| 16 এপ্রিল 2024
Categories
ধারাবাহিক লোকসংস্কৃতি

নারী পুরুষের মিলন কাহিনী (পর্ব-২৭)

আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট

বিবাহ  মানব সমাজের প্রাচীনতম প্রতিষ্ঠান। যুগে যুগে প্রতিষ্ঠানটি এর আদি রূপ থেকে বর্তমান কাঠামোয় উপনীত হয়েছে। বিবাহপ্রথাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে প্রধানত ধর্ম। বিয়েসংক্রান্ত সকল নিয়মকানুন বিধিবদ্ধ হয়েছে ধর্মীয় অনুশাসনে। প্রাচীনকাল থেকে বাংলায় ধর্মীয় শাস্ত্রের বিধানই ছিল সামাজিক আইন, ধর্মীয় আইনের দ্বারাই শাসিত হতো সমাজ-সংসার। ধর্মীয় এবং রাষ্ট্রীয় আইনের পাশাপাশি লোকজ সংস্কৃতিও বৈবাহিক জীবনকে প্রভাবিত করেছে নানাভাবে। মনুস্মৃতি এবং অর্থশাস্ত্রে আট প্রকারের হিন্দু-বিবাহ পদ্ধতির উল্লেখ আছে। ‘ব্রাহ্ম’, ‘দৈব’, ‘আর্য’, ‘প্রজাপত্য’, ‘অসুর’, ‘রাক্ষস’, ‘পৈশাচ’ ও ‘গান্ধর্ব’ এই আট ধরনের বিবাহের মধ্যে ব্রাহ্ম বিবাহই শুধু গ্রহণযোগ্য ছিল। দায়ভাগ গ্রন্থে জীমূতবাহন উল্লেখ করেছেন যে, ব্রাহ্ম, দৈব, আর্য, প্রজাপত্য এবং গান্ধর্ব বিবাহ অনিন্দনীয়। ধর্মশাস্ত্রের বিধান অনুযায়ী নিজ বর্ণের মধ্যে বিবাহ ছিল সাধারণ নিয়ম। সবর্ণে বিবাহ উৎকৃষ্ট হলেও মনু ব্রাহ্মণ পুরুষকে নিজ বর্ণ ছাড়া নিম্নতর তিন বর্ণে বিবাহের অধিকার দিয়েছিলেন। মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যে, যেমন চন্ডীমঙ্গলে, মুসলমানদের নিকা বিবাহের কথা বলা হয়েছে। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে, এমনকি বিশ শতকেও মুসলমানদের মধ্যে বহুবিবাহ ব্যাপক হারে প্রচলিত ছিল। উচ্চশ্রেণীর অবস্থাপন্ন মুসলমানদের একাধিক স্ত্রী থাকত। বিশ শতকের শুরুতে কুলীনদের বাইরে হিন্দু সমাজে বহুবিবাহ তেমন প্রচলিত ছিল না। বিয়ের এমন অনেক জানা অজানা বিষয়ে আলো ফেলেছেন ড. রোহিণী ধর্মপাল তাঁর এই ধারাবাহিক ‘নারী-পুরুষের মিলন কাহিনী’-তে। আজ থাকছে নারী-পুরুষের মিলন কাহিনীর ২৭পর্ব।


নারী পুরুষের মিলন নিয়েই এই কাহিনী, আর তার একটি অন্যতম প্রতিক্রিয়াই তো সন্তানাদি, তাই মনে হল এই নিয়ে একটু কথা বলাই যায়। 
এবার দেখি, সেই প্রথম ছয় প্রকার পুত্র কারা। হ্যাঁ, আমি সন্তান বলে লিখছি বটে, কিন্তু এখানে বাপু পুত্র বলতে একশো শতাংশ পুত্রই বলা হয়েছে, কোনো সূত্র দিয়ে তা পুত্র বা কন্যা বলা যাবে না! 
 তালিকায় স্বভাবতই সবার আগে আছে
১} স্বয়ংজাত পুত্র, বিবাহিতা স্ত্রীতে স্বামী নিজের ঔরসে যে পুত্রের জন্ম দেন।
২]প্রণীত পুত্র তার পরেই, বিবাহিতা স্ত্রীতে যদি অপর কোনো উত্তম পুরুষের ঔরসে পুত্রের জন্ম হয়।
৩} পরিক্রীত পুত্র এরপরেই। অন্য কোনো পুরুষকে যদি ধনের লোভ দেখিয়ে নিয়োগ করে বিবাহিতা স্ত্রীর সঙ্গে মিলিত করে পুত্রের জন্ম হয়। 
৪} পৌনর্ভব পুত্র, কোনো বিবাহিতা স্ত্রীকে যদি অন্য পুরুষ পত্নীরূপে গ্রহণ করে এবং পুত্রের জন্ম দেয়, তবে তাই পৌনর্ভব। এই কথাটি নিয়ে ভাবার বিষয় আছে কিন্তু। এখানে স্বামীর মৃত্যুর পর, এমন কথা বলা নেই নির্দিষ্ট করে। অর্থাৎ তাও হতে পারে, আবার স্বামী জীবিত থাকা সত্ত্বেও আবার বিয়ে হতে পারে, অর্থাৎ বিচ্ছেদের পর আবার বিয়ে। পুনর্বিবাহের ফলে যে জন্ম নিচ্ছে, সে পৌনর্ভব!
৫}বিয়ের আগেই কুমারীর গর্ভে জাত পুত্র, কানীন পুত্র! এবং এই ছেলেও বাবার সম্পত্তির অধিকারী! জলে ভাসিয়ে দিলে আলাদা কথা, সমাজ কিন্তু অধিকার চাইবার আইন করে রেখেছে সেই কুমারী মায়ের! 
৬} চমকের উপর চমক, ষষ্ঠ প্রকারটি। স্বৈরিণীজ, বিয়ে হয়েছে, এমন মেয়ে, স্বামী ছাড়া অন্য কোনো পুরুষের (সমান বা উত্তমজাতীয়) দ্বারা  পুত্রের জন্ম দিলে সেও বাবার সম্পত্তির–কোন বাবা, তা অবশ্য স্পষ্ট নয়–অধিকারী। তবে যখন প্রথমেই বলে দিচ্ছে পৈতৃক সম্পত্তির অধিকারী, তখন অনুমান করা যায়, যে যিনি ওই পত্নীর পতি, তাঁর সম্পদের অধিকারী ।
 এই ছয় প্রকারের মধ্যে প্রথম দুই প্রকারকে বলা হচ্ছে ঔরস পুত্র, কানীন পুত্রকেও কিন্তু ব্যবহিত-ঔরস পুত্র বলা হচ্ছে। অর্থাৎ দেখুন, কুমারী অবস্থার সন্তানকে সবরকমে সমাজ স্বীকার করছে! অথচ আমাদের এখনও এই নিয়ে সিনেমা বানাতে হচ্ছে! যেখানে কত লুকোছাপার খেলা, কত আত্মহত্যার চেষ্টা, লজ্জা!
সেই লক্ষ্মী অভিনীত জুলি (আহা, কীসব গান, আর সদ্য কৈশোরে পা রাখা শ্রীদেবী) থেকে প্রীতি জিন্টা অভিনীত
কেয়া কহেনা, গল্পের কেন্দ্রে এক মা, যার বিয়ে হয় নি! কুন্তী কর্ণকে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন ঘাবড়ে গিয়ে, অথচ আইনে কিন্তু আটকাত না! বাবার সম্পত্তির অধিকার পাচ্ছে মানেই স্পষ্ট যে সে সমাজত্যক্ত নয়।
প্রণীত পরিক্রীত আর স্বৈরিণীজ হল ক্ষেত্রজ পুত্র। আর এই ছয় প্রকারই “বন্ধুদায়াদ” অর্থাৎ ওই, পৈতৃক সম্পত্তির অধিকারী।
এবার আসি পরের ভাগে। যেই প্রকারগুলি “অবন্ধুদায়াদ”, অর্থাৎ যারা পৈতৃক সম্পত্তির অধিকারী নয়।
 ১}  মা বাবা যদি নিজের ছেলেকে অন্য অপুত্রক কাউকে দিয়ে দেন, তবে সে দত্ত ।
২} অন্যের ছেলেকে টাকা দিয়ে কিনে আনলে তখন সে ক্রীত।
৩} এটা খুব সুন্দর । যদি ছোট বাচ্চা কেউ এসে বাবা মা বলে নিজেই আপন করে ডাকে, তবে সে কৃত্রিম পুত্র।
৪} আশ্চর্য প্রকার এটি! এমনও হত, এবং তারপরেও বিয়ে আটকাত না! বিয়ের সময়ই কনে অন্তঃসত্ত্বা থাকত,  তবে সেই পুত্রের নাম হত সহোঢ়।
৫} সহোদর ছাড়া, অন্য আত্মীয় পুত্রও তো পুত্রের মতোই, তাই সে জ্ঞাতিরেতা। রেতঃ হল বীর্য। 
এবং
৬} মেয়েটি যদি নিজের থেকে অধম জাতীয়া হয়, তাহলে সেই পুত্র হীনযোনিধৃত। 
 এই বারো প্রকার ছাড়া আরোও আট প্রকার পুত্রের কথা বলা হয়েছে যারা বিভিন্ন জাতির নারীপুরুষের মিলনে জাত সঙ্কর। (মহাভারত, আদি পর্ব, তৃতীয় খণ্ড, পৃঃ ১২৭২ এবং মহাভারতের সমাজ, পৃঃ ৩১)
 এইভাবে বারো ধরণের পুত্রের বর্ণনা করে পাণ্ডু আবার কুন্তীকে নিজের যৌন  অপারগতার কথা বলে এক অনুনয় করতেই থাকলেন। তখন কুন্তী স্বামীকে সেই দুর্বাসার থেকে পাওয়া বরের কথা জানালেন। পাণ্ডু তখন এক ধার্মিক পুত্র চাইলেন, তাই ধর্মকেই আহ্বান জানানোর অনুরোধ করলেন।
কুন্তীর মন্ত্রের ডাকে ধর্ম এলেন। কুন্তীকে হেসে জিজ্ঞেস করলেন, কি চাও। কুন্তীও হেসে বললেন, আমাকে পুত্র দিন। তার পর সেই সুব্রতা কুন্তী শয্যাং জগ্রাহ ধর্মেণ সহ (মহাভারত, আদি পর্ব, খণ্ড তিন, 
পৃঃ ১২৯৭) অর্থাৎ ধর্মের সঙ্গে বিছানায় গেলেন, তাইই লেখা কিন্তু, শয্যাং। পরিবেশটা কেমন ছিল ? না, বহুমৃগেহরণ্যে, জন্তুজানোয়ারে ভর্তি বনে। জন্ম হল যুধিষ্ঠিরের।
এর পরে পাণ্ডু চাইলেন সবচেয়ে বলশালী এক পুত্র। কুন্তী ডাকলেন বায়ুকে। জন্ম হল ভীমের। সেই একই দিনে দুর্যোধনও জন্মালেন।
এবার পাণ্ডুর ইচ্ছে হল এক মহাবীর পুত্রের জনক হওয়ার। এবার কুন্তীর সঙ্গে মিলিত হলেন দেবরাজ ইন্দ্র । পৃথিবীর আলো দেখলেন অর্জুন।
এবার স্বভাবতই মাদ্রীর মন খারাপ হলো। কুন্তী দিদি তিনটে ছেলের মা হয়ে গেল!!! মাদ্রী ধরলেন পাণ্ডুকে। । “আমিও মা হতে চাই। আমাকেও ওই মন্ত্র ব্যবহারের সুযোগ দিন!” পাণ্ডুর অনুরোধ কুন্তী ফেলতে পারলেন না, কিন্তু বলে দিলেন মাদ্রী একবারই মাত্র ব্যবহার করতে পারবেন এই মন্ত্র। তা কুন্তী যান ডালে ডালে, মাদ্রী গেলেন পাতায় পাতায়! “বেশ। একবারই ব্যবহার করব! তাতেই কেল্লা ফতে করব”! এমন কিছু একটা ভেবেছিলেন নিশ্চয়ই । একবারই ব্যবহার করলেনও। ডাকলেন কাকে? না সেই সংজ্ঞা আর সূর্যের পুত্রদ্বয়, অশ্বিনীকুমারদের। নাসত্য ও দ্রস্য, এই দুই ভাইকে। জোড়া দেবতা তো, একজন মানেই দুজন! দুই দেবতার ঔরসে মাদ্রীর গর্ভে দুটি সন্তানের জন্ম দিলেন। যদিও পাণ্ডু মাদ্রীরকে আবার মন্ত্র দিতে কুন্তীকে বলেন, কিন্তু কুন্তী কিছুতেই আর সেই মন্ত্র দিলেন না। স্বাভাবিক, তিনি সেবা করা এই বর পেয়েছেন। মাদ্রী সেই ফল কেন বারবার পাবে!
যাক্, দেবতাদের সঙ্গে হলেও কুন্তী আর মাদ্রীর মা হওয়ার বাসনাও পূর্ণ হল, আবার যৌন কামনাও খানিক নিবারিত হল। কিন্তু বেচারা পাণ্ডু! তাঁর তো অবস্থা শোচনীয়। কামেচ্ছা তো ভরপুর আছে, এদিকে শাপের ভয়ে তা নিয়ে ভাবতেও ভয়! বেঁচে মরে থাকার মতো!
 এমনই একদিন, সেই বসন্তকাল, বড় মারাত্মক ঋতু এটি, সকল প্রাণীর মধ্যে, বিশেষ করে মানুষের মধ্যে প্রেমের বড়ই বাড়বাড়ন্ত ঘটায়, পাণ্ডু মাদ্রীর সঙ্গে বনে ঘুরতে বেরিয়েছেন, চারিদিকের পরিবেশ দেখে তাঁর হৃদয়ে মন্মথ কড়া নাড়ল! তার ওপর মাদ্রী সেদিন পড়েছেন সূক্ষ্ম বস্ত্র। বারুদের স্তূপে আগুন! পাণ্ডু সব ভুলে মাদ্রীকে জড়িয়ে ধরলেন। মাদ্রী প্রাণপণ চেষ্টা করলেন সেই আলিঙ্গন থেকে মুক্ত হতে, কিন্তু কতক্ষণই বা! তিনি নিজেও কিছুক্ষণ পর বিবশ হয়ে গেলেন। আর পাণ্ডু মাদ্রীং মৈথুনধর্মেন সোহন্বগচ্ছৎ (মহাভারত, আদি পর্ব, তৃতীয় খণ্ড, পৃঃ ১৩২৯), মাদ্রীর সঙ্গে মৈথুনে রত হলেন, সঙ্গম শেষ করেই মারাও গেলেন!
মাদ্রীর আর্তনাদ শুনে কুন্তী এসে দেখলেন এবং সব বুঝলেন। ওই অবস্থাতেও তিনি বললেন, “মাদ্রী, ভাগ্যবতী তুমিই। রাজার শেষ হাসিভরা পরিতৃপ্ত মুখখানা তুমিই দেখলে”! 
নারী পুরুষের মিলন কতখানি গুরুত্বপূর্ণ, এই মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে কুন্তী তা বুঝিয়ে  দিলেন।
[চলবে]

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত