| 15 জুলাই 2024
Categories
ইতিহাস

রক্তাক্ত লালবাগ কেল্লার ইতিহাস

আনুমানিক পঠনকাল: 2 মিনিট

ঢাকার বুকে যেসব মুঘল স্থাপনা ইতস্তত বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তার মধ্যে আজো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে পুরনো ঢাকার ঐতিহাসিক লালবাগ কেল্লা। প্রতিদিন দর্শনার্থীদের ভিড়ে মুখর থাকে ঐতিহাসিক এ এলাকা। কিন্তু আমরা কজন জানি এর পেছনের রক্তাক্ত ইতিহাস৷ এই কেল্লার উদ্যানে, গোলপুকুরে স্বাধীনচেতা বাঙালি সৈন্যদের রক্তে আর্দ্র হয়েছে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে৷ আজ সেই ইতিহাসই জানাব৷ তবে তার আগে কেল্লার নির্মাণ ইতিহাসের বর্ণনা দেয়া যাক।

কেল্লা আওরাঙ্গবাদ নামে পরিচিত এ দুর্গের নির্মাণ কাজ শুরু হয় ১৬৭৮ সালে মুঘল সুবাদার আজম শাহের হাত ধরে। উদ্দেশ্য ছিল ঢাকার সুবাদারের বাসস্থান হিসেবে ব্যবহার করার। এক বছর পর দরবার হল ও মসজিদ নির্মাণের পর আজম শাহের ডাক আসে দিল্লি থেকে৷ সম্রাট আওরঙ্গজেব তাকে মারাঠা বিদ্রোহ দমনের জন্য জরুরি তলব করেন। ১৬৮০ সালে সুবাদার শায়েস্তা খান আবার এ দুর্গের নির্মাণ কাজ শুরু করেন। ১৬৮৪ সালে শায়েস্তা খানের কন্যা পরীবিবির মৃত্যুর পর তিনি এ দুর্গকে অপয়া মনে করে নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেন। লালবাগ কেল্লার ভেতরে রয়েছে তিনটি ঐতিহাসিক স্থাপনা। পরী বিবির মাজার, দরবার হল এবং তিন গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদ কেল্লাকে দিয়েছে আলাদা আবেদন। আদিকালে কেল্লায় প্রবেশের পথ ছিল চারটি৷ দক্ষিণ ফটক ছিল এর প্রধান দ্বার৷ প্রধান দ্বারের সামান্য পশ্চিমে ছিল কথিত গুপ্তপথ। লোকশ্রুতি বলছে, এ পথ বুড়িগঙ্গার তল দিয়ে নারায়ণগঞ্জ এর সোনাকান্দা দুর্গের সাথে বা জিনজিরা প্রাসাদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলত। বর্তমানে গুপ্তপথটি বন্ধ আছে।

রক্তাক্ত ইতিহাসের শুরু

লালবাগ কেল্লার সবচেয়ে আদি ইতিহাস পাওয়া যায় ইংরেজদের ফ্যাক্টরির ঢাকা ডায়রী থেকে৷ ১৬৮৯ সালের ৯ জুলাই তারিখের ঢাকা ডায়রীর বর্ণনায় লেখা হয় যে, নবাবের বাসস্থান ছাড়াও লালবাগ দুর্গে বন্দী আটক রাখার ব্যবস্থা ছিল। যেখানে সেইসময় কয়েকজন ইংরেজ বন্দী অবস্থায় ছিল। ১৮৪৪ সালে স্থানীয় ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ বার্ষিক ৬০ রূপির বিনিময়ে লালবাগ কেল্লার ইজারা কিনে নেয় এবং সেখানে সেনাঘাটি স্থাপন করে৷ ১৮৫৩ সালে পুরানা পল্টন থেকে সেনানিবাস লালবাগ কেল্লায় স্থাপন হলে ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত কেল্লা সেনানিবাস হিসেবেই ব্যবহৃত হয়। ৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের পর পুলিশ রিজার্ভ ফোর্সকে লালবাগে স্থানান্তরিত করা হয়। ১৯৪৭ সালের আগে এখানে ছিল গাড়োয়ালী পুলিশ৷ ১৯৪৭ সালের পর কেল্লা ব্যবহৃত হয় আই.বি অফিস ও পুলিশ লাইনস হিসেবে৷ ইতিহাসের দায় মেটাতে লালবাগ কেল্লা বারংবার এদেশের স্বাধীনতাকামী সাহসী মানুষের রক্তে ভিজে উঠেছে। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের প্রভাবে ২২ নভেম্বর লালবাগ কেল্লায় ৭৩ নং নেটিভ ইনফ্রেন্টির ২ নং কোম্পানির বাংগালি সিপাহীদের অস্ত্র সমর্পণের নির্দেশ দিলে তারা সেই নির্দেশের বিপরীতে প্রতিরোধ গড়ে তোলে । এ প্রতিরোধ যুদ্ধে ৪১ জন বাংগালি নির্মমভাবে এবং তারো পরে এ ঘটনায় আরো ১১ জন বাঙালি সিপাহিকে বাহাদুর শাহ পার্কের গাছে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়৷ জনশ্রুতি আছে, লালবাগ কেল্লার যে পুকুর রয়েছে সেখানেও বাঙালি বিদ্রোহীদের লাশ ফেলা হয়েছিল।
লালবাগ কেল্লা পুনর্বার রক্তে ভিজে উঠে ১৯৪৮ সালের ১৪ জুলাই। পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে কেল্লায় অবস্থানরত পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পুলিশের বিদ্রোহের মধ্যে সেখানে রচিত হয় আরেক উপাখ্যান৷

কোথায় আছে লালবাগ কেল্লার শহীদদের সমাধি?

১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহে ইংরেজদের গ্রেপ্তার করা সিপাহি ও তাদের সমর্থকদের বাহাদুর শাহ পার্কের আমগাছে ঝুলিয়ে ফাঁসি দেয়া হয়। তবে তাদের কোথায় কবর দেয়া হয়েছিল তার কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। লোকশ্রুতি বলছে, কেল্লার ভেতরের শহীদদের লাশ ফেলা হয়েছিল কেল্লার পুকুরে। আরো অল্প লাশ ভেতরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল৷ পুকুরের লাশ সম্পর্কে জানা যায়, গোকূলচর এলাকার সোনা মিয়া পাঁচটি নৌকা নিয়ে পুকুরের লাশগুলো বুড়িগঙ্গায় ভাসিয়ে দেয় এবং অন্য লাশগুলো সমাহিত করা হয় বিষ্ণুচরণ দাস স্ট্রিটের গোড়ে শহীদ এলাকায়৷ লালবাগ ও আজিমপুরের মধ্যখানে অবস্থিত এ এলাকাটিতে সিপাহি বিদ্রোহে শহীদদের দাফন করা হয়েছিল বলে এর নাম হয় গোড়ে শহীদ। এর কিছুদিন পরই এ এলাকার নাম বিকৃত করে ঘোড়া শহীদ হিসেবে প্রচার করা হয়৷ সলিমুল্লাহ মুসলিম এতিমখানার দক্ষিণ -পূর্ব পাশে যে কয়টি কবর দেখা যায় সেগুলোই শহীদ সিপাহিদের সমাধি বলে স্বীকৃত।

 

 

তথ্যসূত্রঃ বিজন জনপদ থেকে রাজধানী ঢাকা- মো. খালেকুজ্জামান
ঢাকার খেরোখাতা ইতিহাস ও ছবিতে- মুন্সী আরমান আলী

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত