন কথা হচ্ছে, এই প্রস্তাবে রাম সরাসরি “না “বললেও হয়ত যথেষ্ট ঝামেলা হত। কিন্তু রাম ঠিক না বললেন না। বরং দিব্যি মিথ্যা বললেন! হ্যাঁ,  পরিষ্কার মিথ্যা। বললেন, আমি তো বিবাহিত, দেখতেই পাচ্ছ। বরং আমার এই কোলপোঁছা ভাইটি বিয়ে করে নি এখনও, অথচ বিয়েপাগলা হয়ে উঠেছে! আর তোমার যা রূপ! দারুণ মানাবে! 
বেচারা শূর্পনখা! রামকে ছেড়ে ধরল লক্ষ্মণকে! সত্যি, এ ব্যাটাকেও দেখতে ভালোই! আর কাউকে মারাটারার ঝামেলা নেই! একেই পাকড়ানো যাক্!
লক্ষ্মণের কাছে যেতেই তিনি হাসতে হাসতে বললেন, “আমি তো রামের চাকর মনিষ্যি । আমাকে বিয়ে করলি চাকরাণী হয়ে থেকে যেতে হবে, তা কি তোমার পোষাবে !! বরং, তুমি রামের ছোট বউ হয়ে যাও। আর ওই একটু আগে যেমন বলছিলে, তোমাকে পেলেই, –মানে তুমি যা রূপবতী– ওই অসতী কুৎসিৎ চিরুণদাঁতী, পেটরোগা সীতাকে রাম ভুলে যাবেন!”
শূর্পনখা তো বুঝতেই পারছিল না যে দুই ভাই স্রেফ যাচ্ছেতাই নির্মম ঠাট্টা করছেন! সে বেচারী ফের রামকে বলল, “তুমি যখন এই বিশ্রী মানুষীটাকে ছেড়ে আমার কাছে আসছ না, তখন রও, একে তোমার সামনে এখুনি আমি কচমচিয়ে খাব আর তোমার সঙ্গে থাকব” এই বলে চোখ পাকিয়ে সীতাকে খেতে গেল! তখন রাম দেখলেন মহা বিপদ উপস্থিত! লক্ষ্মণকে বললেন, “এর সঙ্গে ঠাট্টা তামাশা না করলেই পারতে!” অথচ শুরু করেছিলেন নিজেই!! ” এখন শিগগিরই একে থামাও। এর বরং অঙ্গ নষ্ট করে দাও”। তখন লক্ষ্মণ খড়্গ দিয়ে শূর্পনখার নাক কান দুইই কেটে দিলেন! রক্তাক্ত শূর্পনখা তারস্বরে  চিৎকার করতে করতে খরের কাছে গিয়ে আছাড় খেয়ে পড়ল।
 বোনের হাল দেখে খর দূষণ শত শত রাক্ষুসে সৈন্য নিয়ে ছুটে এল। রাম লক্ষ্মণের ওপর সীতাকে দেখার ভার দিয়ে একাই শতসহস্র হয়ে লড়লেন! সে কী লড়াই। বাপ্ রে বাপ্! দশ দিক আঁধার হয়ে গেল বাণ বাণে! চারিদিকে শুধু ধনুর টঙ্কার আর নিহতদের আর্ত নাদ!
এখন বলা হয়, এই খর দূষণ প্রভৃতিরা বনেচর। এরাই অনার্য। আর্যরা এসে এদের হটিয়ে দেওয়ায় এরা বনে বাস করতে বাধ্য হয়েছে। তাই যদি হয়, তাহলে এরা প্রথম থেকে বনচর নয়! আর এরা তো সকলেই লঙ্কারাজ দশাননের আত্মীয় স্বজন! তাহলে হেলাফেলা করার মত তো নয়!
আর ঋষিরাও তো প্রথম থেকেই বনে জঙ্গলেই তাঁদের তপোবনাশ্রম গড়ে তুলতেন। আর এরা সেই ঋষিদের মেরে খেত। ঋষিদের কাজে সবরকমে ব্যাঘাত ঘটাত। বরং এদের শক্তি এত বেশি ছিল যে ঋষিরা কিছুই করতে পারতেন না, অসহায়ের মত মরা ছাড়া। তাই এদেরকে পুরোপুরি বেচারা, আক্রান্ত, অত্যাচারিত বলাটা কি ঠিক!! মানে রামকে যেমন দেবতা বানানোতেও আমার আপত্তি, তেমন জোর করে ভিলেন বানানোতেও আপত্তি! আর ওই সুপারহিরোরা যখন লড়াই করে, তাদের লড়াইয়ে কত সাধারণ মানুষ মারা যায়, বাড়িঘর ভেঙে চুরচুর হয়ে যায়, সব তো চকচকে মুখে দেখি, তখন তো আপত্তি ওঠে না! আর ঋষি বলে কি আত্মরক্ষার্থে উদ্যোগ নেওয়া খারাপ? যেখানে তাঁরা কিন্তু নিজেদের যাগযজ্ঞ অধ্যায়ন অধ্যাপনা নিয়েই ব্যস্ত, রাক্ষসদের কোনো ক্ষতি কথার কোনো ইচ্ছেই তাঁদের ছিল না?
এখানেও রাম ধরে নিন ঋষিদের প্রতিভূ । তাও নিজে থেকে লড়াই শুরু করেন নি, আগে কথা দিয়ে থাকলেও; যদিও এক্ষেত্রে তাঁদের অশালীন রসিকতার মাত্রাছাড়া হয়ে যাওয়াতেই গোলটা আরো পাকলো, তাতে সন্দেহ নেই। তবে রাম যখন বৈখানস, বালখিল্য, সংপ্রক্ষাল প্রভৃতি মুনিদের কাছে অনুরুদ্ধ হয়ে কথা দিয়েছিলেন রাক্ষসদের পীড়ন থেকে তাঁদের রক্ষা করবেন; তখনই সীতা বলেছিলেন, “মিথ্যা কথন, পরদারগ্রহণ আর অকারণ রৌদ্রতা ঠিক নয়। মিথ্যা তুমি বলো না ( যদিও শূর্পনখাকে বলেছেন পরেই, অর্থাৎ ঠাট্টা তামাশা করে মিথ্যা বলাকে মিথ্যার মধ্যে ধরা হত না হয়ত ), অন্যের বউয়ের প্রতি লোভ তোমার এখনও নেই, পরেও হবে না (মেয়ের কী অগাধ বিশ্বাস দেখুন )। কিন্তু শুধু শুধু রাগ হিংস্রতা বড় খারাপ । আমরা তো এখানে যুদ্ধ করতে আসিনি।” কী সুন্দর করে বললেন সীতা! আসলে রামের জন্যে চিন্তাও হচ্ছে, এই বনে এসেও লড়াই-ঝগড়ার থেকে রেহাই নেই বরের!
 কিন্তু ঢেঁকি যেমন স্বর্গে গিয়েও ধান ভাঙে, যতই বনবাসী তপস্বীর মত পোষাক পরুন, আদতে তো ক্ষত্রিয়, তাই যেমন মাংস খাওয়া ছাড়তে পারেন না, তেমন অনুরুদ্ধ হলে বা আক্রান্ত হলে লড়াই করাও ছাড়া সম্ভব নয়! তাই রাম আক্রমণ করতে আসা সবাইকে মারলেন। বেঁচে গেল কেবল একটি রাক্ষস। তার নাম অকম্পন হলে হবে কী, কাঁপতে কাঁপতে সে গিয়ে পড়ল একেবারে লঙ্কায়, রাবণের কাছে! আচ্ছা, রাবণের না হয় অনেক ক্ষমতা ছিল, অকম্পন তো নেহাতই চুনোপুঁটি এক রাক্ষস, সে সমুদ্র পেরিয়ে এত সহজে লঙ্কায় গেল কি করে!
এই অকম্পনই কিন্তু অকম্পিত স্বরে, সবার আগে রাবণকে সীতাহরণের পরামর্শ দিল। শূর্পনখা আসবে next scene এ। অকম্পন সংক্ষেপে সীতার রূপ বর্ণনা করল, তার দেহ সৌষ্ঠবের কথা বলতেও ভুলল না, সব বলে টলে সে ব্যাটা বলল, “এই সুন্দরীটিকে অপহরণ করে আনুন, রাম মনের দুঃখে এমনিই মরে যাবে”! রাবণ এমন charged up হলেন, যে পরদিন সকালেই এসে হাজির দণ্ডকারণ্যে, মারীচের কাছে। মারীচ কিন্তু প্রথমবার রাবণকে বুঝিয়ে টুঝিয়ে ফেরত পাঠিয়ে দিলেন।
কিন্তু রাবণের বিধি বাম হয়েছেন! তাই তারপরেই শূর্পনখা এল লঙ্কায়। সবার সামনেই রাবণকে যাচ্ছেতাই করল, বলল, “তুমি কেমন রাজা! কোনো খোঁজ রাখো না! রাম একাই চোদ্দ হাজার রাক্ষসের সঙ্গে খর ও দূষণকেও মেরেছে! আর তুমি কিছুই জানো না! আর এই রামের পরমাসুন্দরী বউ সীতাকে তোমার জন্য নিয়ে আসতে গিয়ে রামের ভাই লক্ষ্মণ আমাকে কী হাল করেছে দেখো!”
সুতরাং রাবণ আবার এলেন দণ্ডকারণ্যে, মারীচের কাছে। রাবণের ধমক খেয়ে, ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও মারীচ অপরূপ মণিমাণিক্যখচিত সোনার হরিণের রূপ নিল, আর সীতার কুটিরের সামনে আপনমনে খেলা করতে শুরু করল।
 এরপর তো সবাই জানি, সীতা প্রলুব্ধ হলেন, লক্ষ্মণের বারণ না শুনে রাম তার পিছু ধাওয়া করলেন, শেষে কুটির থেকে বহু দূরে গিয়ে যখন সেই হরিণটিকে অবশেষে তীরবিদ্ধ করলেন, তখন সে রামের মত গলা করে “হা সীতা”,  “হা লক্ষ্মণ” বলে তবে প্রাণবায়ুটি ত্যাগ করলে। 
এবার, মারীচের চিৎকার শুনেই রামের আর এক মুহূর্তও দেরি করা উচিত ছিল না! কিন্তু দুশ্চিন্তিত হয়েও তিনি অন্য শিকারটিকার সেরে, তবে কুটিরের দিকে হাঁটা দিলেন। এই দেরিটা তিনি কেন যে করলেন!
এইবার একটু সীতার কথায় আসি। বাল্মীকির সীতা কিন্তু রামানন্দ সাগরের মাথা হেঁট করে কাঁদতে থাকা সীতা নন, বাঙালী সীতার মত ছিঁচকাঁদুনেও নন। এই সীতা রীতিমতো তেজি এবং কোমর বেঁধে ঝগড়া করা মেয়ে! রামের চিৎকার শোনামাত্র  তিনি লক্ষ্মণকে যেতে অনুরোধ করলেন। লক্ষ্মণ রাজি হলেন না, কারণ তিনি তো প্রথম থেকেই জানতেন সোনার হরিণ হয় না, হতে পারে না!
কিন্তু সীতা রেগেমেগে চোখ লাল করে লক্ষ্মণকে যা তা কথা শোনালেন। বললেন, “তুই তোর বংশের অযোগ্য সন্তান! তুই নিশ্চয়ই আমাকে পাওয়ার জন্যই এই জঙ্গলে আমাদের সঙ্গে এসেছিস। তুই চাস রাম বিপদে পড়ুক। বা বলা যায় না, তুই হয়ত ভরতের চর! তার কথামতো এখানে আছিস আর চাইছিস আমরা বিপদে পড়ি”!
লক্ষ্মণের তো মাথায় বজ্রাঘাত! সীতা এসব কী বলছেন! কিন্তু এরপর তো আর না গিয়ে উপায় থাকে না। তাই তিনি নেহাতই অনিচ্ছেতেই এগোলেন সেই আর্তনাদ লক্ষ্য করে।
এখানে আরো একটি কথা স্পষ্ট করে বলার। লক্ষ্মণ কিন্তু যাওয়ার সময় কোনো গণ্ডি টানেননি। লক্ষ্মণের গণ্ডি বলে বাল্মীকির রামায়ণে কোনো ঘটনা নেই! এ নেহাতই প্রাদেশিক কবিদের পরবর্তী সংযোজন। অথচ যুগ যুগ ধরে পুরুষতান্ত্রিকতা এই গণ্ডি পেরোলে মেয়েদের কী সর্বনাশ হতে পারে, এই বলে সঙ্কীর্ণ বেড়ার মধ্যে তাদের আটকে রেখে দিয়েছে!
আগের সবকটি পর্ব পড়তে ও ড. রোহিণী ধর্মপালের অন্য লেখা পড়তে এখানে ক্লিক করুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত