নারী পুরুষের মিলন কাহিনী (পর্ব-৭)

বিবাহ  মানব সমাজের প্রাচীনতম প্রতিষ্ঠান। যুগে যুগে প্রতিষ্ঠানটি এর আদি রূপ থেকে বর্তমান কাঠামোয় উপনীত হয়েছে। বিবাহপ্রথাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে প্রধানত ধর্ম। বিয়েসংক্রান্ত সকল নিয়মকানুন বিধিবদ্ধ হয়েছে ধর্মীয় অনুশাসনে। প্রাচীনকাল থেকে বাংলায় ধর্মীয় শাস্ত্রের বিধানই ছিল সামাজিক আইন, ধর্মীয় আইনের দ্বারাই শাসিত হতো সমাজ-সংসার। ধর্মীয় এবং রাষ্ট্রীয় আইনের পাশাপাশি লোকজ সংস্কৃতিও বৈবাহিক জীবনকে প্রভাবিত করেছে নানাভাবে। মনুস্মৃতি এবং অর্থশাস্ত্রে আট প্রকারের হিন্দু-বিবাহ পদ্ধতির উল্লেখ আছে। ‘ব্রাহ্ম’, ‘দৈব’, ‘আর্য’, ‘প্রজাপত্য’, ‘অসুর’, ‘রাক্ষস’, ‘পৈশাচ’ ও ‘গান্ধর্ব’ এই আট ধরনের বিবাহের মধ্যে ব্রাহ্ম বিবাহই শুধু গ্রহণযোগ্য ছিল। দায়ভাগ গ্রন্থে জীমূতবাহন উল্লেখ করেছেন যে, ব্রাহ্ম, দৈব, আর্য, প্রজাপত্য এবং গান্ধর্ব বিবাহ অনিন্দনীয়। ধর্মশাস্ত্রের বিধান অনুযায়ী নিজ বর্ণের মধ্যে বিবাহ ছিল সাধারণ নিয়ম। সবর্ণে বিবাহ উৎকৃষ্ট হলেও মনু ব্রাহ্মণ পুরুষকে নিজ বর্ণ ছাড়া নিম্নতর তিন বর্ণে বিবাহের অধিকার দিয়েছিলেন। মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যে, যেমন চন্ডীমঙ্গলে, মুসলমানদের নিকা বিবাহের কথা বলা হয়েছে। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে, এমনকি বিশ শতকেও মুসলমানদের মধ্যে বহুবিবাহ ব্যাপক হারে প্রচলিত ছিল। উচ্চশ্রেণীর অবস্থাপন্ন মুসলমানদের একাধিক স্ত্রী থাকত। বিশ শতকের শুরুতে কুলীনদের বাইরে হিন্দু সমাজে বহুবিবাহ তেমন প্রচলিত ছিল না। বিয়ের এমন অনেক জানা অজানা বিষয়ে আলো ফেলেছেন ড. রোহিণী ধর্মপাল তাঁর এই ধারাবাহিক ‘নারী-পুরুষের মিলন কাহিনী’-তে। আজ থাকছে নারী-পুরুষের মিলন কাহিনীর ৭ম পর্ব।


রামায়ণ ।  ইক্ষ্বাকু বংশ। রাজা দশরথ । বেদ-বেদাঙ্গ পারঙ্গম, পরম ধার্মিক, দূরদর্শী, তেজস্বী ইত্যাদি ইত্যাদি এবং পরম কামুক, পরম লম্পট। কৌশল্যা, সুমিত্রা এবং কৈকেয়ী ছাড়াও আরো তিনশ পঞ্চাশ জন স্ত্রী!!! অর্থাৎ সর্বসাকুল্যে তিনশ তিপান্ন জন স্ত্রী । দাসী প্রভৃতির হিসেবে আর গেলাম না। রাম বনবাসে যাওয়ার পর মৃত্যুশয্যায় দশরথ ডেকে পাঠাচ্ছেন সব স্ত্রীদের!! তখনই এই সংখ্যাটি প্রকাশিত হয়ে পড়ছে। কেকয়রাজ অশ্বপতির কন্যা অপরূপ লাবণ্যময়ী কৈকেয়ীকে বিবাহ করার জন্য যখন তিনি উতলা হলেন, তখনই মেঘে মেঘে বেলা ভালোই হয়েছে। তবু কামের নিবৃত্তি হয় নি। ধরে নেওয়াই যায়, যে শর্ত সত্যবতীর ক্ষেত্রে দাসরাজা রেখেছিলেন, রাজকন্যা কৈকেয়ীর ক্ষেত্রে তার ব্যত্যয় আরোই হবে না!  তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ রামের রাজ্যাভিষেকের মত এতখানি  গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে রাজা সিদ্ধান্ত নিলেন কখন? না যখন ভরত শত্রুঘ্ন মামারবাড়ি গেলেন। আজ সিদ্ধান্ত নিলেন, পরের দিনই অভিষেকের দিন স্থির করা হল। বশিষ্ঠকে বললেন অভিষেকের উপকরণ আজই সংগ্রহের আদেশ দিন। রামকে বলছেন, যে সময়ে ভরত এই রাজধানী ছেড়ে প্রবাসে আছে, সেই সময়ই অভিষেকের উপযুক্ত, এই আমার মত(অযোধ্যা কাণ্ড, বাল্মীকি রামায়ণ, সারানুবাদ, রাজশেখর বসু, পৃঃ ৬৯) । আরোও মজা হল এই অভিষেকের নিমন্ত্রণ পাঠানো হল নানা নগর ও জনপদের প্রধান প্রধান ব্যক্তিদের। বাদ গেলেন দুজন। সীতার বাবা জনক, যিনি ব্রহ্মজ্ঞ ছিলেন, যিনি মিথ্যা সহ্য করতে পারতেন না। আর কৈকেয়ীর বাবা কেকয়রাজ অশ্বপতি। রাজপ্রাসাদেও দেখি, সবাই রামের রাজ্যাভিষেকের  খবর পেয়ে আনন্দে উতলা । কৈকেয়ীর কাছে কিন্তু এই খবর পৌঁছয় নি।
কৈকেয়ী যখন গোঁসাঘরে, তখন তিনি মান ভাঙাতে বলছেন, বলো কোন অপরাধীকে মুক্তি দিতে হবে বা কোন নিরপরাধকে হত্যা করতে হবে!!! যে সময় বিনা বিচারে চোরকে চোর বললে নিন্দা হত, সেই সময় এমন উক্তি!!! সেই বলে না বৃদ্ধস্য তরুণী ভার্যা! তা দোষটা বেশি কার? তরুণী ভার্যার? না কামাসক্ত বৃদ্ধ পতির?ভরতকে দেখি  মামার বাড়ি থেকে ফিরে মায়ের ঘরেই বাবার খোঁজ করছেন, কারণ তিনিও জানেন তাঁর মায়ের কাছেই দশরথ বেশি থাকেন। 
রামের বনবাস যাত্রার সংকল্প শুনে কৌশল্যা বিলাপ করতে করতে বলছেন যে তিনি তো বহুদিনই স্বামীর অনুরাগের সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত । এখনই তিনি কৈকেয়ীর দাসীর চেয়েও হীন অবস্থায় দিন কাটান, পরে কী হবে!!! কৈকেয়ী মান করেছেন শুনে  কৈকেয়ীর কাছে দশরথ যখন তাঁর মান ভাঙাতে এসেছেন, তখন স্বয়ং রচয়িতা তাঁকে কখনো  কামী, কখনো কামার্ত, কখনো কামোন্মত্ত বলে বিশেষায়িত করেছেন । সত্যি বলতে কি, দশরথ যদি এমন কামুক না হতেন, রাম-সীতা লক্ষ্মণ-ঊর্মিলা, সত্যি বলতে কি পুরো পরিবারের এই দুর্দশা হতোই না! ভরত অযোধ্যায় থাকতে এই অভিষেক হলে কৈকেয়ী-মন্থরা-সংবাদ তৈরিই হত না!! আর এই রকমে শত শত স্ত্রী থাকার পরেও কোনোও অল্পবয়সী মেয়েকে দেখে কারুর যৌনবাসনা চরম অসংযত হয়ে উঠলে কাকে দায়ী করা  উচিত বলুন তো?!!!
 মহাভারতের আদিপর্বে  আছে যযাতি রাজার গল্প। এই গল্পেও প্রেমের অনেক পরত আছে। সেইখানে পরে আসব আবার। এখানে এই প্রসঙ্গে যেটুকু বলার, সেইটুকু শোনাই।
 রাজা যযাতি দৈত্যগুরু শুক্রাচার্য্যের কাছে অভিশপ্ত হয়ে জরাগ্রস্ত হলেন। সেই অভিশাপের কারণও শেষ পর্যন্ত সেই অতিরিক্ত কাম। অভিশপ্ত হয়ে জরাগ্রস্ত হয়ে রাজার একমাত্র চিন্তা হল তিনি সম্ভোগ কি করে করবেন! রাজার দুশ্চিন্তা দেখে শুক্রাচার্য্য বললেন, এই  একাগ্রচিন্তে তাঁকে চিন্তা করে রাজা এই জরা আরেকজনকে সঞ্চারিত করতে পারবে। রাজা যযাতি সঙ্গে সঙ্গে চলে গেলেন জ্যেষ্ঠ পুত্র যদুর কাছে। এবং তাকে স্পষ্ট বললেন, আমি বুড়ো হয়ে গেছি। চামড়া মাংস সব ঝুলে গেছে, অথচ আমার যৌবনকে উপভোগ করা, সম্ভোগের ইচ্ছা এখনও যায় নি। সুতরাং তুমি আমার পাপ ও জরা গ্রহণ করো, তোমার যৌবন আমাকে দাও, যাতে আমি ইচ্ছামত সম্ভোগ করতে পারি। ভেবে দেখুন, বাবা, যিনি একাধিক সন্তানের জনক, তিনি আরো যৌনতা উপভোগ করার জন্য ছেলের জীবনে কী দুর্যোগ নামিয়ে আনছেন, তা ভাবলেনও না। যদু রাজী না হওয়াতে পরের ছেলে তুর্ব্বসুকে একই অনুরোধ করলেন । সেও যথাবিহিত রাজী হল না। এই ভাবে অপরাপর পুত্ররাও তাঁর এই অবাঞ্ছিত প্রস্তাবে না বলল। এই না শুনেই যদি যযাতি ক্ষান্ত হতেন, তাহলে হয়ত খুব কিছু বলার থাকতে না। কিন্তু প্রত্যেক ছেলেকে তিনি বিশ্রী অভিশাপ দিলেন! শেষে কনিষ্ঠ পুত্র পুরু বাবার কথায় সম্মতি দিলে তিনি নিজের জরার সঙ্গে ছেলের যৌবন exchange করলেন এবং সেই নবলব্ধ যৌবন নিয়ে সুখের সাগরে নিমজ্জিত হলেন। আর বেচারা পুরু অপেক্ষা করে রইল কবে বাবার কামতৃষ্ণা মিটবে!!!!
 মহাভারতে দেখি, হাজার বছর (গৌরবে বহুবচন ) পরে যযাতি ডেকে পাঠালেন পুরুকে এবং তার যৌবন ফেরত দিলেন। সঙ্গে বললেন একটি অমোঘ গাথা, তার একটা ছোট্ট অংশ বলি,
 ন জাতু কামঃ
কামানাপুভোগেন  শাম্যতি ।
হবিষা কৃষ্ণবর্ত্মেব ভূয় এবাভিবর্ব্ধতে ।।
অর্থাৎ কাম্য বস্তুর উপভোগে কাম কখনো নিবৃত্তি পায় না, বরং আগুন যেমন ঘি দিলে আরোও ধকধকিয়ে জ্বলে ওঠে, কামও তেমনই কাম্য বস্তু উপভোগ করতে করতে আরো বেড়ে ওঠে। অর্থাৎ কাম দিয়ে কামের জ্বালা মেটে না কখনো।

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত