| 16 এপ্রিল 2024
Categories
ধারাবাহিক লোকসংস্কৃতি

নারী-পুরুষের মিলন কাহিনী (পর্ব-১)

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট

বিবাহ  মানব সমাজের প্রাচীনতম প্রতিষ্ঠান। যুগে যুগে প্রতিষ্ঠানটি এর আদি রূপ থেকে বর্তমান কাঠামোয় উপনীত হয়েছে। বিবাহপ্রথাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে প্রধানত ধর্ম। বিয়েসংক্রান্ত সকল নিয়মকানুন বিধিবদ্ধ হয়েছে ধর্মীয় অনুশাসনে। প্রাচীনকাল থেকে বাংলায় ধর্মীয় শাস্ত্রের বিধানই ছিল সামাজিক আইন, ধর্মীয় আইনের দ্বারাই শাসিত হতো সমাজ-সংসার। ধর্মীয় এবং রাষ্ট্রীয় আইনের পাশাপাশি লোকজ সংস্কৃতিও বৈবাহিক জীবনকে প্রভাবিত করেছে নানাভাবে। মনুস্মৃতি এবং অর্থশাস্ত্রে আট প্রকারের হিন্দু-বিবাহ পদ্ধতির উল্লেখ আছে। ‘ব্রাহ্ম’, ‘দৈব’, ‘আর্য’, ‘প্রজাপত্য’, ‘অসুর’, ‘রাক্ষস’, ‘পৈশাচ’ ও ‘গান্ধর্ব’ এই আট ধরনের বিবাহের মধ্যে ব্রাহ্ম বিবাহই শুধু গ্রহণযোগ্য ছিল। দায়ভাগ গ্রন্থে জীমূতবাহন উল্লেখ করেছেন যে, ব্রাহ্ম, দৈব, আর্য, প্রজাপত্য এবং গান্ধর্ব বিবাহ অনিন্দনীয়। ধর্মশাস্ত্রের বিধান অনুযায়ী নিজ বর্ণের মধ্যে বিবাহ ছিল সাধারণ নিয়ম। সবর্ণে বিবাহ উৎকৃষ্ট হলেও মনু ব্রাহ্মণ পুরুষকে নিজ বর্ণ ছাড়া নিম্নতর তিন বর্ণে বিবাহের অধিকার দিয়েছিলেন। মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যে, যেমন চন্ডীমঙ্গলে, মুসলমানদের নিকা বিবাহের কথা বলা হয়েছে। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে, এমনকি বিশ শতকেও মুসলমানদের মধ্যে বহুবিবাহ ব্যাপক হারে প্রচলিত ছিল। উচ্চশ্রেণীর অবস্থাপন্ন মুসলমানদের একাধিক স্ত্রী থাকত। বিশ শতকের শুরুতে কুলীনদের বাইরে হিন্দু সমাজে বহুবিবাহ তেমন প্রচলিত ছিল না। বিয়ের এমন অনেক জানা অজানা বিষয়ে আলো ফেলেছেন ড. রোহিণী ধর্মপাল তাঁর এই ধারাবাহিক ‘নারী-পুরুষের মিলন কাহিনী’-তে। আজ থাকছে নারী-পুরুষের মিলন কাহিনীর প্রথম পর্ব।


জন্ম মৃত্যু বিবাহ। এই হল মানুষের জীবন চক্র। তার মধ্যে অবশ্য জন্ম আর মৃত্যুতে নিজের বিশেষ কোনো হাত থাকে না, ভীষ্মের মত স্বেচ্ছা-মৃত্যুর কেস ছাড়া। একমাত্র বেছে নেওয়ার ক্ষেত্র হল বিয়ে। বিয়ে করব কি করব না, করলে কখন করব, কাকে করব; এই সব ক্ষেত্রেই মানুষের সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গা রয়েছে। বস্তুত বিয়েটা তুলনায় সবচেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ। বিয়ের প্রয়োজন তখনই এল, যখন জনসংখ্যা খানিক বাড়ল, যখন মানুষের মধ্যে সম্পত্তি তৈরি করা আর তার রক্ষণাবক্ষেণের ধারণা তৈরি হল। তার আগে নারী পুরুষের যৌন মিলনের ইচ্ছেই প্রধান এবং একমাত্র ছিল। এবং সেটা যখন যাকে মনে ধরত, তার সঙ্গেই। মন আর শরীর যাকে চাইবে, সেই সময়ের মত সেই হবে সঙ্গী। সেই মিলনে সন্তানের জন্ম হলেও কারুরই তাতে আপত্তি থাকত না, কারণ সেই সন্তান তো শেষ পর্যন্ত দলের। নতুন জন্ম না হলে দল বাড়বে কি করে! প্রতিদিন প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করতে হলে দলে চাই নতুন রক্ত, নতুন সদস্য, যারা এসে অক্ষমদের জায়গা নেবে। এই তো ছিল সহজ হিসেব।
ধর্ম মানে কিন্তু প্রয়োজন, ধরে রাখা। মানুষ ধর্ম রচনা করে নিজের প্রয়োজনেই। একমাত্র মানবিক গুণ ছাড়া, মনুষ্য ধর্ম ছাড়া ধর্মের আর কোনো কিছুই চিরন্তন নয়। তাই মানুষের আরেকজন মানুষের প্রতি সহানুভূতি ভালবাসা শ্রদ্ধা ছাড়া ধর্মের যা কিছু, সবই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাল্টেছে। এখন যাকে আমরা স্বৈরাচার বলি, তাই ছিল সেই আদিযুগে ধর্ম। নারীর সঙ্গে  পুরুষের অবাধ যৌন মিলন ছিল সেই সময়ের ধর্ম। পুরুষের একাধিক সঙ্গী তো এই সেদিন পর্যন্ত বৈধ ছিল। কোনো কোনো সম্প্রদায়ে তা এখনও আছে। তাছাড়াও বিবাহিত পুরুষের বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্ক নিয়ে আমরা এখনও কি খুব চিৎকার চেঁচামেচি করি? মানে সেই পুরুষটির স্ত্রী হয়ত করেন; যন্ত্রণা পান, অপমানিত বোধ করেন। কিন্তু খুব কম জনই তার তীব্র বিরোধিতা করেন। তার একটা কারণ অবশ্যই অর্থনৈতিক। এখনও পর্যন্ত, এই একবিংশ শতকেও, দুর্ভাগ্যক্রমে অধিকাংশ মেয়েই অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল। কিন্তু সবচেয়ে জোরালো কারণটা সামাজিক, যে কারণে অর্থনৈতিক জোর থাকা মেয়েরাও চুপ করে থাকে। সমাজ এখনও পুরুষের একাধিক সঙ্গী নিয়ে খুব আঙুল তোলে না। এমনকী সৃষ্টিশীল মানুষদের যে প্রেরণার জন্য অন্য সঙ্গী লাগতেই পারে, ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একথা বেশ জোর গলাতেই বলে। একটি মেয়েকে জোর গলায় বলতে শুনেছিলাম যে অর্থ আর হৃদয়ের জোর থাকলে একজন পুরুষ একাধিক মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতেই পারে! পুরুষ নিজেও এমনটাই মনে করে, কারণ সমাজ তাকে এই ভাবনার প্রশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু আদিম সময়ে এই ভাবনার অধিকার মেয়েদেরও ছিল সমান ভাবে । মেয়েরাও যছেচ্ছ পুরুষ সঙ্গী গ্রহণ করত, পছন্দ না হলে নতুন কাউকে আবার কাছে টেনে নিত। একজনের হয়ে থাকার ইচ্ছা, দায়, নীতি বা প্রথা কোনো পক্ষেই ছিল না। আর যেহেতু বেঁচে থাকাই ছিল একমাত্র লড়াই, তাই সম্পদ গড়ে তোলা এবং তা রক্ষার কথা ভাবার বিষয়টাই ছিল না। বাঁচো খাও-দাও উদ্দাম নাচে মেতে ওঠো আর পছন্দ মত সঙ্গী বেছে নিয়ে শরীরী খেলায় মাতো। তার ফলস্বরূপ শিশু আসা মানে গোষ্ঠীর জোর আরেকটু বাড়ল। এইমাত্র।
মহাভারতের আদি পর্বে একষট্টিতম অধ্যায়ে ধর্মের জন্ম কথা আছে। অদ্ভুত এই যে পুরুষের স্তন নিয়ে আমরা কখনো আলোচনা করি না। স্তন শব্দটিই নারী শরীরের সঙ্গে সংযুক্ত । অথচ এখানে দেখি, ব্রহ্মার ডান স্তন থেকে মানুষের আকারে ধর্ম বেরিয়ে এলেন, যেই ধর্ম হল মানুষের সুখের কারণ; সংস্কৃত ভাষায় লেখা শ্লোকটিতেও এই স্তন শব্দটিই আছে, স্তনন্তু দক্ষিণং ভিত্ত্বা, এই বলে। এই কথাটা এই কারণে বলছি যে আমাদের প্রাচীন সাহিত্য অনেক স্বাভাবিক দৃষ্টি নিয়ে সবকিছু দেখত। যাই হোক,  এই ধর্মের আবার তিন ছেলে– শম কাম এবং হর্ষ। কি আশ্চর্য লক্ষ্য করুন, সবার আগে শম। অর্থাৎ কিনা সংযম, বাসনার নিবৃত্তি। তারপরে কাম। কাম মানেটাকে কিন্তু আমরা সঙ্কীর্ণ করে ফেলেছি শরীরী বৃত্তে। তা একেবারেই ভুল। কাম মানে কামনা ইচ্ছা, যার একটি অংশ মাত্র হল যৌন ইচ্ছা । আর তৃতীয় ছেলেটির নাম হর্ষ, অর্থাৎ নিখাদ আনন্দ । তার মানে অস্থির না হয়ে খুব উত্তেজিত না হয়ে কামনা করো, তবেই আনন্দ পাবে। এই তিন ছেলের বউদের কি নাম? শমের বউ প্রাপ্তি। শান্ত থাকো, ধৈর্য ধর, ঠিক পাবে। কামের বউ রতি। রতি বলতে আমরা রমণের নানা কৌশল, মৈথুনের নানা কৌশলকেই বুঝি। কিন্তু রতি মানে অনুরাগও, প্রীতিও। আর হর্ষের বউ নন্দা। আনন্দা । এই হল আদর্শ দম্পতির পরাকাষ্ঠা । একে অপরের পরিপূরক, একের উপর আরেক সম্পূর্ণ নির্ভরশীল । এই হলেন ধর্ম আর তাঁর পরিবার। সেই ধর্মকে আমরা কোথায় নামিয়ে এনেছি…।
[ চলবে ]

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত